ডেভিড লিঞ্চের কথা বলতে গেলে আমরা আসলে সিনেমার এক স্বাপ্নিক দুনিয়ার কথা বলি—যা অস্বস্তিকর, মোহময়, কখনো অসংলগ্ন কিন্তু ভেতরে ভেতরে গভীর অনুভূতিতে ভরা।
লিঞ্চ কখনোই চাননি তার সিনেমা শুধুই বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হোক। তিনি চেয়েছেন, দর্শক সেটা অনুভব করুক।
তার সিনেমা চলে অবচেতন বাঁকে—প্রতীক ও চিহ্ন বারবার ফিরে আসে, যুক্তি বাঁক নেয়, সৌন্দর্যের সঙ্গে থাকে ভয় আর স্বাভাবিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে কিছু অন্ধকার।
দশকের পর দশক ধরে সহিংসতা, পরিচয়, স্মৃতি আর বাস্তবতার ভ্রম অনুসন্ধান করেছেন লিঞ্চ।
তার কাজগুলোর মধ্যে পাঁচটি সিনেমার কথা আলাদা করে বলতে হয়, যেগুলো ‘লিঞ্চিয়ান’ জগতে প্রবেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ব্লু ভেলভেট (১৯৮৬)
‘ব্লু ভেলভেট’কে অনেকেই মনে করেন সেই সিনেমা, যেখানে লিঞ্চ পুরোপুরি নিজের স্বর খুঁজে পান। প্রথম দেখায় ছবিটা যেন নিখুঁত আমেরিকান উপশহর—সাদা কাঠের বেড়া, ফুটন্ত গোলাপ, হাসিমুখের মানুষ।
কিন্তু শুরুতেই লিঞ্চ ক্যামেরা নামিয়ে দেন সবুজ ঘাসের নিচে, যেখানে পোকামাকড় কিলবিল করছে।
এই এক দৃশ্যই সিনেমার মূল বক্তব্য দিয়ে দেয়—আমেরিকান স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে আছে পচন।
গল্পের কেন্দ্রে জেফ্রি বোমন্ট (কাইল ম্যাকলাকলান), এক কৌতূহলী কলেজছাত্র। হঠাৎ করেই সে একটি কাঁটা মানুষের কান খুঁজে পায় এবং ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে যৌন সহিংসতা আর দুর্নীতিতে ভরা এক দুঃস্বপ্নের জগতে।
সেই জগতের কেন্দ্রে আছে ফ্র্যাঙ্ক বুথ (ডেনিস হপার)—সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর খলনায়কদের একজন। ফ্র্যাঙ্ক শুধু হিংস্র নয়; শিশুসুলভ, আনপ্রেডিক্টেবল এবং নিষ্ঠুরতায় ভীষণ বেপরোয়া।
তার উপস্থিতি ছবিটাকে সাধারণ রহস্য থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের দিকে।
ইসাবেলা রোসেলিনির ডরোথি ভ্যালেন্স চরিত্রটি একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও প্রলোভনময়—ব্যথা, কামনা এবং অপমানকে এমনভাবে ধারণ করে, যা আজও দর্শকদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করে।
দ্য এলিফ্যান্ট ম্যান (১৯৮০)
প্রথম দেখায় ‘দ্য এলিফ্যান্ট ম্যান’ যেন লিঞ্চের সিনেমার মধ্যে ব্যতিক্রম। মার্জিত সাদা-কালো চিত্রায়ণ এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতায় দাঁড়ানো এই সিনেমাটি তার অন্য পরাবাস্তব দুঃস্বপ্ন থেকে অনেকটাই আলাদা। কিন্তু এই ক্লাসিকাল আবরণের নিচে লুকিয়ে আছে মানবতা, নিষ্ঠুরতা এবং মর্যাদার এক গভীর ধ্যান।
ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডে ‘বিকৃত মানুষ’ হিসেবে প্রদর্শিত জোসেফ মেরিকের (জন মেরিক) জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ছবিটি অসাধারণ সহমর্মিতায় ভরা। জন হার্টের অভিনয় সংযত হলেও প্রভাবশালী। তিনি মেরিককে কোনো দানব হিসেবে নয় বরং সংবেদনশীল ও বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
শিল্পকারখানার মতো শব্দজগৎ, দেহগত বিকৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতার প্রতি আকর্ষণ এখানে স্পষ্ট।
ভিক্টোরিয়ান শহর নিজেই যেন এক নিষ্ঠুর যন্ত্র—যা দুর্বলদের পিষে ফেলে, আবার নিজেকে সভ্য বলে বাহবা দেয়। এখানে আসল ভয় মেরিকের চেহারায় নয়, বরং সমাজের প্রতিক্রিয়ায়।
‘দ্য এলিফ্যান্ট ম্যান’ অন্ধকারের মাঝেও সহানুভূতির পক্ষে দাঁড়ায়। প্রমাণ করে লিঞ্চের সিনেমা শীতল বা নির্লিপ্ত নয় বরং গভীরভাবে নৈতিক। তবে কখনোই অতিআবেগী নয়। এটি দেখায়,বাইরের আবরণ নয়, মানুষের আত্মার প্রতিই লিঞ্চের আগ্রহ অটুট।
মালহল্যান্ড ড্রাইভ (২০০১)
যদি কোনো এক সিনেমা ২১শ শতকের লিঞ্চকে সংজ্ঞায়িত করে, তা হলো মালহল্যান্ড ড্রাইভ। এটি প্রায়ই সর্বকালের সেরা সিনেমার তালিকায় থাকে। সিনেমাটি হলিউড এবং স্বপ্নভঙ্গের ওপর নির্মিত এক মর্মস্পর্শী আখ্যান।
গল্প শুরু হয় এক রৌদ্রোজ্জ্বল রহস্যের মতো। এক উদীয়মান অভিনেত্রী বেটি (নাওমি ওয়াটস) লস অ্যাঞ্জেলেসে আসে এবং এক সাময়িক স্মৃতিশক্তিহীন নারী রীটা (লরা হেরিংস) এর সঙ্গে মিলে যায়। তারা একসঙ্গে রীটার অতীত খুঁজতে শুরু করে।
কিন্তু মাঝপথে সিনেমার চরিত্রের পরিচয় বদলে যায়, সময়রেখা ধ্বংস হয় এবং অর্থ বিলীন হয়ে যায়। যা আগে রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল, তা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। লিঞ্চ সিনেমার ব্যাখ্যা দিতে অস্বীকার করেন, আর সেই অস্বীকারই সিনেমার শক্তি। মালহল্যান্ড ড্রাইভ স্বপ্নের মতো কাজ করে—যুক্তি হারিয়ে গেলেও আবেগ থেকে যায়।
নাওমি ওয়াটস তার অভিনয় দিয়ে দর্শককে মুগ্ধ করেন। আশাবাদ রূপান্তরিত হয় বেদনায়। হলিউডের চিত্র এখানে নির্মম—গ্ল্যামার নেই, আছে ক্রূরতা ও উদাসীনতা। এখানে সফলতা বা ব্যর্থতা যেন যোগ্যতা নয়, নিয়তির খেলা।
ইরেজারহেড (১৯৭৭)
‘ইরেজারহেড’ লিঞ্চের প্রথম ফিচার সিনেমা এবং সম্ভবত তার সিনেমায় দুঃস্বপ্নের সবচেয়ে খাঁটি প্রকাশ। সীমিত বাজেটে কয়েক বছর ধরে চিত্রায়িত সাদা-কালো সিনেমাটি গল্পের চেয়েও বেশি এক ধরনের আতঙ্কের আক্রমণের মতো।
গল্পের কেন্দ্রে হেনরি স্পেন্সার। ইনি এমন এক ব্যক্তি যিনি এক ধ্বংসপ্রায় শিল্পাঞ্চলে বাস করেন। তার জীবন বিপর্যস্ত হয় এক বিকৃত, অমানবীয় শিশুর জন্মের পর।
সিনেমা প্রাথমিক ভয়কে স্পর্শ করে। পিতৃত্ব, যৌন উদ্বেগ, দেহের ক্ষয় এবং বিচ্ছিন্নতাকে তুলে ধরে।
দৃশ্যগুলো অর্ধ-স্মৃতির স্বপ্নের মতো ছাপ রেখে যায়। ইরেজারহেড-এর জগৎ মানুষের জন্য শত্রুতাপূর্ণ মনে হয়।
লিঞ্চ প্রথম থেকেই বুঝেছিলেন সিনেমাও সঙ্গীত বা চিত্রকর্মের মতো আবেগ প্রকাশ করতে পারে আলাদা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই।
‘ইরেজারহেড’ বহু প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারকে প্রভাবিত করেছে, কারণ এটি বেপরোয়া হতে সাহস করে।
দ্য স্ট্রেইট স্টোরি (১৯৯৯)
লিঞ্চের সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ বলা যেতে পারে ‘দ্য স্ট্রেইট স্টোরি’কে।
সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সিনেমাটির গল্প আবর্তিত হয় অ্যালভিন স্ট্রেইট নামের এক বৃদ্ধ মানুষকে ঘিরে। তিনি ছিন্নমূল ভাইয়ের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য ঘাস কাঁটার মেশিনে চড়ে ভ্রমণ করেন।
এখানে কোনো দুঃস্বপ্ন নেই। কোনো ভঙ্গুর পরিচয় নেই। কোনো অতিপ্রাকৃতিক সহিংসতা নেই। তবু সিনেমাটি স্পষ্টভাবে ‘লিঞ্চিয়ান’—নীরবতা, প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং আবেগের নরম ছায়ার প্রতি মনোযোগে।
সিনেমাটিতে আমেরিকার মধ্যপশ্চিম বিস্তৃত, ধ্যানমগ্ন স্থান হয়ে ওঠে। সেখানে সময় যেন ধীরে চলে এবং ছোট সাক্ষাৎগুলোরও গভীর প্রভাব থাকে।
এই সিনেমায় রিচার্ড ফার্নসওয়ার্থের অভিনয় অনবদ্য। তিনি অনুশোচনা, জেদ এবং ভালোবাসা অল্প সংলাপেই প্রকাশ করেন।
সিনেমার মূল বিষয়—বার্ধক্য, ক্ষমা এবং সাধারণ জীবনের মর্যাদা।
‘দ্য স্ট্রেইট স্টোরি’— লিঞ্চকে শিল্পী হিসেবে পুরোপুরি চিত্রায়িত করে।
এটি স্মরণ করায়-তার সিনেমার উদ্দেশ্য বিভ্রম নয়, বরং সহানুভূতি। যা হতে পারে দুঃস্বপ্নের জগতে প্রবেশ করে কিংবা খোলা রাস্তায় ভ্রমণের মাধ্যমে।
