-3 C
New York

ফেদেরিকো ফেলিনির যে ৫ সিনেমা না দেখলেই নয়

ফেদেরিকো ফেলিনির সিনেমা দেখা মানে শুধু একটি গল্প দেখা নয়। তার ছবিতে ঢুকলে মনে হয়—আপনি হেঁটে চলেছেন স্মৃতি, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ, আনন্দ আর গভীর নীরবতার ভেতর দিয়ে। তিনি ছিলেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় নির্মাতা, যিনি ইতালির যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তববাদী সিনেমাকে নিয়ে গেছেন একেবারে ব্যক্তিগত, স্বপ্নময় ও কল্পনাপ্রবণ এক জায়গায়।

ফেলিনির ছবিতে বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা খুব স্পষ্ট নয়। কখনও মনে হয় যা দেখছেন তা বাস্তব, আবার পরমুহূর্তেই তা স্বপ্নে বদলে যায়। অনেক সময় তার ক্যামেরা বাইরের জগৎ ছেড়ে ঢুকে পড়ে মানুষের ভেতরের জগতে—ভয়, দ্বিধা, কামনা, স্মৃতি আর আত্মসংঘাতের দিকে।

মার্টিন স্করসেজি, টেরি গিলিয়ামসহ বহু বড় নির্মাতার ওপর ফেলিনির প্রভাব রয়েছে। ফেলিনিকে বুঝতে চাইলে, তার সিনেমার জগতে ঢোকার জন্য এই পাঁচটি ছবি সবচেয়ে ভালো শুরু।

নাইটস অব ক্যাবিরিয়া ( ১৯৫৭)

সব হারিয়েও আশায় বাঁচার গল্প বলে এই সিনেমা। ‘নাইটস অব ক্যাবিরিয়া’ দেখায় নিষ্ঠুর পৃথিবীতে নিষ্পাপতার হার না মানা রূপ।

ক্যাবিরিয়া (জুলিয়েটা মাসিনা) রোমের একজন যৌনকর্মী। জীবন তাকে বারবার ঠকায়—ছিনতাই হয়, প্রেমে প্রতারণা হয়, মানুষ তাকে ব্যবহার করে ফেলে দেয়। তবু সে ভালোবাসায় বিশ্বাস হারায় না।

ক্যাবিরিয়া রাগী, প্রাণবন্ত, হাসিখুশি—সে কাঁদে, আবার দাঁড়ায়। ফেলিনি এখানে দুঃখের পাশে হাসি রাখেন, যাতে চরিত্রটি আরও বাস্তব লাগে।

শেষ দৃশ্যে ক্যাবিরিয়াকে ভঙুর অবস্থায় দেখা যায়, কিন্তু সে হেঁটে চলে। অচেনা কিছু মানুষের হাসির ভেতর দিয়ে সে সামনে এগোয়। এটি সুখের সমাপ্তি নয়, কিন্তু আশাব্যঞ্জক সমাপ্তি। ফেলিনি যেন বলেন—জীবন যতই নির্মম হোক, টিকে থাকাটাই সবচেয়ে বড় জয়।

৮½ (১৯৬৩)

নিজেকে খুঁজতে গিয়ে সিনেমা বানানো বা সিনেমা বানাতে গিয়ে নিজেকে খুঁজে পাবার গল্প এটি। ‘৮½’ ফেলিনির সবচেয়ে ব্যক্তিগত ছবি।

এখানে গুইদো আনসেলমি (মারচেলো মাস্ত্রোয়ানি) একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, যিনি নিজের ছবিটা শেষ করতে পারছেন না। চারপাশে মানুষ আছে, টাকা আছে, সুযোগ আছে—কিন্তু তিনি জানেন না কী বলতে চান।

এই সমস্যাটাকেই ছবির বিষয় বানান ফেলিনি। বাস্তবতা, স্বপ্ন, শৈশবের স্মৃতি, কল্পনা—সব মিশে যায়। কোথায় বাস্তব শেষ, কোথায় কল্পনা শুরু, তা বোঝা কঠিন। ঠিক যেমন জীবনে হয়।

শেষ দৃশ্যটি খুব আনন্দময়—সব চরিত্র একসঙ্গে হাঁটে, যেন এক ধরনের উৎসব। ফেলিনি বলেন—সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, কিন্তু নিজেকে মেনে নিলেই শান্তি আসে।

লা দোলচে ভিতা (১৯৬০)

ঝলমলে জীবনের ভেতরের শূন্যতা প্রকাশ করে এই সিনেমা। ‘লা দোলচে ভিতা’ মুক্তির সময় ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। আজও এটি আধুনিক জীবনকে দেখার এক তীক্ষ্ণ আয়না।

ছবির মূল চরিত্র সাংবাদিক মারচেলো রুবিনি (মারচেলো মাস্ত্রোয়ানি)। সে রোমের অভিজাত সমাজে ঘোরাফেরা করে—তারকা, ধনী মানুষ, রাতভর পার্টি, বিলাসিতা। বাইরে থেকে জীবনটা ঝলমলে, কিন্তু ভেতরে সে কিছুই খুঁজে পায় না।

ছবিটি পর্বের মতো এগোয়। প্রতিটি পর্বে একেকটি প্রশ্ন উঠে আসে—এই জীবন কি সত্যিই সুখের?

ট্রেভি ফাউন্টেনের বিখ্যাত দৃশ্যটি শুধু সুন্দর নয়, এটি প্রতীকী ও তাৎপর্যপূর্ণ। এতে আকর্ষণ আছে, কিন্তু দিশা নেই।

‘লা দোলচে ভিতা’ দেখায়, কীভাবে আধুনিক মানুষ ধীরে ধীরে অর্থহীনতার দিকে এগোয়।

লা স্ত্রাদা (১৯৫৪)

পথের গল্প, কিন্তু গভীর ট্র্যাজেডির প্রকাশ এই সিনেমা। ‘লা স্ত্রাদা’ সেই ছবি, যেটি ফেদেরিকো ফেলিনিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে। বাইরে থেকে এটি একটি সহজ পথচলার গল্প মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে ছবিটি প্রচণ্ড বেদনাদায়ক।

ছবির মূল চরিত্র গেলসোমিনা (জুলিয়েটা মাসিনা)—একজন সরল, শিশুসুলভ মেয়ে। দারিদ্র্যের কারণে তার মা তাকে বিক্রি করে দেয় এক রুক্ষ, নির্দয় পথশিল্পী জাম্পানো-র (অ্যান্থনি কুইন) কাছে। তারা এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ঘুরে বেড়ায়, রাস্তার ধারে কসরত দেখিয়ে জীবিকা চালায়।

এই যাত্রার মধ্যেই গড়ে ওঠে এক ভয়ংকর সম্পর্ক—যেখানে ভালোবাসা নেই, আছে নির্যাতন, নীরবতা আর ভয়। গেলসোমিনা এখানে শুধু একজন নারী নন, তিনি নিষ্পাপতার প্রতীক—যে এক কঠিন পৃথিবীতে ঠাঁই খুঁজে পায় না।

ফেলিনি দুঃখকে এখানে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। ছবির পথ যেন শেষ হয় না—ঘুরতেই থাকে। শেষ দৃশ্যটি এতটাই হৃদয়বিদারক যে তা অনেক দিন মনে গেঁথে থাকে।

‘লা স্ত্রাদা’ দেখায়—সবচেয়ে নির্মম মানুষও একসময় অনুতাপ থেকে বাঁচতে পারে না।

ইল বিদোনে (১৯৫৫)

প্রতারণার জীবন আর ভেতরের শূন্যতাকে তুলে ধরে এই সিনেমা। ‘ইল বিদোনে’ ফেলিনির একটি স্বল্প আলোচিত ছবি, কিন্তু গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এটি কয়েকজন প্রতারকের গল্প, যারা যাজক বা সরকারি লোক সেজে দরিদ্র গ্রামবাসীদের ঠকায়।

অগুস্তো চরিত্রে অ্যান্থনি কুইন এখানে একজন অভিজ্ঞ প্রতারক—যার জীবন ভরা মিথ্যা, কিন্তু ভেতরে সে ফাঁপা।

এই ছবিতে ফেলিনি অপরাধকে রোমান্টিক করেন না। বরং দেখান, কীভাবে ছোট ছোট প্রতারণা মানুষের ভেতরটা ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। এই মানুষগুলো বড় মাপের অপরাধী নয়—তারা ক্লান্ত, ভেঙে পড়া এবং মানসিকভাবে একা।

ছবির শেষটা খুব নীরব, কিন্তু ভয়ানক শক্তিশালী। এখানে বোঝা যায়—আইনের শাস্তির আগেই অপরাধবোধ কীভাবে মানুষকে শাস্তি দিতে শুরু করে।

‘ইল বিদোনে’ ফেলিনির সবচেয়ে নৈতিক ও গম্ভীর ছবিগুলোর একটি।

কেন আজও ফেলিনি গুরুত্বপূর্ণ

ফেদেরিকো ফেলিনি আমাদের শেখান—সব কিছু পরিষ্কার হওয়া জরুরি নয়। বিভ্রান্তি মানেই ব্যর্থতা নয়। দ্বন্দ্ব থাকাটাই মানুষের স্বভাব।

এই পাঁচটি ছবি দেখলে বোঝা যায়, ফেলিনি কীভাবে বাস্তবতা থেকে ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্নের জগতে পৌঁছান।

ফেলিনির সিনেমা বলে—জীবন সব সময় সহজ নয়, সব সময় অর্থপূর্ণও নয়। কিন্তু গভীরভাবে তাকালে, মন দিয়ে দেখলে, জীবন সব সময়ই দেখার মতো।

Related Articles

Latest Articles