27.8 C
Dhaka
Home Blog

ডিজিটাল যুগে সম্পর্কের নতুন ব্যাকরণ: উত্তম কুমার কি এখনো প্রাসঙ্গিক?

বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবস ২৪ জুলাই। একইসঙ্গে দিনটি আজকের ডিজিটাল যুগে আমাদের সামনে এক অদ্ভুত আয়না হয়ে দাঁড়ায়—যেখানে প্রেম, বিচ্ছেদ, সেলিব্রিটি, আবেগ আর জনপরিসর সবকিছুই এক নতুন ব্যাকরণে লিখিত হচ্ছে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’র পর আমরা যেন প্রবেশ করেছি এক নতুন উপন্যাসে—‘লাভ ইন দ্য টাইম অব নিউ মিডিয়া’।

ফেসবুক বা নিউ মিডিয়া এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি এক ধরনের ডিজিটাল সমাজব্যবস্থা। এখানে হাসি-কান্না, রাগ-অনুরাগ, প্রেম-অভিমান সবকিছুই ‘কনটেন্ট’ হয়ে ওঠে। জেন-জি প্রজন্মের কাছে সম্পর্ক মানে শুধু অনুভূতি নয়, বরং এক ধরনের এক্সপ্রেশনাল পারফরম্যান্স—স্টোরি, রিল, পোস্ট, রিঅ্যাকশন ও ভিউয়ের ভেতর দিয়ে তা বারবার পুনর্গঠিত হয়।

প্রেম এখানে ব্যক্তিগত থেকেও বেশি হয়ে ওঠে পাবলিক ইভেন্ট। এই পাবলিক ইভেন্টের ভেতরেই তৈরি হয় নতুন ধরনের নৈতিকতা—নিউ এথিকস। আগে যেখানে সম্পর্কের গোপনীয়তা ছিল মৌলিক শর্ত, এখন সেখানে দৃশ্যমানতাই সত্য। কে কাকে ভালোবাসছে, কে কাকে ছেড়ে যাচ্ছে, এগুলো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক বিচার্য বিষয়। সম্পর্ক ভাঙলেই শুরু হয় বিশ্লেষণ, স্ক্রিনশট, পক্ষ-বিপক্ষ এবং এক ধরনের ডিজিটাল ট্রায়াল।

আজকের এই বাস্তবতায় উত্তম-সুচিত্রা যেন এক ভিন্ন সময়ের নান্দনিক প্রতীক। তাদের প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা—সবকিছুই ছিল পর্দার ভাষায় আবৃত, সংযত, ইঙ্গিতপূর্ণ। উত্তম কুমারের মৃত্যুদিবসে দাঁড়িয়ে তাই মনে হয়, সেই সাদা-কালো যুগে সম্পর্ক ছিল ধীর, গভীর ও অনেক বেশি ‘অদৃশ্য’। আর অদৃশ্য বলেই সেখানে কল্পনার জায়গা ছিল বিস্তৃত, শ্রদ্ধার জায়গা ছিল অটুট।

আজকের ডিজিটাল সমাজে সেই অদৃশ্যতার জায়গাটি প্রায় নেই। উত্তম-সুচিত্রার যুগে বিচ্ছেদও ছিল এক ধরনের নীরব শিল্প। আর আজকের নিউ মিডিয়ায় বিচ্ছেদ এক ধরনের ‘স্পেকটাকল’—যেখানে জনতা দর্শক থেকে বিচারকে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো সেলিব্রিটির সম্পর্ক ভাঙলেই যে সামাজিক মিডিয়া উৎসব শুরু হয়, তা দেখায় যে আমরা এখন আবেগকে অনুভব করার চেয়ে বিশ্লেষণ করতে বেশি আগ্রহী।

এই জায়গাতেই জেন-জি প্রজন্মের দ্বন্দ্ব আরও গভীর। তারা একদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে বেশি খোলামেলা; অন্যদিকে একইসঙ্গে তারা সবচেয়ে বেশি এক্সপোজড, সবচেয়ে বেশি নজরদারির মধ্যে থাকা প্রজন্ম। সম্পর্কের রসায়ন এখানে আর নিষিদ্ধ ট্যাবু নয়, কিন্তু একইসঙ্গে তা আবার কনটেন্ট, ট্রেন্ড ও ডিজিটাল ভ্যালিডেশনের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে সম্পর্কও আর কেবল ‘ভালোবাসা’ নয়, এক ধরনের ডিজিটাল অর্থনীতি। লাইক, কমেন্ট, ভিউ, ফলোয়ার—সবমিলিয়ে কে কতটা ‘মূল্যবান’ তা নির্ধারিত হচ্ছে।

প্রেম এখানে অনুভূতির চেয়ে বেশি এক ধরনের এক্সচেঞ্জ সিস্টেমে পরিণত হয়েছে, যেখানে আবেগের পাশাপাশি কাজ করছে দৃশ্যমানতা ও জনপ্রিয়তার চাপ।

উত্তম কুমারের কালজয়িতা বোঝা যায় তার কয়েকটি প্রতিনিধিত্বশীল চলচ্চিত্রের ভেতর দিয়ে। যেমন: ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘নায়ক’, ‘চাওয়া পাওয়া’ বা ‘সাগরিকা’। যোগাযোগবিদ্যা ও চলচ্চিত্র অধ্যয়নের দৃষ্টিতে এসব চলচ্চিত্র শুধু কাহিনীর জন্য নয়, বরং ‘স্টার ইমেজ কনস্ট্রাকশন’-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

‘সপ্তপদী’তে রোমান্টিক সম্পর্ক ধর্ম, পরিচয় ও সামাজিক টেনশনের ভেতর দিয়ে ধীরে বিকশিত হয়, যেখানে প্রেম এক ধরনের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার জায়গা তৈরি করে। ‘হারানো সুর’-এ সঙ্গীত ও স্মৃতির মাধ্যমে পরিচয় পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া দেখা যায়, তা আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল পরিচয় রাজনীতির বিপরীতে এক দীর্ঘস্থায়ী আবেগীয় আর্কাইভ নির্মাণ করে। আবার সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এ উত্তম নিজেই এক মিডিয়া টেক্সট হয়ে ওঠেন, যেখানে খ্যাতি, ইমেজ ও অন্তর্গত নিঃসঙ্গতার দ্বন্দ্ব আধুনিক সেলিব্রিটি কালচারের আগাম রূপরেখা তৈরি করে।

এই চলচ্চিত্রগুলো দেখায়, উত্তম কুমারের স্টারডম কেবল বিনোদন নয়, বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, যেখানে ধীর ন্যারেটিভ, সংযত আবেগ ও নৈতিক কোড দর্শকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ তৈরি করতো। তাই আজকের অ্যালগরিদমিক, দ্রুতভোগ্য কনটেন্ট-সংস্কৃতিতে তাকে ‘অচল’ মনে হলেও, আসলে তিনি সেই মিডিয়া-ইকোসিস্টেমের প্রতিনিধি, যেখানে অর্থ তৈরি হতো স্ক্রল নয়, বরং স্থিরদৃষ্টির গভীরতায়।

যোগাযোগবিদ্যা ও চলচ্চিত্র অধ্যয়নের দৃষ্টিতে উত্তম কুমারকে ‘অচল’ বলা এক অর্থে সময়ের পরিবর্তিত মিডিয়া-ইকোলজির প্রতিফলন। কারণ, তিনি যে ইমেজ-রেজিমে কাজ করেছেন, তা ছিল ক্লাসিক্যাল সিনেমা যুগের, যেখানে স্টার ইমেজ তৈরি হতো ধীর গতির ন্যারেটিভ, সীমিত মিডিয়া এক্সপোজার এবং নিয়ন্ত্রিত জনপরিসরের ভেতরে।

আজকের প্ল্যাটফর্ম ক্যাপিটালিজমে সেই স্টারডম আর টিকে নেই। এখন সেলিব্রিটি মানে রিয়েল-টাইম পারফরম্যান্স, ইনফ্লুয়েন্সার ইকোনমি, আর অ্যালগরিদমিক দৃশ্যমানতা। এই অর্থে উত্তম কুমার ‘অচল’। কারণ, তিনি অ্যালগরিদম-নির্ভর নন, বরং ন্যারেটিভ-নির্ভর এক যুগের নির্মাণ।

কিন্তু, একইসঙ্গে তিনি গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, ফিল্ম স্টাডিজে স্টার টেক্সট কেবল সমকালীন জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি, জাতিগত কল্পনা ও আবেগীয় আর্কাইভের অংশ হয়ে থাকে। উত্তম কুমারের ইমেজ একটি স্থির ডিজিটাল প্রোফাইল নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক প্রতীক, যেখানে ‘নায়কত্ব’ কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নয়, বরং মধ্যবিত্ত নৈতিকতা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও রোমান্টিক সংযমের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই তাকে ‘অচল’ বলা মানে আসলে একটি নির্দিষ্ট মিডিয়া-টেম্পোরালিটির বাইরে থাকা এক নান্দনিক কাঠামোকে ভুল বোঝা।

যোগাযোগবিদ্যার তত্ত্বের ভাষায় বলা যায়, উত্তম কুমার যে ধরনের ‘ইমোশনাল সিগনিফিকেশন’ তৈরি করেছিলেন, তা আজকের মিম-কালচার বা ফাস্ট কনটেন্ট ইকোসিস্টেমে দ্রুত ভেঙে পড়া অর্থের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। তার ইমেজ ভোগের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আবেগীয় স্থায়িত্বের জন্য নির্মিত। তাই ডিজিটাল যুগে তাকে অচল মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি একটি বিকল্প মিডিয়া এথিকসের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে দৃশ্যমানতা নয়, বরং অর্থের গভীরতা ও নীরবতার শক্তিই স্টারডমের ভিত্তি।

উত্তম কুমার ছিলেন এক ভিন্ন সময়ের নায়ক, যেখানে নায়কত্ব মানে ছিল নৈতিকতা, সংযম ও এক ধরনের সামাজিক দায়িত্ব। তার চোখের ভেতরের আবেগও ছিল নিয়ন্ত্রিত, পরিশীলিত। আজকের ডিজিটাল নায়ক-নায়িকারা আবার একইসঙ্গে দৃশ্যমান ও ভঙ্গুর। তাদের জীবন লাইভ, কিন্তু তাদের নিঃসঙ্গতাও লাইভ-ই।

আজ তাই উত্তম কুমারের মৃত্যুদিবসে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমরা শুধু একজন মহানায়ককে স্মরণ করছি না; স্মরণ করছি এক হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক-সংস্কৃতিকে। যেখানে ভালোবাসা মানে ছিল দায়বোধ, বিচ্ছেদ মানে ছিল নীরবতা, আর স্মৃতি মানে ছিল সম্মান।

আজকের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব নিউ মিডিয়া’য় সেই নীরবতার জায়গা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে না? এই প্রশ্নের ভেতরেই যেন ফিরে আসে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ চলচ্চিত্রের সেই বিখ্যাত মুহূর্ত—যখন খ্যাতির চূড়ায় দাঁড়িয়েও উত্তম কুমার নিজের ভেতরের নিঃসঙ্গতাকে চিনে ফেলেন, আর শোনা যায় সেই উচ্চাভিলাষী, তীব্র উচ্চারণ ‘আই উইল গো টু দি টপ, দি টপ, দি টপ’। এই এক লাইনে অরিন্দম মুখার্জীর স্বপ্ন যেমন আছে, তেমনি আছে আধুনিক সেলিব্রিটি সংস্কৃতির সারকথাও।

গুরুর সতর্কতা উপেক্ষা করে বাণিজ্যিক সাফল্যের শিখরে ওঠার যে তাড়না, তা আজ আর কেবল চলচ্চিত্রের কাহিনী নয়; বরং নিউ মিডিয়া যুগে প্রত্যেক ইনফ্লুয়েন্সার, প্রতিটি ইউজার প্রোফাইলের নীরব প্রতিজ্ঞা। কিন্তু সেই ‘টপ’-এ পৌঁছে যাওয়ার পর যে শূন্যতা, যে একাকীত্ব, যে আত্মসংঘাত তা-ই এই সংলাপকে কালজয়ী করে তোলে। আর আজকের ডিজিটাল দৃশ্যমানতার রাজনীতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজ আমরা তাই দেখি কাউকে ‘টপ’ করে ঝরেও যেতে!

আজ আমাদের ‘উত্তম’ নেই বলে নিউ মিডিয়া ও নিউ জেনারেশনের ‘অধম হইবার এত বাসনা’! তবু ইতিহাসের পর্দা পুরোপুরি নামেনি। উত্তম-সুচিত্রার ধীর আলোয় গড়া প্রেম, সংযমে নির্মিত আবেগ, আর মানবিক সম্পর্কের যে নীরব ব্যাকরণ ছিল, তা হয়তো এখন আর স্ক্রিনে দেখা যায় না, কিন্তু ডিজিটাল কোলাহলের ফাঁকে ফাঁকে তার প্রতিধ্বনি এখনো শোনা যায়। সেই প্রতিধ্বনিই মনে করিয়ে দেয়, দৃশ্যমানতার যুগ শেষ কথা নয়, অনুভবের নীরবতাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।

 

রাজীব নন্দী: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; ডক্টোরাল স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।
[email protected]

ফ্রান্সকে ‘আফ্রিকার দল’ বলায় ক্ষুব্ধ ফরাসি ফুটবল প্রধান

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচকে ঘিরে বর্ণবাদ বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন প্যারাগুয়ের সাবেক কিংবদন্তি গোলরক্ষক হোসে লুইস চিলাভার্ট। ফ্রান্সকে ‘আফ্রিকার একটি দল’ বলে মন্তব্য করায় তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফিলিপ দিয়ালো।

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে চিলাভার্টের মন্তব্যকে বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন দিয়ালো, ‘ফরাসি জাতীয় দলকে নিয়ে হোসে লুইস চিলাভার্ট যে বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন, আমি তার তীব্র নিন্দা জানাই। এই ধরনের বক্তব্য আমাদের ফুটবলের সম্মান, ভ্রাতৃত্ব ও বৈচিত্র্যের মূল্যবোধকে আঘাত করে।’

এরপর আরও কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, ‘একসময় তিনি হয়তো একজন অসাধারণ গোলরক্ষক ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি নিজের মর্যাদা হারিয়েছেন।’

প্যারাগুয়ের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার চিলাভার্ট ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন।

৬০ বছর বয়সী এই সাবেক গোলরক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করেন। যেখানে ফ্রান্সের সাবেক ফরোয়ার্ড ক্রিস্তফ দুগারি বলেছেন, প্যারাগুয়ের জয়ের কোনো সম্ভাবনাই নেই। তারই জবাব দিয়ে চিলাভার্ট লেখেন, ‘ক্রিস্তফ, তুমি ঠিকই বলেছ। ১৯৯৮ সালে আমরা ফ্রান্সের মুখোমুখি হয়েছিলাম, আর এবার প্যারাগুয়ে খেলবে আফ্রিকার একটি দলের বিপক্ষে।’

ফ্রান্স জাতীয় দল দীর্ঘদিন ধরেই তাদের বহুসাংস্কৃতিক ও বৈচিত্র্যময় পরিচয়ের জন্য পরিচিত। দলের অনেক ফুটবলারেরই আফ্রিকান বংশোদ্ভূত পারিবারিক শিকড় রয়েছে। কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলের মতো তারকারা আফ্রিকান অভিবাসী পরিবারের সন্তান।

উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয়ও ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হয়েছিল। সেই ফরাসি দলের সদস্য ছিলেন দুগারি। অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলের জয়ে সেবার প্যারাগুয়েকে বিদায় করেছিল ফ্রান্স।

মজার বিষয় হলো, প্রায় তিন দশক পর ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়েও একই ব্যবধানে অর্থাৎ ১-০ গোলে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রান্স।

ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, আমি প্রস্তাব করছি যে, শিক্ষার্থী হিসাব (স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট), নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে টিআইএন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি ছাড়া, ব্যাংক হিসাব খুলতে ইচ্ছুক প্রত্যেক ব্যক্তিকে টিআইএন সনদ দাখিল করতে হবে।

এই প্রস্তাব কার্যকর হলে নির্ধারিত ব্যতিক্রম ছাড়া নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য টিআইএন সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে। এর মাধ্যমে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের পেছনে একটা রাজনীতি কাজ করছে: অর্থমন্ত্রী

ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনকারীদের সঙ্গে ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের একটি যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, ‘যারা টাকা তুলে নিচ্ছেন, তারা নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের কারণে তা করছেন না; বরং মনে হচ্ছে তারা ইসলামী ব্যাংককে বিপদের মুখে ফেলতে চাইছেন। এর পেছনে কারও হাত, কোনো শক্তির হাত আছে। আসলে তারা ব্যাংকটিকে ব্যর্থ করে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা উসুল করতে চাচ্ছে।’

এর আগে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ৬৮ বিধির আওতায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ আকারে বিষয়টি উত্থাপন করেন।

সেখানে তিনি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অযৌক্তিক, অবৈধ ও অপ্রত্যাশিত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানান। 

ওই নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের একাংশের বিক্ষোভের ফলে আমানত উত্তোলনের হার হঠাৎ বেড়ে গেছে। এতে দেশের বৃহত্তম শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকটি বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে।

মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগের বিরুদ্ধে গত ১ জুন থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের পর সাত দিনের মধ্যে ব্যাংকটি ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকার আমানত হারায়। সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে অনুষ্ঠিত ওই বিক্ষোভের কারণে কয়েকটি শাখার কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।

অর্থমন্ত্রী জানান, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের তদন্তে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও শুধু চেয়ারম্যান নিয়োগের কারণে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেন না।’

‘গ্রাহকরা দেখেন তারা সঠিকভাবে সুদ পাচ্ছেন কি না, তাদের টাকা ফেরত পাবেন কি না এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের আস্থা আছে কি না। চেয়ারম্যান নিয়োগের কারণে গ্রাহকরা টাকা তুলে নিচ্ছেন—এমন নজির বিশ্বের কোথাও নেই,’ বলেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, ‘এই ব্যাংকটিকে ঘিরে যে সুবিধাবাদী রাজনীতিতে অর্থায়নের যে প্রক্রিয়া চলছে এটা শুধু ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, রাজনীতির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের এই ইকোসিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

অর্থমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, ‘স্বৈরাচারের লোকজন যখন ব্যাংকটি দখল করেছিল, তখন কি গ্রাহকরা অর্থ উত্তোলন করেছিল? করেনি। কারণ ব্যাংকের গ্রাহকের সঙ্গে চেয়ারম্যান নিয়োগ সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়।’ 

‘এটি ‍শুধু ইসলামী ব্যাংকেই সীমিত নয়। রামিসা হত্যাসহ প্রতিটি পরিস্থিতিতেই এক ধরনের মবোক্রেসি সৃষ্টির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু ঘটলেই মবোক্রেসি বা উচ্ছৃঙ্খলা শুরু হয়। এটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির একটি প্রক্রিয়ার অংশ,’ বলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকে এমন একজন গভর্নর এসেছেন, যিনি সঠিক কাঠামোর মধ্যে থেকে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। তবে কিছু মানুষ তাকে “ঋণগ্রস্ত” আখ্যা দিয়ে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। যা সঠিক কাজটা গ্রহণ করতে না চাওয়ার মানসিকতার প্রতিফলন।

তিনি বলেন, ‘যারা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন এবং ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন, তাদের সঙ্গে আজকের এই প্রস্তাব উত্থাপনকারীদের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে হয়।’

বিএনপি আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে আপস করবে না বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।

‘সুরাইয়া’ সিনেমায় নাম ভূমিকায় তুষি

নতুন একটি সিনেমায় অভিনয় করছেন আলোচিত অভিনেত্রী নাজিফা তুষি। সিনেমার নাম ‘সুরাইয়া’। ওই সিনেমায় নাম ভূমিকায় থাকবেন তুষি। 

এটি তার অভিনীত পঞ্চম সিনেমা। আগে ‘আইসক্রিম’, ‘হাওয়া’, ‘প্রেশার কুকার’ ও ‘রইদ’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন তুষি।

এর মধ্যে ‘রইদ’ সিনেমাটি আগামী কোরবানি ঈদে মুক্তি পাবে।

নতুন সিনেমাটি শিবব্রত বর্মনের ছোটগল্প ‘সুরাইয়া’ অবলম্বনে নির্মাণ করছেন রবিউল আলম রবি।

সিনেমাটিতে অভিনয় করছেন নাজিফা তুষির পাশাপাশি শ্যামল মাওলা, নাসির উদ্দিন খান, ইন্তেখাব দিনার, দিলারা জামান, অশোক ব্যাপারীসহ আরও অনেকেই। 

সিনেমাটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ২০ এপ্রিল থেকে সিনেমাটির শুটিং শুরু হয়েছে। মে মাসজুড়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শুটিং করে শেষ হবে। 

রুক্ষ বাস্তবতা ও মানবিক গল্প নিয়ে রোমান্টিক ঘরানার সিনেমাটি বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের পর দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে।

‘সুরাইয়া’ সিনেমাটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি অনুদান পায়। এছাড়া বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবের ফিল্ম মার্কেটেও সিনেমাটির চিত্রনাট্য নিয়ে অংশ নিয়েছেন নির্মাতা। 

শুরুটা হয় ২০২৩ সালের বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান প্রজেক্ট মার্কেট দিয়ে। একই বছর ফ্রেঞ্চ ফিল্ম ল্যাব ‘প্রদুইর অ স্যুদ’-এ অংশ নেয় ‘সুরাইয়া’। 

২০২৪ সালে সিয়াটলের তাসভীর চলচ্চিত্র উৎসবের ফিল্ম বাজারেও এটি নির্বাচিত হয়। গত বছর বার্লিন ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ড থেকে তহবিল পায় সিনেমাটি।

হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে লেবাননজুড়ে ইসরায়েলের হামলা, জ্যেষ্ঠ নেতা নিহতের দাবি

লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ)।

আল জাজিরা জানিয়েছে, একইসঙ্গে বৈরুতে এক জ্যেষ্ঠ হিজবুল্লাহ নেতাকে হত্যার দাবি করেছে তারা।

টাইমস অব ইসরায়েল জানায়, লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক বিমান হামলার কথা বলেছে আইডিএফ। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে বলে জানানো হয়।

আল জাজিরা জানায়, এর আগে দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননে হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার সতর্কবার্তা জারি করেছিল সেনাবাহিনী।

আইডিএফ দাবি করেছে, লেবাননের রাজধানীতে রাতভর চালানো এক হামলায় তারা হুসেইন মাকলেদকে হত্যা করেছে। তাকে হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা সদর দপ্তরের প্রধান বলা হয়েছে।

আইডিএফ জানায়, মাকলেদ ইসরায়েলি বাহিনী সম্পর্কে গোয়েন্দা মূল্যায়ন প্রস্তুত করা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনায় হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের সঙ্গে সমন্বয় করতেন।

অসমাপ্ত বিচারকাজ নতুন চিফ প্রসিকিউটর এগিয়ে নেবেন: তাজুল ইসলাম

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের অসমাপ্ত কাজ নতুন চিফ প্রসিকিউটর এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।

আজ সোমবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তাজুল ইসলাম বলেন, আপনারা ইতোমধ্যে জেনেছেন যে, আমার স্থলে একজন নতুন চিফ প্রসিকিউটর নিযুক্ত হয়েছেন। আমি তার সাফল্য কামনা করছি। আমরা যে অসমাপ্ত দায়িত্বগুলো রেখে যাচ্ছি, আশা করি তিনি সেগুলো সফলভাবে শেষ করবেন।

নতুন সরকার গঠনের পর নতুন চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যখন কোনো রাজনৈতিক বা নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়। এটাই প্রচলিত নিয়ম।

তিনি আরও বলেন, জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশের যে মানুষগুলো রক্ত দিয়েছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের বিচারের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আমি আশা করি নতুন চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে এই ট্রাইব্যুনালে সেই বিচার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে এগিয়ে যাবে।

বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তাজুল ইসলাম বলেন, ছাত্র-জনতার যে বিশাল আত্মত্যাগ, তার বিনিময়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে ন্যায়বিচারের জোরালো দাবি রয়েছে। এখানে ন্যায়বিচারের একটি তৃষ্ণা আছে। যাদের স্বজনরা গুম হয়েছেন এবং আর কখনো ফিরবেন না, তারা এই গুমের বিচার চান। তারা যথাযথ বিচার চান যাতে হারানো স্বজনদের ফিরে না পেলেও অন্তত এই সান্ত্বনা পান যে, যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার হয়েছে। সেই বিচারের তৃষ্ণা থেকেই আমি বিশ্বাস করি, ইনশাআল্লাহ, যিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন তিনি এই বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এই বিচার প্রক্রিয়াকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

পরবর্তীতে কোথায় যোগ দেবেন জানতে চাইলে তাজুল ইসলাম বলেন, আমার মূল পরিচয় আমি সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আমার স্বাভাবিক পেশাগত জীবনে ফিরে যাব। আমি একদিনের জন্যও বেকার থাকব না, এ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: এক আলোকযাত্রার নাম

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্মদিন ২৫ জুলাই। এটি কেবল একজন শিক্ষক, লেখক বা সংগঠকের জন্মদিন নয়; বরং এমন এক মানুষের জীবন ও কর্মকে স্মরণ করার দিন, যিনি বই, জ্ঞান ও মানবিকতাকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ করেছেন।

একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা সাধারণত অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কিন্তু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, কোনো জাতির স্থায়ী উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধির ওপর। এই সত্যটিকেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার কর্মজীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তার বিশ্বাস ছিল, উন্নত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে আলোকিত নাগরিকের হাত ধরে, আর সেই আলোকপ্রাপ্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো বই। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই তার নেতৃত্বে অসংখ্য মানুষের শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠায় গড়ে উঠেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র—বাংলাদেশের এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে অল্প কয়েকটি বেসরকারি উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করেছে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাদের অন্যতম। এটি কেবল একটি সাহিত্যসংগঠন বা গ্রন্থাগার নয়; বরং পাঠাভ্যাস, আত্মশিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিশীলন, মানবিক শিক্ষা ও নাগরিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার একটি সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রাণপুরুষ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

তার সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এই যে তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজের ভেতরের সৃজনশীল শক্তিকে সংগঠিত করে জ্ঞানচর্চাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ও আনন্দময় অনুষঙ্গে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে শিক্ষা ছিল না কেবল পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের উপায়; বরং আত্মগঠন, চরিত্র নির্মাণ এবং আজীবন শেখার এক অব্যাহত প্রক্রিয়া।

এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তিনি কয়েক প্রজন্মকে শেখানোর চেষ্টা করেছেন, একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল অবকাঠামো, অর্থনীতি বা প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয় জ্ঞান, মানবিকতা, নৈতিকতা ও মুক্তচিন্তায় সমৃদ্ধ নাগরিক গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। সেই অর্থে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার।

বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, দুর্বল গ্রন্থাগার সংস্কৃতি এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানচর্চার সীমাবদ্ধতা আজও শিক্ষাব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং তার একটি অপরিহার্য পরিপূরক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

শিক্ষা যে কেবল তথ্য অর্জনের বিষয় নয়, বরং সমালোচনামূলক চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব বিকাশের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া—বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সেই ধারণাকে বাস্তব অনুশীলনের ক্ষেত্র করে তুলেছে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের আত্মশিক্ষার দর্শন তরুণদের একটা বড় অংশকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং নিজের বৌদ্ধিক বিকাশের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

বাংলাদেশের বহু পরিবারে এখনো পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার সংস্কৃতি সীমিত। এই বাস্তবতায় বিদ্যালয়ভিত্তিক বইপড়া কর্মসূচি, পাঠ প্রতিযোগিতা, বই-পর্যালোচনা এবং নির্বাচিত গ্রন্থপাঠের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বইকে পরীক্ষার উপকরণ থেকে জীবনবোধ ও আত্মগঠনের অনুষঙ্গে রূপান্তর করার প্রয়াস নিয়েছে। এর ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভাষাদক্ষতা, কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং নৈতিক সংবেদনশীলতা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এক অর্থে, এটি বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও বটে।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নাগরিক সমাজকে রাষ্ট্র ও বাজারের মধ্যবর্তী এমন একটি পরিসর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে স্বেচ্ছাসেবী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সামাজিক আস্থা, সহযোগিতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ভিত্তি নির্মাণ করে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে বইপড়া, সাহিত্য আলোচনা, বিতর্ক, আবৃত্তি, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এমন একটি উন্মুক্ত পরিসর গড়ে তুলেছে, যেখানে ভিন্নমত, পেশা ও সামাজিক পটভূমির মানুষ যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এ ধরনের উদ্যোগ নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামাজিক পুঁজি বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কর্মসূচি এর অন্যতম সৃজনশীল উদ্যোগ। এর দর্শন সহজ কিন্তু গভীর–পাঠককে বইয়ের কাছে নয়, বইকে পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়া। জ্ঞানকে বড় শহর কিংবা অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের, বিশেষত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণের একটি কার্যকর উদাহরণ।

অবশ্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রম এখনো দেশের সব অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে পারেনি। ডিজিটাল যুগে পাঠাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল লাইব্রেরি, অডিওবুক, অনলাইন পাঠচক্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ-উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, যা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও শক্তিশালীভাবে আসতে পারে। তবে এ কথাও সত্য যে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের বাস্তবতা অনেক সময় এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

তবু এসব সীমাবদ্ধতা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কিংবা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের গুরুত্বকে খাটো করে না। তাকে কেবল একজন জনপ্রিয় বক্তা, পরিবেশ আন্দোলনের উদ্যমী পুরুষ, টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপক, লেখক বা সাহিত্য আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে মূল্যায়ন করলে তার অবদানের প্রকৃত ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। শিক্ষাদর্শন, সমাজতত্ত্ব ও নাগরিক উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, তিনি এমন এক সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার লক্ষ্য ছিল জ্ঞানসমৃদ্ধ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা।

২০০৪ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এশিয়ার নোবেলখ্যাত ‘র‍্যামন ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কারে ভূষিত হন। এর আনুষ্ঠানিক সাইটেশনের জবাবে তিনি বলেছিলেন—‘Little minds and great nations cannot go together. Consequently, our aspiration for greatness as a nation must be matched by our commitment to create enlightened people within the nation. And therefore, our endeavour is to create for Bangladesh an informed, enriched and committed generation of future citizens. In this, our focus has been on the youth.’

এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যেই তার সমগ্র জীবনদর্শনের সারমর্ম নিহিত। তিনি বিশ্বাস করেন, সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে কোনো জাতি মহৎ হতে পারে না। তাই তার আজীবনের সাধনা এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা হবে জ্ঞানসমৃদ্ধ, মননশীল, মূল্যবোধে ঋদ্ধ এবং দায়িত্বশীল। তরুণদের প্রতি তার বিশেষ মনোযোগের পেছনেও আছে এই বিশ্বাস—একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার আগামী প্রজন্মের চিন্তা, চরিত্র ও মূল্যবোধের মাধ্যমে।

আজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রবাহ মানুষের মনোযোগকে ক্রমেই খণ্ডিত করে তুলছে, তখন বইপড়া, গভীর চিন্তা এবং আত্মশিক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তথ্যের প্রাচুর্যের এই যুগে কেবল তথ্য নয়, প্রয়োজন বিচক্ষণতা; কেবল মত নয়, প্রয়োজন বিচারবোধ; কেবল দক্ষতা নয়, প্রয়োজন মানবিকতা। এই নতুন বাস্তবতায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনদর্শন ও কর্মযজ্ঞ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাই কেবল একজন শিক্ষক, লেখক বা সংগঠকের নাম নন; তিনি এক আলোকযাত্রার নাম। তার আজন্ম বিশ্বাস—একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার সম্পদে নয়, তার মানুষের মধ্যে নিহিত। তিনি মনে করেন, ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’। এই বিশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা, পাঠসংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের ইতিহাসে তার এই আলোকযাত্রা দীর্ঘদিন ধরে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

লেখক: শুভ কিবরিয়া, সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

লাল কার্ড দেখা বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত, ফিফাকে ধন্যবাদ দিলেন ট্রাম্প

এক আশ্চর্যজনক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এর ফলে এবারের বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দলটির হয়ে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলতে তার কোনো বাধা নেই।

আসরের শেষ বত্রিশের ম্যাচে গত বৃহস্পতিবার সানফ্রান্সিসকোতে যুক্তরাষ্ট্র ২-০ গোলে হারায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে। সেদিন তাদের হয়ে প্রথম গোলটি করা বালোগুন প্রতিপক্ষের তারিক মুহারেমিভিচের ডান গোড়ালিতে পা দিয়ে আঘাত করেন। ফলে তাকে ভিএআরের সাহায্য নিয়ে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়। এতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন তিনি। তবে ফর্মে থাকা এই ফরোয়ার্ডের নিষেধাজ্ঞা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।

রোববার এক বিবৃতিতে ফিফা জানিয়েছে, ‘ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার এই সিদ্ধান্তটি এক বছরের পর্যবেক্ষণমূলক সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হলো।’

সেখানে আরও বলা হয়েছে, ‘এই পর্যবেক্ষণমূলক সময়ের মধ্যে বালোগুন যদি একই ধরনের এবং সমমাত্রার কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করেন, তবে এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হবে এবং পূর্বের শাস্তি কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি নতুন অপরাধের জন্য অতিরিক্ত শাস্তিও এর সাথে যুক্ত হতে পারে।’

সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বাস্তবায়ন স্থগিত করার এখতিয়ার ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটির রয়েছে।

এই ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং একটি বড় অবিচারকে বদলে দেওয়ার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ!’

স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ফেডারেশন চলতি বিশ্বকাপে তাদের শীর্ষ গোলদাতাকে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচে খেলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। ইউএস সকার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা ডিসিপ্লিনারি কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছি এবং ফোলারিন বালোগুন আগামীকাল (বাংলাদেশ সময় অনুসারে মঙ্গলবার) খেলার যোগ্য হওয়ায় আমরা আনন্দিত।’

এবারের টুর্নামেন্টে চার ম্যাচে তিনটি গোল করা ২৫ বছর বয়সী বালোগুন গত শুক্রবার দাবি করেছিলেন যে, তার ওই ফাউলের জন্য লাল কার্ডের বদলে হলুদ কার্ড দেখানোই বেশি ন্যায়সংগত হতো। যুক্তরাষ্ট্রের একটি অনুশীলন সেশনে সাংবাদিকদের বালোগুন বলেছিলেন, ‘পা ফেলার মতো অন্য কোনো জায়গা ছিল না। এটি (মুহারেমোভিচের পায়ে আঘাত করা) এড়ানো অসম্ভব ছিল।’

তিনি যোগ করেছিলেন, ‘তো আমি বিষয়টি নিয়ে অনেক ভিন্ন ভিন্ন মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি দেখেছি। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, একটি হলুদ কার্ডই যথেষ্ট হতো। যা ঘটার ঘটে গেছে, তাই এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং আমাকে এটি মেনে নিতে হবে।’

সিয়াটলে অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের মধ্যকার শেষ ষোলোর লড়াই। নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ায় এই ম্যাচে বালোগুনের খেলার সুযোগ পাওয়ার বিষয়ে অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি বেলজিয়াম।

প্রতারণা ও যৌতুক দাবি: বাংলাদেশ ও ফিনল্যান্ডে আজিমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

ফিনল্যান্ডে বসবাসরত এক প্রবাসী নারীর কাছে যৌতুক দাবি এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার আত্মসাতের অভিযোগে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বাসিন্দা মো. আজিমুর রহমান ওরফে আজিম গাজীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন ঢাকার একটি আদালত। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফিনল্যান্ডেও একাধিক ফৌজদারি মামলায় আদালতের পরোয়ানা রয়েছে বলে মামলার আর্জি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ১৩ জুলাই দায়ের করা যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারার একটি মামলা আমলে নিয়ে ঢাকার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুর রহমান আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।

মামলার আর্জি অনুযায়ী, বাদী বাংলাদেশ ও ফিনল্যান্ডের দ্বৈত নাগরিক এবং দীর্ঘদিন ধরে ফিনল্যান্ডে বসবাস করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে পরিচয়ের পর মো. আজিমুর রহমান নিজেকে অবিবাহিত এবং সাবেক সেনাসদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে আত্মহত্যার ভয়ভীতি, মানসিক চাপ এবং আবেগের সুযোগ নিয়ে তাকে বিয়েতে সম্মত করানো হয়। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি ঢাকার মিরপুরের একটি কাজী অফিসে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

আর্জিতে বলা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে বাদীর কাছ থেকে ধার, সহায়তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলে ধারাবাহিকভাবে অর্থ নেওয়া শুরু করেন আসামি। বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় এবং পরবর্তীতে ফিনল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় ভিসা, বিমানভাড়া, হোটেল খরচ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোর্স, পারিবারিক ব্যয়, জমি-সংক্রান্ত বিষয়, ব্যবসা, মায়ের চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা বলে তিনি বারবার অর্থ নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলায় আরও বলা হয়েছে, বাদীর পরিবারের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে অর্থ নেওয়া হয়। এমনকি বাদীর মায়ের বন্ধক রাখা জমি ছাড়ানোর জন্যও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাদীর দাবি, বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, নগদ অর্থ এবং পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে মোট প্রায় ৯০ লাখ টাকা আসামিকে দেওয়া হয়েছে। এসব লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশের ব্যাংক ও আর্থিক নথি তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও আর্জিতে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া, বিয়ের পর ফিনল্যান্ডে যাওয়ার আগে বাদীর পরিবারের কাছ থেকে ২৭ ভরি স্বর্ণালঙ্কার গ্রহণ করেন আসামি। পরে ওই স্বর্ণ ফেরত চাইলে তা আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডে যাওয়ার পর আসামি বাংলাদেশের পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি রাজকীয় বাড়ি নির্মাণ, ফিনল্যান্ডে একটি বার স্থাপনের জন্য ৮ কোটি টাকা দাবি করেন। সর্বশেষ ২০ জুন বাংলাদেশে একটি খামার স্থাপনের জন্য ৪২ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করলে বাদী যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারায় ঢাকার আদালতে মামলা করেন। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

বাদীর অভিযোগ, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পরে তিনি জরুরি সেবায় ফোন করলে ফিনল্যান্ডের পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আসামিকে আটক করে। ওই ঘটনার পর পুলিশি তদন্ত, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং অন্যান্য নথির ভিত্তিতে ফিনল্যান্ডে একাধিক মামলা দায়ের হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, বর্তমানে ফিনল্যান্ডে মো. আজিমুর রহমানের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন, প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করে ইউরোপে যাওয়ার অভিযোগ, জোরপূর্বক অর্থ আদায় ও ভরণপোষণের ব্যয় বহনে বাধ্য করা, ম্যারিটিয়াল রেপ এবং শিশুর সামনে অনৈতিক আচরণ সংক্রান্ত অভিযোগসহ মোট চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে বৈবাহিক ধর্ষণের অভিযোগের সমর্থনে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সনদও রয়েছে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ফিনিশ পুলিশ তাকে খুঁজছে এবং তিনি ইউরোপের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন। মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব আইনি জটিলতার কারণে তার বিরুদ্ধে ইউরোপে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তিনি শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছেন বলে বাদীপক্ষ দাবি করেছে।

এদিকে, বাংলাদেশে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির খবর পাওয়ার পর মো. আজিমুর রহমান কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আর্জিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আসামি বর্তমানে বাদীকে তালাক না দিয়ে নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন এবং বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন। একই সঙ্গে, বিয়ের আগে নিজের পূর্বের একাধিক বিবাহের তথ্য গোপন করে প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

বাদীর দাবি, এসব ঘটনার ফলে তিনি এবং তার সন্তান গুরুতর মানসিক ট্রমা, বিষণ্নতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমানে তারা ফিনল্যান্ডে চিকিৎসা ও থেরাপি নিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আসামির মা মোছা. কহিনুর বেগম, ভাই বরিশাল যমুনা ব্যাংকে কর্মরত মো. আরিফুর রহমান, ভাইয়ের বউ মনিপুর কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা লিটা, বোন রুমা এবং বোনের স্বামী জাকিরকে বিষয়টি জানানো হলেও তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি; বরং আসামিকে সমর্থন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বাদী আদালতের কাছে অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, গ্রেফতার, যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা, তার কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার ফেরত এবং অন্যান্য আইনি প্রতিকার চেয়েছেন।

মামলার অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মো. আজিমুর রহমান ওরফে আজিম গাজীর বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।