-1.5 C
New York

২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে জামায়াতের ইশতেহার ঘোষণা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ক্ষমতায় এলে আগামী পাঁচ বছরে সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে বলে জানিয়েছে দলটি। পুরো ইশতেহারকে ৮ ভাগে ভাগ করেছে দলটি।

আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ৯০ পৃষ্ঠার এই ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচনী ইশতেহার’ এর বিস্তারিত তুলে ধরেন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান।

ইশতেহারে সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে দলটি। এগুলো হলো—আপসহীন বাংলাদেশ গঠন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ, যুবকদের ক্ষমতায়ন, নারীদের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলার সার্বিক উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সবুজ-পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার, সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা এবং কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। 

ইশতেহারের ৮টি ভাগ হলো—জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষায় বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ, আত্মনির্ভরতার পথে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়, টেকসই অর্থনীতি উন্নয়ন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান, স্বনির্ভর কৃষি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, জনজীবনের মৌলিক মানোন্নয়ন, সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যুবকদের নেতৃত্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র। 

ইশতেহারে বলা হয়, ‘আমরা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন ও সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে বৈষম্যমূলক আইন ও নীতিমালা দ্রুত সংস্কার বা বাতিল করা হবে।’

জামায়াত জানিয়েছে, নির্বাচিত হলে ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে মনোনীত করা হবে ও সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর চেয়ারপারসন পদে বিরোধী দলের সদস্যদের সংখ্যা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের চেয়েও বেশি হারে বরাদ্দ দেওয়া হবে।

সংসদ সদস্যরা যেন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন, সে জন্য সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। দলীয় শৃঙ্খলার নামে সংসদ সদস্যদের জাতীয় ও জনস্বার্থে স্বাধীনভাবে কাজ করা থেকে বিরত রাখা হবে না— এমন কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় জুলাই ভিশনের চেতনা বাস্তবায়ন, টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি গঠন, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিতকরণ, কৃষিতে বিপ্লব সাধন, ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘থ্রি জিরো ভিশন’ বাস্তবায়নকেও ইশতেহারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারে বলা হয়, ‘ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে মন্ত্রিসভা জাতির বৈচিত্র্যের প্রতিফলন ঘটাবে।’

প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিদ্যমান জবাবদিহি ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি স্বাধীন ‘জবাবদিহি কাউন্সিল’ গঠন করা হবে, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন এবং তাদের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেবেন।

সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন চালু করা হবে। প্রাপ্ত আসন ও ভোটের অনুপাতে জাতীয় কোষাগার থেকে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়া হবে।

সুশাসন নিশ্চিত করতে জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে দলটি। সব সরকারি দপ্তরে একটি অনলাইন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করা হবে, যার মাধ্যমে নাগরিকরা সহজেই অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ নিষ্পত্তির সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কিত তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।

নাগরিকদের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে জামায়াত ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। সরকারি সেবাকে কার্যকর, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে একটি ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ ব্যবস্থা চালু করা হবে।

‘মাইগভ’-এর মতো একটি কেন্দ্রীয় ই-গভর্ন্যান্স পোর্টাল তৈরি করা হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থাকবে। এর মাধ্যমে ঘরে বসেই এক ক্লিকে একাধিক সরকারি সেবা গ্রহণ করা যাবে।

জামায়াত জানিয়েছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারি দপ্তরগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে এবং সব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি ও সেবা সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল করা হবে। সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি নেওয়া হবে না। নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সম্পূর্ণভাবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হবে, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।

জামায়াত আরও বলেছে, সব স্তরের উন্নয়ন কার্যক্রম স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অধীনে বাস্তবায়ন করা হবে। মন্ত্রণালয়গুলোর ভূমিকা সীমিত থাকবে তদারকি ও সমন্বয়ে।

পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়বিচার ও সমমর্যাদাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে জামায়াত বলেছে, তারা বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান ও বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা বৃদ্ধিতে কাজ করবে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী ও নিকটবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে।’

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদারের মাধ্যমে ধাপে ধাপে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

ক্ষমতায় গেলে মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীকে অন্তর্ভুক্ত করার অঙ্গীকার করেছে জামায়াত। নারীদের মর্যাদা রক্ষা করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়ের সম্মতিক্রমে দৈনিক কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার কথাও বলা হয়েছে।

‘নারী চলবে নির্ভয়ে’—এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যস্ত সময়ে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু, গণপরিবহনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, ডাবল ডেকার বাসে নারীদের জন্য পৃথক কামরা এবং জরুরি হেল্পলাইন নম্বর চালু করার পাশাপাশি জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে।

নারীদের কর্মক্ষেত্রে পুনঃপ্রবেশ সহজ করতে আজীবন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগও চালু করা হবে বলে জানিয়েছে দলটি।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘জনশক্তি শিল্প মন্ত্রণালয়’ করা হবে এবং এ খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।

২০৩০ সালের মধ্যে পরিবেশগত অবক্ষয়, বর্জ্য ও বন্যার ঝুঁকি শূন্য— এই ‘থ্রি জিরো ভিশন’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে জামায়াত।

নির্বাচিত হলে জাতীয়ভাবে সম্মানিত শিক্ষক, খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, গবেষক ও শিক্ষা প্রশাসকদের নেতৃত্বে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করে সমন্বিত শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে দলটি।

ইশতেহারে আরও বলা হয়, সংসদকে পুনরায় জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি, সমঝোতা ও রাষ্ট্রীয় সফর নিয়ে সংসদে উন্মুক্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে।

Related Articles

Latest Articles