চলমান শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় হাঁস-মুরগির খামারে বিভিন্ন রোগবালাই ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন খামারি ও গৃহস্থালিভাবে হাঁস-মুরগি পালনকারীরা।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, তীব্র শীতে মুরগির শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগের পাশাপাশি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ বেড়েছে। বিশেষ করে রাণীক্ষেত রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক মুরগি মারা যাচ্ছে।
সাধারণত দেশি মুরগি প্রথমে রাণীক্ষেত রোগে আক্রান্ত হয়, পরে তা দ্রুত পুরো খামারে ছড়িয়ে পড়ে। শীতকালে মুরগির শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকায় তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যায়। ফলে একবার আক্রান্ত হলে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার একাধিক গ্রাম্য খামারির। তারা জানান, চলমান শৈত্যপ্রবাহে তাদের খামারের অনেক মুরগি মারা গেলেও সুনির্দিষ্ট রোগ শনাক্ত করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
একই অবস্থার কথা জানান বাড়তি আয়ের জন্য গৃহস্থালিভাবে মুরগি পালন করা নারীরাও। অনেক ক্ষেত্রে রাণীক্ষেত রোগে মুরগি মারা গেলেও এর লক্ষণ সম্পর্কে তারা অবগত নন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামের গৃহিণী মালেকা বেগম (৩০) জানান, গত এক সপ্তাহে তার ১৩টি মুরগি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
তিনি বলেন, রোগাক্রান্ত মুরগিগুলো সারাদিন অস্বাভাবিকভাবে ডাকাডাকি ও ছটফট করত। মুরগির বাচ্চাগুলোও সারাদিন চ্যাঁচামেচি করে অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যেত। কিন্তু কোন রোগে মারা যাচ্ছে, তা আমরা বুঝতে পারিনি।
একই উপজেলার হাজিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নাজমুন (৪৮) বলেন, আমার মুরগিগুলোর মধ্যেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। তিন দিনের মধ্যে আটটি মুরগি মারা যায়। পরে একটি মৃত মুরগি উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ময়নাতদন্ত করে জানানো হয়, সেটি রাণীক্ষেত রোগে আক্রান্ত ছিল।
তিনি আরও জানান, চিকিৎসকেরা বলেছেন রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় বাকি মুরগিগুলোও একই কারণে মারা গেছে।
এদিকে তীব্র শীতের কারণে হাঁসের খামারগুলোতে ডাক প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, এ রোগ দ্রুত ছড়ালেও মৃত্যুহার তুলনামূলক কম হওয়ায় সময়মতো ব্যবস্থা নিলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার হরিহরপুর ও গোরিয়া ঢেঁপা কন্দর এবং পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার সাহাপাড়া ও চন্দনবাড়ি গ্রামের কয়েকজন খামারি হাঁস মারা যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গোরিয়া ঢেঁপা কন্দর গ্রামের খামারি শাহ আলম (৫৫) বলেন, গত সপ্তাহে ডাক প্লেগ রোগে আমার কয়েকটি হাঁস মারা গেছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মামুন শাহ বলেন, টিকা না দেওয়ার কারণে আক্রান্ত মুরগির মৃত্যুহার বেশি হচ্ছে। হাঁস-মুরগির দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বর্তমানে তাপমাত্রা অনেক কমে যাওয়ায় তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই টিকাই একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ। তিনি জানান, জন্মের তিন দিনের মধ্যেই মুরগির বাচ্চাকে টিকা দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পোলট্রি শেডে পর্যাপ্ত উষ্ণতা নিশ্চিত করতে হবে এবং মেঝেতে পর্যাপ্ত লিটার ব্যবহার করতে হবে। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা ভেটেরিনারি হাসপাতালে যোগাযোগ করা জরুরি।
আবহাওয়াবিদরা জানান, হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস ও প্রায় মেঘমুক্ত আকাশের কারণে উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। চলতি মাসজুড়ে একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজমান থাকতে পারে।
