-4.6 C
New York

কলাবাগান থেকে কামরাঙ্গীরচর: বিচিত্র সমস্যা আর প্রত্যাশার সমীকরণে ঢাকা-১০

ধানমন্ডি-কলাবাগান এলাকায় গত ১০ বছরে অন্তত ৫ বার ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন এ এলাকার বাসিন্দা তনিমা মাহজাবিন। সবশেষ নিজের প্রিয় মোবাইল ফোনটি হারানোর পর বুঝতে পেরেছেন যে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ না হলে এসব ছোটখাটো অপরাধ দূর করা সম্ভব না।

গত তিন সংসদ নির্বাচনে ভোট দেননি তনিমা। তাই এবারের নির্বাচন নিয়ে রয়েছে তার বিশেষ আগ্রহ। তফসিল ঘোষণার পর থেকে খেয়াল রাখছেন কারা প্রার্থী হচ্ছেন তার এলাকা ঢাকা-১০ আসনে। তাদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। এ আসনের হাজারীবাগ এলাকায় তার বেড়ে ওঠা, এখন থাকেন এলিফ্যান্ট রোড এলাকায়।

তনিমা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সবার উচিত দল বা প্রতীক না দেখে যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করা। যে প্রার্থী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন তাকেই আমি ভোট দেবো।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ২২, ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনটিকে ঢাকার অন্যতম ‘অভিজাত’ আসন বলা হয়। বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এই এলাকার ভোটার।

এ আসনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও স্থাপনাগুলো হলো ধানমন্ডি লেক, নিউমার্কেট, জিগাতলা, ট্যানারি মোড়, সাত মসজিদ রোড, গ্রিন রোড, আবাহনী মাঠ, স্কয়ার হাসপাতাল, শুক্রাবাদ, সোবহানবাগ, ঢাকা কলেজ।

ধানমন্ডি-কলাবাগান এলাকায় উন্নত সড়ক আর সুউচ্চ ভবন দেখা গেলেও ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের খবর প্রায়ই আসে পত্রিকার পাতায়। আর হাজারীবাগ-জিগাতলা-কামরাঙ্গীরচরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে জলাবদ্ধতা, গ্যাস সংকট, খেলার মাঠের অভাবসহ নানা সমস্যা।

প্রায় ৩০ বছর ধরে ধানমন্ডির বিভিন্ন এলাকায় চায়ের দোকান করেন মোহাম্মদ কবির। কখনো আবাহনী মাঠ, কখনো জিগাতলায় ছিল তার দোকান। বিভিন্ন সময় রাজনীতিবিদদের কাছে স্থায়ী দোকানের প্রতিশ্রুতি পেয়েও উচ্ছেদ হতে হয়েছে। জীবিকার তাগিদে আবারও দোকান নিয়ে বসেছেন। ভোটারও হয়েছেন ধানমন্ডি-নিউমার্কেট-কলাবাগান-হাজারীবাগ মিলিয়ে ঢাকা-১০ আসনের।

কবির ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দেশে অনেক সমস্যা, কিন্তু আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় সমস্যা বেকারত্ব। বেকারত্বের কারণেই সব অপরাধ, চুরি, ছিনতাই, মাদকের প্রকোপ বাড়ছে। নতুন সরকারের কাজ হবে সবার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।’

ঢাকা-১০ আসনের অন্তর্ভুক্ত নিউমার্কেট এলাকাটি রাজধানীর বাণিজ্যিক ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হলেও এখানে রয়েছে নানা সমস্যা।

তীব্র যানজট ও ফুটপাত দখলের কারণে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে চরম বিঘ্ন হয়। অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সংঘাত, অপরিকল্পিত পার্কিং এখানকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে প্রায় ব্যাহত করে।

নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য সচিব আবু সাঈদ রুবেল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নির্বাচনের পর জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমাদের দাবি থাকবে নিউমার্কেটের নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা হয়। এখানকার সার্বিক ব্যবসার পরিবেশ যেন কোনোভাবে বিঘ্নিত না হয়। এজন্য জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ সহজ থাকার দরকার।’

ইতোমধ্যে প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়া শুরু করেছেন, এলাকার সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন সমস্যা সমাধানের। উঠান বৈঠক করে তারা পাড়া-মহল্লা পর্যায়ের সমস্যাগুলো জেনে নিচ্ছেন ভোটারদের কাছ থেকে। আর ভোটাররাও খেয়াল রাখছেন কোন প্রার্থী কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন এ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. জসীম উদ্দীন সরকার।

তিনি বলেন, ‘২০১৪ ও ২০১৮ সালে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া যুবসমাজ এবার ভোট দিতে মুখিয়ে আছে। তাদের প্রত্যাশা শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি ও অপশাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি গুণগত পরিবর্তন।’

এলাকার সমস্যা প্রসঙ্গে জসীম উদ্দীন সরকার বলেন, ‘আমি এ এলাকার একজন বাসিন্দা হিসেবে বলতে পারি এখানকার জনগণের প্রধান দাবি তিনটি—নিরাপত্তা, জলাবদ্ধতা নিরসন ও গ্যাস সংকট সমাধান। চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং বড় সমস্যা। ব্যবসায়ীরা নিয়মিত চাঁদার আতঙ্কে থাকে।’

নির্বাচিত হলে ধাপে ধাপে এলাকার সমস্যাগুলো সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

‘তবে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা জরুরি। ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে যে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা এখনো সক্রিয়। জনমনে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এই আতঙ্ক দূর করা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব,’ যোগ করেন জসীম উদ্দীন।

বিএনপি প্রার্থী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘ঢাকা-১০ নির্বাচনী এলাকা বৈচিত্র্যময়—কামরাঙ্গীরচরের মতো শ্রমজীবী মানুষের এলাকা যেমন আছে, তেমনি ধানমন্ডির মতো অভিজাত আবাসিক এলাকাও রয়েছে। তাই এ আসনের ভোটারদের সমস্যা, প্রত্যাশা ও রাজনীতি দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন। সুতরাং সবার জন্য এক ধরনের বার্তা নয়, বরং ভিন্ন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছানোর কৌশল নিয়েছি।’

‘বিএনপি লক্ষ্য জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, দায়বদ্ধ সংসদ ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অতীতে আমাদের আসনের অনেক এমপি এ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না। ভোটারদের মধ্যে একটি সাধারণ শঙ্কা রয়েছে—নির্বাচনের পর জনপ্রতিনিধিদের আর পাওয়া যায় না। আমি বলব, আমি এ এলাকায় থাকি, এখানেই রাজনীতি করেছি। গত ১৭ বছরের প্রতিকূল সময়েও জনগণের পাশে ছিলাম। নির্বাচিত হই বা না হই, জনগণের সাথেই থাকব।’

‘দুর্নীতি, দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটলে আমি মানুষকে বলছি, সরাসরি আমার সঙ্গে যেন তারা যোগাযোগ করেন। রাজনীতির নামে দুর্বৃত্তায়ন কোনোভাবেই আমি মেনে নেব না,’ যোগ করেন তিনি।

ভোটারদের উদ্দেশে রবিউল বলেন, ‘এবারের নির্বাচন শুধু এমপি নির্বাচন নয়—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের নির্বাচন। তাই সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটে দেওয়ার আহ্বান জানাই।’

দুই প্রার্থীই নিউমার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব নিরসনে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এ আসনের অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আ. আউয়াল, এবি পার্টির নাসরীন সুলতানা, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির আবু হানিফ হৃদয়, বাংলাদেশ লেবার পার্টির আবুল কালাম আজাদ, মুক্তিজোটের আনিছুর রহমান, আমজনতার দলের আব্দুল্লাহ আল হুসাইন, জাতীয় পার্টির বহ্নি বেপারী, জনতার দলের মো. জাকির হোসেন।

ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬৬০, যা গত নির্বাচনের তুলনায় ৬৩ হাজার ৭২৭ বেশি। এবার এ আসনে ভোটারদের মধ্যে ২ লাখ ৪ হাজার ৬০৪ পুরুষ, ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০ নারী ও ৬ জন হিজড়া।

Related Articles

Latest Articles