32.7 C
Dhaka
Home Blog

ফোন চুরি হলে বা হারালে প্রথম ৩০ মিনিটে যা করা জরুরি

মোবাইল ফোন এখন আর শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ব্যক্তিগত ছবি, অফিসের নথিসহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই এখন একটি ফোনের ভেতরে থাকে।

তাই ফোন চুরি বা হারিয়ে গেলে প্রথম চিন্তা শুধু নতুন ফোন কেনার খরচ হওয়া উচিত নয়। বরং সবচেয়ে জরুরি হলো, ফোনের ভেতরে থাকা তথ্য ও আর্থিক অ্যাকাউন্টগুলো কত দ্রুত সুরক্ষিত করা যায়।

এ ক্ষেত্রে প্রথম ৩০ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

প্রথমেই অন্য কারও ফোন থেকে নিজের নম্বরে কল দিন।

ফোনটি হয়তো চুরি হয়নি, কাছাকাছি কোথাও পড়ে গেছে। কোনো সৎ ব্যক্তি পেয়ে থাকলে ফোন ধরতে পারেন।

কিন্তু ফোনটি কোথায় আছে নিশ্চিত না হয়ে একা সেখানে ছুটে যাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে অবস্থান যদি অপরিচিত বা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা দেখায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।

এরপর যত দ্রুত সম্ভব ফোনের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করুন।

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে গুগলের ‘ফাইন্ড হাব’ ব্যবহার করে হারানো ফোন খোঁজা, লক করা এবং প্রয়োজনে দূর থেকে ডেটা মুছে ফেলা যায়।

অন্য ফোন বা কম্পিউটার থেকে নিজের গুগল অ্যাকাউন্টে সাইন ইন করে ফাইন্ড হাবে গেলে ফোনটির বর্তমান অথবা সাম্প্রতিক অবস্থান দেখা যেতে পারে।

সেখান থেকে ফোনে শব্দ বাজানো এবং ‘মার্ক অ্যাজ লস্ট’ (হারিয়ে গেছে বলে চিহ্নিত করা) ব্যবহার করে ডিভাইসটি লক করার সুযোগ আছে। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, ফাইন্ড হাব চালু থাকলে ফোনের সাম্প্রতিক এনক্রিপ্টেড অবস্থানও কাজে লাগতে পারে, এবং সমর্থিত ডিভাইস অফলাইনে থাকলেও ফাইন্ড হাব নেটওয়ার্ক সেটি খুঁজতে সহায়তা করতে পারে।

ফোনে আগে থেকেই পিন, প্যাটার্ন বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা থাকলে নিরাপত্তা আরও বাড়ে।

আইফোন হারিয়ে গেলে অন্য ডিভাইস থেকে আইক্লাউডের ‘ফাইন্ড ডিভাইসেস’ ব্যবহার করে সেটিকে ‘মার্ক অ্যাজ লস্ট’ করা যায়।

লস্ট মোড চালু করলে ফোনটি পাসকোড দিয়ে লক হয়ে যায়। ফলে অন্য কেউ ফোন হাতে পেলেও সহজে সেটিতে প্রবেশ করতে পারে না।

অ্যাপলের তথ্যমতে, আইক্লাউডের ফাইন্ড ডিভাইসেসে প্রবেশ করতে হারানো ফোনে পাঠানো যাচাইকরণ কোড-ও প্রয়োজন হয় না। ফলে বিশ্বস্ত আইফোনটিই চুরি হলেও দ্রুত লস্ট মোড চালু করার সুযোগ থাকে।

আইফোনে ‘স্টোলেন ডিভাইস প্রোটেকশন’ আগে থেকে চালু থাকলে নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়। এই সুবিধা চালু থাকলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ফেস আইডি বা টাচ আইডি প্রয়োজন হতে পারে।

ফোন চুরির পর সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হলো সিম কার্ড সাময়িকভাবে ব্লক করা।

কারণ আপনার নম্বরে আসতে পারে ওটিপি, ব্যাংকের যাচাইকরণ কোড, পাসওয়ার্ড রিসেট কোড, বিভিন্ন অ্যাপের লগইন কোড এবং গুরুত্বপূর্ণ খুদে বার্তা।

চোর ফোন আনলক করতে না পারলেও যদি কোনোভাবে সিম অন্য ফোনে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে আপনার নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট দখলের চেষ্টা করতে পারে।

তাই অন্য নম্বর থেকে নিজের মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করে সিম ব্লক করার ব্যবস্থা নিন। পরে পরিচয় যাচাই করে একই নম্বরের নতুন সিম নেওয়া যাবে।

ফোনে বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা কোনো ব্যাংকের অ্যাপ থাকলে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

বিশেষ করে ফোনটি যদি আনলক অবস্থায় চুরি হয়, অথবা চোর আপনার পিন বা স্ক্রিন লক জানে—তাহলে সময় নষ্ট করা বিপজ্জনক।

নিজ নিজ ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নিজস্ব হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে প্রয়োজন হলে অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ব্লক বা সুরক্ষিত করুন।

একই সঙ্গে সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোও পরীক্ষা করুন। সন্দেহজনক কোনো লেনদেন দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে জানান।

স্মার্টফোনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলোর একটি হলো গুগল অ্যাকাউন্ট বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট।

কারণ এই একটি অ্যাকাউন্ট থেকেই অনেক সময় ইমেইল, ছবি, ফোন নম্বরের তালিকা, ক্লাউড ব্যাকআপ এবং অন্য অনেক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড রিসেট করা সম্ভব।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে।

ফোনটি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চললে সঙ্গে সঙ্গে মূল গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট থেকে ডিভাইসটি সরিয়ে ফেলবেন না।

বিশেষ করে আইফোনের ক্ষেত্রে অ্যাপল সরাসরি সতর্ক করেছে, ‘ফাইন্ড মাই’ থেকে চুরি হওয়া ডিভাইস সরিয়ে দিলে ‘অ্যাক্টিভেশন লক’ উঠে যেতে পারে, এতে চোরের জন্য ফোনটি পুনরায় ব্যবহার বা বিক্রি করা সহজ হয়ে যেতে পারে।

বরং প্রথমে লস্ট মোড বা মার্ক অ্যাজ লস্ট চালু করুন।

এরপর অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা সেটিংস পরীক্ষা করুন। অচেনা লগইন বা পরিবর্তন দেখতে পেলে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন এবং অন্য অচেনা ডিভাইসের সেশন বন্ধ করুন।

ফোনের মধ্যে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, জিমেইল কিংবা অফিসের স্ল্যাক বা টিমস অ্যাকাউন্ট লগইন করা থাকতে পারে।

অন্য ডিভাইস থেকে এসব অ্যাকাউন্টে ঢুকে সক্রিয় সেশন পরীক্ষা করুন।

সন্দেহ থাকলে চুরি হওয়া ডিভাইস থেকে সেশন লগআউট করুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।

ইমেইল অ্যাকাউন্টকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। কারণ অধিকাংশ অনলাইন অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড রিসেট লিংক ইমেইলেই আসে।

অর্থাৎ চোর ইমেইলে প্রবেশ করতে পারলে একে একে অন্যান্য অ্যাকাউন্টেও প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে।

প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি স্বতন্ত্র আইএমইআই নম্বর থাকে। দুই সিমের ফোনে সাধারণত দুটি আইএমইআই থাকতে পারে।

আইএমইআই পাওয়া যেতে পারে ফোনের বাক্সে, ক্রয়ের রসিদে, গুগল ফাইন্ড হাবে অথবা আগে সংরক্ষণ করে রাখা তথ্য থেকে।

গুগলের ফাইন্ড হাব থেকেও হারানো অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের আইএমইআই দেখা যায়।

নিকটস্থ থানায় অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করার সময় আইএমইআই, ফোনের মডেল, রং, মোবাইল নম্বর এবং ঘটনার সময়-স্থান সঙ্গে রাখা ভালো।

অ্যান্ড্রয়েড এবং আইফোন—দুটিতেই দূর থেকে ফোনের ডেটা মুছে ফেলার ব্যবস্থা আছে।

কিন্তু এটি প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত নয়।

প্রথমে ফোন খুঁজে বের করা ও লক করার চেষ্টা করুন। ফোন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম এবং ভেতরের তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হলে দূর থেকে মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা যেতে পারে।

অ্যান্ড্রয়েডের ক্ষেত্রে গুগল সতর্ক করেছে, দূর থেকে মুছে ফেলার পর ডিভাইসটির অবস্থান আর ফাইন্ড হাবে পাওয়া যাবে না।

আইফোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। অ্যাপল জানিয়েছে, আইওএস ১৫ বা পরবর্তী সংস্করণের সমর্থিত ডিভাইস মুছে ফেলার পরও ফাইন্ড মাই দিয়ে অবস্থান শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে ডিভাইসটি ফাইন্ড মাই থেকে সরিয়ে ফেলা উচিত নয়, কারণ তাতে অ্যাক্টিভেশন লক বন্ধ হয়ে যায়।

তাই ‘মুছে ফেলা’ এবং ‘অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে ফেলা’—দুটি এক জিনিস নয়।

ফোন আনলক অবস্থায় চুরি হলে ঝুঁকি অনেক বেশি

চুরির সময় ফোনটি যদি লক করা থাকে এবং শক্তিশালী পিন বা বায়োমেট্রিক সুরক্ষা থাকে, তাহলে কিছুটা সময় পাওয়া যায়।

কিন্তু ফোনটি যদি ব্যবহার করার সময় হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আলাদা।

চোর তখন সরাসরি খুদে বার্তা পড়তে, ইমেইল খুলতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে এবং কিছু আর্থিক অ্যাপে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় সিম, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করার কাজগুলো আরও দ্রুত করতে হবে।

চোরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে নতুন প্রতারণার শিকার হবেন না

ফোন চুরির কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর আরেক ধরনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

কেউ ফোন করে বলতে পারে, ‘আপনার ফোনটি পেয়েছি।’ তারপর ওটিপি, অ্যাপল আইডির পাসওয়ার্ড, গুগলের পাসওয়ার্ড কিংবা কোনো যাচাইকরণ কোড চাইতে পারে।

কখনো আবার খুদে বার্তা বা ইমেইলে ভুয়া ফাইন্ড মাই বা গুগল লগইন পাতার লিংক পাঠানো হয়। সেখানে লগইন করলে আপনার আসল পাসওয়ার্ড প্রতারকের কাছে চলে যেতে পারে।

তাই ফোন ফিরে পাওয়ার নাম করে কেউ ওটিপি, পিন বা পাসওয়ার্ড চাইলে কখনোই দেবেন না।

ফোন চুরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি রাখা বেশি কার্যকর।

প্রথমত, ফোনে শক্তিশালী পিন বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। শুধু সহজ প্যাটার্ন বা ১২৩৪ ধরনের পিন এড়িয়ে চলুন।

দ্বিতীয়ত, অ্যান্ড্রয়েডে ফাইন্ড হাব এবং আইফোনে ফাইন্ড মাই চালু রাখুন। গুগল নিজেও হারানোর আগেই অবস্থান ও ফাইন্ড হাব সক্রিয় আছে কি না পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়।

তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (দুই স্তরের যাচাইকরণ) চালু করুন এবং ব্যাকআপ কোড নিরাপদ জায়গায় রাখুন।

চতুর্থত, ফোনের আইএমইআই নম্বর আলাদা জায়গায় লিখে রাখুন।

পঞ্চমত, গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও নথির নিয়মিত ক্লাউড ব্যাকআপ রাখুন। তাহলে নিরাপত্তার স্বার্থে ফোন দূর থেকে মুছে ফেলতে হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারানোর ভয় কম থাকবে।

একটি স্মার্টফোন হারানোর ক্ষতি হয়তো কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু ফোনে থাকা ইমেইল, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত ছবি, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ও অফিসের নথি অন্য কারও হাতে গেলে ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়েও অনেক বড় হতে পারে।

তাই ফোন চুরির পর প্রথম কাজ নতুন ফোনের দাম নিয়ে চিন্তা করা নয়।

প্রথম কাজ হলো, চুরি হওয়া ফোনটিকে দ্রুত ডিজিটাল জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

কারণ আজকের দিনে চোর শুধু আপনার ফোনটি হাতে পায় না, সুযোগ পেলে আপনার পুরো ডিজিটাল পরিচয়ের দরজাটিও তার হাতে চলে যেতে পারে।

নিরাপত্তা নাকি নিয়ন্ত্রণ: নারী আবাসিক হলের রাজনীতি

‘আমার বাড়ি খাগড়াছড়িতে। যখনই আমি ঢাকায় ফিরি, বাস আমাকে ভোর ৪টার দিকে নামিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের হলের গেট খোলে সকাল ৬টায়। এই দুই ঘণ্টা আমি কোথায় থাকব? আমি কী করব? যদি নিরাপত্তার নামে হলের গেট রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়, তাহলে কি এই মধ্যবর্তী সময়ে ছাত্রীদের কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি থাকে না? এ কারণেই আমরা দাবি করছি, হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাহী সদস্য হেমা চাকমার এই কথাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়টির নারী নিরাপত্তা নীতির স্ববিরোধিতা প্রকাশ করে। যদি রাত ১০টার পর ক্যাম্পাস সত্যিই ছাত্রীদের জন্য অনিরাপদ হয়, তাহলে ভোর ৪টায় বাস থেকে নেমে হলগেট খোলার অপেক্ষায় থাকা একজন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? যদি সেই সময়ে কোনো বাস্তব নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে হল তালাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্য আসলে কী? এই নীতি কি সত্যিই নারীদের নিরাপত্তার জন্য, নাকি এর ভিত্তি এই ধারণায় যে, নারীদের নিজেদের ভালোর জন্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে?

এই ধরনের অভিজ্ঞতা কেবল হেমার একার না। বেগম রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী অদিতি রায়ও নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেছেন, ‘গত শীতে আমরা একটি শিক্ষাসফর থেকে ফিরছিলাম। আমাদের বাস ক্যাম্পাসে পৌঁছায় রাত সাড়ে ৩টার দিকে। হলের গেট মাত্র কিছুক্ষণের জন্য খোলা হয়েছিল, তারপর আবার বন্ধ হয়ে যায়। আমি অসুস্থ থাকায় সময়মতো বাস থেকে নামতে পারিনি। আমি ও আরেকজন মেয়ে সকাল ৬টা পর্যন্ত হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বাইরে অপেক্ষা করতে বাধ্য হই।’

আরেকজন শিক্ষার্থী বর্ণনা করেন, কীভাবে তার এক বান্ধবী শিক্ষাসফর থেকে ফিরে অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারানোর পরও তার স্থানীয় অভিভাবক উপস্থিত না থাকায় প্রাথমিকভাবে তাকে হলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি তাকে সিট বাতিলের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনা প্রশাসনের বৈপরীত্য সামনে আনে। নিরাপত্তার নামে তৈরি নীতিগুলো প্রায়ই ছাত্রীদের আরও বেশি অনিরাপত্তার মুখে ঠেলে দেয়। তাদের রক্ষা করার বদলে এসব নীতি কার্যত তাদের একটি কারাগারে আটকে ফেলে।

২০২৬ সালেও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা মূলত সহিংসতার উৎপত্তিস্থলের মুখোমুখি হওয়ার বদলে নারীর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ এবং জনপরিসরে মোরাল পুলিশিং করার চারপাশেই ঘুরপাক খায়।

এই স্ববিরোধিতা সম্প্রতি ডাকসুর একটি উদ্যোগে আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত টিএসসিতে ‘ফিমেল জোন’ নামে পর্দাঘেরা একটি বসার জায়গা চালু করা হয়েছে। প্রথম দেখায় এটি পর্দাশীল নারীদের জন্য একটি ব্যবস্থা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতীকের দিক থেকে চিন্তা করলে, এটি জনপরিসরে নারীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের এক পুরোনো ঐতিহ্যকেই আরও এগিয়ে নেয়। যে ঐতিহ্য ইতোমধ্যে হলের কারফিউ ও নারীর চলাফেরার ওপর নানা বিধিনিষেধে প্রতিফলিত।

এই উদ্যোগের সমালোচনা মানে এই নয় যে, যেসব ছাত্রী পর্দার আড়ালে বসতে চান তাদের সেই অধিকার অস্বীকার করা। ধর্মীয়, ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক কারণে যারা এই ব্যবস্থা বেছে নিতে চান, তাদের সেই স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে থাকা উচিত। সমস্যা তখনই দেখা দেয়, যখন একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক চর্চা সমগ্র নারীত্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, আর অন্যদিকে হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবি ‘স্লাটশেমিং’য়ের মুখোমুখি হয়।

এ কারণেই ‘ফিমেল জোন’ নামকরণটি বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। ডাকসু একে ‘পর্দা জোন’ বলে ডাকেনি। তারা একে আখ্যা দিচ্ছে ‘ফিমেল জোন’। এই জায়গার প্রতীক হিসেবে যে কার্টুন বেছে নেওয়া হয়েছে, সেটিও হিজাব পরা এক নারীর প্রতীক। এভাবে একটি নির্দিষ্ট নারীত্বের রূপকে অন্তর্নিহিতভাবে ‘নারী’র প্রতিনিধিত্বকারী চিত্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলো।

কিন্তু নারীত্ব সংজ্ঞায়িত করছে কে? ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছিলেন, মানুষ নারী হয়ে জন্মায় না, নারী হয়ে ওঠে। নারীত্ব কোনো স্থির জৈবিক সত্ত্বা না। এটি সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত নির্মিত হওয়া একটি সামাজিক পরিচয়। যখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একটি দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক চিহ্নকে সব নারীর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে, তখন তা অজান্তেই নারীত্বের একটি নির্দিষ্ট রূপকে সবার সামনে সর্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নারীদের কল্পনা করার পদ্ধতিকেই আকার দেয়। ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস, পোশাক-রীতি, রাজনৈতিক অবস্থান ও জনজীবনে বিচরণের ভিন্ন ভিন্ন উপায় নিয়ে বৈচিত্র্যময় ব্যক্তি হিসেবে নারীদের উপস্থিতি ক্রমে সংকুচিত হয়ে যায়। তারা একটি একক, পূর্বনির্ধারিত সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। নারীত্বের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ নারী কেমন হবে তার একটিমাত্র চিত্রের আড়ালে হারিয়ে যায়।

সামাজিক মনোবিজ্ঞান এই প্রক্রিয়া বোঝার জন্য একটি কার্যকর ধারণা দেয় ‘ডিপারসোনালাইজেশন’। সেখানে বর্ণনা করা হয়, কীভাবে ব্যক্তিরা ধীরে ধীরে সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত ‘স্বাভাবিক’ বা ‘উপযুক্ত’ বৈশিষ্ট্যগুলো নিজেদের গোষ্ঠীর জন্য আত্মস্থ করে নেয়। এই প্রত্যাশাগুলো যত স্বাভাবিক বলে গৃহীত হয়, সমষ্টির স্বাধীনতা সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা ততই সংকুচিত হতে থাকে। প্রচলিত রীতির বাইরের জীবনযাপনের ধরণগুলো আর সমান বৈধ বলে মনে হয় না। সেগুলো অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক, এমনকি বাড়াবাড়ি বলে প্রতীয়মান হতে থাকে। এই যুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়েও বিস্তৃত। অনেক নারী পোশাক শ্রমিকের জন্য বোরকা কিংবা গায়ে জড়ানো বিশাল ওড়না এক ধরনের ‘সেফটি কিট’ হিসেবে কাজ করে, যা তাদের পিতৃতান্ত্রিক নিয়মকানুনকে খুব একটা চ্যালেঞ্জ না করেই উপার্জনের পথে চলতে দেয়। সমস্যা তখন হয়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো এটিকে নারীত্বের আদর্শ চিত্র হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সমাজের প্রতিফলন হিসেবে এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না। এটি সামাজিক নিয়মকানুন গঠনকারী একটি প্রতিষ্ঠানও বটে। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন কার্যকর যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল বজায় রাখতেই ব্যর্থ হয়, তখন আলোচনার ব্যর্থতা আড়াল করতে নারীত্বের মানদণ্ডও নির্ধারণ করতে শুরু করে। কাকে নিরাপত্তা দিবে আর কাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, কার কণ্ঠস্বর দমন করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত তখন প্রতিষ্ঠানই নিতে থাকে। যার মাধ্যমে ‘আদারিং’ করার রাজনীতি শুরু হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ধরনের নীতিগুলো ‘প্রকৃত নারী’ হিসেবে কোনটা বিবেচিত হবে, তা ঠিক করে দিচ্ছে। এখানেই ‘পারফরম্যাটিভ অন্তর্ভুক্তি’র ধারণা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই ইনক্লুসিভিটির ভাষায় কথা বলে। এই ইনক্লুসিভিটির মধ্যে মাত্র সেই নারীরাই আমন্ত্রিত, যারা পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর নরম বিরোধিতা করে জোড়া-তালি দিয়ে তাকে টিকিয়ে রাখছে।

১৯৯০-এর দশক জুড়ে বাংলাদেশের জেলা শহরের অনেক রেস্তোরাঁ নারীদের জন্য ‘প্রাইভেট কেবিন’ বা পর্দাঘেরা আলাদা বসার জায়গার বিজ্ঞাপন দিত। এই ব্যবস্থাগুলো নিরাপত্তা, শালীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের ভাষায় যুক্তিসঙ্গত করা হতো। কিন্তু এই যুক্তির আড়ালে ভিন্ন একটি ধারণা লুকিয়ে ছিল—জনপরিসরে নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি নিজেই একটি সমস্যা। জনপরিসরকে অনিরাপদ করে তোলা পরিস্থিতিগুলোর মুখোমুখি হওয়ার বদলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীদের জনদৃষ্টি থেকে আড়াল করে নারীর জনপরিসর সংকোচন করে।

পাবলিক ও প্রাইভেট পরিসরে নারীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক নিয়মকানুন এভাবেই নিজেদের পুনরুৎপাদন করে। ধীরে ধীরে নিপীড়নমূলক কাঠামো স্বাভাবিক হিসেবে ধরা দেওয়া শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এসব চর্চাকে আর নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে চিনতে পারে না। তারা এগুলোকে স্বাভাবিক, এমনকি প্রয়োজনীয় বলে মনে করতে শুরু করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার রাজনীতিও একইভাবে কাজ করে। ২০২৬ সালেও ছাত্রীদের রাত ১০টার মধ্যে হলে ফিরতে হয়। নারীদের জন্য গেস্ট পলিসি পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। অথচ যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা—তা শিক্ষক, সহপাঠী বা অনলাইন নিপীড়নের মাধ্যমেই হোক না কেন—এখনো অকার্যকর। প্রতিষ্ঠানগুলো নারীর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে যতটা শক্তি ব্যয় করে, নিপীড়নকারীদের মোকাবিলা বা জবাবদিহিতার প্রক্রিয়ায় ততটা করে না। নিরাপত্তার দায়ভার এখনো নারীর ওপরই বর্তায়, হয়রানি ও নিপীড়ন সহায়ক কাঠামোর ওপর থাকছে না।

এই স্ববিরোধিতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি, একি বিশ্ববিদ্যালয় পড়া ছেলে শিক্ষার্থীরা মলচত্বরে ১০টার পর সময় কাটায়, বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, রাজনৈতিক আলোচনা ও নেটওয়ার্ক তৈরি করে; অথচ নারীদের রাত ১০টার মধ্যে হলে ফিরে যেতে হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় সমান নাগরিকত্বের চর্চা করার দাবি করতে পারে না, যদি সে ক্যাম্পাস জীবনের প্রাণকেন্দ্র সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীদের সমান প্রবেশাধিকার থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বঞ্চিত রাখে।

এই ব্যবস্থাকেই এখন অনেক ছাত্রী চ্যালেঞ্জ করছেন। কেউ কেউ হলে ফেরার সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ আরও মৌলিক দাবি তুলছেন—হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতে হবে। একদল প্রায়ই এসব দাবিকে বাড়াবাড়ি বলে খারিজ করে দেন। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়া নিজেই পিতৃতান্ত্রিক সামাজিকীকরণের ফল, যেখানে বিধিনিষেধকে স্বাভাবিক ধরা হয়, অথচ স্বাধীনতার দাবিকে অযৌক্তিক মনে করা হয়।

সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা হয়তো অন্য জায়গায় লুকিয়ে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রীদের হলের তালাবদ্ধ গেট ভেঙে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার দৃশ্য সেই আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী টার্নিং পয়েন্টে পরিণত হয়েছিল। সারা দেশে সেই দৃশ্যকে সাহস, প্রতিরোধ ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের দৃশ্য হিসেবে উদযাপন করা হয়েছিল। তালাবদ্ধ গেট হয়ে উঠেছিল কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। সেই গেট ভাঙা হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক মুক্তির এক কঠোর প্রদর্শন।

তার কিছুদিন পরই রাতে সেই একই নারীদের হলে তালাবদ্ধ করে রাখা আবার ‘নিরাপত্তা’র ভাষায় যুক্তিসঙ্গত করা হচ্ছে। যদি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে নারীর রাজনৈতিক এজেন্সি এতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণ গণতান্ত্রিক জীবনে সেই এজেন্সি কেন সংকুচিত হয়ে ওঠে? রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্ত পার হয়ে গেলে চলাফেরার স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা কিংবা ক্যাম্পাস জীবনে পূর্ণ অংশগ্রহণের অধিকার কেন শর্তসাপেক্ষ হয়ে যাবে? এই সমস্যা হলের নীতিমালা বা টিএসসির পর্দাঘেরা বসার জায়গার সীমা ছাড়িয়ে অনেক বিস্তৃত। এখানে আলোচনা আসলে পূর্ণ নাগরিকত্ব সম্পর্কেই।

গণতান্ত্রিক সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাদের কাছে প্রত্যাশা কেবল ডিগ্রি দিয়ে বের করা না। এমন স্বাধীনচেতা নাগরিক গড়ে তোলা, যারা নিজে বিচার-বিবেচনা করতে, দায়িত্ব নিতে এবং জনজীবনে অংশ নিতে সক্ষম। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নতুন জ্ঞান উৎপাদন করার মধ্য দিয়ে পশ্চাৎপদতা ত্যাগ করে সমাজের অগ্রগামী অংশ প্রস্তুত করা। যে নীতিগুলো ধরে নেয় যে, নারীদের ক্রমাগত প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান দরকার, সেগুলো এই মূল লক্ষ্যকেই দুর্বল করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এগুলো অনিরাপদ পরিবেশ বদলানোর বদলে সেই পরিবেশে সবচেয়ে অরক্ষিত মানুষদের নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়।

ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের সময় পিতৃতান্ত্রিক খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসা নারীদের অনেকেই পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতির কাছে ঘরের আলমারিতে রাখা সাজসজ্জার শোপিসের মতো। অতিথি এলে বের করা হয়, চলে গেলে আবার শোকেসে তুলে রাখা হয়। অনেকের কাছে এভাবে বস্তুরূপে টিকে থাকাটাই সম্মানের প্রতীক। যারা একে সম্মান মনে করেন না, তাদের জন্য সেই শৃঙ্খল ভাঙার সংগ্রাম এখনো চলছে।

 

নূজিয়া হাসিন রাশা: ছাত্র সংগঠক ও ফ্রিল্যান্স লেখক।

নাটকীয় ম্যাচ জিতে রেফারিদের কঠোর সমালোচনায় টুখেল

ঐতিহাসিক অ্যাজটেকায় ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচের পর রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু এই ম্যাচেই নয়, পুরো টুর্নামেন্টেই বিভিন্ন সময় ভিএআর এর সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এবার ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই বলে দিয়েছেন, এবারের বিশ্বকাপের রেফারিরা যথেষ্ট মানসম্মত নন। 

ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচে অন-ফিল্ড রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অস্ট্রেলীয়-ইরানীয় রেফারি আলিরেজা ফাগানি। এই নিয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে রেফারির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আর ভিএআর হিসেবে ছিলেন কলম্বিয়ান রেফারি নিকোলাস গালো। ম্যাচে দুটি পেনাল্টি ও একটি লাল কার্ড দেখিয়েছেন রেফারি। 

এর মধ্যে একটি পেনাল্টি ও লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত গেছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। এরপরই ম্যাচ শেষে মিডিয়ার সামনে সরাসরি নিজের অসন্তোষ উগড়ে দিয়েছেন টুখেল। বিবিসি স্পোর্টসকে টুখেল বলেছেন, ‘রেফারিরা প্রত্যাশিত মানের নন। চতুর্থ রেফারিরাও ওই মানের নন’।  

ম্যাচের ৬৯ মিনিটে মেক্সিকোর ব্রায়ান গুতিয়েরেজকে ফাউলের অভিযোগে ভিএআরের সাথে আলোচনা করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি দেন রেফারি। পেনাল্টি থেকে গোল করে মেক্সিকোকে ম্যাচে ভালোভাবেই ফিরিয়ে এনেছিলেন রাউল হিমেনেজ। কিন্তু রেফারির এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ টুখেল, ‘এটা কি পেনাল্টি হওয়ার মতো নিশ্চিত কোনো ফাউল? আমি তা মনে করি না। মাঠের রেফারি যেখানে ফাউলই দেয়নি, সেখানে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত বদলে পেনাল্টি দেয়া হলো’। 

তবে টুখেলের অভিযোগের সাথে একমত নন ২০১০ বিশ্বকাপ ফাইনালে সহকারী রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড্যারেন ক্যান। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, ‘কেইন মেক্সিকো খেলোয়াড়ের পায়ে লাথি মেরেছিল। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে লুকা মদ্রিচের ফাউলের কারণে ইংল্যান্ড যে পেনাল্টি পেয়েছিল, এটাও অনেকটা সেরকম’। 

সাবেক ইংলিশ গোলরক্ষক জো হার্টও বলেছেন, রেফারি তিনটি সিদ্ধান্তই সঠিক নিয়েছেন, ‘রিপ্লে দেখার সময়ই আমি বুঝতে পেরেছিলাম কী হতে চলেছে। লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। কেইনও বলের নাগাল পায়নি’।

নবম পে স্কেল: জুলাই থেকেই মিলতে পারে বর্ধিত মূল বেতন

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দুই ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে পারে সরকার। এর মধ্যে আগামী জুলাই থেকেই নতুন স্কেলে সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চলতি সপ্তাহেই পে কমিশনের সুপারিশ মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নের রোডম্যাপ অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির।

বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে গঠিত তিনটি পৃথক পে কমিশনের প্রতিবেদনের পর্যালোচনা শেষে এই কমিটি তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করতে পারে অর্থ মন্ত্রণালয়।

প্রাথমিকভাবে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে তিন ও দুই বছর মেয়াদি—দুটি বিকল্প বিবেচনা করেছিল সরকার।

তিন বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হতো এবং তৃতীয় বছরে ভাতাগুলো কার্যকর করা হতো।

তবে অর্থ বিভাগ জানায়, দুই ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমে (আইবিএএসপ্লাসপ্লাস) কারিগরি জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে তারা একবারেই মূল বেতন পুরোটা কার্যকর করার সুপারিশ করে।

তবে সামগ্রিকভাবে দুই ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের দিকেই এগোচ্ছে কমিটি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। আমরা আশা করছি, জুলাইয়ের মাঝামাঝি বা তার পরের সপ্তাহে গেজেট প্রকাশ করা হবে।’

বর্তমান ২০টি গ্রেডের মধ্যে ১ থেকে ১০ নম্বর গ্রেডে ১০০ শতাংশ বা তার কিছুটা কম এবং ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডে গড়ে ১৩০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করতে পারে কমিটি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তব্যে ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার ঘোষণা দেন। তবে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে  ধাপে ধাপে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিচ্ছি। গত ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, অথচ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’

পে-স্কেল সংশোধনের আগের উদাহরণগুলোর মতো এবার বাজেট নথিতে বেতন-ভাতা খাতে আলাদা করে কোনো বৃদ্ধি দেখানো হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বরাদ্দটি নেট পাবলিক সার্ভিস খাতে রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ খাতে ব্যয় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।

কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে ৪৪ হাজার কোটি টাকার এই বরাদ্দ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ে ব্যয় করা হবে।

এবার মূল বেতনে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করেছে নবম পে কমিশন।

২০১৫ সালে দুই ধাপে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ওই বছর সংশোধিত মূল বেতন এবং পরের বছর সংশোধিত ভাতা কার্যকর করা হয়।

বর্তমানে সরকার তার ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।

সংস্কার ও সুশাসনের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি সরকার: জামায়াত আমির

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সরকার তা পূরণ করতে পারেনি।

তিনি বলেন, অতীতে যে শাসনব্যবস্থা ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল, তার মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। ফলে জাতীয় জীবনে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে।

আজ শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়-সংলগ্ন আল-ফালাহ মিলনায়তনে দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুর রহমান বলেন, অভ্যুত্থানের পর মানুষ বিশ্বাস করেছিল, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘ সংলাপের পর যে সংস্কার সনদ তৈরি হয়েছিল, তার ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন করা হয়নি। যেসব রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কারণে অতীতে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেগুলোও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে সরকারি দল ও বিরোধী দল—উভয়েই গণভোটের ফল মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সরকার এখন সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। এ কারণে জাতীয় জীবনে সংকট তৈরি হয়েছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও জুলুম-নিপীড়ন বেড়েই চলেছে। মানুষের জানমাল ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থাকা সত্ত্বেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি নেই।

তিনি সরকারের প্রতি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানান।

শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দল হিসেবে জনগণের স্বার্থবিরোধী যেকোনো সরকারি পদক্ষেপের প্রতিবাদ করা হবে। প্রয়োজন হলে তা প্রতিরোধও করা হবে। এই আন্দোলন সংসদের ভেতরে ও বাইরে সমানতালে চলবে।

তিনি বলেন, জামায়াত একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে চায়। কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথানত না করে মর্যাদাবান জাতি হিসেবে দাঁড়াতে চায়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দলের লড়াই অব্যাহত থাকবে এবং জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা সম্ভব।

বক্তব্যের শুরুতে আশুরার তাৎপর্য তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, হজরত মুসা (আ.)-এর মুক্তি এবং কারবালায় ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও সত্য প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়।

তিনি বলেন, আজও বিশ্বজুড়ে নির্যাতন-নিপীড়ন চলছে। আল্লাহর দেওয়া ন্যায়ভিত্তিক বিধান অনুসরণ করলেই মানবজাতির প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।

এ সময় তিনি বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে সুশাসন, দক্ষতা, জবাবদিহি ও দেশপ্রেমভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এটা আমার ও দেশের জন্য বড় সম্মান: রুনা লায়লা

উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। গান দিয়ে জয় করেছেন কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা।

বাংলাদেশের গর্ব তিনি। নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। সেই সঙ্গে বাংলা গান দিয়ে বিশ্বের দরবারে নিজ দেশকে পরিচিত করিয়েছেন এবং সম্মান বয়ে এনেছেন। স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন দেশ-বিদেশ থেকে।

গুণী এই শিল্পী এখনো গানে গানে সরব আছেন।

এবার একসঙ্গে দুটি সুসংবাদ দিচ্ছেন রুনা লায়লা তার ভক্তদের জন্য। 

একটি হচ্ছে নতুন একটি গান করেছেন। ‘অনায়াসে’ নামের গানটি ১৬ মে মুক্তি পাচ্ছে। গানের মিউজিক ভিডিও করা হয়েছে।

এছাড়া, দ্বিতীয় সুখবরটি হচ্ছে তিনি দিল্লি থেকে বড় একটি সম্মান পাচ্ছেন। ‘মিনার-ই-দিল্লি’ সম্মাননা পাচ্ছেন তিনি। তাকে এই পুরস্কার দেবে দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষ। 

শুভ দিনটি ৪ মে। ওই দিন দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টস ও আম্বেদকর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে উৎসব শুরু হবে।

এই উৎসব শেষ হবে ৮ মে। সেখানেই রুনা লায়লাকে সম্মাননা দেওয়া হবে।

দিল্লিতে পেতে যাওয়া সম্মাননার বিষয়ে রুনা লায়লা বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটা আমার সম্মান এবং দেশের জন্য বড় সম্মান। বাংলাদেশের জন্য বড় একটি সম্মান। খুবই আনন্দিত আমি। খুবই খুশি। গর্ব হচ্ছে আমি বাংলাদেশি শিল্পী হিসেবে সম্মানটি পাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘কৃতজ্ঞতা জানাই সৃষ্টিকর্তাকে, ভালোবাসা জানাই আয়োজকদের।’

রুনা লায়লা বলেন, ‘দিল্লি থেকে আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান রাম কিশোর একটি চিঠিতে আমাকে খবরটি জানিয়েছেন। অনেক খুশি আমি। আয়োজনের অংশ হতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’

এদিকে, নতুন গানের বিষয়ে রুনা লায়লা বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে গানটি সলো গাওয়ার কথা ছিল। পরে বাপ্পা মজুমদারকে নিলাম। এরপর ডুয়েট গান এখন। বাপ্পা শুরুতে ভয় পেল। বলল, আমি গাইব আপনার সঙ্গে?’

তারপর বাপ্পাকে বললাম, ‘অসুবিধা কী? তুমি ভালো গান করো। এভাবেই ডুয়েট গান হলো।’

‘গানটি আসলে নতুন ঢংয়ের। গজল টাইপের গান। এইরকম গান প্রথম গাইলাম। ভালো হয়েছে। সবার ভালো লাগবে। ১৬ মে সবাই শুনতে পারবেন’, যোগ করেন তিনি। 

রুনা লায়লা আরও বলেন, ‘গানের সুর অনেক সুন্দর হয়েছে। গানের কথাও খুব ভালো হয়েছে। এক কথায় আমার কাছে ভালো লেগেছে।’

গানের শিরোনাম ‘অনায়াসে’। গানের কথা লিখেছেন গালিব হাসান। সুর ও সংগীত করেছেন বাপ্পা মজুমদার।
রুনা লায়লা বলেন, ‘গানের কম্পোজিশন অনেক ভালো হয়েছে। গানের কথাও বেশ সুন্দর। সব মিলিয়ে সুন্দর একটি গান আসছে।’

এখনো নিয়মিত গান করে যাচ্ছেন? এর জবাবে রুনা লায়লা বলেন, ‘এটা ওপরওয়ালার রহমত। তার রহমত আছে বলেই গান করতে পারছি। আমি শুধু চেষ্টা ও সাধনা করছি, বাকিটুকু ওপরওয়ালার রহমত। এভাবেই সারাজীবন গান করে যেতে চাই।’

সম্প্রতি সিলেটে একটি শো করে এসেছেন। এই বিষয়ে রুনা লায়লা বলেন, ‘দেড় ঘণ্টার মতো স্টেজে গান করেছি। ভালো একটি শো হয়েছে। দীর্ঘ সময় নিয়ে গান করেছি। এখনো এভাবে গাইতে পারি, এটাও সৃষ্টিকর্তার রহমত।’

ডুয়েট গান নিয়ে ফেসবুকে রুনা লায়লার বার্তা শেয়ার করেন বাপ্পা মজুমদার

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত ৪০, আহত ২৪৬

লেবাননে গত দুদিনের ইসরায়েলি হামলায় ৪০ জন নিহত ও ২৪৬ জন আহত হয়েছেন।

আজ মঙ্গলবার দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

গতকাল পর্যন্ত লেবাননে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানায় জাতিসংঘ। 

ইরানে হামলার পর লেবাননের হিজবুল্লাহর বিপক্ষে যুগপৎ যুদ্ধ ঘোষণা করে ইসরায়েল। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সীমান্ত অঞ্চলে বাফার জোন তৈরি করছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)।

দেশটির টেলিভিশনে দেওয়া বিবৃতিতে সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেন, ‘নর্দার্ন কমান্ড এগিয়ে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নাগরিকদের জন্য যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় একটি বাফার তৈরি করছি আমরা।’

হিজবুল্লাহর চৌকস বাহিনী রাদওয়ান ফোর্সসহ অন্তত ১৬০টি লক্ষ্যে সফল হামলা চালিয়েছে বলেও দাবি করেছে ইসরায়েল। আইডিএফের বরাতে এএফপি জানায়, এসব হামলায় হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা প্রধান হুসেইন মুয়াকালেদ নিহত হয়েছেন। 

এদিকে, আজ দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ইসরায়েলি ড্রোন ভূপাতিতের দাবি করেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ২০২৪ সালে দুই পক্ষের সংঘাতেও হিজবুল্লাহ বেশকিছু ড্রোন ভূপাতিত করেছিল বলে জানায় রয়টার্স। 

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত হামলায় এ পর্যন্ত ৭৮৭ জন মারা গেছেন। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে এএফপি।

বিডিআর হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠন করবে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ২০০৯ সালে রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ড পুনঃতদন্তের জন্য সরকার একটি কমিশন গঠন করবে।

মন্ত্রী গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তর-সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুনরায় কমিশন গঠন করে সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে সেই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এর বিচার করা হবে।

তিনি আরও বলেন, এটা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও আছে। আমরা যেকোনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এতে ৫৭ সেনাকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।

জেমিনাই-চ্যাটজিপিটিকে একটি প্রশ্ন করলে কত বিদ্যুৎ ও পানি খরচ হয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু গবেষণাগারের প্রযুক্তি নয়। চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনাই, মাইক্রোসফট কোপাইলটের মতো এআই টুল প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের নানা কাজে ব্যবহার হচ্ছে। সাধারণত আমরা পর্দায় একটি প্রশ্ন লিখি, তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর পেয়ে যাই। পুরো ব্যাপারটা আমাদের কাছে খুব সহজ মনে হয়।

কিন্তু পর্দার আড়ালে প্রতিটি প্রশ্নের জন্য কাজ করছে বিশাল ডেটা সেন্টার। আর এসব ডেটা সেন্টার চালাতে প্রয়োজন হচ্ছে বিদ্যুৎ। কম্পিউটার ঠাণ্ডা রাখতেও প্রয়োজন হচ্ছে পানি। ফলে এআই যত বেশি ব্যবহার হচ্ছে, ততই বাড়ছে এর পরিবেশগত প্রভাব।

গত বছরের জুনে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এক ব্লগ পোস্টে জানিয়েছিলেন, চ্যাটজিপিটিতে একটি প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৩৪ ওয়াট-ঘণ্টা শক্তি এবং শূন্য দশমিক ৩২২ মিলিলিটার পানি লাগে।
তিনি তুলনা করে বলেছিলেন, একটি ওভেন এক সেকেন্ডের একটু বেশি সময় চালানোর মতো এটি।

একই বছরের আগস্টে গুগল ক্লাউডের এক ব্লগে জানানো হয়, জেমিনাইতে একটি প্রশ্নের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় শূন্য দশমিক ২৪ ওয়াট-ঘণ্টা শক্তি বিদ্যুৎ ও শূন্য দশমিক ২৬ মিলিলিটার পানি, যা প্রায় পাঁচ ফোঁটা পানির সমান। বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি সহজ করে বললে, একটি জেমিনাই প্রশ্নের জন্য যতটা বিদ্যুৎ লাগে, তা দিয়ে ৯ সেকেন্ডেরও কম সময় টেলিভিশন চালানো যায়।

একটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ খুবই সামান্য মনে হতে পারে। কয়েক ফোঁটা পানির মতোই নগণ্য। কিন্তু যখন প্রতিদিন কোটি কোটি প্রশ্ন করা হয়, তখন হিসাবটা বদলে যায়।

ধরা যাক, একজন মানুষ দিনে কয়েকবার এআই ব্যবহার করছেন। তার ব্যবহারের পরিমাণ হয়তো পরিবেশের ওপর চোখে পড়ার মতো প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু একই কাজ যদি কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন করেন, তাহলে সেই সামান্য সামান্য ব্যবহার একসঙ্গে বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা তৈরি করে।

এআইয়ের পরিবেশগত খরচ বোঝার সময় দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হয়। প্রথমটি হলো প্রশিক্ষণ, অর্থাৎ মডেলকে শেখানোর প্রক্রিয়া।

একটি বড় এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে বিপুল পরিমাণ তথ্য ব্যবহার করা হয়। হাজার হাজার জিপিইউ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এই প্রশিক্ষণ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। এই সময় প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়।

সমস্যা হলো, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের মডেল কীভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, কতক্ষণ প্রশিক্ষণ দিয়েছে কিংবা ঠিক কী ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে; এসব তথ্য সবসময় প্রকাশ করে না।

তাই মডেল প্রশিক্ষণের কার্বন নিঃসরণের পুরো হিসাব করা কঠিন।

দ্বিতীয় বিষয় হলো ইনফারেন্স। কেউ যখন এআইকে প্রশ্ন করেন এবং সে উত্তর তৈরি করে, তখন সেটিই ইনফারেন্স।

ধরি, কেউ ঢাকার আবহাওয়া জানতে চাইলেন।

আরেকজন ব্যবহারকারী এআইকে বললেন, ‘আমার জন্য ১০ দিনের একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করো, প্রতিদিনের খাবার, যাতায়াত, খরচ ও সম্ভাব্য ঝুঁকিসহ।’

দুটি প্রশ্নের জন্য কম্পিউটারের কাজ এক হবে না। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে অনেক বেশি হিসাব করতে হতে পারে। উত্তরও হতে পারে অনেক বড়।

এআই যে পরিমাণ লেখা প্রক্রিয়া করে, সেগুলোকে বলা হয় টোকেন। সাধারণভাবে বেশি টোকেন মানে বেশি গণনা ও বেশি শক্তি ব্যবহার।

জার্মানির মিউনিখ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সের গবেষক ম্যাক্সিমিলিয়ান ডনার ও গডরান ছোচার ১৪টি ওপেন-সোর্স এআই মডেল নিয়ে গবেষণা করেন। মডেলগুলোর আকার ছিল ৭ বিলিয়ন থেকে ৭২ বিলিয়ন প্যারামিটার পর্যন্ত।
গবেষণায় দেখা যায়, সব এআই মডেলের শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ এক নয়।

বিশেষ করে রিসোনিং মডেল উত্তর দেওয়ার আগে সাধারণ মডেলের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি ব্যবহার করতে পারে। এআইয়ের যে মডেল তুলনামূলক বেশি ধাপে হিসাব করে তাকে রিসোনিং মডেল বলে।

গবেষকরা বলছেন, প্রতিটি প্রশ্নের জন্য সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল ব্যবহার করা প্রয়োজন হয় না। সহজ একটি প্রশ্নের উত্তর যদি ছোট ও সাধারণ একটি মডেল ভালোভাবেই দিতে পারে, তাহলে শুধু অভ্যাসের কারণে সবচেয়ে বড় মডেল ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।

গবেষণায় এমন উদাহরণও পাওয়া গেছে, যেখানে একটি সাধারণ মডেল প্রায় একই ধরনের নির্ভুলতা বজায় রেখে রিসোনিং মডেলের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম কার্বন নিঃসরণ করেছে।

অর্থাৎ সঠিক কাজের জন্য সঠিক মডেল বেছে নেওয়াও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তুলনাও উঠে এসেছে।

সায়েন্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭০ বিলিয়ন প্যারামিটারের ডিপসিক আর১ রিসোনিং মডেল দিয়ে ৫ লাখ প্রশ্নের উত্তর তৈরি করলে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হতে পারে, তা লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক যাওয়া-আসার একটি বিমানযাত্রার কার্বন নিঃসরণের কাছাকাছি হতে পারে।

এখানে অবশ্য মনে রাখতে হবে, এটি একটি নির্দিষ্ট মডেল ও নির্দিষ্ট পরীক্ষার হিসাব। সব এআই মডেলের ক্ষেত্রে একই সংখ্যা প্রযোজ্য নয়।

চ্যাটজিপিটি চালু হওয়ার পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এআই ব্যবহারের বিস্ফোরণ ঘটেছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে টেকক্রাঞ্চ এক প্রতিবেদনে বলা জানিয়েছিল, চ্যাটজিপিটিতে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি প্রশ্ন বা প্রম্পট পাঠানো হচ্ছে।

অর্থাৎ মানুষ এখন কেবল আলাদা করে এআই অ্যাপ খুলে প্রশ্ন করছে না। নানা কাজের মধ্যেই এআই ঢুকে পড়ছে।

মাইক্রোসফট তাদের অফিস সফটওয়্যারে এআই যুক্ত করেছে। গুগল তাদের সার্চ ও জিমেইল সেবায় এআই ব্যবহার করছে। ফলে ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারের পরিমাণ আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন, এত এআই ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও পানি আসবে কোথা থেকে?

আমরা যখন ফোন বা কম্পিউটার থেকে কোনো প্রশ্ন পাঠাই, তখন উত্তরটি আমাদের যন্ত্রের ভেতরে তৈরি হয় না। প্রশ্নটি চলে যায় দূরের কোনো ডেটা সেন্টারে।

সেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী কম্পিউটার বা সার্ভার একসঙ্গে কাজ করে উত্তর তৈরি করে।

এই সার্ভারগুলো চালাতে প্রচুর বিদ্যুৎ লাগে। আবার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে সার্ভারগুলো গরম হয়ে যায়। তাই এগুলো ঠাণ্ডা রাখার জন্য বিশেষ ধরনের কুলিং ব্যবস্থা দরকার হয়।

কিছু ডেটা সেন্টারে এই ঠাণ্ডা রাখার প্রক্রিয়ায় পানি ব্যবহার করা হয়।

ফলে একটি এআই প্রশ্নের পরিবেশগত খরচ শুধু বিদ্যুতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি, অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে তৈরি হওয়া কার্বন নিঃসরণও।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ ২০২৫ সালের এপ্রিলে এ প্রতিবেদনে বলেছিল, বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টার বেশি হতে পারে।

ফোর্বসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি জাপানের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবহারের কাছাকাছি!

এর পেছনে এআই একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এআই মডেল যত বড় হচ্ছে, সেগুলো চালাতে তত বেশি কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষও এআই ব্যবহার করছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

অর্থাৎ একদিকে প্রযুক্তি আরও দক্ষ হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে।

এআই কোম্পানিগুলো অবশ্য বসে নেই। কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বেশি কাজ করা যায়—এমন নতুন চিপ তৈরি হচ্ছে। ডেটা সেন্টারের কুলিং প্রযুক্তিও উন্নত হচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির ব্যবহার কমানোর জন্য নতুন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকেও বিনিয়োগ করছে। কিন্তু এখানে একটি সমস্যা আছে। প্রযুক্তি আরও দক্ষ হলে সাধারণত সেটি ব্যবহার করাও সস্তা ও সহজ হয়ে যায়। ফলে মানুষ আরও বেশি ব্যবহার করতে শুরু করে।

অর্থনীতিতে এই ঘটনাকে বলা হয় জেভন্স প্যারাডক্স। অর্থাৎ একটি কাজ করতে যত কম সম্পদ লাগে, সেই প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়ে গেলে মোট সম্পদের ব্যবহার আবারও বাড়তে পারে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যাচ্ছে।

একটি প্রশ্নের জন্য হয়তো এখন আগের চেয়ে কম বিদ্যুৎ লাগবে। কিন্তু যদি প্রশ্নের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, তাহলে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার কমার বদলে বেড়েও যেতে পারে।

ব্যাপারটা তা নয়। এআইয়ের অনেক ইতিবাচক ব্যবহার রয়েছে। এটি চিকিৎসা গবেষণা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, যোগাযোগ, প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তা এবং নানা ধরনের কাজকে সহজ করে তুলতে পারে।

সমস্যা হলো, এই প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর পরিবেশগত খরচকেও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

একটি প্রশ্নের জন্য কয়েক ফোঁটা পানি বা সামান্য বিদ্যুৎ হয়তো বড় বিষয় নয়। কিন্তু কোটি কোটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে সেই সামান্য পরিমাণই বড় হয়ে ওঠে।

তাই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ হলো, কম সম্পদ ব্যবহার করে আরও কার্যকর এআই ব্যবস্থা তৈরি করা।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন ডেটা সেন্টারের পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে আরও স্বচ্ছ তথ্য, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার।

এআই আমাদের জীবনকে সহজ করতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধার মূল্য যেন পৃথিবীর পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবেশকে অতিরিক্ত চাপের মুখে ফেলে না সেদিকেও নজর দিতে হবে।

ফলাফল কেবল সংখ্যা, জীবন তারচেয়েও অনেক বড়

আজ বাংলাদেশের লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে একটি বিশেষ দিন। প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল। কারো ঘরে আনন্দ, কারো চোখে স্বস্তির জল, আবার কোথাও হয়তো নেমে এসেছে নীরবতা। কেউ প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে, কেউ পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত ফলের চেয়ে কম, আবার কেউ হয়তো আজ নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে শুরু করেছে।

কিন্তু ফল প্রকাশের এই দিনে সবচেয়ে জরুরি যে কথাটি মনে রাখা দরকার তা হলো, একটি নম্বর কখনোই একজন মানুষের পুরো জীবন, মেধা কিংবা সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না।

এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। সার্বিক পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট।

এই সংখ্যাগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলাফলের ওঠানামা নিয়ে বিশ্লেষণও প্রয়োজন। কেন পাসের হার কমল, কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ল, শিক্ষার মান কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, পরীক্ষা পদ্ধতি কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্ন নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।

কিন্তু আজকের দিনটি শুধু পরিসংখ্যানের দিন নয়, এমন কিছু কিশোর-কিশোরীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যারা এই বয়সেই নিজেদের সাফল্য বা ব্যর্থতার একটি কঠিন সংজ্ঞার মুখোমুখি হচ্ছে।

আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা দীর্ঘদিনের—পরীক্ষায় ভালো ফল করলে বলি, ‘ছেলেটা খুব মেধাবী’; আর ফলাফল প্রত্যাশা মতো না হলে সহজেই বলে ফেলি, ‘ও পড়াশোনায় ভালো না’।

কিন্তু সত্যিই কি তাই? একজন শিক্ষার্থী কি তার পরীক্ষার খাতায় লেখা কয়েকটি সংখ্যার সমান? একজন ১৬ বা ১৭ বছরের কিশোর-কিশোরীর মেধা, সৃজনশীলতা, কৌতূহল, নেতৃত্বের গুণ, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা কি কয়েকটি সংখ্যায় মাপা সম্ভব? অবশ্যই নয়।

তারপরও আমরা সন্তানদের এমন একটি প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিই, যেখানে জিপিএ-৫ যেন সাফল্যের একমাত্র সনদ। কে কত পেল, কে জিপিএ-৫ পেল, কে গোল্ডেন জিপিএ পেল, কে কোন কলেজে ভর্তি হবে, কে কার চেয়ে ভালো করেছে—এসব নিয়ে শুরু হয় তুলনা।

ফল প্রকাশের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের ছবি, অভিনন্দন, ফুল, কেক ও সাফল্যের গল্পে ভরে যায়। এগুলো আনন্দের এবং অবশ্যই উদযাপনের যোগ্য। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে এমন অনেক শিক্ষার্থীও থাকে, যারা নিজের ফলাফল নিয়ে ভীষণ হতাশ। কেউ হয়তো ভাবছে, ‘আমি কি ব্যর্থ?’

এখানেই আমাদের থামতে হবে। একজন সন্তানের ফলাফল দেখে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘কত পেয়েছ?’ প্রথমেই দেখা উচিত, তার মানসিক অবস্থাটা কেমন। কারণ, ফলাফল খারাপ হওয়ার পর একটি শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও পরিবারের সমর্থন। তখন তাকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা নয়, তার পাশে দাঁড়ানো জরুরি। তাকে বলতে হবে, ‘তুমি প্রত্যাশিত ফল পাওনি, কিন্তু তুমি আমাদের কাছে ব্যর্থ নও।’ এই একটি বাক্য হয়তো একটি ভেঙে পড়া মনকে আবার দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া আর জীবনে ব্যর্থ হওয়া এক বিষয় নয়। এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা শিক্ষাজীবনে অসাধারণ ফল করেননি, কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিজেদের যোগ্যতা ও কর্ম দিয়ে পৃথিবীতে অন্যতম জায়গা অর্জন করেছেন। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফল করেছিলেন, কিন্তু জীবনের নানা চ্যালেঞ্জে নিজেদের সামলে উঠতে পারেননি। কারণ, জীবন কোনো বোর্ড পরীক্ষা নয়। জীবনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অনেক বড়। সেখানে শুধু গণিত, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা জীববিজ্ঞানের প্রশ্ন থাকে না। সেখানে থাকে সততা, দায়িত্ববোধ, ধৈর্য, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, মানবিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস।

একজন মানুষ পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে মানুষ হিসেবে কেমন হয়েছে। তাই যারা এবার ভালো ফল করেছে, তাদের অভিনন্দন জানাতেই হবে, তাদের পরিশ্রমকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু তাদের এটাও মনে করিয়ে দিতে হবে, জিপিএ-৫ কোনো গন্তব্য নয়, এটি কেবল একটি ধাপ। সামনে আরও বড় পথ। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মজীবন এবং বাস্তব জীবনের অসংখ্য পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। সেখানে শুধু ভালো ফলাফল যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে দক্ষতা, মূল্যবোধ, প্রযুক্তিজ্ঞান, ভাষাজ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।

যারা প্রত্যাশিত ফল পায়নি, তাদের বলি, গল্প এখানেই শেষ নয়। আজকের ফলাফল জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হতে পারে, কিন্তু পুরো বইটির নয়। হয়তো অন্য পথে সফলতা আসবে। হয়তো তোমার শক্তি এমন কোনো জায়গায়, যেটা এই পরীক্ষার খাতা মাপতে পারেনি। হয়তো তোমার আরও সময় প্রয়োজন। হয়তো তোমাকে নতুন করে চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু একটি পরীক্ষার ফলাফলের কারণে নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলো না।

আমাদের অভিভাবকদেরও মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সন্তানকে প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে, আত্মীয়ের সন্তানের সঙ্গে কিংবা বন্ধুর সঙ্গে তুলনা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তানের ফলাফলকে নিজের সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি বানানো যাবে না। সন্তান জিপিএ-৫ না পেলেও সে ভালো মানুষ হতে পারে, সে একজন দক্ষ উদ্যোক্তা হতে পারে, ভালো শিক্ষক হতে পারে, অসাধারণ শিল্পী হতে পারে, গবেষক হতে পারে, দক্ষ কারিগর হতে পারে কিংবা এমন কিছু করতে পারে, যার কথা আজ আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনেও তাই বড় একটি প্রশ্ন রয়েছে। আমরা কি শুধু ভালো ফল করা শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, নাকি ভালো মানুষ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সক্ষম নাগরিক তৈরি করতে চাই? এই প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও নতুন প্রযুক্তি আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রকে আমূল পরিবর্তন করছে। শুধু মুখস্থ জ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকা কঠিন হবে। যে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে, সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, ভবিষ্যতে তারাই এগিয়ে থাকবে।

তাই ফলাফলকে সম্মান করুন, কিন্তু ফলাফল দিয়ে সন্তানকে বিচার করবেন না। একটি নম্বর তার খাতার পরিচয় হতে পারে, কিন্তু পুরো জীবনের পরিচয় নয়।

শিক্ষার্থীদের প্রতি বার্তা, আজ ফলাফল যাই আসুক, মনে রেখো—তোমার সামনে এখনো পুরো জীবন পড়ে আছে এবং আর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি এখনো শুরুই হয়নি।

 

মো. তরিকুল ইসলাম: লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষা পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]