28 C
Dhaka
Home Blog

বাজারে আসছে গুগলের ‘অডিও গ্লাস’

স্মার্ট চশমার বাজারে সদর্পে ফেরার ঘোষণা দিয়েছে গুগল। প্রায় এক দশক আগে ‘গুগল গ্লাস’ প্রকল্প শুরু করলেও তেমন সাড়া পায়নি গুগল। বরং ওই পণ্যটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। 

এবার সেই বদনাম ঘুচাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিসহ নতুন স্মার্ট চশমা বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে গুগল।  

গুগলের বার্ষিক ডেভেলপার সম্মেলনে এ বিষয়ে ঘোষণা আসে। 

আই/ও ২০২৬ নামের সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা দৈনন্দিন ব্যবহার্য নানা ডিভাইসের সঙ্গে এআই সেবা যুক্ত করার অঙ্গীকার জানান। 

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘অডিও গ্লাস’ তৈরি করছে গুগল। 

এই প্রকল্পে চশমা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়ারবি পার্কার ও জেন্টল মনস্টারকে অংশীদার হিসেবে পাশে পাচ্ছে গুগল। এ ছাড়া, স্যামসাং-এর কাছ থেকেও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নেবে গুগল। 

এই চশমাগুলো অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপলের ফোনের সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। 

পরিকল্পনা মতে এ বছরেই বাজারে আসবে গুগলের অডিও গ্লাস। 

বাজারে প্রচলিত অন্যান্য স্মার্ট গ্লাসে ভিডিও ও ভিজুয়াল ডিসপ্লের দিকে বেশি জোর দেওয়া হলেও গুগলের নতুন এই পণ্যে অডিওর দিকে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। 

ইউজাররা ‘ভয়েস কমান্ড’ বা মৌখিক নির্দেশনার মাধ্যমে অনেক কাজ সেরে ফেলতে পারবেন। এ কারণেই এর নাম ‘অডিও গ্লাস’। 

নতুন এই ডিভাইসগুলো খুব সহজেই জেমিনাই এআই ইঞ্জিনসহ গুগলের অন্যান্য অ্যাপের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবে।  

সম্মেলনে গুগলের এক কর্মকর্তা চশমাকে মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে দোকান থেকে কফির অর্ডার করেন। এতে উপস্থিত দর্শকরা মুগ্ধ হন। 

এই ডিভাইসে টাইপ না করে বা হাত ব্যবহার না করে শুধু মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাজ সারার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। 

২০১০ সালের দিকে বাজারে আসে গুগল গ্লাস। তবে শুরু থেকেই এই পণ্যটি ছিল বিতর্কের কেন্দ্রে। 

ইউজারদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে হুমকি, ডিজাইনের সীমাবদ্ধতা ও সার্বিকভাবে, সমাজের সর্বস্তরে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।   

‘নজরদারি পণ্য’ আখ্যা দিয়ে অনেকেই গুগল গ্লাস বর্জনের ডাক দেন।  

তবে এরপর অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বাজারে স্মার্ট চশমা এনে সেই নেতিবাচক পরিস্থিতি অনেকাংশেই দূর করেছে।

এআই, হার্ডওয়্যার ও ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নয়নে মানুষেরমনে এই প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ দেখা দিয়েছে। 

ইতোমধ্যে রে-ব্যানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মেটার স্মার্ট চশমা বাজারে সাড়া ফেলেছে। অন্যান্য স্টার্টআপ ও প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ধরনের ডিভাইস নিয়ে কাজ করছে।
 

শিশুদের জন্য আর কোনো দেশ নেই

রামিসার বাবার একটি কথা বারবার মাথার ভেতর ঘুরছে। তিনি বলেছেন, তিনি তার মেয়ের হত্যার বিচার চান না। কারণ তিনি জানেন, এই দেশে বিচার পাওয়া এক ধরনের বিলাসিতা।

একজন বাবা কতটা অসহায় হলে নিজের সাত বছরের মেয়ের এমন করুণ মৃত্যুর পরও বিচার ব্যবস্থার ওপর ভরসা রাখতে পারেন না!

এই একটি বাক্যই আসলে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ আর বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম প্রতিচ্ছবি।

রামিসার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের মন্তব্যগুলো পড়ার পর থেকে ভেতরে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। শুধু ঘটনাটা না, বরং ঘটনাটির পর মানুষের প্রতিক্রিয়া আরও বেশি ভয়ংকর লাগছে।

একটা শিশুকে ঘিরে যেখানে শোক, সহানুভূতি আর মানবিকতা থাকার কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ হাসাহাসি, বানানো গল্প, আর অসুস্থ বিনোদন। যেন একটা শিশুর জীবনও এখন মানুষের কাছে ‘কনটেন্ট’ ছাড়া আর কিছুই না।

আমরা প্রায়ই বলি যে সমাজ দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অসুস্থতা হঠাৎ করে তৈরি হয়েছে? সহজ উত্তর হলো, না। বছরের পর বছর ধরে অনলাইনে ঘৃণা, নারীবিদ্বেষ, অশ্লীলতা আর নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক করে তোলার ফল আজ আমরা দেখছি।

এখন মানুষ ট্র্যাজেডির মধ্যেও ভাইরাল হওয়ার সুযোগ খোঁজে। একটা শিশুর মৃত্যুতেও তারা ‘রিঅ্যাকশন’, ‘এনগেজমেন্ট’ আর সস্তা বিনোদনের উপাদান খুঁজে পায়।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এসব মানুষ আমাদের আশেপাশেই থাকে। তারা কোনো দূরের দানব না। তারা আমাদের ফ্রেন্ডলিস্টে আছে, আমাদের কমেন্ট সেকশনে আছে, আমাদের সমাজেই আছে। আর যখন একটা সমাজ ধীরে ধীরে সহানুভূতি হারাতে শুরু করে, তখন সেখানে শুধু অপরাধীই ভয়ংকর না, সেই অপরাধকে ঘিরে মানুষের বিকৃত প্রতিক্রিয়াও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

এ দেশের প্রত্যেকটি পরিবার—যাদের ঘরে কন্যা শিশু আছে—আতঙ্কে দিন পার করছে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা হয়তো দেশ ছাড়ার কথা ভাবছে, ছাড়ছে। এটা করেছে কেবল সন্তানদের নিরাপদ পরিবেশ দেওয়ার জন্য। আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তারা মেয়েদের চলাফেরা সীমিত করছে ভয় থেকে। কারণ, তারা বুঝতে পারছে, এখানে শুধু বাস্তব জীবনই অনিরাপদ না, অনলাইন জগতও ভয়াবহভাবে অসুস্থ হয়ে গেছে।

সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো, আমরা ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি যেখানে একটা শিশুকেও যৌন আকাঙ্ক্ষা থেকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তার শরীরকেও ভোগ্যপণ্য করে তোলা হচ্ছে। তার পরিচয়, তার মর্যাদা, তার প্রতি ন্যূনতম মানবিকতাও মানুষ রক্ষা করতে চায় না। বরং তাকে নিয়েও অশ্লীলতা আর বিকৃত রসিকতা শুরু হয়ে যায়।

একটা সমাজ তখনই সত্যিকারের বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন মানুষ অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। যখন একটা শিশুর ট্র্যাজেডিও মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিতে পারে না, তখন বুঝতে হবে সমস্যা শুধু কিছু অপরাধীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমস্যা আমাদের সামষ্টিক মানসিকতার ভেতরেও ঢুকে গেছে।

রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন থেকেই যায়—আর কত রামিসা হারালে এ দেশ শিশুদের জন্য নিরাপদ হবে? কখনো কখনো সত্যিই মনে হয়, শিশুদের জন্য আর কোনো দেশ নেই।

 

মো. আব্বাস: দ্য ডেইলি স্টারের সাবেক সংবাদকর্মী। বর্তমানে কাজ করছেন করপোরেট কমিউনিকেশন খাতে।
[email protected]

অ্যাটলাসের সিংহদের হুঙ্কার: সেমিফাইনালে আফ্রিকা ও আরবের প্রথম প্রতিনিধি মরক্কো

ক্যামেরুন ১৯৯০, সেনেগাল ২০০২, ঘানা ২০১০— বিশ্বকাপের আঙিনায় আফ্রিকার দৌড় যেন চিরকাল লেখা ছিল কোয়ার্টার ফাইনালেই। ৯২ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে সেমিফাইনালের দরজাটা তাদের কাছে ছিল এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের মরূদ্যানে আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাসের এই অচলায়তনে ফাটল ধরায় মরক্কো।

ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার চিরচেনা আধিপত্য এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার পর তৃতীয় দেশ হিসেবে তাদের সেমিফাইনালে পা রাখাটা ছিল ঐতিহাসিক। অ্যাটলাসের সিংহরা রচনা করে এমন এক রূপকথা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব। মরুভূমির বুকে তারা ফুটিয়ে তোলে এমন এক ফুটবলীয় কাব্য, যার প্রতিটি ছত্রে মিশে ছিল অদম্য সাহস আর হার না মানা মানসিকতা।

টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই মরক্কো আবির্ভূত হয়েছিল জায়ান্ট কিলার রূপে। গ্রুপ পর্বে ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ক্রোয়েশিয়া ও সোনালি প্রজন্মের বেলজিয়ামের মতো পরাশক্তির মুখোমুখি হয়েও তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি। বেলজিয়ামকে হারিয়ে এবং ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে ড্র করে চমক দেখায় দলটি। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে পা রাখে ওয়ালিদ রেগ্রাগুইয়ের শিষ্যরা।

শেষ ষোলোর লড়াইয়ে তাদের সামনে দাঁড়ায় ২০১০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন। লুইস এনরিকের শিষ্যদের সমস্ত কৌশলকে নিজেদের জমাট রক্ষণের জালে আটকে ফেলে মরক্কানরা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে গড়ানো ম্যাচে স্প্যানিশদের রীতিমতো স্তব্ধ করে দেন আশরাফ হাকিমি-সোফিয়ান আমরাবাত-হাকিম জিয়েশরা। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটে মরক্কো, জানান দেয় নিজেদের সামর্থ্যের।

আসল ইতিহাস গড়ার মঞ্চটা প্রস্তুত ছিল দোহার আল থুমামা স্টেডিয়ামে, প্রতিপক্ষ কিংবদন্তি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোসহ শক্তিশালী পর্তুগাল। টুর্নামেন্টে খেলা আগের চার ম্যাচে ১২ গোল নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছিল পর্তুগিজরা। অন্যদিকে, মরক্কোর ইস্পাতকঠিন রক্ষণ তখন পর্যন্ত বিপক্ষ দলের কোনো খেলোয়াড়কে গোল করার সুযোগই দেয়নি। একমাত্র গোলটি তারা হজম করেছিল কানাডার বিপক্ষে— নায়েফ অগার্দের আত্মঘাতী।

বিশ্বমঞ্চে এর আগে মাত্র দুবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল দল দুটি। দুবারই ছিল গ্রুপ পর্বের লড়াই, যেখানে জয়ের হিসাবটা ছিল সমানে সমান। ১৯৮৬ সালের দেখায় মরক্কো ৩-১ গোলের দারুণ এক জয় তুলে নিয়েছিল, আর ২০১৮ আসরে ১-০ ব্যবধানে শেষ হাসি হেসেছিল পর্তুগিজরা।

ম্যাচের ৪২তম মিনিট, ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। সতীর্থ ইয়াহিয়া আত্তিয়াতের বাড়ানো ক্রসে ইউসেফ এন-নেসিরি শূন্যে ভেসে যে জাদুকরী হেডটি করেন, তা যেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকেও হার মানিয়েছিল। বল যখন পর্তুগালের জালে জড়ায়, তখন কেবল একটি গোলের উদযাপন হয়নি, বরং লেখা হয় আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় এক শতাব্দীর হাহাকারের অবসানের প্রথম শ্লোক।

দ্বিতীয়ার্ধে গোল শোধ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারকা ফুটবলারে ঠাসা পর্তুগাল। তারা একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে মরক্কোর ডি-বক্সে। চোটের ছোবলে প্রথম পছন্দের চার ডিফেন্ডারের তিনজনকে হারিয়েও নিজেদের গোলপোস্টের সামনে অটল দুর্গ গড়ে তোলেন কোচ রেগ্রাগুই। এমনকি অধিনায়ক রোমেইন সাইস স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার পর যোগ করা সময়ে দশ জনের দলে পরিণত হলেও কোনো ফাটল ধরেনি রক্ষণে।

উপায় না পেয়ে বদলির বেঞ্চ থেকে নামানো হয় রোনালদোকে। তবে পর্তুগিজদের ত্রাতা হতে পারেননি তিনি। নক-আউট পর্বে গোল না পাওয়ার হতাশা আর বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার তীব্র বেদনা নিয়ে চোখের জলে টানেল দিয়ে তার প্রস্থান ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিষাদময় দৃশ্য। অন্যদিকে, মাঠের ভেতরে তখন প্রথম আফ্রিকান ও আরব দল হিসেবে মরক্কানদের সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়ার বাঁধভাঙা উল্লাস।

পর্তুগালকে হারানোর পর মারাকেশের বিখ্যাত জেমা আল-ফনা চত্বর থেকে শুরু করে রাবাতের রাস্তায় নেমে এসেছিল মানুষের ঢল। এই উন্মাদনা কেবল মরক্কোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আইভরি কোস্টের আবিদজান থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ, তিউনিসিয়ার তিউনিস থেকে লিবিয়ার মিসরাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি প্যারিসের চ্যাম্পস এলিসিস বা লন্ডনের এডজওয়ার রোডেও উড়েছিল মরক্কোর লাল-সবুজ পতাকা।

জয়ের পর আবেগাপ্লুত কোচ রেগ্রাগুই বলেছিলেন, ‘আমরা সত্যিই দারুণ এক পর্তুগাল দলের মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমাদের যা কিছু আছে তা নিয়েই লড়েছি, এখনো আমাদের খেলোয়াড়রা চোটে ভুগছে। ম্যাচের আগে ছেলেদের বলেছিলাম, আফ্রিকার জন্য আমাদের ইতিহাস গড়তে হবে। আমি খুব, খুব খুশি।’

এই অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে পিছপা হয়নি আফ্রিকান ফুটবলও। মহাদেশটির সর্বোচ্চ ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএএফ টুইট করেছিল, ‘মহাদেশীয় অর্জন!… অ্যাটলাসের সিংহদের কী দারুণ এক অর্জন।’ গোটা আরব বিশ্ব ও আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিল দলটি।

মরক্কোর মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কিছু দৃশ্য চিরকাল গেঁথে থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের মনে। গ্যালারিতে ছুটে গিয়ে দলটির ফুটবলারদের তাদের মায়েদের জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া কিংবা মাঠের সবুজ ঘাসে আনন্দে নাচার দৃশ্যগুলো তারা উপহার দিয়েছিল, যা ছিল নিখাদ ভালোবাসার এক অনন্য ক্যানভাস। পেশাদারিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই মানবিক আবেগের প্রকাশ মরক্কোকে প্রিয় করে তুলেছিল ভক্তদের কাছে।

তবে স্বপ্নের সেমিফাইনালে আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের অভিজ্ঞতার কাছে ২-০ ব্যবধানে হার মানতে হয় তাদের। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই থিও হার্নান্দেজের গোলে পিছিয়ে পড়াটা ছিল বড় ধাক্কা, আর শেষ মুহূর্তে রান্দাল কোলো মুয়ানির গোল তাদের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয়। পুরো ম্যাচে ৫১ শতাংশ বল দখলে রাখার পরও ফরাসি দেয়াল ভাঙতে না পারলেও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে লড়াই করতে পারার গর্ব নিয়ে মাঠ ছাড়ে রেগ্রাগুইয়ের দল।

রূপকথার এই যাত্রায় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী প্লে-অফে গ্রুপ পর্বের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে চতুর্থ হয়েই বিশ্বকাপ শেষ করতে হয় মরক্কোকে। শেষটা রাঙানো না গেলেও চোট আর ক্লান্তিতে জর্জরিত দলটির কাছে হয়তো এটি ছিল এক কদম বেশি ফেলার চেষ্টা।

তবে সেখানে কান্নার কোনো স্থান ছিল না৷ দর্শকদের প্রবল করতালির ঝংকারের মাঝে ছিল কেবলই প্রাপ্তির আনন্দ। মরক্কো যদিও কোনো ট্রফি জেতেনি, কিন্তু বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ঠিকই জিতে নিয়েছিল তারা।

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ: আইএমএফ

চলতি বছর বর্তমান মূল্যে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসেবে ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে হবে ২ হাজার ৯১১ ডলার, যেখানে ভারতের ক্ষেত্রে তা হবে ২ হাজার ৮১২ ডলার। অংকের বিচারে এই পার্থক্য সামান্য হলেও এর প্রতীকী তাৎপর্য অনেক বেশি। 

আয়তনের দিক থেকে ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের ৩ হাজার ৯১৬ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বাংলাদেশের (৪৫৮ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে প্রায় আট গুণ বড়। কিন্তু মাথাপিছু আয়ের সূচকে ছোট প্রতিবেশী দেশটি ভারতের সঙ্গে সমানে সমান পাল্লা দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু এই ঘটনাকে ‘বিস্ময়কর’ বলে অভিহিত করেছেন। ভারতীয় বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি নাকি শুধু হিসাবের কারসাজি?

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পার্থক্যের পেছনে মূল কারণ মুদ্রার বিনিময় হার। আইএমএফের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান ডলারের হিসাবে ২০১৮ সাল থেকে পরবর্তী সাত বছর মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল।

তবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশি টাকার মানে বড় ধরনের অবমূল্যায়নের ফলে ভারত ফের এগিয়ে যায়। অবশ্য এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়।

১৯৮৯ থেকে ২০০২ সালের মধ্যবর্তী সময়েও মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। এরপর টানা প্রায় ১৫ বছর ভারত চালকের আসনে থাকলেও ২০১৮ সালে দেশটি বাংলাদেশের নিচে নেমে যায়।

পরবর্তী সময়ে ডলারের বিপরীতে রুপির অবমূল্যায়ন এই তুলনামূলক সমীকরণকে আবারও ভারতের পক্ষে নিয়ে আসে।

সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ে প্রায় ১০০ ডলারের ব্যবধানে ভারতের চেয়ে এগিয়ে যাবে।

তবে আইএমএফ আশা করছে যে, ২০২৭ সালে ভারত আবারও শীর্ষস্থান ফিরে পাবে এবং অন্তত ২০৩১ সাল পর্যন্ত সেই অবস্থান ধরে রাখবে।

এই সূচকটি কেন এত অস্থির বা পরিবর্তনশীল, তা বুঝতে গাণিতিক বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রচলিত বিনিময় হারের ভিত্তিতে প্রতিটি দেশের উৎপাদনকে মার্কিন ডলারে রূপান্তর করে বর্তমান ডলার মূল্যে মাথাপিছু জিডিপি গণনা করা হয়।

যখন কোনো মুদ্রার মান কমে যায়, যেমন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাকা এবং রুপি উভয়ের ক্ষেত্রেই ঘটেছে (ভিন্ন গতিতে হলেও), তখন অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা যেমনই হোক না কেন, ডলারের মাপে উৎপাদনের মূল্য কমে আসে।

২০২৬ সালে এই দুই রেখার একে অপরকে অতিক্রম করা একটি বাস্তব সত্যকেই তুলে ধরে—বিনিময় হারের গতিপ্রকৃতি এই দুই অর্থনীতির ডলার আয়কে একে অপরের খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তবে এটি এককভাবে নিশ্চিত করে না যে, কোন দেশের মানুষ বেশি ভালো আছে।

দ্বিতীয় আরেকটি পরিমাপ চিত্রটিকে বেশ জটিল করে তোলে। আইএমএফ ক্রয়ক্ষমতার সমতাভিত্তিক (পিপিপি) মাথাপিছু জিডিপিও প্রকাশ করে। এখানে বিনিময় হারের প্রভাব বাদ দেওয়া হয় ও প্রতিটি দেশের মুদ্রা নিজ দেশে আসলে কী পরিমাণ পণ্য বা সেবা কিনতে পারে, তার ভিত্তিতে একটি সাধারণ ‘আন্তর্জাতিক ডলারে’ রূপান্তর করা হয়।

এই পদ্ধতিতে দেখা যায় ভারত সব সময়ই বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে। ২০২৫ সালে ভারতের পিপিপি-ভিত্তিক মাথাপিছু আয় ১১ হাজার ৭৮৯ ডলার, যা বাংলাদেশের (১০ হাজার ২৭১ ডলার) চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি।

আইএমএফ বলছে, ২০৩১ সাল নাগাদ এই ব্যবধান বেড়ে ২৪ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ পিপিপি অনুযায়ী তখন ভারতের মাথাপিছু আয় হবে ১৮ হাজার ৪৮৫ ডলার এবং বাংলাদেশের হবে ১৪ হাজার ৮৫৭ ডলার।

 

লালবাগ থানার মামলায় গ্রেপ্তার শিরীন শারমিন, তোলা হবে আদালতে

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আজ মঙ্গলবার তাকে আদালতে তোলা হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম আজ সকালে এই কথা জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, শিরীন শারমিন চৌধুরীকে বর্তমানে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। রিমান্ড চাওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। রিমান্ড আবেদনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সিদ্ধান্ত হবে তার জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে কি না।’

এর আগে আজ মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।

জাতীয় সংসদের তথ্য অনুযায়ী, শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল স্পিকার নির্বাচিত হন। এরপর টানা তিন মেয়াদে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন শিরীন শারমিন।

সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৭ আগস্ট রংপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন হত্যার ঘটনায়ও শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছিল। তবে ডিবি জানিয়েছে, তাকে বর্তমানে লালবাগ থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

সংসার ভাঙল মৌসুমী হামিদের

দুই বছর আগে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ ও লেখক-নাট্যকার আবু সাইয়িদ রানা। কিন্তু তারা এখন আর একসঙ্গে থাকছেন না। বিচ্ছেদের পথে এগোচ্ছেন।

মৌসুমী হামিদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যা শুনেছেন, ঠিকই শুনেছেন। এ নিয়ে আর বিস্তারিত কিছু বলার মতো মানসিক অবস্থায় আমি নেই।’

জানা গেছে, গত বছর নভেম্বর থেকেই মৌসুমী ও রানা আলাদা থাকছেন। বিচ্ছেদ চেয়ে ইতোমধ্যে মৌসুমী হামিদকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছেন রানা।

২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি বিয়ে করেন রানা-মৌসুমী। পারিবারিক সিদ্ধান্তেই বিয়ে হয়েছিল তাদের। সে সময় মৌসুমী বলেছিলেন, ‘রানার সঙ্গে আমার দুই বছরের পরিচয়। এরপর আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিই। দুই পরিবারের সঙ্গে কথা বলি। সবার সম্মতি নিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে নিচ্ছি।’

২০১০ সালে লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টারে রানার্স আপ নির্বাচিত হন মৌসুমী হামিদ। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে আছে ‘লাভ র‍্যাক্টেঙ্গেল (ভালোবাসার চতুষ্কোণে)’, ‘রেডিও চকলেট’। উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে অনন্য মামুন পরিচালিত ‘ব্ল্যাকমেইল’, শামিম আহমেদ রনি পরিচালিত ‘মেন্টাল’, হদি হক পরিচালিত ‘১৯৭১ সেইসব দিন’।

উইটকফ-কুশনারের ওপর নির্ভর করছে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত: গার্ডিয়ান

ইরানে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের পর্যালোচনার ওপর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে হামলার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহে ইরান তার প্রস্তাব পাঠাবে বলে আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সে অনুযায়ী আগামী বৃহস্পতিবার জেনেভায় দুই দেশের মধ্যে নির্ধারিত বৈঠককেই শেষ চেষ্টা হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।

আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন উইটকফ ও কুশনার। সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে তাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন ট্রাম্প।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মার্কিন কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘ইরান সংক্রান্ত সব বৈঠকেই উইটকফ উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্পকে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার মূল্যায়ন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

আরও একাধিক সূত্রের বরাতে সংবাদ মাধ্যমটি জানায়, পরমাণু চুক্তি নিয়ে তেহরান সময়ক্ষেপণ করছে কি না, সে প্রশ্নে উইটকফ ও কুশনারের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্প।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প জানিয়েছেন, চুক্তি না হলে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টিতে সীমিত হামলা নাকি দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিসরে সামরিক অভিযান চালানো হবে—উভয় বিষয়ই বিবেচনায় রেখেছেন তিনি।

ট্রাম্পের প্রধান উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন—ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস ও জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড।

গার্ডিয়ান জানায়, ইরানে সম্ভাব্য বিমান হামলার পক্ষে ও বিপক্ষে—দুই দিকই তুলে ধরেছেন ভ্যান্স।

সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো খতিয়ে দেখছেন জেনারেল কেইন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুদ নিয়েও উদ্বিগ্ন তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমিত বিমান হামলা ইরানকে চুক্তিতে বাধ্য করতে পারবে কি না বা দেশটির শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে কি না—ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যেভাবে স্বনির্ভর হলো বান্দরবানের এক পাহাড়ি পাড়া

বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে রোয়াংছড়ির পাহাড়ঘেরা ছোট্ট জনপদ শুকনাছড়িপাড়া। টিলার ওপর বাঁশের খুঁটির মাচাং ঘর, পাশে কাঠের তৈরি বৌদ্ধবিহার, মাঝখানে একটি পুরোনো তেঁতুল গাছ। গাছের নিচে বসানো পানির পাইপ থেকে টুপটাপ করে পড়ছে পানি। এই পানি শুধু তৃষ্ণাই মেটায় না, এটি একটি পাড়ার আত্মমর্যাদা ও ঐক্যের প্রতীক।

সরকারি সহায়তা না পেলেও নিজেদের একতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই তঞ্চঙ্গ্যা পাড়ার ৩৫টি পরিবার গড়ে তুলেছে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ পানির পাইপলাইন, প্রায় আড়াই কিলোমিটার কাঁচা সড়ক এবং পরিবারভিত্তিক চাঁদায় পরিচালিত একটি বিদ্যালয়।

‘কেউ এনে দেয়নি, আমরাই এনেছি’

পাইপ থেকে কলসিতে পানি ভরছিলেন ৬১ বছর বয়সী বিনতি বালা তঞ্চঙ্গ্যা। মুখে তৃপ্তির হাসি।

‘পাঁচ বছর আগেও এখানে পানির জন্য হাহাকার ছিল। আধা কিলোমিটার নিচে ঝরনায় যেতে হতো। দিনে দুই-তিন ঘণ্টা শুধু পানি আনতেই চলে যেত। কেউ এনে দেয়নি, আমরা নিজেরাই পাইপলাইন বসিয়ে পানি এনেছি,’ বলেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাড়াটি এখন দুই কিলোমিটার দূরের হাজাছড়া ঝরনা থেকে জিএফএস পাইপের মাধ্যমে পানি পাচ্ছে। দুটি স্থানে ও বৌদ্ধবিহারে বসানো হয়েছে ট্যাংক। সেখান থেকেই পানি সংগ্রহ করেন বাসিন্দারা।

কান্দরি তঞ্চঙ্গ্যা ও চঞ্চনা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘পাহাড় বেয়ে পানি আনতে আনতে সব শক্তি শেষ হয়ে যেত। সপ্তাহের সব দিন গোসল করাও সম্ভব হতো না।’

৮৭ বছর বয়সী তিবাধন তঞ্চঙ্গ্যা জানান, প্রায় ৪৫ বছর আগে পাড়াটি গড়ে ওঠার পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ছিল। 

‘আগে বন বেশি ছিল, এখন কমে গেছে। তাই ঝরনাতেও তেমন পানি নেই,’ বলেন তিনি।

আশ্বাসের পর আশ্বাস, কাজ হয়নি

স্থানীয়দের দাবি, একসময় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রকৌশলীরা এসে পরিদর্শনও করেন। কিন্তু কাজ আর এগোয়নি।

অবশেষে পাড়াবাসী নিজেরাই উদ্যোগ নেয়। প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে শ্রম দিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মাটি কেটে পাইপ বসানো হয়। ঝরনা থেকে পানি এনে পাড়ার উঠানে ট্যাংক স্থাপন করা হয়। এখন কোথাও পাইপ নষ্ট হলে পালাক্রমে নিজেরাই তা মেরামত করেন।

পাড়ার কারবারি (পাড়া প্রধান) নীলবরণ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘উপজেলা, ইউনিয়ন, জেলা পরিষদের দরজায় বহু বছর ঘুরেছি। শুধু আশ্বাস পেয়েছি। শেষে সিদ্ধান্ত নিই, নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই পূরণ করব।’

অর্থের জোগান ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরে বৌদ্ধবিহারের জন্য সংরক্ষিত জমিতে কলাবাগান করা হয়। পাশাপাশি পূর্ব পাশে ২০ একর প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত পাড়াবন থেকে বাঁশ বিক্রি করা হয়। কলা ও বাঁশ বিক্রি করে প্রায় চার লাখ টাকা ওঠে। এর মধ্যে দেড় লাখ টাকায় পাইপ ও সরঞ্জাম কেনা হয়। বাকি অর্থে বৌদ্ধবিহারের জন্য একটি আধাপাকা ভোজনশালা নির্মাণ করা হয়, যেটি এখন শিশুদের বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নিজেদের বানানো রাস্তা, নিজেদের স্কুল

পানির পাশাপাশি গ্রামবাসী প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা সড়ক নির্মাণ করেছেন, যা রোয়াংছড়ির প্রধান সড়কের সঙ্গে পাড়াকে যুক্ত করেছে। বর্ষায় কাদা হলেও শুকনো মৌসুমে মোটরসাইকেল ও ছোট যান চলাচল করতে পারে।

পাড়ার এক পাশে বাঁশের বেড়ার একটি ঘর, এটাই প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে ছাউনি না থাকায় আপাতত বৌদ্ধবিহারের ঘরেই পাঠদান চলছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি রঞ্জিত তঞ্চঙ্গ্যা জানান, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবার মাসে ৫০০ টাকা করে দেয়। যাদের ঘরে শিক্ষার্থী নেই, তারা ১০০ টাকা করে সহায়তা করেন।

‘এই টাকাতেই বিদ্যালয়ের খরচ চলে। ঢেউটিন কেনার মতো অর্থ নেই,’ বলেন তিনি।

‘স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার চেষ্টা’

রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহ্লা অং মারমা বলেন, ‘তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মানুষ খুবই পরিশ্রমী ও ঐক্যবদ্ধ। তারা সরকার থেকে কিছু পাওয়ার আশায় বসে থাকেন না।’

অন্যদিকে উপজেলা প্রকৌশলী তুহীন বিশ্বাস বলেন, ‘তারা আবেদন করলে স্থাপিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে সহযোগিতা করা হবে।’

পাহাড়ের ঐতিহ্য, টিকে থাকার লড়াই

নীলবরণ তঞ্চঙ্গ্যার ভাষায়, ‘আগে পাহাড়ের পাড়াগুলো কোনো কিছুর জন্য কারও ওপর নির্ভর করত না। সেই ঐতিহ্য আমরা ধরে রেখেছি।’

সরকারি অবকাঠামোর ছোঁয়া না পেলেও ঐক্য, শ্রম ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুকনাছড়িপাড়া আজ স্বনির্ভরতার এক অনন্য উদাহরণ। পাহাড়ি ঝরনার পানি এখন আর শুধু প্রয়োজন মেটায় না, এটি হয়ে উঠেছে একটি পাড়ার আত্মমর্যাদা, সাম্য ও সম্মিলিত শক্তির প্রতীক।

এক বছরের মধ্যেই নোবেল জয়ে সহায়তা করবে এআই: অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আগামী এক বছরের মধ্যেই মানুষের সঙ্গে কাজ করে নোবেল পুরস্কারজয়ী কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সহায়তা করতে পারবে বলে মন্তব্য করেছেন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বুধবার ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডে এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, প্রযুক্তিটির অগ্রগতি এখন এত দ্রুত যে তা ‘মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো’ অনুভূতি তৈরি করছে।

জ্যাক ক্লার্কের মতে, আগামী ১৮ মাসের মধ্যেই শুধু এআই দ্বারা পরিচালিত কোম্পানিগুলো লাখ লাখ ডলার আয় করতে শুরু করবে। আর দুই বছরের মধ্যে মানবাকৃতির রোবট বিভিন্ন কারিগরি পেশার মানুষের কাজে সহায়তা করবে।

তিনি আরও বলেন, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ এআই নিজেই নিজের পরবর্তী সংস্করণ ডিজাইন করতে সক্ষম হতে পারে।

তবে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। ক্লার্ক বলেন, এখনও এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, প্রযুক্তিটি ‘পুরো পৃথিবীর সবাইকে হত্যা করতে পারে’।

তার ভাষায়, ‘এই ঝুঁকি এখনও দূর হয়নি—এটা স্পষ্টভাবে বলা জরুরি।’

অ্যানথ্রোপিকের সবচেয়ে পরিচিত এআই মডেল ‘ক্লড’। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ‘মাইথোস’ নামে নতুন একটি সংস্করণ চালু করেছে, যা সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক দক্ষতা দেখিয়েছে।

ক্লার্ক বলেন, এআইয়ের বিকাশের গতি ধীর করতে পারলে মানবজাতির জন্য ভালো হতো, যাতে মানুষ প্রযুক্তিটির প্রভাব মোকাবিলার জন্য আরও সময় পায়। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। কারণ বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা প্রযুক্তিটির উন্নয়নকে আরও দ্রুততর করছে।

অ্যানথ্রোপিক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমন কিছু গবেষক, যারা নিরাপত্তা ইস্যুতে মতবিরোধের কারণে ওপেনএআই ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এআই কোম্পানি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এদিকে সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, অ্যানথ্রোপিক, গুগল ও ওপেনএআইয়ের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে এআই প্রযুক্তি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়লে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ‘একক ব্যর্থতার ঝুঁকি’ তৈরি হতে পারে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত এডওয়ার্ড হারকোর্ট সতর্ক করে বলেন, এআই মানুষের হয়ে ক্রমেই বেশি কাজ করতে শুরু করলে মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তিনি এমন ‘সক্রেটিক এআই’ মডেলের পক্ষে মত দেন, যা মানুষকে আরও বেশি চিন্তা করতে উৎসাহিত করবে।

জ্যাক ক্লার্ক বলেন, তার সবচেয়ে ‘রক্ষণশীল’ পূর্বাভাস হলো—সমাজ ও অর্থনীতির বিশাল অংশ গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে। এর মধ্যে মানুষের অর্থনীতি থেকে আলাদা ‘মেশিন অর্থনীতি’, রোবটের উন্নত বুদ্ধিমত্তা, এমনকি মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়াই বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতির মতো বিষয়ও থাকতে পারে।

তিনি স্বীকার করেন, এসবের কিছু কিছু হয়তো ‘পাগলামির মতো’ শোনাতে পারে।

এর আগে, এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্ময়কর পূর্বাভাস দেন অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও অ্যামোদেই। তার দাবি, ভবিষ্যতে প্রতিটি বড় এআই ক্লাস্টারে ৫ কোটি নোবেল পুরস্কারজয়ীর সমপরিমাণ ‘মেধাশক্তি’ থাকবে।

তিনি এআই ডেটা সেন্টারকে ‘প্রতিভাবানদের দেশ’ হিসেবেও বর্ণনা করেন। তার ভাষায়, একটি উন্নত এআই ক্লাস্টার এমন বুদ্ধিমত্তা ধারণ করবে, যা কোটি কোটি অসাধারণ বিজ্ঞানী ও গবেষকের সম্মিলিত সক্ষমতার সমান হতে পারে।

ডারিও অ্যামোদেই বলেন, আগামী কয়েক বছরে এআই এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি গবেষণায় মানুষের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

তবে তিনি সতর্কও করেছেন। তার মতে, এত শক্তিশালী প্রযুক্তির নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

বিশ্রাম, অলসতা ও নতুন শ্রম ধারণা: কর্ম-সংস্কৃতির নীরব বদল

বাংলাদেশে ছুটির খবর সবসময়ই এক ধরনের সামাজিক উল্লাস তৈরি করে। বিশেষ করে ঈদের দীর্ঘ ছুটি যেন আমাদের কর্মজীবনের এক অলিখিত উৎসব। এবারও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে চায়ের আড্ডা সবখানেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস।

সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। খবরটি অনেকের কাছে আনন্দের, কারো কাছে ভ্রমণের পরিকল্পনা, আবার কারো কাছে বিশ্রামের মহাউৎসব।

কিন্তু এই দীর্ঘ ছুটির উচ্ছ্বাসের মধ্যেই নীরবে একটি প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি সত্যিই কাজের চেয়ে বিশ্রামকে বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছি? নাকি বদলে যাওয়া বিশ্ব-বাস্তবতায় আমাদের কর্ম-সংস্কৃতিই নিঃশব্দে পাল্টে যাচ্ছে?

কোভিড-পরবর্তী পৃথিবী, ডিজিটাল অফিস, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, অনলাইন মিটিং, আর সার্বক্ষণিক সংযুক্ত জীবনের ভেতর দাঁড়িয়ে বাঙালির কর্ম-সংস্কৃতির চিত্র এখন আগের মতো নেই। বাইরে থেকে স্থির মনে হলেও ভেতরে ভেতরে ঘটছে এক নীরব রূপান্তর।

‘দিনভর বিশ্রামেই ক্লান্ত’। বাক্যটি শুনতে কৌতুকের মতো লাগলেও এর ভেতরে আজকের বাঙালির কর্ম-সংস্কৃতির এক গভীর সংকট লুকিয়ে আছে। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে কাজের চেয়ে কাজের অভিনয় অনেক সময় বেশি দৃশ্যমান। আবার অন্যদিকে এমনও অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা সীমাহীন পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি বা জীবনমান পান না।

সরকারি অফিসের ঢিলেঢালা পরিবেশ, চাকরির নিশ্চিন্ত আরাম, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, বেসরকারি চাকরির অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ডিজিটাল শ্রমের অদৃশ্য চাপ এবং কোভিড-পরবর্তী ওয়ার্ক ফ্রম হোম, সব মিলিয়ে আমাদের কর্মজীবনের ধারণাই পাল্টে গেছে। বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি আবার আলোচনায় এসেছে।

রোজার সময়সূচি অনুযায়ী সকাল ৯টার আগেই প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে উপস্থিত হওয়ায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর সময়মতো অফিসে আসা যদি ‘অভিভূত হওয়ার’ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে সময়নিষ্ঠা কতটা ব্যতিক্রমী হয়ে গেছে। অথচ রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ ব্যক্তি যদি সময়ানুবর্তিতার দৃষ্টান্ত তৈরি করেন, সেটি নিচের স্তরে কিছুটা হলেও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরি দীর্ঘদিন ধরেই ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে বিবেচিত। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে, সরকারি দপ্তরে সময়মতো কেউ আসে না, কাজের গতি ধীর, ফাইলের চেয়ে চায়ের কাপ বেশি ঘোরে। ধারণাটি পুরোপুরি অসত্য নয়। বিশেষ করে ছুটির আগে বা উৎসবকেন্দ্রিক সময়গুলোতে সরকারি অফিসের কর্মচাঞ্চল্য প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু এই চিত্রের পেছনে শুধু কর্মচারীর আলস্যকে দায়ী করলে বাস্তবতা আড়াল হয়।

একজন সরকারি কর্মচারী যদি প্রতিদিন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে অর্ধাহারে জীবনযাপন করেন, ভাঙা বাস বা ঝুলন্ত টেম্পোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াত করে অফিসে পৌঁছান, তাহলে তিনি কতটা উদ্যম নিয়ে আট ঘণ্টা রাষ্ট্রকে শ্রম দিতে পারবেন? রাষ্ট্র কি তাকে এমন একটি কর্মপরিবেশ দিতে পেরেছে, যেখানে কাজের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত দায়বদ্ধতা তৈরি হয়? প্রণোদনা, সম্মান, দক্ষতার মূল্যায়ন কি বাস্তবেই কার্যকর?

আমাদের কর্ম-সংস্কৃতির বড় সমস্যা হলো, এখানে শ্রমের মর্যাদা নিয়ে আমরা মুখে যত কথা বলি, বাস্তবে ততটা বিশ্বাস করি না। কৈশোরে পড়েছি, বিশ্রাম কাজের অঙ্গ। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক সময় বিশ্রামই যেন মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কাজের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য বিশ্রাম নেই না, বরং বিশ্রামের সুযোগ তৈরি করার জন্যই নানা ব্যস্ততা তৈরি করি। এই মানসিকতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও।

অথচ পৃথিবীর উন্নত শ্রম-সভ্যতাগুলোর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কাজের মর্যাদার ওপর। সোভিয়েত রাশিয়ায় বলা হতো, ‘কর্মই আত্মসম্মানের ভিত্তি।’ জাপানে কর্মপাগল সংস্কৃতি প্রায় জাতীয় পরিচয়ের অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জাপান উঠে দাঁড়িয়েছিল শ্রমশক্তির শৃঙ্খলা দিয়ে। সেখানে সময়ানুবর্তিতা কেবল অফিস নীতি নয়, সামাজিক নৈতিকতা।

কর্ম-সংস্কৃতির সংকট শুধু সরকারিখাতে সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারিখাতে আবার উল্টো চিত্র। এখানে ‘অতিরিক্ত কাজ’ যেন দক্ষতার পরিচয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বহু আগেই বলেছে, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মানুষ যন্ত্র নয়। দীর্ঘ সময় কাজ করলে মনোযোগ কমে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়, ভুল বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে ওভারটাইম এখন ব্যতিক্রম নয়, অনেক ক্ষেত্রে নিয়মে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে করপোরেট ও প্রযুক্তিনির্ভর চাকরিতে ‘সর্বক্ষণ অনলাইন’ থাকার এক অদৃশ্য সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অফিস শেষ হলেও কাজ শেষ হয় না। মুঠোফোন, মেইল, ভিডিও মিটিংসহ নানা কাজে সবসময় কর্মীকে সংযুক্ত থাকতে হয়। কোভিড-পরবর্তী ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে।

কোভিড-পরবর্তী কর্ম-সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ‘প্যানঅপটিকন’ তত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুকো বলেছিলেন, আধুনিক সমাজে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় দৃশ্যমান নজরদারির মাধ্যমে। একসময় অফিসে বস, হাজিরা খাতা কিংবা সিসিটিভি ছিল সেই নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার প্রতীক। কিন্তু কোভিডের পর এই নজরদারি ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। এখন কর্মীকে অনলাইনে সক্রিয় থাকা, দ্রুত জবাব দেওয়া, ভার্চুয়াল মিটিংয়ে উপস্থিত থাকা কিংবা বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাজের গতিবিধি জানান দিতে হয়। অর্থাৎ অফিসের শারীরিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বদলে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘ডিজিটাল প্যানঅপটিকন’, যেখানে কর্মী সারাক্ষণ অদৃশ্য প্রযুক্তিগত নজরদারির মধ্যে অবস্থান করছে।

একইসঙ্গে কার্ল মার্ক্সের এলিয়েনশন থিওরি বা বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বও কোভিড-পরবর্তী কর্ম-সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। মার্ক্স বলেছিলেন, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক ধীরে ধীরে তার শ্রম, উৎপাদন ও ব্যক্তিগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ওয়ার্ক ফ্রম হোম সংস্কৃতি এই বিচ্ছিন্নতাকে আরও জটিল করেছে। আগে অফিস ও ব্যক্তিগত জীবনের একটি স্পষ্ট সীমারেখা ছিল। এখন সেই সীমা প্রায় বিলীন। ঘরই অফিসে পরিণত হয়েছে। ফলে কর্মীকে দিন-রাত সবসময় কাজের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কাজের সময় শেষ হলেও মানসিকভাবে কাজ শেষ হয় না। এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে নতুন ধরনের ডিজিটাল ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ, যেখানে মানুষ নিজের ঘরেও অফিসের চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারছে না।

একসময় বাঙালি অফিস মানেই বুঝত নির্দিষ্ট ভবন, নির্দিষ্ট টেবিল, হাজিরা খাতা আর বিকেল ৫টার ছুটি। কিন্তু বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তি সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এখন ঢাকার একজন তরুণ রাত ২টায় নিউইয়র্কের টিমের সঙ্গে মিটিং করছেন, আবার সকালে সিঙ্গাপুরের ক্লায়েন্টের জন্য রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন। বাসা ও অফিসের সীমানা মুছে গেছে। কাজের সময়ও আর নির্দিষ্ট নেই।

এই নতুন সংস্কৃতিকে কি আমরা ‘আধুনিক কর্ম-দাসত্ব’ বলব, নাকি ‘ডিজিটাল স্বাধীনতা’? উত্তর সহজ নয়। ওয়ার্ক ফ্রম হোম একদিকে যাতায়াতের সময় ও খরচ কমিয়েছে, পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে; অন্যদিকে কর্মঘণ্টাকে অস্পষ্ট করে তুলেছে। আগে অফিসের দরজা পেরোলেই কাজ শেষ হতো। এখন কাজ মানুষের ব্যক্তিগত ঘরে ঢুকে পড়েছে।

আবার আরেকটি বৈপরীত্যও আছে। বাংলাদেশে অনেক সরকারি অফিসে দক্ষ কর্মচারী আছেন, যারা কাজ করতে চান, কিন্তু তাদের কাজ নেই। দক্ষতাকে ব্যবহারের মতো কাঠামো নেই। অন্যদিকে কোথাও কোথাও অদক্ষতা, রাজনৈতিক আনুগত্য ও দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতির সংস্কৃতি কর্মোদ্যম নষ্ট করে দেয়। ফলে একজন মেধাবী কর্মকর্তা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।

বিশ্ব পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থান, শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম বাড়ছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগেও ‘শোভন কাজ’ এখনো সবার নাগালে পৌঁছায়নি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কর্ম-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। অর্থাৎ দীর্ঘ কর্মঘণ্টা সবসময় বেশি উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করে না; বরং ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ বাড়ায়।

কোভিড-পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ক ফ্রম হোম কর্ম-সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা যায়, বাসা থেকে কাজ উৎপাদনশীলতা কিছুটা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ডিজিটাল ক্লান্তি তৈরি করছে। একইসঙ্গে অনলাইন নজরদারির সংস্কৃতিও বেড়েছে। মাইক্রোসফটের জরিপ অনুযায়ী, কর্মীরা নিজেদের কার্যকর মনে করলেও অধিকাংশ ম্যানেজার এখনো কর্মীদের উৎপাদনশীলতা নিয়ে সন্দিহান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যে জানা যায়, বিশ্বে প্রায় ১৯ কোটি মানুষ বেকার এবং ১৫০ কোটির বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে সরকারি চাকরি এখনো তরুণদের কাছে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, শ্রমঘন শিল্প বাড়লেও বাংলাদেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা এখনো অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে এখন কেবল কর্মঘণ্টা নয়, কাজের গুণগত মান ও ফলাফলই কর্ম-সংস্কৃতির নতুন আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকে অমল ও প্রহরীর সংলাপটি সময়ের রহস্য ও মানবিক উপলব্ধিকে এক অসাধারণ প্রতীকে তুলে ধরে—

অমল: তুমি ঘণ্টা বাজাবে না প্রহরী?
প্রহরী: এখনো সময় হয়নি!
অমল: কেউ বলে সময় বয়ে যাচ্চে, কেউ বলে সময় হয়নি। আচ্ছা তুমি ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেইত সময় হবে।
প্রহরী: সে কি হয়? সময় হলে তবে আমি ঘণ্টা বাজিয়ে দিই।

এই সংলাপে রবীন্দ্রনাথ আসলে সময়ের এক গভীর কুহেলিকাকে ধরতে চেয়েছেন। অমলের সরল বিশ্বাস ‘ঘণ্টা বাজালেই সময় হবে’ মানুষের সেই চিরন্তন প্রবণতার প্রতীক, যেখানে আমরা বাহ্যিক ঘটনাকেই সময়ের নিয়ন্ত্রক মনে করি। অথচ প্রহরী জানিয়ে দেয়, মানুষ সময় সৃষ্টি করে না। সময় নিজস্ব নিয়মে প্রবাহিত হয়, মানুষ কেবল তার ঘোষণা দেয়। ঘণ্টাধ্বনি তাই সময়ের জন্ম নয়, তার উপস্থিতির ইঙ্গিতমাত্র।

আধুনিক কর্ম-সংস্কৃতির ভেতরেও এই বিভ্রম স্পষ্ট। কেউ মনে করে অফিসে বসে থাকাই কাজ, কেউ ভাবে অনলাইনে সক্রিয় থাকাই উৎপাদনশীলতা। কিন্তু সময় তার নিজস্ব গতিতেই বয়ে যায়। মানুষ কেবল তার ভেতরে শ্রম, বিশ্রাম ও জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরে।

আমাদের মূল সংকট সম্ভবত কাজের সময় নয়, কাজের দর্শনে। আমরা এখনো শ্রমকে মর্যাদা দেওয়ার চেয়ে চাকরিকে মর্যাদা দেই বেশি। কাজ নয়, পদমর্যাদা—এটিই সামাজিক সম্মানের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। ফলে কর্মদক্ষতার চেয়ে চাকরির নিরাপত্তা, প্রভাব ও সুবিধা বড় হয়ে ওঠে।

একটি সুস্থ কর্ম-সংস্কৃতি গড়ে উঠতে হলে কেবল অফিস সময় কঠোর করলেই হবে না; প্রয়োজন ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়ন, কাজের স্বীকৃতি, উপযুক্ত বেতন, মানসম্মত যাতায়াত, মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব ও দক্ষতাভিত্তিক পুরস্কার ব্যবস্থা। একইসঙ্গে দরকার ‘কম কাজ করাই বুদ্ধিমত্তা’, এই সামাজিক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। কারণ শেষ পর্যন্ত সভ্যতার অগ্রগতি বিশ্রামের ওপর নয়, শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিশ্রাম প্রয়োজন; কিন্তু বিশ্রামের জন্য জীবন নয়, জীবনের জন্যই কাজ।

শেষ পর্যন্ত হয়তো বাঙালির কর্ম-সংস্কৃতিকে পুরোপুরি অলসতা বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। কারণ, পৃথিবীর বহু বড় আবিষ্কারের পেছনেও নাকি অলস মানুষের হাত ছিল। কথিত আছে, অলস মানুষই সবচেয়ে শর্টকাট বুদ্ধি বের করে। কম হাঁটতে চাকা বানায়, কম উঠতে রিমোট বানায়, আর কম অফিস করতে গিয়ে আবিষ্কার করে ওয়ার্ক ফ্রম হোম।

বাঙালিও হয়তো সেই ধারারই উত্তরসূরি। সে কম কাজ করে বেশি বাঁচতে চায়। আবার কম ঘাম ঝরিয়ে বড় সফলতার স্বপ্নও দেখে। সমস্যা হলো, সব অলস মানুষ সৃজনশীল নয়, কিন্তু সব সৃজনশীল মানুষের ভেতরে একটু অলসতা থাকে। তাই আমাদের কর্ম-সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ হয়তো নির্ভর করছে এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটা বোঝার ওপর—আমরা কি সত্যিই সৃজনশীলভাবে কম কাজ করতে চাই, নাকি কাজ এড়ানোর সৃজনশীল অজুহাত খুঁজছি!

 

রাজীব নন্দী: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]