গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক নানা চাপের সম্মুখীন হচ্ছে বিএনপি সরকার। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি, বাণিজ্য ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। মূল্যস্ফীতির পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। সেই সঙ্গে জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু তখনো বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ থাকবে।
বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান এমনি অনুন্নত আর তার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির যদি এই হার বজায় থাকে, তবে জীবনযাত্রার মান আরও নিচে নেমে যাবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের শ্রেণির ওপর চাপ বাড়বে। গত ৩ বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো দৈনন্দিন খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
সম্প্রতি নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সেবার ফি বাড়ানো হয়েছে। এতে নতুন করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে বাড়ছে বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং তা পরিশোধের চাপ। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার ৮২২ বিলিয়ন ডলার এবং আগামী বছরগুলোতে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের দায় বাড়বে।
এসবের মধ্যে নানা উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীরগতিতে হওয়ায় উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড়ও কমেছে, একইসঙ্গে কমেছে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি। এই অবস্থা বিদ্যমান থাকলে ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
বাণিজ্য খাতেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫৮টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতেও খরা বিরাজ করছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সংশ্লিষ্টরা এর কারণ হিসেবে বৈশ্বিক সংঘাত, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাকে দায়ী করেছেন। অথচ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস এই তৈরি পোশাক খাত। ফলে এ খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে বিপুল ঋণ পরিশোধের চাপের মধ্যে ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে বাংলাদেশকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এর পাশাপাশি সরকার তেল, গ্যাস ও সার কেনার জন্য ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের আইটিএফসি থেকে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেবে।
আবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে তিন বছর মেয়াদি ঋণের আবেদন করেছে বাংলাদেশ সরকার। কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে চাপের মুখে পড়লে আইএমএফের কাছে ঋণের জন্য আবেদন করে। এখন দেখার বিষয় আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ দিতে রাজি হয় কি না। কেননা বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের পতনের পর ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণের চুক্তি করেছিল। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই ঋণের আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। অনুমোদিত ওই ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। কিন্তু ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি শর্ত পূরণ না হওয়ায়।
এই পরিস্থিতিতে সাময়িক কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এগুলো প্রয়োজনীয় এবং অর্থনীতির জন্য সহায়ক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পরিকল্পনা কী হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে অর্থনীতি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের গতি ফেরানো। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং সেগুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনৈতিক চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
ফারজানা সাজনিন অর্চি: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
