28.1 C
Dhaka
Home Blog

শুধু রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নয়, অর্থনৈতিক জ্ঞানও প্রয়োজন

আমরা বাংলাদেশিরা গণতন্ত্রকে ভালোবাসি, লালন করি এবং এর জন্য সংগ্রাম করি। কিন্তু, বারবার গণতন্ত্রকে টেকসই করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। সদ্য আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করলাম। এই অভ্যুত্থান নানা দিক থেকেই ছিল অনন্য। এটি ছিল সর্বব্যাপী, তৃণমূলভিত্তিক ও তারুণ্যনির্ভর।

নিপীড়নমূলক শাসনের বিরুদ্ধে আমাদের শিক্ষার্থী ও তরুণদের রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস দীর্ঘ ও গৌরবময়। পঞ্চাশের দশকে বাংলাকে পাকিস্তানের দুই রাষ্ট্রভাষার একটির মর্যাদা এনে দিয়েছিল তরুণরাই। তারাই আইয়ুব শাসনের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দেয়া মুক্তিবাহিনীর অন্যতম শক্তি ছিল এই তরুণেরা। স্বাধীনতার পর তারাই জেনারেল এরশাদের শাসনের অবসান ঘটায় এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায়। এসব আন্দোলনে তরুণদের উদ্যম, দূরদৃষ্টি ও দেশপ্রেম প্রমাণ করে যে, নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিতে নতুন প্রজন্মের অদম্য স্পৃহা কখনো নিঃশেষ হয় না।

কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হতে না হতেই আমাদের রাজনৈতিক নেতারা আবারও পারস্পরিক দ্বন্দ্বে ফিরে গেছেন। পরস্পরকে নিরন্তর দুষছেন। ফলে, দিনকে দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, এত তাড়াতাড়ি যদি দেশের রাজনীতি সেই পুরোনো ধারাতেই ফিরে যায়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী?

প্রশ্ন হলো, আমাদের রাজনৈতিক নেতারা কেন মানুষের মধ্যে এই হতাশা তৈরি করছেন? যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন উদযাপন করার কথা, সেখানে সরকার ও বিরোধীদলগুলোর বাকযুদ্ধ চলছে। আর এ সবকিছুই অস্বস্তি সৃষ্টি করছে দেশের মানুষের মধ্যে। এই মুহূর্তে আমাদের উচিত ছিল একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেদের অভিনন্দন জানানো। কিন্তু তার পরিবর্তে আমরা এমন কথা বলছি বা এমন ইঙ্গিত দিচ্ছি, যা অপ্রয়োজনীয় এবং আত্মঘাতী সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।

গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এসব পরিস্থিতি তৈরি করে তারা নিজেদের অজান্তেই পতিত, পরাজিত, পলাতক স্বৈরাচারের পুনর্বাসনের পথ সুগম করছে কি না, সেটি মনে হয় ভেবে দেখা প্রয়োজন আমাদের।’

আমরা কি সত্যিই অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছি? পরাজিত স্বৈরাচারী শক্তির ফিরে আসার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা কি আছে? আমাদের বিশ্বাস, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা যথেষ্ট প্রস্তুত এবং নিকট ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করে অযথাই নিজের অবস্থানকে দুর্বল করছেন।

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির জুলাই জাতীয় সনদ এবং এতে প্রতিশ্রুত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বিলম্বের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘দেশের বারোটা বাজবে, আর আমরা কি বসে বসে আঙুল চুষব।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, আরেকটি বিপ্লব আসন্ন। এই বিপ্লবের জন্য আমি আপনাদের সবাইকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

নির্বাচিত বিরোধীদলীয় নেতা যখন বলেন ‘দেশের বারোটা বাজছে’, তখন আমাদের ভাবনায় কী আসবে? এটি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। যে ‘দেশের বারোটা বাজছে’, সেখানে কেউ কেন বিনিয়োগ করতে আসবে? দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আমরা কীভাবে অর্জন করব? এ ধরনের বক্তব্য কি আমাদের প্রতিপক্ষের মুখে হাসি ফোটায় না? আমরা ভুল পথে এগোচ্ছি—প্রতিপক্ষের এমন দাবিকে আরও শক্তিশালী করে না?

বিরোধীদলীয় নেতার পূর্বাভাস যদি সত্যের কাছাকাছিও হতো, তাহলে কি দক্ষিণ কোরিয়া আমাদের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সই করত? কিংবা জাপানও কি এই কিছুদিন আগেই একই রকম আরেকটি চুক্তি করত?

সামান্য জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য আমরা কীভাবে নিজেদের অগ্রগতির সম্ভাবনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করি, তারই দুঃখজনক কিন্তু বাস্তব উদাহরণ এগুলো।

আমার আগের কলামে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলাম। দুঃখজনকভাবে, সেই প্রবণতা শুধু অব্যাহতই নেই, বরং আরও সহিংস রূপ নিয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের ছাত্রসংগঠনগুলো সরাসরি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। গত মঙ্গলবার বিভিন্ন জেলার চারটি ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে অন্তত ৯০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব বিরোধ এড়ানো সম্ভব ছিল এবং সংলাপের মাধ্যমে অবশ্যই সমাধান করা যেত। কিন্তু তা না করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার এই প্রবণতা সহিংসতার প্রতি এক ধরনের মানসিক ঝোঁকই প্রকাশ করে। এর ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা আরও কমবে এবং অতীতে যেভাবে বড় রাজনৈতিক দলগুলো পেশিশক্তিকে প্রশ্রয় দিয়েছে, সেই সংস্কৃতিই আরও শক্তিশালী হবে। এর পরিণতিতে ছাত্ররাজনীতি সেই গঠনমূলক ও জাতি গঠনের ভূমিকায় ফিরে যেতে পারবে না, যা আমরা একসময় দেখেছি।

সক্রিয় রাজনীতিতে নেই এমন সাধারণ শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যেই ক্লাসে যেতে বা ক্যাম্পাসে থাকতে ভয় পাচ্ছেন, অনিরাপদ বোধ করছেন। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র এমন হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটাই হচ্ছে এবং বাড়ছে। অতীতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলের ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে যে দ্বন্দ্বের সংস্কৃতি ছিল, আমরা আবারও সেই ধারাবাহিকতাই দেখছি।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ সময়ে ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনায় ৫৬ জন নিহত ও ৫ হাজার ২৪৬ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর মধ্যে ২৭৩টি সংঘর্ষ হয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে, ২৯০টি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এবং ৩৩টি বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে।

এটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত।

আমরা যে বিষয়টি তুলে ধরতে চাই তা হলো, সহিংসতার পরিবর্তে শাসক ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আরও পরিণত ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা হতে হবে। এই সময়ে আমাদের রাজনীতিবিদদের অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করা উচিত। হ্যাঁ, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীদের অনেকে অনেক সময় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা বলেন। কিন্তু সংসদীয় কমিটি কিংবা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধীদলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে দেশের গভীর অর্থনৈতিক সংকট বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করার কোনো আন্তরিক উদ্যোগ আমরা দেখতে পাই না।

একইসঙ্গে বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদদেরও দায়িত্ব অনেক। সেখানে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান কীভাবে এমন মন্তব্য করেন যে, ‘দাম বাড়ানোর অজুহাত তৈরি করতে সরকার কৃত্রিম গ্যাস সংকট সৃষ্টি করেছে’? গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে ১১-দলীয় জোট দেশব্যাপী বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। এটা ‘জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

আজকের এই দুনিয়ায় অর্থনীতি কীভাবে বিকশিত হয়, শিল্প কীভাবে পরিচালিত হয় এবং আমাদের রপ্তানিকারকরা কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন—এসব বিষয়ে আমাদের রাজনীতিবিদদের মৌলিক ধারণা থাকা আবশ্যক। কৃষি এখনো আমাদের পরিকল্পনায় অবহেলিত, অথচ এটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কৃষির উন্নয়নে বায়ো টেকনোলজি ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অপরিহার্য উপাদান। আধুনিক অর্থনীতিতে ব্যাংকখাত সবচেয়ে উন্নত ও জটিল ক্ষেত্রগুলোর একটি। একইসঙ্গে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে প্রকল্প অর্থায়ন কীভাবে হয় এবং কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয় সে বিষয়গুলো রাজনীতিকদের বিবেচনায় রাখা।

আমরা সাধারণত দক্ষতা দেখে মন্ত্রী নিয়োগ দিই না। রাজনৈতিক কারণে যদি এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতেই হয়, তাহলে যাকে যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেই বিষয়ে অবিলম্বে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, আজকের দিনে রাষ্ট্র পরিচালনাও একটি বিজ্ঞান। এটি জ্ঞাননির্ভর ও বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক হতে হয়, বক্তৃতা বা বাগাড়ম্বরনির্ভর নয়। ভালো নীতি বাস্তবায়নে আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকেই এই শিক্ষা নেওয়া উচিত।

বর্তমানে বাংলাদেশ ইতিহাসের অন্যতম কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একটি সুস্থ অর্থনীতির কিছু মৌলিক ভিত্তি হাসিনা সরকারের আমলে ধ্বংস হয়ে গেছে, বিশেষ করে ব্যাংকখাত। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে তৃণমূল পর্যায়ে শৃঙ্খলাহীনতা ও মবতন্ত্রের বিস্তার আমাদের শিল্প উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণ জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ছোট অর্থনীতিগুলো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইরান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে জুনের মধ্যে জ্বালানি ও সার আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

আজ আমরা কাঁচামাল সরবরাহ, শিল্প উৎপাদনের উপকরণের দাম এবং রপ্তানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। তবে সর্বোপরি, জ্বালানির সংকটই আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাসও প্রায় একই।

গ্যাস সংকট, বেসরকারিখাতে দুর্বল বিনিয়োগ ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। করোনা মহামারির পর এই প্রথম শিল্প উৎপাদন কমছে। শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ৭০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার ফলে কর্মহীন হয়েছে লাখো মানুষ।

ব্যাংকখাতের সংকট আরও গভীর হয়েছে। গত মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা টাকার অঙ্কে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি।

মূল্যস্ফীতি এখনো অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এর কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে টানা চার বছর ধরে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের আশপাশে রয়েছে।

কাজেই, আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের উচিত বাংলাদেশের সামনে থাকা গুরুতর চ্যালেঞ্জগুলো উপলব্ধি করা, তাদের বক্তব্যে সংযম আনা এবং আরও বাস্তবসম্মত অবস্থান গ্রহণ করা। একইসঙ্গে পরামর্শ দেবো, বিরোধীদলকে আরও বেশি ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে তারা আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। একইসঙ্গে, যত বেশি স্বাধীনতা বিরোধীদল পাবে, তত বেশি দায়িত্বশীলও তাদের হতে হবে। তাদের অবস্থান হতে হবে আরও বাস্তবভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর।

বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলো তো বটেই, প্রতিটি দেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে অনেক বেশি পরিণত, দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক রাজনৈতিক সংলাপ প্রয়োজন। আর তার জন্য জনপ্রিয়তানির্ভর বাগাড়ম্বরে অবশ্যই সংযত হতে হবে।

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

ট্রাম্পের ফোনের পরই বদলে গেল সিদ্ধান্ত! মুখ খুললেন ইনফান্তিনো

বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে বিতর্ক। কারণ, শাস্তি পুনর্বিবেচনার জন্য সরাসরি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ফোনালাপের পরই ফিফা বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করে।

এই ঘটনায় বিশ্ব ফুটবলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে ফিফা। তবে সোমবার বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন ইনফান্তিনো। তিনি স্বীকার করেছেন, ট্রাম্প তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তবে দাবি করেছেন, ফিফার বিচারিক সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং তাদের সিদ্ধান্তে তিনি কোনো হস্তক্ষেপ করেননি।

ইনফান্তিনো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের কথোপকথনের সময় আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জানিয়েছিলাম যে, বিষয়টি ফিফার স্বাধীন বিচারিক সংস্থার অধীনে আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে। যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত নেবে। ফিফার ব্যবস্থা এভাবেই পরিচালিত হয় এবং এই নীতিই আমি সবসময় সমুন্নত রাখব।’

তবে ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি জানান, বালোগানের শাস্তি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ তিনিই করেছিলেন। ট্রাম্প বলেন, ‘সে (বালোগান) কোনো ভুল করেনি। সে আমাদের সেরা খেলোয়াড়। আপনার সেরা খেলোয়াড়কে যদি বলা হয়, “তুমি খেলতে পারবে না”, তাহলে সেটা খুবই অন্যায্য।’

এরপর তিনি যোগ করেন, ‘আমি বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলাম। যদি এমন একজন শীর্ষ খেলোয়াড়কে খেলতে দেওয়া না হতো, তাহলে বিশ্বকাপের গায়ে বড় ধরনের দাগ লেগে যেত। আমি সেই অনুভূতির কথাই জানিয়েছিলাম। আমার মনে হয়, তারা সত্যিই অসাধারণ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

বিতর্কের সূত্রপাত শেষ বত্রিশের ম্যাচে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে ভিডিও সহকারী রেফারির (ভিএআর) পর্যালোচনায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন বালোগান। নিয়ম অনুযায়ী, এতে পরের ম্যাচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে তার খেলার সুযোগ থাকার কথা নয়।

এদিকে ট্রাম্প বালোগানকে লাল কার্ড দেখানো ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউসের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও তার অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা ব্যাখ্যা তিনি দেননি।

ব্যাংক খাতে গত বছর ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা লোকসান

খেলাপি ঋণ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় কমেছে ব্যাংক খাতের আয়। ফলে প্রথমবারের মতো নিট লোকসানের মুখে পড়েছে এই খাত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতে নিট লোকসান হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম ব্যাংক খাত সামগ্রিকভাবে নিট লোকসানের মুখে পড়লো।

এর আগে ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলো ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছিল।

ব্যাংক কর্মকর্তা মনে করছেন, এর জন্য দায়ী দীর্ঘদিনের ঋণ অনিয়ম, আর্থিক জালিয়াতি ও এই খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি।

তারা আরও বলছেন, কয়েকটি ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংক উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকসহ অনেক ব্যাংক বিপুল পরিমাণ ঋণ অবলোপন করে, এবং খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির চাপে পুরো খাত নিট লোকসানে ডুবে যায়।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি লোকসান গুনেছে। ব্যাংকটির নিট লোকসান হয়েছে ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছর তাদের নিট মুনাফা ছিল ১৩৫ কোটি টাকা।

বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব থাকাকালে শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকটি বড় ধরনের অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির শিকার হয়েছিল। গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম একইসঙ্গে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ আরও চারটি সংকটাপন্ন ব্যাংককে এখন একটি বড় ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু করে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হলো—সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, যার নিট লোকসান ৩১ হাজার কোটি টাকা; এক্সিম ব্যাংকের ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা; গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা, ও ইউনিয়ন ব্যাংকের ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, পুরো ব্যাংকিং খাত এখন অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। আয় সৃষ্টির সুযোগ সীমিত, এবং কার্যত কোনো মুনাফা নেই।

‘যখন খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়, এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তখন লোকসান অনিবার্য হয়ে পড়ে,’ গতকাল দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে বলেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অশ্রেণিকৃত পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ছিল ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা, স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা, এবং অবলোপন করা ঋণ ছিল ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেন, সম্প্রতি পুনঃতফসিল করা বিপুল পরিমাণ ঋণে দুই বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়েছে। যার অর্থ হলো, এই সময়ে ব্যাংকগুলো ঋণ থেকে কোনো আয় করতে পারবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ব্যাংকের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৯৯২ কোটি টাকা।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালে জনতা ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা।

সামগ্রিক লোকসানের মধ্যেও তুলনামূলক শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও উন্নত সম্পদমানের কারণে কয়েকটি ব্যাংক গত বছর উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে।

অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক এককভাবে ১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মুনাফা ছিল ৯৩৮ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংকের ৮৯০ কোটি ও ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) ৯০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য আরও বলছে, গত বছর ব্যাংক খাতের নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকায় নেমে আসে।

আওয়ামী লীগের ফিরতে হলে মানুষের ‘ডিমেনশিয়া’ হতে হবে: তথ্য উপদেষ্টা

বাংলাদেশের সব মানুষ ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রংশ) রোগে আক্রান্ত হলেই কেবল আওয়ামী লীগ এই দেশে বড় গলায় কথা বলতে পারবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ দল হিসেবে পুরোপুরি নিষিদ্ধ হবে কিনা, সেটি আদালতেই নির্ধারিত হবে বলে জানান তিনি।

আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

জাহেদ উর রহমান বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের বড় গলা হতে (রাজনীতিতে স্বাভাবিক হতে) আমাদের সবার স্মৃতিশক্তি শেষ হয়ে যেতে হবে, ডিমেনশিয়া রোগ হয়ে সবকিছু ভুলে যেতে হবে, তাহলে হয়তো (আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা) সম্ভব। 

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার নৈতিক সাহস নেই উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, লুটপাটকারী, মাফিয়া, চোর-বাটপারের আসলে খুব বেশি নৈতিক সাহস থাকে না।

তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ে বন্দুকের সামনে মানুষ দাঁড়াতে পেরেছিল, কারণ তাদের নৈতিক সাহসটা ছিল। এত গুলি, এত মৃত্যু, এরপরও মানুষ পরের দিন আবার গিয়ে (বন্দুকের সামনে) দাঁড়িয়েছে। তো তাদের (আওয়ামী লীগ) দিয়ে আসলে তেমন কিছু হওয়ার কোনো কারণ নাই।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কয়েকটি জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, কিছু ছোটখাটো নাশকতার সক্ষমতা হয়তো (আওয়ামী লীগের) আছে, আর তাদের প্রচুর টাকা আছে। সেটা খরচ করে হঠাৎ করে কোনো নাশকতা করে কিনা, সেজন্য যে জায়গায় ঝুঁকি বেশি মনে হয়েছে সেখানে সেনাবাহিনী রাখা হয়েছে জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে। এর মানে এই না যে সরকার মনে করে আওয়ামী লীগ অনেক কিছু করতে পারবে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য অফিসার আবদাল আহমদ ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসীন।

‘চিত্রা’ থেকে এবার অন্য চরিত্রে সাবিলা নূর

চলতি বছরের ঈদুল ফিতরের সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। এখানে ‘চিত্রা’ চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন সাবিলা নূর।

সিনেমা বিশ্লেষকরা আশা করছেন, তানিম নূর পরিচালিত সিনেমাটি আরও একমাস ভালো ব্যবসা করবে। এখনো মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে হাউসফুল শো হচ্ছে। এছাড়া আগামীকাল শুক্রবার থেকে ৩৮টি সিঙ্গেল স্ক্রিনে মুক্তি পাচ্ছে সিনেমাটি।

 

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার চিত্রা হয়ে উঠতে সব রকমের চেষ্টা করেছেন সাবিলা নূর। মুক্তির পর অভিনেত্রী নিজেই ছুটে গেছেন বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে।

পর্দার ‘চিত্রা’ চরিত্র যখন বাস্তবে মানুষের অনুভূতিতে জায়গা করে নেয়, তখনই তাকে সফল বলাই যায়। তিনি নিজেও সিনেমাটি অনেকবার দেখেছেন। আর প্রতিবারই যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন গল্পকে।

সাবিলা নূর বলেছেন, নিজের অভিনয়ের খুঁত ধরার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি দর্শকের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়াকে। আমার মধ্যে এক ধরনের শিল্পীসুলভ অস্থিরতা কাজ করেছে।

তবে চিত্রা হয়ে ওঠার এই যাত্রায় বেশি  ভূমিকা রেখেছেন পরিচালক তানিম নূর। কথা প্রসঙ্গে বলেন, তানিম নূরই আমাকে  ‘সত্যিকারের চিত্রা’ হিসেবে পর্দায় গড়েছেন। একজন পরিচালকের কাজ শুধু দৃশ্য ধারণ করা নয়, বরং অভিনেতার ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা। পরিচালক সেই কাজটিই করেছেন। ফলে শুটিং সেটে নার্ভাসনেস ধীরে ধীরে কেটে গেছে।

তার ভাষ্য, অভিনয় ওয়ার্কশপের মতো। বড়দের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি শুধু অভিনয় নয়, শৃঙ্খলা, চরিত্রের গভীরতা এবং দৃশ্যের ভেতরে ডুবে থাকার কৌশলও শিখেছেন।

চিত্রা থেকে এবার অন্য চরিত্রে দেখা যাবে তাকে।  আগামী কোরবানি ঈদে তার তিন নম্বর সিনেমা ‘রকস্টার’ মুক্তির তালিকায় আছে। সিনেমার তার বিপরীতে আছেন শাকিব খান। মালয়েশিয়ায় শুটিং শুরু হয়ে বর্তমানে শেষ অংশের শুটিং বাংলাদেশে চলছে। এটি নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ আলোচনা চলছে। এটি পরিচালনা করছেন আজমান রুশো।

সাবিলা নূর বলেন, ‘রকস্টার’ এমন একটি গল্পের সিনেমা, যা আগে আমাদের দেশের দর্শক খুব একটা দেখেনি। এই সিনেমাটি নিয়ে খুব আশাবাদী। আমাদের ‘তাণ্ডব’ আগে গ্রহণ করেছে মানুষ। আশা করছি ‘রকস্টার’ সিনেমাও মানুষ গ্রহণ করবে।

খামেনিকে হত্যা কেন হিতে বিপরীত হতে পারে

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।

আল জাজিরায় প্রকাশিত একটি মতামতে পুরস্কারজয়ী ফিলিস্তিনি সাংবাদিক দাউদ কুতুব এমন মন্তব্যই করেছেন।

মতামতটিতে তিনি লিখেছেন, যুদ্ধের একটি জনপ্রিয় কৌশল হলো শত্রুর নেতৃত্বকে নির্মূলের চেষ্টা করা। এই কৌশল নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে ভালো হতে পারে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে এই কৌশল অতীতে বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

যুদ্ধে প্রধান শত্রুকে হত্যা করে কেউ তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারেন। নিশ্চিতভাবেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করে এখন ‘সাফল্যের’ সাগরে ভাসছেন।

কিন্তু ৮৬ বছর বয়সী এই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা অসুস্থতার কারণে উত্তরাধিকারের কথা ভাবছিলেন। এ অবস্থায় তাকে হত্যা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তির হিসেবে খুব বড় কোনো বীরত্বের ঘটনা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামেনিকে হত্যা করার মানে এই নয় যে, এখনই ইরানে এমন কোনো নেতৃত্ব বা শাসনব্যবস্থা আসছে যা ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থের পক্ষে কাজ করবে।

এর কারণ হলো, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা কোনো শান্তিপূর্ণ ফলাফল আনে না। বরং এর কারণে অনেক বেশি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতা ও অভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যায়।

সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখনই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের হত্যার পাশাপাশি নেতৃত্ব উপড়ে ফেলার ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে, ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ।

ইরাকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশটির নেতা সাদ্দাম হোসেনকে মার্কিন বাহিনী আটক করে তাদের ইরাকি মিত্র বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডের পর সাদ্দামের শাসনের অবসান হয়। এতে ইসরায়েলের প্রকাশ্য শত্রু নেতৃত্ব শেষ হয়ে গেলেও ইরাকে ইরানপন্থী শক্তির ক্ষমতায় আসার পথও খুলে দিয়েছিল।

এর ফলে পরের দুই দশকে ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীগুলোর উর্বর ক্ষেত্র হয়ে ওঠে ইরাক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শত্রুজ্ঞান করা এই বাহিনীগুলো ইরাকজুড়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

মার্কিন আগ্রাসনের কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ আইএসের উত্থান। সিরিয়া থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে যাওয়া আইএস মার্কিন নাগরিকসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এক পর্যায়ে এ অঞ্চল থেকে ইউরোপে শরণার্থীর ঢল নামে।

এমন আরেকটি উদাহরণ হামাস। এ শতাব্দীর প্রথম থেকেই ইসরায়েল বারবার হামাসের শীর্ষ নেতাদের হত্যার চেষ্টা করছে। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিন, তারপর তার উত্তরসূরি মধ্যপন্থী হিসেবে বিবেচিত আবদেল আজিজ রানতিসিকে হত্যা করতে সফল হয় ইসরায়েল। কয়েক দফা হত্যাকাণ্ডের পর ইয়াহিয়া সিনওয়ার গাজায় হামাসের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পরিকল্পনা করেন।

হিজবুল্লাহর ইতিহাসও প্রায় একই রকম। এর সাবেক নেতা হাসান নাসরুল্লাহ সফলভাবে হিজবুল্লাহকে শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করেন। তার পূর্বসূরি আব্বাস আল-মুসাভিকেও হত্যা করেছিল ইসরায়েল।

আড়াই বছর ধরে ইসরায়েল হামাস, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই দুই গোষ্ঠীর নেতাদের একে একে হত্যা করছে। এতে উভয় দলই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু তাদের আদর্শ, লক্ষ্য বা মূল উদ্দেশ্যকে ‘হত্যা’ করতে ব্যর্থ হয়েছে ইসরায়েল। ‘আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’—এই মূলমন্ত্রে হয়তো পরবর্তী কোনো বড় ঝড়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে তারা।

ইরানের ক্ষেত্রে বলা যায়, যিনিই খামেনির স্থলাভিষিক্ত হোক না কেন, তার সঙ্গে আলোচনায় বসা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য অবশ্যই সহজ হবে না এবং এটার সম্ভাবনা খুবই কম। মাস্কাট ও জেনেভায় আলোচনার সময় মধ্যস্থতাকারী ওমানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, খামেনির অধীনে ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে বড় ধরনের ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু খামেনির উত্তরসূরির রাজনৈতিকভাবে ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে মনে হয় না।

যদি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভিযান অব্যাহত রাখে এবং ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য চাপ দেয়, তবে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। এর ফলাফল কী হবে, তা এখনই অনুমান করা যাচ্ছে না।

কিন্তু ইরাক ও লিবিয়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ইরানের নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হওয়া মানে এ অঞ্চলে ও ইউরোপে মার্কিন মিত্রদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করবে।

এ মুহূর্তে একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এই যে, ইরানকে নেতৃত্ব শূন্য করার কৌশলের মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী অর্জন করবে?

নেতানিয়াহুর জন্য খামেনির হত্যাকাণ্ড একটি বিশাল সাফল্য। সামনে ইসরায়েলে নির্বাচন। নির্বাচনে তার রাজনৈতিক জীবনের অবসান হতে পারে এবং দুর্নীতির মামলায় তার জেলও হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে জনপ্রিয়তা অর্জন করে ভোটে জয় তার ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি লাভ। ইসরায়েলি নেতারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা খুব কমই করেন এবং সর্বোপরি, ইসরায়েলি সমাজ এর পক্ষেই থাকে।

কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে অর্জন ততটা স্পষ্ট নয়। যুদ্ধের প্রতি আগ্রহ নেই এমন নাগরিকদের সামনে দূর দেশের ৮৬ বছর বয়সী এক ‘অসুস্থ’ নেতাকে হত্যার বড়াই করছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রে যখন মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সংকটের মধ্যে আছে, তখন করদাতাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ট্রাম্প ব্যয় করছেন এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, যারা প্রকৃতপক্ষে সরাসরি কোনো হুমকি ছিল না। এমনকি এ যুদ্ধকে অনেক মার্কিন নাগরিকই ‘ইসরায়েলের যুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করছে।

ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের পরিবর্তে ট্রাম্পের ‘বোকা’ বনে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে। তিনি এমন এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে গণ্য হতে পারেন যিনি অন্য দেশের প্রধানমন্ত্রীর টিকে থাকা নিশ্চিত করতে ব্যয়বহুল যুদ্ধ শুরু করেছেন। 
এখন এটা পরিষ্কার যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের মাটিতে সেনা নামাচ্ছেন না। কোনো এক সময়ে তাকে অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু, পেছনে পরে থাকবে এমন এক বিপর্যয় যার ধাক্কা সামলাতে হবে এ অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আঞ্চলিক জোটগুলো অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

একইসঙ্গে এই অভিযান এ অঞ্চলে মার্কিন করদাতাদের অর্থ, সেনাদের জীবন ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব নষ্ট করবে, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই দেবে না। আশা করা যায় যে, ওয়াশিংটন এক সময় এই শিক্ষা নেবে যে হত্যাকাণ্ড এবং নেতৃত্ব উপড়ে ফেলার কৌশল শেষ পর্যন্ত কাজে দেয় না।

আরও ১২০২টি ‘রাজনৈতিক’ মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ১৭ বছর ধরে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক আরও এক হাজার ২০২টি মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পরিচালক) ফয়সল হাসান স্বাক্ষরিত এক খুদে বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।

গত রোববার একই কর্মকর্তার আরেক খুদেবার্তায় জানানো হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৭ বছর ধরে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক এক হাজার ছয়টি মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি আইন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলাগুলোর মধ্যে ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি নিয়ে লড়াই

প্রতিটি গণআন্দোলনের দুটি ইতিহাস থাকে। একটি লেখা হয় ক্ষমতার ভাষায়, অন্যটি জনগণের অভিজ্ঞতায়। প্রথমটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত প্রতিষ্ঠা পায়—রাষ্ট্র, সরকার কিংবা নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নির্মাণ করে। দ্বিতীয় ইতিহাসটি গড়ে ওঠে ধীরে—মাঠে থাকা মানুষের স্মৃতি, সংগঠনের দলিল, সংবাদ প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে। তাই গণআন্দোলনের পর লড়াই কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে হয় না, লড়াই হয় রাজনৈতিক স্মৃতির মালিকানা নিয়েও। রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে দ্বিতীয় লড়াইয়ে থাকে নির্লজ্জতার ছাপ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রবণতা নতুন নয়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে আন্দোলনের বহুমাত্রিক চরিত্রকে সংকুচিত করে একক রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে। অথচ গণআন্দোলনের শক্তি কোনো একক দল, ব্যক্তি বা সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজের নানা স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা এবং দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ মিলেই একটি গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। একসময় আন্দোলনের গতি স্তিমিত হয়ে আসে, আবার নতুন নতুন টার্নিং পয়েন্ট সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তা নতুন শক্তি অর্জন করে।

জনগণের পক্ষে সংগঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির হস্তক্ষেপ, উদ্যোগ ও সংগ্রামই স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষকে ঘনীভূত করে আনে৷ আন্দোলনে নতুন বেগ ও দিকনির্দেশনা দেয়। ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, আন্দোলনের স্মৃতি নিয়েই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় এমন একটি বয়ান সামনে এসেছে যে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে প্রগতিশীল বা বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা ছিল নাজুক। এমনকি ফ্যাসিবাদবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে না ওঠার পেছনেও ‘বামপন্থীদের’ রাজনৈতিক অবস্থানকে দায়ী করা হয়েছে।

এসব বক্তব্যের একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য আছে। আর তা হলো জুলাইয়ের ইতিহাসে বামপন্থী রাজনীতির ভূমিকা সংকুচিত বা প্রশ্নবিদ্ধ করা। কিন্তু ইতিহাসের মূল্যায়ন কি এভাবেই করা যায়? কোনো রাজনৈতিক শক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্ক যদি সমসাময়িক কর্মসূচি, প্রতিবেদন, মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উপেক্ষা করে গড়ে ওঠে, তাহলে সেটি আর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস থাকে না। এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাস থেকে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে বিস্মৃত করে দেওয়ার যে প্রবণতা, তা মূলত শাসকগোষ্ঠীর প্রবণতা। এ জন্যই প্রয়োজন ‘বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই’।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বামপন্থীদের অবস্থান নাজুক ছিল—এই দাবি আন্দোলনের নথিভুক্ত ইতিহাসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনগুলো প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। 

২০২৪ সালের ৭ জুলাই বাম গণতান্ত্রিক জোট এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবি জানায়। তারা স্পষ্টভাবে বলে, মুক্তিযোদ্ধাদের তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত ৩০ শতাংশ কোটা বহাল রাখা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং এটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

একইদিনে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পরিবর্তে অনগ্রসর অঞ্চল, জাতিসত্তা ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তিসঙ্গত কোটা নিশ্চিত করার দাবি তোলে।

এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণে। প্রথমত, এটি প্রমাণ করে যে বামপন্থীরা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বুঝে যুক্ত হয়নি। বরং আন্দোলনের রাজনৈতিক দাবির প্রশ্নে শুরু থেকেই একটি সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, তাদের দাবিতে কেবল বিদ্যমান কোটার বিরোধিতাই ছিল না, একইসঙ্গে বৈষম্যহীন একটি বিকল্প কাঠামোর প্রস্তাব উপস্থিত ছিল। অর্থাৎ আন্দোলনের দাবি রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা ও সম্প্রসারণের চেষ্টা তারা করেছিল।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অন্য যেকোনো গণআন্দোলনের মতোই বিভিন্ন টার্নিং পয়েন্টের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ১৬ জুলাই আন্দোলনে সেরকম এক নতুন মোড় ছিল৷ সেদিন শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ বর্বর হামলা চালায়৷ হামলার প্রতিবাদে বাম গণতান্ত্রিক জোট দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। রাজধানীর পুরানা পল্টনে জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। 

এরপর ১৮ জুলাই ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির প্রতিও তারা আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায়। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দেয়। ২৬ জুলাই যখন আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে এবং রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে, তখন বাম গণতান্ত্রিক জোট নিহতদের স্মরণে সারা দেশে শোকমিছিল করে এবং সরকারের পদত্যাগ দাবি করে। এসব কর্মসূচির প্রতিটি সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমে নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে বামপন্থী সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক উপস্থিতির দলিল রয়েছে। ইতিহাসের মূল্যায়ন যদি দলিল ও তথ্যের ভিত্তিতে হয়, তাহলে অন্তত এটুকু বলা যায় না যে তারা আন্দোলনের বাইরে ছিল।

তবে এখানেই আলোচনার শেষ নয়। কোনো আন্দোলনে সংবাদ সম্মেলন করা, বিবৃতি দেওয়া বা কর্মসূচি ঘোষণা করা এক বিষয়; আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে মাঠে থাকা, আন্দোলনকারীদের সংগঠিত করা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া আরেক বিষয়। জুলাই আন্দোলনও এর ব্যতিক্রম নয়৷ এর ইতিহাস কেবল ঘোষিত কর্মসূচির ইতিহাস না৷ এটি এমন এক সময়ের ইতিহাস, যখন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও মানুষ রাস্তায় থাকার উপায় খুঁজে নিয়েছিল। তাই আন্দোলনের মূল্যায়নে কারা কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে এই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা ভুল হবে বরং সংকটময় মুহূর্তে কোন রাজনৈতিক শক্তি রাজপথে ‘গণ’কে সংগঠিত করতে ভূমিকা পালন করেছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ‘মুখ’গুলো যখন অ্যাম্বাসির চৌকাঠে আটকে যাচ্ছিল, তখন জনগণকে সংগঠিত করার ব্রত নিয়েছিল মাঠের এক সুসংগঠিত শক্তি৷ যার গুরুত্বপূর্ণ অংশই ছিল ‘বাম-প্রগতিশীল’।

১৫ জুলাইয়ের পর যখন সহিংসতা বেড়ে যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলা হয়, রাষ্ট্র দমননীতির পথে হাঁটে এবং পরে কারফিউ জারি করা হয়, ঠিক সেই পর্যায়ের ঘটনাগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি আড়াল হয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনের সেই দিনগুলোর ইতিহাস না বুঝলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চরিত্রও বোঝা সম্ভব নয়।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হামলার আগে ইডেন কলেজ থেকে রাজু ভাস্কর্যের উদ্দেশে আসা একটি মিছিল কলেজ গেটেই হামলার শিকার হয়। ওই মিছিলে বামপন্থী নারী নেতৃবৃন্দ আক্রান্ত হন। পরদিন পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে ওঠে।

১৭ জুলাই পুলিশ, বিজিবি ও ছাত্রলীগের যৌথ দমন-পীড়নের মধ্যেও গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের নেতারা প্রেসক্লাব থেকে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। এসব কর্মসূচি আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। এগুলো যে দমন-পীড়নের মধ্যেও রাজনৈতিক প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কারফিউ জারি, গ্রেপ্তার ও সর্বব্যাপী নজরদারির মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই সময়েও বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্রসংগঠন প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে।

২৮ জুলাই সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের কালো পতাকা মিছিল এবং ২৯ জুলাই পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে রিপোর্টাস ইউনিটির সামনে ঝটিকা সমাবেশ—এসব কর্মসূচি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। একই সময়ে বিভিন্ন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে আন্দোলনের রাজনৈতিক আবহ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাদের ‘নাজুক’ বলা হচ্ছে কিংবা কেবল ‘সমর্থক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে একটা সংগঠন হলো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। শিক্ষক নেটওয়ার্ককে এই আন্দোলনের কেবল সমর্থক অ্যাখ্যা দেওয়া গণঅভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে বেঈমানির সামিল। 

১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো খালি করে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ত্যাগে বাধ্য করার পরও ১ আগস্ট শিক্ষক নেটওয়ার্কের কর্মসূচিতে আন্দোলনকারীরা আবারও ক্যাম্পাসে সমবেত হওয়ার সুযোগ পায়। সেদিন সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত রাজপথ আবারও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে।

২৭ জুলাই শিক্ষক নেটওয়ার্ক আটককৃত সমন্বয়কদের খুঁজতে ডিবি অফিসে হাজির হয়, যা আন্দোলনকারীদের বুকে নতুন সাহসের সঞ্চার ঘটায়। এই ঘটনাগুলো হয়তো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একমাত্র চালিকাশক্তি ছিল না। কিন্তু এগুলো দেখায়, আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময়েও বামপন্থী ও প্রগতিশীল অংশ তাদের ব্যানারেই জনগণকে সংগঠিত করে চলেছিল। ২ আগস্ট বাম-প্রগতিশীলদের নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়া ‘দ্রোহ যাত্রা’য় এই অভ্যুত্থানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে, ডাক এসেছিল ‘এক দফা’র।

শেখ হাসিনার শাসনামলের দীর্ঘ সময়জুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম ছিল প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর ছাত্র রাজনীতিতে নতুন শক্তির আবির্ভাব ঘটে। একই সময়ে বিরোধী বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে।

এই প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়। ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চলে। সব প্রচেষ্টা সফল হয়নি, মতপার্থক্যও ছিল। কিন্তু সেই ব্যর্থতা থেকেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে ঐক্য গঠনের পথে বাধা ছিল বামপন্থীরা। বাস্তবতা ছিল আরও জটিল। বিভিন্ন সংগঠনের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, সাংগঠনিক কৌশল ও পারস্পরিক অবিশ্বাস—সব মিলিয়েই সেই ঐক্যের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেই ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের বিরুদ্ধে বাম-প্রগতিশীলদের আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত ছিল৷

দলিল উপেক্ষা করে কোনো একপক্ষের ওপরে দোষ চাপানোর প্রবণতাকে রাজনৈতিক পর্যালোচনা বলা যায় না৷ তা হয় কেবল একটি রাজনৈতিক বয়ান। জুলাই-পরবর্তী সময়ে এই বয়ান নির্মাণের প্রবণতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের বহুমাত্রিক ইতিহাসকে সংকুচিত করে এমন একটি আখ্যান তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে কয়েকজন ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারাই কেন্দ্রে থাকবে, আর অন্যদের অবদান প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হবে।

অথচ গণঅভ্যুত্থানের শক্তি ছিল তার বহুস্বরিক চরিত্রে। সেখানে ছাত্র ছিল, শ্রমিক ছিল, শিক্ষক ছিল, সাংস্কৃতিক কর্মী ছিল, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কর্মী ছিল, আবার কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না থাকা অসংখ্য সাধারণ মানুষও ছিল। ইতিহাসের এই বহুত্ব অস্বীকার করলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় গণআন্দোলনেরই। কারণ, তখন আন্দোলন আর জনগণের সম্মিলিত সংগ্রাম হিসেবে থাকে না, নতুন ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার উপাখ্যানে পরিণত হয়।

জুলাইয়ের রাজনৈতিক স্মৃতির মালিকানা কার হাতে থাকবে, তা নিয়েই বর্তমান বিতর্ক চলছে৷ কে আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করেছে, কার কণ্ঠ ইতিহাসে থাকবে, আর কার অবদান বিস্মৃত হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আজ নতুন করে লেখা হচ্ছে। নতুনভাবে নির্মিত এই রাজনৈতিক বয়ানে ক্ষমতাসংলগ্ন বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী নিজেদের ইতিহাসের প্রধান নির্মাতা এবং অগ্রগামী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট।

ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণেই ইতিহাসকে পুনর্লিখনের এমন প্রবণতা অতীতেও ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এহেন রাজনীতি জন্ম দিয়েছে ইনু–মেননদের মতো চরিত্রের, যারা একসময় গণআন্দোলনের ভাষা ধারণ করলেও শেষ পর্যন্ত আদর্শ ত্যাগ করে সুবিধাবাদী নিপীড়কের অংশে পরিণত হয়েছেন। অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীরা আজ নিজেদের চোখের সামনেই শুধু নতুন স্বৈরাচারের উদ্ভবের সম্ভাবনাই দেখছে না, তাদের সহযোগী নতুন ‘ইনু–মেনন’দের জন্মের সম্ভাবনাও দেখছেন।

ইতিহাসকে বহুস্বরের পরিবর্তে একক মালিকানাধীন করার এই প্রবণতা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক যাত্রার জন্যও এক গভীর অশনিসংকেত। সেই কারণেই জুলাইয়ের ইতিহাস লিখতে হলে কোনো একক সংগঠন বা নেতৃত্বের গৌরবগাঁথা নয়, গণঅভ্যুত্থানের বহুস্বরিক চরিত্রকে স্বীকার করতে হবে। সমালোচনা হবে, মতভেদ থাকবে, রাজনৈতিক মূল্যায়নও ভিন্ন হবে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা দাবি করে যারা মাঠে ছিল, তাদের উপস্থিতি যেন রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে অদৃশ্য না হয়ে যায়।

গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তি তার ‘গণ’-এর মধ্যেই নিহিত। যারা এই সত্য অস্বীকার করে তারা ‘গণ’র ইতিহাসকে এক কাগুজে কাঠগড়ায় তুলে দেয়৷ আন্দোলনের শক্তিকে কেটেছেটে আন্দোলন সংগ্রামের একটা বনসাই সংকীর্ণমনা গোষ্ঠীর ড্রইংরুমে শোপিস হিসেবে জায়গা পায়।

 

নুজিয়া হাসিন রাশা: বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি।

উদ্‌যাপন করতে গিয়ে কবজি ভেঙে বিশ্বকাপ শেষ হেন্ডারসনের

মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারিয়ে নাটকীয়ভাবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে ইংল্যান্ড। দারুণ এই জয়ের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ম্যাচ শেষে উদ্‌যাপনের সময় দুর্ঘটনায় কবজি ভেঙে হাসপাতালে যেতে হয়েছে অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার জর্ডান হেন্ডারসনকে। পরে নিশ্চিত করা হয়েছে, চোটের কারণে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে তার।

শেষ বাঁশি বাজার পর সতীর্থদের সঙ্গে সমর্থকদের সামনে উদ্‌যাপন করতে যান ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা। সেই সময় বিজ্ঞাপন বোর্ডের ওপর পড়ে গিয়ে গুরুতর চোট পান হেন্ডারসন। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাকর্মীরা ছুটে আসেন। তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয় এবং পরে স্ট্রেচারে করে মাঠ থেকে বের করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জুড বেলিংহ্যাম বিবিসিকে বলেন, ‘ও কিছুটা সমস্যায় আছে। তবে আমাদের মেডিকেল দল পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আসলে কী হয়েছে, তা আমি পুরোপুরি জানি না। তাই বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না। সবাই ওর পাশে ছিল, আর সেটাই ছিল দেখার মতো সুন্দর একটি মুহূর্ত।’

ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলও ম্যাচ শেষে হেন্ডারসনের চোট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘জর্ডানের কবজিতে চোট লেগেছে। আজকের রাতের সঙ্গে এটা একেবারেই মানানসই নয় যে জর্ডান আমাদের সঙ্গে নেই। পরবর্তী চিকিৎসা কীভাবে হবে, সেটা আমি জানি না। ডাক্তার শুধু জানিয়েছেন, সে এখন হাসপাতালে আছে।’

পরে জানা যায়, হেন্ডারসনের কবজি ভেঙে গেছে এবং এই চোটে বিশ্বকাপে আর খেলা হচ্ছে না তার। এই বিশ্বকাপে খুব বেশি সুযোগ পাননি সাবেক লিভারপুল অধিনায়ক। পানামার বিপক্ষে ম্যাচে ৮৪তম মিনিটে বদলি হিসেবে নেমেই তার একমাত্র মাঠে নামা। যদিও মেক্সিকোর বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে বেঞ্চে ছিলেন তিনি। ম্যাচ চলাকালে টাচলাইনের পাশে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে জড়িয়ে হলুদ কার্ডও দেখেন।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের এই ম্যাচে জুড বেলিংহ্যামের জোড়া গোল এবং হ্যারি কেইনের পেনাল্টি থেকে করা গোলে ৩-২ ব্যবধানে জয় পায় ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই জ্যারেল কুয়ানসাহ স্টাডস তুলে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় হেসুস গালিয়ার্দোকে আঘাত করায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেও শেষ পর্যন্ত জয় ধরে রেখে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে থ্রি লায়ন্সরা।
 

অভ্যন্তরীণ নৌপথে বাড়ছে ফি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বাড়ার শঙ্কা

অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌপথে চলা যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের বিভিন্ন চার্জ ও ফি সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। পরিবহন খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নির্মাণসামগ্রী পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়বে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গত মাসে সংশোধিত এ হার ঘোষণা করেছে। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ফি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

আগামী অর্থবছর থেকে কার্গো জাহাজ, বাল্কহেড, মাছ ধরার নৌকা ও অন্যান্য নৌযানকে সংরক্ষণ ফি (কনজারভেন্সি চার্জ) হিসেবে প্রতি গ্রস টনে ১০০ টাকা দিতে হবে, যা বর্তমানে ৪০ টাকা। লঞ্চ মালিকদের প্রতি যাত্রীর বিপরীতে বার্ষিক সংরক্ষণ ফি প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি—১৫০ টাকা দিতে হবে, বর্তমানে এটি ১১৫ টাকা।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুসারে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বিভিন্ন সেবার ফি বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রতি আট ঘণ্টার জন্য পাইলটেজ ফি ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হয়েছে।

সর্বশেষ ২০১৯ সালে সরকার এসব ফি বাড়িয়েছিল। বর্ধিত হারের মধ্যে পণ্য ও যাত্রীবাহী—সব ধরনের নৌযানের বার্থিং ও মুরিং চার্জ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

‘পদ্মা সেতুর কারণে ইতোমধ্যে আমরা অনেক যাত্রী হারিয়েছি। যাত্রী সংকটে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এখন চার্জ ও ফি বাড়ানো হলে আমাদের আরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হবে,’ বলেন সুন্দরবনস নেভিগেশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক আক্তার হোসেন।

এই কোম্পানি ঢাকা-বরিশাল নৌপথে লঞ্চ পরিচালনা করে। আক্তার বলেন, যাত্রী কমে যাওয়ায় এই রুটে চলা লঞ্চগুলো ইতোমধ্যে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম ভাড়া নিচ্ছে।

কার্গো জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার মালিকরা বলেছেন, বাড়তি চার্জ পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি করবে।

বাংলাদেশ কোস্টাল শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নাজমুল হোসেন হামদু বলেন, এই পরিবর্তনের প্রভাব মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার ওপর পড়বে।

তিনি বলেন, ‘ভাড়া বাড়ানো ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। শুরুতে এই ধাক্কা আমাদের ওপর আসবে, এরপর সবার ওপর।’

তিনি জানান, কার্গো জাহাজে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও পরিবহন করা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি হয়। সেখানে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কারখানা ও গন্তব্যে পাঠানো হয়।

‘সিমেন্টের কাঁচামাল থেকে শুরু করে গম, লবণ, ডাল ও পাথর—আমরা যে পণ্য পরিবহন করি, তার তালিকা বেশ দীর্ঘ,’ যোগ করেন তিনি।

সিমেন্ট খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্লিংকার, চুনাপাথর, স্ল্যাগ, ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসামের মতো আমদানি করা কাঁচামাল পরিবহনে নির্মাতারা নৌপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারা দেশে সিমেন্টও পরিবহন করা হয়।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সিমেন্ট কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, বাড়তি চার্জের ফলে প্রতি বস্তা সিমেন্ট উৎপাদন ব্যয় ৩ টাকার বেশি বেড়ে যাবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, নির্মাণকাজে মন্দার কারণে শিল্পখাতটি কঠিন সময় পার করছে।

‘চাহিদা নেই বললেই চলে। বাজার স্থবির হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় খাতটি আরও চাপে পড়েছে। এই অবস্থায় নৌপরিবহন-সংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যয় বৃদ্ধি সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে,’ আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম হিসাব করে দেখিয়েছেন, নৌপথে গম, ডাল, সয়াবিন ও ভুট্টার মতো পণ্য পরিবহনের খরচ প্রতি টনে ৩৬ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের প্রায় ৯০ শতাংশই হয় নৌপথে।

‘বন্দরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের পর আমরা লাইটার জাহাজে করে বরিশাল, আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে পণ্য পাঠাই। ফলে এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করলেও তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের উপরে রয়েছে এবং তা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

কার্গো অপারেটররা জানান, বেশ কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এখন নিজেদের জাহাজ ব্যবহার করে বন্দর থেকে কারখানায় ও বিতরণকেন্দ্রে পণ্য পরিবহন করছে। ফলে তাদের ব্যবসা কমে গেছে।

বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আইনবিষয়ক সম্পাদক কাজী আবদুল করিম বলেন, অপারেটররা বাড়তি ব্যয় পুরোপুরি গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবেন না।

বাংলাদেশ অয়েল ট্যাংকার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কমিটির এক সাবেক সদস্য বলেন, চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন তেলবাহী ট্যাংকার মালিকদের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

‘আগের তুলনায় আমরা এখন প্রায় ৪৫ শতাংশ কম পেট্রোলিয়াম পরিবহন করছি,’ বলেন তিনি।