28.4 C
Dhaka
Home Blog

ইরানে হামলা নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলন, বক্তব্য রাখবেন পেন্টাগন প্রধান

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত সামরিক অভিযান তৃতীয় দিনে পা দিয়েছে। যুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আজ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

আজ সোমবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। 

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিরক্ষামন্ত্রী একইসঙ্গে পেন্টাগন প্রধান নামেও পরিচিত। 

চলতি মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাহী আদেশে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদের নাম বদলে যুদ্ধমন্ত্রী করার উদ্যোগ নেন। তবে এখনো এটি কংগ্রেসের অনুমোদন পায়নি। 

আজ স্থানীয় সমায় সকাল ৮টায় (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায়) এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। 

সামাজিক মাধ্যম এক্সে পোস্ট করে পেন্টাগন এই তথ্য জানিয়েছে। 

পেন্টাগন  আরও জানিয়েছে, ওই সংবাদ সম্মেলনে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনও অংশ নেবেন। 

 

এখন পর্যন্ত চলমান সামরিক অভিযানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি যুক্তরাষ্ট্রে। 

দেশটির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে বিচ্ছিন্নভাবে সামরিক অভিযানের অগ্রগতি নিয়ে হালনাগাদ তথ্য দিয়েছেন। 

মার্কিন সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকমের পক্ষ থেকেও কিছু বিবৃতি এসেছে। 

বিশ্লেষকদের আশা, পিট হেগসেথের বক্তব্যে পরিষ্কার হবে এই সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কি এবং এটি কতদিন ধরে চলতে পারে। 

 

মঙ্গলবার পিট হেগসেথ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিয়ে আইনপ্রণেতাদেরকে সামরিক অভিযানের অগ্রগতির বিষয়ে অবহিত করবেন। 

রোববার হোয়াইট হাউস এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

কংগ্রেসের বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভিযোগ, সামরিক অভিযান শুরুর আগে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের শলাপরামর্শ করা হয়নি। 

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেনা যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। 

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম নিশ্চিত করে, রোববারের এক হামলায় তেহরানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।

১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধন: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

আগামী ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওইদিন ১৪ উপজেলায় কার্যক্রমের সূচনা হবে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের উপ-কমিটির একটি সভা হয়েছে এবং এখানে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উপ-কমিটির সুপারিশের আলোকে ফ্যামিলি কার্ড বিষয়ে পাইলটিংয়ের একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজ হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, আগামী ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। ১৪টি উপজেলাকে আমরা বাছাই করেছি। এসব উপজেলায় একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে। একযুগে সেদিন ১৪ উপজেলায় কার্যক্রমের সূচনা হবে। এটা কন্টিনিউয়াসলি চলবে এবং এই কার্যক্রম দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ড বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অন্যতম নির্বাচনী কমিটমেন্ট। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিন এর ওপর কাজ করেছেন। আজ তার সভাপতিত্বে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এটি আজকে অনুমোদিত হয়েছে।

এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাওয়া যাবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিশ্বাস, কোনো ধরনের ধর্মীয় ডিসক্রিমিনেশন—কিছুই হবে না। এটি ইউনিভার্সাল একটি কার্ড এবং পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হচ্ছে। আশা করছি আগামী চার মাসের মধ্যে পাইলটিং কার্যক্রম শেষ হয়ে যাবে। পরে আপনার সারা বাংলাদেশে আরও ব্যাপকভাবে, অন্তত প্রতিটি উপজেলা এর আওতায় আসবে।

বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাছাই করা হচ্ছে না। ইনফরমেশন কালেক্ট করা হচ্ছে ডোর টু ডোর স্টেপস অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে। কোনো অবস্থাতে ঘরে বসে কোনো বাছাই হবে না। ফিল্ড লেভেল থেকে ইনফো কালেকশন করা হবে এবং কাউকে ডিসক্রিমিনেট করা হবে না। কাউকে বাদ দেওয়া হবে না। প্রোগ্রামটা রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে সরকার।

মন্ত্রী বলেন, কোনো গোয়েন্দা, কোনো দলীয়— কোনো ধরনের ইনভলভমেন্ট নাই। এখানে প্রোগ্রামটা রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে সরকার। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওর নেতৃত্বে, আমাদের বিভিন্ন কর্মকর্তারা আছেন, তাদের নেতৃত্বে কমিটি থাকবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সরকারি কর্মচারীরা আছেন। তাদের নেতৃত্বে কমিটি থাকবে। ওয়ার্ড পর্যায়ে আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীরা আছেন। তাদের নেতৃত্বে কমিটি থাকবে। প্রত্যেকটি ওয়ার্ডের কার্যক্রম তদারকির জন্য ওই উপজেলার একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাকে  দায়িত্ব দেওয়া হবে। দ্বিস্তর বিশিষ্ট চেকিং এবং রিচেকিং হবে, যেন ভুল-ভ্রান্তি সবচেয়ে কম হয়।

চাঁদে আছড়ে পড়া স্পেসএক্সের রকেট পৃথিবীর জন্য হুমকি নয়: নাসা

চাঁদের সঙ্গে ভেসে বেড়ানো একটি স্পেসএক্স রকেটের সম্ভাব্য সংঘর্ষ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।

সংস্থাটির মতে, এই ঘটনায় পৃথিবীর জন্য কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই।

আজ বুধবার বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

নাসার মুখপাত্র জিমি রাসেল বলেন, সংঘর্ষের স্থানটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে এ নিয়ে মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

তিনি জানান, এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে নাসার বিজ্ঞানীরা চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে নতুন তথ্য সংগ্রহ করবেন। একই সঙ্গে মহাকাশে বিচরণকারী বিভিন্ন বস্তুকে শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তি আরও উন্নত করার সুযোগ পাবেন।

এ বিষয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমির জনসাধারণবিষয়ক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. ম্যাট বোথওয়েল বলেন, ‘বিশাল একটি বস্তুর চাঁদে আছড়ে পড়ার ঘটনা এটি। তবে এতে পৃথিবীর জন্য সামান্যতমও কোনো বিপদ নেই। আমরা কেবল ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করতে পারি।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদে এ ধরনের সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর মতো ঘন বায়ুমণ্ডল না থাকায় মহাকাশের বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ ও গ্রহাণু প্রায়ই চাঁদের পৃষ্ঠে আঘাত হানে। তবে এই ঘটনাগুলোর প্রভাব পৃথিবীতে পড়ে না।

বরং এ ধরনের সংঘর্ষ বিজ্ঞানীদের জন্য চাঁদের ভূতাত্ত্বিক গঠন ও মহাকাশে বস্তুর গতিপথ সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার সুযোগ তৈরি করে।

রোনালদোর পর্তুগালকে বিদায় করে শেষ আটে স্পেন

আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। তাই ট্রফির স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মাঠে নেমেছিলেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। কিন্তু নাটকীয় এক সমাপ্তিতে সেই স্বপ্নে ইতি টানল স্পেন। ম্যাচের যোগ করা সময়ে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর করা একমাত্র গোলে পর্তুগালকে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন।

বাংলাদেশ সময় সোমবার রাতে ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ আটের টিকিট কাটে ২০১০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা।

পুরো ম্যাচে বলের দখল, আক্রমণ আর সুযোগ তৈরিতে আধিপত্য দেখানো স্পেন জয় পায় ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে। যদিও ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রাখে দলটি। লুইস দে লা ফুয়েন্তে আগের ম্যাচের একাদশই অপরিবর্তিত রাখেন। দুই দলের মূল লড়াই ছিল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। স্পেন আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও পর্তুগাল ছিল গোছানো রক্ষণে এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের অপেক্ষায়।

প্রথম বড় সুযোগটি আসে মিকেল ওইয়ারজাবালের সামনে। প্রতিপক্ষের অর্ধ থেকে বল কেড়ে নিয়ে দূরপাল্লার শটে পরীক্ষা নেন তিনি দিয়োগো কস্তাকে। জবাবে ডান দিক দিয়ে পাল্টা আক্রমণে উঠে শট নেন জোয়াও ক্যানসেলো, তবে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর দানি ওলমোর দারুণ পাস থেকে আরেকটি সোনালি সুযোগ পান ওইয়ারজাবাল। কিন্তু একেবারে ফাঁকা অবস্থান থেকেও শট বাইরে মেরে বসেন তিনি।

খেলা যখন দুই প্রান্তে সমান তালে ছুটছে, তখনই নিজের সামর্থ্যের জানান দেন দুই গোলরক্ষক। একদিকে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর ডান দিক থেকে নেওয়া শট ঠেকিয়ে দেন উনাই সিমন। অন্যদিকে কয়েক মিনিট পর অবিশ্বাস্য জোড়া সেভ করে পর্তুগালকে রক্ষা করেন দিয়োগো কস্তা।

দুই ডিফেন্ডারের নজর এড়িয়ে নুনো মেন্দেসকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে শট নেন লামিন ইয়ামাল। কস্তা সেটি ফিরিয়ে দিলে ফিরতি বলে আলেক্স বায়েনার বাঁকানো শটও দুর্দান্ত ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন পর্তুগিজ গোলরক্ষক।

প্রথমার্ধের মাঝামাঝি থেকে স্পেনের দখল আরও বাড়লেও উনাই সিমনকেও সমান ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। জোয়াও ফেলিক্সের হেড দারুণভাবে ঠেকানোর পর মুহূর্তের ব্যবধানে রোনালদোর কাছের পোস্টে নেওয়া শটও রুখে দেন তিনি।

ওলমো ও ইয়ামাল একবার করে জালেও বল পাঠিয়েছিলেন, তবে দুটিই অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। বিরতির ঠিক আগে কর্নার থেকে নুনো মেন্দেসের শক্তিশালী শট পেদ্রো পোরোর মাথায় লেগে ক্রসবারে আঘাত করে ফিরে আসে। অল্পের জন্য পিছিয়ে পড়া থেকে বেঁচে যায় স্পেন।

দ্বিতীয়ার্ধে শুরুতে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে পর্তুগাল। তবে খুব দ্রুতই আবার বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে ফিরিয়ে আনে স্পেন। এই অর্ধেই লামিন ইয়ামালকে থামাতে গিয়ে চোট পান নুনো মেন্দেস। পরে তাকে বদলি করে মাঠে নামানো হয় নেলসন সেমেদোকে।

স্পেন আক্রমণের ধার অব্যাহত রাখে। পেদ্রির শট অল্পের জন্য ওপর দিয়ে চলে যায়। এরপর বায়েনার শট এবং ইয়ামালের ফ্রি-কিক দুটিই কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন দিয়োগো কস্তা।

শেষ দিকে পর্তুগালকে প্রায় নিজেদের অর্ধেই আটকে রাখে স্পেন। দানি ওলমোর শট রুবেন দিয়াস ব্লক করেন। আর ফেরান তোরেসের বিপজ্জনক ক্রসে কোনো স্প্যানিশ ফুটবলার পা ছোঁয়াতে পারেননি।

তবে যোগ করা সময়ে আর ভুল করেনি লা রোহা। ডান দিক থেকে ফেরান তোরেসের নিখুঁত পাসে বক্সে বল পান সদ্য বদলি নামা মিকেল মেরিনো। কাছের পোস্ট লক্ষ্য করে নেওয়া তার শট জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে স্পেন শিবির। বাকি কয়েক মিনিট সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষণ সামলে ১-০ গোলের জয় নিশ্চিত করে স্পেন।

 

গাজীপুরে আওয়ামী লীগের ৩০ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধঘোষিত দল আওয়ামী লীগের ৩০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি)।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গতকাল রোববার সকাল থেকে আজ সোমবার সকাল পর্যন্ত মহানগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় এ বিশেষ অভিযান চালানো হয়। জিএমপির মিডিয়া শাখার কর্মকর্তা ও পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) জালাল উদ্দিন মাহমুদ দ্য ডেইলি স্টারকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের নাম ও পদবি জানতে চাইলে পরে তা জানানো হবে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

পুলিশ বলছে, মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নিয়মিতভাবে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিংয়ে অভিন্ন শুল্ককর চান ব্যবসায়ীরা

দেশের রেস্তোরাঁ শিল্পকে সংকট থেকে উত্তরণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিং সার্ভিসে অভিন্ন শুল্ককর বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার চায় বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।

আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনের বিজয়নগরে সমিতির প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি ও প্রস্তাব জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁ এবং ক্যাটারিং খাতের জন্য ভ্যাট ও করের হার সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি। বর্তমানে রেস্তোরাঁয় ভ্যাট ৫ শতাংশ ও ক্যাটারিং সার্ভিসে ১৫ শতাংশ দিতে হয়।

তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে সেটা সমান করে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে হবে। বিভিন্ন শ্রেণির রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিং সেবার ওপর ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট ও কর আরোপের ফলে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় বৈষম্য সৃষ্টি হয় ও কর প্রশাসনও জটিল হয়ে পড়ে।

ইমরান হাসান আরও বলেন, পাশাপাশি স্ট্রিট ফুডসহ সব ধরনের রেস্তোরাঁকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এতে চলমান অসম প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় অনেকটা বৃদ্ধি পাবে।

এ ব্যবসায়ী বলেন, এছাড়া বাজেটে জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর ও ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ হ্রাস করার প্রস্তাব করছি। বর্তমান সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপ, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের কর আরোপ বা বহাল রাখা জনসাধারণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার ঢাকার বাইরে রেস্তোরাঁ ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নতুন রেস্তোরাঁর স্থাপনা ও যন্ত্রপাতির ওপর প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ ও দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ অবচয় সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করায় আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এতে নতুন উদ্যোক্তারা কর রেয়াত পাবেন। তবে আমরা চাই, রেস্তোরাঁ শিল্পের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ নিশ্চিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

‘একইসঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কর কাঠামোকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমানো, কর প্রশাসনে হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।’

ইমরান হাসান বলেন, আমরা আশা করি, চূড়ান্ত বাজেটে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিতের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট পরিশোধের সময় বাড়িয়ে তিন মাস করা প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে আগের মতো মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট পরিশোধ ও রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।

এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনায় ওয়ান স্টপ সার্ভিসের দ্রুত বাস্তবায়ন, রেস্তোরাঁ খাতে জন্য সুনির্দিষ্ট শিল্প নীতি ঘোষণা এবং সমিতির সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবসহ রেস্তোরাঁ সেক্টরে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা এবং রেস্তোরাঁ শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সহসভাপতি শাহ সুলতান খোকন, যুগ্ম মহাসচিব ফিরোজ আলম সুমন, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌফিকুর ইসলামসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

২৮ বছর পর আবার নার্গাজুন-টাবু জুটি

বলিউড অভিনেত্রী টাবুকে ২৮ বছর পর দক্ষিণী সুপারস্টার নার্গাজুনের সঙ্গে দেখা যাবে। তিনি ইতোমধ্যে ‘কিং ১০০’ সিনেমার শুটিং শুরু করেছেন।

আজ মঙ্গলবার বলিউড হাঙ্গামার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

এই সিনেমাটি নাগার্জুনের ক্যারিয়ারের ১০০তম চলচ্চিত্র হওয়ায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সিনেমাটি প্রযোজনা করছে তার নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অন্নপূর্না স্টুডিওস।

এটি হবে টাবু ও নাগার্জুনের চতুর্থ যৌথ কাজ। দীর্ঘদিন পর এই জুটিকে আবার একসঙ্গে পর্দায় দেখতে পেয়ে ভক্তরাও খুশি।

টাবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ক্ল্যাপবোর্ডের ছবি শেয়ার করে জানান, তিনি শুটিংয়ে যোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি নির্মাতাদের ট্যাগ করে প্রকল্পটি নিয়ে নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

এর আগে টাবু ও নাগার্জুন একাধিক সিনেমায় কাজ করেছেন। তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজগুলোর একটি হলো ১৯৯৬ সালের তেলেগু ব্লকবাস্টার নিননে পেল্লাডাটা। সিনেমাটি বাণিজ্যিক ও সমালোচনা—দুই দিক থেকেই সফল ছিল এবং এটি সেরা তেলেগু চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও জিতেছিল।

এর আগে ১৯৯৫ সালের সিসিনদ্রি সিনেমায় টাবু সংক্ষিপ্ত একটি ক্যামিও চরিত্রে অভিনয় করেন, যা প্রযোজনা করেছিলেন নাগার্জুন এবং এতে তাঁর ছেলে আখিল আক্কেনি শিশু শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছিলেন। পরে ১৯৯৮ সালের রোমান্টিক কমেডি আভিদা মা আভিদেতেও এই জুটি একসঙ্গে কাজ করেন।

প্রায় তিন দশক পর ‘কিং ১০০’ এর মাধ্যমে তারা আবার নতুনভাবে একসঙ্গে কাজ করতে যাচ্ছেন। যদিও চরিত্র সম্পর্কে বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, তাদের ভিন্নধর্মী চরিত্রে দেখা যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়, জবাব দেব ‘অকল্পনীয় শক্তিতে’: লারিজানি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় ইরান বসবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলি লারিজানি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আজ এ কথা বলেন।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে তেহরান। আলি লারিজানি সেই খবর নাকচ করে দেন।

এক্সে দেওয়া পোস্টে লারিজানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘ট্রাম্প তার “অবাস্তব কল্পনায়” থাকেন। তিনি এর অধ্যে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। এখন তিনি আরও মার্কিন সেনা হতাহতের ভয়ে ভীত।’

এর আগে তিনি বলেছিলেন, ইরানের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশকে লক্ষ্য করে নয়, বরং মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে।

রোববার আলি লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর এমন শক্তিতে আঘাত হানার হুমকি দেন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তিনি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

এক্সে তিনি লেখেন, ‘গতকাল ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং তারা আঘাত পেয়েছে। আজ আমরা তাদের এমন শক্তিতে আঘাত করব, যা তারা আগে কখনো দেখেনি।’

নতুন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির

পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে মো. আলী হোসেন ফকিরকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

আজ মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। 

তিনি বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের সদস্য। তার নিজ জেলা বাগেরহাট।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসানের সই করা প্রজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে আলী ফকির হোসেন বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমের স্থলাভিষিক্ত হলেন।

‘শিখা’ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বাঙালি মুসলমানের জনপরিসরে যুক্তির খোঁজে

বাংলার ঢাকায় আজি হতে শতবর্ষ আগে ‘অজ্ঞান-তিমিরান্ধস্য’ মুসলিম বাঙালি জাতির চক্ষুন্মীলনের জন্য যে ‘জ্ঞানাঞ্জন’ প্রজ্বলিত হয়েছিল, আজ সেই আলোর কাছেই আমাদের আত্মসমালোচনার সময়। ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’র শতবর্ষ তাই নিছক স্মরণোৎসব নয়; এটি বাঙালি মুসলমান সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রার এক কঠিন হিসাব-নিকাশ।

১৯২৬ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠা এবং পরের বছর তার মুখপত্র ‘শিখা’র প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, শত বছর পরও তা আমাদের পিছু ছাড়েনি—আমরা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখেছি? নাকি কেবল আনুগত্যের পুরোনো ভাষা, গোঁড়ামির পুরোনো কাঠামো এবং সংস্কারের পুরোনো শৃঙ্খলকে প্রযুক্তির নতুন পর্দায় স্থানান্তর করেছি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-শাসিত এই ডিজিটাল সমাজে তথ্যের বিস্তার ঘটেছে বিস্ফোরণের মতো, কিন্তু চিন্তার পরিসর কি একইভাবে প্রসারিত হয়েছে? আমরা কি যুক্তিবোধকে জীবনের চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছি, নাকি অ্যালগরিদম, গুজব, আবেগ ও দলীয় আনুগত্যের কাছে নিজেদের বিচারবুদ্ধিকে আরও সহজে সমর্পণ করেছি?

‘অজ্ঞান-তিমির’ ভেদ করে যে আজি হতে শতবর্ষ আগে ‘চক্ষুন্মীলন’-এর যজ্ঞ শুরু হয়েছিল, আজ আমরা সেই আলোর সামনেই দাঁড়িয়ে। তাই প্রশ্নটা শুধু অতীতের নয়। প্রশ্নটা আমাদের বর্তমানের। আমাদের ভবিষ্যতেরও। বুদ্ধির মুক্তির যে আন্দোলন একদিন শুরু হয়েছিল, আমরা কি সত্যিই তার উত্তরাধিকার বহন করছি? নাকি আমাদের সময়ই বলে দিচ্ছে—সেই আন্দোলনের প্রয়োজন আজ আরও গভীর, আরও জরুরি?

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ কোনো নিছক সাহিত্যিক আড্ডা ছিল না। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহের হোসেন, আবদুল কাদির, আবুল ফজল ও তাদের সহযাত্রীরা সাহিত্যকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন সমাজের চিন্তার পদ্ধতি বদলানোর মাধ্যম হিসেবে। তাদের কাছে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ মানে ধর্মবিরোধিতা ছিল না; বরং ধর্ম, শাস্ত্র, ঐতিহ্য ও সামাজিক বিধানকে অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে বিচারবুদ্ধি, ইতিহাস ও পরিবর্তিত মানবিক প্রয়োজনের আলোকে বোঝা। মুসলিম সাহিত্য সমাজের ঘোষিত লক্ষ্যই ছিল মানুষের বুদ্ধিকে অন্ধ বিশ্বাস ও শাস্ত্রানুগতার অধীনতা থেকে মুক্ত করা।

এই আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে রাজনীতিকে শুধু দল, নির্বাচন ও রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখলে চলবে না। রাজনৈতিক যোগাযোগের দৃষ্টিতে ক্ষমতার একটি বড় অংশ কাজ করে মানুষের ভাষা, বিশ্বাস, পরিচয় ও ‘স্বাভাবিক বোধ’ নির্মাণের মাধ্যমে। কোন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হবে, কে কথা বলার অধিকার পাবে, কোন প্রশ্নকে ধর্মদ্রোহিতা বলা হবে এবং কোন নীরবতাকে সামাজিক শালীনতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে—এসবই রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন। এই অর্থে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ছিল সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিচালিত এক ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রাম। এর নেতারা সমকালীন দলীয় রাজনীতির অভিন্ন কর্মসূচিতে আবদ্ধ ছিলেন না। তাদের বড় উপলব্ধি ছিল, শুধু শাসক বদলালেই সমাজ মুক্ত হয় না; মানুষের চিন্তার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুরোনো কর্তৃত্বকেই পুনরুৎপাদন করে।

কিন্তু এখানেই আন্দোলনের একটি সীমাবদ্ধতাও ছিল। তারা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে রাজনৈতিক মুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে যথার্থভাবেই চিহ্নিত করেছিলেন, অথচ সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পেছনে সক্রিয় শ্রেণিশক্তি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠিত রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে পর্যাপ্ত সাংগঠনিক মোকাবিলা গড়ে তুলতে পারেননি।

যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় মুসলিম সাহিত্য সমাজকে একটি প্রাথমিক ‘বিকল্প জনপরিসর’ বা কাউন্টারপাবলিক হিসেবে দেখা যায়। হাবারমাসের জনপরিসরের ধারণা অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক সমাজে এমন একটি ক্ষেত্র প্রয়োজন, যেখানে নাগরিকেরা ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বাইরে দাঁড়িয়ে সাধারণ স্বার্থের বিষয় নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা করবেন। কিন্তু ন্যান্সি ফ্রেজার দেখিয়েছেন, বাস্তবে একটি একক ও সমতাভিত্তিক জনপরিসর সচরাচর থাকে না; প্রান্তিক ও অধস্তন জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা, প্রয়োজন ও বিরোধী ব্যাখ্যা প্রকাশের জন্য পৃথক বিকল্প পরিসর তৈরি করে। ঔপনিবেশিক বাংলায় কলকাতাকেন্দ্রিক অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তি এবং ঢাকার রক্ষণশীল মুসলিম সামাজিক নেতৃত্বের মাঝখানে ‘শিখা’ তেমনই একটি বিকল্প পরিসর নির্মাণের চেষ্টা করেছিল।

‘শিখা’র পাতায় সাহিত্য, ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, নারী, ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা মূলত প্রশ্ন করার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’—এই বাক্য তাই কোনো অলংকারমাত্র নয়। এটি ছিল জ্ঞান ও ব্যাখ্যার ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ঘোষণা। কে ধর্ম ব্যাখ্যা করবেন, কে সমাজের নৈতিক সীমা নির্ধারণ করবেন এবং কোন জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছাবে—আন্দোলনটি এসব ক্ষমতার কেন্দ্রেই আঘাত করেছিল।

ফলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধও শুধু ধর্মতাত্ত্বিক ছিল না; সেটি ছিল ক্ষমতা রক্ষার যোগাযোগ-কৌশল। কাজী আবদুল ওদুদের ‘সম্মোহিত মুসলমান’, আবুল হুসেনের ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’, ‘আদেশের নিগ্রহ’ ও তার অন্যান্য ‘বিতর্কিত রচনা’ নিয়ে যুক্তির মাধ্যমে আলোচনা করার পরিবর্তে লেখকদের ‘নাস্তিক’, ‘ধর্মদ্রোহী’ কিংবা ‘ইসলামবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিরোধীদের এই কৌশলকে রাজনৈতিক যোগাযোগের ‘ফ্রেমিং’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

রবার্ট এন্টম্যানের ভাষায়, ফ্রেমিং হলো বাস্তবতার কিছু দিক নির্বাচন করে সেগুলোকে এমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া, যাতে সমস্যার সংজ্ঞা, কারণ, নৈতিক মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য সমাধান একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত হয়। এখানে মূল প্রশ্ন, ধর্মীয় ব্যাখ্যা কি ইতিহাস ও যুক্তির আলোকে পুনর্বিবেচ্য, সেটা আড়াল করে আলোচনাটিকে ‘ইসলামের পক্ষে না বিপক্ষে’ এই পরিচয়ভিত্তিক দ্বন্দ্বে নামিয়ে আনা হয়েছিল?

এটি ছিল কার্যকর একটি এজেন্ডা নির্ধারণের কৌশলও। গণমাধ্যম ও প্রভাবশালী যোগাযোগকারীরা সবসময় মানুষকে সরাসরি কী ভাবতে হবে তা নির্ধারণ না করলেও, কোন বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে এবং কোন বিষয়কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে হবে—তা অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে। বুদ্ধির মুক্তির বিরোধীরা তাই ওদুদ বা আবুল হুসেনের যুক্তির সত্যতা নিয়ে জনআলোচনা হতে দেননি; বরং তাদের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক আনুগত্য ও পরিচয়ের বৈধতাকেই আলোচনার প্রধান বিষয় বানিয়েছিলেন।

ফলে সংস্কার, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রশ্ন হারিয়ে গিয়ে ‘কে প্রকৃত মুসলমান’—এই প্রতীকী প্রতিযোগিতা সামনে চলে আসে। কাজী নজরুল ইসলামের উপস্থিতি এই বিরোধকে আরও তীব্র করেছিল। কারণ, নজরুলের সাহিত্য ও রাজনৈতিক ভাষা একইসঙ্গে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় ভণ্ডামিকে চ্যালেঞ্জ করছিল। তার বিরুদ্ধে ‘কাফের’ বা ‘নাস্তিক’ অভিধার ব্যবহারও ছিল যুক্তির জবাবে সামাজিক পরিচয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ।

রাজনৈতিক যোগাযোগে একে চরিত্রহননমূলক বৈধতা-হরণ বলা যায়—বক্তব্যের মোকাবিলা না করে বক্তার কথা বলার নৈতিক অধিকারটিই অস্বীকার করা। তবে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকে নিছক বীরত্বগাথায় পরিণত করাও সমালোচনামূলক ইতিহাসচর্চা নয়। আন্দোলনটি প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক, শিক্ষিত ও পুরুষ মধ্যবিত্তের বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ ছিল। নারীর মুক্তি নিয়ে প্রগতিশীল অবস্থান থাকলেও বেগম রোকেয়ার মতো সমকালীন শক্তিশালী নারীবাদী চিন্তকের সঙ্গে মুসলিম সাহিত্য সমাজের দৃশ্যমান সম্পর্ক তৈরি না হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শূন্যতা। কৃষক, শ্রমিক, গ্রামীণ নারী ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষের ভাষায় মুক্তবুদ্ধির ধারণা অনুবাদ করার দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিও গড়ে ওঠেনি। সংগঠনটির সভায় নারীদের অংশগ্রহণ ও সংগীত পরিবেশনের অগ্রসর নজির থাকলেও এর বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে নারী প্রায় অনুপস্থিত ছিল।

আরও বড় দুর্বলতা ছিল প্রতিষ্ঠান নির্মাণে। একটি বার্ষিক পত্রিকা, কিছু সভা ও কয়েকজন উজ্জ্বল লেখকের ওপর নির্ভরশীল আন্দোলন সামাজিক ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। ‘শিখা’র মাত্র পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় এবং মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যক্রমও ১৯৩৮ সালের পর টেকেনি। বিরোধীপক্ষের হাতে ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সালিশ, পারিবারিক কর্তৃত্ব ও স্থানীয় প্রভাবের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক; বিপরীতে মুক্তবুদ্ধির পক্ষের যোগাযোগ ছিল নগরকেন্দ্রিক ও সীমিত। এমনকি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আন্দোলন ও দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ধারায় প্রভাবিত হয়ে আগের মুক্তবুদ্ধির অবস্থান থেকে দূরে সরে যান। অতএব, আন্দোলনের ইতিহাস শুধু প্রতিরোধের ইতিহাস নয়; এটি সংগঠনহীন প্রগতিবাদের ভঙ্গুরতার ইতিহাসও।

এক শতাব্দী পর প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু যোগাযোগের মৌলিক ক্ষমতা-সম্পর্ক খুব বেশি বদলায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সব কণ্ঠকে সমান দৃশ্যমানতা দেয়নি। ডিজিটাল জনপরিসরে যুক্তির চেয়ে পরিচয়, তথ্যের চেয়ে আবেগ এবং সংলাপের চেয়ে দলগত আনুগত্য দ্রুত সংগঠিত হয়। এখানে কোনো বক্তব্যের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের আগেই বক্তার ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয় যাচাই করা হয়। প্রশ্নটির উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারীকে ‘কোন পক্ষের লোক’ হিসেবে শনাক্ত করাই হয়ে ওঠে প্রধান যোগাযোগ-কৌশল।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘স্পাইরাল অব সাইলেন্স’ বা নীরবতার সর্পিল প্রক্রিয়া। এলিজাবেথ নোয়েল-নিউম্যানের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন মনে করে তার মতামত সামাজিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিরোধী এবং তা প্রকাশ করলে বিচ্ছিন্নতা বা শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে, তখন সে নীরব থাকে। এই নীরবতা আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ মতকে বাস্তবের চেয়ে আরও শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান করে। বাঙালি মুসলমানের বর্তমান জনপরিসরে ধর্মীয় পুনর্ব্যাখ্যা, ইতিহাসের সমালোচনামূলক পাঠ কিংবা সংখ্যালঘু মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সামাজিক বর্জন, চাকরিগত ক্ষতি, অনলাইন আক্রমণ বা চরিত্রহননের আশঙ্কা একই ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করে।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বক্তব্যের ব্যাপক উপস্থিতিকে সরলভাবে ধর্মীয় জাগরণ বা সামাজিক পশ্চাৎপদতার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এখানে বিশ্বাস, বাজার, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, জনপ্রিয়তার অর্থনীতি এবং অ্যালগরিদমিক দৃশ্যমানতা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। ধর্মীয় আবেগ যেমন আন্তরিক বিশ্বাসের প্রকাশ হতে পারে, তেমনি তা অনুসারী সংগ্রহ, রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণ এবং বিরোধী কণ্ঠকে চাপে রাখার যোগাযোগ-পুঁজিও হতে পারে। সমালোচনার লক্ষ্য বিশ্বাসী মানুষ নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই ক্ষমতাকাঠামো, যা বিশ্বাসকে প্রশ্নহীন আনুগত্যে এবং ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক নীরবতা তৈরির অস্ত্রে পরিণত করে।

এখানে বুদ্ধির মুক্তির প্রবক্তাদের কাছ থেকেও একটি শিক্ষা নিতে হবে। মুক্তবুদ্ধি মানে ধর্মকে অপমান করা নয়, আবার ধর্মীয় অনুভূতির নামে সব প্রশ্ন বন্ধ করে দেওয়াও নয়। যুক্তিবাদ যদি সাধারণ মানুষের জীবন, ভাষা ও বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করে কেবল শিক্ষিত অভিজাতের শ্রেষ্ঠত্ববোধে পরিণত হয়, তবে সেটিও মুক্তির পথ নয়। কার্যকর মুক্তবুদ্ধির জন্য প্রয়োজন এমন যোগাযোগ, যা মানুষের বিশ্বাসকে বুঝবে, কিন্তু ভয় পেয়ে সত্য গোপন করবে না; ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপ করবে, কিন্তু ঐতিহ্যকে ইতিহাসের ঊর্ধ্বে স্থান দেবে না।

বুদ্ধির মুক্তির প্রকল্প তাই শুধু কয়েকজন প্রাবন্ধিক বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের দায়িত্ব হতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে প্রশ্ন, প্রমাণ ও বিতর্কের চর্চা; সংবাদমাধ্যমে উত্তেজনানির্ভর ধর্মীয় ফ্রেমের পরিবর্তে প্রেক্ষাপটভিত্তিক সাংবাদিকতা; বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ও ধর্মীয় চাপমুক্ত গবেষণা; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই ও মিডিয়া সাক্ষরতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে বহুমাত্রিক ব্যাখ্যার সুযোগ—এসব ছাড়া মুক্তবুদ্ধি কেবল বার্ষিক বক্তৃতার বিষয় হয়েই থাকবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শুধু নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে না দেখে বিরুদ্ধমত শোনার নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, মুক্ত জনপরিসর তৈরি হয় তখনই, যখন কোনো বক্তব্যের মূল্য বক্তার পরিচয় দিয়ে নয়, তার যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে বিচার করা হয়।

শতবর্ষ পরে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রকল্পকে তাই সফল বা ব্যর্থ—এই দুই সরল শ্রেণিতে ফেলা যায় না। এটি ভাষা আন্দোলন, বাঙালি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং পরবর্তী অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। একইসঙ্গে এটি গণভিত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব এবং রাজনৈতিক সংগঠনের অভাবে সমাজের গভীরে স্থায়ী যুক্তিবাদী সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারেনি।

আজকের প্রশ্ন তাই এই নয় যে আমরা কাজী আবদুল ওদুদ বা আবুল হুসেনকে যথেষ্ট স্মরণ করছি কি না। প্রশ্ন হলো, তারা যে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, আমরা সেগুলো করার সামাজিক অধিকার রক্ষা করছি কি না। কোনো সমাজে বই, ডিগ্রি, প্রযুক্তি ও তথ্যের পরিমাণ বাড়তে পারে; কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হলে তাকে জ্ঞানী সমাজ বলা যায় না।

বুদ্ধির মুক্তির প্রকৃত পরীক্ষা কোনো স্মারকসভায় নয়—তার পরীক্ষা হয় তখন, যখন অজনপ্রিয় একটি মতকে যুক্তি দিয়ে বলার সুযোগ দেওয়া হয়; যখন ধর্মের নামে ক্ষমতা চর্চাকে ধর্মবিদ্বেষ ছাড়াই সমালোচনা করা যায়; যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার আবেগ সত্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে ওঠে না। সেই পরীক্ষায় বাঙালি মুসলমান সমাজ কতটা উত্তীর্ণ হয়েছে? সম্ভবত এই কারণেই শতবর্ষ পূর্তিতে আন্দোলনটির বিজয় ঘোষণা করার চেয়ে তার অসমাপ্তির স্বীকারোক্তিই বেশি সৎ। কারণ, জ্ঞান এখন আর আগের মতো দুষ্প্রাপ্য নয়, কিন্তু বুদ্ধি এখনো নানাভাবে আড়ষ্ট। আর বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেও মানসিক মুক্তি অসম্ভব।

তবে এই আত্মসমালোচনাকে কোনোভাবেই বাঙালি মুসলমান সমাজের একক ব্যর্থতার বয়ান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বাংলার নবজাগরণে রাজা রামমোহন রায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যুক্তিবাদ, মানবমর্যাদা, নারীশিক্ষা, ধর্মীয় সংস্কার ও স্বাধীন চিন্তার পক্ষে যে বিপুল শ্রম, সামাজিক ঝুঁকি ও ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তার উত্তরাধিকার বাঙালি হিন্দু সমাজও সমানভাবে ধারণ করতে পারেনি। শতবর্ষের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও সেখানে জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পৌরাণিক অতীতের রাজনৈতিক ব্যবহার, ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক পুনর্লিখন এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতার নতুন উত্থান স্পষ্ট। অর্থাৎ যুক্তির সংকট কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি ক্ষমতা, পরিচয় ও সামাজিক অনিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহত্তর বাঙালি সংকট।

অবশ্য দুই সমাজের ইতিহাস, ক্ষমতার অবস্থান ও আধুনিকতার অভিজ্ঞতা এক নয়। তাই তাদের ব্যর্থতাকেও যান্ত্রিকভাবে সমান করে দেখা অনুচিত। ঔপনিবেশিক শিক্ষা, শ্রেণিগঠন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘুতা, রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—সবক্ষেত্রেই বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের পথ ছিল ভিন্ন। তবু একটি জায়গায় তাদের বর্তমান সংকট আশ্চর্যজনকভাবে মিলিত হয়েছে—উভয় সমাজেই মনীষীদের নাম উচ্চারিত হয়, কিন্তু তাদের মতো প্রশ্ন করার সাহস অনুসরণ করা হয় না; তাদের প্রতিকৃতি টাঙানো হয়, অথচ তাদের চিন্তার বিপজ্জনক ধারটি ভোঁতা করে দেওয়া হয়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ কিংবা আবদুল ওদুদ—সবাইকে নিরাপদ স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত করার মধ্য দিয়েই আমরা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সমাজকে পুনর্গঠন করছি। বাঙালি হিন্দু সমাজের এই বুদ্ধিবৃত্তিক পশ্চাদপসরণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা অবশ্যই আরেকটি স্বতন্ত্র পরিসর দাবি করে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই মুসলমান না হিন্দু, কে বেশি যুক্তিবাদী, তা নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা আদৌ যুক্তির সমাজ হতে চেয়েছি কি না। যে সমাজ মনীষীদের জন্মদিন পালন করে, কিন্তু তাদের প্রশ্ন সহ্য করে না; বইমেলা করে, কিন্তু বইয়ের ভাবনা ভয় পায়; বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ায়, কিন্তু স্বাধীন বিচারবুদ্ধি সংকুচিত করে; ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে সত্যকে এবং সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষার নামে মানুষকে নীরব করে—সে সমাজ আসলে জ্ঞানের নয়, স্মারক ও স্লোগানের সমাজ। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কি এই নয় যে, আমরা মুক্তবুদ্ধির শহীদদের সম্মান করতে শিখেছি, কিন্তু মুক্তবুদ্ধিকে এখনো সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার দিইনি?

 

রাজীব নন্দী: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; ডক্টোরাল স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।
[email protected]