28 C
Dhaka
Home Blog

বিশ্রাম, অলসতা ও নতুন শ্রম ধারণা: কর্ম-সংস্কৃতির নীরব বদল

বাংলাদেশে ছুটির খবর সবসময়ই এক ধরনের সামাজিক উল্লাস তৈরি করে। বিশেষ করে ঈদের দীর্ঘ ছুটি যেন আমাদের কর্মজীবনের এক অলিখিত উৎসব। এবারও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে চায়ের আড্ডা সবখানেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস।

সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। খবরটি অনেকের কাছে আনন্দের, কারো কাছে ভ্রমণের পরিকল্পনা, আবার কারো কাছে বিশ্রামের মহাউৎসব।

কিন্তু এই দীর্ঘ ছুটির উচ্ছ্বাসের মধ্যেই নীরবে একটি প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি সত্যিই কাজের চেয়ে বিশ্রামকে বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছি? নাকি বদলে যাওয়া বিশ্ব-বাস্তবতায় আমাদের কর্ম-সংস্কৃতিই নিঃশব্দে পাল্টে যাচ্ছে?

কোভিড-পরবর্তী পৃথিবী, ডিজিটাল অফিস, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, অনলাইন মিটিং, আর সার্বক্ষণিক সংযুক্ত জীবনের ভেতর দাঁড়িয়ে বাঙালির কর্ম-সংস্কৃতির চিত্র এখন আগের মতো নেই। বাইরে থেকে স্থির মনে হলেও ভেতরে ভেতরে ঘটছে এক নীরব রূপান্তর।

‘দিনভর বিশ্রামেই ক্লান্ত’। বাক্যটি শুনতে কৌতুকের মতো লাগলেও এর ভেতরে আজকের বাঙালির কর্ম-সংস্কৃতির এক গভীর সংকট লুকিয়ে আছে। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে কাজের চেয়ে কাজের অভিনয় অনেক সময় বেশি দৃশ্যমান। আবার অন্যদিকে এমনও অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা সীমাহীন পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি বা জীবনমান পান না।

সরকারি অফিসের ঢিলেঢালা পরিবেশ, চাকরির নিশ্চিন্ত আরাম, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, বেসরকারি চাকরির অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ডিজিটাল শ্রমের অদৃশ্য চাপ এবং কোভিড-পরবর্তী ওয়ার্ক ফ্রম হোম, সব মিলিয়ে আমাদের কর্মজীবনের ধারণাই পাল্টে গেছে। বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি আবার আলোচনায় এসেছে।

রোজার সময়সূচি অনুযায়ী সকাল ৯টার আগেই প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে উপস্থিত হওয়ায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর সময়মতো অফিসে আসা যদি ‘অভিভূত হওয়ার’ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে সময়নিষ্ঠা কতটা ব্যতিক্রমী হয়ে গেছে। অথচ রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ ব্যক্তি যদি সময়ানুবর্তিতার দৃষ্টান্ত তৈরি করেন, সেটি নিচের স্তরে কিছুটা হলেও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরি দীর্ঘদিন ধরেই ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে বিবেচিত। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে, সরকারি দপ্তরে সময়মতো কেউ আসে না, কাজের গতি ধীর, ফাইলের চেয়ে চায়ের কাপ বেশি ঘোরে। ধারণাটি পুরোপুরি অসত্য নয়। বিশেষ করে ছুটির আগে বা উৎসবকেন্দ্রিক সময়গুলোতে সরকারি অফিসের কর্মচাঞ্চল্য প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু এই চিত্রের পেছনে শুধু কর্মচারীর আলস্যকে দায়ী করলে বাস্তবতা আড়াল হয়।

একজন সরকারি কর্মচারী যদি প্রতিদিন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে অর্ধাহারে জীবনযাপন করেন, ভাঙা বাস বা ঝুলন্ত টেম্পোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াত করে অফিসে পৌঁছান, তাহলে তিনি কতটা উদ্যম নিয়ে আট ঘণ্টা রাষ্ট্রকে শ্রম দিতে পারবেন? রাষ্ট্র কি তাকে এমন একটি কর্মপরিবেশ দিতে পেরেছে, যেখানে কাজের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত দায়বদ্ধতা তৈরি হয়? প্রণোদনা, সম্মান, দক্ষতার মূল্যায়ন কি বাস্তবেই কার্যকর?

আমাদের কর্ম-সংস্কৃতির বড় সমস্যা হলো, এখানে শ্রমের মর্যাদা নিয়ে আমরা মুখে যত কথা বলি, বাস্তবে ততটা বিশ্বাস করি না। কৈশোরে পড়েছি, বিশ্রাম কাজের অঙ্গ। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক সময় বিশ্রামই যেন মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কাজের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য বিশ্রাম নেই না, বরং বিশ্রামের সুযোগ তৈরি করার জন্যই নানা ব্যস্ততা তৈরি করি। এই মানসিকতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও।

অথচ পৃথিবীর উন্নত শ্রম-সভ্যতাগুলোর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কাজের মর্যাদার ওপর। সোভিয়েত রাশিয়ায় বলা হতো, ‘কর্মই আত্মসম্মানের ভিত্তি।’ জাপানে কর্মপাগল সংস্কৃতি প্রায় জাতীয় পরিচয়ের অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জাপান উঠে দাঁড়িয়েছিল শ্রমশক্তির শৃঙ্খলা দিয়ে। সেখানে সময়ানুবর্তিতা কেবল অফিস নীতি নয়, সামাজিক নৈতিকতা।

কর্ম-সংস্কৃতির সংকট শুধু সরকারিখাতে সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারিখাতে আবার উল্টো চিত্র। এখানে ‘অতিরিক্ত কাজ’ যেন দক্ষতার পরিচয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বহু আগেই বলেছে, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মানুষ যন্ত্র নয়। দীর্ঘ সময় কাজ করলে মনোযোগ কমে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়, ভুল বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে ওভারটাইম এখন ব্যতিক্রম নয়, অনেক ক্ষেত্রে নিয়মে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে করপোরেট ও প্রযুক্তিনির্ভর চাকরিতে ‘সর্বক্ষণ অনলাইন’ থাকার এক অদৃশ্য সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অফিস শেষ হলেও কাজ শেষ হয় না। মুঠোফোন, মেইল, ভিডিও মিটিংসহ নানা কাজে সবসময় কর্মীকে সংযুক্ত থাকতে হয়। কোভিড-পরবর্তী ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে।

কোভিড-পরবর্তী কর্ম-সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ‘প্যানঅপটিকন’ তত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুকো বলেছিলেন, আধুনিক সমাজে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় দৃশ্যমান নজরদারির মাধ্যমে। একসময় অফিসে বস, হাজিরা খাতা কিংবা সিসিটিভি ছিল সেই নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার প্রতীক। কিন্তু কোভিডের পর এই নজরদারি ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। এখন কর্মীকে অনলাইনে সক্রিয় থাকা, দ্রুত জবাব দেওয়া, ভার্চুয়াল মিটিংয়ে উপস্থিত থাকা কিংবা বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাজের গতিবিধি জানান দিতে হয়। অর্থাৎ অফিসের শারীরিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বদলে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘ডিজিটাল প্যানঅপটিকন’, যেখানে কর্মী সারাক্ষণ অদৃশ্য প্রযুক্তিগত নজরদারির মধ্যে অবস্থান করছে।

একইসঙ্গে কার্ল মার্ক্সের এলিয়েনশন থিওরি বা বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বও কোভিড-পরবর্তী কর্ম-সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। মার্ক্স বলেছিলেন, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক ধীরে ধীরে তার শ্রম, উৎপাদন ও ব্যক্তিগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ওয়ার্ক ফ্রম হোম সংস্কৃতি এই বিচ্ছিন্নতাকে আরও জটিল করেছে। আগে অফিস ও ব্যক্তিগত জীবনের একটি স্পষ্ট সীমারেখা ছিল। এখন সেই সীমা প্রায় বিলীন। ঘরই অফিসে পরিণত হয়েছে। ফলে কর্মীকে দিন-রাত সবসময় কাজের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কাজের সময় শেষ হলেও মানসিকভাবে কাজ শেষ হয় না। এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে নতুন ধরনের ডিজিটাল ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ, যেখানে মানুষ নিজের ঘরেও অফিসের চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারছে না।

একসময় বাঙালি অফিস মানেই বুঝত নির্দিষ্ট ভবন, নির্দিষ্ট টেবিল, হাজিরা খাতা আর বিকেল ৫টার ছুটি। কিন্তু বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তি সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এখন ঢাকার একজন তরুণ রাত ২টায় নিউইয়র্কের টিমের সঙ্গে মিটিং করছেন, আবার সকালে সিঙ্গাপুরের ক্লায়েন্টের জন্য রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন। বাসা ও অফিসের সীমানা মুছে গেছে। কাজের সময়ও আর নির্দিষ্ট নেই।

এই নতুন সংস্কৃতিকে কি আমরা ‘আধুনিক কর্ম-দাসত্ব’ বলব, নাকি ‘ডিজিটাল স্বাধীনতা’? উত্তর সহজ নয়। ওয়ার্ক ফ্রম হোম একদিকে যাতায়াতের সময় ও খরচ কমিয়েছে, পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে; অন্যদিকে কর্মঘণ্টাকে অস্পষ্ট করে তুলেছে। আগে অফিসের দরজা পেরোলেই কাজ শেষ হতো। এখন কাজ মানুষের ব্যক্তিগত ঘরে ঢুকে পড়েছে।

আবার আরেকটি বৈপরীত্যও আছে। বাংলাদেশে অনেক সরকারি অফিসে দক্ষ কর্মচারী আছেন, যারা কাজ করতে চান, কিন্তু তাদের কাজ নেই। দক্ষতাকে ব্যবহারের মতো কাঠামো নেই। অন্যদিকে কোথাও কোথাও অদক্ষতা, রাজনৈতিক আনুগত্য ও দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতির সংস্কৃতি কর্মোদ্যম নষ্ট করে দেয়। ফলে একজন মেধাবী কর্মকর্তা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।

বিশ্ব পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থান, শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম বাড়ছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগেও ‘শোভন কাজ’ এখনো সবার নাগালে পৌঁছায়নি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কর্ম-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। অর্থাৎ দীর্ঘ কর্মঘণ্টা সবসময় বেশি উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করে না; বরং ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ বাড়ায়।

কোভিড-পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ক ফ্রম হোম কর্ম-সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা যায়, বাসা থেকে কাজ উৎপাদনশীলতা কিছুটা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ডিজিটাল ক্লান্তি তৈরি করছে। একইসঙ্গে অনলাইন নজরদারির সংস্কৃতিও বেড়েছে। মাইক্রোসফটের জরিপ অনুযায়ী, কর্মীরা নিজেদের কার্যকর মনে করলেও অধিকাংশ ম্যানেজার এখনো কর্মীদের উৎপাদনশীলতা নিয়ে সন্দিহান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যে জানা যায়, বিশ্বে প্রায় ১৯ কোটি মানুষ বেকার এবং ১৫০ কোটির বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে সরকারি চাকরি এখনো তরুণদের কাছে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, শ্রমঘন শিল্প বাড়লেও বাংলাদেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা এখনো অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে এখন কেবল কর্মঘণ্টা নয়, কাজের গুণগত মান ও ফলাফলই কর্ম-সংস্কৃতির নতুন আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকে অমল ও প্রহরীর সংলাপটি সময়ের রহস্য ও মানবিক উপলব্ধিকে এক অসাধারণ প্রতীকে তুলে ধরে—

অমল: তুমি ঘণ্টা বাজাবে না প্রহরী?
প্রহরী: এখনো সময় হয়নি!
অমল: কেউ বলে সময় বয়ে যাচ্চে, কেউ বলে সময় হয়নি। আচ্ছা তুমি ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেইত সময় হবে।
প্রহরী: সে কি হয়? সময় হলে তবে আমি ঘণ্টা বাজিয়ে দিই।

এই সংলাপে রবীন্দ্রনাথ আসলে সময়ের এক গভীর কুহেলিকাকে ধরতে চেয়েছেন। অমলের সরল বিশ্বাস ‘ঘণ্টা বাজালেই সময় হবে’ মানুষের সেই চিরন্তন প্রবণতার প্রতীক, যেখানে আমরা বাহ্যিক ঘটনাকেই সময়ের নিয়ন্ত্রক মনে করি। অথচ প্রহরী জানিয়ে দেয়, মানুষ সময় সৃষ্টি করে না। সময় নিজস্ব নিয়মে প্রবাহিত হয়, মানুষ কেবল তার ঘোষণা দেয়। ঘণ্টাধ্বনি তাই সময়ের জন্ম নয়, তার উপস্থিতির ইঙ্গিতমাত্র।

আধুনিক কর্ম-সংস্কৃতির ভেতরেও এই বিভ্রম স্পষ্ট। কেউ মনে করে অফিসে বসে থাকাই কাজ, কেউ ভাবে অনলাইনে সক্রিয় থাকাই উৎপাদনশীলতা। কিন্তু সময় তার নিজস্ব গতিতেই বয়ে যায়। মানুষ কেবল তার ভেতরে শ্রম, বিশ্রাম ও জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরে।

আমাদের মূল সংকট সম্ভবত কাজের সময় নয়, কাজের দর্শনে। আমরা এখনো শ্রমকে মর্যাদা দেওয়ার চেয়ে চাকরিকে মর্যাদা দেই বেশি। কাজ নয়, পদমর্যাদা—এটিই সামাজিক সম্মানের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। ফলে কর্মদক্ষতার চেয়ে চাকরির নিরাপত্তা, প্রভাব ও সুবিধা বড় হয়ে ওঠে।

একটি সুস্থ কর্ম-সংস্কৃতি গড়ে উঠতে হলে কেবল অফিস সময় কঠোর করলেই হবে না; প্রয়োজন ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়ন, কাজের স্বীকৃতি, উপযুক্ত বেতন, মানসম্মত যাতায়াত, মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব ও দক্ষতাভিত্তিক পুরস্কার ব্যবস্থা। একইসঙ্গে দরকার ‘কম কাজ করাই বুদ্ধিমত্তা’, এই সামাজিক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। কারণ শেষ পর্যন্ত সভ্যতার অগ্রগতি বিশ্রামের ওপর নয়, শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিশ্রাম প্রয়োজন; কিন্তু বিশ্রামের জন্য জীবন নয়, জীবনের জন্যই কাজ।

শেষ পর্যন্ত হয়তো বাঙালির কর্ম-সংস্কৃতিকে পুরোপুরি অলসতা বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। কারণ, পৃথিবীর বহু বড় আবিষ্কারের পেছনেও নাকি অলস মানুষের হাত ছিল। কথিত আছে, অলস মানুষই সবচেয়ে শর্টকাট বুদ্ধি বের করে। কম হাঁটতে চাকা বানায়, কম উঠতে রিমোট বানায়, আর কম অফিস করতে গিয়ে আবিষ্কার করে ওয়ার্ক ফ্রম হোম।

বাঙালিও হয়তো সেই ধারারই উত্তরসূরি। সে কম কাজ করে বেশি বাঁচতে চায়। আবার কম ঘাম ঝরিয়ে বড় সফলতার স্বপ্নও দেখে। সমস্যা হলো, সব অলস মানুষ সৃজনশীল নয়, কিন্তু সব সৃজনশীল মানুষের ভেতরে একটু অলসতা থাকে। তাই আমাদের কর্ম-সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ হয়তো নির্ভর করছে এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটা বোঝার ওপর—আমরা কি সত্যিই সৃজনশীলভাবে কম কাজ করতে চাই, নাকি কাজ এড়ানোর সৃজনশীল অজুহাত খুঁজছি!

 

রাজীব নন্দী: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

বল হাতে উজ্জ্বল নাহিদ, ৯ বছর পর চ্যাম্পিয়ন পেশোয়ার

শুরুটা খরুচে হলেও গতি, বাউন্স ও নিখুঁত ইয়র্কারের মিশেলে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন নাহিদ রানা। বাংলাদেশের তরুণ এই পেসারের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সঙ্গে অ্যারন হার্ডির তোপে ফাইনালে লড়াই করার মতো পুঁজি পেল না হায়দরাবাদ কিংসমেন। এরপর ছোট লক্ষ্য তাড়ায় প্রথমে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়লেও হার্ডি ও আব্দুল সামাদের ঝড়ো জুটির কল্যাণে পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) শিরোপার উল্লাসে মাতল পেশোয়ার জালমি।

রোববার লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ৫ উইকেটে জিতেছে পেশোয়ার। পিএসএলে এটি তাদের দ্বিতীয় শিরোপা। নয় বছর আগে ২০১৭ সালের আসরে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেয়েছিল তারা।

টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে হায়দরাবাদ ১৮ ওভারে মাত্র ১২৯ রানে গুটিয়ে যায়। জবাব দিতে নেমে ২৮ বল হাতে রেখে ৫ উইকেটে ১৩০ রান তুলে জয়ের বন্দরে পৌঁছায় পেশোয়ার।

নাহিদ ৪ ওভারে একটি মেডেনসহ ২২ রানে নেন ২ উইকেট। অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করে ম্যাচসেরা হওয়া হার্ডি ৪ ওভারে ২৭ রানে ৪ উইকেট নেওয়ার পর খেলেন ৫৬ রানের অপরাজিত ইনিংস। তিনি ৩৯ বল মোকাবিলায় মারেন নয়টি চার। পঞ্চম ওভারে কেবল ৪০ রানে পেশোয়ারের ৪ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর সামাদের সঙ্গে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ জুটি বাঁধেন তিনি। তারা ৬০ বলে যোগ করেন ৮৫ রান। সামাদ ৩৪ বলে তিনটি চার ও চারটি ছক্কায় করেন ৪৮ রান।

সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে দুর্দান্ত বোলিং করা নাহিদকে টি-টোয়েন্টি সিরিজে বিশ্রাম দিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তবে শেষ পর্যন্ত একটি বড় বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতার ফাইনালের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাকে পিএসএলে ফের খেলার অনুমতি দেওয়া হয়। আস্থার প্রতিদান দিয়ে বড় ম্যাচের চাপ সামলে ঠিকই জ্বলে ওঠেন এই তরুণ।

হায়দরাবাদের বিপক্ষে ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারে প্রথমবার বল হাতে পেয়ে সাইম আইয়ুবের কাছে একটি করে চার ও ছক্কায় ১৩ রান হজম করেন নাহিদ। তবে ঘুরে দাঁড়াতে একদমই সময় নেননি। অষ্টম ওভারে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে গতিময় বাউন্সারে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে গোল্ডেন ডাকের তেতো স্বাদ দেন তিনি।

এরপর ১৪তম ওভারে আক্রমণে ফিরে ১৪৮ কিলোমিটার গতির এক দারুণ ডেলিভারিতে হুনাইন শাহকে সরাসরি বোল্ড করেন তিনি। ওই ওভারে আসে কেবল একটি লেগ বাই। নিজের শেষ ও ইনিংসের ১৭তম ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের ধারা জারি রেখে নাহিদ খরচ করেন মাত্র ৪ রান। সব মিলিয়ে নিজের শেষ তিন ওভারে একটি মেডেনসহ স্রেফ ৯ রান দিয়ে ২ উইকেট তুলে নেন এই গতিময় পেসার।

এক পর্যায়ে ২ উইকেটে ৭১ রান তুলে ফেললেও হার্ডি ও নাহিদের তোপে হায়দরাবাদ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। স্কোরবোর্ডে ৯০ রান জমা হতে নেই হয়ে যায় ৭ উইকেট। শেষমেশ অল্প পুঁজি নিয়ে পেশোয়ারকে চমকে দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। একপ্রান্ত আগলে পাঁচটি চার ও দুটি ছক্কায় সাইম করেন ৫০ বলে ৫৪ রান। তবে যোগ্য সঙ্গ তিনি পাননি ম্যাক্সওয়েল, উসমান খান বা কুসল পেরেরার কাছ থেকে।

সয়াবিন তেলের আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছে

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সয়াবিন তেলের আমদানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশ কম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে।

আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় না করায় তারা আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।

তারা বলেন, বর্তমান ও আগের অন্তর্বর্তী সরকারকে অনুরোধ জানানো হলেও দাম সমন্বয় করা হয়নি। লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

এদিকে সরকার বলছে যে আমদানির পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে এবং এই মুহূর্তে কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, পাম তেল আমদানি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন, যা এ বছরের একই সময়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫৭ হাজার টনে।

তবে, এই সময়ে সয়াবিন তেলের আমদানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে; আমদানির পরিমাণ ৪ লাখ ৪৮ হাজার টন থেকে কমে ২ লাখ ৬১ হাজার টনে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভোজ্য তেলের বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ টন, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়।

সম্প্রতি বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কিছু এলাকায় ভোজ্য তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এর প্রাপ্যতাও সংকুচিত হয়ে আসছে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল আমদানি কমে যাওয়ার জন্য দাম সমন্বয় না করার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন।

তিনি জানান, গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে দাম সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল; কিন্তু তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি দাবি করেন, পুরো শিল্প খাত এখন লোকসানের মধ্য দিয়ে চলছে এবং কোনো কোম্পানিই টানা লোকসান সইতে রাজি নয়।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি টন সয়াবিন তেল ১ হাজার ১৫৪ ডলারে বিক্রি হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে এই দাম বেড়ে ১ হাজার ২৮২ ডলারে এবং মার্চে তা আরও বেড়ে ১ হাজার ৪৮২ ডলারে দাঁড়ায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন, এই খাত চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতি লিটারে ২০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হওয়ায় কোম্পানিগুলোর পক্ষে স্বাভাবিক মজুত বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরও দাবি করেন, সয়াবিন তেলের মাত্র একটি চালান আমদানিতেই ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, শুধু কার্যক্রম সচল রাখা, সরবরাহ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং ব্যাংকের দায় মেটানোর জন্য কোম্পানিগুলো সীমিত সরবরাহ বজায় রাখছে। ডিলাররাও সামান্য লাভে উচ্চ মাসিক ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

গত মঙ্গলবার নিত্যপণ্যের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গঠিত ১১তম টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আমদানির জন্য বড় অংকের পুঁজির প্রয়োজন হয় এবং সেই পর্যায়ের মূলধন কেবল বড় ব্যবসায়ীদেরই রয়েছে। তাই আমরা নিত্যপণ্যের আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।

সয়াবিন তেলের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের সংগৃহীত তথ্য বলছে যে বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ে দাম লেখা থাকায় এতে কোনো ধরনের কারসাজি করার সুযোগ থাকে না।

তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ ‘কিছুটা সীমিত’।

তিনি আরও স্বীকার করেন, বাজারে খোলা সয়াবিন তেল ‘পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া গেলেও’ তা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা নিত্যপণ্যের বর্তমান দাম এবং আমদানির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছি। এখন পর্যন্ত আমাদের মূল্যায়ন বলছে যে আমদানির অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। অন্য কথায়, এমন কোনো বড় সমস্যা এখনো দেখা দেয়নি যার জন্য বড় ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে।’

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি

সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ও ‘ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন রুখে দিতে’  ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগর এবং জেলায় বিক্ষোভসহ লিফলেট বিতরণ ও সেমিনার আয়োজনের মতো কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠক শেষে দুপুরে আল ফালাহ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির  মাওলানা মামুনুল হক।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুসারে আগামী ৯ এপ্রিল থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করবেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীরা।

এছাড়া ১১ এপ্রিল দেশের সকল মহানগরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে। ১২ এপ্রিল একই কর্মসূচি পালিত হবে সকল জেলায়।
১৩ এপ্রিল ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।

মামুনুল হক বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে নানা রকম ছলচাতুরি করছে। তারা সুস্পষ্টত মানুষের ম্যান্ডেটকে অপমান করেছে।

তিনি বলেন, দায়িত্বশীল জায়গা থেকে বিরোধী দল চুপ থাকতে পারে না। ফ্যাসিবাদের এই প্রত্যাবর্তনকে আমরা রুখে দিব। আমরা গণভোটের রায় যেভাবে হোক কার্যকর করব। আমরা এই দাবির পক্ষে অব্যাহতভাবে কর্মসূচি পালন করে যাব।

দমের ‘রানী’ পূজা চেরি

ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দম’ সিনেমায় ‘রানী’ চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হচ্ছেন পূজা চেরি। তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো। 

রেদওয়ান রনি নির্মিত সিনেমাটি মাল্টিপ্লেক্সে সবচেয়ে বেশি শো পেয়ে ভালো চলছে। যারা সিনেমাটি দেখছেন, তাদের অনেকেই বিভিন্ন রিভিউতে পূজার অভিনয়ের প্রশংসা করছেন। 

আফরান নিশোর সঙ্গে তার রসায়ন জমেছে বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। সিনেমার রানী চরিত্রের জন্য নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন—এমনটা বলেছেন অনেক দর্শক।

 

পূজা চেরি বলেন, ‘দম শুধু আমার জন্য একটা সিনেমা নয়, এটা আমার জীবনের নতুন অধ্যায় বলতে পারেন। এই সিনেমায় অভিনয়ের পর অনেক কিছু বদলে গিয়েছে। আমার অভিনয় ক্যারিয়ারেও পরিবর্তন হয়েছে। এই সিনেমাটা যেন আমাদের জীবনেরই একটা আয়না—যেখানে ভাঙা স্বপ্ন আছে, চেপে রাখা কান্না আছে আর আছে নিজের সঙ্গে নীরব যুদ্ধ করার গল্প।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘দম সিনেমাটি আমরা সবাই অনেক কষ্ট করে করেছি। পরিশ্রমটা সিনেমা যারা দেখছেন তারা বুঝতে পারছেন। এমন ঘটনার সিনেমা এর আগে বাংলাদেশের দর্শক দেখেনি। দম নিয়ে যে সাড়া পাচ্ছি, যে ভালোবাসা দিচ্ছে সবাই, মানুষের চোখে যে আবেগ দেখছি—সিনেমা নিয়ে তা সত্যি অতুলনীয়। আর আমাকে রানী করে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে পরিচালক রেদওয়ান রনি। তার শ্রম ছাড়া এটা সম্ভব হতো না।’

 

দেশে মুক্তির পর ‘দম’ সিনেমাটি আগামীকাল ২৭ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় প্রদর্শিত হবে।

‘দম’ সিনেমাটি ঈদুল ফিতরে মুক্তির তিন দিনে মাল্টিপ্লেক্সে ১ কোটি টাকার গ্রস কালেকশন করেছে।

স্টার সিনেপ্লেক্স ও লায়ন সিনেমাস মিলিয়ে ৩৫টি শো চলছে সিনেমাটির। প্রতিটি শো হাউজফুল যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

 

এসভিএফ আলফা-আই এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেড এবং চরকি প্রযোজিত ‘দম’ সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন রেদওয়ান রনি, রবিউল আলম রবি, সৈয়দ আহমেদ শাওকী, আল-আমিন হাসান নির্ঝর ও মো. সাইফুল্লাহ রিয়াদ।

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতে হিজবুল্লাহ জড়ালে লেবাননে কঠোর হামলা: ইসরায়েল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত শুরু হলে তাতে হিজবুল্লাহ যোগ দিলে লেবাননে কঠোর হামলা চালানো হবে বলে পরোক্ষ বার্তা দিয়েছে ইসরায়েল।

আজ মঙ্গলবার লেবাননের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

তারা বলেন, ‘সম্ভাব্য হামলায় লেবাননের বেসামরিক অবকাঠামো এমনকি বৈরুতের বিমানবন্দরও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।’

এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য জানা যায়নি।

আগামী বৃহস্পতিবার জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তৃতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে ২০২৪ সালের যুদ্ধে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলে ইসরায়েল।

ওই যুদ্ধে গোষ্ঠীটির নেতা হাসান নাসরাল্লাহসহ অনেক যোদ্ধা নিহত হন এবং তাদের বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করা হয়।

হিজবুল্লাহর বর্তমান নেতা নাঈম কাশেম সম্প্রতি টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহের অবস্থান নিরপেক্ষ নয়। সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবেই নিজেদের দেখছি আমরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আত্মরক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। হস্তক্ষেপের ব্যাপারে আমরা সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেব।’

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৈরুতে মার্কিন দূতাবাস থেকে সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন এখন পোস্ট অফিসের ভূমিকায়: সুজন সম্পাদক

নির্বাচন কমিশন এখন পোস্ট অফিসের ভূমিকা পালন করছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

সুজন সম্পাদক বলেন, ‘আমরা অনুরোধ করেছিলাম, ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকসহ যেসব ক্ষেত্রে অযোগ্যতা আছে, সেগুলোর ব্যাপারে তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নিয়ে যেন গেজেট প্রকাশ করে। আমরা আরও বলেছিলাম, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কি না ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কমিশন সেটা সার্টিফাই করবে। এটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচন কমিশনই স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার জন্য। এখন তারা যেটা করে, রিটার্নিং অফিসাররা যে ফলাফল দেয়, সেটাই তারা গেজেট আকারে প্রকাশ করে দেয়। তারা তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সেই দায়িত্বটা পালন করে না এবং তারা এখন অনেকটা পোস্ট অফিসের মতো ভূমিকা পালন করে—চিঠি আসলো, স্ট্যাম্প দিয়ে পাঠিয়ে দিলো।’

নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ মীমাংসার পর গেজেট প্রকাশ করা উচিত ছিল মন্তব্য করে সুজন সম্পাদক বলেন, ‘যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন নির্বাচন কমিশন তদন্ত করতে পারে। তদন্ত করে ফলাফল বাতিলও করতে পারে, আবার নতুন নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারে।’

নূর হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলার উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে কি না যদি এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে নির্বাচন কমিশন তদন্ত সাপেক্ষে সেই নির্বাচন বাতিল করতে এবং পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারবে। এবার এই প্রশ্নগুলো উঠেছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশন তদন্ত করেনি। বরং তড়িঘড়ি করে গভীর রাতে গেজেট প্রকাশ করেছে। গেজেট প্রকাশ করার একটি তাৎপর্য হলো, যখন গেজেট প্রকাশ হয়, তখন এটা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত হয়ে যায়। তারা হাত মুছে নিয়েছে, তাদের আর করার কিছু নেই।’

অভিযোগ মীমাংসার এখনো সুযোগ আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আরপিওর ৯১ (এফ) যদি হলফনামা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে গেজেট প্রকাশের পরেও নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। তারা নির্বাচনও বাতিল করতে পারবেন।’

আরপিও অনুসারে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক উল্লেখ করে সুজন সম্পাদক বলেন, ‘আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে মনোনয়নপত্রটা সম্পূর্ণ কি না এ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। যদি মনোনয়নপত্র সম্পূর্ণ না হয়, তাহলে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া উচিত কি না সেটাও প্রশ্ন করার সময় এসেছে।’

দীর্ঘ অপেক্ষার পর আসছে ‘ট্রাম্প মোবাইল’

প্রায় এক বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবার ‘ট্রাম্প মোবাইল’ বাজারে আনার ঘোষণা দেয়। গত বছরের জুনে ট্রাম্পের ছেলেদের মাধ্যমে পরিচালিত ট্রাম্প অর্গানাইজেশন জানায়, আগস্ট থেকে বাজারে আসবে ফোনটি। 

আগ্রহীদের কাছ থেকে ১০০ ডলার করে জামানত রাখে প্রতিষ্ঠানটি। তবে মাঝে প্রায় এক বছর চলে গেলেও ট্রাম্প ফোনের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য জানা যায়নি। 

অবশেষে ক্রেতাদের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, চলতি সপ্তাহেই গ্রাহকের হাতে পৌঁছাবে স্বর্ণখচিত ট্রাম্প ফোন। 

আজ বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। 

ট্রাম্প ফোনের দাম ধরা হয়েছে ৪৯৯ ডলার। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘ট্রাম্প মোবাইল টি১।’ 

বিশ্লেষকদের মতে, এটা দেখতে অনেকটাই চীনে নির্মিত টি-মোবাইল রেভেল ৭ প্রো ৫জি জিএসএম ফোনের মতো। ওয়ালমার্টে ওই ফোনটি ২০০ ডলারে বিক্রি হয়। 

ট্রাম্প মোবাইলের ওয়েবসাইটে ‘শর্তাধীনে’ ফোন ডেলিভারির কথা বলা হয়েছে। 

অর্থাৎ, যারা ১০০ ডলার জামানত রেখে ‘প্রিঅর্ডার’ করেছিলেন, তারা সবাই ফোনটি নাও পেতে পারেন। 
পরিবর্তিত শর্ত মতে, ১০০ ডলার জামানত রাখা মানেই এই নয় যে ইউজার ফোনটি পাবেন। এটি একটি ‘বিশেষ শর্তের আওতায় পাওয়া সুযোগ’। 

ওয়েবসাইটে এসব তথ্য প্রকাশের পর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে ফোন ডেলিভারির বিষয়টি নিশ্চিত করে ট্রাম্প অর্গানাইজেশন। 

একটি পোস্টে বলা হয়, ‘যারা টি১ ফোন প্রি-অর্ডার করেছিলেন, তারা শিগগির ইমেইলে আপডেট পাবেন। এ সপ্তাহেই ফোনগুলো ইউজারদের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে’। 

ট্রাম্প মোবাইলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্যাট ও’ব্রায়েন সিএনএনকে জানান, ‘গুণগত মান ঠিক রাখতে দীর্ঘ সময় ধরে ফোনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে।’

‘ফোনটির চাহিদা অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও ধাপে ধাপে অর্ডার অনুযায়ী ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সবাই আরাধ্য ফোনটি হাতে পেয়ে যাবেন’, যোগ করেন তিনি। 

প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজিস-এর বিশ্লেষক ম্যাক্স ওয়েইনবাখ সিএনএনকে বলেন, ‘অ্যান্ড্রয়েড ফোন বাজারে আনতে কমপক্ষে ১৮ মাস সময় লাগে। সফটওয়্যার চূড়ান্ত করা, উৎপাদনকারী ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই করতেই অনেক সময় লেগে যায়।’

ট্রাম্প ফোনের কয়েকটি বিষয় সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। 

‘ট্রাম্পের ব্র্যান্ড’ ও সোনালী অবয়ব যথাস্থানেই থাকলেও, আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় প্রতিশ্রুত সবগুলো ফিচার চূড়ান্ত মডেলে থাকছে না। তুলনামূলকভাবে ছোট স্ক্রিন ও কম মেমোরি থাকবে এতে। 

ট্রাম্প মোবাইল মূলত একটি বিশেষায়িত ‘অ্যান্ড্রয়েড ফোন’। শুরুতে এর প্রচারণায় ‘মেইড ইন ইউএসএ’ বলা হলেও দ্রুত এই দাবি থেকে সরে আসে ট্রাম্প অর্গানাইজেশন। 

পরবর্তীতে জানানো হয়, ‘মার্কিন মূল্যবোধ মাথায় রেখে এটি তৈরি করা হয়েছে’। 

মোবাইল ফোন খাতের বিশ্লেষকরা শুরুতেই ‘মেইড ইন ইউএসএ’ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। 

কেউ কেউ দাবি করেন,  ফোনের ডিজাইন ও ফিচার চীনে নির্মিত অপর একটি ফোনের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। 

ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশনের ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডিভাইস ট্র্যাকার বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট রায়ান রেইথ সিএনএনকে বলেন, এ ধরনের শব্দগুলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য ব্যবহার করা হয়। 

ফোন তৈরির প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েকটি ধাপ আছে।

অ্যাপলের ফোনের ডিজাইন তৈরি হয় ক্যালিফোর্নিয়ায়। তবে নির্মাণ হয় চীন ও ভারতের মতো জায়গায়, যেখানে শ্রম-খরচ অপেক্ষাকৃত কম। পাশাপাশি, ফোনের ডিজাইন বা নকশা ‘আমেরিকান’ হলেও এর ছোট ছোট আনুষঙ্গগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। 

ফোনের আরেকটি বিষয় সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন ‘সাবেক’ ব্যবসায়ী, তিনি এ মুহূর্তে দেশের প্রেসিডেন্ট। এ পরিস্থিতিতে নিজের নাম ব্যবহার করে ‘ব্র্যান্ড’ তৈরি করা ও পণ্য বিক্রি করার বিষয়টি কতটুকু নৈতিক, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

তবে ট্রাম্প নিজে নয়, ফোন বিতরণের সঙ্গে যুক্ত তার দুই ছেলে এরিক ও ডোনাল্ড জুনিয়র। 

ফোনের ডেটা ও ভয়েস প্যাকেজের দাম ধরা হয়েছে ৪৭ ডলার ৪৫ সেন্ট। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ ও ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অর্জনকে বিশেষায়িত করা হয়েছে।
 

হামের প্রকোপ এবং বরাবরের মতোই নারীর দোষ

‘সব থেকে ভয়াবহ ব্যাপার যেটা সেটা হলো, আমাদের মায়েরা ফিটনেস ধরে রাখার জন্য তাদের সন্তানকে বুকের দুধ পান করান না।’ নিজের কানকে বিশ্বাস না করে ভিডিওটি আবার শুরু থেকে দেখলাম। একবার… দুবার… পাঁচবার।

কথাটি বলা হয়েছে হামে শিশুমৃত্যুর চলমান সঙ্কট নিয়ে। বলেছেন একজন পুরুষ রাজনীতিবিদ।

দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে এ বিষয়ে ন্যুনতম খোঁজ রাখেন, এমন যে কেউ জানেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতির ব্যাপারে। প্রতিষ্ঠিত খবরের কাগজ খুললে, অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই সামনে আসে হাসপাতালে ভর্তি থাকা শিশুদের ছবি। সেই ছবিতে শিশুর সঙ্গে বেশিরভাগ সময়েই থাকেন তার মা।

সত্যি করে বলুন তো, দুশ্চিন্তায় বিধ্বস্ত নারীটিকে দেখে কখনো মনে হয়েছে, তিনি এতই সৌখিন যে ‘ফিটনেস’ ধরে রাখতে শিশুকে বুকের দুধ পান না করিয়ে ব্যয়বহুল টিনজাত শিশুখাদ্য খাওয়াচ্ছেন?

যেখানে শিশুর সুস্থতা প্রতিটি মায়ের কাম্য, সেখানে শিশু স্বাস্থ্যের এই সংকটে কী করে মায়েদের দিকে আঙ্গুল ওঠে? যেখানে মায়েরা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মাসের পর মাস অসুস্থ থাকেন, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস এমনকি প্রাণঘাতী এক্লাম্পশিয়ার মতো পরিস্থিতির শিকার হন, সেখানে তিনি ‘ফিটনেস’ ঠিক রাখতে বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করাবেন না? এমন অদ্ভুত ধারণা কী করে তৈরি হয়?

ওই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্যের পর ‘মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ পান করায় না, তাই হামে এত শিশু মারা যাচ্ছে’ এমন একটা আলাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে চাউর হয়ে গেল ‘মায়ের বুকের দুধ কম খাওয়ানো হাম আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ।’

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, ঠিক আছে, এটাই কারণ। কিন্তু, ঠিক কোন তথ্যের ভিত্তিতে ‘বিশেষজ্ঞরা’ মায়েদের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন?

১৭ মে নিউ এজ পত্রিকার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের বুকের দুধ পান করানোর হার কমে আসা, হামের টিকা দেওয়ায় ঘাটতি এবং ভিটামিন-এ দেওয়ায় দেরি করার কারণে বাচ্চাদের পুষ্টির অভাব হয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে শিশুদের মাঝে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

হামের টিকায় ঘাটতি থাকাটাও একটা কারণ। অথচ সেটাকে পাশ কাটিয়ে দোষ চাপানো হচ্ছে মায়েদের ওপর। হামের টিকা না দিয়ে শুধু মায়ের দুধ পান নিশ্চিত করলেই কি এই হামের প্রকোপ থেকে রেহাই পাওয়া যেত? বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন!

কিন্তু মায়েরা কি আসলেই ‘ফিটনেস’ ধরে রাখতে বাচ্চাকে দুধ পান করান না?

নিউ এজের ওই প্রতিবেদনে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’ এর বরাত দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের বাচ্চাদের ‘সব ধরণের’ বুকের দুধ পান করানো কমেছে। শিশুকে মা শুধুমাত্র বুকের দুধ পান করান; পানি, তরল বা শক্ত খাবার দেন না, এমনটা দেখা গেছে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে। তবে শিশুকে কোনো না কোনো সময়ে মা বুকের দুধ পান করিয়েছেন, এমনটা দেখা গেছে ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে।

এই সার্ভে প্রতিবেদনের কোথাও বলা হয়নি যে ‘ফিটনেস’ ধরে রাখতে মায়েরা বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করান না।

গত ১৭ মে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আয়োজিত ‘হাম ও ডেঙ্গুরোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখেছি, অনেক মা নিজেই অপুষ্টিতে ভুগছেন। ফলে শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। অনেক শিশু জন্মের পর শালদুধও পাচ্ছে না।’

যেখানে মায়েরা নিজেরাই ভুগছেন অপুষ্টিতে, সেখানে বাচ্চা বুকের দুধ পাচ্ছে না। এই দোষ মায়ের ওপর দেওয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত?

নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে ছোঁয়াচে রোগ হাম বাংলাদেশ থেকে চলেই গিয়েছিল প্রায়। হামে বাচ্চারা আক্রান্ত হলেও তা থেকে সেরে উঠত সহজেই। যে টিকাদান কর্মসূচির কারণে এই সাফল্য, তা এলোমেলো হয়ে যায় বাংলাদেশে ১৮ মাস ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হস্তক্ষেপে। ফলশ্রুতিতে হামের টিকার মজুদ কমে যায় এবং একটা সময় শেষ হয়ে যায়। গত ৭ মে দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।

শিশুস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি টিকা নিয়ে এমন অব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চাপা দিতেই কী মায়েদের দোষারোপ করা হচ্ছে? সে প্রসঙ্গে না গেলেও, আর কারো কী কোনো গাফিলতি নেই এই সংকটে?

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে রয়েছে মাত্র ২০টি শয্যা। সেখানেও একটি যন্ত্রাংশে সমস্যা থাকায় হামে আক্রান্ত শিশুর বাবাকে পাঠানো হয় দামী যন্ত্রাংশটি কিনতে। তিনি শহর ঘুরে ঘুরে সেটা কিনে যখন হাসপাতালে ফিরলেন, ততক্ষণে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে গেছে শিশুটি।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সংকট আরও তীব্র। যাতায়াতের অসুবিধার কারণে সেখানে টিকা, স্বাস্থ্যসেবা দুটোই পৌঁছাতে অসুবিধা। আর এই অব্যবস্থাপনার দায়ে জীবন যাচ্ছে আদিবাসী শিশুদের।

সমকালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই দশকের সব রেকর্ড ভেঙে গত দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এর আগে ২০০০ সালের পর কোনো বছরই হামের সংক্রমণ ৫০ হাজারের ঘর স্পর্শ করেনি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংকটে ১৭ মে পর্যন্ত দুই মাসে মারা গেছে ৪৫৯ শিশু। এর মধ্যে প্রতিটি মৃত্যুই ঠেকানো যেত, যদি টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিত চলত, যদি বিভাগীয় শহরে শিশুদের আইসিইউগুলো ঠিকঠাক-মতো চলত, যদি প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হতো গাফিলতি ছাড়াই।

কিন্তু না, দোষ মায়েদের। কারণ, কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতা করার চাইতে নারীর দিকে অপবাদের আঙ্গুল তোলা সহজ!

আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, এমনকি নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষের থেকেও মায়েদের শুনতে হয় হাজারটা সমালোচনা। বাচ্চা খায় না? মায়ের দোষ। বাচ্চার ঘুম কম হয়? মায়ের দোষ। বাচ্চা কান্নাকাটি করে? মায়ের দোষ!

ইংরেজিতে এর একটা নাম আছে, ‘মম-শেমিং’। বাংলায় এর কোনো জুতসই প্রতিশব্দ নেই। কারণ, মায়ের দোষ দিয়েই সবাই অভ্যস্ত। আলাদা নামে কী আসে যায়!

এসব অভিযোগের থলিতে এখন নতুন করে যুক্ত হলো ‘মা বুকের দুধ পান করায় না বা করায়নি, তাই বাচ্চার অমুক অসুখ হয়েছে’। এই ধারণাটাকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তুলবে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মন্তব্য এবং কিছু চটকদার হেডলাইন।

আসলেই যারা দোষী, যাদের জবাবদিহি করা জরুরি, তাদের ব্যাপারে সবাই ভুলেই যাবে। আর বরাবরের মতো মায়েরা চুপচাপ সয়ে যাবে অপবাদের বোঝা। মাঝখান দিয়ে লম্বা হবে নিষ্পাপ শিশুদের লাশের মিছিল।

 

কে এন দেয়া: সহ-সম্পাদক, দ্য ডেইলি স্টার

মিরপুরে ফিরল গর্জন, মুগ্ধ প্রতিপক্ষও

ক্রিকেটের প্রতি দেশের মানুষের আবেগ চিরকালই আকাশছোঁয়া। কিন্তু গত প্রায় দেড় বছর ধরে দেশের ক্রিকেটে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল। মাঠের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার অভাব এবং মাঠের বাইরের নানা বিতর্কিত ঘটনার কারণে দর্শকরা অনেকটাই ক্রিকেটবিমুখ হয়ে পড়েছিলেন। গ্যালারিগুলো যেন খাঁ খাঁ করছিল, হারিয়ে গিয়েছিল সেই চিরচেনা গর্জন।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে দেখা গেল এক অভাবনীয় দৃশ্য। মেঘলা আকাশ, বৃষ্টির শঙ্কা, এমনকি দীর্ঘ দুই ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকার পরও দর্শকরা শুধু মাঠেই থাকলেন না, বরং উপচে পড়া ভিড় জমিয়ে প্রমাণ করলেন, ক্রিকেটের প্রতি তাদের ভালোবাসা একটুও ম্লান হয়নি।

স্বাগতিকদের ব্যাটিং ব্যর্থতা এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচটিতে নিউজিল্যান্ডের জয়, ফলাফলের এই দিকটি হয়তো দর্শকদের হতাশ করেছে। মাঝারি লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করতে নেমে বাংলাদেশের বোলাররা, বিশেষ করে শরিফুল ইসলাম শুরুতেই কিউই শিবিরে কাঁপন ধরালেও, বেভান জ্যাকবের অপরাজিত ফিফটিতে অনায়াস জয় তুলে নেয় সফরকারীরা। কিন্তু এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে সবচেয়ে বড় খবর হয়ে দাঁড়ায় মিরপুরের গ্যালারি। দীর্ঘদিন পর মাঠে ফেরা এই দর্শকদের আবেগ ও বাঁধভাঙা উল্লাস মুগ্ধ করেছে খোদ প্রতিপক্ষ দলের অধিনায়ককেও।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে দর্শকদের এই অভাবনীয় উপস্থিতি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন কিউই অধিনায়ক নিক কেলি, ‘এটি ছিল অসাধারণ। খুব আওয়াজ ছিল। তারা খুবই আবেগপ্রবণ। তারা এই দলকে কতটা ভালোবাসে, তা তাদের গর্জন শুনেই বোঝা যায়। আমি ভেবেছিলাম বৃষ্টি হয়তো তাদের কিছুটা ভয় পাইয়ে দেবে। কিন্তু বৃষ্টি থামতেই তারা সবাই আবার ফিরে এসেছেন।’

বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে কেলি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ সত্যিই অসাধারণ। আমরা এখানকার সময়টা খুব উপভোগ করেছি। তারা অনেক বেশি অতিথিপরায়ণ।’

প্রতিপক্ষ হিসেবে ম্যাচ জেতার পরও দর্শকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ম্যাচ জিতে আমরা হয়তো তাদের উৎসবটা কিছুটা নষ্ট করেছি, এজন্য দুঃখিত। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে তারা ক্রিকেটকে ভালোবাসেন। আমি আশা করি তারা বিনোদন পেয়েছেন।’

দীর্ঘ খরা কাটিয়ে ঘরের মাঠে এমন দর্শক সমর্থন পেয়ে আবেগাপ্লুত বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক লিটন দাসও। দেড় বছর পর মিরপুরে দর্শকদের এমন উপস্থিতি দলের জন্য কতটা জরুরি ছিল, তা স্বীকার করে নিয়ে অধিনায়ক বলেন, ‘খুবই ভালো লাগছে। সত্যি কথা, খুবই হ্যাপি।’

‘আমার মনে হয়েছে আবার আমাদের দর্শকরা আমাদেরকে সাপোর্ট করতেছে। হোম গ্রাউন্ডে এমন সাপোর্ট পেলে একটা আলাদা বেনিফিট থাকেই। দর্শক হচ্ছে একটা দলের প্রাণ। তারা যদি সাপোর্ট করে, তবে আমাদের জন্য কাজটা অনেক ইজি হয়ে যায়,’ আগামী দিনগুলোতেও দর্শকরা এভাবেই মাঠে ফিরে আসবেন প্রত্যাশা করে বলেন লিটন।