25.7 C
Dhaka
Home Blog

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনার প্রত্যাশায় ইইউ

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আশা করছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম নতুন সরকারও অব্যাহত রাখবে।

আজ সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, আমরা প্রত্যাশা করছি বিচারিক সংস্কার বাস্তবায়ন হবে, কমার্শিয়াল কোর্ট গড়ে তোলা হবে এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা হবে।

তিনি বলেন, ইইউ-বাংলাদেশ সম্পর্কের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মিলার ও ঢাকায় নিযুক্ত ইইউভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এর আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

মিলার গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা এবং সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যাশা করছে ইইউ।

তিনি বলেন, ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু, সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ও বিনিয়োগকারী, সহায়তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নবনির্বাচিত সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশীদার।

তিনি বলেন, সংস্কার, বাণিজ্য, মানবিক বিষয়, অভিবাসনসহ ইইউ-বাংলাদেশ সম্পর্কের সব দিক নিয়েই আলোচনা হয়েছে।

ইইউ রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা আশা করি খুব শিগগিরই বাংলাদেশের সঙ্গে এই চুক্তি সই করার অবস্থানে যেতে পারব।

মিলার বলেন, অবশ্যই বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশ কি চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনতে পারবে?

দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত বিশাল প্রান্তর। যেখানে গাছপালা তো নেই-ই, এমনকি ঘাসের অস্তিত্বও খুঁজতে হয়। কয়েক ফুট উঁচু কাদামাটির বাঁধ এলাকাটিকে অসংখ্য ছোট ছোট ব্লকে ভাগ করে রেখেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ছোট-বড় অসংখ্য পুকুরের এক অন্তহীন জাল।

জোয়ারের সময় উপকূলীয় এ অঞ্চলের নদী-খাল কানায় কানায় পানিতে ভরে যায়। আবার ভাটায় সেই পানি ১০-১২ ফুট নেমে যায়। কিন্তু কাদামাটির বাঁধে ঘেরা ঘেরগুলোর ভেতরে আটকে থাকা পানি একই স্তরে আটকে থাকে। অর্থাৎ উপকূলীয় জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ সেখানে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, লবণাক্ত পানি আটকে রেখে বাণিজ্যিকভাবে বাগদা চিংড়ি চাষ হচ্ছে এসব ঘেরে।

এখন যে ২১ হাজার একর জুড়ে চিংড়ির ঘের, সেটিই একসময়ের কক্সবাজার জেলার চকরিয়া সুন্দরবন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এলাকাটি নানা দেশীয় প্রজাতিতে সমৃদ্ধ একটি প্যারাবন ছিল। এ বনের প্রধান প্রজাতিগুলোর মধ্যে ছিল সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, হেঁতাল, পশুর, ধুন্দল, হাওয়া, গোলপাতা প্রমুখ (বাংলাপিডিয়া ২০১২, ৩৩৩)। বনটি ছিল বাঘ, হরিণ, বুনো শূকর, বানরসহ নানা বন্যপ্রাণীর এক সমৃদ্ধ আবাসস্থল। চকরিয়া সুন্দরবনে মাছ ও প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো চিংড়িও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত।

কিন্তু, সেসব আজ অতীত। কেবলই স্মৃতি।

বর্ষায় পুরো চকরিয়া সুন্দরবন জুড়ে বাগদা চিংড়ি (ব্ল্যাক টাইগার) চাষ হয়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে এই ভূখণ্ড হয়ে ওঠে বিশাল এক লবণ মরুভূমি। যতদূর দৃষ্টি যায়, কেবল লবণের স্তূপ চোখে পড়ে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশক থেকেই চকরিয়া সুন্দরবন ও এর আশেপাশের এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে লবণ চাষ হচ্ছে। তারও আগে লবণ উৎপাদনের জ্বালানি হিসেবে এই বন থেকে ব্যাপক হারে সুন্দরী গাছ কেটে নেওয়া হতো।

চকরিয়া সুন্দরবন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন। একসময় এর বিস্তৃতি ছিল প্রায় ৪৫ হাজার একর জুড়ে। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৯০৩ সালে চকরিয়া রেঞ্জে ১৮ হাজার ৫০০ একরকে সংরক্ষিত বন এবং আরও ২ হাজার ৫২০ দশমিক ৪৫ একরকে রক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। এর ফলে ১৯০৩ সালের পর চকরিয়া সুন্দরবনের মোট ২১ হাজার ২০ দশমিক ৪৫ একর এলাকা বন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে আসে।

১৯২৯ সালে চকরিয়া সুন্দরবনের ৩ হাজার ৯১০ দশমিক ৪০ একর জায়গা বন বিভাগ থেকে অবমুক্ত করে ‘বদরখালী সমবায় কৃষি এবং উপনিবেশ সমিতি’র ২৬২টি ভূমিহীন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০।

এ অঞ্চলে মানুষের বসতি গড়ে ওঠার পর থেকেই চকরিয়া সুন্দরবনের গাছ কাটা শুরু হয়। তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে এসে এই বন যে ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে, তার নজির আগে ছিল না। ওই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে, বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণ ঘটে এবং এই বনভূমিকে সম্পূর্ণভাবে চিংড়ির ঘেরে পরিণত করা হয়।

বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সম্পৃক্ততার আগেই এ এলাকায় জবর-দখল শুরু হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে গিয়াসউদ্দিন নামে এক স্থানীয় প্রভাবশালী চিংড়ি চাষ, হাঁস পালন ও মাছ চাষের জন্য ৫৬৩ একর প্যারাবন ইজারা পান। পরে তিনি ইজারা নেওয়া জায়গার ম্যানগ্রোভ বন কেটে ফেলেন। মূলত, এ ঘটনার মধ্য দিয়েই চকরিয়ায় বন ধ্বংসের শুরু।

পরবর্তীকালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণকে আরও ত্বরান্বিত করে। মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে কক্সবাজারের চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ অঞ্চলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকার ও বিশ্বব্যাংকের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৮ সালে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয় চকরিয়া উপজেলার রামপুর মৌজায় ৫ হাজার একর জমি চিংড়ি চাষের জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে, ১৯৮২ সালে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয় আরও ২ হাজার একর এবং ১৯৮৭ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় ২১ দশমিক ৭৬ একর জমি মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে বরাদ্দ দেয়।’

মৎস্য অধিদপ্তর ১৯৭৮ সালে ৫ হাজার একর জমি ৩৯ জন চিংড়ি চাষিকে লিজ দেয়। এর ফলে ম্যানগ্রোভ উজাড় করে চকরিয়া সুন্দরবনকে বাণিজ্যিক চিংড়ির ঘেরে রূপান্তরের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগিয়ে যায়।

চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ অঞ্চলের কর্মকর্তারা এত বড় আকারের জমির ইজারা নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করতে না চাইলেও মাতামুহুরি নদীর ওপারে, চকরিয়া সুন্দরবনের উত্তরে অবস্থিত বদরখালী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের স্মৃতিতে এখনো সেই সময়ের কথা বিদ্যমান। তাদের ভাষ্য, ইজারা পাওয়া ব্যক্তিরা ছিলেন এলাকার বাইরের ধনী ও প্রভাবশালী মানুষ। তারা প্যারাবন পরিষ্কার করে সেখানে বাঁধ নির্মাণ করেন এবং জমিগুলোকে চিংড়ির ঘেরে পরিণত করেন।

জমির ইজারাপ্রাপ্তরা চিংড়ি চাষের জন্য প্যারাবন পরিষ্কার করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগান। বদরখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ সাদ্দালিয়া গ্রামের কৃষক নুরুল কাদের তাদেরই একজন।

কাদের জানান, মজুরির বিনিময়ে শ্রমিক হিসেবে তিনিও চকরিয়া সুন্দরবনের গাছ কাটার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। ইজারাপ্রাপ্তদের একেক জন ১৫০ একর করে জমি পেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি দেড় থেকে দুই বছর চকরিয়া প্যারাবনে গাছ কেটেছি। আমরা দা-কুড়াল দিয়ে গাছ কাটতাম। পরে সেগুলো রোদে শুকাতাম এবং পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিতাম। এভাবে একেকটি প্লট পুরোপুরি পরিষ্কার করতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেত।’

জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে (১৯৮৪–৮৫) সরকার বড় বড় প্লটগুলোর ইজারা বাতিল করে। এরপর বিশ্বব্যাংকের স্বল্পসুদে ঋণ প্রদানকারী শাখা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) আর্থিক সহায়তায় ১৯৭৮ সালে প্রথম দফায় মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা ৫ হাজার একর জমিতে উন্নত চিংড়ি চাষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এ সময় এ জমি ১০ একর করে ৪৬৮টি প্লটে ভাগ করে চিংড়ি চাষিদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়।

একই সময়ে এডিবির অর্থায়নে ২ হাজার একর জমিকে ১১ একর করে ১১৯টি প্লটে ভাগ করে চিংড়ি চাষিদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ অঞ্চলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, আরও ৪৮ একর জমিতে একটি প্রদর্শনী চিংড়ি খামার এবং বাকি জমিতে অবকাঠামো ও বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

সরকারিভাবে এসব চিংড়ির প্লট ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য বরাদ্দ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সুবিধাভোগীদের অনেকেই ছিলেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক একাই ৩০টি প্লট, অর্থাৎ মোট ৩০০ একর জমির ইজারা পায়। একসময়ের চকরিয়া সুন্দরবনের মাঝামাঝি জায়গায় এখনো দাঁড়িয়ে আছে গ্রামীণ ব্যাংকের চারতলা বৃত্তাকার ভবন। ভবনের গায়ে ঝুলছে ‘গ্রামীণ মৎস্য ফাউন্ডেশন’-এর সাইনবোর্ড, যা চকরিয়ার ম্যানগ্রোভ বন থেকে বাণিজ্যিক চিংড়ির ঘেরে রূপান্তরের এক স্থায়ী স্মারক হয়ে আছে।

তবে চকরিয়া সুন্দরবনের পুরো এলাকা মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বন বিভাগের ৭ হাজার একর জমি ডি-রিজার্ভ করে মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর ৬৪০ একর জমি ভূমিহীন কৃষক সমিতির কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ছাড়া, ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে আরও ৫৬৩ দশমিক ৮৪ একর জমি চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দেওয়া হয়।

তবে এসব বরাদ্দকৃত জমির সীমানা কখনোই সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। এই সুযোগে ইজারা দেওয়া জমির আশেপাশের বনভূমিও একের পর এক দখল হতে থাকে। বন বিভাগ সেই দখল ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। তাদের চোখের সামনেই ধাপে ধাপে বিলীন হয়ে যায় ঐতিহাসিক চকরিয়া সুন্দরবন।

এক সময়কার ২১ হাজার একরের চকরিয়া সুন্দরবনের মধ্যে বর্তমানে ৪ হাজার ২২৭ একর উপকূলীয় বন বিভাগের আওতাধীন। সেখানে নদীর তীর ও খালের ধারে এখনো কেওড়াসহ কিছু ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ টিকে আছে। কিন্তু, হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া বনের বাকি অংশ কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের আওতায় পড়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে বেদখল হয়ে গেছে। একসময়ের সেই বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রে এখন কার্যত কোনো প্রাকৃতিক বনজ উদ্ভিদ অবশিষ্ট নেই।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং তাদের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘চকরিয়া সুন্দরবন: যে বনে গাছ নেই’-এ উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণ জোরালোভাবে দেখায় যে, বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষই এই চকরিয়া সুন্দরবন ধ্বংসের প্রধান কারণ। যদিও শুরুতে বিশ্বব্যাংক এ দাবি অস্বীকার করেছিল।

ম্যানগ্রোভ বন বিশ্বের অন্যতম উৎপাদনশীল ও দুর্যোগ-সহনশীল বাস্তুতন্ত্র। এটি স্থল ও সমুদ্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সংযোগস্থল তৈরি করে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপকূলের জোয়ার-ভাটা অধ্যুষিত এলাকায় বেড়ে ওঠা এই বন উপকূলকে ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের আঘাত থেকে রক্ষার পাশাপাশি উপকূলীয় পলিমাটিকে স্থিতিশীল রাখে। ম্যানগ্রোভের জটিল শিকড়-জাল মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুক, পাখি এবং অসংখ্য জলজ ও স্থলজ প্রাণীর প্রজনন, বেড়ে ওঠা ও খাদ্য সংগ্রহের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। ফলে এই বন সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, উৎপাদনশীল মৎস্যসম্পদ ও উপকূলের লাখো মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

গাছের উচ্চতা, জটিল বনকাঠামো ও সমৃদ্ধ ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদবৈচিত্র্যের জন্য খ্যাত চকরিয়া সুন্দরবন একসময় বিশ্বের অন্যতম সেরা ম্যানগ্রোভ বন ছিল। খর্বাকৃতির অল্প কয়েকটি প্রজাতির ম্যানগ্রোভ বনের বিপরীতে চকরিয়া সুন্দরবন ছিল নানা প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের সমৃদ্ধ সমাবেশ। অনুকূল পরিবেশে এখানকার পরিণত গাছগুলো অস্বাভাবিক উচ্চতায় বেড়ে উঠত। এই অনন্য বাস্তুতান্ত্রিক সমৃদ্ধিই চকরিয়া সুন্দরবনকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় বনে পরিণত করেছিল।

এটি ছিল বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল, উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ, মৎস্যসম্পদের অন্যতম ভিত্তি এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন সঞ্চয়ের একটি প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। এই অসাধারণ বনের বিলুপ্তি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপকূলে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের আশায় বারবার ম্যানগ্রোভ বন উজাড় হয়েছে। এর ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঝুঁকির বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হারিয়ে গেছে। এর সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল রাতে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। ওই রাতে সৃষ্ট প্রবল জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করে এবং প্রায় দেড় লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।

এই বিপর্যয় স্পষ্ট করে দেয় যে, ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাস রুখতে ম্যানগ্রোভ বন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চকরিয়া সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বলয় হারিয়ে গেছে। ফলে আশপাশের এলাকাগুলো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত মোকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়েছে।

নুরুল কাদেরের মনে এখনো দগদগে সেই ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের রাতের স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘রাত ১০টার পরে বেড়িবাঁধ ভেঙে ঘরে পানি ঢুকতে থাকে। আমি, আমার বাবা-মা ও পরিবারের অন্য সবাই পানির তোড়ে ভেসে যাই। তখন আমার ছোট ভাই বাদলের বয়স মাত্র ৪ বছর। সে-ও পানিতে ভেসে যায়। পরে আমরা তার মরদেহ পাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘পানি প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত উপরে ওঠে। চকরিয়ায় আগের মতো সুন্দরবন থাকলে এতো মানুষ মারা যেত না, এতো ক্ষতিও হতো না। সুন্দরবন জলোচ্ছ্বাসের সব পানি হজম করে ফেলতো।’

চকরিয়ায় বন হারিয়ে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে নুরুল কাদের আরও বলেন, ‘চকরিয়া সুন্দরবন না থাকায় আমরা এখন অনেক বেশি অসহায়। আমাদের জীবিকাও হারিয়ে গেছে। আগে নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করতাম। এখন চিংড়ির ঘেরগুলো বহিরাগত ধনীদের দখলে। সেখানে আমাদের ঢোকারও অধিকার নেই। নদী-খালে দু-চারটা মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালাই।’

চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি?

চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের পক্ষে ক্রমেই ঐকমত্য গড়ে উঠছে। বহু বছর আগেই এই বনের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারানো বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরও এই বন ধ্বংস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আক্ষেপ প্রকাশ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনে করেন, পুরো ২১ হাজার একর এলাকাকে একটি একক, অবিচ্ছিন্ন বনভূমি হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত। একইসঙ্গে বিদ্যমান চিংড়ি ঘেরগুলোর ইজারা বাতিল করে পুরো এলাকাকে আইনগতভাবে বনভূমি ঘোষণা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

চকরিয়ায় কয়েক দশক ধরে লবণ উৎপাদন ও চিংড়ি চাষের কারণে মাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হলে নির্মিত বাঁধগুলো অপসারণ করতে হবে অথবা ভেঙে দিয়ে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। জোয়ারের পানি নিয়মিত প্রবেশ শুরু হলে ৪-৫ বছরের মধ্যে মাটির লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। এর ফলে ধীরে ধীরে জমি তার প্রাকৃতিক পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ফিরে পাবে। তখন ম্যানগ্রোভ প্রজাতি রোপণের মাধ্যমে বন পুনরুদ্ধার পরিবেশগতভাবে কার্যকর হয়ে উঠবে। এই পুনরুদ্ধারকালীন সময়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই বাস্তুতন্ত্র পুনর্জীবিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—চকরিয়া সুন্দরবন আদৌ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে কি? কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তর হলো ‘হ্যাঁ’। তবে এর জন্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট নীতি এবং তা বাস্তবায়নে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।

চিংড়ি চাষের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারের সফল উদাহরণ রয়েছে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে। এই দুই দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ম্যানগ্রোভ বনকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে গাছ লাগানো নয়, বরং উপকূলের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত সময়ে থাইল্যান্ড তার প্রায় অর্ধেক ম্যানগ্রোভ বন হারায়। মূলত বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের কারণেই বন কেটে ফেলা হয়। কিন্তু রোগের প্রাদুর্ভাব, এসিড সালফেটযুক্ত মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্টের কারণে অনেক চিংড়ির ঘের মাত্র ৫-১০ বছরের মধ্যেই অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়ে। এতে হাজারো হেক্টর জমিতে থাকা চিংড়ির ঘের পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখতে হয়।

থাইল্যান্ডে ফেলে রাখা চিংড়ি ঘেরের চারপাশের বাঁধ ভেঙে দিয়ে সেগুলোকে আবার জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ও পলি প্রবেশ করে ম্যানগ্রোভ পুনর্জন্মের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়। যেসব এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই ম্যানগ্রোভ পুনর্জন্মের সুযোগ ছিল, সেখানে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই কাজ করে। অন্যদিকে, যেখানে তা যথেষ্ট ছিল না, শুধু সেসব স্থানেই দেশীয় ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ লাগানো হয়।

কমিউনিটিভিত্তিক ইকোলজিক্যাল ম্যানগ্রোভ রিস্টোরেশন (সিবিইএমআর) পদ্ধতির মাধ্যমে দেশটির স্থানীয় জনগণ এই বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে আরও সুস্থ ও সমৃদ্ধ ম্যানগ্রোভ বন গড়ে ওঠে, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়, উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা জোরদার হয় এবং সামুদ্রিক নীল কার্বন সঞ্চয়ের সক্ষমতা বাড়ে।

একইভাবে, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ফিলিপাইনও ব্যাপক আকারে ম্যানগ্রোভ বন উজাড় করে সেখানে মাছ ও চিংড়ির ঘের তৈরি করে। পরে দেশটি পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরকারের সহায়ক নীতি ও স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে সমন্বয় করে ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।

থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে যে, ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত ওই এলাকার প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এরপর যেসব স্থানে প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে সেই স্বাভাবিক পুনর্জন্মের সুযোগ নিশ্চিত করা। নতুন গাছ লাগানো হতে পারে একটি সহায়ক উদ্যোগ, কিন্তু বন পুনরুদ্ধারের মূল কৌশল নয়।

অর্থাৎ, প্রকৃতিকে তার নিজস্ব নিয়মে বন পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে হবে। এতে ম্যানগ্রোভ বন নিজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জন্মাতে পারে এবং চিংড়ি চাষে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতি ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে পারে।

তবে চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে পাহাড়সম বাধা। বেশকিছু বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এর মধ্যে অন্যতম হলো, চিংড়ি চাষের জন্য অব্যাহত আন্তর্জাতিক সমর্থন, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের তরফে।

১৯৮০-এর দশকে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সঙ্গে প্রণীত ও বাস্তবায়িত বিশ্বব্যাংকের সাড়ে ২৬ মিলিয়ন ডলারের (তৎকালীন প্রায় ৪৫ কোটি টাকা) চিংড়ি চাষ প্রকল্প ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। ফলস্বরূপ বিশ্বব্যাংক তাদের চতুর্থ মৎস্য প্রকল্প থেকে চিংড়ি চাষ-সংক্রান্ত অংশটি বাদ দেয় বলে জানা যায়।

পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাংক তার নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। ২০১৮ সালে সংস্থাটি ২৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প অনুমোদন করে। উপকূলীয় ১৪টি জেলায় বাস্তবায়িত প্রকল্পটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেষ হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মে–জুন মাসের ইমপ্লিমেন্টেশন সাপোর্ট মিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির অর্থ ছাড়ের হার ছিল ৭৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। এই প্রকল্পের আওতায় ক্লাস্টারভিত্তিক চিংড়ি চাষ আরও সম্প্রসারণ করা হয়। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে আমরা চকরিয়া সুন্দরবনের রামপুর মৌজায় চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাঁধ, স্লুইসগেটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো দেখতে পেয়েছি।

চিংড়ি চাষে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক সহায়তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সংস্থাটি এখনো রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্পকে উৎসাহিত করে চলেছে। এটা সত্য যে, চিংড়ি বাংলাদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য এবং দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই নীতিগত অবস্থান বিবেচনায় বলা যায়, দীর্ঘদিন চিংড়ি চাষকে সমর্থন করে আসা বিশ্বব্যাংকের মতো একটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিবে বা সেই লক্ষ্যে কার্যকরভাবে উৎসাহিত করবে—এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মহেশখালী দ্বীপের দ্রুত শিল্পায়ন। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে সরকার ২০২৩ সালে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাতারবাড়ী আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করে। বঙ্গোপসাগরের কাছে কোহেলিয়া নদীর তীরে নির্মিত এই প্রকল্পের জন্য নদীর তীরবর্তী ম্যানগ্রোভ বন উজাড় করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য সংযোগ সড়ক ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হয়।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে গেছে। সেটা হলো, ৩০০ ফুট প্রশস্ত ও ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ মাতারবাড়ী পোর্ট অ্যাক্সেস রোডের (পূর্ব অংশ) নির্মাণকাজ। এই সড়কটি চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের ফাঁসিয়াখালীকে বদরখালী ইউনিয়নের রামপুর মৌজার সঙ্গে যুক্ত করবে। একসময়ের ঘন ম্যানগ্রোভ বনভূমির স্থল, নদী ও খালের ওপর এই সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশ সরকারের মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর অংশ) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি, জাপানের পাডেকো এবং বাংলাদেশের ডেভকনের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম প্রকল্পটির নকশা ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর একটি ছিল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মহেশখালী–মাতারবাড়ী এলাকাকে সিঙ্গাপুরের আদলে একটি বন্দর ও শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা। একই সময়ে জাপানও মাতারবাড়ীতে তাদের দ্বিতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ প্রকাশ করে।

বর্তমান সরকার যদি শেখ হাসিনা ও ড. ইউনূস সরকারের দেখানো পথ অনুসরণ করে, তাহলে চকরিয়া সুন্দরবনসহ মহেশখালী ও এর আশপাশের এলাকা ক্রমেই একটি আধুনিক বন্দর, শিল্প ও নগরকেন্দ্রে পরিণত হবে। সেক্ষেত্রে চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়বে।

চকরিয়া সুন্দরবন কারিগরি বিবেচনায় পুনরুদ্ধার সম্ভব। তবে সেটি বাস্তবে হবে কিনা, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের ওপর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পর্যায়ক্রমে চিংড়ি চাষ থেকে সরে আসা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পরিবেশগত পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে হারিয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বন আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। যদি রপ্তানিমুখী চিংড়ি চাষ ও শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকে, তাহলে একসময় দেশের অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের সুযোগ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে, সরকার ও বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি আমদানিকারক দেশগুলো যদি সত্যিই চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধার ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তরিক হয়, তাহলে প্রথমেই এ অঞ্চলের জোয়ার-ভাটানির্ভর প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। এরপর দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও পর্যাপ্ত অর্থায়নসমৃদ্ধ একটি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে হবে।

 

ফিলিপ গাইন: গবেষক ও পরিচালক, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড)।

ফাহমিদা রহমান: গবেষক, সেড।

আট হলুদ কার্ডের ম্যাচে কানাডাকে বিদায় করে কোয়ার্টারে মরক্কো

প্রথমার্ধে কানাডার গোছানো ফুটবলের কাছে সুবিধা করতে না পারলেও দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়িয়ে বড় জয় তুলে নিয়েছে গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। আজেদিন ওনাহির জোড়া গোলে সহ-আয়োজক কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিলো মরক্কো। 

এই জয়ের মাধ্যমে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপে অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার অনন্য নজির স্থাপন করলো মরক্কো। 

ফিফা র‍্যাংকিংয়ে সেরা দশে থাকা মরক্কো কাগজে-কলমে ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নেমেছিল। তবে প্রথমার্ধে ফেভারিট সুলভ খেলা খেলতে পারেনি তারা। বরং মাঠের পারফরম্যান্সে কানাডাই ছিলো এগিয়ে। ১২ মিনিটে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছিল কানাডার সামনে। কিন্তু তানি ওলুয়াসেয়ির জোরালো শট দারুণ দক্ষতায় ফেরান ইয়াসিন বোনো। 

শুরুর মিনিট বিশেক বলের দখলই না পাওয়া মরক্কো বড় ধাক্কা খায় ২২ মিনিটে। টুর্নামেন্টে গোলের সামনে দলটির সবচেয়ে বড় ভরসা ইসমাইল সাইবারি হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়ে মাঠ ছাড়েন। সাইবারির অনুপস্থিতিতে মরক্কোর আক্রমণ গতি হারায় আরও। কানাডার ডি-বক্সে মরক্কো প্রথম বল নিয়ে ঢুকতে পেরেছে ৪৪ তম মিনিটে! 

প্রথমার্ধ গোলের দেখা না মিললেও হলুদ কার্ডের কোনো কমতি ছিল না। পুরো ম্যাচে মোট আটবার কার্ড বের করতে হয়েছে রেফারি মাইকেল অলিভারকে। এর মধ্যে ৪০ মিনিট থেকে বিরতির বাঁশি বাজানো পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই পাঁচটি হলুদ কার্ড দেখেছে দুই দল। 

তবে বিরতি থেকে ফিরেই মরক্কো যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। ৫০ মিনিটে অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির শর্ট ফ্রি-কিকে বক্সের বাইরে বল পান ওনাহি। সেখান থেকে নিখুঁত নিচু শটে কানাডা গোলরক্ষককে পরাস্ত করে মরক্কোকে স্বস্তির গোল এনে দেন ওনাহি। গোলের পরপরই খেলার গতিপথ বদলে যায়। প্রথমার্ধে প্রায় বলই না পাওয়া মরক্কো খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। 

এই ম্যাচের আগে চার ম্যাচেই ৭৫ মিনিটের পরে গোলের দেখা পাওয়া কানাডা সমতায় ফেরার আশায় ছিল। তবে সেই আশা নষ্ট হয় ৮২ মিনিটে, সেই ওনাহির গোলেই। চোখের পলকে প্রতিআক্রমণে নিজেদের বক্স থেকে কানাডার বক্সে বল নিয়ে আসে মরক্কো। দুই ডিফেন্ডারের চাপ সামলে ব্রাহিম দিয়াজ বল বাড়ান ফাঁকায় দাঁড়ানো ওনাহিকে। অনেকটা আগের গোলের মতোই ঠাণ্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে কানাডার বিদায় প্রায় নিশ্চিত করে দেন ওনাহি। 

৮৭ মিনিটে গোলের দেখা পেতে পারতেন সাইবারির বদলি হিসেবে নামা সুফিয়ান রাহিমি। কিন্তু তার শুন্যে ভেসে নেয়া দারুণ হেড ক্রসবারে লেগে ফেরত এলে হতাশ হতে হয় রাহিমিকে। তবে ম্যাচ শেষে এই হতাশা থাকেনি তার। স্টপেজ টাইমের শেষ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে দারুণ বল বাড়ান দিয়াজ, সেটি থেকে গোল করতে ভুল করেননি রাহিমি। 

কোয়ার্টারে মরক্কোর প্রতিপক্ষ ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে ম্যাচের জয়ী দল। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরেই বিদায় নিতে হয়েছিল আফ্রিকান দেশটিকে। 

কৌতূহল জাগানো বাজেট ব্রিফকেসের আদ্যোপান্ত

বাজেট ঘোষণার দিন এলেই চিরচেনা কিছু দৃশ্য চোখে পড়ে। সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দেশের অর্থমন্ত্রী। তবে সব ছাপিয়ে মানুষের চোখ আটকে যায় অর্থমন্ত্রীর হাতে থাকা একটি জিনিসের ওপর—ব্রিফকেস।

কৌতূহল জাগতে পারে, এই ব্রিফকেসের ভেতর কি লাখ লাখ কোটি টাকা ভরা থাকে? ব্যাপারটা কিন্তু একদমই তা না। যত টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়, সেগুলো যদি নোট আকারে নিতে হতো, তবে অর্থমন্ত্রীকে বড় ট্রাক নিয়ে সংসদে যেতে হতো।

মূলত ওই ব্রিফকেসে থাকে একটি ছাপানো বক্তৃতা আর দেশের কোটি কোটি টাকা আয়-ব্যয়ের বিশাল এক পরিকল্পনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্থমন্ত্রীরা কেন এই ব্রিফকেস বয়ে বেড়ান? এই রীতির শুরুই বা কোত্থেকে? 

অর্থমন্ত্রীদের এই ব্রিফকেসের পেছনে আছে মজার ইতিহাস।

মানিব্যাগে যখন আর ধরছিল না

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা আকবর আলি খানের ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ বইয়ে এই ব্রিফকেসের গল্পের উল্লেখ আছে।  

আধুনিক বাজেট ব্যবস্থার সূচনা মূলত স্যার রবার্ট ওয়ালপুলের হাত ধরে হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ১৭২৫ থেকে ১৭৪২ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রীর (চ্যান্সেলর অব দি এক্সচেকার) দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পরে তিনি দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রীও হন। 

বাজেট ঘোষণার আগে বিভিন্ন মহল থেকে কর বাড়ানো বা কমানোর অজস্র অনুরোধ আর পরামর্শের চিরকুট আসত ওয়ালপুলের কাছে। তিনি সেসব চিরকুট নিজের ব্যুজেট বা মানিব্যাগে জমিয়ে রাখতেন। পরে বাজেট তৈরির সময় ওই চিরকুটগুলোই হতো তার মূল ভরসা। 

অর্থবছর শেষের দিকে যখন সরকারের আর্থিক পরিকল্পনার প্রস্তুতি শুরু হতো, তখন ওয়ালপুল ওই থলি থেকে চিরকুটগুলো বের করে পরিকল্পনা করতেন। এই অভ্যাসটি থেকেই মূলত ‘বাজেট ব্রিফকেস’-এর আদি ধারণার জন্ম।

পরবর্তীতে শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের অর্থনীতি যখন বড় হতে শুরু করল, তখন অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবের কাগজপত্রের বহরও গেল বেড়ে। অগত্যা মানিব্যাগের জায়গা দখল করল এই ব্রিফকেস। 

এরপর ১৮৬০ সালে ব্রিটেনের বাজেটপ্রধান উইলিয়াম ই. গ্ল্যাডস্টোন সোনা দিয়ে রানির মুখের আদল খোদাই করা একটি লাল স্যুটকেসে করে বাজেটের নথি নিয়ে আসেন। 

ওই স্যুটকেস বহু বছর ধরে ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রীরা ব্যবহার করেছেন।

‘বাজেট’ মানে চামড়ার থলি

‘বাজেট’ মূলত একটি ইংরেজি শব্দ, যার কোনো গ্রহণযোগ্য প্রতিশব্দ বাংলায় নেই। ফলে বাংলাদেশের সরকারি দাপ্তরিক কাজে এই ইংরেজি শব্দটিই ব্যবহার করা হয়। 

বাংলা একাডেমির ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ অনুযায়ী, ১৯০২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় প্রথম ‘বাজেট’ শব্দটি পাওয়া যায়।

তবে এই ইংরেজি ‘বাজেট’ শব্দটি এসেছে পুরোনো ফরাসি শব্দ ‘ব্যুজেট’ থেকে। এর অর্থ হলো ‘থলি’ বা ‘মানিব্যাগ’।

অষ্টাদশ শতকে যুক্তরাজ্যে থলিতে ভরে দেশের আয়-ব্যয়ের হিসাব আইনসভায় আনা হতো। তখন থেকেই এই হিসাব-নিকাশের নাম হয় ‘বাজেট’।

আবার অক্সফোর্ড ডিকশনারি বলছে ভিন্ন কথা। ষোড়শ শতাব্দীতে নাকি ‘কারও বাজেট খোলা’ মানে বোঝানো হতো—গোপন বা সন্দেহজনক কিছু প্রকাশ করা। 

লাল, কালো নাকি মেরুন রঙের ব্রিফকেস?

১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল। কলকাতায় এই উপমহাদেশে প্রথম বাজেট পেশ করেন ব্রিটিশ সরকারের জেমস উইলসন।

সেই থেকে শুরু করে ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের হাত হয়ে আজ পর্যন্ত এই ব্রিফকেসের ঐতিহ্য টিকে আছে। 

আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি বাজেট পেশ করা দুই সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবং আবুল মাল আবদুল মুহিতকেও প্রতিবারই ব্রিফকেস হাতে সংসদে ঢুকতে দেখা গেছে। দুজনই ১২ বার করে বাজেট পেশ করেছেন।

তবে প্রথা অনুযায়ী এই ব্রিফকেস ‘লাল’ রঙের হওয়ার কথা থাকলেও অর্থমন্ত্রীরা মাঝেমধ্যেই ফ্যাশন সচেতন হয়ে ওঠেন। কখনো কালো বা মেরুন—নানা রঙের ব্রিফকেস দেখা গেছে তাদের হাতে। যেমন প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিতকে মেরুন ও কালো রঙের ব্রিফকেস ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

সবকিছুর পেছনে ‘গোপনীয়তা’

এই ব্রিফকেস ব্যবহারের সবচেয়ে বড় কারণ ‘গোপনীয়তা’। বাজেটে কোন জিনিসের দাম কমবে আর বাড়বে, তা গোপন রাখা দরকার। কারণ ব্যবসায়ীরা আগেভাগে জেনে গেলে রাতারাতি মজুতদারি করতে পারেন। 

ফলে এই গোপনীয়তা রক্ষা করা যেকোনো অর্থমন্ত্রীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যে অর্থমন্ত্রী এই গোপনীয়তা ধরে রাখতে পারেন না, বলা হয় তার পদে থাকারই যোগ্যতা নেই।

গোপনীয়তা ভঙ্গের গল্প

বাজেট তথ্য ফাঁসের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৪৭ সালে। লন্ডনের স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ও তৎকালীন ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী হিউ ডাল্টন যখন বাজেটের কাগজপত্র নিয়ে পার্লামেন্টে ঢুকছিলেন, তখন সাংবাদিকরা তাকে আসন্ন কর ব্যবস্থা নিয়ে কিছু প্রশ্ন করেন।

ডাল্টন অসাবধানতাবশত কিছু প্রস্তাবের খুঁটিনাটি ফাঁস করেন। সেই তথ্য সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনের মাধ্যমে পত্রিকার অফিসে পৌঁছে যায়। কিছু পত্রিকা সেই খবর দিয়ে বিশেষ সংখ্যাও প্রকাশ করে ফেলে।

ডাল্টন যখন পার্লামেন্টে তার বাজেট বক্তৃতা দেওয়া শুরু করলেন, ততক্ষণে সেই পত্রিকার কপিগুলো সংসদ সদস্যদের হাতে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই নতুন করের তথ্য পুরোপুরি জনসমক্ষে চলে আসে।

বিরোধী দলের রাজনীতিকরা সরকারের বিরুদ্ধে বাজেট ফাঁসের অভিযোগ তোলেন। ডাল্টন নিজের ভুলের দায় স্বীকার করে নিয়ে এর কিছুদিন পরই পদত্যাগ করেন।

ব্রিফকেস প্রথা ভাঙার গল্প

১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রীরা সংসদে যাওয়ার আগে ১১ ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে বাজেটের স্যুটকেস হাতে নিয়ে ছবি তোলার পোজ দিতেন। ব্রিটেনের এই সংসদীয় ঐতিহ্য পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে তাদের একসময়কার উপনিবেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। 

তবে ২০১৯ সালে এই ঐতিহ্যে পরিবর্তন আনেন ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন। তিনি ব্রিফকেসের বদলে লাল কাপড়ে মোড়ানো ‘বহি-খাতা’ নিয়ে আসেন। এটি এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় হিসাবের খাতা। তার এই পদক্ষেপকে ঔপনিবেশিক প্রতীকী ভাবধারা থেকে বেরিয়ে আসার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হয়।

পরবর্তীতে ২০২১ সালে নির্মলা সীতারমন লাল মোড়কে মোড়ানো একটি ‘ট্যাবলেট’ বা ট্যাব নিয়ে সংসদে ঢোকেন। সেবার কোনো কাগজপত্র ছাড়াই ট্যাব দেখে ডিজিটাল বাজেট বক্তৃতা পাঠ করেন তিনি।

তবে ট্যাবলেট আসুক বা ল্যাপটপ, আমাদের দেশে অর্থমন্ত্রীদের চিরচেনা সেই ব্রিফকেস হাতে পোজ দেওয়ার দৃশ্যটির আবেদন আজও কমেনি। যদিও সরকারের ভেতরের বাস্তব চিত্রটা এখন বদলে গেছে। আধুনিক বাজেট এখন সম্পূর্ণ ডিজিটালি তৈরি হয়। ব্রিফকেসটি এখন কেবলই একটি প্রতীক।

 

নারায়ণগঞ্জে বিএনপি নেতাকে যুবদল নেতার সমর্থকদের মারধর

নারায়ণগঞ্জে এক বিএনপি নেতাকে মারধর করেছেন যুবদল নেতার অনুসারীরা। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা পরিষদের ভেতর এক অনুষ্ঠানে তর্কের জেরে এ মারধরের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।

আহত অকিল উদ্দিন ভূইয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তার অভিযোগ, জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনির সঙ্গে তর্কের জেরে তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠান চলছিল জেলা পরিষদে। এ সময় বিগত দিনে দলীয় কর্মসূচি ও আন্দোলনে ভূমিকা নিয়ে মশিউর রহমান রনি ও অকিল উদ্দিন ভূইয়ার তর্ক হয়। সেসময় একপর্যায়ে জেলা পরিষদ প্রশাসক ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সামনেই অকিলকে মারতে যান রনির সমর্থকরা। তখন বিষয়টি সেখানে মিটিয়ে দেওয়া হয়।

বিএনপি নেতা অকিল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সিনিয়র নেতারা সেখানেই বিষয়টি মিটিয়ে দিয়েছিলেন। আমি আর রনি একসঙ্গেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসি। কিন্তু মূল ভবনের গেট পার হওয়ার পর আমার ওপর রনির লোকজন হামলা চালায়।’

মারধরের বিষয়টি তিনি দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের জানিয়েছেন এবং তারা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আপাতত তিনি আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে জানান।

যোগাযোগ করা হলে যুবদল নেতা মশিউর রহমান রনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিষয়টি একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। মারধরের ঘটনায় আমার কিছু অনুসারী জড়িত আছেন। কিন্তু এতে আমার কোনো নির্দেশনা ছিল না। তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় ঘটনাটি ঘটে গেছে। আমি অতি উৎসাহী এই কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছি।’

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘প্রেশার কুকার’

লন্ডন বেঙ্গলি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের নবম আসরে দেখানো হয়েছে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমা। আন্তর্জাতিক এই আসরে সিনেমাটির ইউকে প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়েছে বুধবার রাত ৮টায়।

নির্মাতা রায়হান রাফী গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান।

উৎসব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভিন্নধর্মী গল্প, নির্মাণশৈলী এবং সমসাময়িক উপস্থাপনার কারণে প্রেশার কুকারকে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে দেখানোর জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।

লন্ডন বেঙ্গলি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালকে বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মনে করা হয়।

এদিকে চলতি সপ্তাহে সিনেমাটি অস্ট্রেলিয়ায় মুক্তি পেয়েছে। আগামী সপ্তাহে নর্থ আমেরিকাসহ আরও কয়েকটি দেশে মুক্তির পরিকল্পনা আছে বলে নির্মাতা সূত্রে জানা গেছে।

সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি, শবনম বুবলি, স্নিগ্ধা চৌধুরী, মারিয়া শান্ত, ফজলুর রহমান বাবু, চঞ্চল চৌধুরীসহ অনেকে।

মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট বাতিল-বিলম্ব, কতদিন চলবে ভোগান্তি

ইরানে গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক দেশ তাদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়ায় বিভিন্ন দেশে আটকা পড়েছেন হাজারো যাত্রী। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোতেও।

বার্তাসংস্থা এপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব ও যাত্রীদের ভোগান্তির খবর।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংস্থা ‘ফ্লাইটরাডার-২৪’ এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত সাতটি বিমানবন্দরে ৩ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

যেসব বিমানবন্দর বন্ধ

মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো হলে—দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শারজাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল আল মাকতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

এসব বিমানবন্দর কবে নাগাদ চালু হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিভিন্ন এয়ারলাইনস কোথায়-কতদিন পর্যন্ত কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে তার তথ্য দিয়েছে।

এমিরেটস এয়ারলাইনস জানিয়েছে, সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সময় বিকেল ৩টা পর্যন্ত দুবাই এয়ারপোর্ট দিয়ে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত থাকবে।

কাতার এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, আকাশসীমা নিরাপদ হলেই কার্যক্রম শুরু করবে তারা। দোহার সময় সোমবার সকাল ৯টার মধ্যে আপডেট তথ্য দেবে তারা।

ইত্তেহাদ এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সময় রাত ২টা পর্যন্ত আবুধাবিতে ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।

এয়ারলাইনসগুলো যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে অনলাইনে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে।

যেসব বিমানবন্দরে হামলা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার বিপরীতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত দুই দেশে তিনটি বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, শনিবার ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের দুটি বিমানবন্দর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এর মধ্যে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারজন আহত হয়েছেন।

আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা হয়েছে। এতে কয়েকজন কিছুটা আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

আকাশসীমা বন্ধ যেসব দেশে

পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ৭টি দেশের আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতও অস্থায়ী ও আংশিক আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা দেয়। তবে দেশটির ওপর দিয়ে বিমান চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে।

আকাশসীমা বন্ধের পর এসব দেশ থেকে বহু ফ্লাইট মাঝপথে ঘুরিয়ে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করানো হয়।

কতদিন চলবে ভোগান্তি

বিমান চলাচল বিশ্লেষক ও অ্যাটমোসফিয়ার রিসার্চ গ্রুপের প্রেসিডেন্ট হেনরি হার্টেভেল্ট এপিকে বলেন, ‘পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

যাত্রীদের আগামী কয়েক দিন ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে অনেক বিমান এখন সৌদি আরবের দক্ষিণ দিক দিয়ে ঘুরে চলাচল করছে, ফলে যাত্রার সময় ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। এতে বিমান ভাড়াও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা জানান, সামরিক কার্যক্রমের ঝুঁকি কমলে আগামী ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে কিছু দেশ ধাপে ধাপে আকাশসীমা খুলে দিতে পারে।

তবে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

বিশ্বজুড়ে প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে অন্যান্য দেশেও।

বিমান চলাচল বিষয়ক সংস্থা ‘ফ্লাইটঅ্যাওয়ার’ জানিয়েছে, শনিবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ১৮ হাজারের বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে এবং বাতিল করা হয়েছে ২ হাজার ৩৫০টির বেশি।

ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন দ্বীপ বালির বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যগামী অন্তত ১ হাজার ৬০০ পর্যটকের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট হাব দুবাই, আবুধাবি ও দোহা বিমানবন্দর বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

বিমান চলাচল বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এই তিন হাব দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে আরও বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিতে পারে এবং যাত্রীদের বিকল্প পথ ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হতে পারে।

১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন ডেকেছেন রাষ্ট্রপতি

আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ডেকেছেন রাষ্ট্রপতি।

আজ সোমবার জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ অধিশাখা-১ এর পরিচালক (উপসচিব) মো. এমাদুল হকের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৬ সালের ১২ মার্চ, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেন রাষ্ট্রপতি। 

কেন মানুষ গুজব ছড়ায়?

গত ১৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন অধ্যাপকের সোশ্যাল মিডিয়ায় করা পোস্টের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়ে পড়ে, যেখানে তিনি দুই বছর আগে হওয়া জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত ছবি, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন শিক্ষার্থীর রক্তমাখা মুখ দেখা যায়, সেটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ড দেখে ক্যাপশনে লেখেন শিক্ষার্থীটি বড় ভাইয়ের কথা শুনে মুখে টমেটো সস মেখে এসেছিলেন। ক্যাপশনের শেষে তিনি জুড়ে দেন, ‘এও কি সত্যি?’ প্রশ্ন।

এখানে সরাসরি গুজব না ছড়ালেও তিনি খানিকটা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, যাতে গুজব ছড়ানোর সম্পূর্ণ দায়টা নিজের ঘাড়ের ওপর না পড়ে। প্রোপাগান্ডা বা গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ক্লাসিক উপায় হিসেবে বহুদিন ধরেই ব্যবহার হয়ে এসেছে এটি।

পোস্টটির নিচে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, কীভাবে একজন শিক্ষিত মানুষ, বিশেষ করে যে বিভাগের কাজই হলো তথ্য যাচাই করা, ফ্যাক্ট-চেক করার মতো প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের তৈরি করা, সে বিভাগেরই একজন শিক্ষক কীভাবে এ ধরনের কাজ করতে পারেন, যখন তিনি খুব সহজেই তথ্যটির সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারতেন। অনেকেই মনে করেন, তথ্য যাচাই করার দক্ষতাই মানুষকে গুজব থেকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু আসলেই কি তা-ই? তথ্য যাচাই করার দক্ষতা থাকলে কি মানুষ গুজব ছড়ায় না? মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা।

এই প্রবণতাকে সবচেয়ে সহজে যে শব্দবন্ধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় তা হলো: মোটিভেটেড রিজনিং। ১৯৯০ সালে জিভা কুন্দা তার বিখ্যাত ‘দ্য কেস ফর মোটিভেটেড রিজনিং’ নিবন্ধে তুলে ধরেন মানুষ মূলত দুইভাবে তথ্য গ্রহণ করতে পারে। প্রথমটি হলো অ্যাকুরেসি-মোটিভেটেড রিজনিং, যেখানে উদ্দেশ্য হলো সঠিক তথ্য কী সেটা খুঁজে বের করা। দ্বিতীয়টি হলো ডিরেকশনাল বা গোল-মোটিভেটেড রিজনিং, যেখানে ব্যক্তি তথ্যের সত্যতা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। এখানে উদ্দেশ্য থাকে: তথ্যটি তার ইতোমধ্যেই গড়ে ওঠা মত-বিশ্বাস-ভাবাদর্শের সঙ্গে মেলানো এবং সে অনুযায়ী উপসংহারে পৌঁছানো।

ধরা যাক, কোনো তথ্য তার বিশ্বাসের সঙ্গে খুব সহজেই মিলে যাচ্ছে, তখন তিনি খুব সহজেই সেটিকে বিশ্বাস করেন, সেটাকে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই। আবার, যখন কোনো তথ্য তার বিশ্বাস বা ভাবাদর্শের সঙ্গে না মেলে, তখন তিনি নানাভাবে এই তথ্যের খুঁত বের করার চেষ্টা করেন: কে এটি লিখেছে, তার উদ্দেশ্য কী, তিনি কোন রাজনৈতিক দল বা মতবাদে বিশ্বাসী, এই লেখার মূল সোর্স কী, ডেটাতে কোনো ভুল আছে কি না, কারা এই লেখা প্রকাশ করেছে—এমন নানা বিষয়।

যেমন: ওই পোস্টের কমেন্টেই অনেক মন্তব্যকারি প্রশ্ন করেছেন—কেন শিক্ষার্থীটির চশমা ভাঙলো না, কেন মুখে ক্ষত তৈরি হলো না, অথবা রক্ত গড়িয়ে কেন কাপড়ে লাগলো না। এরপর যখন শিক্ষার্থীটি তার সেলাই করা ক্ষতস্থানের ছবি শেয়ার করলো, তার নিচেই আবার অনেকে মন্তব্য করেছেন—কয়েকটি ছবিতে মুখের ডানপাশে আঘাত আবার কয়েকটি ছবিতে মুখের বামপাশে আঘাতের চিহ্ন কেন? অর্থাৎ, যতই আপনার সামনে প্রমাণ নিয়ে আসা হোক না কেন, আপনি ঠিক সেই তথ্যটিই গ্রহণ করবেন, যেটি আপনার ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত মতামতের পক্ষে যায়, এর বিপক্ষের বিষয়টি নয়।

এর ১৬ বছর পর ইয়েল ল’ স্কুলের গবেষক ড্যান কাহান তার কালচারাল কগনিশন প্রজেক্টে এই মোটিভেটেড রিজনিংয়ের গবেষণাকে আরও এক ধাপ সামনে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি আইডেন্টিটি-প্রোটেক্টিভ কগনিশন বলে আরেকটু নতুন ধারণা সামনে নিয়ে আসেন। তিনি দেখতে পান, মানুষ সাধারণত এমন তথ্যই শেয়ার করে যা তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বা বিভিন্ন ইস্যুতে নিজস্ব অবস্থানকে শক্ত করে। অর্থাৎ, এখানে তথ্যের সত্যতা মূল বিষয় নয়; তথ্য শেয়ার করে মূলত তিনি তার মতাদর্শকেই জানান দেন এবং নিজের আইডেন্টিটি বা পরিচয়কে সুরক্ষা দেন। যে তথ্য তার রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তিনি কখনোই সেটি গ্রহণ করবেন না, সেটি যতই সত্যি হোক না কেন। কারণ এই তথ্য তার বিশ্বাস এবং সর্বোপরি তার পরিচয়ের ওপরই আঘাত হানে।

কাহান এটিও দেখতে পান যে, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি, অর্থাৎ যারা ‘স্মার্ট’, তাদের মধ্যে মোটিভেটেড রিজনিং করার সামর্থ্যও বেশি। তখন তারা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত হাজির করে খুব দ্রুত এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হন, যেটা সরাসরি তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে মিলে যায়। আবার তারা একইভাবে তাদের মতাদর্শের বিরুদ্ধে যায়, এমন তথ্যও খুব দ্রুত ছুঁড়ে ফেলে দেন। এর কারণ হলো: ভুল তথ্য বিশ্বাস করা বা ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে ব্যক্তিগতভাবে তার খুব একটা ক্ষতি হয় না, কিন্তু তার পরিচয় বা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায় এমন তথ্য মেনে নেওয়া তার পুরো অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ফলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তথ্যের সত্যতা খোঁজার চেয়ে নিজের পরিচয় আর বিশ্বাসকেই সুরক্ষা দেওয়ার দিকে ঝোঁকে এবং গুজব বা ভুল তথ্য ছড়ায়।

ফলে মিডিয়া লিটারেসি বাড়ালেই যে মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাই-বাছাই করার প্রবণতা বাড়বে, এমন প্রচলিত ধারণা আসলে বাস্তবে কাজ করে না। মানুষ সেটাই গ্রহণ করে, যেটা তার মতের পক্ষে যায়। মিডিয়া লিটারেসি সম্পর্কিত প্রশিক্ষণগুলোতেও দেখা গেছে যে, প্রশিক্ষণের সময় মানুষ হয়তো ঠিকই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারে এবং এর মাধ্যমে তথ্য যাচাই করার দক্ষতাও বাড়ে, কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায়, দৈনন্দিন জীবনে ব্যক্তি কখনোই এটি প্র্যাকটিস করে না। সে ফিরে যায় তার মতাদর্শ-বিশ্বাসনির্ভর তথ্য গ্রহণের দিকেই।

ভুল তথ্য মোকাবিলার আরেকটা খুব প্রচলিত উপায় হলো ফ্যাক্ট-চেকিং। গবেষণা বলছে, ফ্যাক্ট-চেকিং রিপোর্ট দেখার পর মানুষ সাময়িকভাবে ওই নির্দিষ্ট ভুল তথ্যটি বিশ্বাস করা বন্ধ করে ঠিকই। কিন্তু এর প্রভাব খুব একটা স্থায়ী হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর মানুষ আবার সেই পুরোনো ভুল বিশ্বাসেই ফিরে যায়। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রায় কাজই করে না। কারণ মানুষ তখন তথ্যের চেয়ে তার দলীয় পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়।

২০১০ সালে ওয়েপন্স অব ম্যাস ডেস্ট্রাকশনের ওপর ভিত্তি করে করা গবেষণায় ব্রেন্ডান নাইহান এবং জেসন রাইফলার এই প্রবণতার নাম দিয়েছেন ‘ব্যাকফায়ার ইফেক্ট’। এখানে মানুষ ফ্যাক্ট-চেকিং রিপোর্ট দেখার পর সেই ভুল বিশ্বাসকে আরও বেশি বিশ্বাস করে। কারণ এটা তার পরিচয়কে হুমকির মুখে ফেলে দেয় এবং নিজের পরিচয়কে আঁকড়ে ধরার জন্য এই কাজ করে। তবে পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, এই ব্যাকফায়ার ইফেক্ট বাস্তবে খুব কমই দেখা যায়। অর্থাৎ, ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের প্রভাব থাকলেও তা সীমিত পর্যায়ের।

তবে এর সমাধান কী হতে পারে? বর্তমানে যে বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো প্রিবাঙ্কিং। কোনো ভুল তথ্য ছড়ানোর আগেই মানুষকে সে ধরনের মিথ্যা যুক্তির কৌশল সম্পর্কে সচেতন করে দেওয়া। মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম ম্যাকগুয়ারের ‘ইনওকুলেশন তত্ত্ব’ অনুযায়ী, মানুষকে যদি আগেভাগেই জানানো যায় যে অমুক ধরনের তথ্যের মাধ্যমে তাকে ম্যানিপুলেট করা হতে পারে, তবে তারা পরে সেই আসল ভুল তথ্যের মুখোমুখি হলে তা সহজে বিশ্বাস করে না। এর প্রভাব ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের চেয়ে বেশি স্থায়ী হয়। এটি হয়তো সব সমস্যার সমাধান নয়, কিন্তু বর্তমানে যে পদ্ধতিগুলো আছে তার মধ্যে এটি অন্যতম কার্যকর।

আরেকটি উপায় হলো: বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে সরাসরি এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফলে ক্রমেই বাড়তে থাকা মেরুকরণের প্রভাব কিছুটা কমে আসে। বিপক্ষ মতাদর্শের ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার ফলে গ্রুপ-আইডেন্টিটি রক্ষা করার বদলে সঠিক তথ্য খুঁজে বের করা এবং আপস করাই তখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

উসামা রাফিদ: প্রভাষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব)

১২০ মিনিটের নাটকীয় লড়াইয়ে কেপ ভার্দের বাধা পেরোলো আর্জেন্টিনা

নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে দুই দফা পিছিয়ে পড়লেও একটুও হাল ছাড়ল না কেপ ভার্দে। ঘুরে দাঁড়িয়ে এবারের বিশ্বকাপের নবাগত দলটি আরও একবার চমক দেখিয়ে ঘাম ছাড়িয়ে ছাড়ল আর্জেন্টিনার। তবে শেষ পর্যন্ত চরম বাধা অতিক্রম করে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ল বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা— আত্মঘাতী গোলের কল্যাণে।

শনিবার সকালে মায়ামিতে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো শেষ বত্রিশের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে কেপ ভার্দেকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। এর আগে নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হয় ১-১ সমতায়।

প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে মহাতারকা লিওনেল মেসির গোলে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে দেরয় দুয়ার্তের লক্ষ্যভেদে সমতা টানে কেপ ভার্দে। এরপর অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের শুরুতেই লিসান্দ্রো মার্তিনেজের কল্যাণে আর্জেন্টিনা ফের লিড নেওয়ার পর শেষদিকে স্কোরলাইন ২-২ করেন সিডনি লোপেস কাবরাল। খেলা যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, তখন ম্যাচের ১১১তম মিনিটে ডিনি বোর্জেসের আত্মঘাতী গোল গড়ে দেয় ব্যবধান।

এই জয়ে আসরের শেষ ষোলোতে নাম লিখিয়েছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা, যেখানে তাদের অপেক্ষায় আছে মিশর। অন্যদিকে, বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও প্রতিপক্ষের সমীহ ও ফুটবলপ্রেমীদের কাছ থেকে মর্যাদা— দুটিই আদায় করে নিয়েছে কেপ ভার্দে। এর আগে গ্রুপ পর্বে তারা ছিল অপরাজিত। তিনটি ম্যাচই ড্র করেছিল যথাক্রমে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গে।

গোটা ম্যাচে ৬৪ শতাংশ সময় বল দখলে রাখা আর্জেন্টিনা গোলমুখে ২২টি শট নিয়ে লক্ষ্য রাখে ১০টি। বিপরীতে, গোলপোস্টে কেপ ভার্দের ১৬টি শটের পাঁচটি ছিল লক্ষ্যে।

বেশ ঢিমেতালে শুরু হওয়া ম্যাচের ১৫তম মিনিটে প্রথমবারের মতো কোনো দল গোলমুখে শট নেয়। ডি-বক্সের বামদিক থেকে নেওয়া ৩৯ বছর বয়সী মেসির নেওয়া কোণাকুণি শট চলে যায় পোস্টের বাইরে দিয়ে। তিন মিনিট পর ফ্রি-কিক থেকে সুযোগ আসে আর্জেন্টিনার সামনে। তবে মেসির দূরপাল্লার শট আটকাতে কোনো বেগ পেতে হয়নি গোলরক্ষক ভোজিনিয়াকে।

মেসির আরেকটি গোলে অবশেষে অচলাবস্থা ভাঙে ২৯তম মিনিটে। সেন্টার ব্যাক লিসান্দ্রো মাঝমাঠের সামনে থেকে উঁচু করে অসাধারণ একটি নিখুঁত পাস বাড়ান কেপ ভার্দের ডি-বক্সে। বল মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আলতো ও চোখ ধাঁধানো স্পর্শে বল নিয়ন্ত্রণে নেন মেসি। এরপর চিরাচরিত বাম পায়ের শটে ভোজিনিয়াকে পরাস্ত করে বল পাঠিয়ে দেন জালে।

বিশ্বকাপে রেকর্ড ৩০তম ম্যাচ খেলতে নামা আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসির এবারের আসরে এটি সপ্তম গোল, যিনি আছেন গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষে। সব মিলিয়ে ফুটবলের মহাযজ্ঞে তার গোল হলো ২০টি। বিশ্বকাপে গোলের সংখ্যা বিশের ঘর ছোঁয়া প্রথম খেলোয়াড় তিনি।

বিরতির আগে আবার ভোজিনিয়াকে পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। এই দফায় ডি-বক্সের প্রান্ত থেকে মিডফিল্ডার এঞ্জো ফার্নান্দেজের শট ঝাঁপিয়ে রক্ষা করে ব্যবধান বাড়তে দেননি তিনি।

প্রথমার্ধে কেপ ভার্দে কয়েকবার আভাস দিলেও বলার মতো কোনো আক্রমণ শানাতে পারেনি। তাই গোলপোস্টের নিচে অলস সময় কাটাতে হয় আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে।

বিরতির পর কেপ ভার্দেকে দেখা যায় অন্য রূপে। আক্রমণে মনোযোগী হওয়ার সুফল হিসেবে গোলও পেয়ে যায় তারা। ৫২তম মিনিটে দেরয়ের শট ঠেকালেও সাত মিনিট পর আর পারেননি এমিলিয়ানো। রায়ান মেন্দেসের কাটব্যাকে নিচু কোণাকুণি শটে নিশানা ভেদ করেন মিডফিল্ডার দেরয়।

গোল হজমের পর গা ঝাড়া দেয় আলবিসেলেস্তেরা। ৬২তম মিনিটে লাউতারো মার্তিনেজের ফ্লিকে বল পেয়ে ডি-বক্সে ভোজিনিয়াকে একা পেলেও সোজাসুজি তার গায়ে মেরে সুযোগ হারান মেসি। ১০ মিনিট পর আবার বাধা হয়ে দাঁড়ান কেপ ভার্দের গোলরক্ষক। এবার মেসির দ্রুত নেওয়া ফ্রি-কিক ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন তিনি। ওই কর্নার থেকে বদলি নামা মিডফিল্ডার নিকো গঞ্জালেজের হেড থাকেনি লক্ষ্যে।

যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আরেক বদলি মিডফিল্ডার লেয়ান্দ্রো পারেদেসের দূরপাল্লার শট সহজেই লুফে নেন ভোজিনিয়া। শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগেও তিনি দেখান বীরত্ব। মেসির ফ্রি-কিক সিডনির পায়ে লেগে দিক পাল্টালেও ভোজিনিয়া ফিরিয়ে দেন বল।

ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। দ্বিতীয় মিনিটেই গোল পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। মেসির কর্নারে আলেক্সিস মাক আলিস্তার হেড করার পর দূরের পোস্টে বল পান লিসান্দ্রো। প্রথম ছোঁয়ায় জায়গা বানিয়ে বাম পায়ের বুলেট গতির শটে জাল কাঁপান তিনি।

তবে ম্যাচের নাটকীয়তার বাকি তখনও অনেক। মোড় আবার ঘুরে যায় লেফট ব্যাক সিডনির চোখ ধাঁধানো গোলে। ১০৩তম মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে বাম দিক থেকে মাক আলিস্তারের চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে সামনে এগিয়ে তিনি নেন বাঁকানো শট। বল ঠেকানোর কোনো উপায়ই ছিল না এমিলিয়ানোর— ফের সমতা।

যোগ করা সময়ে মেসিকে আবারও হতাশ করেন ভোজিনিয়া। তবে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের ষষ্ঠ মিনিটে আর পারেননি তিনি। মেসির কর্নারে সেন্টার ব্যাক ক্রিস্তিয়ান রোমেরো হেড করার পর বল বোর্জেসের হাতে লেগে জালে জড়ায়।

তৃতীয় দফা এগিয়ে যাওয়ার পরও আর্জেন্টিনা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ১১৬তম মিনিটে সিডনির দারুণ ফ্রি-কিক ঝাঁপিয়ে রুখে দেন এমিলিয়ানো। তিন মিনিট পর আবার মঞ্চে আবির্ভূত হতে হয় তাকে। স্টিভেন মোরেইরার ক্রসে কেপ ভার্দের একজন হেড করে বিপজ্জনক জায়গায় ফেলেন। তবে বদলি নামা স্ট্রাইকার গিলসন বেনচিমল পা ছোঁয়ানোর আগেই পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে কর্নারের বিনিময়ে বল রুখে দেন এমিলিয়ানো।

কিছুক্ষণ পরই বেজে ওঠে রেফারির শেষ বাঁশি। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬৭তম অবস্থানে থাকা কেপ ভার্দেকে হারিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শীর্ষস্থানধারী আর্জেন্টিনা। আটলান্টায় আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় তারা মুখোমুখি হবে মিশরের।