31 C
Dhaka
Home Blog

খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি বেড়েছে অপচয় ও ক্ষুধা

খাদ্যশস্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক অগ্রগতি; মাঠ থেকে পাতে পৌঁছানোর আগেই প্রতি বছর লাখো টন খাদ্য নষ্ট হওয়া; বাসাবাড়ি, অনুষ্ঠান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের অপচয়; একই সময়ে ১ কোটি ৫৩ লাখেরও বেশি মানুষের তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, যার মধ্যে ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ জরুরি পরিস্থিতিতে। এর সবই বাংলাদেশের একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন চিত্র।

খাদ্য সংকট বিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, তীব্র খাদ্য সংকটে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। কিন্তু চলতি পথে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া খাবার কিংবা পত্রিকার পাতায় ‘নষ্ট হচ্ছে ফসল’ শিরোনাম এই বাস্তবতারই প্রতিদিনের দৃশ্য।

স্বাধীনতার পর থেকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষেই এক বৈপ্লবিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন। ৫১ বছরের ব্যবধানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১১ লাখ টনে। অর্থাৎ প্রায় ৩৬৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা কৃষিখাতে এক অভাবনীয় সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করে।

অথচ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল, জাতিসংঘ শিশু তহবিল, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন ‘বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা, ২০২৬’ অনুযায়ী, এই একই দেশে ২০২৩-২৫ সময়কালে ৪ কোটি ৫৪ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ) মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন এবং প্রায় ১ কোটি ৪৩ লাখ মানুষ অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণজনিত অপুষ্টিতে ভুগছেন।

একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রান্তিকতা ও বহুমুখী আর্থসামাজিক সংকট, যা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি, জনগোষ্ঠী থেকে জনগোষ্ঠী ভেদে আরও গভীর হয়ে ওঠে।

উৎপাদনের সাফল্যের পাশে তাই খাদ্যক্ষয় ও অপচয়ের চিত্রটি আরও বেশি চোখে লাগে।

বিশ্বজুড়েও চিত্রটি একই রকম। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ‘খাদ্য অপচয় সূচক প্রতিবেদন ২০২৪’ অনুযায়ী, ভোক্তার কাছে পৌঁছানো খাদ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই অপচয় হয়, যার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রতিবেদনটি এই অপচয়কে সরাসরি ‘বৈশ্বিক ট্র্যাজেডি’ বলেছে। শুধু বাসাবাড়িতেই প্রতিদিন ১০০ কোটির বেশি বেলার খাবার অপচয় হয়, যা দিয়ে বিশ্বের ক্ষুধার্ত প্রায় ৭৮ কোটি মানুষের প্রত্যেককে প্রতিদিন একবেলার বেশি খাওয়ানো সম্ভব।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, ‘খাদ্যক্ষয় ও অপচয়’ যদি একটি দেশ হতো, তাহলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর এটিই হতো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী।

খাদ্যক্ষয় ও খাদ্য অপচয় শব্দ দুটি প্রায়ই একসঙ্গে ব্যবহৃত হলেও এদের অর্থ আলাদা। কোনো খাদ্যপণ্য উৎপাদন, ফসল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ কিংবা পরিবহনের ধাপে, অর্থাৎ খুচরা বাজারে পৌঁছানোরও আগে নষ্ট হয়ে গেলে তাকে বলা হয় খাদ্যক্ষয়। এর পেছনে মূলত দায়ী থাকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। যেমন: সংরক্ষণাগারের অভাব, দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

আর খুচরা বাজার, খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কিংবা ভোক্তা পর্যায়ে খাওয়ার উপযোগী খাবার পরিবেশনের আগে বা পরে অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে দেওয়া হলে তাকে বলা হয় খাদ্য অপচয়। এখানে দায় মূলত আচরণগত। যেমন: প্রয়োজনের অতিরিক্ত রান্না, পরিকল্পনাহীন কেনাকাটা কিংবা মেয়াদের প্রতি অসচেতনতা।

সহজ কথায়, সরবরাহ শৃঙ্খলের গোড়ায় যা হারিয়ে যায় তা ক্ষয়; আর শেষ প্রান্তে গিয়ে যা ইচ্ছাকৃত বা অসচেতনভাবে ফেলে দেওয়া হয় তা অপচয়।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট ফল ও শাকসবজির প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশে এ হার পণ্য ও গবেষণা ভেদে ২০ থেকে ৪৪ শতাংশ।

কৃষি মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা আয়োজিত ২০২৪ সালের বিশ্ব খাদ্য দিবসের সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশে ফল ও সবজির বার্ষিক ক্ষয় ও অপচয় ৪০ দশমিক ২ শতাংশ বলা হয়েছে, যা বৈশ্বিক হারের কাছাকাছি। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে দেশে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশই ক্ষয় বা অপচয় হয়।

বাংলাদেশে খাদ্যক্ষয়ের বড় অংশ ঘটে মাঠ থেকে ফসল বাজারে পৌঁছানোর মধ্যবর্তী পর্যায়ে। ফল ও সবজির মতো পচনশীল খাদ্য সংরক্ষণে দেশে পর্যাপ্ত হিমাগার নেই, আর উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে খাদ্যের পচনশীলতাও তুলনামূলক বেশি। সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পুরনো, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফসলে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ। দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা ও অনুপযোগী অবকাঠামোর কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন এবং আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েন। ফসলের দাম পড়ে গেলে অনেক সময় হতাশ কৃষক প্রতিবাদ হিসেবে নিজের ফসল নিজেই নষ্ট করেন।

ভোক্তা পর্যায়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। ইউএনইপি-র একই সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাসাবাড়িতে মাথাপিছু বার্ষিক খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ ৮২ কেজি। আর এই অপচয় মানে কেবল খাদ্যেরই অপচয় নয়, এর সঙ্গে অপচয় হয় উৎপাদনের অর্থ, শ্রম, পানি ও জ্বালানির মতো সম্পদ। বাসাবাড়ির খাবার টেবিল, শহরের রেস্তোরাঁ কিংবা বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের বিলাসী আয়োজনে খাদ্য নষ্ট হচ্ছে।

মানুষের অতিরিক্ত খাদ্য কেনার প্রবণতা, সঠিক সংরক্ষণ-ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সমাজে নিজের বিত্ত জাহির করার মানসিকতা থেকে অপচয়ের এক দুরভ্যাস গড়ে উঠেছে। গ্রামাঞ্চলে অপচয় হওয়া খাবারের কিছু অংশ অন্তত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খাদ্যে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু শহরের উচ্ছিষ্ট খাবার সরাসরি গিয়ে পড়ে ডাস্টবিন বা ময়লার ভাগাড়ে।

নগরের ডাস্টবিন ও বর্জ্য ফেলার স্থানগুলোতে প্রতিদিন জমে থাকা বিপুল পরিমাণ খাবার সামাজিক অসমতা ও কাঠামোগত অপচয়ের এক নির্মম বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। এই খাবারের একটি বড় অংশ ফেলে দেওয়ার আগে চরম দারিদ্র্যে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। অতিরিক্ত মজুত ও ব্যবহারিক অসচেতনতার কারণে বাসাবাড়িতেও পচনশীল খাদ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়। সমাজের কোনো কোনো অংশ প্রয়োজনাতিরিক্ত ভোগ করে। অথচ অন্যরা তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়।

এই ভারসাম্যহীনতা অপচয় বাড়ায় এবং সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে দুর্বল করে তোলে। যে দেশে কোটি কোটি মানুষের প্লেটে পুষ্টিকর খাদ্য পৌঁছায় না, সেখানে এই বিপুল অপচয় স্পষ্টতই এক চরম নিষ্ঠুরতা ও বিলাসিতা।

বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ খাদ্যক্ষয় ও অপচয় ডায়াগনস্টিক-২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ক্ষয় ও অপচয় হওয়া খাদ্য উৎপাদনেই দেশের প্রায় ৩৪ হাজার বর্গকিলোমিটার জমি ব্যবহৃত হয়, যা মোট কৃষিভূমির প্রায় ২৭ শতাংশ। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ১৩ শতাংশের জন্য দায়ী এই খাদ্যক্ষয় ও অপচয়। এই সাংঘর্ষিক বাস্তবতা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের খাদ্য সংকট উৎপাদন-স্বল্পতার সংকট নয়; এটি বণ্টন, ব্যবস্থাপনা, ন্যায্যতা ও অধিকারের সংকট।

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর ‘খাদ্যক্ষয় ও অপচয় বিষয়ক আন্তর্জাতিক সচেতনতা দিবস’। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘খাদ্যক্ষয় ও অপচয় হ্রাসের রূপান্তরমূলক সম্ভাবনা’।

খাদ্যক্ষয় ও অপচয় কমানো গেলে ত্রিমুখী সুফল পাওয়া সম্ভব। প্রথমত, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির উন্নয়ন; দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং তৃতীয়ত, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন।

এই কারণেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১২-এর অধীনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য (১২.৩) নির্ধারণ করা হয়েছে—২০৩০ সালের মধ্যে খুচরা ও ভোক্তা পর্যায়ে মাথাপিছু খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে খাদ্যক্ষয় কমানো।

কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, আমরা এই লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে কতটা দূরে দাঁড়িয়ে আছি।

সবার জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাদ্য নিশ্চিত করা এবং দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রণীত জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি ২০২০-এ খাদ্যক্ষয় ও অপচয় রোধে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে উপযুক্ত সময়ে ফসল কাটা ও সঠিক সংরক্ষণের মাধ্যমে ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি ফসল কাটার পর প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, মোড়কীকরণ, বাজারজাতকরণ ও খাদ্যের উচ্ছিষ্ট পুনর্ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান বিস্তার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

একইসঙ্গে জাতিসংঘ খাদ্যব্যবস্থা সম্মেলনের পর্যালোচনা সভায় জমা দেওয়া ‘জাতীয় পথনকশা, জুলাই ২০২৫’-এ খাদ্যক্ষয় ও অপচয় কমাতে একটি পৃথক জাতীয় কৌশল প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে এবং বিষয়টিকে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নীতিগত প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি এখন প্রয়োজন নীতির বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি। এই বাস্তবতায় ‘বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি’ খাদ্যক্ষয় ও অপচয় কমিয়ে সবার খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে নিম্নোক্ত সুপারিশ তুলে ধরছে—

১. কৃষকের জন্য সহজলভ্য হিমাগার ও সংগ্রহোত্তর সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। ফসল কাটা, মাড়াই ও সংরক্ষণে উন্নত পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত পরিবহন ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।

২. কৃষকদের সময়মতো বাজারদর ও চাহিদার তথ্য দিতে হবে, যাতে দাম পড়ে যাওয়ার কারণে ফসল মাঠেই নষ্ট না হয়।

৩. মানুষকে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কেনা ও রান্না করতে উৎসাহিত করতে হবে এবং বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত খাবার আয়োজনের বদলে অপচয় কমানোর চর্চা গড়ে তুলতে হবে।

৪. উদ্বৃত্ত কিন্তু খাওয়ার উপযোগী খাবার খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের কাছে মর্যাদার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য খাদ্যদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আইনি সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে।

৫. যে খাদ্য শেষ পর্যন্ত খাওয়ার উপযোগী থাকে না, তা থেকে জৈব সার বা বায়োগ্যাস তৈরির সুযোগ বাড়াতে হবে।

৬. দেশের কৃষি ও জলবায়ুর উপযোগী কম খরচের সংরক্ষণ, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।

৭. খাদ্যক্ষয় ও অপচয় কতটা কমছে তা বোঝার জন্য বিভিন্ন সংস্থার তথ্য এক জায়গায় এনে নিয়মিত পরিমাপ ও প্রকাশ করতে হবে। সরকারি খাদ্য মজুতে ক্ষতির তথ্যও এর অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

৮. বাংলাদেশে এখনো কোনো খাদ্য অধিকার আইন নেই। খাদ্যকে নাগরিকের আইনি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একটি খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং সেখানে খাদ্যক্ষয় ও অপচয় কমানোকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় পথনকশায় ঘোষিত পৃথক জাতীয় কৌশলটি দ্রুত প্রণয়ন করতে হবে।

খাদ্যক্ষয় ও অপচয় রোধ কেবল পরিবেশ বা অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, এটি খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। যে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনে সাড়ে ৩০০ শতাংশের বেশি অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, সেই একই দেশে কোটি কোটি মানুষ যখন খাদ্যের সংকটে থাকেন, তখন উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষয় বা অপচয় হওয়া নিছক অদক্ষতা নয়, তা এক গভীর নৈতিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতা।

উৎপাদন থেকে ভোক্তা প্রতিটি স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ, দায়িত্বশীল আচরণ এবং শক্তিশালী নীতি-কাঠামো ছাড়া এই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। খানি বিশ্বাস করে, যে খাদ্য ইতোমধ্যে উৎপাদিত হয়েছে তা ক্ষয় বা অপচয় হতে না দেওয়াই ক্ষুধামুক্ত, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও ন্যায্য বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে সহজলভ্য প্রথম পদক্ষেপ। আজকের এই সচেতনতা দিবস নীতিনির্ধারক থেকে কৃষক, ব্যবসায়ী থেকে ভোক্তা—আমাদের প্রত্যেককে এই দায়িত্ব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিক।

 

উম্মে সালমা: সদস্য, বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি
[email protected]

৬৪ জেলায় ফ্রিল্যান্সিং ও এআই প্রশিক্ষণ উদ্বোধন করলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের অষ্টম ব্যাচ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় ব্যাচের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ভোলা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সারাদেশে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন, ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা, প্রকল্প পরিচালক এবং প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

এ ছাড়া জুমের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলা থেকে ৬ হাজার ৪০০ প্রশিক্ষণার্থী এবং জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক, জেলা প্রশাসকসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভোলা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডা. শামীম রহমান।

‘দেশের ৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ প্রকল্পের আওতায় অষ্টম ব্যাচে ৪ হাজার ৮০০ জন এবং ‘তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যুবদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় ব্যাচে ১ হাজার ৬০০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিচ্ছেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগাতে তরুণদের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার আহ্বান জানান তিনি।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম বলেন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হচ্ছে তরুণদের কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলা। প্রশিক্ষণের মান এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মসংস্থানের বিষয়েও নজর রাখা হবে বলে জানান তিনি।

ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম বলেন, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে কাজ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও মেন্টরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ১৮ জন সফল ফ্রিল্যান্সারকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। এ ছাড়া এআই প্রশিক্ষণের প্রথম ব্যাচের ছয়জন প্রশিক্ষণার্থীকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়।

ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণে বরিশাল জেলার সর্বোচ্চ আয়কারী শরীফ মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ, বরগুনার ওসমান গনি, ঝালকাঠির মো. শাওন হাওলাদার, পিরোজপুরের মো. মঈনুল ইসলাম মঈন এবং পটুয়াখালীর মারুফা আমিনকে ল্যাপটপ দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে এআই প্রশিক্ষণ প্রকল্পের কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও সম্মাননা দেওয়া হয়।

‘দেশের বারোটা বেজে যাবে আর আমরা বসে বসে আঙুল চুষব, এটা হবে না’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের গণসমাবেশে সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘দেশের বারোটা বেজে যাবে আর আমরা বসে বসে আঙুল চুষব, এটা হবে না।’

আজ দুপুরে ওই সমাবেশে তিনি অভিযোগ করেন, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার জনগণের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, গণভোটের গণরায় মানার দাবিতে আপস করার জন্য তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আপনারা যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন, আমাদের তো অস্থিরতার কোনো কারণ ছিল না। দেশের বারোটা বেজে যাবে আর আমরা বসে বসে আঙুল চুষব—এটা হবে না।’

সরকারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘সব দেখে মনে হচ্ছে, আরেকটা অনিবার্য বিপ্লব আসন্ন। এই বিপ্লবের জন্য আমি আপনাদের সবাইকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যেমন শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন, তেমনি ভবিষ্যতের যেকোনো আন্দোলনেও দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেবে।

গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, ‘এই ব্যাপারে আপস করার জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের চাপ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের লোভ দেখানো হচ্ছে। আমরা দেশবাসীকে সাক্ষী রেখে বলতে চাই, আপনাদের গণরায়ের পাহারাদারি আমরা করব।’

তিনি বলেন, কোনো কিছুর বিনিময়ে এ দাবি থেকে সরে আসা হবে না। প্রয়োজনে জীবন দিয়েও দাবি আদায় করা হবে।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘জেল-জুলুমের ভয় দেখাবেন না, ফাঁসির ভয় দেখাবেন না। ফাঁসির রশি যদি জাতির মুক্তির জন্য প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটিকে ফুলের মালা হিসেবেই গ্রহণ করব।’

শিক্ষাঙ্গনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারও পুরোনো দখলদার রাজনীতি ও ভয়ের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। তার ভাষায়, সংকট তৈরি করে পরে মূল্যবৃদ্ধিকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘জনগণের রায়কে যারা অপমান করেছে, তাদের সবাইকেই অপমানজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছে।’

তার ভাষ্য, জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। ‘লড়াই কেবল শুরু হয়েছে, শেষ হয়নি’—মন্তব্য করে আগামী দিনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘বিগত কয়েক মাস ধরে আমি বারবার প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি বিভেদ সৃষ্টি না করতে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন না, যেখান থেকে আপনাদের পতন শুরু হবে। গতকাল দেশের তিনটি জায়গায় যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেটিই প্রমাণ করে আপনার দলের ভেতরেই এমন লোক রয়েছে, যারা আপনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায় না।’

গণসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেন, মামুনুল হক বলেন, ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী জালিমকে জুলুম থেকে বিরত রাখাই তাকে সাহায্য করার প্রকৃত উপায়। তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, তারা যেন অতীতের সহিংস ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির পথ থেকে ফিরে আসে। অন্যথায় জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

সরকারের প্রণোদনা-সহায়তা পেতে মামলা প্রত্যাহার করতে হবে গ্রাহকদের: বাংলাদেশ ব্যাংক

সরকারের নীতি সহায়তা বা প্রণোদনা পাওয়ার আগে ব্যাংকের বিরুদ্ধে ঋণগ্রহীতাদের মামলা বা রিট আবেদন প্রত্যাহার করতে হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে।

সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে থাকা মামলা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত নির্ধারিত নীতি সহায়তা বা প্রণোদনা পাওয়া যাবে না।

এ বিষয়ে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধানকে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক গাজী মো. মাহফুজুল ইসলামের সই করা চিঠিতে বলা হয়, রপ্তানিমুখী বন্ধ কল-কারখানা চালু করাসহ কৃষি, সিএমএসএমই ইত্যাদি খাতের ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রণোদনা বা নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু এরপরও দেখা যাচ্ছে যে, কোনো কোনো গ্রাহক একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা বা নীতি সহায়তা নিচ্ছে এবং অপরদিকে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট পিটিশনসহ অন্যান্য মামলা অব্যাহত রাখছে।

এ অবস্থায় দেশের ব্যাংকিং খাতের মামলাজট নিরসনে প্রণোদনা প্যাকেজসহ যেকোনো নীতি সহায়তা দেওয়ার আগে আবেদনকারী সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট পিটিশনসহ অন্যান্য মামলা অনিষ্পন্ন থাকলে তা প্রত্যাহার সাপেক্ষে আবেদন বিবেচনা করতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

চিঠিতে বলা হয়, প্রত্যাহার করা মামলার তালিকা সংযুক্ত করে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা অনিষ্পন্ন নেই উল্লেখ করে আবেদনকারীকে একটি হলফনামা দিতে হবে।

এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
 

মাঠে ‘স্পেস জ্যাকেটে’ যেভাবে ঠান্ডা থাকছেন ফুটবলাররা

ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটির কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা। ১১ জুন মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের শুরুতে জাতীয় সংগীত গাইতে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলাররা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন রুপালি রঙের ঢিলেঢালা এক জ্যাকেট পরে।

অনেকের কাছেই বিষয়টি অদ্ভুত লেগেছিল—এত গরমে আবার অতিরিক্ত পোশাক কেন?

আবার অনেকের কাছে রূপালি জ্যাকেট পরা খেলোয়াড়দের মহাকাশচারীদের মতো মনে হচ্ছিল।

এই রূপালি রঙের জ্যাকেট আসলে কী এবং কেন পরেছেন খেলোয়াড়রা—সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে উঠে আসে এর পেছনের বিজ্ঞান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৪ সালের পর এটিই ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৭৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখেছে নিউইয়র্কবাসী। এমন পরিস্থিতিতে চলমান বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অংশ নেওয়া দলগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—শরীর ঠান্ডা রাখা।

আর এ জন্যই রূপালি রঙের এই বিশেষ জ্যাকেট তৈরি করেছে বিশ্বের শীর্ষ ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। তাদের ‘ক্লাইমাকুল’ প্রযুক্তির অংশ এই জ্যাকেট, যা খেলোয়াড়দের ত্বক ও শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

এই কুলিং ব্যবস্থায় বিশেষ জ্যাকেট ছাড়াও রয়েছে কুলিং ভেস্ট এবং জুতার ওপর পরার জন্য শীতলকারী আবরণ বা ওভারশু।

অ্যাডিডাসের ইনোভেশন অ্যাথলেট পারফরম্যান্স বিভাগের গ্লোবাল ডিরেক্টর মার্গেরিতা রাককুলিয়া দ্য অ্যাথলেটিককে বলেন, ‘খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ধরে রাখার জন্য শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ২০১২ সাল থেকে আমাদের টিম এটি নিয়ে গবেষণা করছে। ২০১৬ রিও অলিম্পিকের আগে আমরা প্রথম কুলিং ভেস্ট তৈরি করি।’

এরপর থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজস্ব গবেষণাগারে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি উন্নত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মহাকাশচারীদের স্পেসস্যুটকে চরম তাপমাত্রা থেকে রক্ষা করার জন্য এ ধরনের জ্যাকেট ব্যবহার করা হয়।

২০২৫ সালে বিশ্বখ্যাত গাড়ির প্রতিযোগিতা ‘ফর্মুলা ওয়ানে’ (এফ ওয়ান) মার্সিডিজ দলের চালক জর্জ রাসেল ও কিমি আন্তোনেলি বাহরাইনের তীব্র গরম থেকে বাঁচতে এই জ্যাকেট পরেছিলেন।

ফুটবলারদের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে অ্যাডিডাস গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহ করে।

রাককুলিয়া বলেন, ‘আমরা সেই মতামতের ওপর ভিত্তি করে কুলিং ভেস্ট ও জ্যাকেটের ডিজাইন নতুন করে তৈরি করি। ফুটবলের বিরতিগুলো খুব ছোট হয়, তাই ভেস্টগুলো এমনভাবে বানানো হয়েছে যেন খেলোয়াড়রা খুব দ্রুত তা পরতে ও খুলতে পারেন। এজন্য সামনে চেইন যুক্ত করা হয়েছে এবং শরীরের গঠন অনুযায়ী ছোট-বড় করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

অ্যাডিডাসের দাবি, জ্যাকেট ও ভেস্ট একসঙ্গে ব্যবহার করলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ত্বকের তাপমাত্রা প্রায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এটি ওজনেও খুব ভারী নয়, জ্যাকেট ও ভেস্ট মিলিয়ে মাত্র এক কেজি।

এবার বিশ্বকাপে জার্মানি, স্পেন, আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকোসহ মোট ১৪টি দেশকে এই বিশেষ কিট সরবরাহ করেছে অ্যাডিডাস।

ব্যবহারের আগে জ্যাকেট ও ভেস্টগুলোকে একদম ঠান্ডা রাখার জন্য বিশেষ ফ্রিজার বক্সে রাখা হয়।

ফুটবলারদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা এই জ্যাকেটের নাম অ্যাডিডাস দিয়েছে ‘অ্যান্থেম জ্যাকেট’।

ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় থেকেই এটি পরে থাকতে পারেন খেলোয়াড়রা।

রাককুলিয়া ব্যাখ্যা করেন, ‘এই জ্যাকেটগুলো শরীরের চারপাশে একটি শীতল আবহ বা মাইক্রোক্লাইমেট তৈরি করে। জ্যাকেটটি ঢিলেঢালা বা ওভারসাইজড হওয়ায় এর ভেতরে বাতাস চলাচলের জায়গা থাকে। এর বাইরের স্তরটি সম্পূর্ণ বাতাস-নিরোধক, ফলে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে না। আর এর উজ্জ্বল রুপালি প্রতিফলক পৃষ্ঠটি বাইরের রোদ ও উত্তাপকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়।’

স্পেনের ফিজিও কার্লোস ক্রুজ নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলে বলেন, ‘এই ভেস্টগুলো শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে এনে ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। আমরা অনুশীলনের পর তো বটেই, এমনকি ম্যাচের আগে ওয়ার্ম-আপ সেশনেও এটি ব্যবহার করছি। এতে খেলার সময় অনেক বেশি সতেজ বোধ হয়।’

দ্য অ্যাথলেটিক জানায়, তীব্র গরমে দীর্ঘক্ষণ দৌড়ানোর ফলে খেলোয়াড়দের পা ফুলে যায় এবং বুট জুতা অনেক সময় পায়ে ঠিকমতো ফিট হতে চায় না। ফলে তাদের পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ে।

এ জন্য এবার বিশ্বকাপে অনেক ফুটবলারই পা ঠান্ডা রাখতে ব্যবহার করছেন ‘কুলিং ওভারশু’। অ্যাডিডাসের তৈরি এই ওভারশু জুতার ওপরে কিংবা খালি পায়েও ঝটপট পরে নেওয়া যায়।

অ্যাডিডাস জানায়, ওভারশুতে বিশেষ জেল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মাত্র কয়েক মিনিটে পায়ের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। হাফটাইমের বিরতিতে ড্রেসিংরুমে ফিরে খেলোয়াড়রা এটি পরে পা দুটিকে দ্রুত ঠান্ডা করে নেন।

ফুটবলারদের কাছ থেকে এই প্রযুক্তির দারুণ ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে উল্লেখ করে অ্যাডিডাস জানায়, অনেকেই ক্লাবে ফিরে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যও এই সরঞ্জাম নিজেদের কাছে রাখতে চেয়েছেন।

নাসা থেকে ফর্মুলা ওয়ান হয়ে ফুটবলে আসা এই প্রযুক্তি এখন টেনিস, ভলিবল, হকি এবং অ্যাথলেটিক্সের মতো অন্যান্য খেলাতেও ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে অ্যাডিডাস।

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় খেলাধুলার জগতে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় ‘স্পেস জ্যাকেট’ ভবিষ্যতের ক্রীড়া প্রযুক্তির নতুন এক প্রতীক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশি দর্শকের জন্য ‘চকলেট’

বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য মুক্তি পেয়েছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘চকলেট’।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ২০ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন জসীম আহমেদ। এতে শিশু নির্যাতনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি ইউটিউবে দেখা যাবে।

জসীম আহমেদ বলেন, ‘চকলেট’ চলচ্চিত্রে শিশু ও নারীদের ওপর চলমান নির্যাতনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যা সচরাচর পর্দায় উঠে আসে না। শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরা চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—নিজের ঘরেও কি শিশুরা নিরাপদ?

চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন গোলাম ফরিদা ছন্দা, শতাব্দী ওয়াদুদ, আজিজুল হাকিম ও শিল্পী সরকার অপু।

এর আগে, চলচ্চিত্র ‘দাগ’ ও প্রামাণ্যচিত্র ‘অ্যা পেয়ার অব স্যান্ডেলস’ নির্মাণ করেছিলেন জসীম আহমেদ।

কম খরচের ড্রোন দিয়ে ইরান যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে

ইরানে গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথ বিমান হামলা শুরুর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি ‘ধ্বংস’ করে দেওয়া হবে। তবে তিনি ড্রোন বা চালকবিহীন বিমানের কথা উল্লেখ করেননি। 

কিন্তু গত ছয় দিনে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে কম খরচে তৈরি দুই হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই মহাক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সামরিক হামলার বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে ইরান। 

বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেসব চিত্র।

হামলায় ইরান মূলত ‘কামিকাজে’ শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করছে। এ ধরনের ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়। কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে শাহেদ ড্রোনের হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। যা এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর ওপর চালানো সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।

এছাড়া বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, দুবাইয়ের বিলাসবহুল পাম জুমেইরাহ হোটেল ও বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তরেও আঘাত হেনেছে শাহেদ ড্রোন।

এই ড্রোন হামলাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষত উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। 

সৌদি আরবের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত দেশটির বৃহত্তম তেল শোধনাগার রাস তানুরায় চালানো একটি ড্রোন হামলা প্রতিহত করলেও অগ্নিকাণ্ডের ফলে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

একইভাবে কাতারে বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি টার্মিনালটিও ইরানি ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ইরানে তৈরি সাড়ে ৩ মিটার লম্বা এই শাহেদ-১৩৬ ড্রোনগুলোর নির্মাণ খরচ বেশ সস্তা। এর প্রতিটির খরচ মাত্র ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার। এগুলো ওড়ানোর আগে স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট গতিপথ ঠিক করে দেওয়া হয়। দূর থেকে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। 

প্রপেলার ইঞ্জিনের সহায়তায় ওড়ে ড্রোনটি। এটি ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারে। ড্রোনগুলোর সামনের নাকের মতো অংশে ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহন করা সম্ভব, যা ৫০০ কেজির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে অনেক কম হলেও লক্ষ্যবস্তুর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে সক্ষম।

ড্রোনগুলো খুব দ্রুত গতির না হলেও অনেক নিচু দিয়ে উড়তে পারে। ফলে রাডার বা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকারী ব্যবস্থার পক্ষে একে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ড্রোন ব্যবহারের পেছনে ইরানের কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। 

গবেষণা প্রতিষ্ঠান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ নিকোলাস কার্লের মতে, ইরান এই হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর ‘মানসিক চাপ ও আতঙ্ক’ সৃষ্টি করতে চায় যেন তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বাধ্য হয়।

জিপিএস জ্যামিং ডিভাইস ও লেজার অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ড্রোনগুলোকে প্রতিহত করা যায়।

এছাড়া ইরান চায়, শত্রুরা যেন ড্রোন ধ্বংস করতে গিয়ে নিজেদের দামি ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ শেষ করে ফেলে। যেমন, শাহেদের মতো একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে অনেক সময় প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার ডলার অর্থমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাইক মুলরয় বিবিসিকে জানান, এ ধরনের ড্রোনগুলো বিভিন্ন যুদ্ধে এত বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে যে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন নিজেদের উন্নত সংস্করণের ড্রোন তৈরি করেছে। ‘লুকাস’ নামের একটি ড্রোন তারা ইতোমধ্যে ব্যবহার শুরু করেছে। 

এদিকে, মার্কিন ও ইসরায়েলি চাপের মুখে ইরানের ড্রোন হামলার হার বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। 

মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিনের তুলনায় ড্রোন হামলার পরিমাণ ৮৩ শতাংশ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ৯০ শতাংশ কমেছে।

অবশ্য গত সোমবার ইরানের ফারস বার্তা সংস্থার এক ভিডিওতে দেখা যায়, দেশটির কোনো এক অজানা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সারি সারি এমন ড্রোনের মজুদ দেখা গেছে।

তবে ইরান কতদিন এই হামলা চালিয়ে যেতে পারবে তা এখনো অনিশ্চিত।

ছুটির দিনেও অফিসে প্রধানমন্ত্রী, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে চাইলেন সবার সহযোগিতা

সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ শনিবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে তিনি তেজগাঁওয়ে নিজ কার্যালয়ে আসেন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুলশানের বাসভবন থেকে সরাসরি তেজগাঁও কার্যালয়ে আসেন।

রুমন আরও জানান, বৈঠকে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন তারেক রহমান। সেইসঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, ইসমাইল জবিহউল্লাহ, হুমায়ুন কবির, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

আজ বিকেলে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত একটি ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে বলেও জানান অতিরিক্ত প্রেস সচিব।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। এরপর থেকে প্রতি শনিবার সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করছেন তিনি। 

জৈব অস্ত্র তৈরির পদ্ধতি জানাল চীনের এআই, ‘জেলব্রেকিং’ নিয়ে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক সময়ে বারবার এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে উদ্বেগজনক খবর প্রকাশিত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাকের ঘটনা নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই সামনে এলো চীনের এআই প্রতিষ্ঠান মুনশটের নতুন ঘটনা।

গবেষকেরা মুনশটের জনপ্রিয় কিমি মডেলের দুটি এআই মডেলকে জৈব অস্ত্র তৈরি ও হত্যাকাণ্ড চালানোর পদ্ধতি জানাতে রাজি করাতে পেরেছেন। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর চীনের ওই প্রতিষ্ঠানটি অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা শুরু করেছে।

আজ বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।

এআই সিস্টেমের নিরাপত্তা পরীক্ষা করে মাইন্ডগার্ড নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

সম্প্রতি মাইন্ডগার্ড বিবিসিকে জানিয়েছে, গত জুলাইয়ে তারা শনাক্ত করে যে মুনশটের ‘কিমি কে২.৬’ ও ‘কে৩ সোয়ার্ম’ মডেল নির্মাতাদের বেঁধে দেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারে।

এটি ‘জেলব্রেকিং’ নামের একটি প্রক্রিয়ার সময় ধরা পড়ে। এ প্রক্রিয়ায় গবেষকেরা একগুচ্ছ জটিল নির্দেশনা দিয়ে পরীক্ষা করেন, এআই টুল নিরাপত্তাব্যবস্থা উপেক্ষা করে কি না।

মাইন্ডগার্ডের ভাষ্য, এসব নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা ছিল, কিমিকে এ ধরনের উদ্বেগজনক বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা হলে সে যেন জবাব না দেয়।

মুনশট বিবিসিকে জানিয়েছে, ‘আরও উন্নত ও নিরাপদ এআই তৈরির অন্যতম প্রধান ভিত্তি’ হিসেবে তারা তৃতীয় পক্ষের মতামতকে স্বাগত জানায়।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, এ অনুসন্ধানের বিষয়ে তারা মাইন্ডগার্ডের সঙ্গে আলোচনা করছে।

মাইন্ডগার্ডের প্রতিষ্ঠাতা পিটার গ্যারাগান বিবিসিকে জানান, কিমি কে২.৬ ও কে৩ সোয়ার্ম নিয়ে তাদের অনুসন্ধানে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ‘টেক লাইফ’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে পিটার বলেন, ‘জেলব্রেকিং সফল হলে এটি (কিমি) যেকোনো বিষয় নিয়েই কথা বলবে। এমনকি ক্ষতিকর অন্যান্য বিষয়েও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরামর্শ দেবে। এ ক্ষেত্রে এটি উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল হয়ে উঠবে।’

জেলব্রেকিং শব্দটি প্রযুক্তিতে উৎসাহী মানুষের কাছে নতুন নয়। স্মার্টফোনের অপারেটিং সিস্টেমের বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে বাড়তি সুবিধা ব্যবহারের প্রক্রিয়াকেও জেলব্রেকিং বলা হয়। তবে এআইয়ের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, বিশেষভাবে সাজানো নির্দেশনার মাধ্যমে মডেলটির নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া এবং নিষিদ্ধ বা অনুপযুক্ত বিষয়ে উত্তর দিতে বাধ্য করা।

সাম্প্রতিক সময়ে ওপেনএআই, মেটা ও অ্যানথ্রপিকের তৈরি এআই এজেন্টকে বিভিন্ন অনলাইন সেবায় হ্যাকিং চালাতে দেখা গেছে।

তবে এ ক্ষেত্রে জেলব্রেকিং ভিন্ন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

জেলব্রেকিং বেশ জটিল একটি প্রক্রিয়া। এতে অনেক সময় ও প্রচেষ্টার প্রয়োজন। তবে কিছু বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, হ্যাকার ও অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা ক্ষতি করার জন্য এগুলো ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারেন।

অ্যানথ্রপিক সম্প্রতি জানিয়েছে, তাদের একটি এআই মডেল ব্যবহার করে ‘ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড’ চালানোর চেষ্টা শনাক্ত করে তা ঠেকানো হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জৈব অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব ছিল।

আয়কর রিটার্নের খুঁটিনাটি: কার জন্য বাধ্যতামূলক, দেরি ও ভুল হলে করণীয় কী

আয়কর রিটার্ন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। রিটার্ন দাখিল কার জন্য বাধ্যতামূলক, কার জন্য নয়, কিংবা দেরিতে রিটার্ন দিলে কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়, ভুল রিটার্ন কীভাবে সংশোধন করা যায় এবং অসম্পূর্ণ রিটার্ন দাখিল করলে কী পরিণতি হতে পারে, এসব প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে।

আয়কর আইনে এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। একজন করদাতার জন্য তাই শুধু রিটার্ন দাখিল করাই যথেষ্ট নয়; বরং সঠিক ব্যক্তি, সঠিক সময়, সঠিক ফরম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং যথাযথ তথ্য—সবকিছু মিলিয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ রিটার্ন দাখিল করা জরুরি। এমনকি রিটার্ন জমা দিয়ে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র হাতে পাওয়ার পরও সেটি আইনের চোখে সম্পূর্ণ নাও হতে পারে, এই বাস্তবতাও অনেকের অজানা।

কারা রিটার্ন দাখিল করবেন

আয়কর আইনের ১৬৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির আয় যদি সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষে করমুক্ত আয় সীমা অতিক্রম করে, তাহলে তাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

তবে শুধু আয় করযোগ্য হলেই নয়, আরও কিছু পরিস্থিতিতেও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের পূর্ববর্তী তিন বছরের মধ্যে কোনো বছরে কর নির্ধারণ হয়ে থাকলেও রিটার্ন দিতে হবে।

এ ছাড়া, কিছু ব্যক্তি ও সত্তার ক্ষেত্রে আয়ের পরিমাণ নির্বিশেষে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানি, কোনো কোম্পানির অংশীদার-পরিচালক বা অংশীদার-কর্মচারী, ফার্ম, ফার্মের অংশীদার, ব্যক্তিসংঘ, ব্যবসায় নির্বাহী বা ব্যবস্থাপকের পদধারী কর্মচারী, গণকর্মচারী এবং বাংলাদেশে স্থায়ী স্থাপনা রয়েছে, এমন অনিবাসী ব্যক্তি।

কেউ যদি সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষে এমন আয় পান, যা আইনের অংশ ৬-এর প্রথম অধ্যায়ের অধীন কর অব্যাহতি বা হ্রাসকৃত করহারের সুবিধাপ্রাপ্ত, তাহলেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। ২৬১ ধারা অনুযায়ী, করদাতা হিসেবে নিবন্ধনযোগ্য ব্যক্তি এবং ২৬৪ ধারা অনুযায়ী, যাদের রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখাতে হয়, তারাও এই বাধ্যবাধকতার আওতায় পড়েন।

কারা রিটার্ন দাখিল থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন

আইনে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা ভাষায় পাঠদানকারী প্রাথমিক বা প্রাক্‌-প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মাসিক পেমেন্ট আদেশভুক্ত (এমপিও) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—যদি তাদের ইংরেজি ভার্সন কারিকুলাম না থাকে।

এ ছাড়া, অব্যাহতির তালিকায় রয়েছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড। কোনো আইন বা সরকারি আদেশে প্রতিষ্ঠিত সংস্থা, কর্তৃপক্ষ, কমিশন, ইনস্টিটিউট, বোর্ড, একাডেমি বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠান, যারা কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে না এবং পরিচালন ব্যয়ের আংশিক বা সম্পূর্ণ অর্থ সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত পায়, তারাও এই ছাড়ের আওতায় পড়ে। এতিমখানা, অনাথ আশ্রম, ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশে কোনো স্থায়ী স্থাপনা নেই এমন অনিবাসী স্বাভাবিক ব্যক্তি, তহবিল ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও এই তালিকায় পড়তে পারেন।

রিটার্ন কীভাবে দাখিল করতে হবে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিশেষ আদেশের মাধ্যমে সব স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে। তবে ৬৫ (পঁয়ষট্টি) বছর বা তার বেশি বয়সের প্রবীণ করদাতা সনদপত্র দাখিল সাপেক্ষে, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা, মৃত করদাতার পক্ষে প্রতিনিধি অথবা বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের পরিবর্তে পেপার রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।

এ ছাড়া, ই-রিটার্ন সিস্টেমে নিবন্ধনসংক্রান্ত সমস্যার কারণে অন্যান্য স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত বা যুগ্ম কর কমিশনারের অনুমোদনক্রমে পেপার রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।

স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা ছাড়া অন্যান্য করদাতাকে ১৬৯ ধারা অনুযায়ী বোর্ড নির্ধারিত ফরমে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। শুধু মূল ফরম পূরণ করলেই হবে না; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তফসিল, বিবৃতি, হিসাব, পরিশিষ্ট ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্রও দিতে হবে। যেসব করদাতার ৭৩ ধারা অনুযায়ী নিরীক্ষিত আয় বিবরণী ও নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাদের রিটার্নের সঙ্গে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, বোর্ড নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণের প্রমাণ, আয় পরিগণনাপত্র এবং উৎসে করের রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র সংযুক্ত করতে হবে।

কোনো আয়বর্ষে আন্তর্জাতিক লেনদেন থাকা সত্তার ক্ষেত্রে ২৩৮ ধারা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক লেনদেনসংক্রান্ত নির্ধারিত বিবরণীও রিটার্নের সঙ্গে দাখিল করতে হয়। অনিবাসী বাংলাদেশি চাইলে নিকটস্থ বাংলাদেশ মিশনে কর পরিশোধের প্রমাণসহ রিটার্ন জমা দিতে পারেন। মিশন দাপ্তরিক সিলসহ প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দিয়ে রিটার্নটি বোর্ডে পাঠাবে।

রিটার্নে কার সই প্রয়োজন

স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে করদাতা নিজেই রিটার্নে সই করবেন। তিনি বাংলাদেশে না থাকলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা আইনগতভাবে উপযুক্ত ব্যক্তি সই করতে পারেন। আইনগতভাবে বৈধ কারণে কোনো করদাতা স্বাভাবিক কাজ করতে অপারগ হলে তার অভিভাবক বা আইনগত প্রতিনিধি সই করতে পারেন। হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের ক্ষেত্রে সাধারণত পরিবারের কর্তা সই করেন। কর্তা বাংলাদেশে না থাকলে বা মানসিক অক্ষমতার কারণে অপারগ হলে পরিবারের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য সই করতে পারেন।

কোম্পানি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে মুখ্য কর্মকর্তা, ফার্মের ক্ষেত্রে নাবালক অংশীদার ছাড়া যেকোনো অংশীদার এবং অন্য কোনো সংঘের ক্ষেত্রে সদস্য বা মুখ্য কর্মকর্তা সই করতে পারেন। অন্যান্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে বা তার পক্ষে সই করার আইনগত ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি সই করবেন।

বিশেষ পরিস্থিতিতে নোটিশ দিয়ে রিটার্ন চাওয়া যেতে পারে

১৭২ ধারা অনুযায়ী, উপ-কর কমিশনার নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে নোটিশ দিয়ে রিটার্ন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারেন। দাখিল করা রিটার্ন অসম্পূর্ণ মনে হলে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসা কোনো অর্থবছরে বন্ধ হলে বা মালিকানা হস্তান্তরের সম্ভাবনা থাকলে, কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি বাংলাদেশ ত্যাগ করলে বা ত্যাগের সম্ভাবনা থাকলে, করদাতা কোনো করবর্ষের কর এড়িয়ে গেলে বা রিটার্ন দাখিল না করলে, অংশীদারি ফার্মের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন হলে বা নতুন উত্তরসূরি ফার্ম সৃষ্টি হলে এ ধরনের নোটিশ আসতে পারে। কেউ মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনোভাবে অন্যের ব্যবসার উত্তরাধিকারী হলেও রিটার্ন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দিলে

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৭০ ধারা অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলকারী স্বাভাবিক ব্যক্তি ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবার করদাতা আয়কর রিটার্নের সঙ্গে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ—সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা—কর প্রণোদনা বা করছাড় পাবেন। তবে ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে কোনো কর প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না।

বিপরীতে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যেটা বেশি—অতিরিক্ত কর দিতে হবে। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যেটা বেশি—অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হবে।

নির্ধারিত সময়ের পরে রিটার্ন দিলে

১৭৪ ধারা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর স্বপ্রণোদিতভাবে দাখিল করা রিটার্ন কিংবা করবর্ষ অতিক্রান্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে দাখিল করা রিটার্ন, উভয়ই ‘বিলম্ব রিটার্ন’ হিসেবে ধরা হতে পারে। স্বপ্রণোদিতভাবে বিলম্ব রিটার্ন দিলে ১৭৩ ধারা অনুযায়ী, প্রযোজ্য কর পরিশোধের পাশাপাশি অতিরিক্ত কর হিসেবে পরিশোধযোগ্য করের ১০ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যেটা বেশি—অতিরিক্ত কর দিতে হবে।

করবর্ষ পার হওয়ার পর নোটিশের ভিত্তিতে বিলম্ব রিটার্ন দাখিল করলে অতিরিক্ত কর হবে পরিশোধযোগ্য করের ১৫ শতাংশ বা ১০ হাজার টাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যেটা বেশি।

এ ছাড়া, ষষ্ঠ তফসিলের অংশ ১-এর নির্দিষ্ট কয়েকটি দফায় উল্লিখিত আয় ও চাকরি থেকে আয় পরিগণনায় কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয়ের ক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোনো আয়ের ক্ষেত্রে বিলম্ব রিটার্নে কর অব্যাহতি প্রযোজ্য না হলে যেভাবে কর নির্ধারণ হতো, সেভাবেই কর পরিগণনা করে পরিশোধ করতে হতে পারে। অর্থাৎ দেরির মাশুল হিসেবে শুধু অতিরিক্ত করই নয়, নির্দিষ্ট কর অব্যাহতির সুবিধাও হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

রিটার্নে ভুল হলে করণীয়

রিটার্ন দাখিলের পর ভুল ধরা পড়লে ১৭৫ ধারা অনুযায়ী, সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যেতে পারে। স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি হওয়া রিটার্নে করদাতা নিজে ত্রুটি দেখতে পেলে, কর মামলা অডিটের সময়, উপ-কর কমিশনার কর্তৃক কর নির্ধারণের সময়, নির্দিষ্ট নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে কিংবা আপিল কর্তৃপক্ষ বা কর আপিল ট্রাইব্যুনালের সেট-এসাইড আদেশের পর দাখিল করা রিটার্নও সংশোধিত রিটার্ন হিসেবে গণ্য হয়।

তবে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের এই সুযোগ সীমাহীন নয়। আইন অনুযায়ী, মূল রিটার্ন দাখিলের তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে হবে। সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সময় বা তার আগে প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংশোধিত রিটার্ন দিয়ে একই করবর্ষের মূল রিটার্নে দেখানো কর-দায় কমানো যাবে না। একইভাবে দালিলিক প্রমাণ ছাড়া মূল রিটার্নে দেখানো আয়, সম্পদ, দায় বা ব্যয়ের তথ্য পরিবর্তন বা স্থানান্তর করা যাবে না।

অসম্পূর্ণ রিটার্নের ঝুঁকি

১৭৬ ধারা অনুযায়ী, রিটার্ন বা সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সময় আইন বা বোর্ডের নির্দেশনা না মানলে রিটার্নটি অসম্পূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে, উপ-কর কমিশনার কারণ উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় তথ্য, দলিল, বিবৃতি বা যাচাই নোটিশে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে দাখিলের জন্য নোটিশ দিতে পারেন।

করদাতা নোটিশের নির্দেশ সম্পূর্ণভাবে পালন না করলে সংশ্লিষ্ট বিধান পরিপালনে ব্যর্থতার কারণে রিটার্নটি বাতিল বা অকার্যকর বলে গণ্য হতে পারে। অর্থাৎ এমনভাবে বিবেচনা করা হতে পারে যেন রিটার্নটি দাখিলই করা হয়নি। এমন ক্ষেত্রে উপ-কর কমিশনার রিটার্ন বাতিল বা অকার্যকর করার নোটিশ করদাতাকে পাঠাবেন এবং পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারকেও লিখিতভাবে অবহিত করবেন। অন্যান্য ক্ষেত্রে রিটার্নটি অডিটের জন্য নির্বাচন করা যেতে পারে।

অন্যদিকে, করদাতা যদি নোটিশ অনুযায়ী সব ঘাটতি পূরণ করেন, তাহলে রিটার্নটি মূল দাখিলের তারিখ থেকেই সম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হবে। নির্দেশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলে উপ-কর কমিশনার রিটার্নটি বাতিল বা অকার্যকর গণ্য করে নতুন করে রিটার্ন দাখিলের নোটিশ দিতে পারেন।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, শুধু প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পাওয়া মানেই রিটার্নটি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নয়। রিটার্ন গ্রহণ করা হয়েছে আর রিটার্ন আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ, এই দুটি বিষয় এক নয়।

করদাতার করণীয়

রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে করদাতার প্রথম কাজ হলো, তার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা নিশ্চিত করা। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিক ফরমে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্রসহ রিটার্ন জমা দেওয়া প্রয়োজন। রিটার্নে ভুল হলে দ্রুত আইনসম্মত পদ্ধতিতে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর কোনো নোটিশ এলে তা উপেক্ষা না করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় জবাব ও কাগজপত্র দাখিল করা জরুরি।

রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে, নির্ধারিত ফরমে, সঠিক সময়ে ও প্রয়োজনীয় সব দলিলসহ রিটার্ন জমা দিতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে উপ-কর কমিশনারের নোটিশের ভিত্তিতেও রিটার্ন দিতে হতে পারে। আবার নির্ধারিত সময়ের পরে রিটার্ন দিলে অতিরিক্ত কর-দায়ের পাশাপাশি কিছু কর অব্যাহতির সুবিধাও ক্ষুণ্ণ হতে পারে। রিটার্নে ভুল থাকলে আইনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশোধনের সুযোগ থাকলেও সংশোধনের নামে মূল রিটার্নের কর-দায় কমানো কিংবা দালিলিক প্রমাণ ছাড়া আয়, সম্পদ, দায় বা ব্যয়ের তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

করদাতাদের মনে রাখা দরকার, রিটার্নের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পাওয়া আর আইন অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ ও বৈধ রিটার্ন দাখিল করা এক বিষয় নয়। প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিলের ঘাটতি থাকলে রিটার্ন অসম্পূর্ণ, এমনকি ক্ষেত্র-বিশেষে বাতিল বা অকার্যকরও বিবেচিত হতে পারে। তাই রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সঠিক সময়ে দাখিল, সঠিক তথ্য প্রদান এবং প্রয়োজনীয় দলিলসহ পূর্ণাঙ্গভাবে দাখিল।

 

ফয়সাল ইসলাম এফসিএ, আর্থিক খাতের বিশ্লেষক
[email protected]