28.7 C
Dhaka
Home Blog

গণশত্রু থেকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং: প্রকৃতি, মিডিয়া ও প্রতিরোধের গল্প

আমরা যখন পরিবেশ নিয়ে কথা বলি, তখন সাধারণত কিছু পরিচিত ছবি ভেসে ওঠে—গলতে থাকা হিমবাহ, কাটা পড়া বন, প্লাস্টিকে ভরা সমুদ্র কিংবা ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া শহর। কিন্তু পরিবেশ আসলে শুধু ‘প্রকৃতি’র বিষয় নয়। এটি গল্পের বিষয়, ক্ষমতার ও মিডিয়ার বিষয়। আরও স্পষ্ট করে বললে—কে পৃথিবীর গল্প বলবে, আর কে শুধু সেই গল্পের ভুক্তভোগী হয়ে থাকবে—এই প্রশ্নও পরিবেশের অংশ।  

হলিউড বহু বছর ধরেই পৃথিবীর শেষ হয়ে যাওয়ার গল্প বানাচ্ছে। ‘দ্য ডে আফটার টুমরো’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘অ্যাভাটার’ কিংবা সাম্প্রতিক ‘ডোন্ট লুক আপ’—সব সিনেমাতেই পৃথিবী বিপদের মুখে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই সিনেমাগুলোর বেশিরভাগ সংকট গ্লোবাল হলেও তার নায়ক প্রায় সবসময়ই আমেরিকা। যেন পৃথিবী মানেই ওয়াশিংটন বা নিউ ইয়র্ক। অথচ জলবায়ু বিপর্যয়ের সবচেয়ে বাস্তব গল্পগুলো ঘটছে ঢাকার উপকণ্ঠে, সুন্দরবনের পাশে, কলকাতার তাপদগ্ধ রাস্তায়, পাকিস্তানের বন্যায় কিংবা আফ্রিকার খরাপীড়িত গ্রামে। পৃথিবীর সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করা মানুষগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি বিপদের মধ্যে। এটিই পরিবেশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো বহুদিন ধরেই বলে আসছে—‘তোমরা উন্নয়ন করেছ, আমরা মূল্য দিচ্ছি’। জলবায়ু পরিবর্তন এখানে শুধু তাপমাত্রার প্রশ্ন নয়; এটি ইতিহাসের প্রশ্ন। উপনিবেশবাদ, শিল্পায়ন, পুঁজিবাদ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘কার্বন সাম্রাজ্যবাদ’। গবেষকরা একে বলছেন ক্লাইমেট ইনজাস্টিস— যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলেই উপস্থিত নেই। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক অন্যায়ের সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণগুলোর একটি।

পৃথিবীর মোট কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য। অথচ ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা আর জলবায়ু উদ্বাস্তু—সবকিছুর সবচেয়ে নির্মম অভিঘাত এখানেই। উপকূলের মানুষ শহরে আসছে। শহর তাদের জায়গা দিতে পারছে না। ফলে পরিবেশ সংকট একসময় সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।

এই জায়গায় এসে পরিবেশ আর সমাজতত্ত্ব আলাদা থাকে না। সমাজতত্ত্ব আমাদের শেখায়—দুর্যোগ কখনও ‘সবার জন্য সমান’ নয়। ঢাকার ধনী এলাকার মানুষ এয়ার পিউরিফায়ার কিনতে পারে, কিন্তু বস্তির মানুষ দূষিত বাতাসই শ্বাস নেয়। দিল্লির অভিজাতরা হিটওয়েভের মধ্যে এসি চালায়, কিন্তু রাস্তায় কাজ করা শ্রমিকের শরীরই হয়ে ওঠে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার।

কিন্তু এই গল্পগুলো আমরা কীভাবে জানি? এখানেই আসে কমিউনিকেশন স্টাডিজ। 

মিডিয়া শুধু খবর দেয় না, মিডিয়া বাস্তবতাও তৈরি করে। কোন বিপর্যয় ‘বড় খবর’ হবে, কোন মৃত্যু ‘পরিসংখ্যান’ হয়ে থাকবে—তা অনেকটাই নির্ভর করে মিডিয়ার ওপর। ইউরোপে বন্যা হলে সেটি হয় ‘গ্লোবাল ট্র্যাজেডি’, কিন্তু বাংলাদেশের উপকূলে হাজার মানুষ গৃহহীন হলে সেটি অনেক সময় ‘লোকাল নিউজ’ হয়েও থাকে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবশ্য এই সমীকরণ কিছুটা বদলে দিয়েছে। এখন কক্সবাজারের একজন তরুণীও ভিডিও বানিয়ে বলতে পারেন সমুদ্র কীভাবে তার বাড়ি গ্রাস করছে। সুন্দরবনের জেলে নিজের ভাষায় জলবায়ুর গল্প বলতে পারেন। অর্থাৎ পরিবেশ আন্দোলন এখন শুধু রাষ্ট্র বা এনজিওর বিষয় নয়, এটি মানুষের ব্যক্তিগত গল্প বলার জায়গাও হয়ে উঠছে।

ভারতীয় সিনেমাতেও পরিবেশ এখন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক হয়ে উঠছে। অমিতাভ বচ্চনের ‘আরক্ষণ’ বা দক্ষিণ ভারতের অনেক সিনেমায় উন্নয়ন বনাম প্রকৃতির দ্বন্দ্ব দেখা যায়। সাম্প্রতিক মালায়ালাম সিনেমাগুলোতে পাহাড় কাটা, নদী দখল বা করপোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশি সিনেমা এখনো খুব শক্তিশালীভাবে জলবায়ু সংকটকে ধারণ করতে পারেনি, কিন্তু ডকুমেন্টারি ও স্বাধীন চলচ্চিত্রে এই চেষ্টাগুলো বাড়ছে।

মজার ব্যাপার হলো, পরিবেশ নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী কাজগুলো প্রায়ই ‘মেইনস্ট্রিম’ নয়। কারণ প্রকৃত পরিবেশ রাজনীতি খুব আরামদায়ক কিছু নয়। এটি প্রশ্ন তোলে—কেন কিছু দেশ পৃথিবী ধ্বংস করার অধিকার পাবে? কেন উন্নয়নের নামে নদী মেরে ফেলা হবে? কেন বিজ্ঞাপন আমাদের এমন জীবনযাপনে উৎসাহিত করবে, যা পৃথিবী টিকিয়ে রাখতে পারে না?

আসলে পরিবেশ সংকটের বড় অংশই একটি ‘কমিউনিকেশন ক্রাইসিস’। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে মানুষ প্রকৃতির চেয়ে স্ক্রিন বেশি দেখে। ফলে নদী শুকিয়ে যাওয়ার চেয়ে নতুন ফোনের বিজ্ঞাপন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পুঁজিবাদ এখানে শুধু অর্থনীতি নয়, এটি কল্পনারও নিয়ন্ত্রক। এই কারণেই বিশ্ব পরিবেশ দিবস এখন শুধু গাছ লাগানোর অনুষ্ঠান হতে পারে না। এটি হওয়া উচিত নতুন গল্প বলার দিন। এমন গল্প, যেখানে পৃথিবী শুধু একটি ‘লোকেশন’ নয়, বরং একটি জীবন্ত রাজনৈতিক ও মানবিক সত্তা।

হয়তো ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ আন্দোলনটি হবে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন—যেখানে সিনেমা, সাহিত্য, গান, সাংবাদিকতা, ইউটিউব ভিডিও, এমনকি মিমও মানুষকে নতুনভাবে পৃথিবীর কথা ভাবতে শেখাবে।

পরিবেশ সংকট নিয়ে সিনেমা বহুদিন ধরেই আমাদের কল্পনা, ভয় এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করছে। বং জুন-হো’র ‘স্নোপিয়ার্সার’–এ দেখা যায় জলবায়ু বিপর্যয়ের পর বেঁচে থাকা মানুষদের শ্রেণিভিত্তিক বিভক্ত এক ট্রেন-সভ্যতা, যেখানে পরিবেশ সংকট শেষ পর্যন্ত সামাজিক বৈষম্যের গল্প হয়ে ওঠে।

আবার ওকজা’র সিনেমায় করপোরেট খাদ্যশিল্প, প্রাণী ও পুঁজিবাদের সম্পর্ককে এমনভাবে দেখানো হয়, যা পরিবেশ রাজনীতিকে একেবারে ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গায় নিয়ে আসে। পিক্সারের ‘ওয়াল-ই’ হয়তো শিশুদের অ্যানিমেশন, কিন্তু সেটি মূলত অতিভোগবাদ, প্লাস্টিক সভ্যতা এবং করপোরেট পৃথিবীর বিরুদ্ধে এক গভীর রাজনৈতিক ভাষ্য।

ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’-এ ধ্বংসপ্রায় পৃথিবী ছেড়ে মানুষ নতুন গ্রহ খুঁজতে বের হয়। যেন পৃথিবীকে বাঁচানোর চেয়ে পালিয়ে যাওয়ার কল্পনাই আধুনিক সভ্যতার বড় স্বপ্ন। আর ‘ডোন্ট লুক আপ’ সিনেমাটি দেখিয়েছে, কীভাবে মিডিয়া, করপোরেট শক্তি ও রাজনৈতিক পপুলিজম মিলে বৈজ্ঞানিক সত্যকেও ‘বিনোদন’ বানিয়ে ফেলে।

এই সিনেমাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিবেশ সংকট শুধু প্রকৃতির সংকট নয়। এটি মিডিয়া, পুঁজিবাদ, তথ্য রাজনীতি এবং মানুষের কল্পনাশক্তিরও সংকট।

এই লেখাটি শেষ করব সত্যজিৎ রায়ের ‘গণশত্রু’ সিনেমাটির প্রসঙ্গ দিয়ে। সেখানে ডা. অশোক গুপ্ত আবিষ্কার করেন যে শহরের মন্দিরের ‘পবিত্র’ জল আসলে দূষিত এবং মানুষের অসুস্থতার কারণ। কিন্তু সত্য প্রকাশ করতে গেলে তিনি শুধু ধর্মীয় গোঁড়ামির মুখোমুখিই হন না; রাজনৈতিক ক্ষমতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং জনমোহিনী প্রচারণাও তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এই লড়াইয়ে একজন সাংবাদিক ও কিছু তরুণ তার পাশে এসে দাঁড়ায়।

সত্যজিৎ যেন দেখাতে চেয়েছিলেন—সমাজকে রক্ষা করতে বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা ও সাংবাদিকতার জোট কতটা জরুরি। আজকের জলবায়ু সংকটের সময়েও সেই কথাই নতুনভাবে সত্য হয়ে ওঠে। কারণ পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, এটি সত্য, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, সাবেক পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক। ইমেইল: [email protected] 

ট্র্যাকের বিষণ্ণ শূন্যতা: হারিয়ে যাচ্ছে নারী অ্যাথলেটদের পদধ্বনি?

রোববার ৪৯তম জাতীয় অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০ মিটারে দ্বিতীয় হয়েছেন শরিফা খাতুন। বুকে পদক, চোখে তৃপ্তি। খুব শিগগিরই তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষিণ সুদানে পাড়ি জমাবেন। এটি হয়তো তার শেষ জাতীয় প্রতিযোগিতা। খুলনার এই স্প্রিন্টার গত ১২ বছর ধরে সেনাবাহিনীতে আছেন। এই খেলাই তাকে এনে দিয়েছে এই চাকরি। তাই গর্বের সঙ্গে বলতে পারেন, ‘কখনো মনে হয়নি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ কিন্তু শারিফার এই আত্মবিশ্বাসী পথচলার পাশে যদি একটু দাঁড়িয়ে ট্র্যাকের দিকে তাকানো যায়, দেখা যাবে, এই পথে মেয়েদের পদচিহ্ন ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

৪৭তম জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় নারী অ্যাথলেট ছিলেন ১৪৬ জন। ৪৮তম আসরে সেই সংখ্যা নামে ১০৭-এ। আর চলমান আসরে ৪৫টি সংস্থার ৪১০ জন অ্যাথলেটের মধ্যে নারী মাত্র ৯৮ জন। তিন বছরে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে নারীর উপস্থিতি। যদিও এ বছরে কমেছে ছেলেদের সংখ্যাও। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো এক একটি গল্পের অনুপস্থিতি। যে মেয়েটি আসেনি, সে কেন আসেনি, সেই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই যে কথাটা বারবার উঠে আসে, সেটা হলো ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। নেত্রকোনা জেলা ক্রীড়া সংস্থার কোচ মোখলেসুর রহমান আশির দশক থেকে এই ট্র্যাকের মানুষ। বললেন, ‘জেলায় ভালো করলাম, বিভাগে ভালো করলাম, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে কিছু হলো না, তখন কেউ দেখে না। পরিবারের কাছে সেটা দায় হয়ে যায়।’ একটি মেয়েকে বছরের পর বছর ট্র্যাকে দৌড়াতে পাঠানো মানে শুধু শারীরিক পরিশ্রম নয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন আর আর্থিক বিনিয়োগও। সেই বিনিয়োগের শেষে যদি কোনো নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে পরিবার পিছিয়ে আসে।

একসময় এই নিশ্চয়তার জায়গাটা পূরণ করত বিটিএমসি, বিজিএমসি, কাস্টমস, রেলওয়ের মতো সংস্থাগুলো। অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মনে করিয়ে দিলেন সেই দিনগুলোর কথা। ‘আগে বারো থেকে পনেরোটি সার্ভিস দল ছিল। একটি সংস্থা দশ হাজার টাকা বেতন দিলে আরেকটি পনেরো হাজার দিয়ে খেলোয়াড় নিয়ে যেত। এই প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স আর আয় দুটোই বাড়ত।’ নিজের কথাই বললেন তিনি, চারটি স্বর্ণপদকের বিনিময়ে বিজেএমসি তাকে সরাসরি অফিসার পদে এবং আটটি ইনক্রিমেন্ট দিয়ে নিয়েছিল। সেই ব্যবস্থা এখন কার্যত নেই। এখন কেবল সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী খেলোয়াড় নেয়, তাও সীমিত সংখ্যায়।

সাবেক হার্ডলার সুমিতা রানী এই ব্যর্থতার দায় সরাসরি দেন ফেডারেশনকে। তার কথায় ক্ষোভ আর বেদনা মিলিয়ে আছে। ‘আমরা যখন খেলেছি, দীর্ঘমেয়াদী ক্যাম্পিং ছিল, পরপর গেম হতো, স্পনসর ছিল। এখন এগুলো নেই।’ তিনি মনে করেন, ফেডারেশনকে জেলা পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ রাখতে হবে, ইকুইপমেন্ট ও সহায়তা দিতে হবে। নোয়াখালীতে একসময় অনেক অ্যাথলেট উঠে এসেছিল কেবল এই সংযোগটা থাকার কারণেই। সুমিতা একটু থামলেন, তারপর বললেন, ‘হার্ডলসে আমার মতন কেউ নেই। ১০০ মিটারেও দেখুন। শিরিন আর কিছু নাম ছাড়া তেমন কেউ নেই। কারণটা বুঝে নিন।’

কারণের আরেকটি স্তর আছে, যেটা নিয়ে কথা বলতে একটু সংকোচ থাকলেও সবাই বললেন। সেটা হলো সমাজ। মোখলেসুর রহমান বললেন তার জেলার একটি মেয়ের কথা। সাঁতারে ভালো ফল করেছিল, বিভাগীয় পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু অভিভাবক যেতে দেননি। কারণ হিসেবে বললেন, ‘এত বড় মেয়ে খেলতে যাবে, এটা পাপ।’ তার পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রসার মেয়েদের খেলাধুলায় আসার পথটাকে আরও সংকীর্ণ করে দিচ্ছে।

শারিফা খাতুনও একই কথা ঘুরিয়ে বললেন। ‘হাফ প্যান্ট পরে দৌড়ানো অনেক জায়গায় পছন্দ করে না। অনেক জায়গা থেকে মেয়েদের আসতে দেওয়া হয় না। এটাও একটা কারণ হতে পারে।’ সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় সামাজিক প্রভাব বেড়েছে বলে যে পর্যবেক্ষণ, তার প্রতিফলন মাঠেও পড়ছে।

এই চাপটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করে গ্রামের মেয়েরা। ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী স্মৃতি আক্তার আজ ট্র্যাকে নেমেছেন পরিবারের সমর্থন নিয়ে। কিন্তু তার পাড়ার বেশিরভাগ মেয়ে আসতে পারেনি। ‘গ্রামাঞ্চলে মেয়েরা খেললে মানুষ অনেক কথা বলে। পারিবারিক কারণে, ধর্মীয় কারণে অনেকে আসতে পারে না।’ একই জেলার ইয়াসমিন আক্তারও বললেন, যদি সরকার থেকে প্রচার করা হতো যে খেলাধুলায় ভালো সুযোগ-সুবিধা আছে, তাহলে বাবা-মায়েরা হয়তো মেয়েদের খেলতে ছেড়ে দিতেন।

সমস্যার গভীরে আরও একটি কারণ লুকিয়ে আছে, যেটা কাঠামোগত। মোখলেসুর রহমান বললেন, তার জেলায় শেষবার জেলা পর্যায়ে অ্যাথলেটিক্স হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। চল্লিশ বছর ধরে জেলায় কোনো প্রতিযোগিতা নেই। তৃণমূলে প্রতিভা তৈরি না হলে জাতীয় পর্যায়ে মুখ কোথা থেকে আসবে? শাহ আলমও বললেন, এবার অনেক জেলা দল পাঠাতেই পারেনি, কারণ কমিটি গঠন নিয়ে ব্যস্ততায় খেলোয়াড় প্রস্তুত করার সময়ই হয়নি। ৬৪ জেলা ও ৮ বিভাগ মিলিয়ে ৭২টির মধ্যে এসেছে মাত্র ২০টির মতো। আর সংখ্যার এই কমতি দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতে আসা প্রধান অতিথি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও।

এত কারণের ভেতরেও শারিফা খাতুনের মতো কেউ কেউ টিকে থাকেন, পদক জেতেন, মিশনে যান। স্মৃতি বা ইয়াসমিনের মতো কেউ কেউ স্বপ্ন নিয়ে ট্র্যাকে নামেন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। কিন্তু এই ব্যক্তিগত সাহস পুরো ছবিটা বদলে দেয় না। ট্র্যাকে যে আলো কমছে, সেটা সংখ্যায় স্পষ্ট, এবং সেই সংখ্যার পেছনে আছে পরিবারের ভয়, সমাজের চোখ, রাষ্ট্রের উদাসীনতা আর একটি ব্যবস্থার ধীর ক্ষয়। শারিফারা মিশনে গেলে তার জায়গায় কে আসবেন, সেই প্রশ্নটার জবাব এখনো তৈরি নেই।
 

বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব: ৪ মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি দ্বিগুণ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের আমদানিতে। দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে বছরের প্রথম চার মাসেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজার ১০৪ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। গত বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে ১০১ শতাংশ।

অন্যদিকে, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে খুবই সামান্য। মাত্র ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকায়।

মোট আমদানির বড় একটি অংশ, ৩৮ শতাংশই করেছে তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান—পেট্রোবাংলা, খাদ্য অধিদপ্তর ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের (ইউএসটিআর) সঙ্গে বাংলাদেশের ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সেই আলোচনার অংশ হিসেবেই আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে। স্বাক্ষরিত হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। চুক্তিটি নিয়ে শুরু থেকেই নানা আলোচনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে উদ্বেগ থাকাটা স্বাভাবিক।

তবে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন কিছুটা অনিশ্চিত। গত ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পারস্পরিক শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার পর চুক্তিটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এমনকি মালয়েশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা একই ধরনের একটি চুক্তি গত ১৬ মার্চ বাতিল ঘোষণা করেছে।

আদালতের রায়ের পর ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের অধীনে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন এবং পরের দিন তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেন।

কিন্তু গত ৭ মে নিউইয়র্কের একটি বিশেষায়িত ফেডারেল আদালত রায় দেয় যে, এই আইনটি কেবল তখনই প্রয়োগ করা যেতে পারে যদি যুক্তরাষ্ট্রের লেনদেনের ভারসাম্যে ‘বড় ও গুরুতর’ ঘাটতি থাকে—যা বর্তমানে নেই বলে আদালত উল্লেখ করেছে।

এআরটি চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৪ হাজার ৫০০টি মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নিতে রাজি হয়েছে। এছাড়া আরও ২ হাজার ২১০টি পণ্যের শুল্ক পর্যায়ক্রমে কমানো হবে।

বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ফাইবার, লোহা, ইস্পাত, ওষুধ, রাসায়নিক ও মার্কিন তুলা থেকে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যের ওপর আরোপিত প্রতিশোধমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। তবে গড়ে ১৬-১৭ শতাংশ মোস্ট-ফেভারড-নেশন (এমএফএন) শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে।

ইউএসটিআর বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরও এক শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এর আগে গত বছরের এপ্রিলে বাণিজ্য ঘাটতির অজুহাতে বাংলাদেশ থেকে আমদানির ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

চুক্তির আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু সরকার এর মধ্যেই আমদানি শুরু করে দিয়েছে। যেমন গত মাসেই বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বড় একটি চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

অধ্যাপক মইনুল বলেন, এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তাতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রাপ্তি সীমিত, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি লাভবান হতে যাচ্ছে।

শুল্ক কমানোর পাশাপাশি এই চুক্তিতে কৃষি পণ্য, জ্বালানি ও শিল্প কাঁচামালের ন্যূনতম বার্ষিক আমদানির প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তিনি আরও যোগ করেন, এর ফলে দেশীয় চাহিদা কম থাকলেও বা দাম বেশি হলেও বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য আমদানি করতে হতে পারে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কম অগ্রাধিকার পেয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ৮৩ শতাংশই ছিল ১০টি নির্দিষ্ট পণ্য, যার মূল্য ১৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। এগুলো হলো এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা, লোহা ও ইস্পাত স্ক্র্যাপ, সয়াবিন অয়েলকেক ও মিল, উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, ব্রিউয়িং ওয়েস্ট ও তরল প্রোপেন।

তালিকার শীর্ষে রয়েছে এলএনজি (৪ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা), যা আমদানি করেছে পেট্রোবাংলা। এর পরেই রয়েছে এলপিজি (৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা), যার প্রধান আমদানিকারক ছিল ওমেরা পেট্রোলিয়াম (৬৮৪ কোটি টাকা), সান গ্যাস (৫০৭ কোটি টাকা) এবং ইউনাইটেড আয়গাজ এলপিজি (৪৪২ কোটি টাকা)।

গত বছরের এই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো এলএনজি বা এলপিজি আমদানি করেনি।

এছাড়া এই চার মাসে ১ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার আমেরিকান গম আমদানি করা হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো গম কেনা হয়নি। এর মধ্যে খাদ্য অধিদপ্তরই ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার গম আমদানি করেছে।

তৈরি পোশাক খাতের জন্য অপরিহার্য মার্কিন তুলার আমদানি গত বছরের তুলনায় ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ১৩৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তবে কিছু প্রধান পণ্যের আমদানি কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন তেলের আমদানি ৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা থেকে কমে ৩ হাজার ২৪০ কোটি টাকায় এবং লোহা ও ইস্পাত স্ক্র্যাপের আমদানি ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা থেকে কমে ৭০৪ কোটি টাকায় নেমেছে।

আমদানিকারকদের মধ্যে সোনারগাঁও সিডস ক্রাশিং মিলস ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকার সয়াবিন ও সয়াবিন বীজ আমদানি করেছে। ডেল্টা অ্যাগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের আমদানির পরিমাণ ছিল ৮৬৭ কোটি টাকা এবং যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চারের ৮১১ কোটি টাকা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ শুল্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দেশগুলোকে এমন বাণিজ্য চুক্তিতে বাধ্য করেছে যাতে তাদের নিজেদের রপ্তানি বাড়ানো যায়।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় রপ্তানিকারক, তাই তাদের শর্ত মানতে হচ্ছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই আমদানি বেড়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন যে, আমদানি করা পণ্যগুলোর অধিকাংশই ছিল জ্বালানি, গম, সয়াবিন ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। 

তিনি আরও জানান, আগে এসব পণ্য অন্য দেশ থেকে আনা হতো, এখন সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হচ্ছে। ফলে চুক্তিটির প্রভাব আমদানিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

 

সীমান্ত নিরাপত্তার চেয়েও ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন বেশি জরুরি: তথ্যমন্ত্রী

বর্তমান বিশ্বে সীমান্ত নিরাপত্তার চেয়েও ডিজিটাল নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে বিশ্ব দ্রুত মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছে। তাই দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)-এ ন্যাশনালিস্ট আইসিটি ফোরাম (এনআইসিটিএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ভুয়া সংবাদ প্রতিরোধ: নীতিমালা, প্রযুক্তি ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক রাউন্ড টেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া সংবাদ ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এখন শুধু সমস্যা চিহ্নিত করার সময় নয়, কার্যকর সমাধান বাস্তবায়নের সময় এসেছে। তিনি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন, তবে সরকারের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রস্তাবও দিন। জাতীয় সমস্যার সমাধানে কার্যকর পরামর্শ পেলে আমরা তা বাস্তবায়নে দ্রুত কাজ করব।”

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনআইসিটিএফ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ইমতিয়াজ মীর্জা।

স্মার্ট ল্যাবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রিয়াদ হাসনাইনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত রাউন্ড টেবিল বৈঠকে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রধান প্রতিবেদক আব্বাস উদ্দিন নয়ন বলেন, বর্তমানে দেশের হাতে গোনা কয়েকটি গণমাধ্যমে ফ্যাক্টচেকিং টিম থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ব্যবস্থা নেই। ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে প্রতিটি গণমাধ্যমে বাধ্যতামূলকভাবে একটি স্বতন্ত্র ফ্যাক্টচেকিং ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন, যা সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিশ্চিত করবে।

একাত্তর টিভির ‘ফেইক নিউজ স্ক্যানার’ অনুষ্ঠানের সম্পাদক ও উপস্থাপক রাকিব হাসান বলেন, দেশে গুজব, মিসইনফরমেশন ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য এখন কেবল সামাজিক সমস্যা নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্দিষ্ট ন্যারিটিভ তৈরি করে গুজব ছড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলোয়ার বাড়ানো হচ্ছে এবং পরে সেই প্ল্যাটফর্ম আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে।

এনআইসিটিএফ-এর সভাপতি রাফেল কবিরের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ রাউন্ড টেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন, অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসেল বিজনেস স্কুলের ‘বিজনেস অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড এআই’ বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ জে মিয়া, এনআইসিটিএফ উপদেষ্টা ড. মারুফ মল্লিকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

অধ্যাদেশ বাতিলে সরকারের ব্যাখ্যা আইনগতভাবে সঠিক নয়: জামায়াত

গুম ও মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যায় আইনগত অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ শিশির মনির।

তার ভাষ্য, এ বিষয়ে সরকারের দেওয়া ব্যাখ্যা ‘আইনগতভাবে সঠিক নয়’।

আজ সোমবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চিফ হুইপের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

এতে আরও বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য ও আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন।

শিশির মনির বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গুম ‘ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’-এর অংশ হলেও তা বিচারযোগ্য হতে ‘ওয়াইডস্প্রেড’ ও ‘সিস্টেমেটিক’ হতে হয়। একক কোনো গুমের ঘটনা এই আইনের আওতায় পড়ে না—ফলে গুম অধ্যাদেশ ও ট্রাইব্যুনাল আইনের সংজ্ঞা এক নয়। মানবাধিকার কমিশন আইনে তদন্ত, সময়সীমা ও ক্ষতিপূরণ–সংক্রান্ত কোনো বিধান নেই—সরকারের এমন বক্তব্যও খণ্ডন করেন তিনি। বলেন, সংশ্লিষ্ট ধারায় ৩০ দিনের সময়সীমা, তদন্ত প্রক্রিয়া ও ক্ষতিপূরণের বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

গণভোট অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, সরকার নিজেই একে ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালিড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের দায়ও সরকারের। বৈধতা স্বীকার করে তা বাস্তবায়ন না করা হলে দায় সরকারকেই নিতে হবে।

বিচারকদের শোকজ নোটিশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যে আইনের আওতায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সেটি ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে—তাই এ ধরনের নোটিশ ‘আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’।

এছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে নতুন ধারা যুক্ত করে আগের মালিকদের কাছে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আরও বলেন, এতে আর্থিক খাতে অনিয়মের দায় নির্ধারণ ও অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে।

ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সংবিধানের ৯৩(ডি) অনুচ্ছেদের সময়সীমা শেষে ১১৭টি পাস, সাতটি রহিত ও ১৬টি ল্যাপস হয়।

তার মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ল্যাপস বা বাতিল হওয়ায় জনআকাঙ্ক্ষা ক্ষুণ্ন হয়েছে।

তিনি জানান, ‘জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট’ অনুযায়ী মতবিরোধহীন বিষয় পাস ও বিতর্কিত বিষয় আলোচনার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। সংসদে কথা বলার সুযোগ না পেয়ে তারা দুই দফা ওয়াকআউট করেন। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলসহ কিছু সদস্যের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অন্তর্ভুক্ত না করাকেও তিনি গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন।

স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগকে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে মোমেন বলেন, এ কারণেই প্রথম ওয়াকআউট করা হয়; পরে প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতির প্রতিবাদে আবারও ওয়াকআউট করা হয়।

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে শেষ মুহূর্তে ১৮(ক) ধারা সংযোজন করে আগের মালিকদের কাছে নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তাদের একটা ইতিহাস আছে—গত ১৬ বছর ধরে তারা বলে আসছে, ঈদের পর আন্দোলন হবে। কিন্তু সেই ঈদ আর আসে না। এখন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও বিচার বিভাগের সচিবালয়-সংক্রান্ত বিল সংশোধনের কথা বলছে। কিন্তু কবে তা আনা হবে—আবারও কি দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে, সেটাই এখন প্রশ্ন।’

তিনি আরও বলেন, জনগণ যদি অধিকার আদায়ে সংসদের ওপর আস্থা হারিয়ে রাজপথে নামে, তার দায় সরকার ও সরকারদলীয় সদস্যদেরই নিতে হবে।

‘চিত্রা’ চরিত্রটি আমার কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে: সাবিলা নূর

ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য দর্শকের প্রশংসায় ভাসছেন অভিনেত্রী সাবিলা নূর।

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত তানিম নূর পরিচালিত এই সিনেমায় ‘চিত্রা’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

এ বিষয়ে সাবিলা নূর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অনেক প্রশংসা পাচ্ছি। এই অভিজ্ঞতা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। চরিত্রটির গভীরতা ও ভিন্নধর্মী উপস্থাপন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছে। দর্শকরাও ভীষণ খুশী।  নির্মাতা তানিম নূর, সহশিল্পী মোশাররফ করিম ভাইয়া, শরিফুল রাজ থেকে শুরু থেকে টিমের সবার আন্তরিক সহযোগিতায় নিজের সেরাটা দিয়ে কাজ করতে পেরেছি।’

‘চিত্রা চরিত্রটি আমার কাছে সবসময় বিশেষ হয়ে থাকবে। দর্শক যেভাবে আমাকে গ্রহণ করেছেন, তা সত্যিই অভিভূত করার মতো। এই ভালোবাসা আমাকে ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। আগামীর কাজ নিয়ে আরও সচেতন হয়েছি। ঈদের সিনেমা হিসেবে বনলতা এক্সপ্রেস ইতোমধ্যে দর্শকদের মাঝে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। সর্বাধিক শো নিয়ে হাউজফুল হচ্ছে। সেই সঙ্গে ৩ এপ্রিল থেকে কানাডা, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে রিলিজ হচ্ছে।’

সাবিলা নূর তার কাছের মানুষদের নিয়ে সিনেমাটির একটি বিশেষ শো উপভোগ করেন। সেসময় তার অনুসারী সাবিলিয়ান থেকে মা, শাশুড়ি ও স্বামী সঙ্গে ছিলেন।

এই সিনেমা নিয়ে তার স্বামীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সাবিলা নূর বলেন, ‘নেহাল আমার স্বামী এবং বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার কাজ দেখে সে ক্রিটিসাইজ করতে পছন্দ করে। সেটা আমিও এনজয় করি। আমার মনে হচ্ছে বনলতা এক্সপ্রেস দেখে সে এবার অন্তত পুরো সিনেমাটি এনজয় করেছে। সেই সঙ্গে আমার একেবারে কাছের মানুষেরাও পছন্দ করেছেন।’

কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রধান বিচারক হলেন দ. কোরিয়ার পার্ক চ্যান-উক

ফ্রান্সের বিখ্যাত কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিচারকদের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন দক্ষিণ কোরীয় ফিল্ম নির্মাতা পার্ক চ্যান-উক। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম নাগরিক হিসেবে তিনি এই বিরল সম্মান লাভ করেছেন। 

আগামী মে মাসে কান উৎসবের ৭৯তম আসরের সভাপতিত্ব করবেন পার্ক চ্যান-উক। 

আজ বৃহস্পতিবার চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকদের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

পরিচালক পার্ক চ্যান-উক এর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে আছে ওল্ডবয় (২০০৩) সিনেমাটি। 

সভাপতি হিসেবে তিনি এ বছরের সেরা চলচ্চিত্রকে পাম ডি’ওর বা গোল্ডেন পাম নামে পরিচিত সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ডটি তুলে দেবেন। 

গত বছর এই সম্মান জেতেন ইরানের চিত্রনির্মাতা জাফর পানাহি। ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ সিনেমার জন্য এই অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। 

 

এমন সময় পার্ক চ্যান-উক বিচারকদের সভাপতি নির্বাচন হলেন, যখন দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

২০১৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় চিত্রনির্মাতা বং জুন-হোর ‘প্যারাসাইট’ সিনেমাটি গোল্ডেন পাম ও অস্কার জিতে নেয়। 

এ ছাড়া, স্কুইড গেম ও কে পপ ডেমন হান্টার-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় টিভি সিরিজ, বিটিএস ও ব্ল্যাকপিংকের মতো জনপ্রিয় কে-পপ ব্যান্ড—এ যেন দক্ষিণ কোরীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন চলছে। 

এ ধারায় সর্বশেষ সহযোজন পার্ক চ্যান-উকের এই স্বীকৃতি। 

সভাপতির পদ পেয়ে পার্ক (৬২) এক বিবৃতিতে জানান, ‘ঘৃণা ও বিভাজনের এই সময়ে একটি সিনেমা হলে যেয়ে একই সময়ে, একত্রিত হয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সহজাত ঘটনাও একটি আবেগঘন, সার্বজনীন একাত্মবোধের অনুভূতি এনে দিতে পারে।’

চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকরা পার্কের সিনেমাগুলোকে, ‘বর্ণনামূলক, চৌকস ও মানবিক’ আখ্যা দেন। 

বং জুন হো সহ দক্ষিণ কোরিয়ার অসংখ্য চিত্রনির্মাতা পার্ক চ্যান-উকের কাজে ‘অনুপ্রেরণা’ খুঁজে পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। 

২০০৪ সালে কান উৎসবের সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ডটি জিতে নেয় পার্কের ওল্ডবয়। 

তার সর্বশেষ কাজ ‘নো আদার চয়েজ (২০২৫)’। ওই সিনেমাটি ডনাল্ড ওয়েস্টলেকের ১৯৯৭ সালের উপন্যাস ‘দ্য এক্স’ এর কাহিনীর ভিত্তিতে নির্মিত। ওই সিনেমায় এক বেকার মানুষের ‘প্রতিদ্বন্দ্বীদের খুন করার’ সিদ্ধান্তের চমকপ্রদ কাহিনী ফুটে উঠেছে। 

এতে স্কুইড গেম খ্যাত অভিনেতা লি বিইউং-হান ও ‘ক্র্যাশ ল্যান্ডিং অন ইউ’ খ্যাত অভিনেত্রী সন ইয়ে-জিন মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। 

সিউলের সোগ্যাং বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন পার্ক।

ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে দখলবাজির চেষ্টা: ষড়যন্ত্র নস্যাৎ, ফিরছে শৃঙ্খলা

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি সংবাদমাধ্যম ‘ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন’ দখলের একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে গেছে। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা একদল সুবিধাবাদী ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কর্মীর অপতৎপরতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মূলত ‘মব কালচার’ তৈরি করে এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নাম ভাঙিয়ে টেলিভিশনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল এই চক্রটি।

ভোল বদলে দখলের চেষ্টা
তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের নিউজরুমের পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তোলে একটি বিশেষ গোষ্ঠী। এই চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির একজন এসোসিয়েট এডিটর এবং শিক্ষাবিটের একজন সিনিয়র রিপোর্টার। অভিযোগ উঠেছে, ওই এসোসিয়েট এডিটর নিজেকে বিএনপির এক প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতার ভাগ্নে পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাতে শুরু করেন। অথচ বিগত সরকারের সময়েও তিনি একই প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ভূমিকা পালন করেছেন শিক্ষাবিটের সেই সিনিয়র রিপোর্টার। যিনি বিগত সরকারের আমলে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে ছয়বার বিদেশ সফর করেছেন। এ ছাড়া ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই সংবাদকর্মী হঠাৎ করেই ‘ছাত্রদল’ কর্মী সেজে জুলাই বিপ্লবের চেতনার ধারক হওয়ার নাটক শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, নিউজরুমে বসে তিনি বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতেন, অথচ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে সবচেয়ে বড় বিএনপিপন্থী হিসেবে জাহির করতে শুরু করেন।

ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে ‘জিয়া পরিবার’ ও ভুয়া পরিচয়
দখল প্রক্রিয়ায় এই চক্রের সাথে যুক্ত হন আরও এক সিনিয়র নিউজ এডিটর। তিনি নিজেকে ‘জিয়া পরিবারের সদস্য’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। সাধারণ কর্মীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের আগে যার রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে কেউ জানত না, তিনি রাতারাতি অতি-বিএনপিপন্থী সেজে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগে বাধ্য করতে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেন।

মিথ্যা অভিযোগ ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার অপব্যবহার
সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি প্রভাবশালী মহলের নাম ভাঙিয়ে এই চক্রটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ দাখিল করে। উদ্দেশ্য ছিল তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করানো এবং মানসিক চাপে ফেলে পদত্যাগে বাধ্য করা। যাতে করে শূন্য পদগুলোতে এই দখলদার চক্র নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে পারে।

কৃতঘ্নতার নজির
প্রতিষ্ঠানের ত্যাগী কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যখন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বর্তমান এসোসিয়েট এডিটর এবং চিফ নিউজ এডিটরকে (সিএনই) চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে চাপ সৃষ্টি করেছিল, তখন ইনডিপেনডেন্ট কর্তৃপক্ষ সাহসিকতার সঙ্গে সেই চাপ উপেক্ষা করে তাদের আগলে রেখেছিল। আজ সেই কর্মকর্তারাই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সংকটে ফেলে ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়েছেন, যা চরম কৃতঘ্নতার বহিঃপ্রকাশ।

রক্ষা পেল ৫০০ কর্মীর রুটি-রুজি
টেলিভিশনটির অভ্যন্তরীণ এই বিশৃঙ্খলা ও দখলের ষড়যন্ত্রের মুখেও পিছু হঠেনি কর্তৃপক্ষ। প্রায় ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মসংস্থান ও প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও সাধারণ কর্মীদের প্রতিরোধের মুখে ষড়যন্ত্রকারীরা বর্তমানে কোণঠাঁসা হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার মধ্য দিয়ে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন আরও একটি বড় সংকট কাটিয়ে উঠল। তবে গণমাধ্যমের ভেতর এমন অপেশাদার রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও সুবিধাবাদীদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে টেলিভিশনটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটিকে আরও গতিশীল করতে কাজ করে যাচ্ছে।

চিকিৎসকদের সেবা সরেজমিন তদারকি করার ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

চিকিৎসকরা ঠিক মতো সেবা দিচ্ছেন কি না, সেটার সরেজমিন তদারকি করার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালগুলোতে আমরা সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, যে বার্তা দিয়েছেন, সে অনুযায়ী কাজ করব।

তিনি বলেন, দায়িত্বরত চিকিৎসকরা ঠিকমতো সেবা দিচ্ছেন কি না, তা দেখতে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে যাব, দেখব। সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে। আমাদের কার্যক্রম দ্বারা যেন জনসাধারণ উপকৃত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা কোনো সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেবো না।

স্বাস্থ্যসচিব মো. সাইদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত।

তিনি বলেন, আমাদের বিভিন্ন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানে প্রচুর শূন্য পদ আছে, ফলে মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা বঞ্চিত হচ্ছে। শূন্য পদ পূরণে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এছাড়া আমাদের মেডিকেল শিক্ষার মান উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য সচিব।

সভায় মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও অধীনস্থ দপ্তর বা সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এআই, কেন উন্নয়ন থামাতে বলছে অ্যানথ্রোপিক?

মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই সিস্টেমের উন্নয়ন সাময়িকভাবে ধীর করা বা বিরতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সর্বাধুনিক এআই মডেলগুলো এমন কিছু লক্ষণ দেখাতে শুরু করেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে এগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এএফপি জানিয়েছে, সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিক ইতোমধ্যে ক্লড নামের এআই মডেল তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন বিশ্বব্যাপী ধীরগতির করা হলে তা মানবসমাজের জন্য উপকারী হতে পারে।

তবে কেবল একটি কোম্পানি উন্নয়ন থামালে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে যাবে বলেও সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমরা মনে করি, সমাজের কাঠামো ও এআইকে মানবস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার গবেষণা যেন প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, সেজন্য অত্যাধুনিক এআই উন্নয়ন ধীর বা সাময়িকভাবে স্থগিত করার সুযোগ থাকা বিশ্বের জন্য ভালো হবে।’

অ্যানথ্রোপিকের মতে, কার্যকর বিরতি বাস্তবায়ন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ একাধিক দেশের বড় এআই কোম্পানিগুলোকে একই সময়ে উন্নয়ন বন্ধে সম্মত হতে হবে। পাশাপাশি এমন নিয়ম থাকতে হবে, যার বাস্তবায়ন যাচাই করা সম্ভব।

প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বৈশ্বিক সমন্বয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে কোম্পানি ও সরকারগুলোকে প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তবে এ ধারণা প্রযুক্তি খাতের অনেকের কাছে জনপ্রিয় নাও হতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, যাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এআই প্রতিযোগিতার অগ্রভাগে রয়েছে। তার মহাকাশ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের বহুল প্রতীক্ষিত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি তাকে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বানাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অ্যানথ্রোপিকের এ অবস্থান নিয়ে ইতোমধ্যে শিল্পখাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তার সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তাদের মতে, সবচেয়ে খারাপ সম্ভাব্য পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেখাচ্ছে এবং নিরাপত্তার আড়ালে প্রতিদ্বন্দ্বীদের গতি কমাতে চাইছে।

তবুও হোয়াইট হাউস স্বীকার করেছে যে অ্যানথ্রোপিকের ‘মাইথোস’ মডেল অত্যন্ত শক্তিশালী। সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতার কারণে এটি সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি; বর্তমানে কেবল নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে এটি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

অ্যানথ্রোপিকের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। ওয়াশিংটন ও সিলিকন ভ্যালির অনেক নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি নির্বাহী মনে করেন, এআই উন্নয়ন ধীর করলে চীন এ প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় কৌশলগত সুবিধা পেয়ে যেতে পারে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বেইজিং সফরের সময় চীনের সঙ্গে এআই নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানান।

এ সপ্তাহে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশেও সই করেছেন, যার মাধ্যমে সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন এআই মডেলগুলো প্রকাশের আগে সরকারকে ৩০ দিনের প্রাথমিক পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

‘মানুষের ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে’

অ্যানথ্রোপিক এ পরিস্থিতির তুলনা করেছে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির সঙ্গে। তবে তাদের মতে, এআই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন, কারণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির তুলনায় এআই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গোপন রাখা অনেক সহজ।

প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘আপনার এমন একটি ব্যবস্থা দরকার, যেখানে প্রয়োজন হলে গতি কমানো বা থামানোর সুযোগ থাকবে। বর্তমানে এআই শিল্পের কাছে যেন শুধু অ্যাক্সিলারেটর আছে, কিন্তু ব্রেক নেই।’

অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, সরকার, বিজ্ঞানী, নাগরিক সংগঠন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী এআই কোম্পানিগুলোকে নিয়ে আগামী কয়েক মাসে আলোচনা শুরু করবে তারা, যাতে এমন কোনো বৈশ্বিক ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর করা যায় তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।

প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, তাদের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী এআই এখন এআই উন্নয়নকেই উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুততর করছে। এর ফলে এমন একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৈরি হতে পারে, যা গবেষকদের ভাষায় ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’-এর দিকে নিয়ে যাবে।

এর অর্থ হলো, এমন একটি এআই ব্যবস্থা, যা মানুষের খুব কম সহায়তায় নিজেই নিজেকে আরও বুদ্ধিমান করে তুলতে সক্ষম হবে।

অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমরা এখনও সেখানে পৌঁছাইনি এবং রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট অবশ্যম্ভাবীও নয়।’ 
তবে প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করেছে, সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত হওয়ার আগেই এ ধরনের সক্ষমতা বাস্তবে দেখা দিতে পারে।

প্রতিবেদনের ভাষায়, ‘এআই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে মানুষের ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।’