26 C
Dhaka
Home Blog

ডান্ডাবেড়ি পায়ে বাবাকে শেষবারের মতো দেখলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা

বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে ঝালকাঠির নলছিটিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক কারাবন্দি নেতা প্যারোলে মুক্তি পেয়ে ডান্ডাবেড়ি পায়ে বাড়িতে এসেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের কামদেবপুর এলাকায় রাকিবুল ইসলামের বাবা মোশাররফ জোমাদ্দরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্যারোলে মুক্তি পেলেও জানাজায় অংশ নিতে পারেনি তিনি।

রাকিবুল সুবিদপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

রাকিবুলের বড় ভাই জুয়েল জোমাদ্দর বলেন, বুধবার দিবাগত রাতে বাবার মৃত্যু হয়। রাকিবুলকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার জন্য বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় জেলা প্রশাসনে আবেদন করা হয়। সব কার্যক্রম শেষে আবেদনপত্রটি কারাগারে যায় দুপুর ৩টায়। এদিকে পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী, দুপুর ৩টায় বাবার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সে কারণে রাকিবুল জানাজায় অংশ নিতে পারেননি।

তিনি আরও বলেন, বিকেল সাড়ে ৪টায় পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় বাসায় আসে রাকিবুল। শেষবারের মতো বাবাকে দেখে সে। পরে দাফন শেষ হলে পুলিশ তাকে নিয়ে যায়।

মোল্লাহাট পুলিশ ফাঁড়ির সাব-ইন্সপেক্টর আমির হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমরা আসামিকে ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় পেয়েছি। সেই অবস্থায় আবার তাকে কারাগারে নিয়ে যাই।  

নলছিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম ডেইলি স্টারকে বলেন, পরিবারের আবেদন ও প্রশাসনের অনুমতির ভিত্তিতে রাকিবুলকে পুলিশি পাহারায় নিরাপদে নেওয়া হয়। পরে 
আবার কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ঝালকাঠি জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ বিকাশ রায়হান বলেন, গত ১৯ ডিসেম্বর রাকিবুলকে কারাগারে আনা হয়। গত বছরের নভেম্বর ও মে মাসে দুইটি বিস্ফোরক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তিনি আরও বলেন, পুলিশ কীভাবে আসামি নেবে তার একটি ফরমেট জেলগেটে থাকে। সে অনুযায়ী, আসামি তরুণ ও দূরবর্তী এলাকা হলে নিরাপত্তার শঙ্কায় পুলিশ সাধারণত ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে নিয়ে থাকে। এখানেও পুলিশের পক্ষ থেকে ডান্ডাবেড়িসহ আসামিকে নেওয়ার চাহিদা ছিল।

 

 

জিন্নাহ কেন স্বাধীন বাংলাদেশে উদযাপনের যোগ্য নন

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে বাংলাদেশে হঠাৎ যে আবেগঘন স্মরণ-অনুষ্ঠান, ছবি টাঙানো বা শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটা কেবল আবেগের প্রশ্ন নয়। ইতিহাসের দলিল ঘাঁটলেই দেখা যায়, জিন্নাহর ‘পাকিস্তান’ আসলে শুরু থেকেই একটা স্পষ্ট, সৎ রাষ্ট্র-পরিকল্পনা ছিল না; এটা ছিল রাজনৈতিক দর-কষাকষির একটা কৌশল, যেটা শেষ পর্যন্ত এমন একটা বাস্তবতায় রূপ নেয় যার বলি হতে হয়েছিল বাঙালিকে।

১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম লীগ যে দাবি তুলেছিল, সেখানে ভারতের উত্তর-পশ্চিম আর পূর্বাঞ্চলের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ গঠনের কথা বলা হয়েছিল, অখণ্ড পাকিস্তানের কথা নয়। ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল তার আলোচিত গ্রন্থ ‘দ্য সোল স্পোকসম্যান: জিন্নাহ, দ্য মুসলিম লীগ অ্যান্ড দ্য ডিমান্ড ফর পাকিস্তান’ যেটি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়, সেখানে তিনি যে যুক্তি দিয়েছেন, তা এই বিতর্কের কেন্দ্রে।

জালালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জিন্নাহ প্রথম দিকে পাকিস্তান দাবিকে ব্যবহার করেছিলেন মূলত একটা ‘বার্গেনিং কাউন্টার’ বা দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে যার উদ্দেশ্য ছিল অখণ্ড ভারতের মধ্যে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর জন্য শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসন আদায় করা, বাস্তবেই আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়। ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনায় জিন্নাহ প্রথমে যে শিথিল যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো মেনে নিয়েছিলেন, তাতেও এই তত্ত্বের সমর্থন মেলে। অর্থাৎ, নিজের রাজনৈতিক কৌশলের প্যাঁচেই শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটা বিভাজনের দিকে ঠেলে দেন, যার পূর্ণ পরিণতি তিনি নিজেও শুরুতে চাননি বা ভাবেননি।

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট জিন্নাহর ডাকে মুসলিম লীগ যে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ পালন করে, তার পরিণতিতে কলকাতায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা ঘটে, তাতে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। রামচন্দ্র গুহ তার ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী’ গ্রন্থে আর জয়া চ্যাটার্জি ‘বেঙ্গল ডিভাইডেড’-এ যে বিশ্লেষণ হাজির করেছেন, তার সারমর্ম হলো—জিন্নাহ যখন সাংবিধানিক দর-কষাকষির পথ ছেড়ে সরাসরি রাজপথের আন্দোলনের ডাক দেন, তখন তিনি এই ডাকের সম্ভাব্য সহিংস পরিণতি এবং বাংলার স্থানীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্তপ্ত বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি।

কেন্দ্র থেকে আসা এই উসকানিমূলক ডাককে বাংলার তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার ও স্থানীয় নেতারা নিজেদের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে কলকাতার দাঙ্গার সরাসরি নির্দেশদাতা না হলেও, এই ধারার ঐতিহাসিকদের মতে জিন্নাহ এই সহিংসতার পরোক্ষ দায় থেকে মুক্ত নন। কারণ যে রাজনৈতিক ভাষা ও আন্দোলনের কাঠামো তিনি বেছে নিয়েছিলেন, সেটাই সহিংসতার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। এই একটা ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, ‘পাকিস্তান’ অর্জনের পথে যে রাজনৈতিক কৌশল জিন্নাহ বেছে নিয়েছিলেন, তার মূল্য চুকাতে হয়েছিল সাধারণ মানুষকে—আর তার রেশ ধরেই দেশভাগের সময় যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তাতে অগণিত বাঙালি প্রাণ হারায়।

জিন্নাহর ব্যক্তিজীবন আর তার রাজনৈতিক প্রচারণার মধ্যে বিশাল ফারাক নিয়েও ইতিহাসবিদরা বহুবার লিখেছেন। স্ট্যানলি ওলপার্টের জীবনীগ্রন্থ ‘জিন্নাহ অব পাকিস্তান’-এ দেখা যায়, জিন্নাহ ছিলেন পশ্চিমা পোশাকে অভ্যস্ত, ইংরেজিতে কথা বলা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে প্রায় সম্পূর্ণ অনাগ্রহী একজন ব্যারিস্টার, যিনি নামাজ পড়তেন না, উর্দুতে সাবলীল ছিলেন না, এমনকি প্রকাশ্য বক্তৃতাও প্রায়ই দিতেন ইংরেজিতে। অথচ রাজনৈতিক প্রয়োজনে তিনিই হয়ে উঠলেন ‘ইসলাম বিপন্ন’ স্লোগানের প্রধান মুখ, যার নামে লাখো মানুষ দাঙ্গায়, দেশত্যাগে আর রক্তক্ষয়ে জড়িয়ে পড়ল। ধর্মকে রাজনৈতিক সংগঠিতকরণের হাতিয়ার বানিয়ে একটা রাষ্ট্র দাঁড় করানো, অথচ নিজে সেই ধর্মীয় পরিচয়ে বিশ্বাসী না হওয়া—এই দ্বিচারিতাই বলে দেয়, গোটা প্রকল্পটার ভিত্তি কতটা নড়বড়ে আর সুবিধাবাদী ছিল।

জিন্নাহর যুক্তির কেন্দ্রে ছিল ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’। হিন্দু আর মুসলমান এক সাথে থাকতে পারে না, কারণ তারা আলাদা জাতি। কিন্তু ইতিহাস মাত্র চব্বিশ বছরের মধ্যেই এই তত্ত্বকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের উপর যে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক শোষণ আর রাজনৈতিক আধিপত্যের বিস্তার করতে শুরু করে পরে তা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তার জবাব দেন। মুক্তিযুদ্ধই সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ যে জিন্নাহর তত্ত্ব ভুল ছিল। ধর্ম দিয়ে জাতি তৈরি হয় না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটার জন্মই তাই জিন্নাহর তত্ত্বের বিরুদ্ধে ইতিহাসের রায়।

১৯৪৮ সালের ২১ ও ২৪ মার্চ ঢাকায় এসে জিন্নাহ যা করলেন, তাতে বাঙালির প্রতি তার ‘বৃহত্তর পাকিস্তান’-এর আসল চেহারা স্পষ্ট হয়ে যায়। রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু তখনকার পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ছাত্রদের প্রতিবাদের মুখে পড়েও তিনি অবস্থান বদলাননি। এই একটা সিদ্ধান্তই বলে দেয়, ‘যুক্ত পাকিস্তান’ আসলে সব অঞ্চলের সমান অংশীদারিত্বের স্বপ্ন ছিল না। এটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান-কেন্দ্রিক আধিপত্যের একটা পরিকল্পনা, যেখানে বাঙালিকে নিজের ভাষা ছাড়তে বলা হচ্ছিল রাষ্ট্র গঠনের নামে। এই ঘোষণার জের ধরেই জন্ম নেয় ভাষা আন্দোলন, আর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রফিক-সালাম-বরকত-জব্বারের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ।

জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনী পড়লে দেখা যায়, তার মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আর দিল্লি-লাহোরের রাজনীতি। পূর্ব বাংলা তার কাছে ছিল ভোটব্যাংক আর জনসংখ্যাগত শক্তির একটা উৎস, নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি-অর্থনীতি নিয়ে আলাদা মনোযোগ পাওয়ার মতো অঞ্চল নয়। ফলাফল হিসাবে দেখা গেল স্বাধীনতার পরপরই পূর্ব বাংলা পরিণত হলো পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে, যেখান থেকে সম্পদ পাচার হতো, অথচ রাজনৈতিক ক্ষমতা আর সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রে বাঙালির প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। এই বৈষম্যের বীজ বোনা হয়েছিল জিন্নাহর জীবদ্দশাতেই।

জিন্নাহর প্রকল্পকে বাঙালি যে নিজের বলে মেনে নেয়নি, তার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ এসেছে বাঙালির নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকেই। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ঠিক প্রাক্কালে বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু মিলে একটা ‘যুক্ত স্বাধীন বাংলা’ (ইউনাইটেড বেঙ্গল)-এর প্রস্তাব তোলেন। অর্থাৎ বাংলাকে ভারত বা পাকিস্তান, কোনোটার সাথেই যুক্ত না করে একটা আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র বানানোর পরিকল্পনা। জিন্নাহ এই প্রস্তাবে শর্তসাপেক্ষ সায় দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আর দিল্লি-লাহোরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা মাঠে মারা যায়। ইতিহাসবিদ লিওনার্ড মোসলি তার ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব দ্য ব্রিটিশ রাজ’ গ্রন্থে এই পর্বের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন কীভাবে বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হয়ে যায়।

বদরুদ্দীন উমর তিন খণ্ডে ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ লিখেছিলেন, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব যিনি নিজে উত্থাপন করেছিলেন, সেই বাঙালি নেতা এ কে ফজলুল হক নিজেই পরবর্তীতে মুসলিম লীগ ও জিন্নাহর রাজনীতি থেকে সরে আসেন। আর ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট—ফজলুল হক, শেরে বাংলা, মাওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর জোট—২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি জিতে জিন্নাহর মুসলিম লীগকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে; লীগ পায় মাত্র ১০টি আসন। উমর তার এই গবেষণাগ্রন্থে এই নির্বাচনকে বাঙালির পক্ষ থেকে মুসলিম লীগ-জিন্নাহর রাজনীতির বিরুদ্ধে একটা সুস্পষ্ট গণরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

জিন্নাহর ‘ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান’-এর ধারণা আসলে কতটা ভঙ্গুর ছিল, তার চূড়ান্ত প্রমাণ মেলে ১৯৭১ সালে, যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই গণহত্যা চালায়। ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাস তার প্রতিবেদন ও পরবর্তীতে ‘দ্য রেপ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংসতার যে বিবরণ দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক জনমতকে বদলে দিয়েছিল। আর পাকিস্তান সরকারের নিজস্ব তদন্ত কমিশন—হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট—পাকিস্তানের ভাঙনের পেছনে পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বৈষম্যমূলক আচরণ ও ব্যর্থতাকেই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ, খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজস্ব দলিলই স্বীকার করে নেয় যে জিন্নাহর গড়া কাঠামোয় বাঙালির প্রতি ন্যায্যতা ছিল না। ওলেম ফন শেনডেলের ‘এ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থেও এই পুরো প্রক্রিয়াকে দেখানো হয়েছে একটামাত্র জাতিরাষ্ট্রের ব্যর্থতার ধারাবাহিক পরিণতি হিসেবে, যার সূচনাবিন্দু ১৯৪৭-৪৮ সালের সেই অসম রাষ্ট্র-পরিকল্পনাতেই নিহিত।

সম্প্রতি বাংলাদেশে কিছু মহল থেকে জিন্নাহকে নিয়ে যে আবেগ দেখা যাচ্ছে—তার মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা জানানো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সংগ্রহশালায় তার ছবি নতুন করে জায়গা পাওয়া—এসব নিছক ইতিহাসচর্চা নয়। যারা এখনও অখণ্ড ‘একটি পাকিস্তান’ ভাবাদর্শে বিশ্বাসী, তাদের কাছে জিন্নাহ একটা বিকল্প জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক, যে পরিচয় বাংলাদেশের জন্মের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে ছিল। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর এসে যে রাষ্ট্র নিজের অস্তিত্বই অর্জন করেছে জিন্নাহর কল্পিত রাষ্ট্রকাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে, সেখানে তাকে নায়কের আসনে বসানো মানে একাত্তরের শহীদদের আত্মত্যাগকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিতে জায়গা পাওয়ার কথা ভাষা শহীদ আর মুক্তিযোদ্ধাদের, জিন্নাহর নয়। কারণ তার স্বপ্ন ছিল আমাদের স্বপ্নের বিপরীত মেরুতে।

 

মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও যোগাযোগ পেশাজীবী

বিএনপি-এনসিপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বিএনপি-ছাত্রদল-যুবদলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। এই আদেশের ফলে শহরজুড়ে পাঁচ বা তার বেশি মানুষের সমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আজ বুধবার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. জি. এম. সরফরাজ স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। একই দিনে দুই পক্ষের আলাদা রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা থেকে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আদেশ অনুযায়ী, হবিগঞ্জ পৌরসভায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও পথসভার ঘোষণা দিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্যদিকে, একই স্থানে ও একই সময়ে হবিগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপি, হবিগঞ্জ পৌর বিএনপি এবং জেলা ছাত্রদল পাল্টা প্রতিবাদ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেয়।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, উভয় পক্ষের বিপুলসংখ্যক সমর্থক সেখানে উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সহিংসতা, হতাহত, সম্পত্তি বিনষ্ট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।

এই আদেশের আওতায় হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় পাঁচ বা তার বেশি লোকের যেকোনো ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল, বিক্ষোভ, স্লোগান দেওয়া, পিকেটিং, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং জনশান্তি বিঘ্নিত করতে পারে এমন যেকোনো কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আদেশে আরও বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, পুলিশ যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধ করতে চায়। যেহেতু কয়েকটি রাজনৈতিক দল একই স্থানে সমবেত হওয়ার কথা জানিয়েছিল, তাই সেখানে বিশৃঙ্খল পরিবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও যেকোনো দুর্ঘটনা এড়াতে আমরা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করেছি। এখন পর্যন্ত পরিবেশ শান্ত রয়েছে।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে দলটি তাদের নির্ধারিত উত্তর অঞ্চলের রোডম্যাপে পরিবর্তন এনে মৌলভীবাজারের রাজনগর ও কুলাউড়ার দুটি পদযাত্রা স্থগিত করে। 

পরে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে আজ বুধবার হবিগঞ্জে নতুন করে প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। এনসিপির অভিযোগ, বিএনপির উসকানিতে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা ছাত্রদল সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিঙ্গন বলেন, আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে ক্ষুব্ধ জনতা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, এতে ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। 

সব খাবারের ব্যবসায় লাগবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন

রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে আমদানিকারক ও বড় আকারের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, খাবারের ব্যবসায় জড়িত এমন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এখন থেকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। নতুন এক বিধিমালায় এ কথা বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, খাদ্যের মান উন্নত করতে এবং খাদ্য ব্যবসার ওপর নজরদারি বাড়াতেই এই নিয়ম করা হয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীরা এই বিধিমালার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, ‘নিরাপদ খাদ্য (নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং) প্রবিধানমালা’ নামের এই নতুন নিয়ম ব্যবসার ওপর বোঝাই শুধু বাড়াবে।

গত ১৬ জুলাই নতুন এই বিধিমালাটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

বিধিমালায় খাদ্য ব্যবসাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু নিবন্ধনই যথেষ্ট হবে। তবে যারা বিশেষ ধরনের বা অতি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য নিয়ে কাজ করে, তাদের লাইসেন্স নিতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ এবং ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে।

প্যাকেটজাত বা মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং আমদানিকারকদেরও (কাঁচা ও তাজা খাবার বাদে) নিবন্ধন করতে হবে।

এমনকি রাস্তার পাশে যারা পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজুর মতো খাবারের ব্যবসা করেন, নতুন এই নিয়মের আওতায় তাদেরকেও নিবন্ধন নিতে হবে।

অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করে, যেমন: শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক বা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি খাবার, তাদের লাইসেন্সের জন্য কঠোর নিয়ম মানতে হবে।

ফর্টিফায়েড খাবার (ভিটামিন বা খনিজ যুক্ত), অর্গানিক পণ্য, জিনগত পরিবর্তন করা খাবার (জিএমও) এবং বিকিরণের মাধ্যমে সংরক্ষিত খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও লাইসেন্সের আওতায় পড়বে। এ ছাড়া বেসরকারি খাদ্যের গুদাম ও হিমাগারকেও (কোল্ড স্টোরেজ) লাইসেন্স ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।

এই বিধিমালা ভোজ্যতেলের পাইকারি বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুত, আমদানি এবং বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

সাধারণত, নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর এবং এরপর এটি নবায়ন করতে হবে।

খরচ ও ফি হার

বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধনের ফি শুরু হবে ১ হাজার টাকা থেকে এবং নবায়নের খরচ হবে ৫০০ টাকা।

খাবারের ব্যবসা করে এমন বড় প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ফি ফ্লোরের আকারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হবে। ছোট দোকানের জন্য এই ফি ১ হাজার টাকা এবং ১০ হাজার বর্গফুটের চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য ৫ হাজার টাকা হবে।

খাদ্য মজুত করার গুদামের জন্য ফি বেশি ধরা হয়েছে। ২০ হাজার বর্গফুটের চেয়ে বড় গুদামের ক্ষেত্রে নতুন লাইসেন্স নিতে ৪০ হাজার টাকা ফি দিতে হবে।

তবে, শিল্প খাতের নেতারা ফিয়ের এই কাঠামোর সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, কিছু ফি নির্দিষ্ট হারের বদলে পণ্যের মোট ‘কস্ট অ্যান্ড ফ্রেট’ বা সিঅ্যান্ডএফ (পণ্য ও পরিবহনের মোট ব্যয়) মূল্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ব্যবসার ওপর বোঝা হয়ে আসবে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, নতুন নিবন্ধন এবং লাইসেন্সের নিয়মটি ভালো উদ্দেশ্যে করা হলেও এটি ব্যবসার জন্য বোঝা তৈরি করতে পারে, কারণ এখানে আগে থেকেই অনেক ধরনের নজরদারি ও নিয়ম রয়েছে।

তিনি বলেন, খাদ্য প্রস্তুতকারক, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক এবং বাজারজাতকারীদের ইতিমধ্যে ব্যবসা শুরু করতে ১৭টি বিভিন্ন সরকারি বিভাগ ও সংস্থা থেকে লাইসেন্স ও নিবন্ধন নিতে হয়।

কামরুজ্জামান বলেন, ‘তাদের উদ্দেশ্য প্রশংসার যোগ্য। তবে চিন্তার বিষয় হলো, শুধু ব্যবসা শুরু করার জন্যই আমাদের ইতিমধ্যে ১৭টি ভিন্ন সংস্থা থেকে লাইসেন্স ও নিবন্ধন নিতে হয়।’

তিনি বলেন, এতগুলো সংস্থার নিবন্ধন ও ফির কারণে কোনো ভালো ফল না এলেও ব্যবসা পরিচালনার খরচ ঠিকই বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নতুন এই নিয়মগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, তাদেরকে আগে থেকেই নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। এখন নতুন আরেকটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এলে তাদের কাজের আওতা নিয়ে সংঘাত তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, লাইসেন্সিংয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ যদি নির্দিষ্ট ফি-এর বদলে সিঅ্যান্ডএফের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়, তবে সেটা ব্যবসার ওপর আরও চাপ বাড়াবে।

তিনি বলেন, ‘ব্যবসার ক্ষেত্রে এক জানালার (সিঙ্গেল উইন্ডো) সেবার বিষয়ে সরকারের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, আমলাতন্ত্র তার পরিপন্থি।’

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, কোনো বিস্তৃত পরিকল্পনা ছাড়া শুধু একটি বিধিমালা দিয়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

একাধিক নিয়মের পরিবর্তে তিনি এমন একটি ব্যবহারিক ও বাস্তবসম্মত খাদ্য নিরাপত্তা আইন করার আহ্বান জানান, যা হঠাৎ কোনো গেজেট জারির মাধ্যমে নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

সমিতির হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার রেস্তোরাঁ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘শুধু আইন বা এ ধরনের গেজেট প্রকাশ করেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।’ তিনি আরও বলেন, এই নতুন নিয়মকানুন ব্যবসার ওপর চাপ বাড়াবে এবং দুর্নীতির নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

ব্যবসায়ী নেতারা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এই নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

এসব উদ্বেগের জবাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (এনফোর্সমেন্ট) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, তারা শুরুতেই শিল্প পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদনের ওপর নজরদারি করার দিকে মনোযোগ দেবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো শিল্প পর্যায়ের উৎপাদন এবং যারা বড় পরিসরে উৎপাদন করছে, সেই সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।’

আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মতো সংস্থা থেকে প্রত্যয়ন পেয়েছে, তাদের এখনই কোনো হস্তক্ষেপে পড়তে হবে না। তবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান সার্টিফিকেশনের বাইরে গিয়েও স্বাধীনভাবে খাদ্যের মান ও উৎপাদন প্রক্রিয়া নজরদারি করবে।

তিনি জানান, আমদানি করা খাদ্যপণ্য, যেমন মাংস ও মধুর ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণা এবং ভেজাল আছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য চারটি বন্দরে ২৫ জন জ্যেষ্ঠ খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিয়োগ দিচ্ছেন তারা।

ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টি-টোয়েন্টি হার, ক্ষুব্ধ আইয়ার

জফরা আর্চার ও জশ টংয়ের গতির সামনে দাঁড়াতেই পারল না ভারত। ট্রেন্ট ব্রিজে ইংল্যান্ডের পেস জুটির তোপে মাত্র ৭৬ রানে গুটিয়ে গিয়ে টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারের স্বাদ পেয়েছে সফরকারীরা। ১২৫ রানের এই বিধ্বংসী পরাজয়ের পর নিজের দলের পারফরম্যান্সকে ‘জঘন্য’ বলে মন্তব্য করেছেন ভারত অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ার।

বৃষ্টিতে প্রথম ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার পর সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ড তোলে ৭ উইকেটে ২০১ রান। জবাবে মাত্র ১১.৫ ওভারে ৭৬ রানে অলআউট হয়ে যায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত। এর ফলে চার ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ইংল্যান্ড।

এর আগে টি-টোয়েন্টিতে ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হার ছিল ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৮০ রানে। ট্রেন্ট ব্রিজে সেই রেকর্ডও ভেঙে যায়।

ম্যাচ শেষে আইয়ার বলেন, ‘এটা ছিল জঘন্য। এর চেয়ে ভালো কোনো শব্দ আমার জানা নেই। এত বড় ব্যবধানে হার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই উইকেটে হার্ড লেংথে বল করলে বোলাররা সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু আমরা সেটা ঠিকভাবে করতে পারিনি। রান তাড়া করার সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে হয়, কিন্তু আমাদের বাস্তবায়ন ছিল খুবই খারাপ।’

২০১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমেই ধস নামে ভারতের ব্যাটিংয়ে। ঘণ্টায় ১৪৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করা আর্চার ও টং নতুন বলে টপ অর্ডার গুঁড়িয়ে দেন। আর্চার ৩ উইকেট নেন ২৯ রানে, আর টং ক্যারিয়ারসেরা ৪ উইকেট শিকার করেন ২৮ রানে।

১৫ বছর বয়সী বৈভব সূর্যবংশীকে ৯০ মাইল গতির বাউন্সারে চাপে ফেলেন আর্চার। যদিও পরের বলেই গালির ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে নিজের সাহসের পরিচয় দেন এই কিশোর। কিন্তু এরপর আর ভারতের ব্যাটাররা প্রতিরোধ গড়তে পারেননি।

অভিষেক শর্মা, সূর্যবংশী, ইশান কিষান, শ্রেয়াস আইয়ার ও অক্ষর প্যাটেল দ্রুত ফিরলে ৫ ওভারের মধ্যেই ৫২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে ভারত। পরে উইল জ্যাকস, আদিল রশিদ ও টংয়ের আঘাতে দ্রুত গুটিয়ে যায় পুরো ইনিংস। ভারতের ইনিংস কেবলমাত্র তাদের সর্বনিম্ন টি-টোয়েন্টি স্কোর ৭৪ রানকে অতিক্রম করতে পেরেছে।

এর আগে ব্যাট হাতে ইংল্যান্ডকে ভালো শুরু এনে দেন জস বাটলার (৩৬)। এরপর ফিল সল্ট ৩৬ বলে ৭০ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। শেষ দিকে অপরাজিত ৪১ রান করে দলকে ২০০-এর গণ্ডি পার করান স্যাম কারান।

ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক সল্টের প্রশংসা করে বলেন, ‘সল্ট অসাধারণ একটি ইনিংস খেলেছে। এমন কঠিন উইকেটে ২০০ রান করা ছিল দারুণ অর্জন। লক্ষ্য ছিল স্টাম্পে বল রাখা এবং মাঝে মাঝে বাউন্সার ব্যবহার করা। পরিকল্পনাটা যতটা সহজ শোনায়, মাঠে ঠিক ততটাই কার্যকর হয়েছে।’

তবে হতাশার মাঝেও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা দেখছেন আইয়ার, ‘এটা শক্তভাবে ফিরে আসার দারুণ সুযোগ। অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। আমরা খুব বাজে ক্রিকেট খেলেছি, তবে এখান থেকে শেখারও অনেক কিছু আছে।’

আগামী বৃহস্পতিবার ব্রিস্টলে হবে সিরিজের চতুর্থ ও শেষ টি-টোয়েন্টি। সেই ম্যাচ জিতলেই সিরিজ নিশ্চিত করবে ইংল্যান্ড।

আতাউর রহমানের অবদান ভোলা যাবে না: মামুনুর রশীদ

বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে মামুনুর রশীদ একটি উজ্জ্বল নাম। বর্ষীয়ান এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সদ্য প্রয়াত নাট্যজন আতাউর রহমানের বহু বছরের সম্পর্ক ছিল। সহযাত্রী, সহকর্মী ও কাছের মানুষ হিসেবে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাকে।

আতাউর রহমানের মৃত্যু কেবল একজন নাট্যব্যক্তিত্ব হারানো নয়, বরং দীর্ঘদিনের একজন সহযোদ্ধাকে হারানো। দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে আতাউর রহমানের নাট্যজীবন, অবদান ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা বলেছেন মামুনুর রশীদ।

মামুনুর রশীদ বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই আতাউর রহমানকে চিনতাম। পাকিস্তান আমলেই তিনি নাটকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্বাধীনতার পর নতুন উদ্যমে নাট্যচর্চা শুরু করেন। পরে তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন।’

‘৫০ বছরেরও বেশি সময় তিনি নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে মঞ্চনাটকে তার বিশাল অবদান আছে। এই অবদান কখনো ভুলবার নয়,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘মঞ্চের জন্য আতাউর রহমান অসংখ্য কাজ করেছেন। নাটক লিখেছেন, নাট্যরূপ দিয়েছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন, অভিনয়ও করেছেন। শুধু নিজের দলের জন্য নয়, অন্য নাট্যদলের জন্যও নির্দেশনা দিয়েছেন। তার কাজ দর্শকদের প্রশংসা ও ভালোবাসা পেয়েছে।’

মামুনুর রশীদ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ‘রক্তকরবী’ নাটকের কথা। তিনি বলেন, ‘রক্তকরবী ছিল অত্যন্ত সাড়া জাগানো ও প্রশংসিত একটি নাটক। এটি তার নির্দেশিত অসাধারণ একটি মঞ্চনাটক। এছাড়া তিনি গ্যালিলিওসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। এসব কাজই তাকে মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখবে।’

আতাউর রহমানের সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ছিল। তিনি প্রচুর পড়তেন, জানতেন অনেক কিছু। সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তিনি নাট্যদলের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন।

তার ভাষ্য, ‘একসময় তিনি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রধান ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি সারাজীবন নাটক নিয়েই থেকেছেন। এর বাইরে আর কিছু ভাবেননি। শিল্পের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা ছিল।’

সমসাময়িকদের হারানোর বেদনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘আমার সমসাময়িক ও কিছুটা সিনিয়র অনেকেই চলে গেছেন। এবার আতাউর রহমানও চলে গেলেন। এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হলো। এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এই শূন্যতা নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।’

মামুনুর রশীদ বলেন, ‘মঞ্চে তার অনেক কাজ দেখেছি, প্রশংসাও করেছি। এত বছরের পথচলায় কত স্মৃতি, কত কথা মনে পড়ছে। সবকিছু ছেড়ে তিনি চলে গেলেন। তার প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রইল।’

মধ্যপ্রাচ্যের যেসব স্থানে ইরানের পাল্টা হামলা

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। 

আজ বৃহস্পতিবার সর্বশেষ ইসরায়েল, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ এবং প্রথমবারের মতো আজারবাইজানে হামলা চালানোর খবর পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার খবরও মিলেছে। 

সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা, সিএনএন ও বার্তাসংস্থা এএফপি এসব তথ্য জানিয়েছে।  

সংযুক্ত আরব আমিরাত

এএফপি জানায়, বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির একটি শিল্প অঞ্চলে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।

আমিরাতের মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, হামলায় পাকিস্তান ও নেপালের ছয়জন নাগরিক আহত হয়েছেন।

এছাড়া দুবাইয়েও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে।

কুয়েত

কুয়েতে অন্তত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। 

এএফপি ও আল জাজিরা জানায়, কুয়েতের উত্তর-পশ্চিমে ক্যাম্প বুহরিং ও দক্ষিণে ক্যাম্প আরিফজানে এ হামলা চালানো হয়।

বাহরাইন

বাহরাইন সরকারের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, একটি জ্বালানি তেলের স্থাপনায় হামলা হয়েছে। 

ইরাক

রাষ্ট্রীয় টিভিতে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরাকের এরবিল শহরে একটি মার্কিন স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা।

ইসরায়েল

ইসরায়েলেও নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে।

সিএনএন জানায়, তেল আবিবের পূর্বে বারেকেত এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পেয়েছে তারা।
এছাড়া ইরানের বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে ইসরায়েল।

আল জাজিরা জানায়, মধ্য ইসরায়েলে ধারাবাহিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। 

কাতার

কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার সকালে ইরানের ১৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও চারটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে তারা।
সিএনএন জানায়, রাজধানী দোহার আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের বিস্ফোরণে শহরের বিভিন্ন ভবন কেঁপে ওঠে।

সৌদি আরব

সৌদি আরবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা তিনটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও বেশ কয়েকটি ড্রোন প্রতিহত করেছেন।

আজারবাইজান

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ না হলেও ইরানের সীমান্ত ঘেঁষা দেশ আজারবাইজানে প্রথমবারের মতো ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে দুজন আহত হয়েছেন। হামলায় একটি বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আজারবাইজানের কর্তৃপক্ষ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। তবে ইরানের সামরিক বাহিনী ড্রোন হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। 

অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে ট্যাক্স বাড়াতে হবে: অর্থমন্ত্রী

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে ট্যাক্স (কর) বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে বাড়াতে হবে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ।

আজ শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গায় প্রস্তাবিত সরকারি হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জমি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপির নির্বাচনী কর্মসূচির মধ্যে কর্মসংস্থান একটি বড় কর্মসূচি। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান কোত্থেকে হবে? এ জন্য আমরা দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগে জোর দিচ্ছে। আগামী বাজেটেও কর্মসংস্থান গুরুত্ব পাবে। এটা করার জন্য যা যা প্রয়োজন সব করা হবে।

তিনি আরও বলেন, পতেঙ্গা অঞ্চলে বড় কোনো হাসপাতাল নেই। এর জন্য আমরা কিছু জায়গা দেখছি। একটি বড় হাসপাতাল সঙ্গে নার্সিং ইনস্টিটিউট ও টেকনোলজিস্টদের জন্য আলাদা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে। এটা এই অঞ্চলের মানুষের দাবিও ছিল।

হাসপাতালে বিশেষায়িত সেবাও থাকবে বলে জানান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।  

রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে নতুন করে ভাবতে হবে কেন?

নব্য উদারবাদ (নিওলিবারেলিজম) ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ প্রভাত পাটনায়েক। একইসঙ্গে গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনীয়তা এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বিকল্প উন্নয়নপথের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।

দ্য ডেইলি স্টার: কয়েক দশক ধরে অনেক উন্নয়নশীল দেশ বিশ্বে সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল সরবরাহ করে আসছে, আর ধনী দেশগুলো ভোগ করেছে তৈরি পণ্য। এই মডেল কি এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে? বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য উত্তেজনা ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নতা যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে রূপ দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সামনে এগুলো কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ও একইসঙ্গে সুযোগ তৈরি করছে?

প্রভাত পাটনায়েক: গত কয়েক দশক ধরে নব্যউদার (নিউলিবারেল) অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। এতে দেশের সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে পণ্য, সেবা এমনকি অর্থ ও পুঁজির তুলনামূলক অবাধ চলাচল নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই মডেল এখন শেষের দিকে এসে ঠেকেছে।

নব্যউদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে বৈষম্য তৈরি করেছে, তা একে স্থবিরতা ও উচ্চ বেকারত্বের মতো সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ কারণেই নিজের দেশের বেকারত্ব কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিতে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করছেন। এ ধরনের শুল্ক হলো ‘প্রতিবেশীকে নিঃস্ব করার’ নীতি, যার মাধ্যমে বেকারত্ব অন্য দেশগুলোতে রপ্তানি করা হয়।

কিন্তু গ্লোবাল সাউথের কোনো দেশ স্বাধীন প্রবৃদ্ধির এমন কৌশল অনুসরণ করলে যুক্তরাষ্ট্রই তার বিরোধিতা করবে।

তাছাড়া, যেকোনো স্বাধীন প্রবৃদ্ধির কৌশল—এমনকি আয়বৈষম্য কমিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে গেলেও তলানির দিকে থাকা দেশগুলোর এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যার বিরোধিতা করবে প্রচলিত এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই। এর মধ্যে রয়েছে ধনীদের ওপর কর আরোপ, রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি করা অথবা শুল্কের মাধ্যমে নিজের দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া।

তবে, এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো—যেহেতু নব্যউদার অর্থব্যবস্থা বৈশ্বিক এবং ইচ্ছামতো যেকোনো দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাই এর নির্দেশনা মেনে চলতে হয়। তা না হলে পুঁজি ও নগদ প্রবাহ ওই দেশ থেকে বেরিয়ে যাবে এবং দেশটিতে সংকট তৈরি হবে।

তাই প্রবৃদ্ধির কৌশল পরিবর্তন করতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে পুঁজির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ, পুঁজির বহির্গমনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।

তবে এই কৌশলের বড় ঝুঁকি হলো—এতে দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি পুঁজি ও নগদ প্রবাহ কমে যাবে। ফলে লেনদেনের ভারসাম্যের ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজন হবে।

তাই অর্থনৈতিক কৌশল পরিবর্তনে কোনো ক্ষুদ্র বা জোড়াতালি ধরনের পদক্ষেপ দিয়ে কাজ হবে না। বরং, পরিবর্তন চাইলে বড় ধরনের আন্তঃসম্পর্কিত পদক্ষেপের দিকে এগোতে হবে।

এর অর্থ হবে—দিরিজিজম, অর্থাৎ রাষ্ট্রের আরও বেশি হস্তক্ষেপ বাড়ানোর দিকে এগোনো। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি নিজের দেশের ধনী শ্রেণিও এই হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করবে।

নব্যউদারনীতিবাদ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে যে জটিল সংকটে ফেলেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে এমন পরিবর্তনই প্রয়োজন। জনগণকে এর পক্ষে সংগঠিত করা গেলেই কেবল তা সম্ভব হবে।

আর সেজন্য জনগণের সামনে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে হতে যাওয়া বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট লাভের প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট চিত্র উপস্থাপন করতে হবে।

ভারতের ক্ষেত্রে, আমি বলে আসছি, নব্যউদারবাদ থেকে সরে আসার সঙ্গে সর্বজনীন, সংবিধানসম্মতভাবে নিশ্চিত এবং আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এমন পাঁচটি অধিকার হলো–

খাদ্যের অধিকার;

কর্মসংস্থানের অধিকার (কর্মসংস্থান দিতে না পারলে পূর্ণ মজুরি দিতে হবে);

জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনামূল্যে, মানসম্মত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অধিকার;

বিনামূল্যে, মানসম্মত, সর্বজনীন ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার অধিকার; ও

সবার জন্য অবদানবিহীন জীবনধারণের উপযোগী পেনশন (যারা অন্য কোনো ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন তারা ছাড়া)

এবং এগুলোর পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ভাতা—যা ভারতের জনসংখ্যার শুধু শীর্ষ ১ শতাংশের ওপর দুটি কর আরোপ করেই দেওয়া সম্ভব। প্রথমত, ২ শতাংশ সম্পদ কর। দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরিত সম্পদের ওপর এক-তৃতীয়াংশ উত্তরাধিকার কর।

আমি নিশ্চিত, সমাজের শুধু শীর্ষ পর্যায়ের ধনীদের ওপর কর আরোপ করে বাংলাদেশেও একই ধরনের অধিকারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র সহজেই গড়ে তোলা সম্ভব।

এমন একটি ‘নতুন উদ্যোগ’ জনগণকে অর্থনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনতে চাওয়া সরকারকে সমর্থন করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

ডেইলি স্টার: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের অধিকাংশজুড়েই রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত যুক্ত। কিন্তু কম খরচের রপ্তানির ওপর নির্ভর করে একটি দেশ কি সত্যিই সমৃদ্ধ হতে পারে? রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেলের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা কী এবং এতে আটকে পড়া এড়াতে বাংলাদেশের এখন কী করা উচিত?

প্রভাত পাটনায়েক: রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশলের একটি দিক রয়েছে, যা প্রায়ই যথাযথভাবে উপলব্ধি করা হয় না। বিশ্বের সব দেশ যদি রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশল অনুসরণ করে, তাহলে এতে সব দেশের সম্মিলিত রপ্তানির প্রবৃদ্ধি তথা বিশ্ববাজারের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ে না।

তাই কিছু দেশের রপ্তানি যদি বিশ্ববাজারের তুলনায় দ্রুত হারে বাড়ে, তাহলে অন্য কিছু দেশের রপ্তানি বৃদ্ধির হার অবশ্যই কম হতে হবে। অন্য কথায়, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশল দেশগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। সহযোগিতার পরিবর্তে এটি তাদের মধ্যে ডারউইনীয় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে, যা আমার কাছে মৌলিকভাবেই নিন্দনীয়।

তবে অভ্যন্তরীণ বাজারভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না।

কিছু পরিসংখ্যান বিবেচনা করা যাক। কোভিড অতিমারি বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দেওয়ারও আগে ২০১০–২০২০ দশকে বৈশ্বিক জিডিপির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

একই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে এই দুই হারের পার্থক্য তথা বিশ্ব অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে প্রায় ১ শতাংশ।

কিন্তু এসময় বৈশ্বিক শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধির হার ছিল আরও বেশি, প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ। তাই গোটা বিশ্বকে বিবেচনায় নিলে, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশলের অধীনে শুধু শ্রমশক্তিতে নতুন করে যুক্ত হওয়া মানুষদেরই কর্মসংস্থান দেওয়া সম্ভব হবে না। এবং এই পরিসংখ্যানে আগে থেকে উপস্থিত বেকার, অর্ধবেকার ও খণ্ডকালীন শ্রমিকদের কথা না হয় বাদই দিলাম।

যেহেতু দারিদ্র্যের মাত্রার সঙ্গে এই শ্রম মজুতের আকারের সম্পর্ক রয়েছে, তাই রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশলে বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য দূর হবে না। বরং এ কৌশল অনুসরণ করতে থাকলে সময়ের সঙ্গে দারিদ্র্য আরও বাড়বে।

অবশ্য রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশলে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ ভালো করতে পারে, কিন্তু তা করতে গিয়ে তাকে অন্য কোনো দেশকে আরও খারাপ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে হবে। তাই দেশগুলোকে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বড় দেশগুলো তা তুলনামূলক সহজেই করতে পারে, কিন্তু ছোট দেশগুলোকে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিতে একত্র হয়ে পর্যাপ্ত আকারের একটি অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি করতে হবে, যার ভিত্তিতে তারা প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।

অবশ্য অভ্যন্তরীণ বাজারনির্ভর প্রবৃদ্ধির অর্থ শুধু অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নয়; এ ধরনের প্রবৃদ্ধি অনুসরণকারী দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পরস্পরের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে, তবে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হতে হবে অভ্যন্তরীণ বাজার।

অর্থনীতিবিদ নিকোলাস কালডর একসময় রপ্তানিনির্ভর শিল্পায়নের দুটি ধরনের মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন: একটি হলো—যেখানে অন্যান্য দেশে রপ্তানির মাধ্যমে শিল্পের প্রবৃদ্ধি ঘটে; আর অন্যটিতে প্রবৃদ্ধি ঘটে কৃষিতে রপ্তানির মাধ্যমে। আমি দ্বিতীয়টির পক্ষে।

ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা এবং কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চাপে রয়েছে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো বারবার কেন এমন পরিস্থিতিতে পড়ে? বাংলাদেশ কীভাবে নিজেদের উন্নয়ন কৌশলে স্বাধীনতা বজায় রেখেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে?

প্রভাত পাটনায়েক: শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন দেশই এসব দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার মুখোমুখি। এর কারণ লুকিয়ে আছে বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থার একটি মৌলিক ত্রুটির মধ্যে।

ধরা যাক, পৃথিবীতে মাত্র দুটি দেশ আছে এবং তারা একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য করে। একটি দেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে, অর্থাৎ দেশটি যতটা আমদানি করে তার চেয়ে বেশি রপ্তানি করে। অন্য দেশটির ঠিক সমপরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি আছে।

এখন উদ্বৃত্ত দেশটি যদি নিজের দেশের পণ্য ও সেবার ওপর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায়—যেমন শ্রমিক ও কৃষকদের আয় বাড়িয়ে তাদের বেশি পণ্য ও সেবা কেনার সুযোগ দেয়, তাহলে সেই বাড়তি চাহিদার একটি অংশ ঘাটতি থাকা দেশের পণ্য আমদানির দিকে যাবে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি-উদ্বৃত্তের ভারসাম্য কমে আসবে।

এর ফলে শুধু বাণিজ্যের ভারসাম্যই ফিরবে না; দুই দেশ মিলিয়ে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও মানুষের ভোগও বাড়বে। বিশেষ করে ঘাটতি থাকা দেশটি বেশি উপকৃত হবে। অর্থাৎ, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য ঘাটতি থাকা দেশকে শুধু আমদানি কমিয়ে অর্থনীতি সংকুচিত করতে হবে না; বরং উদ্বৃত্ত দেশ নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ালেও একই ভারসাম্য অর্জন করা সম্ভব।

কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থা এই পথ অনুসরণ করে না। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা দূর করতে উদ্বৃত্ত দেশকে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বাড়িয়ে সমন্বয় করতে বাধ্য করা হয় না; বরং ঘাটতিতে থাকা দেশকেই তার অভ্যন্তরীণ ব্যবহার কমাতে বাধ্য করা হয়।

এতে বিশ্বে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও ভোগ কমে যায় এবং ঘাটতিতে থাকা দেশটির ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে তীব্র হয়। এটি অত্যন্ত অযৌক্তিক একটি ব্যবস্থা।

১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সময় এটি চালু করা হয়েছিল এবং এখনো টিকে আছে, কারণ পুঁজিবাদের অধীনে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর পরিবর্তে তা কমানোর প্রতিই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই অযৌক্তিক ব্যবস্থার কারণে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে বাণিজ্যনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

ডেইলি স্টার: খাদ্যের দাম, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আমদানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা গ্লোবাল সাউথজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আরও সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিপর্যয়গুলো থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?

প্রভাত পাটনায়েক: ঔপনিবেশিক সময়ের মতোই এখনো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো মূলত গ্লোবাল নর্থের জন্য প্রাথমিক পণ্য উৎপাদন করে। তবে একটি পার্থক্য রয়েছে—নিজেদের সরকারের বিপুল ভর্তুকির কারণে উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলো খাদ্যশস্য ও দুগ্ধজাত পণ্যের বড় উৎপাদক হয়ে উঠেছে। ফলে এখন দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর উত্তর থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করার এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিবর্তে অর্থকরী ফসল ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ার চাপ রয়েছে।

অন্য কথায়, দক্ষিণের দেশগুলোকে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক আফ্রিকান দেশ ইতোমধ্যেই করেছে। তবে এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা পরিত্যাগের ফলে এ দেশগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। গ্লোবাল নর্থের দেশগুলো যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে এসব দেশ দুর্ভিক্ষের মতো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপিত না হলেও অন্য যেকোনো বিপর্যয়ে তারা খাদ্যশস্যের মারাত্মক ঘাটতিতে পড়তে পারে।

খাদ্যশস্যের তুলনায় অর্থকরী ফসলের দাম অনেক বেশি ওঠানামা করে। যে বছর অর্থকরী ফসলের দাম ধসে পড়ে, সে বছর দেশটির খাদ্যশস্যের প্রয়োজন মেটানোর মতো ক্রয়ক্ষমতা থাকে না। আর কোনোভাবে নিজের দেশের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ আমদানি নিশ্চিত করলেও তা ওই দেশের জনগণের কেনার মতো ক্রয়ক্ষমতা থাকবে না।

এর ফলে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। যেগুলোকে অধ্যাপক অমিয় কুমার বাগচী যথার্থভাবেই ‘বিশ্বায়নের দুর্ভিক্ষ’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, বিশ্বায়নের ফলে যে উৎপাদন বিশেষায়ন ঘটে, সেগুলো থেকেই এসব দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি।

তাই বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নয়; দুর্ভিক্ষের মতো বিপর্যয় এড়ানোর প্রয়োজনও এর সঙ্গে জড়িত। আর এ কারণেই গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে।

কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ভারত সরকার খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত করতে নিজের দেশে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা পুরো ব্যবস্থাটিই ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কৃষকরা প্রায় বছরব্যাপী আন্দোলন চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটে। অন্য কথায়, কৃষকরাই চান তাদের নিজেদের দেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক।

ডেইলি স্টার: অনেকেই মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্তের কাছে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাস্তব অর্থে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্বরূপ কেমন হবে?

প্রভাত পাটনায়েক: অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মূল অর্থ হলো—একটি দেশের অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারিত হবে তার নিজের জনগণের ইচ্ছায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মসূচি থাকে এবং গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেওয়ার সময় জনগণ কার্যত বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলোর মধ্য থেকে একটিকে বেছে নেয়। কিন্তু নব্যউদারবাদ (নিউলিবারেলিজম) পুরো চিত্রটিই বদলে দিয়েছে।

এমন এক বিশ্বে, যেখানে অর্থব্যবস্থা বৈশ্বিক হলেও দেশ এখনো জাতিরাষ্ট্র হিসেবেই রয়েছে—সেখানে জনগণ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার ইচ্ছাই ওই দেশের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ করে।

পুঁজি বাইরে চলে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় সব রাজনৈতিক দল কমবেশি একই অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা অর্থব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি এই বাধা সত্ত্বেও ভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে কোনো দল নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর, বড় ধরনের পুঁজির বহির্গমনের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ঠেকাতে নিজেদের অবস্থান বা নীতি পরিবর্তন করে।

তাই গ্লোবাল সাউথের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের সবচেয়ে মৌলিক শর্ত হলো—অর্থ তথা পুঁজির বহির্গমনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। আগেই বলা হয়েছে, এই শর্তটিই একটি স্বাধীন উন্নয়ন কৌশলের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে।

সংক্ষেপে বললে, এ ধরনের কৌশলের মধ্যে থাকবে অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরতা, যার জন্য কৃষির উন্নয়ন করা; বেসরকারি খাতের ‘বিনিয়োগ অবরোধ’ মোকাবিলায় সরকারি খাতকে শক্তিশালী করা; অধিকারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিকেন্দ্রীকরণ করা, যাতে এমনকি গ্রাম পর্যায়ের সভায় সরাসরি নিজেদের অর্থনৈতিক জীবনে প্রভাব ফেলে এমন বিষয়ে মানুষ হস্তক্ষেপ করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ডেইলি স্টার: বাণিজ্যের ধরন পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের মধ্যেই আমরা এক ধরনের গভীর বৈশ্বিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি। আপনি কি মনে করেন, এই সময়টি গ্লোবাল সাউথকে ভিন্ন কোনো উন্নয়নপথ বা কৌশল অনুসরণের সত্যিকারের সুযোগ দিচ্ছে? যদি তাই হয়, তাহলে এই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কী করা উচিত?

প্রভাত পাটনায়েক: এটি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক পরিবর্তনের একটি সময়। তবে গ্লোবাল সাউথের ওপর শীর্ষস্থানীয় পুঁজিবাদী দেশ যেসব পরিবর্তন চাপিয়ে দিচ্ছে, তার ফল হলো পুনঃউপনিবেশায়নের দিকে যাওয়া।

এই প্রচেষ্টায় দুটি প্রধান অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রথম অস্ত্রটি হলো—গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ওপর অসম চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া, যার ফলে এসব দেশকে আরও বেশি মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হবে এবং এর মাধ্যমে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান বেকারত্ব তাদের অর্থনীতিতে আমদানি করতে হবে।

বর্তমানে আলোচনাধীন ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি এমন একটি উদাহরণ এবং নিঃসন্দেহে গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি করা হবে।

দ্বিতীয় অস্ত্রটি হলো—দক্ষিণের সম্পদ, বিশেষ করে তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

এর অর্থ হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক উপনিবেশমুক্তির পর যে অর্থনৈতিক উপনিবেশমুক্তি ঘটেছিল, তার উল্টো পথে যাওয়া। ওই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথ তার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছিল।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের পর দেশটির তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এই পুনঃউপনিবেশায়নের প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ। কেননা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় ভেনেজুয়েলায় তেলের মজুত সবচেয়ে বেশি।

আরেকটি উদাহরণ হলো—যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আগ্রাসনের মাধ্যমে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটিয়ে ইরানের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, যেটি অবশ্যই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিরল মৃত্তিকাসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাও একই কৌশলের অংশ।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরিকল্পনা সফল না হওয়া ‘শাসন পরিবর্তন’ প্রচেষ্টার পথে বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে—পরিকল্পনাটি বাতিল হয়ে গিয়েছে।

তাই বিকল্প অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করতে বাংলাদেশের মতো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে প্রথমেই এই পুনঃউপনিবেশায়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী করার সুযোগ বহাল চায় জামায়াত

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশ নেওয়ার সুযোগ বহাল রাখা, মন্ত্রী-এমপিদের নির্বাচনী প্রচারে নিষেধাজ্ঞাসহ একগুচ্ছ দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

আজ বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ দুই কমিশনারের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

এর আগে বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত জামায়াতের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইসির সঙ্গে এই বৈঠকে অংশ নেয়।

বৈঠক শেষে গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার প্রয়োজনে আমরা কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ইসির সঙ্গে মতবিনিময় করেছি।

বৈঠকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য করার যে প্রাথমিক সুপারিশের কথা উঠে এসেছে, তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে জামায়াত। 

ইসির সেই সুপারিশে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক যারা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা সরকারি বেতনের একটা অংশ পান, সেই শিক্ষকরা নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। 

এর বিপরীতে জামায়াতের যুক্তি, সংবিধানে বা জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি বা নির্বাচনের ব্যাপারে বিধিনিষেধ নেই। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের বাদ দেওয়াটা বৈষম্যমূলক।

গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুদীর্ঘ ইতিহাসে স্কুল-কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে থাকেন। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোন আলোচনা ছাড়াই এই রেকমেন্ডেশন সরকারকে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। 

দলটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক যেসব নিয়োগ দিয়েছে, তাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছে জামায়াত। দলটির মতে, এসব পদে থেকে সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনে অংশ নিলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে না এবং তা পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি করবে।

যেহেতু এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না, তাই সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীরা যেন কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা বা সভায় অংশ নিতে না পারেন, সে ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারির লিখিত দাবি জানিয়েছে দলটি।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে শামসুল আলমের নিয়োগের সমালোচনাও করেছে জামায়াত।

গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, তিনি বিএনপির একটি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা হওয়ায় এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তির নিয়োগ নির্বাচন নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা। তাই অবিলম্বে তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানানো হয়।

এছাড়া, রাজনীতি বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা কোনো রাজনৈতিক দলের পদে থাকা ব্যক্তিরা যেন কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়েছে দলটি।