28 C
Dhaka
Home Blog

রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে নতুন করে ভাবতে হবে কেন?

নব্য উদারবাদ (নিওলিবারেলিজম) ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ প্রভাত পাটনায়েক। একইসঙ্গে গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনীয়তা এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বিকল্প উন্নয়নপথের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।

দ্য ডেইলি স্টার: কয়েক দশক ধরে অনেক উন্নয়নশীল দেশ বিশ্বে সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল সরবরাহ করে আসছে, আর ধনী দেশগুলো ভোগ করেছে তৈরি পণ্য। এই মডেল কি এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে? বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য উত্তেজনা ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নতা যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে রূপ দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সামনে এগুলো কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ও একইসঙ্গে সুযোগ তৈরি করছে?

প্রভাত পাটনায়েক: গত কয়েক দশক ধরে নব্যউদার (নিউলিবারেল) অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। এতে দেশের সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে পণ্য, সেবা এমনকি অর্থ ও পুঁজির তুলনামূলক অবাধ চলাচল নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই মডেল এখন শেষের দিকে এসে ঠেকেছে।

নব্যউদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে বৈষম্য তৈরি করেছে, তা একে স্থবিরতা ও উচ্চ বেকারত্বের মতো সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ কারণেই নিজের দেশের বেকারত্ব কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিতে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করছেন। এ ধরনের শুল্ক হলো ‘প্রতিবেশীকে নিঃস্ব করার’ নীতি, যার মাধ্যমে বেকারত্ব অন্য দেশগুলোতে রপ্তানি করা হয়।

কিন্তু গ্লোবাল সাউথের কোনো দেশ স্বাধীন প্রবৃদ্ধির এমন কৌশল অনুসরণ করলে যুক্তরাষ্ট্রই তার বিরোধিতা করবে।

তাছাড়া, যেকোনো স্বাধীন প্রবৃদ্ধির কৌশল—এমনকি আয়বৈষম্য কমিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে গেলেও তলানির দিকে থাকা দেশগুলোর এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যার বিরোধিতা করবে প্রচলিত এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই। এর মধ্যে রয়েছে ধনীদের ওপর কর আরোপ, রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি করা অথবা শুল্কের মাধ্যমে নিজের দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া।

তবে, এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো—যেহেতু নব্যউদার অর্থব্যবস্থা বৈশ্বিক এবং ইচ্ছামতো যেকোনো দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাই এর নির্দেশনা মেনে চলতে হয়। তা না হলে পুঁজি ও নগদ প্রবাহ ওই দেশ থেকে বেরিয়ে যাবে এবং দেশটিতে সংকট তৈরি হবে।

তাই প্রবৃদ্ধির কৌশল পরিবর্তন করতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে পুঁজির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ, পুঁজির বহির্গমনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।

তবে এই কৌশলের বড় ঝুঁকি হলো—এতে দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি পুঁজি ও নগদ প্রবাহ কমে যাবে। ফলে লেনদেনের ভারসাম্যের ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজন হবে।

তাই অর্থনৈতিক কৌশল পরিবর্তনে কোনো ক্ষুদ্র বা জোড়াতালি ধরনের পদক্ষেপ দিয়ে কাজ হবে না। বরং, পরিবর্তন চাইলে বড় ধরনের আন্তঃসম্পর্কিত পদক্ষেপের দিকে এগোতে হবে।

এর অর্থ হবে—দিরিজিজম, অর্থাৎ রাষ্ট্রের আরও বেশি হস্তক্ষেপ বাড়ানোর দিকে এগোনো। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি নিজের দেশের ধনী শ্রেণিও এই হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করবে।

নব্যউদারনীতিবাদ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে যে জটিল সংকটে ফেলেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে এমন পরিবর্তনই প্রয়োজন। জনগণকে এর পক্ষে সংগঠিত করা গেলেই কেবল তা সম্ভব হবে।

আর সেজন্য জনগণের সামনে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে হতে যাওয়া বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট লাভের প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট চিত্র উপস্থাপন করতে হবে।

ভারতের ক্ষেত্রে, আমি বলে আসছি, নব্যউদারবাদ থেকে সরে আসার সঙ্গে সর্বজনীন, সংবিধানসম্মতভাবে নিশ্চিত এবং আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এমন পাঁচটি অধিকার হলো–

খাদ্যের অধিকার;

কর্মসংস্থানের অধিকার (কর্মসংস্থান দিতে না পারলে পূর্ণ মজুরি দিতে হবে);

জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনামূল্যে, মানসম্মত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অধিকার;

বিনামূল্যে, মানসম্মত, সর্বজনীন ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার অধিকার; ও

সবার জন্য অবদানবিহীন জীবনধারণের উপযোগী পেনশন (যারা অন্য কোনো ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন তারা ছাড়া)

এবং এগুলোর পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ভাতা—যা ভারতের জনসংখ্যার শুধু শীর্ষ ১ শতাংশের ওপর দুটি কর আরোপ করেই দেওয়া সম্ভব। প্রথমত, ২ শতাংশ সম্পদ কর। দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরিত সম্পদের ওপর এক-তৃতীয়াংশ উত্তরাধিকার কর।

আমি নিশ্চিত, সমাজের শুধু শীর্ষ পর্যায়ের ধনীদের ওপর কর আরোপ করে বাংলাদেশেও একই ধরনের অধিকারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র সহজেই গড়ে তোলা সম্ভব।

এমন একটি ‘নতুন উদ্যোগ’ জনগণকে অর্থনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনতে চাওয়া সরকারকে সমর্থন করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

ডেইলি স্টার: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের অধিকাংশজুড়েই রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত যুক্ত। কিন্তু কম খরচের রপ্তানির ওপর নির্ভর করে একটি দেশ কি সত্যিই সমৃদ্ধ হতে পারে? রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেলের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা কী এবং এতে আটকে পড়া এড়াতে বাংলাদেশের এখন কী করা উচিত?

প্রভাত পাটনায়েক: রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশলের একটি দিক রয়েছে, যা প্রায়ই যথাযথভাবে উপলব্ধি করা হয় না। বিশ্বের সব দেশ যদি রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশল অনুসরণ করে, তাহলে এতে সব দেশের সম্মিলিত রপ্তানির প্রবৃদ্ধি তথা বিশ্ববাজারের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ে না।

তাই কিছু দেশের রপ্তানি যদি বিশ্ববাজারের তুলনায় দ্রুত হারে বাড়ে, তাহলে অন্য কিছু দেশের রপ্তানি বৃদ্ধির হার অবশ্যই কম হতে হবে। অন্য কথায়, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশল দেশগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। সহযোগিতার পরিবর্তে এটি তাদের মধ্যে ডারউইনীয় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে, যা আমার কাছে মৌলিকভাবেই নিন্দনীয়।

তবে অভ্যন্তরীণ বাজারভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না।

কিছু পরিসংখ্যান বিবেচনা করা যাক। কোভিড অতিমারি বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দেওয়ারও আগে ২০১০–২০২০ দশকে বৈশ্বিক জিডিপির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

একই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে এই দুই হারের পার্থক্য তথা বিশ্ব অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে প্রায় ১ শতাংশ।

কিন্তু এসময় বৈশ্বিক শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধির হার ছিল আরও বেশি, প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ। তাই গোটা বিশ্বকে বিবেচনায় নিলে, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশলের অধীনে শুধু শ্রমশক্তিতে নতুন করে যুক্ত হওয়া মানুষদেরই কর্মসংস্থান দেওয়া সম্ভব হবে না। এবং এই পরিসংখ্যানে আগে থেকে উপস্থিত বেকার, অর্ধবেকার ও খণ্ডকালীন শ্রমিকদের কথা না হয় বাদই দিলাম।

যেহেতু দারিদ্র্যের মাত্রার সঙ্গে এই শ্রম মজুতের আকারের সম্পর্ক রয়েছে, তাই রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশলে বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য দূর হবে না। বরং এ কৌশল অনুসরণ করতে থাকলে সময়ের সঙ্গে দারিদ্র্য আরও বাড়বে।

অবশ্য রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশলে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ ভালো করতে পারে, কিন্তু তা করতে গিয়ে তাকে অন্য কোনো দেশকে আরও খারাপ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে হবে। তাই দেশগুলোকে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বড় দেশগুলো তা তুলনামূলক সহজেই করতে পারে, কিন্তু ছোট দেশগুলোকে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিতে একত্র হয়ে পর্যাপ্ত আকারের একটি অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি করতে হবে, যার ভিত্তিতে তারা প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।

অবশ্য অভ্যন্তরীণ বাজারনির্ভর প্রবৃদ্ধির অর্থ শুধু অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নয়; এ ধরনের প্রবৃদ্ধি অনুসরণকারী দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পরস্পরের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে, তবে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হতে হবে অভ্যন্তরীণ বাজার।

অর্থনীতিবিদ নিকোলাস কালডর একসময় রপ্তানিনির্ভর শিল্পায়নের দুটি ধরনের মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন: একটি হলো—যেখানে অন্যান্য দেশে রপ্তানির মাধ্যমে শিল্পের প্রবৃদ্ধি ঘটে; আর অন্যটিতে প্রবৃদ্ধি ঘটে কৃষিতে রপ্তানির মাধ্যমে। আমি দ্বিতীয়টির পক্ষে।

ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা এবং কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চাপে রয়েছে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো বারবার কেন এমন পরিস্থিতিতে পড়ে? বাংলাদেশ কীভাবে নিজেদের উন্নয়ন কৌশলে স্বাধীনতা বজায় রেখেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে?

প্রভাত পাটনায়েক: শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন দেশই এসব দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার মুখোমুখি। এর কারণ লুকিয়ে আছে বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থার একটি মৌলিক ত্রুটির মধ্যে।

ধরা যাক, পৃথিবীতে মাত্র দুটি দেশ আছে এবং তারা একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য করে। একটি দেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে, অর্থাৎ দেশটি যতটা আমদানি করে তার চেয়ে বেশি রপ্তানি করে। অন্য দেশটির ঠিক সমপরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি আছে।

এখন উদ্বৃত্ত দেশটি যদি নিজের দেশের পণ্য ও সেবার ওপর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায়—যেমন শ্রমিক ও কৃষকদের আয় বাড়িয়ে তাদের বেশি পণ্য ও সেবা কেনার সুযোগ দেয়, তাহলে সেই বাড়তি চাহিদার একটি অংশ ঘাটতি থাকা দেশের পণ্য আমদানির দিকে যাবে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি-উদ্বৃত্তের ভারসাম্য কমে আসবে।

এর ফলে শুধু বাণিজ্যের ভারসাম্যই ফিরবে না; দুই দেশ মিলিয়ে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও মানুষের ভোগও বাড়বে। বিশেষ করে ঘাটতি থাকা দেশটি বেশি উপকৃত হবে। অর্থাৎ, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য ঘাটতি থাকা দেশকে শুধু আমদানি কমিয়ে অর্থনীতি সংকুচিত করতে হবে না; বরং উদ্বৃত্ত দেশ নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ালেও একই ভারসাম্য অর্জন করা সম্ভব।

কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থা এই পথ অনুসরণ করে না। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা দূর করতে উদ্বৃত্ত দেশকে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বাড়িয়ে সমন্বয় করতে বাধ্য করা হয় না; বরং ঘাটতিতে থাকা দেশকেই তার অভ্যন্তরীণ ব্যবহার কমাতে বাধ্য করা হয়।

এতে বিশ্বে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও ভোগ কমে যায় এবং ঘাটতিতে থাকা দেশটির ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে তীব্র হয়। এটি অত্যন্ত অযৌক্তিক একটি ব্যবস্থা।

১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সময় এটি চালু করা হয়েছিল এবং এখনো টিকে আছে, কারণ পুঁজিবাদের অধীনে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর পরিবর্তে তা কমানোর প্রতিই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই অযৌক্তিক ব্যবস্থার কারণে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে বাণিজ্যনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

ডেইলি স্টার: খাদ্যের দাম, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আমদানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা গ্লোবাল সাউথজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আরও সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিপর্যয়গুলো থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?

প্রভাত পাটনায়েক: ঔপনিবেশিক সময়ের মতোই এখনো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো মূলত গ্লোবাল নর্থের জন্য প্রাথমিক পণ্য উৎপাদন করে। তবে একটি পার্থক্য রয়েছে—নিজেদের সরকারের বিপুল ভর্তুকির কারণে উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলো খাদ্যশস্য ও দুগ্ধজাত পণ্যের বড় উৎপাদক হয়ে উঠেছে। ফলে এখন দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর উত্তর থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করার এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিবর্তে অর্থকরী ফসল ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ার চাপ রয়েছে।

অন্য কথায়, দক্ষিণের দেশগুলোকে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক আফ্রিকান দেশ ইতোমধ্যেই করেছে। তবে এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা পরিত্যাগের ফলে এ দেশগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। গ্লোবাল নর্থের দেশগুলো যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে এসব দেশ দুর্ভিক্ষের মতো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপিত না হলেও অন্য যেকোনো বিপর্যয়ে তারা খাদ্যশস্যের মারাত্মক ঘাটতিতে পড়তে পারে।

খাদ্যশস্যের তুলনায় অর্থকরী ফসলের দাম অনেক বেশি ওঠানামা করে। যে বছর অর্থকরী ফসলের দাম ধসে পড়ে, সে বছর দেশটির খাদ্যশস্যের প্রয়োজন মেটানোর মতো ক্রয়ক্ষমতা থাকে না। আর কোনোভাবে নিজের দেশের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ আমদানি নিশ্চিত করলেও তা ওই দেশের জনগণের কেনার মতো ক্রয়ক্ষমতা থাকবে না।

এর ফলে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। যেগুলোকে অধ্যাপক অমিয় কুমার বাগচী যথার্থভাবেই ‘বিশ্বায়নের দুর্ভিক্ষ’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, বিশ্বায়নের ফলে যে উৎপাদন বিশেষায়ন ঘটে, সেগুলো থেকেই এসব দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি।

তাই বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নয়; দুর্ভিক্ষের মতো বিপর্যয় এড়ানোর প্রয়োজনও এর সঙ্গে জড়িত। আর এ কারণেই গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে।

কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ভারত সরকার খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত করতে নিজের দেশে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা পুরো ব্যবস্থাটিই ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কৃষকরা প্রায় বছরব্যাপী আন্দোলন চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটে। অন্য কথায়, কৃষকরাই চান তাদের নিজেদের দেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক।

ডেইলি স্টার: অনেকেই মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্তের কাছে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাস্তব অর্থে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্বরূপ কেমন হবে?

প্রভাত পাটনায়েক: অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মূল অর্থ হলো—একটি দেশের অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারিত হবে তার নিজের জনগণের ইচ্ছায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মসূচি থাকে এবং গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেওয়ার সময় জনগণ কার্যত বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলোর মধ্য থেকে একটিকে বেছে নেয়। কিন্তু নব্যউদারবাদ (নিউলিবারেলিজম) পুরো চিত্রটিই বদলে দিয়েছে।

এমন এক বিশ্বে, যেখানে অর্থব্যবস্থা বৈশ্বিক হলেও দেশ এখনো জাতিরাষ্ট্র হিসেবেই রয়েছে—সেখানে জনগণ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার ইচ্ছাই ওই দেশের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ করে।

পুঁজি বাইরে চলে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় সব রাজনৈতিক দল কমবেশি একই অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা অর্থব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি এই বাধা সত্ত্বেও ভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে কোনো দল নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর, বড় ধরনের পুঁজির বহির্গমনের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ঠেকাতে নিজেদের অবস্থান বা নীতি পরিবর্তন করে।

তাই গ্লোবাল সাউথের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের সবচেয়ে মৌলিক শর্ত হলো—অর্থ তথা পুঁজির বহির্গমনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। আগেই বলা হয়েছে, এই শর্তটিই একটি স্বাধীন উন্নয়ন কৌশলের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে।

সংক্ষেপে বললে, এ ধরনের কৌশলের মধ্যে থাকবে অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরতা, যার জন্য কৃষির উন্নয়ন করা; বেসরকারি খাতের ‘বিনিয়োগ অবরোধ’ মোকাবিলায় সরকারি খাতকে শক্তিশালী করা; অধিকারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিকেন্দ্রীকরণ করা, যাতে এমনকি গ্রাম পর্যায়ের সভায় সরাসরি নিজেদের অর্থনৈতিক জীবনে প্রভাব ফেলে এমন বিষয়ে মানুষ হস্তক্ষেপ করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ডেইলি স্টার: বাণিজ্যের ধরন পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের মধ্যেই আমরা এক ধরনের গভীর বৈশ্বিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি। আপনি কি মনে করেন, এই সময়টি গ্লোবাল সাউথকে ভিন্ন কোনো উন্নয়নপথ বা কৌশল অনুসরণের সত্যিকারের সুযোগ দিচ্ছে? যদি তাই হয়, তাহলে এই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কী করা উচিত?

প্রভাত পাটনায়েক: এটি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক পরিবর্তনের একটি সময়। তবে গ্লোবাল সাউথের ওপর শীর্ষস্থানীয় পুঁজিবাদী দেশ যেসব পরিবর্তন চাপিয়ে দিচ্ছে, তার ফল হলো পুনঃউপনিবেশায়নের দিকে যাওয়া।

এই প্রচেষ্টায় দুটি প্রধান অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রথম অস্ত্রটি হলো—গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ওপর অসম চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া, যার ফলে এসব দেশকে আরও বেশি মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হবে এবং এর মাধ্যমে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান বেকারত্ব তাদের অর্থনীতিতে আমদানি করতে হবে।

বর্তমানে আলোচনাধীন ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি এমন একটি উদাহরণ এবং নিঃসন্দেহে গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি করা হবে।

দ্বিতীয় অস্ত্রটি হলো—দক্ষিণের সম্পদ, বিশেষ করে তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

এর অর্থ হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক উপনিবেশমুক্তির পর যে অর্থনৈতিক উপনিবেশমুক্তি ঘটেছিল, তার উল্টো পথে যাওয়া। ওই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথ তার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছিল।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের পর দেশটির তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এই পুনঃউপনিবেশায়নের প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ। কেননা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় ভেনেজুয়েলায় তেলের মজুত সবচেয়ে বেশি।

আরেকটি উদাহরণ হলো—যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আগ্রাসনের মাধ্যমে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটিয়ে ইরানের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, যেটি অবশ্যই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিরল মৃত্তিকাসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাও একই কৌশলের অংশ।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরিকল্পনা সফল না হওয়া ‘শাসন পরিবর্তন’ প্রচেষ্টার পথে বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে—পরিকল্পনাটি বাতিল হয়ে গিয়েছে।

তাই বিকল্প অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করতে বাংলাদেশের মতো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে প্রথমেই এই পুনঃউপনিবেশায়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী করার সুযোগ বহাল চায় জামায়াত

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশ নেওয়ার সুযোগ বহাল রাখা, মন্ত্রী-এমপিদের নির্বাচনী প্রচারে নিষেধাজ্ঞাসহ একগুচ্ছ দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

আজ বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ দুই কমিশনারের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

এর আগে বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত জামায়াতের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইসির সঙ্গে এই বৈঠকে অংশ নেয়।

বৈঠক শেষে গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার প্রয়োজনে আমরা কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ইসির সঙ্গে মতবিনিময় করেছি।

বৈঠকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য করার যে প্রাথমিক সুপারিশের কথা উঠে এসেছে, তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে জামায়াত। 

ইসির সেই সুপারিশে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক যারা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা সরকারি বেতনের একটা অংশ পান, সেই শিক্ষকরা নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। 

এর বিপরীতে জামায়াতের যুক্তি, সংবিধানে বা জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি বা নির্বাচনের ব্যাপারে বিধিনিষেধ নেই। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের বাদ দেওয়াটা বৈষম্যমূলক।

গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুদীর্ঘ ইতিহাসে স্কুল-কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে থাকেন। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোন আলোচনা ছাড়াই এই রেকমেন্ডেশন সরকারকে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। 

দলটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক যেসব নিয়োগ দিয়েছে, তাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছে জামায়াত। দলটির মতে, এসব পদে থেকে সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনে অংশ নিলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে না এবং তা পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি করবে।

যেহেতু এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না, তাই সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীরা যেন কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা বা সভায় অংশ নিতে না পারেন, সে ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারির লিখিত দাবি জানিয়েছে দলটি।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে শামসুল আলমের নিয়োগের সমালোচনাও করেছে জামায়াত।

গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, তিনি বিএনপির একটি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা হওয়ায় এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তির নিয়োগ নির্বাচন নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা। তাই অবিলম্বে তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানানো হয়।

এছাড়া, রাজনীতি বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা কোনো রাজনৈতিক দলের পদে থাকা ব্যক্তিরা যেন কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়েছে দলটি।

৬ বছরে প্রথমবারের মতো শিল্প খাতের উৎপাদন কমেছে

জ্বালানি সংকট, দুর্বল রপ্তানি চাহিদা ও উচ্চ ব্যাংক ঋণের খরচের চাপে ধুঁকছে দেশের শিল্প খাত। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে উৎপাদন কমেছে কারখানাগুলোতে। ২০২০ সালের করোনাকালের পর দেশে শিল্প উৎপাদনে এমন বড় পতন এই প্রথম।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গতকাল সোমবার প্রকাশিত সাময়িক উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ কমেছে। অথচ এক বছর আগে একই সময়ে এই খাতে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।

২০২০ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশব্যাপী কোভিড লকডাউনের সময় উৎপাদন ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। এরপর সাম্প্রতিক এই সংকোচনের আগ পর্যন্ত পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল।

অর্থনীতিবিদরা সাম্প্রতিক এই পতনের জন্য দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তাকে দায়ী করেছেন, যা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. দ্বীন ইসলাম বলেন, এই সংকোচন কোনো সাময়িক পতন নয়, বরং এটি আমাদের অর্থনীতির গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত দুর্বলতাকেই প্রতিফলিত করে।

তিনি বলেন, শিল্পের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির হার একটি স্পষ্ট সংকেত যে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতার কারণে উৎপাদন ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

‘গ্যাস ও বিদ্যুতের অব্যাহত সংকট কারখানার সক্ষমতার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ ঋণের খরচ এবং দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ শিল্প কর্মকাণ্ডকে আরও সংকুচিত করেছে।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি সম্ভবত রপ্তানি কমার সঙ্গে সম্পর্কিত।

শিল্প খাতের এই মন্দার প্রভাবে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

কৃষি ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির গতিও কমেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে সেবা খাত, যা জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি—সেটির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে দ্রুত কমে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ হয়েছে। এটি মূলত পুরো অর্থনীতির সর্বব্যাপী দুর্বল চিত্রকেই ফুটিয়ে তুলছে।

অধ্যাপক দ্বীন ইসলাম মনে করেন, সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ ও বাজেট সুবিধা উদ্যোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে এসব উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় পরিপূরক সংস্কারের ওপর।

তিনি বলেন, ভর্তুকিযুক্ত ঋণ দেওয়া জরুরি, তবে তা যথেষ্ট নয়। জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকলে উৎপাদনকারীরা উৎপাদন বাড়াতে পারবেন না। আসল চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং একটি স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা।

তিনি বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, ব্যাংকগুলো এখন অনেক বেশি ঝুঁকিবিমুখ হয়ে পড়েছে। তাদের বেশিরভাগ তারল্য এখন উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে ঋণের বদলে সরকারি সিকিউরিটিজে চলে যাচ্ছে। বাজারে আস্থা ফিরে না এলে এবং শিল্প খাতে ঋণের প্রবাহ শুরু না হলে, আর্থিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও শিল্পের পুনরুদ্ধার ধীরগতিতেই চলবে।

বাংলাদেশ যেহেতু স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে, তাই অধ্যাপক দ্বীন ইসলামের মতে, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো এখন নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিক পরিবেশে প্রবেশ করছে, যেখানে শিল্পগুলো আগের মতো আর অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে না, যে সুবিধার ওপর তারা এতদিন নির্ভরশীল ছিল।

তিনি আরও বলেন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর এটাই উপযুক্ত সময়। অন্যথায়, বর্তমান এই মন্দা রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান এই অর্থনৈতিক মন্থরতাকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

তিনি বলেন, নির্বাচন একটি ‘ধীরে চলো’ বা পর্যবেক্ষণমূলক পরিবেশ তৈরি করেছিল, যা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে বাধ্য করে। বিনিয়োগকারীরা যখন নীতিমালার বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন না, তখন স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যায় এবং প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে তার প্রতিফলন ঘটে।

তিনি আরও যোগ করেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা যুক্ত হয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দুর্বল করে রেখেছিল।

সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে—আইএমএফের এমন পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করে আশিকুর বলেন, এই পূর্বাভাসকে কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে বরং একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।

তিনি বলেন, কেবল সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে বাংলাদেশ শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি আশা করতে পারে না। এর জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন, যা দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে।

তিনি যুক্তি দেন, দেশ এখন স্বল্প প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির এমন এক বৃত্তে আটকা পড়েছে, যা কেবল আর্থিক সংহতি বা আর্থিক খাতের সংস্কার দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।

পিআরআইয়ের এই প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত বাধা দূর করতে সরকারের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকারী সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটি বিশ্বাসযোগ্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরতে হবে যা ব্যবসায়িক নিশ্চয়তা ফিরিয়ে আনবে। একবার আস্থা ফিরে এলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরবে।

এর আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৬ অর্থবছরের জন্য দেশের সাময়িক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল, যা আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি।

বহুজাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে মিশ্র পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক তাদের ২০২৬ সালের জুনের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ প্রতিবেদনে দীর্ঘ সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হওয়ার আভাস দিয়েছে।

অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) শিল্প খাতের মন্থর গতি এবং অব্যাহত অনিশ্চয়তার কারণে তাদের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ করেছে।

আইএমএফ তাদের ২০২৬ সালের এপ্রিলের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে তুলনামূলক ইতিবাচক ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বজায় রেখেছে। তবে সংস্থাটি বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হলে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার, শক্তিশালী বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি।

আইএমএফ আরও পূর্বাভাস দিয়েছে, আর্থিক ও ব্যাংক খাতের অব্যাহত চাপ থাকলেও চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) বাংলাদেশের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়বে।

‘১৫টি শট নিয়েও গোল নেই’, আক্ষেপ কলম্বিয়া কোচের

বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের কাছে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছে কলম্বিয়া। তবে ম্যাচ শেষে হতাশ হলেও নিজের খেলোয়াড়দের সমালোচনা করেননি কোচ নেস্তর লরেঞ্জো। পুরো ম্যাচে ভালো খেলেও গোল করতে না পারার মূল্যই দিতে হয়েছে দলকে বলে জানান তিনি।

অতিরিক্ত সময়সহ ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে গোলশূন্য ড্র হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ভাগ্য সঙ্গ দেয় সুইজারল্যান্ডের। ম্যাচ শেষে সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে লরেঞ্জো বলেন, গোলের সামনে ব্যর্থতাই তাদের বিদায়ের প্রধান কারণ, ‘নিঃসন্দেহে আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি ছিল গোল করতে না পারা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানতাম ম্যাচটি খুবই জমাট, কৌশলনির্ভর এবং সমানে সমান হবে। তবু আমার বিশ্বাস, ৯০ মিনিটে আমাদের জয়ের দাবিটাই বেশি ছিল। আমরা আক্রমণের চেষ্টা করেছি, অনেক শট নিয়েছি, কিন্তু গোল করতে পারিনি।’

লরেঞ্জোর মতে, সময় যত গড়িয়েছে ম্যাচের গতি তত কমেছে। দুই দলই ক্লান্ত হয়ে পড়ায় খেলা শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে গড়ায়। ম্যাচে জন আরিয়াসকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও ব্যাখ্যা দেন কলম্বিয়া কোচ। তার ভাষ্য, আরিয়াস শারীরিকভাবে ক্লান্ত ছিলেন। পাশাপাশি আগের ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখায় আরেকটি কার্ড পেলে সম্ভাব্য কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ছিটকে যাওয়ার ঝুঁকিও ছিল।
একই কারণে ম্যাচের শেষদিকে বদলি করা হয় ফরোয়ার্ড লুইস সুয়ারেজকেও, যিনি দ্বিতীয়ার্ধে একটি হলুদ কার্ড দেখেছিলেন।

লরেঞ্জো বলেন, ‘শেষ দিকে আরেকটি ট্যাকলে লাল কার্ড দেখার ঝুঁকি ছিল। পাশাপাশি ক্লান্তিও কাজ করছিল।

দলের পারফরম্যান্স নিয়ে অবশ্য গর্বই প্রকাশ করেছেন তিনি, ‘আমরা ১৫টি শট নিয়েছি, যা অনেক। কিন্তু গোল করতে না পারলে তার মূল্য দিতেই হয়। খেলোয়াড়দের দোষ দেওয়ার কিছু নেই। কখনও বল জালে জড়ায়, কখনও জড়ায় না।’

বিশ্বকাপে দারুণ সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারের হতাশা নিয়ে ঘরে ফিরতে হচ্ছে কলম্বিয়াকে। অন্যদিকে ইতিহাস গড়ে ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে সুইজারল্যান্ড, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

 

‘জোহরা বেগমের ইচ্ছাপত্র’ টেলিফিল্মের শুটিংয়ের ফাঁকে তারকাদের আলাপচারিতা

রাজধানীর উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়ির নাম আপনঘর। ওই বাড়িতে নাটক-সিনেমার শুটিং হয়ে আসছে অনেক দিন ধরে। সেদিন ছিল ঈদের একটি টেলিফিল্মের শুটিং। বড় বড় তারকারা শুটিং করছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম একজন ফেরদৌসী মজুমদার।

শুটিং হাউজে পৌঁছার আগেই হঠাৎ বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির মধ্যে পৌঁছে যাই সেখানে। ভেতরে ঢুকেই দেখতে পাই শুটিং চলছে। ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় পৌঁছাই।

ভেতরে অনেক মানুষ। বুঝতে পারি দৃশ্যধারণ চলছে। দূর থেকে উঁকি দিয়ে দেখতে পাই ক্যামেরার সামনে একটি চেয়ারে বসে আছেন ফেরদৌসী মজুমদার।

'জোহরা বেগমের ইচ্ছাপত্র’

আরেকটি চেয়ারে বসে আছেন মামুনুর রশীদ। মনিটরের সামনে বসে আছেন পরিচালক আরিফ খান। তার পাশে বসে আছেন তৌকীর আহমেদ। এই টেলিফিল্মটি তৌকীর আহমেদের লেখা।

পরিচালক দৃশ্য বুঝিয়ে দিলেন। কিছুটা সময় রিহার্সেল করে নেন ফেরদৌসী মজুমদার এবং মামুনুর রশীদ। পরিচালক বললেন, ‘এবার শুরু করি তাহলে?’

ফেরদৌসী মজুমদার বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি রেডি।’ মামুনুর রশীদ হাসলেন।

মুগব

অ্যাকশন বলার সঙ্গে সঙ্গে সংলাপ শুরু করেন ফেরদৌসী মজুমদার। বড় একটি সংলাপ টানা বলে যান। শেষে গিয়ে আটকে যান। দ্রুত প্রোডাকশনের কেউ একজন পানি নিয়ে আসে। ফেরদৌসী মজুমদার বললেন, ‘সরি।’

পরিচালক আরিফ খান বললেন, ‘সমস্যা নেই।’ পাশ থেকে তৌকীর আহমেদ বললেন, ‘সুন্দর হয়েছে।’

ফের অ্যাকশন বলা মাত্রই ফেরদৌসী মজুমদার সংলাপ শুরু করেন চেয়ারে বসে। ধীরে ধীরে তিনি উঠে দাঁড়ান। তার সংলাপ শেষ হবার পরেই মামুনুর রশীদ সংলাপ শুরু করেন। চমৎকার একটি দৃশ্যের শুটিং শেষ হয়।

ইউনিটের সবাই হাততালি দেন। ফেরদৌসী মজুমদার বললেন, ‘ঠিকঠাক বলেছি তো?’ মামুনুর রশীদ বললেন, ‘অসাধারণ হয়েছে আপনার অভিনয়। এখনো এত এনার্জি নিয়ে কাজ করছেন ভাবতেই অবাক লাগছে।’

ওকে

ফেরদৌসী মজুমদার হাসলেন। সহকারি পরিচালক এবং আরও দুজন ছুটে এলেন ফেরদৌসী মজুমদারকে মেকআপরুমে নেবার জন্য। তিনি বললেন, ‘ধরতে হবে না, একাই যেতে পারব।’ তারপরও তারা সঙ্গে গেলেন।

মেকআপরুমে গিয়ে বসলেন ফেরদৌসী মজুমদার। ড্রয়িংরুমে বসলেন মামুনুর রশীদ, তৌকীর আহমেদ, পরিচালক।

মামুনুর রশীদ বললেন, ‘অনেক বছর পর ফেরদৌসী মজুমদারের সঙ্গে টিভি নাটকে অভিনয় করছি। ফেরদৌসী মজুমদারের স্মৃতি শক্তি অনেক প্রখর। এখনো দুর্দান্ত অভিনয় করছেন।’

ফেরদৌসী মজুমদার সম্পর্কে মামুনুর রশীদ আরো বলেন, ‘মঞ্চ, টিভি নাটক, বেতার, সবখানেই তিনি।

অভিনয়ের লিজেন্ড ফেরদৌসী মজুমদার। সেই পাকিস্তান আমলে টেলিভিশনের জন্য অরণ্যে একদা নামে একটি নাটক লিখেছিলাম, সেই নাটকে তিনি অভিনয় করেছিলেন। সংশপ্তক নাটকে তিনি দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছেন হুরমতি চরিত্রে অভিনয় করে। মঞ্চে তার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় দেখেছি। আরও দেখেছি।’

ফেরদৌসী মজুমদার

এতক্ষণে ফেরদৌসী মজুমদার পোশাক বদলে নেন। তিনি অভিনয় করছেন জোহরা চরিত্রে। টেলিফিল্মের নাম ‘জোহরা বেগমের ইচ্ছাপত্র’।

ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, ‘সুন্দর পরিবেশে অভিনয় করছি। পরিচালক, সহশিল্পী, ইউনিটের সবাই খুব সহযোগিতা করছেন। চেনা মানুষগুলোর সঙ্গে অভিনয় করছি। তৌকীর আহমেদ আমার ভীষণ পছন্দের। তিনি এটি লিখেছেন।’

ফেরদৌসী মজুমদার আরও বলেন, ‘জোহরা চরিত্রে অভিনয় করে তৃপ্তি পাচ্ছি। খুব ভালো একটি চরিত্র। অভিনয়ের সুযোগ আছে।’

আবারও ক্যামেরার সামনে গেলেন ফেরদৌসী মজুমদার। এবারের দৃশ্যটিতে তিনি একা অভিনয় করবেন। পরিচালক সেভাবেই বুঝিয়ে দেন। অ্যাকশন বলার আগে গুণী অভিনেত্রী স্ক্রিপ্টে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন। চশমা ঠিক করে নিয়ে মন দিয়ে সংলাপ পড়ছেন। বাইরে তখন বৃষ্টি। মেঘের গর্জন হচ্ছে। বজ্রপাতও হচ্ছে। কেউ একজন বললেন, ‘আজ বৃষ্টি থামবে না?’

১

দৃশ্যটি রাতের। সেভাবেই ঘরটিকে সাজানো হয়েছে। লাইনম্যান সুন্দর করে রাতের পরিবেশ তৈরি করেছেন।
ফেরদৌসী মজুমদার বললেন, ‘রাতের দৃশ্য তাই তো?’ সহকারি পরিচালক পাশ থেকে বললেন, ‘জি ম্যাডাম।’

দশ-পনেরো মিনিট ফেরদৌসী মজুমদার দাঁড়ালেন। পরিচালক তার কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর পজিশন দেখিয়ে দেন। নতুন এই দৃশ্যটি একটু অন্যরকম। কেননা, জোহরা বেগম একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী, মঞ্চে কাজ করেছেন একসময়। সেই চরিত্রগুলো এখনো ভুলতে পারেননি। স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি নিজ বাড়িতে মাঝে মাঝে স্বপ্নের ঘরে অভিনয় করেন। সেভাবেই তিনি অভিনয় করছেন।

অ্যাকশন বলার সঙ্গে সঙ্গে ফেরদৌসী মজুমদার সংলাপ দেওয়া শুরু করলেন। অর্ধেক বলার পর ভুলে গেলেন। ইউনিটের কয়েকজন তাকে ধরে বসালেন চেয়ারে। কিছু সময় বিশ্রাম নেবার পর তিনি আবারও স্ক্রিপ্টে চোখ বুলিয়ে নেন এবং বললেন, ‘এবার যাওয়া যাক।’

শুরু হলো তার সংলাপ দেওয়া। এবার একবারেই বড় একটি দৃশ্যধারণের কাজ শেষ হলো। ইউনিটের সবাই আবারও হাততালি দিলেন। সবাই একবাক্যে বললেন, ‘অসাধারণ আপনার অভিনয়!’

১

ফেরদৌসী মজুমদার তৃপ্তির হাসি হাসলেন। লাঞ্চের বিরতি দেওয়া হলো। ইউনিটের কেউ একজন বললেন, ‘৩০ মিনিট পর আবারও শুটিং শুরু হবে।’

নিচতলায় এক এক করে সবাই খেতে এলেন। মামুনুর রশীদ, তৌকীর আহমেদ সহ কয়েকজন একসঙ্গে খেতে বসলেন। পরিচালক কথায় কথায় জানালেন, আফজাল ভাই রওনা দিয়েছেন।

খেতে বসে মামুনুর রশীদ বললেন, ‘তৌকীর, টেলিফিল্মটি কবে লিখেছ?’

তৌকীর আহমেদ বললেন, ‘আমেরিকায় বসে লিখেছি।’ এরপর মামুনুর রশীদ বললেন, ‘গল্পটা দুর্দান্ত।’

৪০ মিনিট পর শুটিং শুরু হলো। এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। এবারের দৃশ্যের জন্য বলা হলো ফেরদৌসী মজুমদার, মামুনুর রশীদ ও তৌকীর আহমেদকে।

১

ফেরদৌসী মজুমদার এলেন। মামুনুর রশীদ ও তিনি চেয়ারে বসলেন। তৌকীর আহমেদ সংলাপ শুরু হলেই ঢুকবেন।

অ্যাকশন বলার পর ফেরদৌসী মজুমদার সংলাপ শুরু করলেন। মামুনুর রশীদের সঙ্গে জরুরি একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছেন তিনি। এমন সময় তৌকীর আহমেদ ভেতরে এসে মায়ের কাছে সম্পত্তি ভাগের কথা বলেন। এমন কথা শুনে ফেরদৌসী মজুমদার রেগে যান।

তৃতীয়বারে দৃশ্যটি চূড়ান্ত হয় এবং বেশ সময় লেগে যায়। আরও কিছু সময় পর আফজাল হোসেন এলেন এবং তিনি মেকআপরুমে গিয়ে রেডি হলেন।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আরেকটি দৃশ্যের জন্য ফেরদৌসী মজুমদার, আফজাল হোসেন এবং তৌকীর আহমেদ ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন। দৃশ্যটি চূড়ান্ত হতে অনেক সময় লাগল। পরিচালক যত্ন নিয়ে দৃশ্যটি শেষ করলেন।
এভাবে একটার পর একটা দৃশ্যধারণ চলতেই লাগল উত্তরার শুটিং হাউজে। ফের বিরতি দেওয়া হলো। মেকআপরুমে ফেরদৌসী মজুমদারের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেন আফজাল হোসেন। এদিকে মামুনুর রশীদ চলে যাবেন, তিনি বিদায় নেন সবার কাছ থেকে।

ফেরদৌসী মজুমদার বললেন, ‘মামুন আপনি ভালো থাকবেন।’ মামুনুর রশীদ বললেন, ‘আপনিও ভালো থাকবেন।’

এদিকে ফেরদৌসী মজুমদার ও আফজাল হোসেন গল্প করতে করতে ছবি তুলতে লাগলেন। আফজাল হোসেন একসময় বললেন, ‘অসাধারণ অভিনয় করছেন আপনি। অভিনয়ের জীবন্ত কিংবদন্তি আপনি।’
 

ইরানে ১৩ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

ইরানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ওপর অন্তত ১৩টি হামলার সত্যতা তারা নিশ্চিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার ঘটনায় হতাহতের বিষয়ে পাওয়া প্রতিবেদনের তথ্য এখনো যাচাই করা হচ্ছে।

এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রিয়েসুস বলেন, ‘ডব্লিউএইচও ইরানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ওপর ১৩টি এবং লেবাননে একটি হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছে।’

তবে তিনি কোনো পক্ষকে দায়ী করেননি এবং বিস্তারিত তথ্যও দেননি।

একই ব্রিফিংয়ে ডা. হানান বালখি জানান, ইরানে চারটি অ্যাম্বুলেন্সও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 
ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, কাছাকাছি হামলার কারণে কয়েকটি হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

দেশে ভূমিকম্প অনুভূত

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।

আজ বুধবার রাত ১০টা ৫১ মিনিটে এই কম্পন অনুভূত হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরে সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, আজ রাতে দেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার এবং রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প ছিল।

এদিকে ভূমিকম্প বিষয়ক ওয়েবসাইট ভলকানো ডিসকভারি জানিয়েছে, মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলে ৫ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূমিকম্পটি মাটির ১৩০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে।

চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির আন্দোলন ও বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার

দেশের চা শ্রমিকরা দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিসহ চার দফা দাবিতে এক মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করছেন। অন্য তিনটি দাবি হলো—২০২৩ সালের গেজেট বাতিল, যাতে বছরে মজুরি মাত্র ৫ শতাংশ বাড়ানোর বিধান রয়েছে; চা জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা; এবং অবিলম্বে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বিটিডব্লিউইউ) নির্বাচন দেওয়া।

২০২৩ সালের গেজেট অনুযায়ী ৫ শতাংশ মজুরি বাড়ানোর পর চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা থেকে বেড়ে ১৯৬ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ বেড়েছে মাত্র ৯ টাকা। বর্তমান বাজারে পরিবার নিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য এই মজুরি বৃদ্ধি শ্রমিকদের কাছে নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়।

আন্দোলনকারী চা শ্রমিকরা বলছেন, পাঁচ সদস্যের একটি শ্রমিক পরিবারের শুধু খাদ্যচাহিদা পূরণ করতেই প্রতিদিন প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা প্রয়োজন। এর বাইরে শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্র, বাসস্থানসহ অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন রয়েছে। ফলে ৫০০ টাকা মজুরির দাবি কোনো বিলাসিতা নয়, শুধু খাবার খেয়ে পরের দিন কাজ করবার দাবি মাত্র।

সাধারণত প্রতি দুই বছর পরপর মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের দরকষাকষির মাধ্যমে চা শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হতো। ২০২২ সালে ৩০০ টাকা মজুরি নির্ধারণের আন্দোলনের পর শ্রমিকদের মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১২০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা করা হয়েছিল।

কিন্তু একতরফাভাবে জারি করা ২০২৩ সালের গেজেটে এই দরকষাকষির বদলে বছরে মাত্র ৫ শতাংশ মজুরি বাড়ানোর ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফলে দৈনিক মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকা করে মজুরি বাড়ে, যা একেবারেই অপ্রতুল। এ কারণেই শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি ২০২৩ সালের গেজেট বাতিল চাইছেন। 

এখানে উল্লেখ করা দরকার, চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের মেয়াদ গত মাসেই শেষ হয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছিলেন, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের সরকারের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে আগস্টে মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হবে।

চা শ্রমিকদের আরেকটি দাবি হলো অবিলম্বে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজন করা। সর্বশেষ এই ইউনিয়নের নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে। দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে থাকা ইউনিয়ন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ শ্রমিকদের স্বার্থের বদলে মালিকপক্ষের স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ উঠেছে। 

সম্প্রতি ৫০০ টাকা মজুরি আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী গীতা রানী কানুকে এই ইউনিয়ন নেতাদের একাংশের করা মামলায় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এটা মজুরি আন্দোলনকে দুর্বল করতে বাগান মালিক ও সরকারের সঙ্গে কতিপয় ইউনিয়ন নেতার গাঁটছড়া বাঁধার ইঙ্গিত দেয়।

চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর প্রসঙ্গ উঠলেই চা বাগান মালিকেরা দাবি করেন, টাকার হিসেবে চা শ্রমিকরা দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরি পেলেও অন্যান্য যেসব সুবিধা তারা ভোগ করেন, সেগুলোর আর্থিক মূল্য ৫০০ টাকারও বেশি। চলুন দেখা যাক, বাগান মালিকরা কোন কোন ‘সুবিধাকে’ মজুরির হিসেবে দেখান এবং বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুসারে সেগুলোকে আসলেই অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা। 

এসব সুবিধঅর মধ্যে রয়েছে রেশন, বাসস্থান, চিকিৎসা সুবিধা, পেনশন, শ্রমিকদের সন্তানের শিক্ষা, পানি সরবরাহ, মশা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ছিটানো, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, গামছা সরবরাহের মতো কল্যাণমূলক কর্মসূচি, শ্রমিকদের বসতির আশপাশে উৎপাদিত ফলমূল ও শাকসবজির মূল্য, বাড়তি পাতা তোলার বোনাস এবং ভবিষ্য তহবিলে মালিকের দেওয়া চাঁদা।

কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী রেশন ছাড়া এসব সুবিধার কোনোটিকেই মজুরি হিসেবে গণ্য করা যায় না। শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২(৪৫) ধারায় বাসস্থান, আলো, পানি, চিকিৎসাসেবা বা অন্যান্য সুবিধার মূল্য, অবসর বা ভবিষ্য তহবিলে মালিকের দেওয়া চাঁদা এবং কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত খরচের জন্য দেওয়া অর্থকে মজুরির সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ চা বাগান মালিকরা পানি সরবরাহ, মশা নিয়ন্ত্রণ ও পয়োনিষ্কাশনের মতো চা বাগান পরিচালনার অপরিহার্য খরচকে শ্রমিকের মজুরি হিসেবে দেখাতে চাইছেন। এটি শুধু শ্রম আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়, যেকোনো বিবেচনাতেই অযৌক্তিক।

চা বাগানের বিশেষ পরিস্থিতির কারণে শ্রম আইনের ৯৬ ধারায় বাগানে বসবাসকারী প্রত্যেক শ্রমিক ও তার পরিবারের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার  কথা বলা হয়েছে। এটা শ্রমিকদের জন্য মালিকের একটি বাধ্যতামূলক কল্যাণমূলক ব্যবস্থা, শ্রমিকের মজুরির অংশ নয়।

এছাড়া চা শ্রমিকরা যে জমিতে বসবাস করেন, তা বাগান মালিকদের নিজস্ব জমি নয়। এগুলো সরকারি, অর্থাৎ জনগণের জমি। চা বাগানের জমি বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, বাগান মালিকরা এসব জমি সরকারের কাছ থেকে খুব কম খরচে ইজারা নেন। তাদের কোনো ইজারা ফি দিতে হয় না। শুধু একরপ্রতি বছরে ৩০০ টাকা ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হয়।

দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে বসবাস করলেও চা শ্রমিকদের এসব জমিতে আইনি অধিকার নেই। ঐতিহাসিক সিএস ও আরএস জরিপে তাদের বসতিগুলো খাস জমি হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে এসব জমিতে স্রেফ থাকতে দেওয়ার বিনিময়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা কম মজুরির শ্রমে আটকে আছেন।

প্রশ্ন আসতে পারে, মজুরি এত কম হলে চা শ্রমিকরা বাগানের কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন? কারণ কাজ ছেড়ে দিলে তাদের কয়েক প্রজন্মের বসতবাড়িও ছেড়ে দিতে হবে। ওই বাড়িই তাদের একমাত্র ঠিকানা। আইনি অধিকার না থাকায় সেই জমিটুকু ধরে রাখতে পরিবারের অন্তত একজনকে চা বাগানে কাজ করতে হয়।

সপ্তাহে শ্রমিক পরিবার প্রতি যে সাত-আট কেজি রেশনের চাল বা আটা দেওয়া হয়, সরকার থেকে সস্তায় লিজ নেওয়া বাগানের জমিতে যে ছোট্ট কুঁড়েঘরের অমানবিক পরিবেশে তাদের থাকতে দেওয়া হয় এবং বাগানে যে সামান্য স্বাস্থ্য সেবাটুকু তাদের মেলে, তার মূল্য যোগ করলেও তা বাংলাদেশের যেকোনো খাতের ন্যূনতম মজুরির থেকে কম এবং মানবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।

দেশের অন্য যে কোন স্থানের তুলনায় চা বাগানে দারিদ্রের হার বেশি। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। চরম দরিদ্রতা, অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়ায় দেশে যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া ও জরায়ু ক্যানসারের প্রবণতা চা শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। অপুষ্টির কারণে চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বাকায়, ২৭ শতাংশ শীর্ণকায় এবং স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। 

ভালো ফলনের জন্য চা গাছ ছাঁটাই করে নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি বাড়তে দেওয়া হয় না। চা শ্রমিকের জীবনটাও অনেকটা ছেঁটে দেওয়া চা গাছের মতোই, লেবার লাইনের একটা কুঁড়েঘরে বন্দী। মধ্যযুগের ভূমিদাসের মতোই মালিকের বাগানের সঙ্গে বাঁধা তার নিয়তি।

অতি সামান্য মজুরির কারণে কোনো কোনো শ্রমিক সকালে লবণ দিয়ে এক কাপ চা ও দুমুঠো চালভাজা খেয়ে কাজে যান। যে চা তারা উৎপাদন করেন, সেটি দুধ-চিনি দিয়ে খাওয়ার সামর্থ্যও তাদের নেই। দৈনিক হাজিরা নিশ্চিত করতে পাতা তোলা শ্রমিকদের ২৩ কেজি পাতা তুলতে হয়, গাছ ছাঁটাইয়ের শ্রমিকদের অন্তত ২৫০টি গাছ ছাঁটতে হয় এবং কীটনাশক ছিটানো শ্রমিকদের এক একর জমিতে কাজ করতে হয়।

দুপুরের খাবারও অনেক সময় শুধু মরিচ ও চা পাতার চাটনি, সঙ্গে মাঝে মধ্যে মুড়ি-চানাচুর। একেকদিন কাজ করতে গিয়ে হাত-পা ফুলে যায়। ঝোপালো চা গাছের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে হাত-পা-কোমর ছিলে যায়। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, সাপ-বিচ্ছুর কামড় খেয়ে তারা বাগানে কাজ করে। সন্তানের শিক্ষা মেলে না, চিকিৎসা মেলে না। যে ঘরটিতে প্রজন্মান্তরে তার বসবাস, সে ঘরটিও তার হয় না। ঘরটি ধরে রাখতে হলে পরিবারের একজনকে অন্তত চা শ্রমিক হতেই হয়।

অন্যদিকে ব্রিটিশ মালিকানাধীন কোম্পানি, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি করপোরেশনগুলো কম খরচে সরকারি খাস জমি ইজারা নেয় এবং ভর্তুকি মূল্যে সার পায়। তারপরও শ্রমিকদের বাঁচার মতো মজুরি দিতে তাদের যত টালবাহানা। 

প্রশ্ন হলো, শ্রীলঙ্কার চা বাগানের মালিকরা যদি একজন শ্রমিককে দৈনিক ১ হাজার ৭৫০ রুপি, অর্থাৎ প্রায় ৬৫০ টাকা দিতে পারেন এবং ভারতের কেরালার ব্যবসায়ীরা যদি ৫৪৬ রুপি, অর্থাৎ প্রায় ৭১০ টাকা দিতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের চা বাগান মালিকরা কেন তা পারবেন না?

বাংলাদেশের চা বাগানে উৎপাদনশীলতা কম, এই অজুহাতও গ্রহণযোগ্য নয়। বাগান মালিকরা যদি উৎপাদনব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে বিনিয়োগ না করেন, তার দায় শ্রমিকদের নিতে হবে—এটা কোনো কথা হতে পারে না।

এর সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারও জড়িত। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাইস-ইনডেক্স বেইজড ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার কথা বলেছিল। পাশাপাশি আয়বৈষম্য কমানো এবং চা জনগোষ্ঠীর সুষম উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিএনপির প্রার্থীরাও নির্বাচনী প্রচারণার সময় চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বর্তমানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সবচেয়ে বেশি চা শ্রমিকদের পাশে থাকবে। শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও বলেছিলেন, চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নকে সরকার অগ্রাধিকার দেবে।

চা শ্রমিকরা এর জবাবে বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপকভাবে ভোট দেন এবং কয়েকটি আসনে তাদের ভোট বিএনপি প্রার্থীদের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের উচিত ছিল নিজ উদ্যোগে চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো। এর বদলে শ্রমিকরা এক মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করলেও সরকার তাদের দাবি মেনে নেবে, এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৫০০ টাকা মজুরি আন্দোলনের নেত্রী গীতা রানী কানুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সরকারের উচিত তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। ৫০০ টাকা দৈনিক মজুরি ও ভূমির অধিকারসহ চা শ্রমিকদের চার দফা দাবি মেনে নেওয়া এবং গীতা রানী কানুকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া উচিত।

প্রতিদিন লাখ লাখ বাংলাদেশি যে চা পান করেন, সেই চা উৎপাদনের মূল্য যেন চা শ্রমিকদের চরম দারিদ্র্যের মধ্যে আটকে রাখার বিনিময়ে দিতে না হয়।

 

কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী ও লেখক; তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন। 

[email protected]

শ্রীমঙ্গলে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে হবিগঞ্জের পথে এনসিপি নেতারা

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে হবিগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা।

এর আগে প্রায় আধা ঘণ্টা তাদের যাত্রা আটকে ছিল বলে অভিযোগ করেন তারা।

এনসিপি সূত্র জানায়, আজ বুধবার বিকেল ৪টার কিছু পর রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউস থেকে এনসিপির গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে।

এনসিপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জাকারিয়া ইমন জানান, শ্রীমঙ্গলের চা-কন্যা এলাকায় পুলিশ তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমাদের চারবার আটকানো হয়েছে। বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটের দিকে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে আমরা আবার হবিগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছি। এখন কামাইছড়া পার হচ্ছি।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এনসিপি নেতাদের বহরে প্রায় ১০টি মাইক্রোবাস রয়েছে। বহরটি চা-কন্যা এলাকায় এলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। তখন গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপি নেতারা। পুলিশ এনসিপি নেতাদের ১৪৪ ধারার মধ্যে হবিগঞ্জে যেতে নিষেধ করেন। অপরদিকে এনসিপি নেতারা পুলিশকে বাধা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এনসিপি নেতাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই গাড়িবহর আটকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শুনছেন না। বহরটি শ্রীমঙ্গল পার হয়ে গেছে।’

হবিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক জানান, সকাল থেকেই হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সে বিষয়ে নজরদারিতে আছেন তিনি। মাঠে পুলিশ, বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। 

এর আগে, গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জে জুলাই পদযাত্রাকালে এনসিপির গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে দলের কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম ও নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারীসহ ১০ জন আহত হন বলে অভিযোগ করে দলটি।

এরপর আজ বিকেল ৩টায় হবিগঞ্জ পৌর শহরে সমাবেশের ডাক দেয় এনসিপি। একই সময়ে পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দেয় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল। দুই পক্ষের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে জেলা প্রশাসন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে। পরে সেখানে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেয় এনসিপি।

সচেতনতার অভাবেই সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা

ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো ডিজিটাল পেমেন্ট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর যত বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, সাইবার অপরাধীরা ততই তাদের অসচেতনতাকে ব্যবহার করে পাসওয়ার্ড ও অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো প্রতারণা করছে বলে এক গোলটেবিল বৈঠকে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সোমবার ঢাকার দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে গুগল ডট ওআরজির সহায়তায় দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘স্ট্রেন্দেনিং সাইবার রিসিলেন্স ফর এমএসএমইএস: ট্যাকলিং ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রড অ্যান্ড ইম্প্রুভিং গ্রিভ্যান্স মেকানিজম’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তারা জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার ও নীতিগত সংস্কারের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা বলেন, উন্নত প্রযুক্তির চেয়ে ডিজিটাল শৃঙ্খলার মৌলিক বিষয়গুলো মেনে চললেই অধিকাংশ প্রতারণা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, প্রায় ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ আর্থিক প্রতারণা ঘটে পাসওয়ার্ড বা ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) শেয়ার করার কারণে। কোনো অবস্থাতেই এগুলো শেয়ার করা উচিত না। সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং আচরণগত একটি চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ আর্থিক আচরণের অভ্যাস গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে আর্থিক সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করেছে। পাশাপাশি ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সী কিশোর-কিশোরীদের অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক লেনদেন আলাদা রাখা, দায়িত্ব অনুযায়ী কর্মীদের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং কোনো কর্মী চাকরি ছাড়লে সঙ্গে সঙ্গে তার ডিজিটাল প্রবেশাধিকার বাতিল করার পরামর্শ দেন তিনি।

এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা খান বলেন, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) জন্য ডিজিটাল রূপান্তর এখন অনিবার্য। সেইসঙ্গে সাইবার সহনশীলতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, আমাদের এই পথেই এগোতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। এসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও ওয়েবসাইট উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ জরুরি। কিন্তু, ওটিপি বা পাসওয়ার্ড শেয়ার করা যাবে না—এই সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।

ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আর্থিক প্রতারণা থেকে সুরক্ষিত রাখতে সমন্বিত সাইবার নিরাপত্তা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, প্রতারকরা প্রযুক্তিগত হ্যাকিংয়ের চেয়ে বেশি ব্যবহার করছে প্রতারণামূলক কৌশল।

ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. হাফিজুল ইসলাম বাবু বলেন, ভুয়া অর্থ পরিশোধের রসিদ, নকল ব্যবসায়িক পেজ এবং সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করে অপরাধীরা প্রতারণা করে।

তিনি বলেন, একদিন সকালে যখন এক সন্দেহভাজনকে আটক করি, তখন তার অ্যাকাউন্টে ছিল ৩ হাজার টাকা। সন্ধ্যার মধ্যে তার অ্যাকাউন্টে টাকার পরিমাণ বেড়ে হয়ে যায় ৪০ হাজার টাকা।

এই উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখান, কীভাবে প্রতারণার মাধ্যমে খুব দ্রুত অর্থ সংগ্রহ করে অপরাধীরা।

তার মতে, প্রতারকরা আরও বেশি মানুষকে ফাঁদে ফেলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পেজের প্রচারণায়ও অর্থ ব্যয় করে। চুরি হওয়া অর্থ সরিয়ে ফেলার আগেই সম্পদ জব্দ করতে সক্ষম একটি জাতীয় সমন্বিত সাইবার প্রতারণা অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠনের আহ্বান জানান তিনি।

দ্য ফ্রন্ট পেজের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক ফাসবীর এসকান্দার বলেন, সাইবার নিরাপত্তার মান ও কমপ্লায়েন্সে বাংলাদেশে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

বিদ্যমান ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্স বা নতুন ব্যবসার জন্য আলাদা ফোন নম্বর ব্যবহার করতে হয়। কেন?

তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার ও কার্যক্রম সীমিত করা সাইবার ঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শক্তিশালী ডিভাইস নিরাপত্তা নীতি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কমপ্লায়েন্স কাঠামো এবং বাধ্যতামূলক ডিভাইস নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডিন মো. শাহজাদ হোসেন বলেন, হিউম্যান ইরর এখনো সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি।

আলোচনায় তিনি এমন একটি র‌্যানসমওয়্যার হামলার উদাহরণ দেন, যা একজন কর্মী ভুয়া অনলাইন বিজ্ঞাপনে ক্লিক করার পর ঘটেছিল।

তিনি বলেন, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও গুগল ডট ওআরজির সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র গড়ে তুলেছে, যা ইতোমধ্যে এমএসএমই উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

ডিজিটাল ফরেনসিক ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য একটি সাইবার ইন্টেলিজেন্স ল্যাব প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় সাইবার সহনশীলতা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

র‌্যাপিডের (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট) নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ বলেন, উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরাও ভুয়া পরিচয় দেওয়া প্রতারকদের ফাঁদে পড়েন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পরিচয়ে প্রতারকের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুরুতে আমিও সন্দেহ করিনি।

অতিরিক্ত প্রশাসনিক সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে একজন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা সীমিত করার প্রস্তাবও দেন তিনি।

সিটি ব্যাংক পিএলসির ডিজিটাল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ ইব্রাহিম সাজিদ বলেন, বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য ফাঁস হওয়ার কারণে প্রতারকদের জন্য অন্যের পরিচয় ব্যবহার করা সহজ হয়ে গেছে। ফলে তারা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই দ্রুত কৌশল বদলে ফেলতে পারে।

তিনি প্রস্তাব করেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত। শুধু এই উদ্যোগই প্রতারণা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারে।

বৈঠকে উদ্যোক্তারা তাদের জীবিকা ও ব্যবসায় সাইবার প্রতারণার সরাসরি প্রভাবের কথা তুলে ধরেন।

বিউটি আক্তারের স্বামী এমএফএস এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বিউটি জানান, তাদের পরিবার নিয়মিত প্রতারণামূলক ফোনকল পেলেও এখন সতর্ক থাকতে শিখেছেন।

এসএমই উদ্যোক্তা শাহানা আক্তার জানান, হ্যাকাররা তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপত্তিকর ছবি পোস্ট করেছিল, যা তার বিউটি পার্লারের ব্যবসায় বড় ক্ষতি করেছে। অন্য এক ঘটনায়, অনলাইন মেকআপ প্রশিক্ষণের জন্য অগ্রিম টাকা দিলেও সেই কোর্স আর হয়নি।

সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিউনিটি সাইবার৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা তানজিম আল ফাহিম বলেন, অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা বড় ধরনের ক্ষতির পরই কেবল সহায়তা চান। সাধারণত দেখা যায়, নিরাপদ ব্যাকআপ না রাখার কারণে উদ্যোক্তারা পুরো ডিজিটাল অবকাঠামো হারিয়ে ফেলেন। তাদের পুরো ডেটাবেস হারিয়ে যায়। কোনো ব্যাকআপ থাকে না, এমনকি ডিজিটালভাবে নিরাপদ ব্যাকআপও থাকে না।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের আরেকটি সাধারণ ভুল হলো, অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পুরো কার্যক্রম একটি ফেসবুক পেজের ওপর নির্ভরশীল। অথচ তারা প্ল্যাটফর্মটির নীতিমালা সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। উদ্যোক্তারা অনেক সময় সাময়িক বিধিনিষেধকে গুরুত্ব দেন না। ফলে, একপর্যায়ে তাদের ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

স্প্রীহা ফাউন্ডেশনের ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাবের পরিচালক তাহসিন ইফনুর সাঈদ বলেন, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা ইতোমধ্যেই সাইবার ঝুঁকি কমানোর বাস্তবসম্মত উপায় গড়ে তুলেছে। ওষুধের দোকান ও অন্যান্য সেবাভিত্তিক ব্যবসা গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে।

দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ইজলাল হোসেন বলেন, উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া। উদ্যোক্তারাই যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল শক্তি হন, তাহলে তাদের সুরক্ষা দেওয়া এবং সচেতন করে তোলা শুধু আমাদের দায়িত্ব নয়, অঙ্গীকারও হওয়া উচিত।

দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সেরাজ বলেন, এমএসএমইকে সাইবার হুমকি থেকে রক্ষা করতে হলে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা থামিয়ে নয়, বরং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি অংশীজনদের প্রতি এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে উদ্যোক্তারা ডিজিটাল রূপান্তরকে গ্রহণ করার পাশাপাশি নিরাপদে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।

তবে তিনি সাইবার ঝুঁকির কারণে উদ্ভাবন সীমিত করার পক্ষপাতি নন। এ বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, আমরা প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কোনো আপস করতে চাই না।

তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়তে হলে শৈশব থেকেই সচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাজিদা ফাউন্ডেশনের পরিচালক মো. নোমানুজ্জামান, বন্ডস্টেইনের পরিচালক মো. সাদেকুল আরেফীন, কারিগরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানিয়া ওয়াহাব এবং বিটিআরসির উপপরিচালক তাইফুর রহমান। গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন দ্য ডেইলি স্টারের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ বিভাগের প্রধান তানজিম ফেরদৌস।