30.8 C
Dhaka
Home Blog

ফলাফল কেবল সংখ্যা, জীবন তারচেয়েও অনেক বড়

আজ বাংলাদেশের লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে একটি বিশেষ দিন। প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল। কারো ঘরে আনন্দ, কারো চোখে স্বস্তির জল, আবার কোথাও হয়তো নেমে এসেছে নীরবতা। কেউ প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে, কেউ পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত ফলের চেয়ে কম, আবার কেউ হয়তো আজ নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে শুরু করেছে।

কিন্তু ফল প্রকাশের এই দিনে সবচেয়ে জরুরি যে কথাটি মনে রাখা দরকার তা হলো, একটি নম্বর কখনোই একজন মানুষের পুরো জীবন, মেধা কিংবা সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না।

এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। সার্বিক পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট।

এই সংখ্যাগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলাফলের ওঠানামা নিয়ে বিশ্লেষণও প্রয়োজন। কেন পাসের হার কমল, কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ল, শিক্ষার মান কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, পরীক্ষা পদ্ধতি কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্ন নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।

কিন্তু আজকের দিনটি শুধু পরিসংখ্যানের দিন নয়, এমন কিছু কিশোর-কিশোরীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যারা এই বয়সেই নিজেদের সাফল্য বা ব্যর্থতার একটি কঠিন সংজ্ঞার মুখোমুখি হচ্ছে।

আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা দীর্ঘদিনের—পরীক্ষায় ভালো ফল করলে বলি, ‘ছেলেটা খুব মেধাবী’; আর ফলাফল প্রত্যাশা মতো না হলে সহজেই বলে ফেলি, ‘ও পড়াশোনায় ভালো না’।

কিন্তু সত্যিই কি তাই? একজন শিক্ষার্থী কি তার পরীক্ষার খাতায় লেখা কয়েকটি সংখ্যার সমান? একজন ১৬ বা ১৭ বছরের কিশোর-কিশোরীর মেধা, সৃজনশীলতা, কৌতূহল, নেতৃত্বের গুণ, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা কি কয়েকটি সংখ্যায় মাপা সম্ভব? অবশ্যই নয়।

তারপরও আমরা সন্তানদের এমন একটি প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিই, যেখানে জিপিএ-৫ যেন সাফল্যের একমাত্র সনদ। কে কত পেল, কে জিপিএ-৫ পেল, কে গোল্ডেন জিপিএ পেল, কে কোন কলেজে ভর্তি হবে, কে কার চেয়ে ভালো করেছে—এসব নিয়ে শুরু হয় তুলনা।

ফল প্রকাশের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের ছবি, অভিনন্দন, ফুল, কেক ও সাফল্যের গল্পে ভরে যায়। এগুলো আনন্দের এবং অবশ্যই উদযাপনের যোগ্য। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে এমন অনেক শিক্ষার্থীও থাকে, যারা নিজের ফলাফল নিয়ে ভীষণ হতাশ। কেউ হয়তো ভাবছে, ‘আমি কি ব্যর্থ?’

এখানেই আমাদের থামতে হবে। একজন সন্তানের ফলাফল দেখে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘কত পেয়েছ?’ প্রথমেই দেখা উচিত, তার মানসিক অবস্থাটা কেমন। কারণ, ফলাফল খারাপ হওয়ার পর একটি শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও পরিবারের সমর্থন। তখন তাকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা নয়, তার পাশে দাঁড়ানো জরুরি। তাকে বলতে হবে, ‘তুমি প্রত্যাশিত ফল পাওনি, কিন্তু তুমি আমাদের কাছে ব্যর্থ নও।’ এই একটি বাক্য হয়তো একটি ভেঙে পড়া মনকে আবার দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া আর জীবনে ব্যর্থ হওয়া এক বিষয় নয়। এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা শিক্ষাজীবনে অসাধারণ ফল করেননি, কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিজেদের যোগ্যতা ও কর্ম দিয়ে পৃথিবীতে অন্যতম জায়গা অর্জন করেছেন। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফল করেছিলেন, কিন্তু জীবনের নানা চ্যালেঞ্জে নিজেদের সামলে উঠতে পারেননি। কারণ, জীবন কোনো বোর্ড পরীক্ষা নয়। জীবনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অনেক বড়। সেখানে শুধু গণিত, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা জীববিজ্ঞানের প্রশ্ন থাকে না। সেখানে থাকে সততা, দায়িত্ববোধ, ধৈর্য, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, মানবিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস।

একজন মানুষ পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে মানুষ হিসেবে কেমন হয়েছে। তাই যারা এবার ভালো ফল করেছে, তাদের অভিনন্দন জানাতেই হবে, তাদের পরিশ্রমকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু তাদের এটাও মনে করিয়ে দিতে হবে, জিপিএ-৫ কোনো গন্তব্য নয়, এটি কেবল একটি ধাপ। সামনে আরও বড় পথ। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মজীবন এবং বাস্তব জীবনের অসংখ্য পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। সেখানে শুধু ভালো ফলাফল যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে দক্ষতা, মূল্যবোধ, প্রযুক্তিজ্ঞান, ভাষাজ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।

যারা প্রত্যাশিত ফল পায়নি, তাদের বলি, গল্প এখানেই শেষ নয়। আজকের ফলাফল জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হতে পারে, কিন্তু পুরো বইটির নয়। হয়তো অন্য পথে সফলতা আসবে। হয়তো তোমার শক্তি এমন কোনো জায়গায়, যেটা এই পরীক্ষার খাতা মাপতে পারেনি। হয়তো তোমার আরও সময় প্রয়োজন। হয়তো তোমাকে নতুন করে চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু একটি পরীক্ষার ফলাফলের কারণে নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলো না।

আমাদের অভিভাবকদেরও মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সন্তানকে প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে, আত্মীয়ের সন্তানের সঙ্গে কিংবা বন্ধুর সঙ্গে তুলনা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তানের ফলাফলকে নিজের সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি বানানো যাবে না। সন্তান জিপিএ-৫ না পেলেও সে ভালো মানুষ হতে পারে, সে একজন দক্ষ উদ্যোক্তা হতে পারে, ভালো শিক্ষক হতে পারে, অসাধারণ শিল্পী হতে পারে, গবেষক হতে পারে, দক্ষ কারিগর হতে পারে কিংবা এমন কিছু করতে পারে, যার কথা আজ আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনেও তাই বড় একটি প্রশ্ন রয়েছে। আমরা কি শুধু ভালো ফল করা শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, নাকি ভালো মানুষ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সক্ষম নাগরিক তৈরি করতে চাই? এই প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও নতুন প্রযুক্তি আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রকে আমূল পরিবর্তন করছে। শুধু মুখস্থ জ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকা কঠিন হবে। যে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে, সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, ভবিষ্যতে তারাই এগিয়ে থাকবে।

তাই ফলাফলকে সম্মান করুন, কিন্তু ফলাফল দিয়ে সন্তানকে বিচার করবেন না। একটি নম্বর তার খাতার পরিচয় হতে পারে, কিন্তু পুরো জীবনের পরিচয় নয়।

শিক্ষার্থীদের প্রতি বার্তা, আজ ফলাফল যাই আসুক, মনে রেখো—তোমার সামনে এখনো পুরো জীবন পড়ে আছে এবং আর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি এখনো শুরুই হয়নি।

 

মো. তরিকুল ইসলাম: লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষা পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

বিফলে নাহিদের রেকর্ড, ব্যাটিং ব্যর্থতায় জিম্বাবুয়ের কাছে হারল বাংলাদেশ

২১ রানে ৬ উইকেট নিয়ে জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং প্রায় একাই গুঁড়িয়ে দিলেন নাহিদ রানা। এই গতিময় পেসার গড়লেন ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড। কিন্তু তার অনবদ্য কীর্তি গেল বিফলে। নিদারুণ ব্যাটিং ব্যর্থতায় সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়েও একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ল টাইগাররা।

সোমবার হারারেতে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ২৫ রানে জিম্বাবুয়ের কাছে হেরেছে বাংলাদেশ। পেসবান্ধব উইকেটে টস জিতে আগে স্বাগতিকদের ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে ৩৬.৪ ওভারে ১৪১ রানে মাত্র অলআউট করে দেয় তারা। কিন্তু জবাব দিতে নেমে ৩৩.১ ওভারে স্রেফ ১১৬ রানেই গুটিয়ে যায় মেহেদী হাসান মিরাজের দল।

জিম্বাবুয়ের ১০ উইকেটের ৮টি নেন বাংলাদেশের পেসাররা। নাহিদের ৬ শিকারের সঙ্গে তাসকিন আহমেদ ২ উইকেট পান ৩২ রানে। অন্যদিকে, কন্ডিশনের ফায়দা তুলে বাংলাদেশের পতন হওয়া ১০ উইকেটের সবকটি যায় জিম্বাবুয়ের পেসারদের ঝুলিতে। রিচার্ড এনগারাভা ও ব্র‍্যাড ইভান্স তিনটি করে এবং ব্লেসিং মুজারাবানি ও নিউম্যান নিয়ামুরি দুটি করে উইকেট দখল করেন।

এই ফলের পেছনে জিম্বাবুয়ের বোলারদের সাফল্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যাটারদের অ্যাপ্রোচের দায়ও কম নয়। উইকেট ছুড়ে আসেন বেশ কয়েকজন ব্যাটার। তাদের মধ্যে সৌম্য সরকার, তাওহিদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান মিরাজের আউট ছিল দৃষ্টিকটু।

দারুণ বোলিংয়ে জিম্বাবুয়েকে অল্পতে গুটিয়ে দেওয়ার স্বস্তি বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নামার পর দ্রুতই উড়ে যায়। পঞ্চম ওভারের মধ্যে তিন টপ অর্ডার ব্যাটার সাজঘরে ফিরলে বিপর্যয়ে পড়ে তারা। তখন দলের সংগ্রহ কেবল ১৭ রান।

ছক্কার চেষ্টায় ফাইন লেগে ক্যাচ দেন ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। তিনে নামা নাজমুল হোসেন শান্ত ফাঁদে পা দিয়ে ধরা পড়েন থার্ডম্যানে। তাদের ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে আরেক ওপেনার সৌম্যও বিলাসী শটে বিদায় নেন ক্যাচ তুলে।

এরপর ৪৯ রানে জুটি গড়ে বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন হৃদয় ও নুরুল হাসান সোহান। ১৯তম ওভারে এই জুটি ভাঙার পর আর লড়াইয়ে ফিরতে পারেনি বাংলাদেশ। ফের অযথা  বড় শটের চেষ্টায় জিম্বাবুয়েকে উইকেট উপহার দেন হৃদয়। বিতর্কিত সিদ্ধান্তে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে পড়েন সোহান। ডিআরএস না থাকায় রিভিউ নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।

হৃদয় ও সোহানের মাঝে ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিলে শামিল হন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ও অধিনায়ক মিরাজ। এরপর লেজের দিকের ব্যাটাররা পারেননি অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাতে। ফলে বাজে হারে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।

সফরকারীদের মাত্র তিন ব্যাটার পৌঁছান দুই অঙ্কে। সোহান দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৪৪ বলে ৩১ রানের ইনিংস খেলেন। হৃদয় করেন ৫৮ বলে ২৫ রান। আর মিরাজের ব্যাট থেকে আসে ১৮ বলে ১০ রান।

এর আগে ইনিংসের শুরুটা বেশ ইতিবাচকই করেছিল জিম্বাবুয়ে। ওভারপ্রতি প্রায় ৬ রান তুলে বিনা উইকেটে ৩৬ তুলে ফেলেছিল। তখনই রানআউটের ফাঁদে কাটা পড়েন ওপেনার বেন কারান। এরপর টানা দুই ওভারে জোড়া ধাক্কা দেন তাসকিন। আরেক ওপেনার ব্রায়ান বেনেট ও জিম্বাবুয়ে ব্যাটিংয়ের বড় ভরসা ক্রেইগ আরভাইনকে ফিরিয়ে দেন তিনি।

ইনিংসের বাকি অংশটুকু ছিল শুধুই নাহিদের। তার পেস যেন সামলাতেই পারেনি স্বাগতিকরা। ৪৫ থেকে ৭০— এই ২৫ রান তুলতেই আরও ৫ উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। সবগুলোই নিজের পকেটে ঢোকান নাহিদ। জিম্বাবুয়ের মিডল অর্ডারের পাঁচ ব্যাটারের কেউই দুই অঙ্কের ঘরে রান তুলতে পারেননি।

এরপর প্রতিরোধ গড়েন অধিনায়ক এনগারাভা ও নিয়ামুরি। নবম উইকেটে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ৬৩ রানের জুটিও ভাঙে নাহিদের হাতেই। ৪১ বলে ২৭ রান করা এনগারাভাকে ফিরিয়ে নিজের ষষ্ঠ শিকার তুলে নেন এই গতি তারকা। জিম্বাবুয়ের পক্ষে ৫১ বলে সর্বোচ্চ ৩৩ রান করেন নিয়ামুরি। তাকে ফিরিয়ে জিম্বাবুয়ের ইনিংস মুড়িয়ে দেন মিরাজ।

তবে শেষমেশ এনগারাভা ও নিয়ামুরির ওই জুটিই স্বাগতিকদের জন্য ভীষণ কার্যকর হয়ে ওঠে। আর অল্প পুঁজি নিয়েও নিজেদের অসাধারণভাবে মেলে ধরে জয় ছিনিয়ে নেন তাদের বোলাররা।

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ১ বছরে বেড়েছে ৪১ শতাংশ

২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার সুইস ফ্রাঁ বা প্রায় ১২ হাজার ৭৫১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

২০২৪ সালে দেশটিতে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা প্রায় ৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এই অর্থ ছিল সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আগের তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আমানত।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রতি বছর আমানতের তথ্য প্রকাশ করে। ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড’ ক্যাটাগরির আওতায় দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিক, বাসিন্দা বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সব ধরনের মুদ্রায় রাখা আমানত পর্যবেক্ষণ করে।

তবে প্রতিবেদনে আমানতকারীর ধরন বা কোন উদ্দেশ্যে আমানত রাখা হয়েছে, তা আলাদা করে দেখানো হয় না।

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো ঐতিহাসিকভাবে আর্থিক গোপনীয়তার জন্য পরিচিত। যদিও সম্প্রতি কিছু সংস্কার আনায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ব্যাংকগুলোর স্বচ্ছতা ও সহযোগিতা বেড়েছে।

২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানত সাধারণত ৪৮ কোটি থেকে ৬৬ কোটি ফ্রাঁ’র মধ্যে সীমিত ছিল।

২০২৩ সালে আমানতের পরিমাণ কমে রেকর্ড সর্বনিম্ন ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঁতে নেমে যায়। ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের আমানত এক লাফে ৩৩ গুণ বেড়ে যায়।

অবৈধ আর্থিক প্রবাহের ওপর বৈশ্বিক নজরদারি বৃদ্ধির কারণে ২০২১ সালে করোনা-পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ ৮৭ কোটি ১০ লাখ ফ্রাঁ’তে পৌঁছানোর পর ২০২২ সালে আমানত হঠাৎ কমে যায়।

গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের আমানতের পরিমাণ কমেছে। ভারতের আমানত কমে দাঁড়ায় ৩২ কোটি ৩১ লাখ সুইস ফ্রাঁ ও পাকিস্তানের আমানত কমে দাঁড়ায় ২৩ কোটি ৬৩ লাখ ফ্রাঁ।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংক্রান্ত শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতে অথবা এসব দেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে পাচার করা হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিসটিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সুইস ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অ্যাকাউন্ট থাকে। এর মধ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের আমানত ছাড়াও বাংলাদেশিদের অবৈধ অর্থ থাকতে পারে। তাই সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না যে সেখানে আমানত বৃদ্ধির কারণ শুধু পাচার করা অর্থ।’

‘তবে বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে সুইস ব্যাংকগুলোর কাছে তথ্য চাইতে পারে,’ বলেন তিনি।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা খুবই জটিল ও কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী পাচার অর্থ উদ্ধারের হার মাত্র ২ শতাংশের মতো। তা সত্ত্বেও প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, কারণ এতে অন্তত জড়িতদের ওপর চাপ তৈরি হয়।’

এদিকে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘হঠাৎ আমানত বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগের ফলে ধনীরা বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরে উৎসাহিত হয়েছে।’

গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে ১ জুলাই থেকে ১১ দলের ৩৬ দিনের কর্মসূচি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ১ জুলাই থেকে ৩৬ দিনের কর্মসূচি পালন করবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ।

কর্মসূচি অনুযায়ী, ১ থেকে ১৫ জুলাই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে দেশের সব জেলা ও মহানগরে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। ৬ জুলাই জাতীয় সংসদের সামনে শহীদ পরিবারের ব্যানারে মানববন্ধন এবং স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। ৮ জুলাই রাজধানীতে জাতীয় সেমিনার, ২০ জুলাই নারীদের অংশগ্রহণে আলোচনা সভা এবং ২৩ থেকে ২৫ জুলাই চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।

এ ছাড়া ৩১ জুলাই দেশের সব মসজিদে দোয়া এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার কর্মসূচি রয়েছে। ৫ আগস্ট রাজধানীসহ সারা দেশে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

রাজধানীসহ সারা দেশে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে স্মৃতিচারণমূলক সমাবেশ এবং গ্রাফিতি অঙ্কনের কর্মসূচিও থাকবে।

সংবাদ সম্মেলনে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ৩৬ দিনের কর্মসূচিগুলোর কিছু বিভিন্ন তারিখে বাস্তবায়ন করা হবে। এসব তারিখ ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি কয়েকটি মহানগরে আগে ঘোষিত সমাবেশ পূর্বনির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ৪ জুলাই রাজধানীর বাইরে সারা দেশে পূর্বঘোষিত গণমিছিলও হবে।

এর আগে সকাল ১১টায় ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিগত সরকারের আমলের ‘নৃশংসতার’ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৩৬ দিনের কর্মসূচি চূড়ান্ত করতেই এ বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনসহ অন্য নেতারা।

জানা গেল মোহনলালের দৃশ্যম-৩ মুক্তির তারিখ

ভারতীয় সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় ক্রাইম-থ্রিলার ফ্র্যাঞ্চাইজি দৃশ্যম। অবশেষে সিনেমাটির তৃতীয় পর্বের টিজার প্রকাশে করেছেন নির্মাতারা। আগের মতো এবারও প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোহনলাল।

বলিউড হাঙ্গামার প্রতিবেদনে বলা হয়, সিনেমাটি আগামী ২১ মে মুক্তি পাবে।

টিজারের শুরুতেই দৃশ্যম ও দৃশ্যম-২ এর গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো আবার তুলে ধরা হয়। এটি দর্শকদের দ্রুত জর্জকুট্টির জটিল জগতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এরপর একটি গির্জার ভেতরে নিজের ভয় ও অনুভূতির কথা স্বীকার করতে দেখা যায় জর্জকুট্টিকে। পরিবারকে রক্ষার প্রতিজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করলেও, তার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক অজানা আতঙ্ক। যেন সে সবসময় কারও নজরে আছে।

এর আগে মোহনলাল নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় টিজার প্রকাশের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ২৯ এপ্রিল বিকেল ৫টায় টিজার প্রকাশিত হবে। একই সঙ্গে তিনি সিনেমাটির বিশ্বব্যাপী মুক্তির তারিখও নিশ্চিত করেন।

ইরানে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের পরিষদ ভবনে হামলা

ইরানের রাজধানী তেহরানের দক্ষিণে কুম শহরে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ ভবনে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

দেশটির স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাতে আজ মঙ্গলবার বার্তাসংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।

হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির ভিডিও প্রকাশ করে ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি। 

জানায়, তেহরানে পুরোনো পার্লামেন্ট ভবনে অবস্থিত পরিষদের আরেকটি কমপ্লেক্সেও রাতভর হামলা হয়েছে।

এদিকে অ্যাক্সিওসের বরাতে ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য ওই ভবনে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক চলার সময় বিমান হামলাটি চালানো হয়। 

এতে পরিষদের অনেক সদস্য নিহত বা আহত হয়েছেন বলে দাবি করছে চ্যানেলটি। 

তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি গণমাধ্যমগুলো। 

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস হলো ধর্মীয় আলেমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিষদ। এর সদস্য সংখ্যা ৮৮। 

সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ ও তার কার্যক্রম তদারক করা এ পরিষদের কাজ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীন সফরের আমন্ত্রণ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।

সাক্ষাৎকালে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং- এর পক্ষ থেকে উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন।

গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, তবে সফরসূচি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়নি। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর অনেক অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারমূলক কাজ চলছে। যখন তিনি বিদেশ সফর শুরু করবেন তখন চীন সফরের বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে গঠিত নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানাতেই মূলত চীনের রাষ্ট্রদূত এই সাক্ষাৎ করতে আসেন।

‘বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই এই সুদৃঢ় সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল। ধারাবাহিকভাবে চীন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী উন্নয়ন সহযোগী। বিগত বছরগুলোতে চীনের সাথে বাংলাদেশের যে উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে, বর্তমান সরকার সেটিকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে চায়।

‘চীন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি মূলত একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল। এতে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না হলেও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কীভাবে একটি নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া যায়, উভয় দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে কীভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও জোরদার করা যায়, এসব বিষয়ে সৌজন্যমূলক অঙ্গীকার করা হয়েছে।

‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি কি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে, নাকি শক্তিশালী?

প্রতি বছরের ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এটি শুধু একটি প্রতীকী আয়োজন নয়; এটি বিশ্বের প্রায় সাড়ে ৪৭ কোটি আদিবাসী মানুষের অস্তিত্ব, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু বাংলাদেশে দিবসটি এলেই একটি পুরোনো বিতর্ক আবারও ফিরে আসে—এই দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বলা যাবে কি না।

রাষ্ট্রের সরকারি ভাষ্যে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘জাতিগত সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘উপজাতি’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম, মধুপুর, সিলেট, উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী বহু জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় দেন ‘আদিবাসী’ হিসেবে। ফলে প্রশ্নটি কেবল ভাষার নয়; এটি পরিচয়, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও মানবাধিকারের প্রশ্ন।

বাংলাদেশে এই বিতর্কের আরেকটি মাত্রা রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিলে বা আদিবাসীরা স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুললে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাদের এই স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার কাঠামো কি সত্যিই এমনটি বলে?

উত্তর হলো, না।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দলিল হলো ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস ডিক্লেয়ারেশন অন দ্যা রাইটস অব ইন্ডিজিনিয়াস পিপলস (ইউএনডিআরআইপি)’, যা ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। বাংলাদেশও এই ঘোষণাপত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।

ইউএনডিআরআইপি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি না হলেও এটি বর্তমানে আদিবাসীদের অধিকার সংক্রান্ত সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বৈশ্বিক মানদণ্ড।

ঘোষণাপত্রটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি আদিবাসীদের পরিচয় নির্ধারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে দেয় না। বরং, জনগোষ্ঠীর নিজের পরিচয় দেওয়ার অধিকারকে মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশও এই নীতিকেই অনুসরণ করে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক পরিভাষা যাই হোক না কেন, কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক এবং আত্মপরিচয় আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়।

পরিচয়ের প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অনেকেই মনে করেন, ‘আদিবাসী’ শব্দটি শুধু একটি নাম। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এটি কেবল একটি পরিভাষা নয়, বিশেষ কিছু অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। ইউএনডিআরআইপি আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ভূমি, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও নিজস্ব প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।

আবার জাতিসংঘের এই দুটি মৌলিক মানবাধিকার চুক্তি ‘ইন্টারন্যাশনাল কোভেনান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্টান অন ইকোনোমিক, স্যোসিয়াল অ্যান্ড কালচারাল রাইটস (আইসিইএসসিআর)’-এর প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে।’

এই একটি বাক্যকে ঘিরেই বহু বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশেও অনেক সময় বলা হয়, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মানে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে না।

স্বায়ত্তশাসন কি বিচ্ছিন্নতা?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-ডিটারমিনেশনের দুটি মাত্রা রয়েছে। প্রথমটি ‘ইন্টারনাল সেলফ-ডিটারমিনেশন’। অর্থাৎ, বিদ্যমান রাষ্ট্রের ভেতরেই একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারবে। দ্বিতীয়টি ‘এক্সটারনাল সেলফ-ডিটারমিনেশন’। এটি সাধারণত উপনিবেশ, বিদেশি দখল বা অত্যন্ত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

ইউএনডিআরআইপি মূলত প্রথম ধারণাটিকেই সমর্থন করে।

ঘোষণাপত্রের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আদিবাসীরা তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয় পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন বা স্ব-শাসনের অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একই ঘোষণাপত্রের ৪৬ নম্বর অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে, এই দলিলের কোনো কিছুই কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক ঐক্য ক্ষুণ্ন করার অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন নিজেই স্বায়ত্তশাসন ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টেনে দিয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী যদি তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা কিংবা স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় অধিকতর অংশগ্রহণের দাবি তোলে, সেটিকে কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদ বলা যায়?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর উত্তর হলো ‘না’। বরং এসব দাবি গণতান্ত্রিক আলোচনার অংশ, যা বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই বাস্তবায়িত হতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ২৩ (এ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা নেবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সাংবিধানিক স্বীকৃতি। তবে এখানেই বিতর্কের সূচনা। কারণ, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। এর পরিবর্তে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ও ‘নৃগোষ্ঠী’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

রাষ্ট্রের এই অবস্থানের পেছনে একটি যুক্তি রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বলা হয়েছে, ‘আদিবাসী’ শব্দটির আন্তর্জাতিক আইনি তাৎপর্য রয়েছে এবং এটি ব্যবহারে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসনের দাবির সঙ্গে এই পরিভাষাকে যুক্ত করে অনেক সময় বিচ্ছিন্নতাবাদের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু, আন্তর্জাতিক আইন এই আশঙ্কাকে কতটা সমর্থন করে?

বাস্তবতা হলো, ইউএনডিআরআইপি বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিল কোথাও বলেনি যে আদিবাসীদের স্বীকৃতি মানেই একটি জনগোষ্ঠী স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার পেয়ে যাবে। বরং ঘোষণাপত্রের ৪৬ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই ঘোষণাপত্র কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক ঐক্য ক্ষুণ্ন করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন নিজেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।

এই বিষয়টি বোঝার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

কানাডায় ফার্স্ট নেশনস, ইনুইট ও মেটিস জনগোষ্ঠী সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। নিউজিল্যান্ডে মাওরি জনগোষ্ঠীর অধিকার ও ভূমি প্রশ্নে বিশেষ আইনগত কাঠামো রয়েছে। নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডে সামি জনগণের প্রতিনিধিত্বের জন্য সামি পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বলিভিয়া ও ইকুয়েডরের সংবিধানে আদিবাসীদের বহুস্তরীয় স্বীকৃতি রয়েছে। এসব দেশের কোনোটিই আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়ার কারণে রাষ্ট্র হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়েনি। বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে আস্থা বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একই। কোনো জনগোষ্ঠী যদি তাদের ভাষায় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহ্যগত ভূমির সুরক্ষা বা স্থানীয় প্রশাসনে অধিকতর অংশগ্রহণের দাবি তোলে, সেটিকে কি বিচ্ছিন্নতাবাদের সমার্থক হিসেবে দেখা উচিত? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উত্তর হওয়া উচিত ‘না’।

অবশ্যই, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন যদি প্রকাশ্যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে বা রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়, সেটি ভিন্ন বিষয় এবং তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিবেচিত হবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক অধিকার, ভাষার অধিকার বা স্থানীয় পর্যায়ে অধিকতর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে বৈধ আলোচনার বিষয়।

এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯। বাংলাদেশ এখনো এই কনভেনশন অনুসমর্থন করেনি। তবে এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আদিবাসী ও উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। এতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও নীতিনির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হতে পারে।

এখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৯৭ সালের এই চুক্তি পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আঞ্চলিক পরিষদ ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির মতো বিষয়গুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজেই একসময় স্বীকার করেছিল যে, দেশের সব অঞ্চলে একই ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সবসময় সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে নয়, বরং তা টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি উপায় হতে পারে।

আজকের বিশ্বে আদিবাসীদের প্রশ্নটি আর কেবল পরিচয়ের প্রশ্ন নয়। এটি উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জীববৈচিত্র্য সেইসব অঞ্চলে সংরক্ষিত রয়েছে, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে আসছে। ফলে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবাধিকারের বিষয় নয়, এটি টেকসই উন্নয়নেরও প্রশ্ন।

বাংলাদেশের উচিত এই বিতর্ককে ‘রাষ্ট্র বনাম আদিবাসী’ দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন’ এর আলোকে বিবেচনা করা। কোনো জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই রাষ্ট্রকে দুর্বল করা নয়। বরং রাষ্ট্রের শক্তি নিহিত থাকে তার বৈচিত্র্যকে ধারণ করার সক্ষমতায়। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে মর্যাদা দেয়, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক হয়।

তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হবে কি না, সেটিতে সীমাবদ্ধ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চায়, যেখানে প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারবে এবং উন্নয়নের সুফল সমানভাবে ভোগ করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমরা বৈচিত্র্যকে ভয় পাই, নাকি সেটিকেই বাংলাদেশের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করি।

 

মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং করপোরেট কমিউনিকেশনসে কর্মরত।
[email protected]

বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় ফিফাকে ধুয়ে দিল উয়েফা

যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। সংস্থাটির দাবি, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে’ ফিফা এবং এটি ফুটবলের ন্যায়বিচার ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বিপজ্জনক নজির।

সোমবার এক বিবৃতিতে উয়েফা কড়া ভাষায় জানায়, ‘এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা এক বছরের পরীক্ষামূলক সময়ের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত মাত্রা অতিক্রম করেছে। ফুটবল, অন্য যেকোনো খেলার মতোই, নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই নিয়মই সুষ্ঠু, সৎ ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার ভিত্তি। অনেক সময় নিয়মের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এই ঘটনায় তেমন কোনো সুযোগ ছিল না।’

উয়েফা আরও সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বকাপের মতো আসরে এমন সিদ্ধান্ত পুরো ফুটবলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

‘ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, কারণ এটি সুন্দর একটি খেলা এবং সবাই বিশ্বাস করে যে পৃথিবীর সব জায়গায় একই নিয়মে এটি পরিচালিত হয়। বিশ্বকাপ কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো টুর্নামেন্ট নয়। এখানে নেওয়া সিদ্ধান্ত পুরো ফুটবলের ওপর প্রভাব ফেলে। এমন নজিরবিহীন, দুর্বোধ্য ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে আমরা বিস্মিত।’

বালোগানের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের শুরু শেষ বত্রিশের ম্যাচে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার এক ডিফেন্ডারের পায়ের ওপর পা দেওয়ায় ভিডিও রিভিউ শেষে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয় তাকে। ম্যাচটি ২-০ গোলে জিতেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ড দেখলে পরের ম্যাচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকতে হয়। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে বালোগুনের খেলা সম্ভব নয় বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল।

তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে শাস্তিটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও প্রকাশ্যে লাল কার্ড প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

এরপর ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে তিনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলার অনুমতি পান। তবে এই সিদ্ধান্তের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এদিকে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘সঠিক কাজ করার জন্য এবং একটি বড় অন্যায় সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ।

ফিফার এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বেলজিয়াম কোচ রুদি গার্সিয়াও। ব্যঙ্গ করে তিনি বলেন, ‘আমি জানতামই না, ফিফা বিশ্বকাপে এখন ৫ জুলাই মানেই ১ এপ্রিল! অর্থাৎ আজ বুঝি “এপ্রিল ফুল” দিবস!’

৩০ শতাংশের কম অগ্রগতি হওয়া প্রকল্প বাতিলের নির্দেশ

উন্নয়ন ব্যয়ে অপচয় কমাতে ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় জবাবদিহি বাড়াতে ধীরগতির প্রকল্পগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ৩০ শতাংশের কম অগ্রগতি হওয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে যেগুলো আর কার্যকর নয়, সেগুলো বাতিল করতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিয়ম তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ড্যাশবোর্ডভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা, যোগ্য প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের আলোকে গত ১৪ জুন সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এসব নির্দেশনা জারি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

অর্থনীতিবিদরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ধীরগতির ও অপচয়মূলক প্রকল্প ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, মন্ত্রণালয়গুলো নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করলে ও ভবিষ্যতে প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাস্তবায়নের পূর্ণ প্রস্তুতি নিশ্চিত না করলে এই সংস্কারের সুফল মিলবে না।

গত তিন অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে খারাপ হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার নেমে আসে ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে এডিপি বাস্তবায়নের গড় হার ৭৯ শতাংশ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলো এখনও প্রয়োজনীয় ও কার্যকর কি না, তা মূল্যায়ন করতে পারবে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে তারা প্রকল্প পুনর্গঠন, পরিধি সংশোধন কিংবা পুরোপুরি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ‘গ্রিন বুক’-এ অন্তর্ভুক্ত নতুন প্রকল্পগুলোর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দ্রুত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি সরকারের নতুন এডিপি আগামী মাস থেকে, অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে কার্যকর হবে।

সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন করেছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।

এই কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট বরাদ্দসহ প্রায় ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্লক বরাদ্দের আওতায় নতুন আরও প্রায় ১ হাজার ২০০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়া প্রকল্পগুলোর বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিয়মের কারণ চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে এসবের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য ড্যাশবোর্ডভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালকদের নিয়োগ দিতে হবে শুধু পেশাগত যোগ্যতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে না পারা প্রকল্পগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত অবশ্যই কঠোর মূল্যায়নের ভিত্তিতে নিতে হবে।

তিনি বলেন, আমি আশা করছি, সিদ্ধান্তগুলো কস্ট-বেনিফিট অ্যানালিইসিসের (ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ) ভিত্তিতেই নেওয়া হবে।

তার ভাষায়, ধরুন, একটি প্রকল্পের মোট ব্যয় ১০০ টাকা। এর মধ্যে ৩০ টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে। এখন সরকারকে দেখতে হবে, প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল অবশিষ্ট ৭০ টাকার ব্যয়ের চেয়ে বেশি কি না। তারপরই পরবর্তী অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, সম্ভাব্য সুফল যদি অবশিষ্ট ব্যয়ের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে প্রকল্পটি এডিপিতে রাখা যৌক্তিক। অন্যথায় সেটি বাতিল করা উচিত। সেই বিবেচনায় এডিপি ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া দরকার ছিল।

তবে এই সংস্কার বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, আসল প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে কি না, আর হলেও তা সঠিকভাবে হবে কি না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। একটি প্রকল্প যত দিন টিকে থাকে, তত দিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠী নানা ধরনের সুবিধা ভোগ করে।

তিনি আরও বলেন, এডিপিতে দ্রুত নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তার মতে, এডিপি বাস্তবায়নের দুর্বল হার ও দীর্ঘদিনের অপচয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, একনেকের অনুমোদনের সময় অনেক প্রকল্পই বাস্তবায়নের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে না।

জাহিদ হোসেন বলেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রায়ই তাড়াহুড়ো করে করা হয়। বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে নকশার ত্রুটি ধরা পড়ে, কাজ ও ক্রয় পরিকল্পনায়ও নানা দুর্বলতা দেখা যায়। ফলে অনুমোদনের পরও প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু করতে তিন থেকে চার বছর লেগে যায়।

তার মতে, বাস্তবায়নের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই নতুন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেওয়া উচিত।

গতকাল শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, এডিপি বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক এবং সরকার এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে।

তিনি বলেন, মানুষকে প্রভাবিত করা বা উন্নয়নের বাহ্যিক চিত্র তুলে ধরার জন্য সরকার কোনো মেগা প্রকল্প নিতে চায় না।

‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে অনুমোদিত সব মেগা প্রকল্প একসঙ্গে বন্ধ করে দিলে বড় ধরনের অপচয় ও নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সেসব প্রকল্প এখন মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।