27 C
Dhaka
Home Blog

আইফোন ডুয়ো: অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল স্মার্টফোনটিতে কী আছে

প্রযুক্তিপ্রেমীদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে উন্মোচিত হয়েছে অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল স্মার্টফোন আইফোন ডুয়ো।

বুধবার রাতে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী (সিইও) হিসেবে প্রথমবারের মতো পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেন জন টার্নাস।

ক্যালিফোর্নিয়ার কুপারটিনোতে অ্যাপল সদর দপ্তরের স্টিভ জবস থিয়েটার থেকে সরাসরি সম্প্রচারকৃত অনুষ্ঠানে টার্নাস বলেন, ‘অন্যরা এমন ফোল্ডেবল ফোন তৈরি করেছে, যেগুলো পাশাপাশি জোড়া লাগানো দুটি ফোনের মতোই অস্বস্তিকর মনে হয়।’

‘বড় ডিসপ্লের এমন একটি ডিভাইস তৈরি করাই অ্যাপলের লক্ষ্য, যা ব্যবহারকারীদের আইপ্যাডের মতোই স্বাভাবিক ও সহজাত অনুভূতি দেবে,’ যোগ করেন তিনি।

আইফোন ডুয়ো দেখতে অনেকটা পাসপোর্টের মতো, প্রান্তগুলো গোলাকার। ভাঁজ খুললে ফোনটি ৭ দশমিক ৬ ইঞ্চির (১৯ সেন্টিমিটার) বড় ও চওড়া স্ক্রিনে রূপ নেবে। অ্যাপলের দাবি, পুরোপুরি খোলা অবস্থায় এটিই তাদের সবচেয়ে পাতলা আইফোন।

বিদ্যমান ফোল্ডেবল ফোনগুলোর সমালোচনা করে টার্নাস বলেন, এগুলো অনেকটা অস্বস্তিকর এবং স্ক্রল করা বা ভিডিও দেখার মতো সাধারণ কাজের জন্যও খুব একটা উপযোগী নয়। 

তার দাবি, পকেটে রাখা যায়—এমন একটি ডিভাইসে আইপ্যাডের মতো অভিজ্ঞতা দিতেই আইফোন ডুয়ো তৈরি করা হয়েছে। এ জন্য এতে বিশেষভাবে তৈরি হিঞ্জ, একই অনুপাতের দুটি পর্দা এবং নতুন টাইটানিয়ামের বডি ব্যবহার করা হয়েছে।

টার্নাস বলেন, ‘এটি একেবারেই নতুন, আবার একই সঙ্গে বেশ পরিচিত। আকারে এটি আপনার পাসপোর্টের কাছাকাছি। হাতে ধরতে পরিচিত লাগে এবং এক হাতেও আরামে ব্যবহার করা যায়।’

অ্যাপল জানিয়েছে, আইফোন ডুয়ো-তে রয়েছে ‘এ২০ প্রো চিপ’। ২ ন্যানোমিটারের এই প্রসেসরে রয়েছে ৬ কোরের সিপিইউ, ৭ কোরের জিপিইউ এবং দুটি ১৬ কোরের নিউরাল ইঞ্জিন। অ্যাপলের দাবি, বিশেষভাবে তৈরি ভ্যাপার-চেম্বার কুলিং ব্যবস্থার কারণে আইফোন ডুয়ো দীর্ঘ সময় ধরে আইফোন ১৭ প্রোর তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ বেশি গতিতে কাজ করতে পারবে।

এতে অ্যাপলের তৈরি নতুন সি২ সেলুলার মডেম চিপও ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়্যারলেস ডেটা সংযোগের জন্য কোয়ালকমের চিপের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই মডেম তৈরি করেছে অ্যাপল।

ফোল্ডেবল নকশার কারণে আইওএস ২৭-এ আইফোন ডুয়োতে নতুন কিছু মাল্টিটাস্কিং সুবিধাও থাকছে। ‘স্প্লিট ভিউ’ ব্যবহার করে পাশাপাশি দুটি অ্যাপ চালানো যাবে। একই অ্যাপের দুটি উইন্ডোও একসঙ্গে খোলা যাবে। নিয়মিত ব্যবহৃত দুটি অ্যাপকে জোড়া হিসেবে সংরক্ষণ করা যাবে। পাশাপাশি অন্য একটি অ্যাপ চালু রেখেই এআই সিরির সঙ্গে কথা বলা যাবে। 

অ্যাপল জানিয়েছে, নেটফ্লিক্স, জুম ও স্ল্যাকের মতো অ্যাপগুলো ইতিমধ্যে বড় ফোল্ডেবল স্ক্রিনের জন্য নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে।

ফোনটিতে থাকছে ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন মেইন ক্যামেরা। এতে ২x অপটিক্যাল-মানের টেলিফটো সুবিধা এবং ৪৮ মেগাপিক্সেলের আল্ট্রা-ওয়াইড ক্যামেরাও রয়েছে। পেছনের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার সময় বাইরের স্ক্রিনে ছবির প্রিভিউ দেখা যাবে। 

‘ডুয়ো প্রিভিউ’ সুবিধার মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে থাকা ব্যক্তিরাও ছবিতে নিজেদের অবস্থান সরাসরি দেখতে পারবেন। ফোনটিতে ডলবি ভিশনে সর্বোচ্চ ১২০ ফ্রেম প্রতি সেকেন্ডে ‘৪কে’ ভিডিও ধারণ করা যাবে।

আইফোন ডুয়োতে দুই পাশে দুটি ব্যাটারি রাখা হয়েছে। অ্যাপলের দাবি, ভেতরের স্ক্রিন ব্যবহার করে একটানা ৩১ ঘণ্টা পর্যন্ত ভিডিও দেখা যাবে। শুধু বাইরের স্ক্রিন ব্যবহার করলে এই সময় ৪৪ ঘণ্টা পর্যন্ত হবে। দুই স্ক্রিন সমানভাবে ব্যবহার করলে স্বাভাবিক ব্যবহারে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা ব্যাটারি ব্যাকআপ পাওয়া যাবে। তারযুক্ত চার্জিংয়ে প্রায় ২০ মিনিটে ব্যাটারি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করা যাবে।

বিশ্বজুড়ে ফোনটিতে শুধু ই-সিম ব্যবহারের সুবিধা থাকবে, অর্থাৎ এতে প্রচলিত ফিজিক্যাল সিম কার্ড ব্যবহার করা যাবে না। সংযোগের জন্য থাকছে অ্যাপলের এন১ নেটওয়ার্কিং চিপ, যা ওয়াই-ফাই ৭, ব্লুটুথ ৬ ও থ্রেড সমর্থন করবে। 

আইফোন ডুয়ো পাওয়া যাবে ‘স্টার হোয়াইট’ ও ‘নাইট স্কাই’—এই দুই রঙে। স্টোরেজের ক্ষেত্রে ২৫৬ জিবি, ৫১২ জিবি, ১ টেরাবাইট ও ২ টেরাবাইটের সংস্করণ থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রে ফোনটির দাম শুরু হবে ১ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে।

১৬ অক্টোবর থেকে আইফোন ডুয়োর প্রি-অর্ডার নেওয়া শুরু হবে। ২৩ অক্টোবর থেকে ৭০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে ফোনটি বাজারে পাওয়া যাবে। অ্যাপল জানিয়েছে, ডিভাইসটিতে অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে থাকবে আইওএস ২৭.১।

টার্নাস আইফোনকে ব্যক্তিগত এআই ব্যবহারের একটি কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

অ্যাপলের সিইও বলেন, ‘আপনার তথ্য যখন আর আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখন আস্থারও একটা সীমা থাকে।’ এ কারণেই যতটা সম্ভব অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স সরাসরি ডিভাইসেই কাজ করে বলে জানান তিনি।

অ্যাপলের এআই পণ্য বিভাগের দায়িত্বে থাকা লিলিয়ান রিনকন নতুন সিরির বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাজারে আসার সময়ই নতুন সিরি ৩ লাখ অ্যাপের সঙ্গে কাজ করতে পারবে। 

চলতি বছরের শুরুতে গুগল থেকে অ্যাপলে যোগ দেন রিনকন।

এর আগে অনুষ্ঠানে শুরুতে আইফোন ১৮ সিরিজের প্রো ও প্রো ম্যাক্স মডেল উন্মোচন করেন টার্নাস।

২০০৭ সালে প্রথম আইফোন বাজারে আসার পর থেকে প্রতিবছরই নতুন সংস্করণ উন্মোচন করেছে অ্যাপল। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে এল বহুল প্রতীক্ষিত আইফোন ১৮ সিরিজ।

তিনটি ফোনেই অ্যাপলের সবচেয়ে আধুনিক ‘এ২০ প্রো’ চিপ ব্যবহৃত হয়েছে। অ্যাপল জানিয়েছে, নতুন এই চিপের কারণে উন্নত এআই মডেল সরাসরি আইফোনে চালানো আরও সহজ হবে।

আইফোন ১৮ সিরিজের প্রো ও প্রো ম্যাক্স মডেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (সিরি) ও ব্যাটারিতেও করা হয়েছে ব্যাপক উন্নতি।

আইফোন ১৮ প্রোর দাম শুরু হচ্ছে ১ হাজার ১৯৯ ডলার থেকে, আর ১৮ প্রো ম্যাক্সের দাম ১ হাজার ২৯৯ ডলার থেকে। আগের প্রজন্মের ১৭ প্রো ও ১৭ প্রো ম্যাক্সের তুলনায় দুটি মডেলেরই প্রারম্ভিক দাম ১০০ ডলার বেশি।

এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যে এ ধরনের ছবি শনাক্তে নতুন প্রযুক্তিও এনেছে অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটি ‘অ্যাপল রেফারেন্স ইমেজ’ নামে একটি নতুন মানদণ্ড চালু করেছে। 

এর মাধ্যমে আইফোন ১৮ প্রোর ক্যামেরায় তোলা ছবির সত্যতা যাচাই করা যাবে। তবে সুবিধাটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনে পাওয়া যাবে না। পাশাপাশি এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবি শনাক্তে ‘সিন্থআইডি’ নামের নতুন মানদণ্ডও চলবে অ্যাপলে। 

অ্যাপল নতুন সংস্করণের এয়ারপডস ৫ উন্মোচন করেছে। এর দাম শুরু হবে ১২৯ ডলার থেকে। তুলনামূলক কম দামের এই মডেলেই প্রথমবারের মতো নয়েজ ক্যানসেলেশন সুবিধা থাকছে। 

১৪৯ ডলারের আরেকটি সংস্করণে থাকবে ওয়্যারলেস চার্জিং ও স্টেমে থাকা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভলিউম বাড়ানো-কমানোর সুবিধা। স্টেমে আঙুল ওপর-নিচ করেই ভলিউম পরিবর্তন করা যাবে।

অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১২ ও অ্যাপল ওয়াচ আলট্রা ৪ উন্মোচন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন দুই ঘড়িতেই স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে বড় ধরনের উন্নতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। 

নতুন সেন্সর ব্যবস্থা আগের চেয়ে ঘন ঘন হৃদস্পন্দন পরিমাপ করবে। এর মাধ্যমে শরীরের পুনরুদ্ধার ও ফিটনেসের অবস্থা বোঝার নতুন সুবিধাও যুক্ত হয়েছে। 

অ্যাপলের দাবি, নতুন অ্যাপল সিলিকন ও উন্নত সেন্সরের সাহায্যে এসব ঘড়িতে পরিধানযোগ্য ডিভাইসের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভুল হৃদস্পন্দন পরিমাপের সুবিধা পাওয়া যাবে।

গত অর্থবছরে আইফোন থেকে অ্যাপলের আয় হয়েছে ২০৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা কোম্পানিটির মোট বিক্রির অর্ধেকেরও বেশি।

বাজার বিশ্লেষক পাওলো পেসকাতোর রয়টার্সকে বলেন, ‘অ্যাপল নতুন একটি প্রিমিয়াম পণ্যের বাজার তৈরি করেছে, আয়ের নতুন পথ খুলেছে এবং আইফোন ব্যবসায় নতুন গতি এনেছে।’

তবে পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠান চলাকালে ১ শতাংশ ও অনুষ্ঠান শেষে অ্যাপলের শেয়ারের দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়।

এর আগে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশনের (আইডিসি) পূর্বাভাস করেছিল, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি আইফোনের ফোল্ডেবল স্মার্টফোন বিক্রি হতে পারে। এ থেকে অ্যাপলের আয় হতে পারে ৪৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

আইডিসির গবেষণা পরিচালক নাবিলা পোপাল ম্যাশেবলকে বলেন, ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে অ্যাপলের প্রবেশ কেবল এই খাতের প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনবে না, বরং পুরো বাজারের গতিপথই বদলে দিতে পারে।

আইডিসির হিসাবে, অ্যাপল ফোল্ডেবল ফোনের বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করতে পারে। একইসঙ্গে এই ফোন বিক্রি থেকে তৈরি হওয়া মোট বাজারমূল্যের অর্ধেকেরও বেশি অ্যাপলের দখলে যেতে পারে।

অ্যাপলের নতুন ফোনটি বাজারে আসার পর দীর্ঘদিন ধরে ফোল্ড ফোনের বাজারে নেতৃত্ব দেওয়া স্যামসাং ও হুয়াওয়ের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামবে।
 

আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী লিডসের ব্যাংকআল্টিমাস নিয়ে টানাপোড়েন

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার মিজানুর রহমানকে লিডস করপোরেশনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ফোন করে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাবেক প্রধান হিসেবে মিজানুর রহমান লিডসের কার্যক্রম ও পণ্য সম্পর্কে আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও আইনি পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার পরও তিনি মার্চের শুরুতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন।

বাংলাদেশে গত দুই দশকে ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত। লিডস করপোরেশন এ খাতে কাজ করে আসছে। ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গ্রাহকের হিসাব ও আর্থিক তথ্য সংরক্ষণ, বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ ধরনের ব্যবস্থা তৈরি ও পরিচালনার জন্য কারিগরি দক্ষতা, ব্যবস্থা বিন্যাসের জ্ঞান এবং অর্থের প্রয়োজন হয়।

১৯৯২ সালে বাংলাদেশে এনসিআর করপোরেশনের কার্যক্রম থেকে যন্ত্রপাতি কেনার পর লিডস করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৯ সালে কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরির কার্যক্রমে প্রবেশ করে। লিডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আবদুল ওয়াহিদের বক্তব্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন ব্যাংকে এনসিআরের এটিএম কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকার মাধ্যমে ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে লিডসের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। পরে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেয়।

লিডসের আর্থিক সংকট প্রকাশ্যে আসার আগে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩০০ কর্মী কাজ করতেন, যাদের অর্ধেক ছিলেন কারিগরি বিভাগের। কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের শেষ দিক থেকে নিয়মিত বেতন প্রদানে সমস্যা শুরু হয়। সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা এস এম সাইফুর রহমান জানান, ওই সময় কর্মীদের বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়লেও পরিচালনা পর্ষদ ও মালিকপক্ষ এটিকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল।

এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতের আদেশে লিডসের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাংকআল্টিমাস নিলামে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর পেছনে ছিল খান আখতার আলমের পাওনা পরিশোধসংক্রান্ত মামলা। ওই সময় পাওনার পরিমাণ প্রায় ৮৩ কোটি টাকা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ব্যাংকআল্টিমাস লিডসের প্রধান পণ্য হওয়ায় নিলামের উদ্যোগে কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সাইফুর রহমান জানান, দুই দশকের বেশি সময় লিডসে কাজ করার পর প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যাওয়ার সময় তার পাওনা এক কোটি টাকার বেশি ছিল।

খান আখতার আলমের সঙ্গে লিডসের বিরোধের সূত্র ১৯৮১ সালের একটি মামলা। আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, খান আখতার আলম তখন এনসিআর করপোরেশনের কর্মী ছিলেন এবং বিক্রয় কমিশন পাওয়ার দাবি নিয়ে ওই মামলা করেন। তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত পাওনা কমিশন বাবদ ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। ১৯৮৬ সালে মামলাটি খারিজ হলে তিনি ১৯৮৭ সালে আপিল করেন। এ সময় এনসিআর ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় এবং তাদের যন্ত্রপাতি থেকে লিডস করপোরেশনের যাত্রা শুরু হয়।

লিডসের আইনজীবীদের বক্তব্য ছিল, প্রতিষ্ঠানটি এনসিআর করপোরেশনকে অধিগ্রহণ বা একীভূত করেনি। বরং এনসিআরের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির দায় লিডস গ্রহণ করেনি। তবে ১৯৯৯ সালে খান আখতার আলম মামলার নথিতে লিডস করপোরেশন ও এনসিআরের তৎকালীন আঞ্চলিক ব্যবস্থাপককে পক্ষভুক্ত করেন। বিষয়টি ২০১০ সালে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে বিবেচিত হয়।

২০১০ সালে আদালত খান আখতার আলমের পাওনা নির্ধারণের জন্য নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দেন। এনএল রায় অ্যান্ড কোম্পানিকে এ কাজের জন্য নিয়োগ করা হয়। একই বছর সম্পন্ন নিরীক্ষায় সুদসহ খান আখতার আলমের পাওনা ৭ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়। ২০১৮ সালে সেই পাওনা প্রায় ৫৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায় এবং ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালত লিডসকে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়।

লিডসের কর্মীদের অভিযোগ, ২০১৮ সালে আদালতের ওই নির্দেশের বিষয়টি তাদের জানানো হয়নি। একই সময় থেকেই বেতন প্রদানে অনিয়ম শুরু হয়। সাবেক কর্মী আরিফুর আমরান চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে অনেক সময় তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকত। ২০২৩ সালের শুরুতে তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ার সময় তার পাওনা ১৭ লাখ টাকার বেশি ছিল বলে জানান।

সাইফুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, লিডসের কর্মীদের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ২ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করত। কর্মীদের পাওনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগ থেকে মালিকদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যবহারের কথা জানানো হতো বলে তিনি দাবি করেন।

প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার দায়িত্ব নেওয়ার পর মিজানুর রহমানও অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব জব্দের আগে লিডস মাসে প্রায় ৪ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পেত। বিপরীতে কর্মীদের বেতন বাবদ ব্যয় ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। তার দাবি, নথিতে অর্থের উপস্থিতি থাকলেও সেই অর্থ পাওয়া যাচ্ছিল না এবং অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

এই অভিযোগের বিষয়ে লিডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আবদুল ওয়াহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কর্মীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা হবে বলে জানান। পরে তিনি মিজানুর রহমানকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা কর্মীদের ই-মেইলে জানান এবং কর্মীদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান।

মিজানুর রহমান অবশ্য দাবি করেন, লিডসের আর্থিক ও আইনি সমস্যার পেছনে মালিকপক্ষের সিদ্ধান্ত ছিল এবং পরিস্থিতি সমাধানের বাইরে চলে গিয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্য নথিতে অর্থ সরিয়ে নেওয়া বা অর্থের অপব্যবহারের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ব্যাংকআল্টিমাস ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলোর জন্যও পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কারিগরি কর্মী কমে গেলে রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন সেবা যুক্ত করা এবং সফটওয়্যার হালনাগাদে সমস্যা তৈরি হতে পারে। লিডসের অধিকাংশ কারিগরি কর্মী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলো নিয়ে উদ্বেগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ব্যাংকআল্টিমাস ব্যবহারকারী উত্তরা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, সফটওয়্যার সেবায় হঠাৎ কোনো সমস্যা হলে এর প্রভাব ব্যাংকের কার্যক্রমে পড়তে পারে। তার মতে, একটি কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিবর্তন করা দ্রুত সম্পন্ন করার মতো বিষয় নয় এবং এর প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাহ উল হক জানান, সফটওয়্যার-সংক্রান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি নির্দেশনা রয়েছে। কোনো সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর সংখ্যা কমে গেলেই ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে না বলে তিনি জানান। তবে নতুন পণ্য চালু বা সফটওয়্যার হালনাগাদে বিলম্ব হতে পারে বলে উল্লেখ করেন।

লিডস করপোরেশনের ঘটনাপ্রবাহে তাই একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট কীভাবে তার কর্মী, মালিকানা, আদালতের মামলা এবং ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তার একটি চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৮ সাল থেকে বেতন অনিয়ম, কর্মীদের পাওনা, পুরোনো দেওয়ানি মামলা, অর্থ পরিশোধের আদেশ এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকআল্টিমাস নিলামে ওঠার ঘটনা একই ধারাবাহিকতায় সামনে এসেছে।

তবে এসব ঘটনার পাশাপাশি আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং লিডসের বর্তমান মালিকানা ও পরিচালন কাঠামোর বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাংকআল্টিমাস ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলোর জন্য সফটওয়্যারটির মালিকানা, রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি কর্মী এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য থাকা প্রয়োজন।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ল, চাপ কমবে তো?

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন বাড়িয়ে নতুন জাতীয় বেতন-কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। নতুন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কের খুব বেশি অবকাশ নেই। দীর্ঘদিন ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে; খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ মানুষের আয়কে ক্রমেই চাপে ফেলেছে। ফলে বহু বছর পর বেতন-কাঠামো পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে হতে পারে।

কিন্তু বেতন বাড়ানোর হিসাবটি শুধু কত শতাংশ বেতন বাড়ল, সেখানে শেষ হয় না। আসল হিসাব হলো, সেই বাড়তি আয়ে আগের তুলনায় কতটা বেশি পণ্য ও সেবা কেনা যাবে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা বলা হয়। শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার জন্য সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, জুলাই ২০২৬-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। জুনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার কমেছে, এটি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পণ্যের দাম আগের জায়গায় ফিরে এসেছে। দাম বৃদ্ধির গতি কেবল কিছুটা কমেছে, দাম কমেনি।

এই পার্থক্যটি সাধারণ মানুষের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পণ্যের দাম এক বছরে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির পরের বছর সেই পণ্যের দাম আরও ৮ শতাংশ বাড়লে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলা যাবে, কিন্তু ক্রেতার খরচ কমবে না। তার পরিবর্তে আগের বাড়তি দামের ওপর আরও নতুন ব্যয় যুক্ত হবে। ফলে কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব মানুষের সংসার চালানোর সক্ষমতার ওপর জমতে থাকে।

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন-কাঠামোর একটি উদ্দেশ্য তাদের আয়কে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। কিন্তু একই যুক্তি বেসরকারি খাতের কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দেশের কর্মজীবী মানুষের বড় একটি অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাদের অনেকেরই জাতীয় বেতন-কাঠামোর মতো কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নেই। বেতন বৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বেসরকারি চাকরিজীবীদের অবস্থা কঠিন। তাদের আয়ের ওপর নির্ভর করে বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত, খাবার ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়। একইসঙ্গে তাদের অনেককে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাকরির অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে হয়।

এখানে বেতন বৃদ্ধির একটি সহজ হিসাব করা যায়। কারো বেতন বছরে ৫ শতাংশ বাড়ল, কিন্তু একই সময়ে তার পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের গড় বৃদ্ধি যদি তারচেয়ে বেশি হয়, তাহলে কাগজে বেতন বাড়লেও বাস্তবে তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে না। এর বিপরীতে আগের জীবনযাত্রা ধরে রাখতেই তাকে সঞ্চয় কমাতে, ঋণ নিতে বা অতিরিক্ত কাজ করতে হতে পারে।

সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন-কাঠামো অন্তত একটি কাঠামোবদ্ধ সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করছে। বেসরকারি খাতে এমন ব্যবস্থা না থাকায় মূল্যস্ফীতি বাড়লে কর্মীদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি। ফলে শুধু বার্ষিক ৫ বা ৭ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।

এর সঙ্গে নতুন বেতন-কাঠামোর আরেকটি অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। সেটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। মানুষের হাতে বেশি অর্থ গেলে বাজারে চাহিদা বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসতে পারে। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ যদি সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে কিছু পণ্য ও সেবার দাম আরও বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

এ কারণেই বেতন বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি কর্মীদের আয় বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই আয় বৃদ্ধির ফলে বাজারে অতিরিক্ত মূল্যচাপ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও নজরে রাখতে হবে। অর্থনীতিবিদদের একাংশও নতুন বেতন-কাঠামোর ফলে সরকারি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপের কথা বলেছেন।

আরও বড় বিষয় হলো, বাড়তি বাজার-চাহিদার সুফল তখনই সবার কাছে পৌঁছাবে, যখন উৎপাদন বাড়বে এবং সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন, বাসস্থানসহ প্রয়োজনীয় খাতে সরবরাহে সমস্যা থাকলে বাড়তি আয় সহজেই বাড়তি দামে পরিণত হতে পারে। তখন সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন বৃদ্ধির কিছুটা সুবিধা পেলেও নির্দিষ্ট আয়ের অন্য মানুষ আরও চাপে পড়তে পারেন।

এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি কার্যকর নীতিগত কাঠামো নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। সরকার সরাসরি প্রতিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন নির্ধারণ করে দিতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও ব্যবসার ধরন ভিন্ন। কিন্তু মূল্যস্ফীতি একটি নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে বেতন পুনর্বিবেচনা, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন সমন্বয় এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীদের সুরক্ষার মতো বিষয় নিয়ে একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।

শুধু মাসিক বেতন বাড়লেই জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা আসে না। এমন উদ্যোগের সঙ্গে শ্রমিকের অন্যান্য অধিকারও যুক্ত হওয়া দরকার। নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও চাকরির নিরাপত্তা একজন মানুষের প্রকৃত আর্থিক নিরাপত্তার অংশ।

সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বেতন বৃদ্ধি ঘুষের বৈধ কারণ হতে পারে না। একজন সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব আইন মেনে সেবা দেওয়া। একইসঙ্গে ঘুষের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ে। সরকারি সেবায় অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে সেটিও এক ধরনের মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করে। তাই বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সাফল্য শুধু নতুন বেতন-কাঠামোর সংখ্যায় মাপা উচিত নয়। মাপতে হবে একজন কর্মী মাস শেষে তার আয় দিয়ে আগের তুলনায় কতটা স্বস্তিতে সংসার চালাতে পারছেন, সেটি দিয়ে।

সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ানো প্রয়োজন ছিল, হয়েছে। এখন বড় কাজ হলো মূল্যস্ফীতিকে এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, যাতে সেই বাড়তি আয় বাজারের বাড়তি দামে হারিয়ে না যায়। একইসঙ্গে বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার পথও তৈরি করতে হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে বেতন কত শতাংশ বাড়ল, তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মাসের শেষে সেই বেতনে কতটা জীবন চালানো গেল।

 

মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও যোগাযোগ পেশাজীবী।
[email protected]

আগামী সংসদ অধিবেশনে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: আইনমন্ত্রী

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পর্যাপ্ত সময় আছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ১২৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের হাতে সময় আছে। সুতরাং বিশেষ অধিবেশন ডাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। যেহেতু ১৫ জুলাই থেকে ৬০ দিনের মধ্যে আমাদের পরবর্তী অধিবেশন হওয়ার কথা, আশা করি সেই অধিবেশনেই এটা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।’

আজ শনিবার রাজধানী ঢাকায় একটি অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

আইনমন্ত্রী আরও জানান, মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনের খসড়া অনুমোদনের জন্য আগামী মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে তোলা হবে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এটি সংসদে যাবে।

এর আগে অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইন সংক্রান্ত আইনের বিষয়ে ভুল ব্যাখ্যা গেছে—যে আমরা এই দুইটা আইন পাস করব না বলে পার্লামেন্টে উঠাইনি।’

‘মানবাধিকার কমিশন আইন সংক্রান্ত যে বিলটা আমরা নিয়ে এসেছি ১৩৩টি অর্ডিন্যান্সের মধ্যে, সেখানে আমরা বলেছি অধিকতর যাচাই-বাছাই করে নিয়ে আসব। আমরা গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইন নেইনি। এটার ক্ষেত্রেও আমরা পাবলিক স্টেটমেন্ট করেছি, অধিকতর যাচাই-বাছাই করে নিয়ে আসব,’ বলেন তিনি।

আইনমন্ত্রী জানান, খসড়া চূড়ান্ত করতে সিভিল সোসাইটি, ল’ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি ও উন্নয়ন সহযোগীদের আলোচনা হয়েছে। এছাড়া ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে আসা মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

‘সুপারিশগুলো যতটা সম্ভব আমরা অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছি এবং আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতেও এটা যাচাই-বাছাই করার অনেক সুযোগ রয়েছে,’ বলেন তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলতে পারি গত কয়েক মাসের সরকারে বিচার বহির্ভূত হত্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। গুমের একটা অভিযোগ যখন এসেছে, আমরা এটাকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি এবং আমি ইন্টারনালি বলেছি এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখানোর জন্য। খুব স্বচ্ছভাবে তদন্ত হওয়া দরকার এবং সেই সঙ্গে পরিবারগুলোর পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য যেটা করার, আমরা করেছি।’

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন—সরকার অনুধাবন করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাথায় রাখতে হচ্ছে, যে বিচারকটি মোমবাতি জ্বেলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাতের বেলায় সাজা দিয়ে গেছেন, তাদের বিচার আমরা করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের সচিবালয়—ফ্যাসিস্টদের আরেকটা আস্তানা, সেই আস্তানার দিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। আমার দেশের প্রধান বিচারপতির বাসভবন যখন আক্রান্ত হয়, একজন আইনজীবী, একজন নাগরিক, একজন মানুষ হিসেবে একদিকে যেমন হৃদয় রক্তক্ষরণ হয়, ঠিক একইভাবে আমাকে চিন্তা করতে হয়, কেন প্রধান বিচার বাসভবনে আক্রান্ত হলো? সে চিন্তা আমাদের মাথায় রাখতে হয়।’

গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে অধস্তন আদালতের প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিচারককে বদলি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে বিচার বিভাগের সরে আসতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘এই ১ হাজার ৪০০ বিচারকের মধ্যে যারা মোমবাতি জ্বেলে গণতন্ত্রকামী মানুষকে সাজা দিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ প্রাইজ পোস্টিং পেয়েছিলেন। আমরা যখন সেগুলো ঠিক করতে গেছি, ৭০ শতাংশ অনুমোদন দেওয়া হয়নি সুপ্রিম কোর্ট থেকে। এ রকম একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ যাচ্ছে।’

‘যদি মনে করেন সরকার নিয়ন্ত্রণ করে, আমি বিনয়ের সঙ্গে বলবো এটা সরকারের বিষয় না। সরকার যখন পার্টি ক্যাডারকে বসিয়ে দেয় এবং এই জজ সাহেব যখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে না পারেন, তখনই বিচার বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়ে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যদি নিয়োগ হয়, ভালো জজ যদি নিয়োগ হয়, ব্যক্তি যদি ভালো হয়, তাহলেই কেবল একটি স্বাধীন-স্বচ্ছ প্রত্যাশিত বিচার বিভাগ পাবেন। অন্যথায় এ ধরনের বিচার বিভাগের স্বপ্ন শুধু কাগজে কলমে রাখলে পাওয়া সম্ভব না,’ যোগ করেন তিনি।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমার দেশের সুপ্রিম কোর্ট কাগজে কলমে থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বলয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান, চাকরির সুবিধা পাওয়া প্রতিষ্ঠান, বদলি হওয়ার কোন চান্স নাই, রিমুভ করার কোনো সুযোগ নাই। সেই সুপ্রিম কোর্ট বিগত ১৬-১৭ বছর সঠিকভাবে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।’

সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দায়ের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহার করা হবে না এবং মাদক মামলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে বলেও জানান তিনি।

আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারকে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলছি। আমাদের সংগ্রাম যেমন একদিকে মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, ঠিক একইসঙ্গে এক্সটেনডেড সংগ্রাম, যখন মানবাধিকারের কথা বলতে যাই, তখন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের পাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় আধিপত্যবাদী শক্তি।’

‘খোলামেলা কেউ কেউ বলছেন ভারতীয় আধিপত্যবাদ, আমরা আধিপত্যবাদী শক্তি বলছি। আমাদের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হচ্ছে, মাঠ থেকে আমাদের নৈরাজ্যবাদ বা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হচ্ছে, আমাদের মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হচ্ছে। আমরা এমন একটি সরকার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে কথা বলতে যেয়ে আধিপত্যবাদ, নৈরাজ্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদ আমাদেরকে মোকাবিলা করতে হয়,’ যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি চলতি বছরে হতে পারে ৩.৫ শতাংশ: আইএমএফ

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।

সম্প্রতি সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর শেষ করার পর আজ বৃহস্পতিবার আইএমএফের এক বিবৃতিতে এই পূর্বাভাসের কথা জানানো হয়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে।

আইএমএফের বিবৃতিতে বলা হয়, এই সফরে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করার এবং সরকারের সংস্কারের অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে আলোচনা করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ এখনো বড় ধরনের রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এই চাপ আরও বেড়েছে। এর ফলে আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বেড়েছে এবং ব্যাংকিং খাতের নানামুখী চাপের মধ্যেই নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।

গত সপ্তাহে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের সম্ভাবনার কথা জানায়।

আইএমএফ বলছে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাগুলো দূর করতে পারলে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে।

আইএমএফের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘গঠনমূলক আলোচনা’ করেছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।

এতে আরও বলা হয়, নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য রূপরেখা, ঋণের আকার ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে সামনের মাসগুলোতে আলোচনা চলবে।

‘প্রকৃতির একটা বিচার আছে’, যুক্তরাষ্ট্রকে বিদায় করে বললেন বেলজিয়ামের মিডফিল্ডার

যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়ামের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াই শুরুর আগেই সব মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিয়ম অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগান ছিলেন এই ম্যাচে নিষিদ্ধ। কিন্তু ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে সেটা প্রত্যাহার করে নিতে বলেন। এবং চরম বিতর্কের জন্ম দিয়ে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়েও যায়। মজার বিষয় হলো, সেই বালোগানকে নিয়ে নেমেও বেলজিয়ামের কাছে পাত্তা পায়নি স্বাগতিকরা। এটাকে প্রকৃতির বিচার বললেন বেলজিয়াম মিডফিল্ডার নিকোলাস রাসকিন।

সোমবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেয় বেলজিয়াম। আগের ম্যাচে লাল কার্ড দেখার পরও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার বালোগানকে খেলার অনুমতি দিয়েছিল ফিফা। রাসকিন মূলত ফিফার সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

রাউন্ড অফ ৩২-এর ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিরুদ্ধে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন বালোগান। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ম্যাচে তার ওপর স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা থাকার কথা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনোকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানান। এরপর ফিফা তাদের ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর ধারা ব্যবহার করে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে। ট্রাম্প নিজেই ইনফান্তিনোকে ফোন করার বিষয় নিশ্চিত করে বালোগানকে লাল কার্ড দেখানোর সমালোচনা করেন।

ফিফা প্রেসিডেন্ট অবশ্য দাবি করেন, তাদের বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করেছে। ট্রাম্পকে তিনি জানিয়েছিলেন যে বালোগানের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। পরে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি জানায়, এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।

ফিফার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশনও ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে বালোগানের খেলার যোগ্যতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিল, যদিও তাতে কাজ হয়নি।

তবে মাঠের লড়াইয়ে এই বিতর্ককে পাত্তাই দেয়নি বেলজিয়াম। স্বাগতিকদের ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে।

ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের রাসকিন বলেন, ‘আমি তো আগেই বলেছি, আমার মনে হয় জীবনে সব সময়ই কোথাও না কোথাও একটা বিচার থাকে। এই ধরনের ঘটনা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, আমরা মনে করি না যে এটি ন্যায্য ছিল।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আজকের দিনটি আমাদের জন্য কিছুটা ভাগ্যও বয়ে এনেছে। আমাদের ম্যাচটি জেতা দরকার ছিল এবং পুরো দল এই মানসিকতা নিয়েই মাঠে নেমেছিল।’

আগামী শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলেসে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে স্পেনের মুখোমুখি হবে বেলজিয়াম।

 

‘আমাদের পথিকৃৎ ছিলেন আতাউর রহমান’

অভিনেতা ও নির্দেশক আতাউর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন অভিনেতা তারিক আনাম খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যচর্চায় আতাউর রহমান ছিলেন একজন পথিকৃৎ ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ।

দীর্ঘদিন ধরে মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আসছেন তারিক আনাম খান। সদ্য প্রয়াত অভিনেতা-নির্দেশক আতাউর রহমানের সঙ্গে তার পরিচয় ও সখ্যতা ছিল বহুদিনের। খুব কাছ থেকে দেখেছেন এই নাট্যব্যক্তিত্বকে।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে তারিক আনাম খান বলেন, ‘একজন কমিটেড মানুষ ছিলেন আতাউর রহমান। সারাজীবন কমিটমেন্ট ধরে কাজ করে গেছেন। আমাদের পথিকৃৎ তিনি। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনে বড় দায়িত্ব পালন করেছেন। আধুনিক নাট্যচর্চা করেছেন।’

তিনি জানান, ১৯৬৮ সালে আতাউর রহমান ও জিয়া হায়দার মিলে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় গঠন করেন। স্বাধীনতার পর আরও অনেকে এই দলে যুক্ত হন। বাংলাদেশের নাট্যচর্চার শুরুর দিকেই আতাউর রহমান নাটক নির্দেশনা দিয়েছেন, অভিনয়ও করেছেন।

তারিক আনাম খান বলেন, ‘সম্ভবত ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে তার সঙ্গে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। সেটা আজীবন ছিল।’

আতাউর রহমানের ব্যক্তিগত স্বভাবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আতাউর রহমানের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টার সম্পর্ক ছিল। মজা করতেন। আড্ডা পছন্দ করতেন। আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন। আমার বাসায়, কখনো আতা ভাইয়ের বাসায় আড্ডা দিয়েছি। কখনো কখনো আলী যাকেরের বাসায়ও আড্ডা দিয়েছি।’

নাট্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সময় আতাউর রহমানের উৎসাহের কথাও স্মরণ করেন তারিক আনাম খান। তিনি বলেন, ‘আমি যখন নাট্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করি, সেই সময় আতাউর রহমান একবার এসেছিলেন। নতুন সদস্য নেওয়া হবে এবং বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। তিনি ভীষণ উৎসাহ দিয়েছিলেন সেই সময় আমাকে। যা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার নির্দেশনা নিয়েও তিনি প্রশংসা করেছেন এবং সমালোচনা লিখেছেন। এসব আমার জন্য ছিল বিশাল অনুপ্রেরণা।’

টেলিভিশন নাটকে একসঙ্গে কাজ করার স্মৃতিচারণ করে তারিক আনাম খান বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে টিভি নাটকে অভিনয় করেছি। “লাল মাটির কালো ধোঁয়া” নামে একটি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছিলাম আতা ভাই আর আমি। অনেক আগের কথা। নাটকটির নাট্যকার ছিলেন সেলিম আল দীন।’

তিনি জানান, পরে ‘গুলশান এভিনিউ’ নাটকেও আতাউর রহমান অভিনয় করেছিলেন।

‘কাজেই স্মৃতির শেষ নেই,’ বলেন তিনি।

আতাউর রহমানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তারিক আনাম খান বলেন, ‘তার চলে যাওয়ায় দুঃখ পেয়েছি। আসলে এভাবেই চলে যেতে হয়, জীবন এমনই। তবে তার উৎসাহ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে, তা মনে থাকবে সবসময়।’

ইরানের ডুবে যাওয়া যুদ্ধজাহাজ থেকে ৩২ নাবিককে উদ্ধার করল শ্রীলঙ্কা

ইরানের ফ্রিগেট শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা থেকে গুরুতর আহত ৩২ নাবিককে উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কা। 

গত বুধবার শ্রীলঙ্কার জলসীমার ঠিক বাইরে ওই যুদ্ধজাহাজটি ডুবে যায় বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ। 

আজ বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। 
কী কারণে ওই নৌযানটিতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং কেন এটি ডুবে যায়, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায়নি।

 

তবে শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে হেরাথ বলেন, আহতদের দ্বীপরাষ্ট্রটির দক্ষিণে অবস্থিত একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। 

১৮০ ক্রূর ফ্রিগেটটি ভোর বেলায় সহায়তা চেয়ে বার্তা পাঠায়। 

শ্রীলঙ্কার উপকূল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ডুবে যাই আইআরআইএস ডেনা। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাকি ক্রুদের খোঁজা হচ্ছে। 

এএফপিকে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এখনো খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছি। তবে বাকি ক্রুদের ভাগ্যে কি হয়েছে, সে ব্যাপারে আমাদের এখনো কোনো ধারণা নেই।’

হেরাথ জানান, উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর দুইটি নৌযান ও একটি উড়োজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে তিনি জাহাজডুবির কারণ জানাননি। 

বিরোধীদলের এক আইনপ্রণেতা পার্লামেন্টে মন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান হামলার কারণে ইরানের ওই যুদ্ধজাহাজটি আক্রান্ত হয়েছিল কী না। 

তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রশ্নের কোনো জবাব আসেনি। 

নৌবাহিনীর মুখপাত্র বিদ্ধিকা সামপাথ জানান, আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের ক্ষেত্রে কলম্বোর যে দায়বদ্ধতা আছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। 

ওই অভিযানে ইরানের ৩২ নাবিককে উদ্ধার করে রাজধানী কলম্বো থেকে ১১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গল শহরের সবচেয়ে বড় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। 

 

সামপাথ এএফপিকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা মেনে আমরা সাহায্যের ডাকে সাড়া দিয়েছি। ভারত মহাসাগরে এটা আমাদের খোঁজ ও উদ্ধার অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। 

শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী জানিয়েছে, তারা উদ্ধার অভিযানের ফুটেজ প্রকাশ করছে না, কারণ এতে অন্য একটি দেশের সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা আছে। 

ইরানের আহত সেনাদের নৌবাহিনীর সদস্যরা গলের হাসপাতালে নিয়ে আসে। এরপর পুলিশ ওই হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার করেছে। 

এর আগে হামলা চালিয়ে ইরানের নৌবাহিনীর নয়টি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

রোববার (১ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে করা এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ওই নয়টি জাহাজের মধ্যে ‘কয়েকটি বেশ বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ।’    

জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পুনর্গঠন করে গেজেট প্রকাশ

‘জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’ পুনর্গঠন করে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। জাতীয় পুরস্কার প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আসা প্রস্তাব যাচাই-বাছাই ও সুপারিশ করার জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

১০ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

অতিরিক্ত সচিব (কমিটি ও অর্থনৈতিক) মো. হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি বিষয়ক অধিশাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনটি গতকাল বুধবার রাতে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

পুনর্গঠিত এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

এ ছাড়া, সদস্য হিসেবে আরও রয়েছেন রেলপথ এবং নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও পদাধিকারবলে এই কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

কমিটিকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ স্বরাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বা সিনিয়র সচিবগণ থাকবেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।

প্রজ্ঞাপনে কমিটির জন্য তিনটি প্রধান কাজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে, জাতীয় পুরস্কার প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে পাওয়া প্রস্তাবসমূহ পরীক্ষা করা।
বিভিন্ন জাতীয় পুরস্কারের ক্রম নির্ধারণ এবং প্রয়োজনে পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ প্রদান। নতুন কোনো জাতীয় পুরস্কার প্রবর্তনের প্রস্তাব পরীক্ষা করা এবং সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করা।

এই কমিটি গঠনের ফলে গত ২ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে জারি করা আগের প্রজ্ঞাপনটি বাতিল বলে গণ্য হবে। প্রজ্ঞাপনটি অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে।

মোবাইল নেটওয়ার্কের মান নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্যে ধোঁয়াশা

জুলাই মাসে বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের মান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার বেঁধে দেওয়া মানদণ্ড পূরণ করেছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত অপর এক মূল্যায়নে মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া তথ্য এবং সংস্থাটির নিজস্ব যাচাইকৃত তথ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান পাওয়া গেছে।

মূল্যায়নের আওতায় ছিল দেশের চার মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটক।

তাদের দেওয়া সেবার মান (কোয়ালিটি অব সার্ভিস—কিউওএস) সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে বিটিআরসির সংগ্রহ করা নেটওয়ার্কের তথ্য তুলনা করা হয়েছে।

চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি ছিল বিটিআরসির প্রথম কিউওএস মূল্যায়ন।

এবারই প্রথম সংস্থাটি একইসঙ্গে জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল নেটওয়ার্কের কার্যকারিতার মূল্যায়ন করেছে।

তবে বিটিআরসি ও শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, এই মূল্যায়নে প্রচলিত ড্রাইভ টেস্টের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থার টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

নেটওয়ার্কের মান নির্ধারণ, তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি এবং কোন কোন অঞ্চল থেকে নমুনা হিসেবে কোন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে—এসব দিক বিচারে টিএমএসের তথ্য ও ড্রাইভ টেস্টের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

এই খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, টিএমএসের তথ্য সবসময় গ্রাহকদের অভিজ্ঞতার প্রকৃত চিত্র তুলে নাও ধরতে পারে। বিশেষ করে যখন অপারেটরদের নেটওয়ার্ক কভারেজ ও গ্রাহকসংখ্যায় পার্থক্য থাকে।

মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ অপারেটর জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড পূরণ করেছে।

তবে অপারেটরদের দেওয়া তথ্য ও বিটিআরসির পরিমাপের মধ্যে পার্থক্য, র ডেটার ঘাটতি ও বিভিন্ন এলাকায় নেটওয়ার্কের কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধান সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগের কারণ হয়েছে।

একমাত্র অপারেটর হিসেবে জুলাইয়ে ফোর-জি নেটওয়ার্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে টেলিটক।

টেলিটকের ফোর-জি রেডিও রিসোর্স কন্ট্রোল (আরআরসি) সফলতার হার ছিল ৯৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা নির্ধারিত ৯৯ শতাংশের চেয়ে কম।

ফোর-জি ডেটা নন-রিটেইনেবিলিটি হার ছিল শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ, যা অনুমোদিত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশি।

আরআরসি সফলতার হার দিয়ে কোনো ডিভাইস কতবার সফলভাবে ফোর-জি নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারে, তা পরিমাপ করা হয়। আর নন-রিটেইনেবিলিটি দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে ডেটা সংযোগ বিচ্ছিন্নের হার পরিমাপ করা হয়।

টেলিটকের মূল ডেটা (র ডেটা) বা বাইনারি ফাইল অসম্পূর্ণ থাকায় বিটিআরসি প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য যাচাই করতে পারেনি। জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের তথ্যের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বারবার ‘টেলিটকের অসম্পূর্ণ তথ্য/বাইনারি ফাইল’ উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকায় টেলিটকের পারফরম্যান্সেও বড় ধরনের ব্যবধান দেখা গেছে। ৬৪টি পরিমাপ করা উপজেলার মধ্যে মাত্র ১২টিতে এর ফোর-জি আরআরসি সফলতার হার নিয়ন্ত্রক সংস্থার মানদণ্ড পূরণ করেছে। উপজেলা পর্যায়ে ৫৩৭টি পরিমাপের মধ্যে মাত্র ১৩৬টি নির্ধারিত মান পূরণ করেছে।

এসব দুর্বলতা সত্ত্বেও টেলিটক ফোর-জি নেটওয়ার্কে গড়ে ১১ দশমিক ২০ এমবিপিএস ডাউনলোড স্পিড পেয়েছে বলে জানিয়েছে, যা সর্বনিম্ন প্রয়োজনীয় ৩ দশমিক ৫০ এমবিপিএসের তুলনায় অনেক বেশি।

টেলিটকের সিএসএফবি সফলতার হার ছিল ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ভয়েস কলের জন্য ফোর-জি ডিভাইসগুলো কতটুকু সাফল্যের সঙ্গে পুরোনো নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারে, তা এই মানদণ্ডের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়।

গ্রামীণফোন বিটিআরসির নির্ধারিত মানদণ্ডের মধ্যে ছিল। তবে মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া কিছু তথ্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিমাপের মধ্যে ব্যবধান পাওয়া গেছে।

বিটিআরসি গ্রামীণফোনের টু-জি কল ড্রপের হার শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ পেয়েছে, যা কোম্পানিটির দেওয়া তথ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। তাদের গড় ফোর-জি ডাউনলোড গতি ছিল ৮ দশমিক ২৩ এমবিপিএস, যেখানে অপারেটরটি ৮ দশমিক ২২ এমবিপিএস জানিয়েছিল।

ভিওএলটিই (ভয়েস ওভার লং-টার্ম ইভল্যুশন) কল ড্রপের হারে সবচেয়ে বেশি পার্থক্য পাওয়া গেছে। বিটিআরসির পরিমাপে এটি ছিল শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ, যেখানে গ্রামীণফোন জানিয়েছিল শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ। উভয় হারই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ সীমার নিচে ছিল।

গ্রামীণফোনের সিএসএফবি সফলতার হার ছিল ৯৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যা নির্ধারিত ৯৮ শতাংশের চেয়ে বেশি।

মূল্যায়নে কিছু উপজেলায়, বিশেষ করে বান্দরবান ও রাঙামাটিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও পাওয়া গেছে।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, ‘সেবার মান উন্নত করা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করতে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

‘গ্রামীণফোনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকা বাদে বাকি সব জায়গায় বিটিআরসির কিউওএসের সব মানদণ্ড পূরণ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নেটওয়ার্ক আরও উন্নত করার জন্য আমরা কাজ করছি’, যোগ করেন তিনি।

মূল্যায়নের সময় রবি তথ্য ও নেটওয়ার্কের মান নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়েছে।

বিটিআরসি রবির গড় ফোর-জি ডাউনলোড গতি ৬ দশমিক ৮৫ এমবিপিএস পরিমাপ করেছে। যেসব অপারেটরের তথ্য বিটিআরসি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পেরেছে, তাদের মধ্যে এটি ছিল সর্বনিম্ন। তবে এই গতিও সর্বনিম্ন নির্ধারিত ৩ দশমিক ৫০ এমবিপিএসের চেয়ে বেশি।

রবির টু-জি কল সেটআপ সফলতার হার ছিল ৯৯ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা ৯৯ শতাংশের মানদণ্ডের চেয়ে সামান্য বেশি। মূল্যায়নে বিভিন্ন এলাকায় রবির দেওয়া তথ্য ও বিটিআরসির পরিমাপের মধ্যেও পার্থক্য পাওয়া গেছে।

প্রয়োজনীয় মূল ডেটা বা বাইনারি ফাইল না থাকায় রবির ৪১ হাজার ৮১৯টি সেলের তথ্য বিটিআরসি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

অপারেটরগুলো সাধারণত এ ধরনের ফাইল মাত্র সাত দিন সংরক্ষণ করে। তাই বিটিআরসি রবির নিজস্ব বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, পরের মাস থেকে প্রতিদিন তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে।

রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম নেটওয়ার্কের মান মূল্যায়নে শুধু টিএমএসের তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, পরিমাপের সংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে। ফলে সীমিত নেটওয়ার্ক কাভারেজ বা ছোট ডেটাসেট থাকা অপারেটরগুলো বেশি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও বেশি ট্রাফিক এবং গ্রাহক থাকা অপারেটরগুলোর তুলনায় ভালো করছে বলে মনে হতে পারে।

তিনি দাবি করেন, নেটওয়ার্কের ব্যাপ্তি ও গ্রাহকের সংখ্যার মতো বিষয়গুলো ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। যার ফলে বড় নেটওয়ার্ক, বেশি গ্রাহক ও ট্রাফিকসমৃদ্ধ অপারেটরের তুলনায় সীমিত নেটওয়ার্ক কাভারেজ ও অপ্রতুল ডেটা সরবরাহকারী অপারেটরের ফল ভালো আসতে পারে।

‘শুধু টিএমএস থেকে পাওয়া কিউওএসের তথ্যের ভিত্তিতে অপারেটরদের মধ্যে তুলনা করলে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে’, যোগ করেন তিনি।

শাহেদ দাবি করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামগ্রিক কিউওএস নির্ধারণ বা তুলনার জন্য শুধু টিএমএসের তথ্য ব্যবহারের নজির নেই।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো কিউওএস মূল্যায়নের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে এর পদ্ধতি, পরিমাপের আওতা, নমুনা সংগ্রহ কাঠামো, স্বচ্ছতা এবং ব্যবহৃত তথ্য কতটুকু প্রতিনিধিত্বমূলক, সেটার ওপর।’

বাংলালিংকের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি ধারাবাহিকতা

বিটিআরসির পরিমাপ করা গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর মধ্যে বাংলালিংক সবচেয়ে ধারাবাহিক ফল পেয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলালিংকের টু-জি কল সেটআপ সফলতার হার ৯৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং গড় ফোর-জি ডাউনলোড স্পিড ৮ দশমিক ৬১ এমবিপিএস পরিমাপ করেছে।

তাদের টু-জি কল ড্রপের হার ছিল শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ, আর ফোর-জি আরআরসি সফলতার হার ছিল ৯৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সিএসএফবি সফলতার হার ছিল ৯৯ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং এসএমএস সম্পন্ন হওয়ার হার ছিল ৯৯ দশমিক ৮১ শতাংশ।

জাতীয় পর্যায়ে বাংলালিংকের দেওয়া তথ্য ও বিটিআরসির পরিমাপের তেমন ব্যবধান পাওয়া যায়নি।

তবে মূল্যায়নে দেখা গেছে, বান্দরবানের কয়েকটিসহ ছয়টি উপজেলায় টু-জি ও ফোর-জি—উভয় নেটওয়ার্কেই ‘নো সার্ভিস’ ছিল।

ইংরেজিতে মূল প্রতিবেদন পড়তে ক্লিক করুন এখানে।