বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এর আগে এতটা কোণঠাসা অবস্থায় ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপে নাজেহাল আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড। একাধিক ইস্যুতে জর্জরিত বিসিবি শনিবারের বোর্ড সভায় সবাইকে চমকে দিয়েছে সাকিব আল হাসানের প্রসঙ্গ টেনে।
রাজনৈতিক কারণে নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশের ইতিহাসের সফলতম ক্রিকেটার দেশে একরকম অলিখিত নিষিদ্ধ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনো ভক্ত সাকিবের ‘৭৫’ নম্বর জার্সি পরে মাঠে গেলেও তা খুলে রাখা হচ্ছে। সাকিবের নাম লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে কাউকে মাঠে ঢুকতে দিচ্ছেন না বিসিবির নিরাপত্তাকর্মীরা।
অথচ হুট করেই সেই সাকিবের প্রতি দরদ দেখাচ্ছে বোর্ড। রীতিমতো বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে তাকে ফেরানোর। এমনকি নতুন বছরে তাকে কেন্দ্রীয় চুক্তির প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন দুই পরিচালক আমজাদ হোসেন ও আসিফ আকবর। সাকিবের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে—এই ভিত্তিতেই এমন অগ্রগতি বলে জানান আসিফ।
সাকিবকে ফেরানোর প্রসঙ্গটি এমন এক দিনে সামনে আনা হয়েছে, যেদিন একাধিক নেতিবাচক খবরে বোর্ডের বিব্রত হওয়ার কথা। বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের নির্ধারিত সভা চলাকালেই আইসিসি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয়—’বাংলাদেশের পরিবর্তে বিশ্বকাপে খেলবে স্কটল্যান্ড।’ এটি অবশ্য অনুমিতই ছিল। আইসিসির বোর্ড সভায় বেশিরভাগ সদস্য দেশের ভোট পায়নি বিসিবি; ভেন্যু বদলে নিজেদের দাবিও প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি তারা।
বোর্ড সভা চলাকালীন খবর আসে, পদত্যাগ করেছেন বিসিবির প্রভাবশালী পরিচালক ইশতিয়াক সাদেক। তাদের ঘনিষ্ঠ আরও একাধিক পরিচালকের পদত্যাগের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্তিগত কারণ দেখানো হলেও নেপথ্যে যে ভিন্ন কারণ রয়েছে, তা স্পষ্ট। এছাড়া বিসিবির আরেক পরিচালক মুখলেসুর রহমান শামীমের বিরুদ্ধে বিপিএলে ফিক্সিংয়ের অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে তাকে স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হয়েছে। এর আগে ক্রিকেটারদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় আন্দোলনের মুখে পরিচালক নাজমুল ইসলামকেও পদ থেকে সরাতে বাধ্য হন বুলবুল।
বিপিএলের মধ্যেই একাধিক দাবি সামনে এনে ক্রিকেটাররা ম্যাচ বয়কট করে বিসিবির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের অচলাবস্থা ও দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন চরমে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই, ঘরোয়া ক্রিকেটে পরবর্তী সূচি নিয়ে কারো কাছে কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই। বিপিএল চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের অধিনায়ক ও দেশের টেস্ট দলপতি নাজমুল হোসেন শান্ত প্রকাশ্যে নিজের হতাশা প্রকাশ করেছেন।
ঘরে-বাইরে খেলা বন্ধ, সংগঠকদের বিরোধ এবং বোর্ড কর্তাদের নিয়ে ক্রিকেটারদের চরম অসন্তোষ এখন ওপেন সিক্রেট। এর মধ্যে বিশ্বকাপ আয়োজন হাতছাড়া হওয়ায় সামনে অপেক্ষা করছে বিপুল আর্থিক ক্ষতির ধাক্কা। এত সংকটের ভিড়ে বোর্ড সভায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ালো সাকিবকে ফেরানোর সিদ্ধান্ত!
অথচ বুলবুল যার সমর্থনে বিসিবি সভাপতি হয়েছেন, সেই সদ্য সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি সাকিবকে কোনোভাবেই বাংলাদেশে খেলতে দেবেন না। তাকে দেশের ক্রিকেটে নিষিদ্ধ করার কথাও উঠেছিল তাদের পক্ষ থেকে। সেই সাকিবের প্রতি আচমকা এই সদয় হওয়ার কারণ কী?
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সংসদ সদস্য হওয়ায় সাকিবের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। সরকারি বাধার কারণেই তিনি দেশে ফিরতে পারেননি। এখন আসিফ আকবররা বলছেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিসিবি সভাপতি সাকিবের বিষয়টি সমাধান করবেন এবং সেরা তারকাকে তারা দলে চান।
বিশ্বকাপ না থাকায় বাংলাদেশের পরবর্তী আন্তর্জাতিক সিরিজ পাকিস্তানের বিপক্ষে, আগামী মার্চে। ততদিনে দেশের ক্ষমতার আরেক দফা পালাবদল হয়ে যাওয়ার কথা। বর্তমান বোর্ড পরিচালকদের সবাই পদে থাকবেন কি না, তাও নিশ্চিত নয়। এত অনিশ্চয়তার মাঝে সাকিব প্রসঙ্গ সামনে আনা কি কেবলই আলোচনার মোড় ঘোরানোর চেষ্টা? এমন প্রশ্ন অবশ্য খোদ সংবাদ সম্মেলনেই হয়েছে। বিসিবির দুই পরিচালক হালকা হেসে তা উড়িয়ে দিলেও সাকিবকে অস্বাভাবিকভাবে টেনে আনা কেউই সরলভাবে দেখছেন না।
কথা হলো, সাকিব প্রসঙ্গ এনে বিসিবির বর্তমান কর্তাদের ব্যর্থতার বোঝা কি এতে বিন্দুমাত্র কমবে?
