26.2 C
Dhaka
Home Blog

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: এক আলোকযাত্রার নাম

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্মদিন ২৫ জুলাই। এটি কেবল একজন শিক্ষক, লেখক বা সংগঠকের জন্মদিন নয়; বরং এমন এক মানুষের জীবন ও কর্মকে স্মরণ করার দিন, যিনি বই, জ্ঞান ও মানবিকতাকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ করেছেন।

একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা সাধারণত অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কিন্তু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, কোনো জাতির স্থায়ী উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধির ওপর। এই সত্যটিকেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার কর্মজীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তার বিশ্বাস ছিল, উন্নত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে আলোকিত নাগরিকের হাত ধরে, আর সেই আলোকপ্রাপ্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো বই। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই তার নেতৃত্বে অসংখ্য মানুষের শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠায় গড়ে উঠেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র—বাংলাদেশের এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে অল্প কয়েকটি বেসরকারি উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করেছে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাদের অন্যতম। এটি কেবল একটি সাহিত্যসংগঠন বা গ্রন্থাগার নয়; বরং পাঠাভ্যাস, আত্মশিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিশীলন, মানবিক শিক্ষা ও নাগরিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার একটি সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রাণপুরুষ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

তার সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এই যে তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজের ভেতরের সৃজনশীল শক্তিকে সংগঠিত করে জ্ঞানচর্চাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ও আনন্দময় অনুষঙ্গে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে শিক্ষা ছিল না কেবল পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের উপায়; বরং আত্মগঠন, চরিত্র নির্মাণ এবং আজীবন শেখার এক অব্যাহত প্রক্রিয়া।

এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তিনি কয়েক প্রজন্মকে শেখানোর চেষ্টা করেছেন, একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল অবকাঠামো, অর্থনীতি বা প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয় জ্ঞান, মানবিকতা, নৈতিকতা ও মুক্তচিন্তায় সমৃদ্ধ নাগরিক গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। সেই অর্থে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার।

বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, দুর্বল গ্রন্থাগার সংস্কৃতি এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানচর্চার সীমাবদ্ধতা আজও শিক্ষাব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং তার একটি অপরিহার্য পরিপূরক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

শিক্ষা যে কেবল তথ্য অর্জনের বিষয় নয়, বরং সমালোচনামূলক চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব বিকাশের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া—বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সেই ধারণাকে বাস্তব অনুশীলনের ক্ষেত্র করে তুলেছে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের আত্মশিক্ষার দর্শন তরুণদের একটা বড় অংশকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং নিজের বৌদ্ধিক বিকাশের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

বাংলাদেশের বহু পরিবারে এখনো পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার সংস্কৃতি সীমিত। এই বাস্তবতায় বিদ্যালয়ভিত্তিক বইপড়া কর্মসূচি, পাঠ প্রতিযোগিতা, বই-পর্যালোচনা এবং নির্বাচিত গ্রন্থপাঠের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বইকে পরীক্ষার উপকরণ থেকে জীবনবোধ ও আত্মগঠনের অনুষঙ্গে রূপান্তর করার প্রয়াস নিয়েছে। এর ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভাষাদক্ষতা, কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং নৈতিক সংবেদনশীলতা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এক অর্থে, এটি বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও বটে।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নাগরিক সমাজকে রাষ্ট্র ও বাজারের মধ্যবর্তী এমন একটি পরিসর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে স্বেচ্ছাসেবী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সামাজিক আস্থা, সহযোগিতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ভিত্তি নির্মাণ করে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে বইপড়া, সাহিত্য আলোচনা, বিতর্ক, আবৃত্তি, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এমন একটি উন্মুক্ত পরিসর গড়ে তুলেছে, যেখানে ভিন্নমত, পেশা ও সামাজিক পটভূমির মানুষ যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এ ধরনের উদ্যোগ নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামাজিক পুঁজি বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কর্মসূচি এর অন্যতম সৃজনশীল উদ্যোগ। এর দর্শন সহজ কিন্তু গভীর–পাঠককে বইয়ের কাছে নয়, বইকে পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়া। জ্ঞানকে বড় শহর কিংবা অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের, বিশেষত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণের একটি কার্যকর উদাহরণ।

অবশ্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রম এখনো দেশের সব অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে পারেনি। ডিজিটাল যুগে পাঠাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল লাইব্রেরি, অডিওবুক, অনলাইন পাঠচক্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ-উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, যা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও শক্তিশালীভাবে আসতে পারে। তবে এ কথাও সত্য যে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের বাস্তবতা অনেক সময় এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

তবু এসব সীমাবদ্ধতা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কিংবা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের গুরুত্বকে খাটো করে না। তাকে কেবল একজন জনপ্রিয় বক্তা, পরিবেশ আন্দোলনের উদ্যমী পুরুষ, টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপক, লেখক বা সাহিত্য আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে মূল্যায়ন করলে তার অবদানের প্রকৃত ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। শিক্ষাদর্শন, সমাজতত্ত্ব ও নাগরিক উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, তিনি এমন এক সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার লক্ষ্য ছিল জ্ঞানসমৃদ্ধ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা।

২০০৪ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এশিয়ার নোবেলখ্যাত ‘র‍্যামন ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কারে ভূষিত হন। এর আনুষ্ঠানিক সাইটেশনের জবাবে তিনি বলেছিলেন—‘Little minds and great nations cannot go together. Consequently, our aspiration for greatness as a nation must be matched by our commitment to create enlightened people within the nation. And therefore, our endeavour is to create for Bangladesh an informed, enriched and committed generation of future citizens. In this, our focus has been on the youth.’

এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যেই তার সমগ্র জীবনদর্শনের সারমর্ম নিহিত। তিনি বিশ্বাস করেন, সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে কোনো জাতি মহৎ হতে পারে না। তাই তার আজীবনের সাধনা এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা হবে জ্ঞানসমৃদ্ধ, মননশীল, মূল্যবোধে ঋদ্ধ এবং দায়িত্বশীল। তরুণদের প্রতি তার বিশেষ মনোযোগের পেছনেও আছে এই বিশ্বাস—একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার আগামী প্রজন্মের চিন্তা, চরিত্র ও মূল্যবোধের মাধ্যমে।

আজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রবাহ মানুষের মনোযোগকে ক্রমেই খণ্ডিত করে তুলছে, তখন বইপড়া, গভীর চিন্তা এবং আত্মশিক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তথ্যের প্রাচুর্যের এই যুগে কেবল তথ্য নয়, প্রয়োজন বিচক্ষণতা; কেবল মত নয়, প্রয়োজন বিচারবোধ; কেবল দক্ষতা নয়, প্রয়োজন মানবিকতা। এই নতুন বাস্তবতায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনদর্শন ও কর্মযজ্ঞ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাই কেবল একজন শিক্ষক, লেখক বা সংগঠকের নাম নন; তিনি এক আলোকযাত্রার নাম। তার আজন্ম বিশ্বাস—একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার সম্পদে নয়, তার মানুষের মধ্যে নিহিত। তিনি মনে করেন, ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’। এই বিশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা, পাঠসংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের ইতিহাসে তার এই আলোকযাত্রা দীর্ঘদিন ধরে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

লেখক: শুভ কিবরিয়া, সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

লাল কার্ড দেখা বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত, ফিফাকে ধন্যবাদ দিলেন ট্রাম্প

এক আশ্চর্যজনক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এর ফলে এবারের বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দলটির হয়ে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলতে তার কোনো বাধা নেই।

আসরের শেষ বত্রিশের ম্যাচে গত বৃহস্পতিবার সানফ্রান্সিসকোতে যুক্তরাষ্ট্র ২-০ গোলে হারায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে। সেদিন তাদের হয়ে প্রথম গোলটি করা বালোগুন প্রতিপক্ষের তারিক মুহারেমিভিচের ডান গোড়ালিতে পা দিয়ে আঘাত করেন। ফলে তাকে ভিএআরের সাহায্য নিয়ে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়। এতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন তিনি। তবে ফর্মে থাকা এই ফরোয়ার্ডের নিষেধাজ্ঞা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।

রোববার এক বিবৃতিতে ফিফা জানিয়েছে, ‘ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার এই সিদ্ধান্তটি এক বছরের পর্যবেক্ষণমূলক সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হলো।’

সেখানে আরও বলা হয়েছে, ‘এই পর্যবেক্ষণমূলক সময়ের মধ্যে বালোগুন যদি একই ধরনের এবং সমমাত্রার কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করেন, তবে এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হবে এবং পূর্বের শাস্তি কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি নতুন অপরাধের জন্য অতিরিক্ত শাস্তিও এর সাথে যুক্ত হতে পারে।’

সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বাস্তবায়ন স্থগিত করার এখতিয়ার ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটির রয়েছে।

এই ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং একটি বড় অবিচারকে বদলে দেওয়ার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ!’

স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ফেডারেশন চলতি বিশ্বকাপে তাদের শীর্ষ গোলদাতাকে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচে খেলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। ইউএস সকার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা ডিসিপ্লিনারি কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছি এবং ফোলারিন বালোগুন আগামীকাল (বাংলাদেশ সময় অনুসারে মঙ্গলবার) খেলার যোগ্য হওয়ায় আমরা আনন্দিত।’

এবারের টুর্নামেন্টে চার ম্যাচে তিনটি গোল করা ২৫ বছর বয়সী বালোগুন গত শুক্রবার দাবি করেছিলেন যে, তার ওই ফাউলের জন্য লাল কার্ডের বদলে হলুদ কার্ড দেখানোই বেশি ন্যায়সংগত হতো। যুক্তরাষ্ট্রের একটি অনুশীলন সেশনে সাংবাদিকদের বালোগুন বলেছিলেন, ‘পা ফেলার মতো অন্য কোনো জায়গা ছিল না। এটি (মুহারেমোভিচের পায়ে আঘাত করা) এড়ানো অসম্ভব ছিল।’

তিনি যোগ করেছিলেন, ‘তো আমি বিষয়টি নিয়ে অনেক ভিন্ন ভিন্ন মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি দেখেছি। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, একটি হলুদ কার্ডই যথেষ্ট হতো। যা ঘটার ঘটে গেছে, তাই এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং আমাকে এটি মেনে নিতে হবে।’

সিয়াটলে অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের মধ্যকার শেষ ষোলোর লড়াই। নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ায় এই ম্যাচে বালোগুনের খেলার সুযোগ পাওয়ার বিষয়ে অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি বেলজিয়াম।

প্রতারণা ও যৌতুক দাবি: বাংলাদেশ ও ফিনল্যান্ডে আজিমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

ফিনল্যান্ডে বসবাসরত এক প্রবাসী নারীর কাছে যৌতুক দাবি এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার আত্মসাতের অভিযোগে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বাসিন্দা মো. আজিমুর রহমান ওরফে আজিম গাজীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন ঢাকার একটি আদালত। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফিনল্যান্ডেও একাধিক ফৌজদারি মামলায় আদালতের পরোয়ানা রয়েছে বলে মামলার আর্জি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ১৩ জুলাই দায়ের করা যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারার একটি মামলা আমলে নিয়ে ঢাকার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুর রহমান আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।

মামলার আর্জি অনুযায়ী, বাদী বাংলাদেশ ও ফিনল্যান্ডের দ্বৈত নাগরিক এবং দীর্ঘদিন ধরে ফিনল্যান্ডে বসবাস করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে পরিচয়ের পর মো. আজিমুর রহমান নিজেকে অবিবাহিত এবং সাবেক সেনাসদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে আত্মহত্যার ভয়ভীতি, মানসিক চাপ এবং আবেগের সুযোগ নিয়ে তাকে বিয়েতে সম্মত করানো হয়। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি ঢাকার মিরপুরের একটি কাজী অফিসে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

আর্জিতে বলা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে বাদীর কাছ থেকে ধার, সহায়তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলে ধারাবাহিকভাবে অর্থ নেওয়া শুরু করেন আসামি। বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় এবং পরবর্তীতে ফিনল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় ভিসা, বিমানভাড়া, হোটেল খরচ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোর্স, পারিবারিক ব্যয়, জমি-সংক্রান্ত বিষয়, ব্যবসা, মায়ের চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা বলে তিনি বারবার অর্থ নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলায় আরও বলা হয়েছে, বাদীর পরিবারের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে অর্থ নেওয়া হয়। এমনকি বাদীর মায়ের বন্ধক রাখা জমি ছাড়ানোর জন্যও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাদীর দাবি, বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, নগদ অর্থ এবং পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে মোট প্রায় ৯০ লাখ টাকা আসামিকে দেওয়া হয়েছে। এসব লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশের ব্যাংক ও আর্থিক নথি তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও আর্জিতে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া, বিয়ের পর ফিনল্যান্ডে যাওয়ার আগে বাদীর পরিবারের কাছ থেকে ২৭ ভরি স্বর্ণালঙ্কার গ্রহণ করেন আসামি। পরে ওই স্বর্ণ ফেরত চাইলে তা আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডে যাওয়ার পর আসামি বাংলাদেশের পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি রাজকীয় বাড়ি নির্মাণ, ফিনল্যান্ডে একটি বার স্থাপনের জন্য ৮ কোটি টাকা দাবি করেন। সর্বশেষ ২০ জুন বাংলাদেশে একটি খামার স্থাপনের জন্য ৪২ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করলে বাদী যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারায় ঢাকার আদালতে মামলা করেন। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

বাদীর অভিযোগ, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পরে তিনি জরুরি সেবায় ফোন করলে ফিনল্যান্ডের পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আসামিকে আটক করে। ওই ঘটনার পর পুলিশি তদন্ত, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং অন্যান্য নথির ভিত্তিতে ফিনল্যান্ডে একাধিক মামলা দায়ের হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, বর্তমানে ফিনল্যান্ডে মো. আজিমুর রহমানের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন, প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করে ইউরোপে যাওয়ার অভিযোগ, জোরপূর্বক অর্থ আদায় ও ভরণপোষণের ব্যয় বহনে বাধ্য করা, ম্যারিটিয়াল রেপ এবং শিশুর সামনে অনৈতিক আচরণ সংক্রান্ত অভিযোগসহ মোট চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে বৈবাহিক ধর্ষণের অভিযোগের সমর্থনে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সনদও রয়েছে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ফিনিশ পুলিশ তাকে খুঁজছে এবং তিনি ইউরোপের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন। মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব আইনি জটিলতার কারণে তার বিরুদ্ধে ইউরোপে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তিনি শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছেন বলে বাদীপক্ষ দাবি করেছে।

এদিকে, বাংলাদেশে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির খবর পাওয়ার পর মো. আজিমুর রহমান কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আর্জিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আসামি বর্তমানে বাদীকে তালাক না দিয়ে নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন এবং বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন। একই সঙ্গে, বিয়ের আগে নিজের পূর্বের একাধিক বিবাহের তথ্য গোপন করে প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

বাদীর দাবি, এসব ঘটনার ফলে তিনি এবং তার সন্তান গুরুতর মানসিক ট্রমা, বিষণ্নতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমানে তারা ফিনল্যান্ডে চিকিৎসা ও থেরাপি নিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আসামির মা মোছা. কহিনুর বেগম, ভাই বরিশাল যমুনা ব্যাংকে কর্মরত মো. আরিফুর রহমান, ভাইয়ের বউ মনিপুর কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা লিটা, বোন রুমা এবং বোনের স্বামী জাকিরকে বিষয়টি জানানো হলেও তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি; বরং আসামিকে সমর্থন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বাদী আদালতের কাছে অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, গ্রেফতার, যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা, তার কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার ফেরত এবং অন্যান্য আইনি প্রতিকার চেয়েছেন।

মামলার অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মো. আজিমুর রহমান ওরফে আজিম গাজীর বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করলো ব্রিটিশ ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ‘ভল্ট’

ব্রিটিশ ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ‘ভল্ট’ বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে। শনিবার (২৫ জুলাই) সিলেটে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক খালেদ আহমেদ এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ভল্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের শতভাগ মালিকানাধীন ‘ভল্ট’ যুক্তরাজ্যের হসপিটালিটি খাতে পেমেন্ট সলিউশন ও পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) সেবা দিয়ে আসছে। গত এক দশক ধরে এর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও পরিচালনা কাঠামো সিলেটভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ইওটেক’ পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশের হসপিটালিটি খাতে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ফিনটেক সেবা সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে ভল্টের বৈশ্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশভিত্তিক প্রযুক্তি সক্ষমতাও ব্যবহৃত হবে।

দেশে নতুন ফিনটেক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরুর প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক খালেদ আহমেদ বলেন, ভল্টের এই উদ্যোগ সিলেটের প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতার প্রতিফলন। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। স্থানীয় মার্চেন্টদের ডিজিটাল লেনদেনে যুক্ত করতে যুক্তরাজ্যের ট্রানজেকশন প্রসেসিংয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর এ উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানে ভল্ট হোল্ডিংসের কো-ফাউন্ডার ও সিপিও এবং ভল্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আসাদ জামান বলেন, সিলেটের প্রকৌশলীরা এক দশক ধরে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করছেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। এই ইকো-সিস্টেমের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নগদ লেনদেন থেকে সরে এসে ডেটা-চালিত ডিজিটাল অপারেশন ও ম্যানেজমেন্ট টুল ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এর ফলে ব্যবসা পরিচালনায় প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে।

পেট্রোল-ডিজেলচালিত গাড়ির দাম আরও বাড়তে পারে

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পেট্রোল ও ডিজেলচালিত আমদানি করা গাড়ির ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে এসব গাড়ির দাম বাড়তে পারে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ হাজার ২০০ সিসি থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি ইঞ্জিনের পেট্রোল ও ডিজেল গাড়ির মোট করের হার বর্তমান ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করা হবে।

তবে অন্যান্য ধরনের গাড়ির কর কাঠামো আগের মতোই থাকবে।

অন্যদিকে, বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) এবং প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যেন পরিবেশবান্ধব গাড়ির ব্যবহার বাড়ে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমে।

পুশ ইন ও সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে ১১ দলের ২ দিনের কর্মসূচি

ভারতের সীমান্তে ‘পুশ ইন’ এবং বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বন্ধের দাবিতে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ১২ জুন দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ এবং ১৫ জুন ঢাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।

আজ বুধবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও বক্তব্য রাখেন।

আযাদ অভিযোগ করেন, সীমান্ত হত্যা দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও বর্তমান সরকারের আমলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে—এই তিন মাসে সীমান্তের ৫০টির বেশি স্থানে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে ১৯ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ২৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া, বিএসএফ ও মিয়ানমারের আরাকান আর্মির হাতে ৮৩ জন আটক বা অপহরণের শিকার হয়েছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের সমালোচনা করে আযাদ বলেন, ‘সীমান্তে কাউকে হত্যা করার কোনো আইনগত বিধান নেই। কেউ অপরাধ করলেও তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। সরাসরি গুলি করে হত্যা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।’

তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন ছিলাম, আছি এবং থাকব। যেকোনো মূল্যে পুশ ইনের চেষ্টা প্রতিহত করা হবে।’

১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী ১২ জুন সীমান্তবর্তী জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এসব কর্মসূচিতে ১১ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা অংশ নেবেন। এছাড়া, ১৫ জুন রাজধানী ঢাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, শূন্যরেখার কাছে মানবিক সংকটের মুখে পড়া লোকজনকে খাবার ও পানির জন্য অনুরোধ করতে দেখা গেছে।

তিনি সীমান্তে নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পুশ ইন ঠেকাতে বিজিবিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের জনগণকে মানবপ্রাচীর গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো সন্ত্রাসী, চোরাকারবারি বা অপরাধী বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও সরকারের কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্যের সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতিকে কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ‘এখানে বাংলাদেশের মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব জড়িত,’ যোগ করেন তিনি।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘১৯৭১ সালে যেমন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তেমনই সীমান্তে যদি কোনো রাষ্ট্র বা বাহিনী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করে, তাহলে দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইন বন্ধে সরকারকে আরও সক্রিয় কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি নিতে বলেন তারা।

ঈদেই কেন বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে

ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মিশে আছে এক গৌরবোজ্জ্বল ও সোনালী অধ্যায়। এক সময় এ দেশে নিয়মিত নির্মিত হতো অসংখ্য ব্যবসাসফল ও মানসম্মত চলচ্চিত্র, যা দর্শকদের হলমুখী করতে জাদুর মতো কাজ করত।

তখন কেবল ঈদ বা বিশেষ উৎসব নয়, সারা বছরজুড়েই বড় বাজেটের সিনেমাগুলো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেত। তবে সময়ের বিবর্তনে সেই চিরচেনা চিত্র এখন অনেকটাই ম্লান।

গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তির জন্য নির্মাতারা এখন কেবল দুই ঈদকেই বেছে নিচ্ছেন, যা চলচ্চিত্র পাড়াকে যেন কেবল উৎসবকেন্দ্রিক করে তুলেছে।

বিষয়টি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন কয়েকজন নির্মাতা ও শিল্পী।

‘উৎসব’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ঢালিউডের আলোচিত দুই সিনেমা। দুটি সিনেমাই পরিচালনা করেছেন তানিম নূর। তিনি বলেন, আমাদের এখানে সিনেমা প্রযোজনা করাটাই ঝুঁকিপূর্ণ; সহজে কেউ প্রযোজনায় আসতে চান না। না চাওয়ার অন্যতম কারণ হলো—লগ্নিকৃত টাকা তো ফেরত আসতে হবে।

তিনি আরও বলেন, একটা সময় ছিল, ঈদ ছাড়া সারা বছর সিনেমা মুক্তি দিয়ে সেই বিনিয়োগ তুলে আনা সম্ভব হতো। এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ঈদে মুক্তি দেওয়া হলে তবুও কিছুটা টাকা উঠে আসার সম্ভাবনা থাকে, কিছুটা স্বপ্ন বেঁচে থাকে।

‘এ কারণেই আমি মনে করি, ঈদ ছাড়া বড় বাজেটের সিনেমা এ দেশে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। তবে এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসা দরকার।’

মিশা সওদাগর অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তার ক্যারিয়ারে বহু ব্যবসাসফল সিনেমা যুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র ঈদের সময় বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি দিলে উন্নতি হবে না; সারা বছর ধরেই সিনেমা মুক্তি দিতে হবে। তাহলেই ঢাকাই সিনেমা চাঙা হবে। অন্তত ১২ মাসে ১২টি হিট সিনেমা দরকার।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরুন বারো মাসে এক বছর—আমি এক মাস খেলাম, আর এগারো মাস না খেয়ে থাকলাম; তাহলে জীবন চলবে না, থেমে যাবে। সেভাবেই যদি দুটি ঈদে বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি দেওয়া হয়, তাহলে কীভাবে চলচ্চিত্র শিল্প টিকে থাকবে, ঘুরে দাঁড়াবে? প্রথমত ভালো সিনেমা এবং দ্বিতীয়ত বড় বাজেটের সিনেমা—দুটিই বছরব্যাপী মুক্তি পেতে হবে।

‘মনপুরা’খ্যাত পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, আমাদের ভঙ্গুর চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য ঈদকেন্দ্রিক বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি কোনোভাবেই ফলপ্রসূ হতে পারে না, হবেও না। এভাবে চলতে পারে না। চলচ্চিত্রশিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে অবশ্যই সারা বছর কিছু কিছু বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি দিতে হবে এবং ভালো সিনেমা নির্মাণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের এখানে যারা প্রযোজনা করেন, তাদের কাছে অনুরোধ, বছরব্যাপী সিনেমা মুক্তি দিন। পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। সারা বছর দর্শকদের জন্য সিনেমা উপহার দিতে হবে; এর কোনো বিকল্প নেই।

তৌকীর আহমেদ এ পর্যন্ত সাতটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন। তার সিনেমা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও প্রশংসা ও সম্মান পেয়েছে। তিনি বলেন, এটুকু বলতে পারি যে ভালো গল্পের সিনেমা হলে দর্শক তা দেখেন; এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। দর্শকরা ভালো গল্পের সিনেমাই চান। কাজেই ঈদের সময় দর্শক বেশি পাওয়া যায়, কিন্তু অন্য সময় পাওয়া যাবে না, তা নয়। চেষ্টা করলে সবই সম্ভব। এজন্য বলতে পারি, বারো মাসই সিনেমা মুক্তি পেতে পারে। তাহলে দর্শকরা দেখবেন, ভালো সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে—তখন তারা হলে যাবেন।

চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত বেশিরভাগ সিনেমাই দর্শকদের কাছে পৌঁছেছে; তার সিনেমাভাগ্য ভালো বলা যায়। দেশের বাইরেও তিনি সিনেমা করেছেন। বছরব্যাপী সিনেমা মুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের সিনেমার সোনালি অতীত রয়েছে, এবং একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যও আছে। একইসঙ্গে বলব, এখনো দর্শকরা ভালো সিনেমার অপেক্ষায় থাকেন এবং ভালো সিনেমা হলে গিয়ে দেখেন। এর সর্বশেষ প্রমাণ এবারের ঈদের সিনেমাগুলো।

তিনি বলেন, আমি মনে করি, বছরজুড়ে সিনেমা মুক্তি পাওয়া দরকার। শুধু কেন দুটি ঈদে বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পাবে? স্বীকার করছি, ঈদে দর্শকরা বেশি করে হলমুখী হন; কিন্তু আমরা যদি ১২ মাস ধরে ভালো সিনেমা মুক্তির বিষয়টি নিয়ে না ভাবি, তাহলে হবে না। ভাবতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজও করতে হবে।

ঢাকাই সিনেমার দর্শকপ্রিয় নায়ক সিয়াম আহমেদ। তার ঝুলিতে বেশ কিছু সফল সিনেমা যুক্ত হয়েছে। ‘জংলি’ সিনেমা দিয়ে গত বছর তিনি বেশ আলোচিত হন। এ বছর ‘রাক্ষস’ সিনেমায় নতুনভাবে দর্শকদের সামনে এসেছেন এবং প্রশংসা কুড়াচ্ছেন।

সারাবছর সিনেমা মুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, চলচ্চিত্রের একজন শিল্পী হিসেবে আমি মনে করি, সারাবছর বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পাওয়া দরকার। পাশাপাশি ভালো ভালো সিনেমাও সারা বছর জুড়ে মুক্তি পাওয়া উচিত। তাহলে দর্শকরা বেশি করে ভালো সিনেমা দেখতে পারবেন। এ বিষয়ে প্রযোজক ও পরিচালকদের আরও বেশি করে ভাবতে হবে।

খামেনির মৃত্যুর পর আলোচনায় খোমেনির নাতি

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুলুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছেন।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি কে হবেন, তা নির্ধারণে আলেমদের আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

৮৬ বছর বয়সী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হওয়ার পর দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—এবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন?

হাসান খোমেনি প্রয়াত রুহুলুল্লাহ খোমেনির ১৫ নাতি-নাতনির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত। ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের ভেতরে তাকে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি হিসেবে দেখা হয়। তিনি সংস্কারপন্থী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও রাখেন।

রয়টার্স জানায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ও হাসান রুহানির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো। তারা দায়িত্বে থাকাকালে পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন।

৫৩ বছর বয়সী খোমেনি দক্ষিণ তেহরানে তার দাদার মাজারের তত্ত্বাবধায়ক। এই দায়িত্ব তাকে জনজীবনে একটি প্রতীকী গুরুত্ব দিয়েছে। তবে তিনি কখনো সরকারি কোনো পদে দায়িত্ব পালন করেননি।

ইরানের কিছু রাজনীতিক তাকে খামেনির আমলে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা কট্টরপন্থীদের, বিশেষ করে তার ছেলে মোজতাবা খামেনির সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেন।

জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতার পর কিছু রাজনীতিক মনে করেন, দেশকে স্থিতিশীল রাখতে খামেনির জায়গায় একজন মধ্যপন্থি নেতা আসা প্রয়োজন। এ কারণে হাসান খোমেনির নাম আলোচনায় আসে।

১৯৭৯ সালে শাহকে উৎখাত করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই ব্যবস্থার প্রতি অনুগত থাকলেও হাসান খোমেনি মাঝে মাঝে সংস্কারের কথা বলেন এবং ভিন্নমত প্রকাশ করেন।

২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা গার্ডিয়ান কাউন্সিল যখন অনেক সংস্কারপন্থী প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করে, তখন তিনি এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।

সে সময় খোমেনি বলেন, ‘আপনি আমার জন্য কাউকে বেছে দিয়ে আমাকে বলতে পারেন না যে তাকে ভোট দিতে হবে!’

এর ফলে কট্টরপন্থী ইব্রাহিম রাইসির নির্বাচনে জয়ের পথ সহজ হয়। রাইসি ২০২৪ সালে এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনাতেও তিনি জবাবদিহি দাবি করেন। পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার পর ওই তরুণীর মৃত্যু দেশজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দেয়।

খোমেনি বলেন, ‘নির্দেশনা ও শিক্ষার অজুহাতে এই ২২ বছর বয়সী মেয়েটির সঙ্গে কী ঘটেছে, তা কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।’

তবে তিনি বিক্ষোভকারীদের সব অবস্থানের সঙ্গে একমত ছিলেন না। খামেনির বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার বিষয় নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন।

ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতার সময় তিনি রাষ্ট্রের পক্ষেই অবস্থান নেন। কিছু বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে তিনি ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করার অভিযোগ তোলেন। সরকারপন্থী মিছিলে অংশ নেন এবং কিছু সহিংসতার সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের কর্মকাণ্ডের তুলনা করেন।

খামেনির মৃত্যুর পর এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, খামেনি চিরকাল ‘ইরানের জনগণ ও মুসলমানদের নায়ক’ হয়ে থাকবেন। তিনি আরও বলেন, ইরানের জনগণ ইমাম খোমেনির পথেই এগিয়ে যাবে।

২০১৫ সালে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খোমেনির এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে প্রগতিশীল ধর্মতাত্ত্বিক হিসেবে বর্ণনা করেন। সংগীত, নারীর অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত বলে জানা যায়।

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন এবং ইসলামি চিন্তার পাশাপাশি পাশ্চাত্য দর্শনেও আগ্রহী।

২০১২ সালে কিছু সংস্কারপন্থী নেতা তাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানালেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আলোচনায় অংশ নেওয়া হাসান রুহানির সরকারকে তিনি সমর্থন করেছিলেন। ওই চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটি বাতিল করেন।

পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানিদের যে অর্থনৈতিক কষ্ট হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি কথা বলেছেন।

এক দশক আগে তিনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের নির্বাচনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন।

প্রাথমিকভাবে খামেনির সম্মতি পেলেও পরে গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে।

অযোগ্য ঘোষণার কারণ হিসেবে তার ধর্মীয় পদবী উল্লেখ করা হয়। তিনি হুজ্জাতুল ইসলাম, যা আয়াতুল্লাহর চেয়ে এক ধাপ নিচের মর্যাদা। তবে অনেকেই মনে করেন, তাকে অযোগ্য ঘোষণার পেছনে রাজনৈতিক কারণ ছিল।

২০০৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার দাদার উত্তরাধিকার অনুসরণ করতে হলে সেনাবাহিনীকে রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে। অনেকেই এটিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সমালোচনা হিসেবে দেখেন।

তবে এ বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোপুরি দূরবর্তী নয়।

গত বছর ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের বিমানযুদ্ধের সময় তিনি খামেনিকে চিঠি লিখে তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে এবং ইরানি জাতির জন্য গর্বের কারণ হয়েছে।

সংবাদ মাধ্যম জামারানে প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, তিনি ইসরায়েলকে ‘অশুভ জায়নবাদী শাসন’ বলে উল্লেখ করেন এবং মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

জীবনী অনুযায়ী, তিনি আরবি ও ইংরেজিতে সাবলীল। ২১ বছর বয়স পর্যন্ত ফুটবল খেলতেন। পরে তার দাদা তাকে কুম শহরে গিয়ে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করতে বলেন।

এসব কারণেই তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দৌড়ে থাকবেন বলে মনে করা হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানালেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত

দায়িত্ব নেওয়ার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।

একইসঙ্গে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক আরও জোরদারে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।

আজ সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ক্রিস্টেনসেন এ অভিনন্দন জানান।

বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশকে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করতে ঢাকার সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখতে ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এর আগে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন: বিএনপি ও বিরোধী দলের বাড়তে থাকা দূরত্ব উদ্বেগও বাড়াচ্ছে

স্বাধীনতার পর আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম সংসদীয় শাসনব্যবস্থা দিয়ে। কিন্তু পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু নিজেই একদলীয় ব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের আদর্শ থেকে সরে আসেন।

জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর সৌভাগ্যক্রমে বাকশালের প্রায় সব কাঠামোই বিলুপ্ত করেন, কেবলমাত্র রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা ছাড়া। পরবর্তীতে তৎকালীন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনেন। এই ঘটনাটিকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ বলা যেতে পারে। কারণ, মূলত তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগই এই দাবি জানিয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু এবং তার পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পুরো জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্দীপ্ত করা জেনারেল জিয়াউর রহমান—দুজনকেই হত্যা করে সশস্ত্র বাহিনীরই কিছু সদস্য। পরিহাসের বিষয় হলো, হত্যাকারীরাও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী গোষ্ঠীই প্রবাসী সরকারের চার জাতীয় নেতা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং দুই জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা করে। বিভিন্নভাবে আমরা আরও হারিয়েছি মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, মেজর জেনারেল মঞ্জুর, কর্নেল তাহেরসহ আরও অনেককে, যারা হয়তো ততটা পরিচিত বা উচ্চপদস্থ ছিলেন না।

এমন মর্মান্তিক ও আত্মঘাতী অভিজ্ঞতাগুলো থেকেও আমরা কিছুই শিখিনি, উল্টো নিজেদের মধ্যে লড়াই চালিয়ে গেছি। আমরা বুঝতেই পারিনি যে, এমন প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা এবং লাখো সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ তরুণদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকে প্রহসনে পরিণত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে যারা মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করে না, সেই শক্তিগুলো ইতিহাস বিকৃত করার সুযোগও পাচ্ছে।

দীর্ঘ গণআন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে এরশাদের সরকারের পতন হয় এবং দেশে গণতন্ত্র, সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ও নির্বাচিত সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। (কাকতালীয়ভাবে, ঠিক সেই সময়েই ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারের জন্ম হয়।)

আমরা সবাই ভেবেছিলাম, অবশেষে মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক লক্ষ্য ‘গণতন্ত্রে’ আমরা ফিরেছি। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে নিয়মতান্ত্রিক জাতীয় নির্বাচন পেয়েছি। কিন্তু ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে হয় কারচুপির নির্বাচন, যার পরিণতিতে পতন হয় শেখ হাসিনার সরকারের।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা আমাদের কিছু স্থায়ী শক্তি দিয়েছে। আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারলেও এই ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রয়েছে। এই সময়কালে অর্থনীতি এগিয়েছে, বেসরকারি খাত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের আভাস পেয়েছে। এই সময়কালের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা হলো শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর। গণতান্ত্রিক এই সময়কালে শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশ প্রমাণ করতে পেরেছে যে, এর মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আমরা আবারও নির্বাচিত সরকার, নির্বাচিত সংসদ, সক্রিয় বিরোধী দল, নতুন নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতির মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরে এসেছি।

আজ বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এই স্থিতিশীলতার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সুশাসন। এমন এক অবস্থার মধ্যেই সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর প্রধান ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে তারা সরকার পতনের লক্ষ্যে রাজপথে নামবেন। আমরা এ ধরনের হুমকিকে উদ্বেগজনক মনে করি। এ ধরনের অবস্থান গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং সার্বিকভাবে দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

জামায়াতের এমন বক্তব্যের সমালোচনার পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিএনপি যা করছে, সেটিও পর্যালোচনা করা উচিত। কেননা, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘জনগণের ইচ্ছা’। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজের নেতৃত্বে দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। তার মধ্যে বেশকিছু দল সুপরিচিত নয়। কিন্তু, তারপরও এটি ছিল এক ইতিবাচক উদ্যোগ। কেননা, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট সঙ্গী এবং জাতীয় পার্টি ছাড়া দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলকে সংলাপের টেবিলে আনা হয়েছিল।

কয়েক মাসের আলোচনার পর ‘জুলাই সনদ’ প্রণীত হয় এবং ২৬টি রাজনৈতিক দল এতে সই করে। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন। এই আদেশ সনদ বাস্তবায়ন এবং যেসব সংস্কার প্রস্তাবের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে গণভোট আয়োজনের আইনি কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়।

কমিশনের কাজ শেষ হওয়ার পর মোট ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়, যার মধ্যে ৪৮টির জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। বাকি বিষয়গুলো নির্বাহী আদেশ ও আইন সংশোধনের মাধ্যমেই কার্যকর করা সম্ভব। সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন এমন ৪৮টি বিষয়ের মধ্যে মাত্র ৯টিতে বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে।

সবমিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত সফল বলা যায়। কারণ, যেখানে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিভাজন, সেখানে এমন ঐকমত্য নিঃসন্দেহে এক বড় সাফল্য।

সাংবিধানিক পরিবর্তন আনতে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিনই একটি গণভোটের আয়োজন করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার এমন একটি গণভোট দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করে, যার বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভোটারদের পরিপূর্ণ বোঝাপড়া ছিল না। সাধারণত গণভোট হয় সুনির্দিষ্ট ও সহজবোধ্য কোনো বিষয়ে এবং সেখানে ভোটার ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলতে পারেন। কিন্তু এই গণভোটে চারটি পৃথক প্রশ্নের মাধ্যমে ঐকমত্য কমিশনে আলোচিত ৪৮টি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অসংখ্য সাংবিধানিক সংশোধনীকে একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা এবং সেগুলোর অর্থ ও প্রভাব সম্পর্কে ভোটারদের যথাযথভাবে অবহিত না করা ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত। অধিকাংশ ভোটারই জানতেনই না, তারা আসলে কী বিষয়ে ভোট দিচ্ছেন।

গণভোটে আরও প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, নির্বাচিত সংসদ শুধু আইনসভা হিসেবেই নয়, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও কাজ করবে। আর এখানে এসেই ঐক্য ভেঙে যায়। বিএনপি এই প্রস্তাব কখনোই মেনে নেয়নি। তাদের প্রস্তাব ছিল, সংশোধনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক সংস্কারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাদের এই প্রস্তাব অনেক বেশি আনুষ্ঠানিক ও বহুল প্রচলিত। এমনকি এই পদ্ধতি বিশ্বজুড়েও প্রচলিত।

কিন্তু, সরকার গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত জুলাই সনদ এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির অবস্থান গুরুতর কিছু প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। যেসব বিষয়ে সর্বসম্মত ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নেও বিএনপির গড়িমসি গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। তাদের ব্যাখ্যা হলো, সংবিধান সংশোধনের আগে এসব বিষয় আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এই যুক্তির কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও জুলাই সংস্কার প্রক্রিয়াটি যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটা সম্ভবত সর্বোত্তম উপায় নয়।

আমাদের সংবিধানে নির্বাহী, বিচার ও আইন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথাযথ ভারসাম্য প্রত্যাশিত ছিল। এর উদ্দেশ্য হলো, সব ক্ষমতা যেন নির্বাহী বিভাগের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়ে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সংবিধানে সেই ক্ষমতার ভারসাম্য ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং এমন এক শাসনব্যবস্থার জন্ম হয়, যাকে কিছু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ‘নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন। দুর্ভাগ্যবশত, দীর্ঘকাল ধরে আমরা সেটার মধ্য দিয়েই যাচ্ছি।

আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, কেন আমাদের সংসদীয় শাসনব্যবস্থা একই ধরনের সরকারব্যবস্থা থাকা অন্যান্য দেশের মতো সফল হতে পারেনি? এর উত্তর নিহিত রয়েছে আমাদের নেতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। বরাবরই আমাদের শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির কারণে শীর্ষনেতার ভূমিকা সবসময় জবাবদিহি ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে থেকে গেছে। যখন এমন একটি দল নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং তার শীর্ষনেতা প্রধানমন্ত্রী হন, তখন একজন ব্যক্তির হাতে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীভূত সমস্ত ক্ষমতা সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়।

এর ফলে রাষ্ট্রের বহু প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের শিকার হয় এবং সেগুলো কার্যত দলেরই সম্প্রসারিত অংশে পরিণত হয়। যার উদাহরণ হিসেবে পুলিশ বাহিনীর কথা বলা যায়। এই বাহিনীতে কখনোই প্রকৃত স্বাধীনতা ছিল না। বরং তারা সবসময় বিরোধী দল দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একই কথা আমলাতন্ত্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেখানে পদোন্নতির প্রধান মানদণ্ড দক্ষতা বা সততা নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্য। রাষ্ট্রের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে দলেরই সম্প্রসারিত অংশে পরিণত করার মাধ্যমে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা আর অন্য কোনোভাবেই হয়নি।

আমাদের সংসদকে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক। ১৯৯১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আমরা কখনোই বিরোধী দলকে সংসদে তাদের প্রাপ্য ভূমিকা পালন করতে দিইনি। অন্যদিকে বিরোধী দলও সবসময় মনে করেছে, ক্ষমতাসীন দলের যেকোনো নীতির বিরোধিতা করাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব, এমনকি সেই নীতি দেশের জন্য উপকারী হলেও।

বর্তমানে, সাংবিধানিক পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ দুটি শব্দের মাঝে আটকে আছে—‘সংশোধন’ ও ‘সংস্কার’। বিএনপি সংবিধান ‘সংশোধনের’ বিষয়ে সংলাপের প্রস্তাব দিচ্ছে, অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল সংবিধান ‘সংস্কার’ চাইছে। জামায়াতের এই অনমনীয়তার আসল কারণ হলো, তারা সংবিধান নতুন করে লিখতে চায়, যা সম্ভবত আমাদেরকে এক বিশৃঙ্খল ও সমাধানহীন সংকটের মধ্যে ফেলে দেবে। সংবিধান সংশোধন করা কি সংস্কারেরই আরেকটি রূপ নয়?

বিএনপি গত ২৯ এপ্রিল ১৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। সদস্যদের মধ্যে সাতজন বিএনপি ও পাঁচজন অন্যান্য দল থেকে এবং পাঁচজন বিরোধী দল থেকে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জামায়াত সময় চেয়েছিল। গত ১৬ জুন জামায়াত আমির এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন, তারা এই কমিটিতে যোগ দেবেন না। পরবর্তীতে ১৩ জুলাই শাসক দল জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাস করে।

আমরা মনে করি, জামায়াতের উচিত তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় যোগ দেওয়া। বাইরে থাকার চেয়ে কমিটিতে তাদের উপস্থিতি আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দেবে। সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম যদি তাদের আশানুরূপ না হয়, তাহলে তারা বিরোধিতা করতে পারবে, এমনকি চাইলে সরেও দাঁড়াতে পারবে। তখন তারা জনগণকে সার্বিক বিষয় সম্পর্কে অবগতও করতে পারবে। কিন্তু, বিশেষ কমিটি কীভাবে কাজ করবে সেটা না দেখেই এই কমিটিতে যোগদান থেকে বিরত থাকাটা অন্যদের ওপর জামায়াতের নিজস্ব ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টামাত্র।

শাসক দল ও বিরোধী দলের মধ্যে এখন সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক অবলম্বনের সময় এসেছে। তা না হলে, আবারও জন্ম নিতে পারে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা। আর তেমনটি হলে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে আমাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি।

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার