32 C
Dhaka
Home Blog

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীন সফরের আমন্ত্রণ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।

সাক্ষাৎকালে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং- এর পক্ষ থেকে উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন।

গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, তবে সফরসূচি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়নি। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর অনেক অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারমূলক কাজ চলছে। যখন তিনি বিদেশ সফর শুরু করবেন তখন চীন সফরের বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে গঠিত নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানাতেই মূলত চীনের রাষ্ট্রদূত এই সাক্ষাৎ করতে আসেন।

‘বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই এই সুদৃঢ় সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল। ধারাবাহিকভাবে চীন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী উন্নয়ন সহযোগী। বিগত বছরগুলোতে চীনের সাথে বাংলাদেশের যে উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে, বর্তমান সরকার সেটিকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে চায়।

‘চীন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি মূলত একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল। এতে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না হলেও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কীভাবে একটি নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া যায়, উভয় দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে কীভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও জোরদার করা যায়, এসব বিষয়ে সৌজন্যমূলক অঙ্গীকার করা হয়েছে।

‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি কি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে, নাকি শক্তিশালী?

প্রতি বছরের ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এটি শুধু একটি প্রতীকী আয়োজন নয়; এটি বিশ্বের প্রায় সাড়ে ৪৭ কোটি আদিবাসী মানুষের অস্তিত্ব, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু বাংলাদেশে দিবসটি এলেই একটি পুরোনো বিতর্ক আবারও ফিরে আসে—এই দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বলা যাবে কি না।

রাষ্ট্রের সরকারি ভাষ্যে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘জাতিগত সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘উপজাতি’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম, মধুপুর, সিলেট, উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী বহু জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় দেন ‘আদিবাসী’ হিসেবে। ফলে প্রশ্নটি কেবল ভাষার নয়; এটি পরিচয়, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও মানবাধিকারের প্রশ্ন।

বাংলাদেশে এই বিতর্কের আরেকটি মাত্রা রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিলে বা আদিবাসীরা স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুললে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাদের এই স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার কাঠামো কি সত্যিই এমনটি বলে?

উত্তর হলো, না।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দলিল হলো ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস ডিক্লেয়ারেশন অন দ্যা রাইটস অব ইন্ডিজিনিয়াস পিপলস (ইউএনডিআরআইপি)’, যা ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। বাংলাদেশও এই ঘোষণাপত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।

ইউএনডিআরআইপি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি না হলেও এটি বর্তমানে আদিবাসীদের অধিকার সংক্রান্ত সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বৈশ্বিক মানদণ্ড।

ঘোষণাপত্রটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি আদিবাসীদের পরিচয় নির্ধারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে দেয় না। বরং, জনগোষ্ঠীর নিজের পরিচয় দেওয়ার অধিকারকে মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশও এই নীতিকেই অনুসরণ করে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক পরিভাষা যাই হোক না কেন, কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক এবং আত্মপরিচয় আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়।

পরিচয়ের প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অনেকেই মনে করেন, ‘আদিবাসী’ শব্দটি শুধু একটি নাম। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এটি কেবল একটি পরিভাষা নয়, বিশেষ কিছু অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। ইউএনডিআরআইপি আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ভূমি, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও নিজস্ব প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।

আবার জাতিসংঘের এই দুটি মৌলিক মানবাধিকার চুক্তি ‘ইন্টারন্যাশনাল কোভেনান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্টান অন ইকোনোমিক, স্যোসিয়াল অ্যান্ড কালচারাল রাইটস (আইসিইএসসিআর)’-এর প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে।’

এই একটি বাক্যকে ঘিরেই বহু বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশেও অনেক সময় বলা হয়, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মানে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে না।

স্বায়ত্তশাসন কি বিচ্ছিন্নতা?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-ডিটারমিনেশনের দুটি মাত্রা রয়েছে। প্রথমটি ‘ইন্টারনাল সেলফ-ডিটারমিনেশন’। অর্থাৎ, বিদ্যমান রাষ্ট্রের ভেতরেই একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারবে। দ্বিতীয়টি ‘এক্সটারনাল সেলফ-ডিটারমিনেশন’। এটি সাধারণত উপনিবেশ, বিদেশি দখল বা অত্যন্ত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

ইউএনডিআরআইপি মূলত প্রথম ধারণাটিকেই সমর্থন করে।

ঘোষণাপত্রের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আদিবাসীরা তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয় পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন বা স্ব-শাসনের অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একই ঘোষণাপত্রের ৪৬ নম্বর অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে, এই দলিলের কোনো কিছুই কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক ঐক্য ক্ষুণ্ন করার অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন নিজেই স্বায়ত্তশাসন ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টেনে দিয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী যদি তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা কিংবা স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় অধিকতর অংশগ্রহণের দাবি তোলে, সেটিকে কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদ বলা যায়?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর উত্তর হলো ‘না’। বরং এসব দাবি গণতান্ত্রিক আলোচনার অংশ, যা বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই বাস্তবায়িত হতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ২৩ (এ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা নেবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সাংবিধানিক স্বীকৃতি। তবে এখানেই বিতর্কের সূচনা। কারণ, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। এর পরিবর্তে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ও ‘নৃগোষ্ঠী’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

রাষ্ট্রের এই অবস্থানের পেছনে একটি যুক্তি রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বলা হয়েছে, ‘আদিবাসী’ শব্দটির আন্তর্জাতিক আইনি তাৎপর্য রয়েছে এবং এটি ব্যবহারে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসনের দাবির সঙ্গে এই পরিভাষাকে যুক্ত করে অনেক সময় বিচ্ছিন্নতাবাদের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু, আন্তর্জাতিক আইন এই আশঙ্কাকে কতটা সমর্থন করে?

বাস্তবতা হলো, ইউএনডিআরআইপি বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিল কোথাও বলেনি যে আদিবাসীদের স্বীকৃতি মানেই একটি জনগোষ্ঠী স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার পেয়ে যাবে। বরং ঘোষণাপত্রের ৪৬ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই ঘোষণাপত্র কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক ঐক্য ক্ষুণ্ন করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন নিজেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।

এই বিষয়টি বোঝার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

কানাডায় ফার্স্ট নেশনস, ইনুইট ও মেটিস জনগোষ্ঠী সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। নিউজিল্যান্ডে মাওরি জনগোষ্ঠীর অধিকার ও ভূমি প্রশ্নে বিশেষ আইনগত কাঠামো রয়েছে। নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডে সামি জনগণের প্রতিনিধিত্বের জন্য সামি পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বলিভিয়া ও ইকুয়েডরের সংবিধানে আদিবাসীদের বহুস্তরীয় স্বীকৃতি রয়েছে। এসব দেশের কোনোটিই আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়ার কারণে রাষ্ট্র হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়েনি। বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে আস্থা বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একই। কোনো জনগোষ্ঠী যদি তাদের ভাষায় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহ্যগত ভূমির সুরক্ষা বা স্থানীয় প্রশাসনে অধিকতর অংশগ্রহণের দাবি তোলে, সেটিকে কি বিচ্ছিন্নতাবাদের সমার্থক হিসেবে দেখা উচিত? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উত্তর হওয়া উচিত ‘না’।

অবশ্যই, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন যদি প্রকাশ্যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে বা রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়, সেটি ভিন্ন বিষয় এবং তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিবেচিত হবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক অধিকার, ভাষার অধিকার বা স্থানীয় পর্যায়ে অধিকতর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে বৈধ আলোচনার বিষয়।

এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯। বাংলাদেশ এখনো এই কনভেনশন অনুসমর্থন করেনি। তবে এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আদিবাসী ও উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। এতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও নীতিনির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হতে পারে।

এখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৯৭ সালের এই চুক্তি পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আঞ্চলিক পরিষদ ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির মতো বিষয়গুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজেই একসময় স্বীকার করেছিল যে, দেশের সব অঞ্চলে একই ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সবসময় সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে নয়, বরং তা টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি উপায় হতে পারে।

আজকের বিশ্বে আদিবাসীদের প্রশ্নটি আর কেবল পরিচয়ের প্রশ্ন নয়। এটি উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জীববৈচিত্র্য সেইসব অঞ্চলে সংরক্ষিত রয়েছে, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে আসছে। ফলে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবাধিকারের বিষয় নয়, এটি টেকসই উন্নয়নেরও প্রশ্ন।

বাংলাদেশের উচিত এই বিতর্ককে ‘রাষ্ট্র বনাম আদিবাসী’ দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন’ এর আলোকে বিবেচনা করা। কোনো জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই রাষ্ট্রকে দুর্বল করা নয়। বরং রাষ্ট্রের শক্তি নিহিত থাকে তার বৈচিত্র্যকে ধারণ করার সক্ষমতায়। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে মর্যাদা দেয়, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক হয়।

তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হবে কি না, সেটিতে সীমাবদ্ধ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চায়, যেখানে প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারবে এবং উন্নয়নের সুফল সমানভাবে ভোগ করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমরা বৈচিত্র্যকে ভয় পাই, নাকি সেটিকেই বাংলাদেশের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করি।

 

মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং করপোরেট কমিউনিকেশনসে কর্মরত।
[email protected]

বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় ফিফাকে ধুয়ে দিল উয়েফা

যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। সংস্থাটির দাবি, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে’ ফিফা এবং এটি ফুটবলের ন্যায়বিচার ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বিপজ্জনক নজির।

সোমবার এক বিবৃতিতে উয়েফা কড়া ভাষায় জানায়, ‘এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা এক বছরের পরীক্ষামূলক সময়ের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত মাত্রা অতিক্রম করেছে। ফুটবল, অন্য যেকোনো খেলার মতোই, নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই নিয়মই সুষ্ঠু, সৎ ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার ভিত্তি। অনেক সময় নিয়মের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এই ঘটনায় তেমন কোনো সুযোগ ছিল না।’

উয়েফা আরও সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বকাপের মতো আসরে এমন সিদ্ধান্ত পুরো ফুটবলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

‘ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, কারণ এটি সুন্দর একটি খেলা এবং সবাই বিশ্বাস করে যে পৃথিবীর সব জায়গায় একই নিয়মে এটি পরিচালিত হয়। বিশ্বকাপ কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো টুর্নামেন্ট নয়। এখানে নেওয়া সিদ্ধান্ত পুরো ফুটবলের ওপর প্রভাব ফেলে। এমন নজিরবিহীন, দুর্বোধ্য ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে আমরা বিস্মিত।’

বালোগানের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের শুরু শেষ বত্রিশের ম্যাচে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার এক ডিফেন্ডারের পায়ের ওপর পা দেওয়ায় ভিডিও রিভিউ শেষে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয় তাকে। ম্যাচটি ২-০ গোলে জিতেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ড দেখলে পরের ম্যাচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকতে হয়। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে বালোগুনের খেলা সম্ভব নয় বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল।

তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে শাস্তিটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও প্রকাশ্যে লাল কার্ড প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

এরপর ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে তিনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলার অনুমতি পান। তবে এই সিদ্ধান্তের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এদিকে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘সঠিক কাজ করার জন্য এবং একটি বড় অন্যায় সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ।

ফিফার এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বেলজিয়াম কোচ রুদি গার্সিয়াও। ব্যঙ্গ করে তিনি বলেন, ‘আমি জানতামই না, ফিফা বিশ্বকাপে এখন ৫ জুলাই মানেই ১ এপ্রিল! অর্থাৎ আজ বুঝি “এপ্রিল ফুল” দিবস!’

৩০ শতাংশের কম অগ্রগতি হওয়া প্রকল্প বাতিলের নির্দেশ

উন্নয়ন ব্যয়ে অপচয় কমাতে ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় জবাবদিহি বাড়াতে ধীরগতির প্রকল্পগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ৩০ শতাংশের কম অগ্রগতি হওয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে যেগুলো আর কার্যকর নয়, সেগুলো বাতিল করতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিয়ম তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ড্যাশবোর্ডভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা, যোগ্য প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের আলোকে গত ১৪ জুন সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এসব নির্দেশনা জারি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

অর্থনীতিবিদরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ধীরগতির ও অপচয়মূলক প্রকল্প ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, মন্ত্রণালয়গুলো নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করলে ও ভবিষ্যতে প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাস্তবায়নের পূর্ণ প্রস্তুতি নিশ্চিত না করলে এই সংস্কারের সুফল মিলবে না।

গত তিন অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে খারাপ হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার নেমে আসে ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে এডিপি বাস্তবায়নের গড় হার ৭৯ শতাংশ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলো এখনও প্রয়োজনীয় ও কার্যকর কি না, তা মূল্যায়ন করতে পারবে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে তারা প্রকল্প পুনর্গঠন, পরিধি সংশোধন কিংবা পুরোপুরি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ‘গ্রিন বুক’-এ অন্তর্ভুক্ত নতুন প্রকল্পগুলোর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দ্রুত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি সরকারের নতুন এডিপি আগামী মাস থেকে, অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে কার্যকর হবে।

সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন করেছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।

এই কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট বরাদ্দসহ প্রায় ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্লক বরাদ্দের আওতায় নতুন আরও প্রায় ১ হাজার ২০০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়া প্রকল্পগুলোর বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিয়মের কারণ চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে এসবের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য ড্যাশবোর্ডভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালকদের নিয়োগ দিতে হবে শুধু পেশাগত যোগ্যতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে না পারা প্রকল্পগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত অবশ্যই কঠোর মূল্যায়নের ভিত্তিতে নিতে হবে।

তিনি বলেন, আমি আশা করছি, সিদ্ধান্তগুলো কস্ট-বেনিফিট অ্যানালিইসিসের (ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ) ভিত্তিতেই নেওয়া হবে।

তার ভাষায়, ধরুন, একটি প্রকল্পের মোট ব্যয় ১০০ টাকা। এর মধ্যে ৩০ টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে। এখন সরকারকে দেখতে হবে, প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল অবশিষ্ট ৭০ টাকার ব্যয়ের চেয়ে বেশি কি না। তারপরই পরবর্তী অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, সম্ভাব্য সুফল যদি অবশিষ্ট ব্যয়ের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে প্রকল্পটি এডিপিতে রাখা যৌক্তিক। অন্যথায় সেটি বাতিল করা উচিত। সেই বিবেচনায় এডিপি ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া দরকার ছিল।

তবে এই সংস্কার বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, আসল প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে কি না, আর হলেও তা সঠিকভাবে হবে কি না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। একটি প্রকল্প যত দিন টিকে থাকে, তত দিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠী নানা ধরনের সুবিধা ভোগ করে।

তিনি আরও বলেন, এডিপিতে দ্রুত নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তার মতে, এডিপি বাস্তবায়নের দুর্বল হার ও দীর্ঘদিনের অপচয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, একনেকের অনুমোদনের সময় অনেক প্রকল্পই বাস্তবায়নের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে না।

জাহিদ হোসেন বলেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রায়ই তাড়াহুড়ো করে করা হয়। বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে নকশার ত্রুটি ধরা পড়ে, কাজ ও ক্রয় পরিকল্পনায়ও নানা দুর্বলতা দেখা যায়। ফলে অনুমোদনের পরও প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু করতে তিন থেকে চার বছর লেগে যায়।

তার মতে, বাস্তবায়নের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই নতুন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেওয়া উচিত।

গতকাল শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, এডিপি বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক এবং সরকার এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে।

তিনি বলেন, মানুষকে প্রভাবিত করা বা উন্নয়নের বাহ্যিক চিত্র তুলে ধরার জন্য সরকার কোনো মেগা প্রকল্প নিতে চায় না।

‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে অনুমোদিত সব মেগা প্রকল্প একসঙ্গে বন্ধ করে দিলে বড় ধরনের অপচয় ও নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সেসব প্রকল্প এখন মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।

আইসিএপিপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হলেন ইসমাইল জবিউল্লাহ

বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজের (আইসিএপিপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।

আজ সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিএপিপি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম। সংগঠনটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা জোরদার করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আগামী ২৫ থেকে ২৮ জুন মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে অনুষ্ঠিতব্য আইসিএপিপির ৪৫তম স্থায়ী কমিটির সভায় মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল দলের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেবেন।

২০০৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল নোমান এবং ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন আইসিএপিপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

 

২ দশক পর মুক্তি পেল দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডার সিক্যুয়েল

একটা সিনেমার সিক্যুয়েলের জন্য দুই দশকের অপেক্ষা। ২০০৬ সালে ডেভিড ফ্রাঙ্কেল পরিচালিত ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’ সিনেমাটি বক্সঅফিস কাঁপিয়ে দিয়েছিল। মাত্র ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নির্মিত এই সিনেমা বিশ্বব্যাপী আয় করেছিল প্রায় ৩২৭ মিলিয়ন ডলার।

আজ ১ মে পর্দায় আসছে ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২’। আন্তর্জাতিক মুক্তির দিনে বাংলাদেশের স্টার সিনেপ্লেক্সেও মুক্তি পাচ্ছে এই সিনেমা।

‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’ নির্মিত হয়েছিল লরেন ওয়েইসবর্গারের উপন্যাস অবলম্বনে। আগের সিনেমার ধারাবাহিকতায় এটিও পরিচালনা করেছেন ডেভিড ফ্রাঙ্কেল।

সিনেমার প্রধান আকর্ষণ হলিউডের তিনজন জনপ্রিয় তারকা মেরিল স্ট্রিপ, অ্যান হ্যাথাওয়ে এবং এমিলি ব্লান্ট। আরও অভিনয় করেছেন—স্ট্যানলি টুসি, জাস্টিন থেরাক্স, কেনেথ ব্রানা, ট্রেসি থমাস প্রমুখ।

আগের পর্বে অভিনয়ের সময় তিনটি অস্কারবিজয়ী অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপের বয়স ছিল ৫৬ বছর। ওই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি। এবার পত্রিকার সম্পাদক চরিত্রে দেখা যাবে তাকে।

এআইয়ের সাহায্যে যেভাবে ইরানে হামলা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ফলে যুদ্ধ পরিকল্পনা ও হামলার গতি ‘চিন্তার গতির’ চেয়েও দ্রুত হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এই প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এতটাই কমিয়ে দিচ্ছে যে মানুষ কেবল যন্ত্রের প্রস্তাব অনুমোদন করার ভূমিকায় নেমে আসার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হামলার পরিকল্পনায় অ্যানথ্রোপিকের তৈরি এআই মডেল ক্লড ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তি ‘কিল চেইন’ বা লক্ষ্য নির্ধারণ থেকে আইনি অনুমোদন এবং হামলা শুরুর পুরো প্রক্রিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্ষিপ্ত করে দেয়।

ইসরায়েল এর আগে গাজায় লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবহার করেছিল। এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে তারা ইরানে প্রথম ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি হামলা চালায়। ওই হামলায় ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।

‘ডিসিশন কমপ্রেশন’: সিদ্ধান্তের সময় সংকুচিত

এই ক্ষেত্রের গবেষকদের মতে, জটিল সামরিক হামলার পরিকল্পনায় আগে যেখানে দিন বা সপ্তাহ লেগে যেত, এখন তা মিনিট বা সেকেন্ডে নেমে এসেছে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ‘ডিসিশন কমপ্রেশন’। এর ফলে মানব সামরিক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা কেবল এআই-নির্ধারিত হামলার পরিকল্পনায় সিল দেওয়ার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছেন।

২০২৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক অ্যানথ্রোপিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরসহ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোতে তাদের মডেল স্থাপন করে। একই সময়ে যুদ্ধপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালানটির টেকনোলজিস পেন্টাগনের সঙ্গে যৌথভাবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যা দ্রুত গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ভূগোলের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ক্রেইগ জোন্স বলেন, ‘এআই লক্ষ্য নির্ধারণে যে সুপারিশ করছে, তা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তার গতির চেয়েও দ্রুত। অতীতে যেসব অভিযানে দিন বা সপ্তাহ লাগত, এখন তা একসঙ্গে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হচ্ছে।’

হামলার আইনি মূল্যায়নেও এআই

সর্বাধুনিক এআই ব্যবস্থা ড্রোন ফুটেজ, টেলিযোগাযোগ নজরদারি ও মানব গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত সম্ভাব্য লক্ষ্য চিহ্নিত করতে পারে। প্যালানটির টেকনোলজিসের সিস্টেম মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে অগ্রাধিকার-ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ, অস্ত্র নির্বাচন, মজুত পরিস্থিতি এবং আগের অভিযানগুলোর কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে। এমনকি হামলার আইনি ভিত্তিও স্বয়ংক্রিয় যুক্তির মাধ্যমে মূল্যায়ন করে।

লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপক ডেভিড লেসলি বলেন, ‘এটি সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তির নতুন যুগ।’ তবে তিনি সতর্ক করে দেন, এআই ব্যবহারে ‘কগনিটিভ অফ-লোডিং’ হতে পারে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য চিন্তাভাবনার দায়িত্ব যন্ত্র নিয়ে নেওয়ায় এর পরিণতি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ

শনিবার দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। বিদ্যালয়টি একটি সামরিক ব্যারাকের কাছে ছিল বলে জানা গেছে।

জাতিসংঘ একে ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এ ঘটনার তদন্ত করছে।

ইরানের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ইরান ২০২৫ সালে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবহারের দাবি করলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের এআই কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে।

ইরানে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বলে আসছিল, তারা অ্যানথ্রোপিকের ব্যবহার বন্ধ করবে, কারণ প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা মার্কিন নাগরিকদের নজরদারিতে তাদের এআই ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। তবে পর্যায়ক্রমে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে অপেনএআই পেন্টাগনের সঙ্গে সামরিক প্রয়োজনে নিজেদের মডেল ব্যবহারের চুক্তি করেছে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্রেরণা জোশি বলেন, ‘এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও দক্ষতা বাড়ায়। লজিস্টিকস, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার বাড়ছে। এটি দ্রুতগতিতে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তদাতাদের সহায়তা করে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-চালিত যুদ্ধ প্রযুক্তির এই দ্রুত বিস্তার ভবিষ্যতের সামরিক কৌশল আমূল বদলে দিতে পারে। তবে মানবিক বিবেচনা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের অভিযানে সাংবাদিক ও ঢাবি শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে দুই মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। 

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা হলেন— বাংলানিউজ২৪.কম-এর তোফায়েল আহমেদ (২৫) এবং আজকের পত্রিকার কাউসার আহমেদ রিপন (২৭)। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল পুলিশ সদস্য তোফায়েলকে লাঠি দিয়ে নির্বিচারে পেটাচ্ছেন। পরে অন্য পুলিশ সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতালে সংবাদমাধ্যমকে তোফায়েল জানান, অভিযানের ভিডিও ধারণ করতে গেলে পুলিশ তাকে বাধা দেয়। এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে চার-পাঁচজন কনস্টেবল মিলে তাকে মারধর শুরু করেন।

সহকর্মী তোফায়েলকে বাঁচাতে গেলে হামলার শিকার হন সাংবাদিক রিপন আহমেদও। তিনি বলেন, পুলিশকে থামতে বলায় তারা আমাকে ভিডিও করতে বাধা দেয় এবং লাঠি দিয়ে আমার পায়ে আঘাত করে।

এ বিষয়ে রমনা ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম দাবি করেন, এটি একটি ‘ভুল বোঝাবুঝি’। তিনি বলেন, একজন মাদকাসক্তের ছুরিকাঘাতে এক পুলিশ সদস্যের ভ্রু কেটে যায়। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সাংবাদিকদের সাথে আইডি কার্ড না থাকায় পুলিশ সদস্যরা ভুলবশত তাদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন।

ডিসি এই ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে অভিযান চলাকালে ঢাবির তিন শিক্ষার্থীকেও আটক করা হয়। তাদের মধ্যে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের ঢাকা মহানগর ইউনিটের আহ্বায়ক নাঈম উদ্দিনকে পুলিশের মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। 

ভিডিওতে দেখা যায়, নাঈম ডিসি মাসুদ আলমের সাথে কথা বলার সময় হঠাৎ এক পুলিশ সদস্য তাকে পেছন থেকে টেনে-হিঁচড়ে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছেন।

নাঈম উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘বহু ভাষার সন্ধ্যা’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছিলেন এবং ফেরার পথে পুলিশের মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, তারা আমাদের কাছে অবৈধ কিছু না পেয়ে অভিযোগ তোলেন যে আমরা নাকি তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছি। আমার মাথা, হাত ও পায়ে চোট লেগেছে। আমার সঙ্গ থাকা আরও এক বন্ধুকেও তারা মেরেছে।

নাঈমকে মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম বলেন,সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে তল্লাশি করতে চাইলে তিনি বাধা দেন এবং তর্কে লিপ্ত হন। তখন একজন পুলিশ সদস্য তাকে পেছন থেকে টেনে নামান। তবে তিনি নিজে হস্তক্ষেপ করে পুলিশ সদস্যদের থামিয়েছেন বলেও জানান।

নাঈমের কাছে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি বলে স্বীকার করেন মাসুদ আলম। তবে মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আটক তিন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা, জীবনদর্শন ও মহাবয়ানের ডাক

একদিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর আর সামনে মেঘালয় পাহাড়, মাঝখানে এক প্রাচীন বানাই গ্রাম মোহনপুর। সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের এ গ্রামের ধারেকাছে কোনো হাসপাতাল নেই। গ্রামের প্রবীণ ধাত্রীরাই সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা।

বানাই ভাষায় ধাত্রীদের বলে ‘দাইমাও’। মোহনপুর গ্রামের বিখ্যাত দাইমাও শিবিলা বানাই (৮৫)। তার ধাত্রীবিদ্যার হাতেখড়ি দিদিমা চুইলতামণি বানাই ও সুকুমণি বানাইয়ের কাছে। নাকলা নিকনীর (গোত্র) শিবিলা এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশের বেশি নিরাপদ প্রসব করিয়েছেন। বানাই সমাজে দাইমাওয়েরা পবিত্র ও সম্মানিত। তারা একইসঙ্গে ভেষজচিকিৎসা এবং আধ্যাত্মিকতার অনুশীলন করেন। গর্ভের পরিবেশ থেকে পৃথিবীর পরিবেশে মানুষের সংযোগকে জটিল অভিজ্ঞতা ও প্রার্থনার ভেতর দিয়ে তারা সম্ভব করে তোলেন। কিন্তু বানাই সমাজেও দাইমাওদের কাজ কমছে, নতুন দাইমাও গড়ে উঠছে না।

এর কারণ বহুমুখী। নানাভাবে বলপ্রয়োগ, সাংস্কৃতিক হেজিমনি, ভূমি বেদখল আর কৃষিভিত্তিক উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন বানাই সমাজকে করুণভাবে ‘গরিব’ ও ‘অসহায়’ করে তুলেছে। গ্রামে কোনো কাজ নেই, জীবিকার খোঁজে মানুষ ছুটছে দিগ্বিদিক। এমনকি বন্দুকের নলের ডগায় জীবন বন্ধক রেখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যাচ্ছে কয়লা ও পাথরখনিতে। অভাব, ক্ষীণ স্বাস্থ্য আর জাতিগত প্রান্তিকতার কারণে জারি থাকা ভয় ও শঙ্কার পরিবেশ বানাই সমাজে সন্তান নেওয়ার হারও কমছে। পৃথিবীর এক প্রাচীনবিদ্যা আর বিশ্ববীক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সিবিলাকেও কঠিন রক্তআগুন সামাল দিয়েই বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। রাষ্ট্র বা সমাজ শিবিলাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয় না। নাগরিক তৎপরতা বা সংস্কারের তুমুল বিবাদ শিবিলাদের জ্ঞান, দর্শন কিংবা সংগ্রামকে ধারণ করে না।

কেবল শিবিলা নয়; দেশের আদিবাসী কিংবা বাঙালি, সব সমাজেই গ্রামীণ ধাত্রী ও লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা ক্রমশ ভঙ্গুর, অস্বীকৃত, ক্ষতবিক্ষত ও নিশ্চিহ্নের পথে। অথচ পৃথিবী কীভাবে তাদের অবদান অস্বীকার করবে? এ বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জীবন ও কল্যাণ সুরক্ষায় আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান ও স্বীকৃতি’। আদিবাসী ধাত্রীদের বঞ্চনা ও অবদান, লোকায়ত জ্ঞান ও দর্শন নিয়ে চলতি আলাপটি হাজির হচ্ছে।

লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সুরক্ষা, আদিবাসী ধাত্রীদের স্বীকৃতি ও মর্যাদা, দেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোয় তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং লোকায়ত জ্ঞানের পাশাপাশি গ্রামীণ ধাত্রীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, উপকরণ সরবরাহ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।

সর্বশেষ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ অনুযায়ী দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন এবং জাতিসত্তা ৫০টি। এর ভেতর ঐতিহ্যগত বা সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষিত ধাত্রীদের সংখ্যা কত আমাদের জানা নেই। গ্রামীণ ধাত্রী বা লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান ও দলিলের শূণ্যতাকে সামনে নিয়েই দেশে প্রথমবারের মতো এই আলাপের বিস্তার ঘটছে।

শতজনমের সাক্ষী ও সাক্ষ্য

শতজনমের সাক্ষী হয়ে জীবনচক্রের সাক্ষ্য সমুন্নত রাখলেও আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে গবেষণা কাজ অপ্রতুল। ‘মিডওয়াইভস, ওম্যান অ্যান্ড দেয়ার ফ্যামিলি: অ্যা মৌরি গেজ’ (কেনি: ২০১১), ‘অ্যাবোরিজিনাল মিডওয়াফ: অ্যা মডেল ফর চেঞ্জ’ (স্কে: ২০১০), ‘রিক্লেইমিং বার্থ, হেলথ অ্যান্ড কমিউনিটি’ (২০০৭), ‘অথরাইজিং ট্র্যাডিশন: ভেক্টরস অব কানেকশন ইন হাইল্যান্ড মায়া মিডওয়াইফারি’ (হিনোজোসা: ২০০৪), ‘রিচ্যুয়ালস অ্যান্ড নলেজ অব অ্যান্ডিন মিডওয়াভস ইন ম্যাটারনাল অ্যান্ড নিওন্যাটাল কেয়ার’ (২০২৬)—আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলো দেখানোর চেষ্টা করেছে, ধাত্রীরা জন্মকে প্রকৃতির এক পবিত্র প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। তারা ঐতিহ্যগত জ্ঞানের মাধ্যমে ভূমি, ভাষা, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরি করেন।

আদিবাসীদের মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে কাজ হলেও লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণা কাজের নজির কম। নাভিল ও হোসাইন (২০১৯) এক গবেষণায় সংক্ষেপে মধুপুরের মান্দি/গারোদের জন্মসংক্রান্ত আচারের কিছু বর্ণনা দিয়েছেন। আমিন ও খান (১৯৮৯) এবং মামুন ও অন্যান্যদের (২০২৫) গবেষণা গ্রামীণ ধাত্রীদের নিয়ে হলেও সেখানে লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার বিজ্ঞান ও দর্শনের বিবরণ ছিল না।

বাংলাদেশের বঞ্চিত আদিবাসী ধাত্রীরা

বাঙালি সমাজে গ্রামীণ ধাত্রীরা সাধারণভাবে ‘দাই’ বা ‘দাই মা’ হিসেবে পরিচিত। জাতিগতভাবে ধাত্রীদের পরিচয় ও ধাত্রীবিদ্যার ধরণ ভিন্ন ভিন্ন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বমদের ভেতর ধাত্রীরা ‘নাউ দমহ্’ নামে পরিচিত। ছোটমণি হিসেবে ছোট-ভাইবোনদের বোঝাতে ‘নাউ’ বলা হয়। দমহ্ মানে কোনো কিছু ধরা, ফা মানে সন্তান। ধাত্রীরাই প্রসবের সময় শিশুকে প্রথম ধরতে পারেন বলে এমন নাম। বান্দরবানের রুমার বেথেলপাড়ার বিখ্যাত নাউ দমহ্ রৌ সুম বমের ধাত্রীজীবনে এখনো কোনো অনিরাপদ প্রসবের ঘটনা ঘটেনি। তবে বিনা বিচারে আটক এবং কারাগারে প্রশ্নহীনভাবে মৃত্যু বম সমাজে সন্তান জন্মদান ও ধাত্রীবিদ্যার কাজকেও প্রভাবিত করেছে।

খুমিদের ভেতর ধাত্রীরা দুই নামে পরিচিত। ‘চা-ন-সিংনাই-নেউমপুই’ এবং ‘ডেউঙদি সাঙন্ডে’। বান্দরবানের রুমার প্রফুংম পাড়ার চিলিং খুমী ও থংবে খুমী বিখ্যাত খুমি ধাত্রী। লুসাই জনগোষ্ঠী ধাত্রীদের ডাকেন ‘নাউ দমতু’।

মারমা ভাষায় ধাত্রীকে বলে ‘ওয়াইব্যইং স্যেমা’। কিন্তু বান্দরবানের মারমারা তাদের আঞ্চলিক টোনে বলেন, ‘ওয়াইনেক ছা:রামা’। বান্দরবানের থানচির ডাকছৈ পাড়ার উনুমে মারমা ও বলিপাড়ার মা মুই চিং মারমা গুরুত্বপূর্ণ ধাত্রী।

মাতৃসূত্রীয় লেঙাম সমাজে ধাত্রীদের বলে ‘মাউ-মুন্নু’। যিনি মাকে চিহ্নিত করেন এবং প্রসবের মাধ্যমে মাধ্যমে কাউকে ‘মা’ করে তোলেন, তিনিই ‘মাউ-মুন্নু’। নেত্রকোণার কলমাকান্দার সন্যাসীপাড়ার চিনচিলি নংব্রেই ছিলেন এক অসাধারণ মাউ-মুন্নু।

মাতৃসূত্রীয় খাসিদের ভেতর ধাত্রীরা ‘কা নংপাইনখ্যা খুন’ নামে পরিচিত। মানে, যারা বাচ্চা প্রসব করান। কিন্তু আঞ্চলিক ওয়ার-সিনতেং ভাষায় ধাত্রীদের ‘সাতার’ ডাকা হয়। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ঝিমাই খাসি পুঞ্জির রানি মারলিয়া একজন খাসি ধাত্রী।

আরেক মাতৃসূত্রীয় মান্দি সমাজে ধাত্রীরা ‘খামাল’ বা সাংসারেক পুরোহিতের মর্যাদা পান। তাদের বলে ‘মিচিকসা খামাল’। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের ইদিলপুরের মিজি মৃ ছিলেন একজন বিখ্যাত মিচিকসা খামাল, যিনি মধুপুরে আনারস আবাদের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। ত্রিপুরারা ধাত্রীদের ডাকেন ‘গুমাচৌক বা গুমাচোক’। খাগড়াছড়ির গুইমারার ঠাকুরছড়ার রচনা রোয়াজা ও বাইল্যাছড়ির সুচিরোং ত্রিপুরা নামকরা গুমাচৌক।

উপকূলের রাখাইনদের ভেতর ধাত্রীদের বলে ‘ওয়াডেছ্রামা’। তারা সমাজে ‘এমিইগ্রীও’ বা বড়মা হিসেবে মর্যাদা পান। কারণ, ‘এ্যাসেই (নাড়ী)’ ছিন্ন করার অধিকার সমাজ কেবল তাদেরকেই দিয়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার তুলাতুলীপাড়ার শতবর্ষী সেমাচিং রাখাইন একজন অভিজ্ঞ ধাত্রী।

চাকমাদের ভেতর ধাত্রীদের বলে ‘অজা’। তঞ্চংগ্যারা বলেন ‘অসাপুরী’। রাঙ্গামাটির রাজস্থলীর গাইন্দা ইউনিয়নের তুলাছড়িপাড়ার দয়ামুগী তঞ্চংগ্যা ও ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের আততলীপাড়ার দিবি তঞ্চংগ্যা অসাপুরীর কাজ করেন।

সাঁওতালরা ধাত্রীকে বলেন ‘দৌরগিন বুডহি’। দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বারকোণা গ্রামের মালতী হেমব্রম ও ঠাকুরগাঁও সদরের মাতৃগাঁওয়ের দুলহান টুডু অভিজ্ঞ ধাত্রী। মুন্ডারা ধাত্রীকে বলেন ‘ধাইয়ানী বা দাইয়ানি’। মুসহর সমাজে ধাত্রীরা ‘ধাইনি’ নামে পরিচিত। ঠাকুরগাঁও সদরে ফকদনপুরের ধাইনি লিলমনি ঋষি একইসঙ্গে একজন খোদনী (উল্কি আঁকিয়ে)।

বেদিয়া মাহাতোদের ভেতর ধাত্রীকে বলে ‘কুশরাইন’। পাবনার চাটমোহরের হান্ডিয়াল ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের মালতী মাহাতো এবং জয়পুরহাটের পাঁচবিবির বালিঘাটা ইউনিয়নের কাশপুর গ্রামের সোনানুনি মাহাতো বলেন বিখ্যাত কুশরাইন।

লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার বিজ্ঞান ও দর্শন

বাংলাদেশের প্রবীণ আদিবাসী ধাত্রীরা জানান, কেবল সন্তান প্রসব ও নিরাপদ মাতৃত্বের কাজ নয়, বরং ভূমি ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরির এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করেন। একইসঙ্গে সমাজে মহাবয়ানের ডাক ও জীবনবীক্ষার প্রবাহ বংশপরম্পরায় জীবিত রাখেন। এ ক্ষেত্রে তাদের বহু রীতি ও কৃত্য পালন করতে হয়। সংরক্ষণ করতে হয় বহু উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ। মাতৃগর্ভ থেকে নাড়ি কাটার দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে সমাজ তাদের দিয়েছে। এটি পেশা নয়, বরং এক গভীর জীবনদর্শন ও জটিল অনুশীলন।

দেখা গেছে, অধিকাংশ আদিবাসী সমাজে নাড়ি কাটার জন্য বিশেষ বাঁশ প্রজাতির তৈরি ছুরি বা ব্লেড ব্যবহৃত হয়। এর ভেতর দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রথম সাংস্কৃতিক সংযোগ ঘটে। হয়তো মানবসমাজ বুনোপ্রকৃতির ভেতর বাঁশকেই প্রথম গৃহপালিত করেছিল বলে সাংস্কৃতিক সভ্যতা বিকাশের সেই আদি স্মৃতির চিহ্ন বাঁশের ছুরির ভেতর দিয়ে আবারো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া; মানুষ যাতে প্রকৃতির ঐতিহাসিক পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ না করে এবং দায় ও দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ থাকে।

মারমা জনগোষ্ঠী এই বাঁশের ছুরিকে ‘ওয়াহ: কালাইসং’ বলেন। লেঙামরা বলেন ‘সাংসালি’, ত্রিপুরাদের ককবরক ভাষায় বলে ‘য়ান্থাল’, চাকমারা বলে ‘দুলুক’, তঞ্চংগ্যারা বলে ‘বাই-শ দুলুক’, মান্দিরা বলেন ‘ওয়ানি গানদেলেং’, মুন্ডারা বলে ‘পাতিক্ষুর’, বেদিয়া মাহাতোরা বলেন ‘চাঁচড়’ এবং সাঁওতালি ভাষায় বলে ‘ছৌইলৌঃ বা ছুনছুনি’। সাঁওতালদের ক্ষেত্রে বাঁশের তৈরি তীরের ফলা (অৗপড়ি) দিয়ে নাড়িকাটার এক আদি নিয়ম ছিল, যা পূর্বজনদের স্মৃতির সঙ্গে নতুন জন্মের এক পরিচয়পর্ব। এসব বাঁশের ছুরির ধরণ, প্রস্তুতপ্রণালি ও ব্যবহারে জাতিগত ভিন্নতা আছে। সব বাঁশ দিয়ে এটি বানানো হয় না। মাকলা, ডলু, পারবো বাঁশ দিয়ে সাধারণত তৈরি হয়। গ্রামে সংরক্ষিত পবিত্র বন বা থান থেকে এই বাঁশ সংগ্রহ করা হয়।

নবজাতকের মুখে বিশুদ্ধ পবিত্র পানি, মধু বা কখনো সাংস্কৃতিক পানীয়ের ফোঁটা দেওয়া হয়। নাভি ও কাটাস্থানে কাঁচা হলুদ, নিম, ছাই ও বিভিন্ন ভেষজের প্রলেপ দেওয়া হয়। অধিকাংশ সমাজে সন্তান জন্মের জন্য এক অস্থায়ী ‘আঁতুড়ঘর’ বানানো হয়। মূলত ধাত্রীরা কয়েকদিনের জন্য এই ঘরেই প্রসূতির সঙ্গে কাটান। এ সময় বিশেষ খাদ্য, স্বাস্থ্যগত পরিচর্যা, নিয়ম ও আচার অনুষ্ঠান পালিত হয়। বাচ্চা জন্মের পর সামাজিকভাবে কৃত্য-অনুষ্ঠান আয়োজনের ভেতর দিয়ে ধাত্রীদের বিদায় দেওয়া হয়। ঋতুভিত্তিক নানা স্বাস্থ্যগত বিধি যেমন আছে, তেমনি লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যায় মহামারি সামাল দেওয়ার বিধিও আছে।

কার্যকর নীতি ও অঙ্গীকার

‘উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণ আইন (২০১৯)’ লোকায়ত জ্ঞানকে ‘চিরায়ত জ্ঞান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ‘বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইনে (২০১৭)’ স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রাণবৈচিত্র্য বিষয়ক জ্ঞানের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, স্বীকৃতি প্রদান ও জ্ঞান সংরক্ষণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ‘জাতীয় সংস্কৃতি নীতিতে (২০০৬)’ আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতি সুসংহত করা এবং ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে (২০১০)’ তাদের সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। লোকায়ত জ্ঞান ও সংস্কৃতি হিসেবে আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা এসব আইন ও নীতি দ্বারা সুরক্ষিত থাকার কথা।

জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে (২০১১) বলা হয়েছে, দরিদ্র, সামাজিকভাবে বঞ্চিত, অশিক্ষিত, প্রান্তিক, দূরবর্তীস্থানে বসবাসরত মানুষ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী, চা-শ্রমিক, কৃষিখাতে ও পশুপালনে নিয়োজিত মানুষ, কারখানা শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও কিছু কর্মসূচি তাদের জন্য বাস্তবায়ন হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কার্যকরভাবে প্রবেশ করতে পারছে না।

সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় মাঠপর্যায় পর্যন্ত ধাত্রীবিদ্যায় দক্ষ জনশক্তি প্রদান এবং প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা আছে স্বাস্থ্যনীতিতে। কিন্তু আদিবাসীসহ গ্রামীণ লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার সুরক্ষা এবং প্রথাগত ধাত্রীদের জীবন-বিকাশে কোনো সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার নেই। এ ক্ষেত্রে কার্যকর নীতিকাঠামোর পাশাপাশি ধাত্রীদের স্বীকৃতি ও লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা সুরক্ষা ও বিকাশে সমন্বিত তৎপরতা জরুরি।

 

পাভেল পার্থ: গবেষক ও লেখক
[email protected]

‘এটা পৃথিবীর শেষ নয়, নতুন শুরুর সময়’—ব্রাজিলকে ধৈর্য ধরার আহ্বান কাফুর

বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের হতাশাজনক বিদায়ের পর শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনা। কোচ, কৌশল, খেলোয়াড় সবকিছু নিয়েই চলছে নানা আলোচনা। তবে ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের অধিনায়ক কাফু মনে করেন, সমাধান শুধু কৌশল বদলানো বা নতুন কাউকে দোষারোপ করার মধ্যে নেই। ব্রাজিলকে আবার শীর্ষে ফিরতে হলে ধৈর্য, নতুন প্রজন্মের ওপর আস্থা এবং কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে সময় দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

শেষ ষোলোতে নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচে জোড়া গোল করেন আর্লিং হালান্ড। এই হারে ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষা অন্তত ২০৩০ সাল পর্যন্ত গড়াল। অর্থাৎ বিশ্বকাপ শিরোপার খরা দাঁড়াবে ২৮ বছরে, যা দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতম।

১৯৯৪ সালে ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটানো ব্রাজিল দলের সদস্য ছিলেন কাফু। তাই দীর্ঘ প্রতীক্ষার চাপ কতটা, তা খুব ভালো করেই জানেন তিনি। পরবর্তী প্রজন্মের ওপর চাপ আরও বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে কাফু বলেন, ‘অবশ্যই আরও বেশি। ১৯৯৪ সালে ২৪ বছর পর শিরোপা জেতার চাপ যদি এতটা হয়ে থাকে, তাহলে কল্পনা করুন, ২০৩০ সালে ২৮ বছর পর সেই চাপ কতটা হবে।’

সোমবার নিউইয়র্কের রকফেলার প্লাজায় ১৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি লেগো ব্লক দিয়ে তৈরি ৮ দশমিক ৪৭ মিটার দীর্ঘ বিশ্বকাপ ট্রফির একটি ভাস্কর্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কাফু।

সেখানে তিনি বলেন, একটি ব্যর্থতার কারণে ব্রাজিলের ফুটবলকে খাটো করে দেখার কোনো কারণ নেই। ‘ব্রাজিল তো ব্রাজিলই। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সম্ভাবনা ও মান কখনোই প্রশ্নের মুখে পড়ে না।’

তবে সেই কারণেই ধৈর্য ধরা আরও কঠিন হবে বলেও মনে করেন তিনি, ‘এটা পৃথিবীর শেষ নয়। বরং এটি একটি নতুন চক্র এবং নতুন প্রজন্মের শুরু। তাই আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, কার্লো আনচেলত্তিই সেই মানুষ, যিনি আবার ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারবেন।’