29 C
Dhaka
Home Blog

শ্রীমঙ্গলে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে হবিগঞ্জের পথে এনসিপি নেতারা

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে হবিগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা।

এর আগে প্রায় আধা ঘণ্টা তাদের যাত্রা আটকে ছিল বলে অভিযোগ করেন তারা।

এনসিপি সূত্র জানায়, আজ বুধবার বিকেল ৪টার কিছু পর রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউস থেকে এনসিপির গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে।

এনসিপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জাকারিয়া ইমন জানান, শ্রীমঙ্গলের চা-কন্যা এলাকায় পুলিশ তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমাদের চারবার আটকানো হয়েছে। বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটের দিকে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে আমরা আবার হবিগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছি। এখন কামাইছড়া পার হচ্ছি।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এনসিপি নেতাদের বহরে প্রায় ১০টি মাইক্রোবাস রয়েছে। বহরটি চা-কন্যা এলাকায় এলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। তখন গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপি নেতারা। পুলিশ এনসিপি নেতাদের ১৪৪ ধারার মধ্যে হবিগঞ্জে যেতে নিষেধ করেন। অপরদিকে এনসিপি নেতারা পুলিশকে বাধা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এনসিপি নেতাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই গাড়িবহর আটকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শুনছেন না। বহরটি শ্রীমঙ্গল পার হয়ে গেছে।’

হবিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক জানান, সকাল থেকেই হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সে বিষয়ে নজরদারিতে আছেন তিনি। মাঠে পুলিশ, বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। 

এর আগে, গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জে জুলাই পদযাত্রাকালে এনসিপির গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে দলের কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম ও নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারীসহ ১০ জন আহত হন বলে অভিযোগ করে দলটি।

এরপর আজ বিকেল ৩টায় হবিগঞ্জ পৌর শহরে সমাবেশের ডাক দেয় এনসিপি। একই সময়ে পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দেয় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল। দুই পক্ষের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে জেলা প্রশাসন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে। পরে সেখানে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেয় এনসিপি।

সচেতনতার অভাবেই সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা

ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো ডিজিটাল পেমেন্ট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর যত বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, সাইবার অপরাধীরা ততই তাদের অসচেতনতাকে ব্যবহার করে পাসওয়ার্ড ও অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো প্রতারণা করছে বলে এক গোলটেবিল বৈঠকে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সোমবার ঢাকার দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে গুগল ডট ওআরজির সহায়তায় দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘স্ট্রেন্দেনিং সাইবার রিসিলেন্স ফর এমএসএমইএস: ট্যাকলিং ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রড অ্যান্ড ইম্প্রুভিং গ্রিভ্যান্স মেকানিজম’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তারা জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার ও নীতিগত সংস্কারের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা বলেন, উন্নত প্রযুক্তির চেয়ে ডিজিটাল শৃঙ্খলার মৌলিক বিষয়গুলো মেনে চললেই অধিকাংশ প্রতারণা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, প্রায় ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ আর্থিক প্রতারণা ঘটে পাসওয়ার্ড বা ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) শেয়ার করার কারণে। কোনো অবস্থাতেই এগুলো শেয়ার করা উচিত না। সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং আচরণগত একটি চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ আর্থিক আচরণের অভ্যাস গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে আর্থিক সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করেছে। পাশাপাশি ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সী কিশোর-কিশোরীদের অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক লেনদেন আলাদা রাখা, দায়িত্ব অনুযায়ী কর্মীদের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং কোনো কর্মী চাকরি ছাড়লে সঙ্গে সঙ্গে তার ডিজিটাল প্রবেশাধিকার বাতিল করার পরামর্শ দেন তিনি।

এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা খান বলেন, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) জন্য ডিজিটাল রূপান্তর এখন অনিবার্য। সেইসঙ্গে সাইবার সহনশীলতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, আমাদের এই পথেই এগোতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। এসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও ওয়েবসাইট উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ জরুরি। কিন্তু, ওটিপি বা পাসওয়ার্ড শেয়ার করা যাবে না—এই সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।

ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আর্থিক প্রতারণা থেকে সুরক্ষিত রাখতে সমন্বিত সাইবার নিরাপত্তা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, প্রতারকরা প্রযুক্তিগত হ্যাকিংয়ের চেয়ে বেশি ব্যবহার করছে প্রতারণামূলক কৌশল।

ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. হাফিজুল ইসলাম বাবু বলেন, ভুয়া অর্থ পরিশোধের রসিদ, নকল ব্যবসায়িক পেজ এবং সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করে অপরাধীরা প্রতারণা করে।

তিনি বলেন, একদিন সকালে যখন এক সন্দেহভাজনকে আটক করি, তখন তার অ্যাকাউন্টে ছিল ৩ হাজার টাকা। সন্ধ্যার মধ্যে তার অ্যাকাউন্টে টাকার পরিমাণ বেড়ে হয়ে যায় ৪০ হাজার টাকা।

এই উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখান, কীভাবে প্রতারণার মাধ্যমে খুব দ্রুত অর্থ সংগ্রহ করে অপরাধীরা।

তার মতে, প্রতারকরা আরও বেশি মানুষকে ফাঁদে ফেলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পেজের প্রচারণায়ও অর্থ ব্যয় করে। চুরি হওয়া অর্থ সরিয়ে ফেলার আগেই সম্পদ জব্দ করতে সক্ষম একটি জাতীয় সমন্বিত সাইবার প্রতারণা অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠনের আহ্বান জানান তিনি।

দ্য ফ্রন্ট পেজের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক ফাসবীর এসকান্দার বলেন, সাইবার নিরাপত্তার মান ও কমপ্লায়েন্সে বাংলাদেশে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

বিদ্যমান ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্স বা নতুন ব্যবসার জন্য আলাদা ফোন নম্বর ব্যবহার করতে হয়। কেন?

তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার ও কার্যক্রম সীমিত করা সাইবার ঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শক্তিশালী ডিভাইস নিরাপত্তা নীতি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কমপ্লায়েন্স কাঠামো এবং বাধ্যতামূলক ডিভাইস নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডিন মো. শাহজাদ হোসেন বলেন, হিউম্যান ইরর এখনো সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি।

আলোচনায় তিনি এমন একটি র‌্যানসমওয়্যার হামলার উদাহরণ দেন, যা একজন কর্মী ভুয়া অনলাইন বিজ্ঞাপনে ক্লিক করার পর ঘটেছিল।

তিনি বলেন, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও গুগল ডট ওআরজির সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র গড়ে তুলেছে, যা ইতোমধ্যে এমএসএমই উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

ডিজিটাল ফরেনসিক ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য একটি সাইবার ইন্টেলিজেন্স ল্যাব প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় সাইবার সহনশীলতা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

র‌্যাপিডের (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট) নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ বলেন, উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরাও ভুয়া পরিচয় দেওয়া প্রতারকদের ফাঁদে পড়েন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পরিচয়ে প্রতারকের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুরুতে আমিও সন্দেহ করিনি।

অতিরিক্ত প্রশাসনিক সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে একজন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা সীমিত করার প্রস্তাবও দেন তিনি।

সিটি ব্যাংক পিএলসির ডিজিটাল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ ইব্রাহিম সাজিদ বলেন, বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য ফাঁস হওয়ার কারণে প্রতারকদের জন্য অন্যের পরিচয় ব্যবহার করা সহজ হয়ে গেছে। ফলে তারা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই দ্রুত কৌশল বদলে ফেলতে পারে।

তিনি প্রস্তাব করেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত। শুধু এই উদ্যোগই প্রতারণা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারে।

বৈঠকে উদ্যোক্তারা তাদের জীবিকা ও ব্যবসায় সাইবার প্রতারণার সরাসরি প্রভাবের কথা তুলে ধরেন।

বিউটি আক্তারের স্বামী এমএফএস এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বিউটি জানান, তাদের পরিবার নিয়মিত প্রতারণামূলক ফোনকল পেলেও এখন সতর্ক থাকতে শিখেছেন।

এসএমই উদ্যোক্তা শাহানা আক্তার জানান, হ্যাকাররা তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপত্তিকর ছবি পোস্ট করেছিল, যা তার বিউটি পার্লারের ব্যবসায় বড় ক্ষতি করেছে। অন্য এক ঘটনায়, অনলাইন মেকআপ প্রশিক্ষণের জন্য অগ্রিম টাকা দিলেও সেই কোর্স আর হয়নি।

সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিউনিটি সাইবার৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা তানজিম আল ফাহিম বলেন, অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা বড় ধরনের ক্ষতির পরই কেবল সহায়তা চান। সাধারণত দেখা যায়, নিরাপদ ব্যাকআপ না রাখার কারণে উদ্যোক্তারা পুরো ডিজিটাল অবকাঠামো হারিয়ে ফেলেন। তাদের পুরো ডেটাবেস হারিয়ে যায়। কোনো ব্যাকআপ থাকে না, এমনকি ডিজিটালভাবে নিরাপদ ব্যাকআপও থাকে না।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের আরেকটি সাধারণ ভুল হলো, অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পুরো কার্যক্রম একটি ফেসবুক পেজের ওপর নির্ভরশীল। অথচ তারা প্ল্যাটফর্মটির নীতিমালা সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। উদ্যোক্তারা অনেক সময় সাময়িক বিধিনিষেধকে গুরুত্ব দেন না। ফলে, একপর্যায়ে তাদের ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

স্প্রীহা ফাউন্ডেশনের ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাবের পরিচালক তাহসিন ইফনুর সাঈদ বলেন, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা ইতোমধ্যেই সাইবার ঝুঁকি কমানোর বাস্তবসম্মত উপায় গড়ে তুলেছে। ওষুধের দোকান ও অন্যান্য সেবাভিত্তিক ব্যবসা গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে।

দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ইজলাল হোসেন বলেন, উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া। উদ্যোক্তারাই যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল শক্তি হন, তাহলে তাদের সুরক্ষা দেওয়া এবং সচেতন করে তোলা শুধু আমাদের দায়িত্ব নয়, অঙ্গীকারও হওয়া উচিত।

দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সেরাজ বলেন, এমএসএমইকে সাইবার হুমকি থেকে রক্ষা করতে হলে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা থামিয়ে নয়, বরং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি অংশীজনদের প্রতি এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে উদ্যোক্তারা ডিজিটাল রূপান্তরকে গ্রহণ করার পাশাপাশি নিরাপদে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।

তবে তিনি সাইবার ঝুঁকির কারণে উদ্ভাবন সীমিত করার পক্ষপাতি নন। এ বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, আমরা প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কোনো আপস করতে চাই না।

তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়তে হলে শৈশব থেকেই সচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাজিদা ফাউন্ডেশনের পরিচালক মো. নোমানুজ্জামান, বন্ডস্টেইনের পরিচালক মো. সাদেকুল আরেফীন, কারিগরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানিয়া ওয়াহাব এবং বিটিআরসির উপপরিচালক তাইফুর রহমান। গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন দ্য ডেইলি স্টারের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ বিভাগের প্রধান তানজিম ফেরদৌস।

রেফারির ভুল ঠেকাতে ৪ বছরের প্রস্তুতি, ফিফার বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা

বিশ্বকাপে একটি ভুল বাঁশি বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের ভাগ্য। একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা চলতে পারে বছরের পর বছর। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে রেফারিদের ভুলের সম্ভাবনা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে ফিফা। খেলোয়াড়দের মতোই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গত চার বছর ধরে প্রস্তুত করা হয়েছে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ফিফা জানিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের রেফারিদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল প্রায় চার বছর আগে। টুর্নামেন্ট যত এগিয়ে এসেছে, বিশেষ করে শেষ ছয় মাসে তাদের অনুশীলনের মাত্রাও তত বাড়ানো হয়েছে।

ফিফার বিশ্বাস, ক্লান্তি বাড়লে রেফারিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক অবসাদ অবস্থান নেওয়ার দক্ষতা, দেখার কোণ এবং প্রতিক্রিয়ার গতি কমিয়ে দেয়। আর সেখান থেকেই জন্ম নিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত।

এই কারণেই এবার রেফারিদের প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয়েছে খেলোয়াড়দের মতোই আধুনিক প্রযুক্তি। অনুশীলনের সময় তাদের শরীরে লাগানো হয় জিপিএস ট্র্যাকার, হার্ট রেট সেন্সর এবং রক্তে ল্যাকটেটের মাত্রা পরিমাপের ব্যবস্থা। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিটি রেফারির জন্য আলাদা অনুশীলনসূচি তৈরি করা হয়।

ফিফা জানিয়েছে, ‘আমরা খেলোয়াড়দের মতো একই মানের ডেটা ট্র্যাকিং প্রযুক্তি রেফারিদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করি।’

বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনকারী ৫২ জন রেফারি, ৮৮ জন সহকারী রেফারি ও ৩০ জন ভিডিও ম্যাচ কর্মকর্তা বর্তমানে মায়ামিতে বিশেষ ক্যাম্পে রয়েছেন। সেখানে তাদের জন্য রয়েছে ১২ জন চিকিৎসক, ১০ জন ফিজিওথেরাপিস্ট এবং ক্রীড়া পুষ্টিবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন শেফ।

রেফারিদের শুধু ফিট থাকাই নয়, ভিন্ন পরিবেশেও যেন একই মানের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ এক ম্যাচ হতে পারে মায়ামির প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতায়, আবার পরের ম্যাচ মেক্সিকো সিটির সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২০০ মিটার উঁচু পরিবেশে। দীর্ঘ বিমানযাত্রা, সময়ের পার্থক্য এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্যও বিশেষ পরিকল্পনা করেছে ফিফা।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৫ ক্লাব বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা থেকে গরম, আর্দ্রতা ও বিভিন্ন টাইম জোনে কাজ করার বিষয়ে মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছেন কর্মকর্তারা।

ম্যাচের আগে রেফারিদের ম্যাচ-পরিস্থিতির মতো অনুশীলন, স্প্রিন্ট ও দ্রুতগতির দৌড় করানো হয়। আর ম্যাচের পর থাকে সক্রিয় পুনর্বাসন, ম্যাসাজ এবং ক্রায়োথেরাপি, যাতে দ্রুত ক্লান্তি কাটিয়ে পরবর্তী ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হওয়া যায়। গরমের প্রভাব কমাতে বিশেষ হাইড্রেশন সাপ্লিমেন্ট এবং সূর্যের তাপ এড়িয়ে অনুশীলনের সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবু সব প্রস্তুতির পরও ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না। গ্রুপ পর্বে যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে জার্মান রেফারি ফেলিক্স জভায়ের যোগ করা সময়ে পায়ে টান লেগে মাঠেই পড়ে যান। দুই দলের খেলোয়াড় ও সহকারী রেফারির সহায়তায় চিকিৎসা নিয়ে তিনি ম্যাচ শেষ করেন।

‘রকস্টার’ সিনেমার প্রথম গান ‘পিরিতি’ নিয়ে মিশ্র সাড়া দর্শকদের

ঈদে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা শাকিব খানের নতুন সিনেমা ‘রকস্টার’ এর প্রথম গান ‘পিরিতি’ প্রকাশিত হয়েছে। গানটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে দর্শকদের নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

ইউটিউবে মন্তব্যের ঘরে আশরাফ নামের এক দর্শক লিখেছেন, ‘গানের মধ্যে শাকিব খান দুর্দান্ত, তার লুক একদম মনে এসে লেগেছে।’ 

তবে কেউ কেউ গানের ভিডিওতে দেখানো শাকিবের জেলজীবনের সঙ্গে বলিউডের কিছু সিনেমার মিল খুঁজছেন। মতিন নামের এক দর্শক লিখেছেন, ‘রণবীর কাপুরের রকস্টার এবং সালমান খানের তেরে নাম সিনেমাতেও এমন জেলের দৃশ্য ছিল।’

‘পিরিতি’ গানের বড় চমক এর চিত্রায়ণ। পুরো গানটি ধারণ করা হয়েছে কারাগারের ভেতরে। ভিডিওতে শাকিব খানকে অত্যন্ত বিধ্বস্ত ও আবেগাপ্লুত অবস্থায় দেখা গেছে। তবে তিনি কেন জেলে গেছেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো কিছু খোলাসা করা হয়নি, যা দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে।

গানটির গায়কী নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পান্থ কানাইয়ের গাওয়া এই গানটি নিয়ে রাজীব নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘পান্থ কানাই ভালো গেয়েছেন, তবে কয়েকটি জায়গায় আরও আবেগ দেওয়া উচিত ছিল।’ অনেকেই আবার এই গানটি পান্থ কানাইয়ের কণ্ঠে খুব একটা পছন্দ করেননি।

‘পিরিতি’ গানটির কথা লিখেছেন হাসান রোবায়েত, সুর করেছেন আহমেদ হাসান সানি এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন জাহিদ নিরব। গানটিতে কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি পর্দায় শাকিব খানের সঙ্গে পান্থ কানাইকেও দেখা গেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা প্রায় ৩৫ হাজার নাবিক ও যাত্রী

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছেন। আরও আটকা আছেন বিভিন্ন জাহাজে থাকা ১৫ হাজার যাত্রী।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজের বরাতে আজ বৃহস্পতিবার বার্তাসংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।

মহাসচিব বলেন, ‘নাবিক ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত আইএমও।’

আইএমওর তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা বিভিন্ন জাহাজে অন্তত ৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় দুজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন।

এ হামলাকে মানবিক সংকট উল্লেখ করে ডোমিঙ্গেজ বলেন, ‘নিরীহ নাবিকদের ওপর কোনো হামলাই গ্রহণযোগ্য নয়।’

এ সময় তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলের সময় সব শিপিং কোম্পানিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি এক প্রকার বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। 

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়।

আজ শুরু হচ্ছে বইমেলা, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ বৃহস্পতিবার ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই আয়োজনের পর্দা উঠছে।
 
দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫ বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেবেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।

এ ছাড়া শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা এবং সংস্কৃতিসচিব মো. মফিদুর রহমান।

আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলা এই বইমেলা প্রতিদিন খোলা থাকবে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। তবে, ছুটির দিনে মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবে না।

বইমেলায় বাংলা একাডেমি ও অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্ধারিত কমিশন নীতি অনুসরণ করবে। বাংলা একাডেমির নিজস্ব বই ও পত্রিকা বিক্রির জন্য মেলার দুই অংশেই স্টল থাকবে।

এবারের মেলায় মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠানের জন্য মোট ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ১৮টি। গত বছর প্রতিষ্ঠান ছিল ৭০৮টি এবং ইউনিট ছিল ১ হাজার ৮৪টি।

বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছে গাছতলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এবারের বইমেলা আয়োজনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পরিবেশ সুরক্ষায়। আয়োজকরা ঘোষণা দিয়েছেন, এবারের বইমেলা হবে ‘জিরো ওয়েস্ট বইমেলা’।

এ লক্ষ্যে মেলা প্রাঙ্গণকে পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখা হবে। স্টল, দোকান, মঞ্চ, ব্যানার, লিফলেট ও খাবারের দোকানগুলোতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ যেমন-পাট, কাপড় ও কাগজ ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে কেন

‘পোস্ট কলোনিয়াল থিওরি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব হিন্দু ন্যাশনালিজম’ (২০২৫) গ্রন্থের লেখক, দার্শনিক ও বিজ্ঞান-ইতিহাসবিদ ড. মীরা নন্দার সঙ্গে আলাপচারিতা।

দ্য ডেইলি স্টার: আপনি যুক্তি দিয়েছেন, ভারতীয় উপমহাদেশে বামপন্থীদের পোস্ট-কলোনিয়াল (উত্তর-উপনিবেশবাদ) সংক্রান্ত সমালোচনার ধরন দেখে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থীরা। এখন দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের রাজনীতিকে বৈধতা দিতে প্রায় একই ধরনের ‘ডিকলোনিয়াল’ বা ‘উপনিবেশবাদ-মুক্ত’ ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। আদর্শগতভাবে বিপরীত দুই পক্ষ কীভাবে একই ভাষায় কথা বলতে শুরু করল?

মীরা নন্দা: আমার বইয়ের মূল বক্তব্যই হলো—পোস্ট-কলোনিয়াল (উত্তর-উপনিবেশবাদ) ও ডিকলোনিয়াল (উপনিবেশবাদ-মুক্ত) তত্ত্বের মধ্যে এমন কিছু বিষয় আছে, যা বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাদী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীদের জন্য খুব সহজেই ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠেছে।

আমার অনেক সমালোচক পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের ‘ভারতীয় মনকে উপনিবেশমুক্ত করার’ আহ্বানের যে স্পষ্ট মিল রয়েছে, তা এড়িয়ে যান। তারা দাবি করেন—হিন্দুত্ববাদীরা পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের ‘মুক্তিকামী’ লক্ষ্যকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে বা বিকৃত করছে।

আমার মতে, বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা আসলে বাস্তবতাকে ইচ্ছা করে এড়িয়ে যাওয়া।

কারণ পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের ‘মুক্তিকামী’ ভাষার আড়ালে এমন কিছু চিন্তা রয়েছে, যার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ বা বিশেষ মনে করার প্রবণতা স্পষ্ট দেখা যায়।

হিন্দুত্ববাদীরা সেই চিন্তা বা কাঠামোকে ভুলভাবে ব্যবহার করছে না। বরং ওই চিন্তার অনেকটাই তাদের নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়।

পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের মৌলিক ধারণাগুলোর সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের দীর্ঘদিনের কিছু বিশ্বাসের বেশ মিল রয়েছে। অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে এই মিল স্পষ্ট।

প্রথমত, পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের মূল কথা হলো, রাজনৈতিকভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও মানুষের চিন্তা ও মানসিকতায় ঔপনিবেশিকতার প্রভাব রয়ে গেছে। এটাকেই বলা হয় ‘মানসিক ঔপনিবেশিকতা’।

এই তত্ত্বের মতে, স্বাধীনতার পর ভারত যেসব ধারণার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে—যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তি অধিকার, মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ এবং উন্নয়নবাদ—এসব মূলত ইউরোপে গড়ে উঠেছে।

ভারতীয় অভিজাতরা এসব ধারণাকে সবার জন্য প্রযোজ্য ও সার্বজনীন মনে করে গ্রহণ করেছেন। এর ফলে ভারত নিজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে আধুনিকতার নিজস্ব পথ তৈরি করতে পারেনি। বরং ইউরোপীয় চিন্তার কাঠামোর মধ্যেই আটকে গেছে।

এই ধারণার সঙ্গে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদীদের বক্তব্যের মিল রয়েছে। গান্ধী, বিবেকানন্দ থেকে নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত অনেকেই বলে এসেছেন, ভারতের পথ নির্ধারণ করতে হবে তার নিজস্ব ‘আত্মা’ ও ‘আধ্যাত্মিকতার’ ভিত্তিতে।

দ্বিতীয়ত, পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, ভারত বা বৃহত্তর প্রাচ্যকে ইউরোপে তৈরি কিছু নির্দিষ্ট ধারণা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। যেমন ব্যক্তিস্বাধীনতা, মার্ক্সের শ্রেণিসংগ্রামের ধারণা বা আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ দিয়ে ভারতীয় সমাজ ও জ্ঞানকে বিচার করলে তা ‘জ্ঞানমূলক সহিংসতা’ বা ‘জ্ঞানমূলক অবিচার’ তৈরি করতে পারে।

এই চিন্তার পেছনে এডওয়ার্ড সাঈদ, মিশেল ফুকোসহ উত্তর-গঠনবাদী চিন্তাবিদদের প্রভাব রয়েছে। তাদের মতে, আমরা যাকে বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান বলে মনে করি, সেটিও অনেক সময় ক্ষমতা ও প্রচলিত চিন্তা কাঠামোর দ্বারা প্রভাবিত হয়।

তাই ভারতকে বোঝার ক্ষেত্রে শুধু ইউরোপীয় জ্ঞান ও ধারণাকে মানদণ্ড হিসেবে না দেখে ভারতের নিজস্ব ধারণা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ ইউরোপীয় জ্ঞানকে একমাত্র বা সর্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে দেখা যাবে না।

মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারও শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সময় অনেক ক্ষেত্রে ‘ঐতিহ্যগত জ্ঞানব্যবস্থা’কে গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে হিন্দু দর্শন ও ঐতিহ্য থেকে আসা বিভিন্ন ধারণাও রয়েছে।

তৃতীয়ত, পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ‘সাবঅলটার্ন’ বা সমাজের নিচের স্তরের মানুষের কণ্ঠস্বর সামনে নিয়ে আসা। ঔপনিবেশিক শাসক এবং পরে ঔপনিবেশিক চিন্তায় প্রভাবিত অভিজাতদের কারণে যাদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষিত হয়েছে, তাদের নিজেদের দৃষ্টিতে সমাজ ও ইতিহাসকে বোঝার চেষ্টা করা হয়।

এটিকেই পোস্ট-কলোনিয়াল প্রকল্পের একটি ‘মুক্তিকামী’ দিক হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু এই ধারণার সমালোচকদের মতে, সাবঅলটার্ন মানুষের চিন্তা ও চেতনা প্রচলিত ক্ষমতা ও ধর্মীয় ধারণা থেকে পুরোপুরি স্বাধীন নয়। তাদের চিন্তাও সমাজের প্রভাবশালী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শ দ্বারা গড়ে ওঠে।

এই কারণে সাবঅলটার্নদের চেতনা অনুসরণ করলে অনেক সময় তা হিন্দুধর্ম, এমনকি হিন্দুত্ববাদের কাছেও গিয়ে পৌঁছাতে পারে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিম্নবর্গের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

তাই সাবঅলটার্নদের চিন্তাকে ইউরোপকেন্দ্রিক জ্ঞানের বিকল্প হিসেবে সরাসরি মহিমান্বিত করলেই তা ‘মুক্তিকামী’ হয়ে যায় না। বরং সেই চিন্তার ভেতরেও প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাব থাকতে পারে।

ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়ায় একদিকে নতুন প্রযুক্তি আসছে, অর্থনীতি বড় হচ্ছে; অন্যদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কারও বাড়ছে। আধুনিকায়ন কেন সমাজকে আরও ধর্মনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী করে তুলতে পারেনি?

মীরা নন্দা: আধুনিক প্রযুক্তি ও পুঁজিবাদী অর্থনীতি গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে ‘পাশ্চাত্য’ ও ‘ঔপনিবেশিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই দ্বৈত অবস্থানই আজকের সংকট তৈরি করেছে। ফলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বিশ্বায়ন যত বেড়েছে, কুসংস্কার, ধর্মীয় উগ্রতা ও দেশজতাবাদও তত শক্তিশালী হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতে এর একটি ভালো উদাহরণ দেখেছি। সেটি হলো তথাকথিত ‘প্রতিক্রিয়াশীল আধুনিকতা’। ভারতে জনপ্রিয় হওয়া প্রথম দিকের এআইভিত্তিক অ্যাপগুলোর প্রায় সবই জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে! জ্যোতিষীরাই বড় পরিসরে এআই ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন। এর কারণ, এসব প্রাচীন কুসংস্কারের চাহিদা অনেক। এমনকি এসব অ্যাপের কোড লেখা সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা নিজেরাই জ্যোতিষের ভক্ত হলেও আমি অবাক হবো না।

এই ‘প্রতিক্রিয়াশীল আধুনিকতা’র শুরু উনিশ শতকের শেষ দিকে, স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর সময়েই। সে সময়ের ইসলামি সংস্কার আন্দোলন নিয়ে আমি খুব বেশি পড়িনি। তবে বিবেকানন্দ ও দয়ানন্দ সরস্বতীর মতো হিন্দু চিন্তাবিদেরা এ ধরনের চিন্তার পক্ষে ছিলেন।

বিবেকানন্দ এমন একটি ভারত চেয়েছিলেন, যার ‘পেশি হবে ইস্পাতের মতো শক্ত’, কিন্তু আত্মা হবে যোগীর মতো। অর্থাৎ ভারত প্রযুক্তিতে উন্নত হবে, কিন্তু তার ‘আধ্যাত্মিক আত্মা’ অক্ষুণ্ণ থাকবে।

গান্ধী অবশ্য নিজের অবস্থানে আরও ধারাবাহিক ছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যে শক্তি ও পৌরুষের ধারণা যুক্ত হয়, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। একইসঙ্গে তিনি আধুনিক জীবনব্যবস্থারও বিরোধিতা করেছিলেন—যেখানে নারী-পুরুষ স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে, শহরে বাস করবে এবং সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নেবে।

তাহলে তারা এই দুই বিপরীত ধারণাকে কীভাবে একসঙ্গে মেলালেন?

মূলত তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পকে পুরো মানবজাতির সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যে আধুনিক বিজ্ঞান এসব প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে, তাকে নতুন জ্ঞান হিসেবে স্বীকার করেননি। তাদের দাবি ছিল, আধুনিক বিজ্ঞান আসলে সেই জ্ঞানই নতুন করে আবিষ্কার করেছে, যা প্রাচীন আর্য ঋষিরা বেদ ও অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থে আগেই জানতেন।

তাই রেলপথ, টেলিগ্রাফ, বিদ্যুৎসহ আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন সুবিধা তারা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদী চিন্তাকে তারা ইউরোপের নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন।

অর্থাৎ, আধুনিক প্রযুক্তিকে তারা সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও কল্যাণকর বলে মনে করলেও, আধুনিক বিজ্ঞানকে হিন্দু ‘আধ্যাত্মিকতা’ ও রহস্যবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন।

এর ফল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমে আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশের সঙ্গে এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানযুগের সূচনা হয়। এই আন্দোলন মধ্যযুগীয় সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

কিন্তু ভারতে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানকে সরাসরি ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সংঘাতে না এনে ‘বৈদিক’ আধ্যাত্মিকতা ও রহস্যবাদের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরের প্রথম কয়েক দশকে নেহরুর নেতৃত্বে ‘বৈজ্ঞানিক মানসিকতা’ ও যুক্তিনির্ভর চিন্তা গড়ে তোলার কিছু চেষ্টা হয়েছিল। এর মাধ্যমে হিন্দুধর্মের প্রচলিত কিছু ধর্মীয় ও অধিবিদ্যাগত ধারণাকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হতে পারত।

কিন্তু এসব উদ্যোগ খুব বেশি দূর এগোয়নি।

বরং ১৯৮০-এর দশক থেকে আধুনিক বিজ্ঞানকেই ‘ইউরোকেন্দ্রিক’ এবং ‘জ্ঞানমূলক সহিংসতার’ উৎস হিসেবে সমালোচনা করা শুরু হয়।

ফলে যা ঘটেছে তা হলো—প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হয়েছে, কিন্তু মানুষের চিন্তা ও সমাজের ঐতিহ্যনির্ভর মানসিকতার তেমন পরিবর্তন হয়নি।

ডেইলি স্টার: সরকার ও বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী যখন দেশীয় জ্ঞানের কথা বলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখন বিজ্ঞানীদের কী করা উচিত?

মীরা নন্দা: এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, তখন যুক্তি ও বিজ্ঞানের সার্বজনীনতা কীভাবে রক্ষা করা যায়—সেটাই প্রশ্ন।

কাজটি সহজ নয়। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের একাংশও যখন সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের ফাঁদে পড়েছেন এবং মনে করছেন, যা কিছু সার্বজনীন তা-ই ইউরোকেন্দ্রিক—তখন বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

আমার মনে হয়, প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তিতে মোকাবিলা করতে হবে।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেমন ভারত সরকার আয়ুর্বেদসহ বিভিন্ন দেশীয় চিকিৎসাপদ্ধতির প্রচার করেছিল। এমনকি গোমূত্র ও গোবরের মতো হাস্যকর ‘চিকিৎসা’র কথাও বলা হয়েছিল। এসব দাবির জবাব দিতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করে।

তবে সংকট শেষ হয়ে গেলেই এই কাজ থামানো যাবে না। আয়ুর্বেদের মূল ধারণাগুলো নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষায় সেগুলোর কোন কোন দাবি ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তা দেখাতে হবে।

এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ইতিহাস ও দর্শন আমাদের অনেক সাহায্য করতে পারে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত আমার বই ‘সায়েন্স ইন স্যাফরন: স্কেপটিক্যাল এস্যেস অন দ্য হিস্টোরি অব ইন্ডিয়ান সায়েন্স’-এ আমি প্রাচীন ও প্রাক-আধুনিক ভারতীয় বিজ্ঞানের বিভিন্ন ভুল ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে তথাকথিত ‘ঐতিহ্যগত জ্ঞানব্যবস্থা’ যুক্ত করার বিরুদ্ধেও একই ধরনের উদ্যোগ দরকার। আমার সাম্প্রতিক বই ‘অ্যা ফিল্ড গাইড টু পোস্ট-ট্রুথ ইন্ডিয়া’-তে আমি এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছি।

আমার বিশ্বাস, বিজ্ঞানী ও ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং এই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এজন্য আমাদের নানা ধরনের অপবাদ শুনতে হতে পারে। কিন্তু সত্য ও যুক্তির পক্ষে দাঁড়ানোর এটাই মূল্য।

ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমেই চাপে পড়ছে। এর ভবিষ্যৎ কী?

মীরা নন্দা: আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

আজকের ভারতের মতো একটি সমাজে, যেখানে দেব-দেবী, ধর্মীয় গুরু, সাধু ও নানা ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের জীবন ও সমাজের গভীরে মিশে আছে, সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা কঠিন।

যারা জীবনের প্রায় সবকিছুর মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি দেখেন, তারা কেন রাষ্ট্রকে ধর্মীয় বিধান থেকে আলাদা রাখতে চাইবেন? আবার যারা নিজেদের পরিচয়কে ধর্মের মাধ্যমে দেখেন, তারাই বা কেন চাইবেন না যে, রাষ্ট্র তাদের ধর্ম ও বিশ্বাস রক্ষা করুক?

ধর্মনিরপেক্ষতা টিকিয়ে রাখতে হলে মানুষের চিন্তাভাবনাতেও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা থাকতে হবে। অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি বলা যত সহজ, বাস্তবে করা ততটাই কঠিন। এর কোনো সহজ সমাধান আমার জানা নেই।

আমি শুধু বলতে পারি, যেখানেই অযৌক্তিকতা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি দেখা যাবে, সেখানেই তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ‘পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি’ দিনকে দিন প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। এর ফলে শ্রেণি, শ্রম ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনায় কী প্রভাব পড়েছে?

মীরা নন্দা: বাম ও ডান—দুই পক্ষের সাংস্কৃতিক রাজনীতিই শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের বাস্তব জীবন ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোকে আড়ালে ঠেলে দিয়েছে।

পোস্ট-কলোনিয়াল বামপন্থীরা শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণকে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের মতে, এই বিশ্লেষণ ‘মৌলবাদী’ ও ‘ইউরোকেন্দ্রিক’। তারা মনে করে, নিম্নবর্গের মানুষের চিন্তা ও চেতনা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের চেয়ে সমাজ ও সম্প্রদায়ের মূল্যবোধের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়।

ভারতে ‘নিচ থেকে ইতিহাস লেখার’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো সাবঅলটার্ন স্টাডিজ। এই ধারার গবেষকেরা ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। মার্ক্সবাদ বা আধুনিকায়ন তত্ত্বে শ্রমজীবী শ্রেণিকে যেভাবে দেখা হয়, তারা সেটিকে গুরুত্ব দিতে চান না।

তাদের কাছে শ্রেণিসংগ্রামের ধারণাই পুরোনো। তাই তাদের প্রস্তাব হলো—দরিদ্র মানুষ, নতুন সামাজিক আন্দোলন, এনজিওসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী জোট গড়ে তুলবে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘পলিটিক্যাল সোসাইটি’ তত্ত্বও মূলত এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

অন্যদিকে, হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থীরা নিম্নবর্ণ, দলিত ও শ্রমজীবী মানুষকে হিন্দু পরিচয়ের অধীনে একত্রিত করতে চাইছে। একইসঙ্গে তাদের মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস তাদের শাখা, স্কুল এবং এমনকি শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমেও তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছে। এর ফলে শ্রমজীবী মানুষকে নিজেদের শ্রমিক পরিচয়ের আগে ‘হিন্দু’ হিসেবে ভাবতে শেখানো হচ্ছে।

পোস্ট-কলোনিয়াল বামপন্থীদের মতো হিন্দুত্ববাদী চিন্তাবিদদেরও দাবি, শ্রেণিসংঘাত পশ্চিমা সমাজের বিষয়, ভারতের নয়। তাদের মতে, হিন্দু সমাজ একটি ‘অখণ্ড’ বা ‘জৈবিক’ সমাজ। এখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী একই দেহের বিভিন্ন অঙ্গের মতো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

তাদের যুক্তি হলো, মানবদেহের একটি পা যেমন মাথার বিরুদ্ধে লড়াই করে না, তেমনি শ্রমজীবী নিম্নবর্ণের মানুষও (যাদের তারা ‘পা’ হিসেবে দেখেন) ব্রাহ্মণদের অর্থাৎ ‘মাথার’, বিরুদ্ধে কেন লড়াই করবে?

এই তথাকথিত ‘অখণ্ড সমাজে’ শ্রেণিসংঘাতের কোনো জায়গা নেই। বরং সব গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির ওপর জোর দেওয়া হয়।

বর্তমান সরকারও সামাজিক সমস্যার সমাধান হিসেবে বাজারব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করছে। এর অর্থ হলো, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল ভর্তুকি, করছাড় ও জমি দেওয়া হচ্ছে। এসব ব্যবসায়ীকে দরিদ্র মানুষের ‘অভিভাবক’ বা ‘ট্রাস্টি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের জন্য থাকছে সীমিত নগদ সহায়তা। এসব সহায়তা অনেক সময় ভোটব্যাংক তৈরির মাধ্যম হয়ে উঠছে। সবার জন্য ভালো স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অবকাঠামো তৈরির বদলে দরিদ্র মানুষকে নগদ অর্থ দিয়ে টিকিয়ে রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিজেপি সরকার হিন্দুধর্মকে ব্যবহার করছে ‘ব্র্যান্ড ভারত’ গড়ে তোলার জন্য। বিদেশি কোম্পানি ও অন্যান্য দেশের কাছে ভারতকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান, যোগব্যায়াম ও প্রাচীন ঐতিহ্যের দেশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

দরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং সবার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সেবার বিষয়গুলো ঐতিহাসিকভাবে বামপন্থীদের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থনৈতিক অধিকার ও জীবনযাত্রার বাস্তব সমস্যা নিয়ে আন্দোলন বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে আনতে পারে।

ভারতের পাঞ্জাবে কৃষক আন্দোলনের সময় কিংবা নাগরিকত্বকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করা সাংবিধানিক সংশোধনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আমরা এমন ঐক্যের কিছু উদাহরণ দেখেছি।

বামপন্থীদের বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন এখনো সক্রিয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বুদ্ধিজীবীদের মনোযোগ শ্রেণি, শ্রম ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বদলে সাংস্কৃতিক পরিচয় ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির দিকে বেশি ঝুঁকে গেছে।

ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র কারও আধিপত্য মেনে নেব না: নাহিদ ইসলাম

ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র কারও আধিপত্যই মেনে নেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপি আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) জাতীয় ছাত্রশক্তি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জাতি ঋণী। বিভিন্ন সময়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের স্বীকৃতি এখনো পায়নি। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মূল্যবোধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা। দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্গঠন প্রয়োজন। ভিসি নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগ যেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জবির অনেক বড় ভূমিকা ছিল। আমরা আন্দোলনের বিভিন্ন সময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অপেক্ষায় থাকতাম। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী আহত হন,’ যোগ করেন তিনি।

‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা অনেক কিছু অর্জন করতে পারেনি’ মন্তব্য করে নাহিদ বলেন, ‘আমরা মনে করি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলমান। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল গণতন্ত্রের জন্য, ভোটাধিকারের জন্য। এবার আমরা দুটি ভোট দিয়েছি। কিন্তু এখনো গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান হয়েছে সীমান্ত সুরক্ষার জন্য, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির জন্য, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য। আমরা কারও আধিপত্য মেনে নেবো না, ভারতেরও না, আমেরিকারও না।’

সভায় এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন, প্রক্টর অধ্যাপক মো. নাসির উদ্দিন, ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান, সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার, জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।
 

সাপের বিষের খামার, স্বপ্ন বড় কিন্তু ক্রেতা নেই

প্রতিবছর বাংলাদেশে বিষধর সাপের কামড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। অথচ সাপের কামড়ের চিকিৎসায় দেশের হাসপাতালগুলো নির্ভরশীল বিদেশ থেকে আমদানি করা অ্যান্টিভেনমের ওপর। 

এর পেছনে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। সেই নির্ভরতা কমানোর আশায় পটুয়াখালীতে গড়ে উঠেছে একটি বেসরকারি সাপের বিষের খামার।

২০০০ সালে পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে বাংলাদেশ স্নেক ভেনম নামে এ খামার প্রতিষ্ঠা করেন প্রবাসফেরত আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাস।

এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজ্জাক জানান, সৌদি আরবে ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করার সময় তিনি প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগ কাছ থেকে দেখেছেন। দেশে ফিরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজের সঞ্চিত অর্থ এমন একটি উদ্যোগে বিনিয়োগ করবেন, যা স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

তার বিশ্বাস ছিল, নিজ জেলায় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।

এরপর তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিষধর সাপ সংগ্রহ ও লালন-পালন শুরু করেন। গত ২৬ বছরে তার সংগ্রহে ২৫০টিরও বেশি সাপ যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিং কোবরা, গোখরা, শঙ্খিনী, কালাচ, রাসেলস ভাইপার, পিট ভাইপার, অজগর ও দাড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ।

২০০৮ সালে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে খামারটির নিবন্ধন ও ২০১৮ সালে পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেন রাজ্জাক। দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে প্রায় তিন মাস আগে খামারটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন পায়। এর ফলে খামারটিতে এখন আইনিভাবে বিষধর সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।

তবে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রেতার অভাব। কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এখনো এই বিষ কিনতে রাজি হয়নি।

রাজ্জাক বলেন, ‘সাপের কাঁচা বিষ সরাসরি বিক্রি করা যায় না। অনুমোদিত মান বজায় রেখে তা প্রক্রিয়াজাত করে অ্যান্টিভেনম ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ কোম্পানি এই বিষ সংগ্রহ বা প্রক্রিয়াজাত করার আগ্রহ দেখায়নি।’

রাজ্জাক জানান, ইনসেপ্টাসহ কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু তারা জানিয়েছে, তারা শুধু পরিশোধিত (রিফাইন্ড) বিষ কিনে থাকে।

তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে বিষ পরিশোধনের অনুমতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।’

‘সেই অনুমতি পেলে আমি সরাসরি ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে বিষ বিক্রি করতে পারব।’

রাজ্জাকের দাবি, তার খামারে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের বিষ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা।

তার মতে, এই বিষ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে অ্যান্টিভেনম আমদানি কমিয়ে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘সরকার ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশে একটি বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।’

বর্তমানে খামারটিতে চারজন কর্মী কাজ করছেন। শুরুতে কর্মীর সংখ্যা ছিল দুইজন।

রাজ্জাক বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে কর্মীদের বেতন দিতেও তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। খামার পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়। ফলে মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ টাকা।

খামারটি টিকিয়ে রাখতে তাকে ব্যক্তিগতভাবেও বড় মূল্য দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি। সৌদি আরবে চাকরি করে জমানো প্রায় সব অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি পৈতৃক জমির গাছ বিক্রি এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বন্ধক রাখতে হয়েছে।

রাজ্জাক বলেন, ‘আমি খামারটি আরও ভালো জায়গায় স্থানান্তর করে আধুনিক সুবিধা যুক্ত করতে চাই। এজন্য ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (এনসিডিসি) ইউনিটের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫১১ জনের মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা বাসস চলতি মাসের শুরুতে এ তথ্য প্রকাশ করে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সাপের কামড়ের প্রতি চারটি ঘটনার মধ্যে একটি বিষধর সাপের কামড়। আক্রান্তদের মধ্যে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হন এবং ১ দশমিক ৯ শতাংশ মানসিক প্রতিবন্ধিতায় ভোগেন। এছাড়া প্রায় ৯৫ শতাংশ সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে গ্রামীণ এলাকায়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের সাপের কামড়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ১ দশমিক ৪ গুণ বেশি।

পটুয়াখালীর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘খামারটি সাপের বিষ সংগ্রহের নিবন্ধন পেলেও সেই বিষ সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না। ওষুধ শিল্পে ব্যবহারের আগে অনুমোদিত মান ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা প্রক্রিয়াজাত করতে হবে।’

যোগাযোগ করা হলে পটুয়াখালীর বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালের স্বত্বাধিকারী আল-আমিন হাওলাদার জানান, তার প্রতিষ্ঠান অ্যান্টিভেনম উৎপাদন করে না। তবে তিনি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার অ্যান্টিভেনম আমদানি করে। বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর এই খাতে বিনিয়োগ করা উচিত। এতে নতুন একটি শিল্প গড়ে উঠতে পারে, উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।’

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, ‘বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায়, যেখানে সাপের কামড়ের ঘটনা বেশি ঘটে, সেখানে আক্রান্তদের চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

ফুটবলে অবিচ্ছেদ্য গান

ইংরেজি ডিকশনারিতে ‘ওয়ান্ডারওয়াল’ শব্দটির কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯৬৮ সালে ‘ওয়ান্ডারওয়াল মিউজিক’ নামে জর্জ হ্যারিসনের একটি সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবাম বের হয়েছিল বটে। তবে এ শব্দটিকে পরিচিতি দিয়েছে ব্রিটিশ ব্যান্ড ‘ওয়েসিস’। আর ‘ওয়ান্ডারওয়াল’-এ নতুন অর্থ যোগ করেছেন এবারের ফিফা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ম্যাচ চলাকালে মাঠে উপস্থিত ভক্তরা।

‘ওয়ান্ডারওয়াল’ গানটিতে এমন একজন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে হিমশিম খান; কিন্তু বিশ্বাস করেন যে আরেকজন মানুষ তার জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বারবার উচ্চারিত ‘মেইবি’ (হয়তো) শব্দটি যতখানি ‘দ্বিধা’ বোঝায়, তার চাইতে বেশি বোঝায় ‘আশা’। গানটির রচয়িতা নোয়েল গ্যালাঘারের মতে, গানটি এমন এক ‘কাল্পনিক বন্ধু’র কথা বলে, যে এসে আপনাকে আপনার নিজের ভেতরের সংকট থেকে উদ্ধার করবে।

ইংল্যান্ডের ফুটবলপ্রেমীরা এই ‘কাল্পনিক বন্ধু’-কে পার্থিব করে তুলেছেন। এবারের বিশ্বকাপ মিশনের প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ৪–২ গোলে হারানোর পর গোটা স্টেডিয়াম ইংল্যান্ডের উদ্দেশে একসঙ্গে গেয়ে ওঠে ‘মেইবি ইউ গনা বি দ্য ওয়ান দ্যাট সেইভস মি’। সেসময় পর্দায় বারবার উঠে আসতে থাকে হ্যারি কেইনের মুখ। ইংল্যান্ড দলের সব ফুটবলার একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে দর্শকের দিকে তাকিয়ে গানটি গাইছিলেন। দৃশ্যটি নাড়া দিয়ে যায়নি এমন ফুটবলপ্রেমী (ও সংগীতপ্রেমী) বোধহয় কমই আছে।

সেই অনন্য মুহূর্তের কারণেই গানটি পরে ইংল্যান্ডের সব ম্যাচের নিয়মিত অংশ হয়ে ওঠে। যেন এটিই ইংল্যান্ড ফুটবল দলের থিম সং।

‘ওয়ান্ডারওয়াল’ ইংলিশ ফুটবল লিগের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জায়গা তৈরি করে নিয়েছিল অনেক আগেই। তবে হাজারো ভক্ত যখন হ্যারি কেইনের দিকে তাকিয়ে গায় ‘মেইবি ইউ গনা বি দ্য ওয়ান দ্যাট সেইভস মি’ তখন মনে হয়, ‘হ্যারি কেইনই সেই খেলোয়াড়, যার পায়ে একটি জাতির স্বপ্ন’।

ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক হ্যারি কেইনও বলেছেন, ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে এটি তার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি।

তার ভাষায়, ‘সেই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে সমর্থকদের দারুণ এক বন্ধন তৈরি হয়। স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় সবার গানটির লিরিক্স মুখস্থ ছিল, সবাই একসঙ্গে গাইছিল।’

গান বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এক দশক আগেও ম্যাচ চলাকালে স্টেডিয়ামে গানের ব্যবহার সীমিত ছিল। দশর্করাই নিজেদের গান ও স্লোগানে স্টেডিয়াম মাতিয়ে রাখতেন। ধীরে ধীরে স্টেডিয়ামগুলোতে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন করা হয় এবং ক্লাবগুলো নিয়মিতভাবে পরিকল্পনামাফিক প্লেলিস্ট সাজাতে শুরু করে। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর অনেকেরই নিজস্ব ‘সংগীত পরিচয়’ আছে।

জাতীয় দলের ক্ষেত্রে ঠিক সেই অভিজ্ঞতাই তৈরি করতে চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, কোন গান কখন বাজানো হবে তা আগেভাগেই ঠিক করে রাখা হয়েছে। ফিফার ‘স্টেডিয়াম এন্টারটেইনমেন্ট টিম’ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এমন প্লেলিস্ট তৈরি করেছে।

এ বছর প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ায় এবারের প্লেলিস্টেও এসেছে অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য। এ বছর ৭৫০টিরও বেশি গান নির্বাচন করা হয়েছে। এসব প্লেলিস্টে সাধারণত স্টেডিয়ামে বাজানো হয় এমন জনপ্রিয় ক্লাসিক গানগুলোর পাশাপাশি প্রতিটি দেশের সমর্থকদের প্রিয় গানও রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

ফিফার প্লেলিস্টে জায়গা পেয়েছে ‘স্টেডিয়াম-সং’ খ্যাত দ্য হোয়াইট স্ট্রাইপসের ‘সেভেন নেশন আর্মি’, এসি/ডিসির ‘থান্ডারস্ট্রাক’। আছে ১৯৯০-এর দশকের জনপ্রিয় ইউরোড্যান্স গান গ্যালার ‘ফ্রিড ফ্রম ডিজায়ার’। গানটি অন্তত এক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে নিয়মিত বাজানো হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও নিয়মিত শোনা যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের মাঠে।

এ ছাড়া, প্রতিটি দলের জন্য আলাদা কিছু ‘সিগনেচার’ গান নির্ধারণ করেছে ফিফা ‘স্টেডিয়াম এন্টারটেইনমেন্ট টিম’। যেমন, আর্জেন্টাইন রক ব্যান্ড ‘লোস ফাবুলোসোস ক্যাডিলাকস’-এর ‘এল ম্যাটাডোর’ গানটি স্থান পেয়েছে আর্জেন্টিনা ম্যাচের প্লেলিস্টে। বাস্তবে গানটির অর্থ বেশ গভীর। রেগে প্রভাবিত গানটি মূলত ১৯৭০-এর দশকে লাতিন আমেরিকার সামরিক একনায়কতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে লেখা। গানটির মূল বার্তা রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও সহিংসতার ইতিহাসকে তুলে ধরলেও ফুটবল মাঠে এটি পরিণত হয়েছে বিজয় ও উচ্ছ্বাসের প্রতীক হিসেবে। গানটির কোরাসে বারবার ‘ম্যাটাডোর! ম্যাটাডোর!’ ধ্বনির সঙ্গে লিওনেল মেসির উপস্থিতিতে মনে হয়, গানটি মেসির দুর্দান্ত গোল করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাকে প্রশংসা করেই গাওয়া হচ্ছে।

একইভাবে দলের সিগনেচার গান হিসেবে ঘানার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে ‘ডোপনেশন’-এর ২০২৫ সালের জনপ্রিয় গান ‘কাকালিকা’। গানটির মূল বার্তা হলো বৈচিত্র্য উদযাপন এবং মানুষকে আনন্দের সঙ্গে গান ও নাচ উপভোগ করতে উৎসাহিত করা।

মেক্সিকো বেছে নিয়েছে ‘মারিয়াচি ভারগাস’ ব্যান্ডের তিনটি ভিন্ন গান। মারিয়াচি ভারগাস একটি বিখ্যাত মারিয়াচি লোকসংগীত ব্যান্ড, যা ১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যান্ডটি তাদের সংগীত ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এবং আজও সমান জনপ্রিয়।

আর দক্ষিণ কোরিয়া বরাবরের মতোই তাদের প্লেলিস্টে রেখেছে কে-পপ। আছে ব্ল্যাকপিঙ্ক এবং বিটিএসের একাধিক গান, যা দেশটির আধুনিক জনপ্রিয় সংগীত সংস্কৃতিকে বিশ্বকাপের মঞ্চে তুলে ধরেছে।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের জন্য যেন নির্ধারিত ডাফট প্নাকের বিখ্যাত গান ‘ওয়ান মোর টাই’। এমবাপের একের পর এক গোলের সাফল্যের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে গেছে গানটি।

অস্ট্রেলিয়ার সিগনেচার গান মেন অ্যাট ওয়ার্ক ব্যান্ডের বিখ্যাত ‘ডাউন আন্ডার’। এই গানটি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত।

আর বেলজিয়াম তাদের ওয়ার্ম-আপের জন্য বেছে নিয়েছে টেকনোট্রনিকের জনপ্রিয় গান ‘পাম্প আপ দ্য জ্যাম’-কে।

স্বাগতিক দল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকরা শুরুর দিকে মাঠে কেবল ‘ইউএসএ ইউএসএ’ স্লোগান দিলেও তেমন কোনো গানে নিজেদের পরিচিত করাতে পারেনি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসিঠাট্টাও হয়েছে। পরে খুব দ্রুতই নিজেদের একটি গান খুঁজে নিয়ে বিড়ম্বনামুক্ত হয়েছে তারা। জন ডেনভারের বিখ্যাত গান ‘কান্ট্রি রোডস টেক মি হোম’ অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের থিম সংয়ে পরিণত হয়েছে। গানটি গাইতে শুরু করার পর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ও অংশগ্রহণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

ফিফা বলছে, এসব গানের উদ্দেশ্য ম্যাচের আবহ তৈরি করা, প্রতিটি দলের সাংস্কৃতিক পরিচয় ফুটিয়ে তোলা এবং এমন স্মরণীয় মুহূর্ত সৃষ্টি করা, যা অনেক সময় ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও দীর্ঘদিন মানুষের মনে থেকে যায়।

কারণ শেষপর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে মানুষ শুধু গোল, ট্রফি কিংবা স্কোরলাইনই মনে রাখে না। মনে রাখে, সম্মিলিত আনন্দ, উদযাপন কিংবা দুঃখের স্মৃতি। কিশোর বয়সে স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার স্মৃতি কারও মনে হয়ত গেঁথে থাকবে এই গানগুলোর সঙ্গে। যেকোনো পরিস্থিতিতে এই গান আরও একবার কোনো একটি নির্দিষ্ট ম্যাচের কথাই মনে করিয়ে দেবে।