28.2 C
Dhaka
Home Blog

এআইয়ের সাহায্যে যেভাবে ইরানে হামলা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ফলে যুদ্ধ পরিকল্পনা ও হামলার গতি ‘চিন্তার গতির’ চেয়েও দ্রুত হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এই প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এতটাই কমিয়ে দিচ্ছে যে মানুষ কেবল যন্ত্রের প্রস্তাব অনুমোদন করার ভূমিকায় নেমে আসার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হামলার পরিকল্পনায় অ্যানথ্রোপিকের তৈরি এআই মডেল ক্লড ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তি ‘কিল চেইন’ বা লক্ষ্য নির্ধারণ থেকে আইনি অনুমোদন এবং হামলা শুরুর পুরো প্রক্রিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্ষিপ্ত করে দেয়।

ইসরায়েল এর আগে গাজায় লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবহার করেছিল। এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে তারা ইরানে প্রথম ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি হামলা চালায়। ওই হামলায় ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।

‘ডিসিশন কমপ্রেশন’: সিদ্ধান্তের সময় সংকুচিত

এই ক্ষেত্রের গবেষকদের মতে, জটিল সামরিক হামলার পরিকল্পনায় আগে যেখানে দিন বা সপ্তাহ লেগে যেত, এখন তা মিনিট বা সেকেন্ডে নেমে এসেছে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ‘ডিসিশন কমপ্রেশন’। এর ফলে মানব সামরিক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা কেবল এআই-নির্ধারিত হামলার পরিকল্পনায় সিল দেওয়ার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছেন।

২০২৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক অ্যানথ্রোপিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরসহ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোতে তাদের মডেল স্থাপন করে। একই সময়ে যুদ্ধপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালানটির টেকনোলজিস পেন্টাগনের সঙ্গে যৌথভাবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যা দ্রুত গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ভূগোলের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ক্রেইগ জোন্স বলেন, ‘এআই লক্ষ্য নির্ধারণে যে সুপারিশ করছে, তা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তার গতির চেয়েও দ্রুত। অতীতে যেসব অভিযানে দিন বা সপ্তাহ লাগত, এখন তা একসঙ্গে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হচ্ছে।’

হামলার আইনি মূল্যায়নেও এআই

সর্বাধুনিক এআই ব্যবস্থা ড্রোন ফুটেজ, টেলিযোগাযোগ নজরদারি ও মানব গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত সম্ভাব্য লক্ষ্য চিহ্নিত করতে পারে। প্যালানটির টেকনোলজিসের সিস্টেম মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে অগ্রাধিকার-ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ, অস্ত্র নির্বাচন, মজুত পরিস্থিতি এবং আগের অভিযানগুলোর কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে। এমনকি হামলার আইনি ভিত্তিও স্বয়ংক্রিয় যুক্তির মাধ্যমে মূল্যায়ন করে।

লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপক ডেভিড লেসলি বলেন, ‘এটি সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তির নতুন যুগ।’ তবে তিনি সতর্ক করে দেন, এআই ব্যবহারে ‘কগনিটিভ অফ-লোডিং’ হতে পারে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য চিন্তাভাবনার দায়িত্ব যন্ত্র নিয়ে নেওয়ায় এর পরিণতি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ

শনিবার দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। বিদ্যালয়টি একটি সামরিক ব্যারাকের কাছে ছিল বলে জানা গেছে।

জাতিসংঘ একে ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এ ঘটনার তদন্ত করছে।

ইরানের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ইরান ২০২৫ সালে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবহারের দাবি করলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের এআই কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে।

ইরানে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বলে আসছিল, তারা অ্যানথ্রোপিকের ব্যবহার বন্ধ করবে, কারণ প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা মার্কিন নাগরিকদের নজরদারিতে তাদের এআই ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। তবে পর্যায়ক্রমে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে অপেনএআই পেন্টাগনের সঙ্গে সামরিক প্রয়োজনে নিজেদের মডেল ব্যবহারের চুক্তি করেছে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্রেরণা জোশি বলেন, ‘এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও দক্ষতা বাড়ায়। লজিস্টিকস, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার বাড়ছে। এটি দ্রুতগতিতে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তদাতাদের সহায়তা করে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-চালিত যুদ্ধ প্রযুক্তির এই দ্রুত বিস্তার ভবিষ্যতের সামরিক কৌশল আমূল বদলে দিতে পারে। তবে মানবিক বিবেচনা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের অভিযানে সাংবাদিক ও ঢাবি শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে দুই মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। 

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা হলেন— বাংলানিউজ২৪.কম-এর তোফায়েল আহমেদ (২৫) এবং আজকের পত্রিকার কাউসার আহমেদ রিপন (২৭)। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল পুলিশ সদস্য তোফায়েলকে লাঠি দিয়ে নির্বিচারে পেটাচ্ছেন। পরে অন্য পুলিশ সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতালে সংবাদমাধ্যমকে তোফায়েল জানান, অভিযানের ভিডিও ধারণ করতে গেলে পুলিশ তাকে বাধা দেয়। এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে চার-পাঁচজন কনস্টেবল মিলে তাকে মারধর শুরু করেন।

সহকর্মী তোফায়েলকে বাঁচাতে গেলে হামলার শিকার হন সাংবাদিক রিপন আহমেদও। তিনি বলেন, পুলিশকে থামতে বলায় তারা আমাকে ভিডিও করতে বাধা দেয় এবং লাঠি দিয়ে আমার পায়ে আঘাত করে।

এ বিষয়ে রমনা ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম দাবি করেন, এটি একটি ‘ভুল বোঝাবুঝি’। তিনি বলেন, একজন মাদকাসক্তের ছুরিকাঘাতে এক পুলিশ সদস্যের ভ্রু কেটে যায়। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সাংবাদিকদের সাথে আইডি কার্ড না থাকায় পুলিশ সদস্যরা ভুলবশত তাদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন।

ডিসি এই ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে অভিযান চলাকালে ঢাবির তিন শিক্ষার্থীকেও আটক করা হয়। তাদের মধ্যে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের ঢাকা মহানগর ইউনিটের আহ্বায়ক নাঈম উদ্দিনকে পুলিশের মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। 

ভিডিওতে দেখা যায়, নাঈম ডিসি মাসুদ আলমের সাথে কথা বলার সময় হঠাৎ এক পুলিশ সদস্য তাকে পেছন থেকে টেনে-হিঁচড়ে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছেন।

নাঈম উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘বহু ভাষার সন্ধ্যা’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছিলেন এবং ফেরার পথে পুলিশের মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, তারা আমাদের কাছে অবৈধ কিছু না পেয়ে অভিযোগ তোলেন যে আমরা নাকি তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছি। আমার মাথা, হাত ও পায়ে চোট লেগেছে। আমার সঙ্গ থাকা আরও এক বন্ধুকেও তারা মেরেছে।

নাঈমকে মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম বলেন,সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে তল্লাশি করতে চাইলে তিনি বাধা দেন এবং তর্কে লিপ্ত হন। তখন একজন পুলিশ সদস্য তাকে পেছন থেকে টেনে নামান। তবে তিনি নিজে হস্তক্ষেপ করে পুলিশ সদস্যদের থামিয়েছেন বলেও জানান।

নাঈমের কাছে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি বলে স্বীকার করেন মাসুদ আলম। তবে মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আটক তিন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা, জীবনদর্শন ও মহাবয়ানের ডাক

একদিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর আর সামনে মেঘালয় পাহাড়, মাঝখানে এক প্রাচীন বানাই গ্রাম মোহনপুর। সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের এ গ্রামের ধারেকাছে কোনো হাসপাতাল নেই। গ্রামের প্রবীণ ধাত্রীরাই সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা।

বানাই ভাষায় ধাত্রীদের বলে ‘দাইমাও’। মোহনপুর গ্রামের বিখ্যাত দাইমাও শিবিলা বানাই (৮৫)। তার ধাত্রীবিদ্যার হাতেখড়ি দিদিমা চুইলতামণি বানাই ও সুকুমণি বানাইয়ের কাছে। নাকলা নিকনীর (গোত্র) শিবিলা এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশের বেশি নিরাপদ প্রসব করিয়েছেন। বানাই সমাজে দাইমাওয়েরা পবিত্র ও সম্মানিত। তারা একইসঙ্গে ভেষজচিকিৎসা এবং আধ্যাত্মিকতার অনুশীলন করেন। গর্ভের পরিবেশ থেকে পৃথিবীর পরিবেশে মানুষের সংযোগকে জটিল অভিজ্ঞতা ও প্রার্থনার ভেতর দিয়ে তারা সম্ভব করে তোলেন। কিন্তু বানাই সমাজেও দাইমাওদের কাজ কমছে, নতুন দাইমাও গড়ে উঠছে না।

এর কারণ বহুমুখী। নানাভাবে বলপ্রয়োগ, সাংস্কৃতিক হেজিমনি, ভূমি বেদখল আর কৃষিভিত্তিক উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন বানাই সমাজকে করুণভাবে ‘গরিব’ ও ‘অসহায়’ করে তুলেছে। গ্রামে কোনো কাজ নেই, জীবিকার খোঁজে মানুষ ছুটছে দিগ্বিদিক। এমনকি বন্দুকের নলের ডগায় জীবন বন্ধক রেখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যাচ্ছে কয়লা ও পাথরখনিতে। অভাব, ক্ষীণ স্বাস্থ্য আর জাতিগত প্রান্তিকতার কারণে জারি থাকা ভয় ও শঙ্কার পরিবেশ বানাই সমাজে সন্তান নেওয়ার হারও কমছে। পৃথিবীর এক প্রাচীনবিদ্যা আর বিশ্ববীক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সিবিলাকেও কঠিন রক্তআগুন সামাল দিয়েই বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। রাষ্ট্র বা সমাজ শিবিলাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয় না। নাগরিক তৎপরতা বা সংস্কারের তুমুল বিবাদ শিবিলাদের জ্ঞান, দর্শন কিংবা সংগ্রামকে ধারণ করে না।

কেবল শিবিলা নয়; দেশের আদিবাসী কিংবা বাঙালি, সব সমাজেই গ্রামীণ ধাত্রী ও লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা ক্রমশ ভঙ্গুর, অস্বীকৃত, ক্ষতবিক্ষত ও নিশ্চিহ্নের পথে। অথচ পৃথিবী কীভাবে তাদের অবদান অস্বীকার করবে? এ বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জীবন ও কল্যাণ সুরক্ষায় আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান ও স্বীকৃতি’। আদিবাসী ধাত্রীদের বঞ্চনা ও অবদান, লোকায়ত জ্ঞান ও দর্শন নিয়ে চলতি আলাপটি হাজির হচ্ছে।

লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সুরক্ষা, আদিবাসী ধাত্রীদের স্বীকৃতি ও মর্যাদা, দেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোয় তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং লোকায়ত জ্ঞানের পাশাপাশি গ্রামীণ ধাত্রীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, উপকরণ সরবরাহ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।

সর্বশেষ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ অনুযায়ী দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন এবং জাতিসত্তা ৫০টি। এর ভেতর ঐতিহ্যগত বা সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষিত ধাত্রীদের সংখ্যা কত আমাদের জানা নেই। গ্রামীণ ধাত্রী বা লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান ও দলিলের শূণ্যতাকে সামনে নিয়েই দেশে প্রথমবারের মতো এই আলাপের বিস্তার ঘটছে।

শতজনমের সাক্ষী ও সাক্ষ্য

শতজনমের সাক্ষী হয়ে জীবনচক্রের সাক্ষ্য সমুন্নত রাখলেও আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে গবেষণা কাজ অপ্রতুল। ‘মিডওয়াইভস, ওম্যান অ্যান্ড দেয়ার ফ্যামিলি: অ্যা মৌরি গেজ’ (কেনি: ২০১১), ‘অ্যাবোরিজিনাল মিডওয়াফ: অ্যা মডেল ফর চেঞ্জ’ (স্কে: ২০১০), ‘রিক্লেইমিং বার্থ, হেলথ অ্যান্ড কমিউনিটি’ (২০০৭), ‘অথরাইজিং ট্র্যাডিশন: ভেক্টরস অব কানেকশন ইন হাইল্যান্ড মায়া মিডওয়াইফারি’ (হিনোজোসা: ২০০৪), ‘রিচ্যুয়ালস অ্যান্ড নলেজ অব অ্যান্ডিন মিডওয়াভস ইন ম্যাটারনাল অ্যান্ড নিওন্যাটাল কেয়ার’ (২০২৬)—আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলো দেখানোর চেষ্টা করেছে, ধাত্রীরা জন্মকে প্রকৃতির এক পবিত্র প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। তারা ঐতিহ্যগত জ্ঞানের মাধ্যমে ভূমি, ভাষা, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরি করেন।

আদিবাসীদের মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে কাজ হলেও লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণা কাজের নজির কম। নাভিল ও হোসাইন (২০১৯) এক গবেষণায় সংক্ষেপে মধুপুরের মান্দি/গারোদের জন্মসংক্রান্ত আচারের কিছু বর্ণনা দিয়েছেন। আমিন ও খান (১৯৮৯) এবং মামুন ও অন্যান্যদের (২০২৫) গবেষণা গ্রামীণ ধাত্রীদের নিয়ে হলেও সেখানে লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার বিজ্ঞান ও দর্শনের বিবরণ ছিল না।

বাংলাদেশের বঞ্চিত আদিবাসী ধাত্রীরা

বাঙালি সমাজে গ্রামীণ ধাত্রীরা সাধারণভাবে ‘দাই’ বা ‘দাই মা’ হিসেবে পরিচিত। জাতিগতভাবে ধাত্রীদের পরিচয় ও ধাত্রীবিদ্যার ধরণ ভিন্ন ভিন্ন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বমদের ভেতর ধাত্রীরা ‘নাউ দমহ্’ নামে পরিচিত। ছোটমণি হিসেবে ছোট-ভাইবোনদের বোঝাতে ‘নাউ’ বলা হয়। দমহ্ মানে কোনো কিছু ধরা, ফা মানে সন্তান। ধাত্রীরাই প্রসবের সময় শিশুকে প্রথম ধরতে পারেন বলে এমন নাম। বান্দরবানের রুমার বেথেলপাড়ার বিখ্যাত নাউ দমহ্ রৌ সুম বমের ধাত্রীজীবনে এখনো কোনো অনিরাপদ প্রসবের ঘটনা ঘটেনি। তবে বিনা বিচারে আটক এবং কারাগারে প্রশ্নহীনভাবে মৃত্যু বম সমাজে সন্তান জন্মদান ও ধাত্রীবিদ্যার কাজকেও প্রভাবিত করেছে।

খুমিদের ভেতর ধাত্রীরা দুই নামে পরিচিত। ‘চা-ন-সিংনাই-নেউমপুই’ এবং ‘ডেউঙদি সাঙন্ডে’। বান্দরবানের রুমার প্রফুংম পাড়ার চিলিং খুমী ও থংবে খুমী বিখ্যাত খুমি ধাত্রী। লুসাই জনগোষ্ঠী ধাত্রীদের ডাকেন ‘নাউ দমতু’।

মারমা ভাষায় ধাত্রীকে বলে ‘ওয়াইব্যইং স্যেমা’। কিন্তু বান্দরবানের মারমারা তাদের আঞ্চলিক টোনে বলেন, ‘ওয়াইনেক ছা:রামা’। বান্দরবানের থানচির ডাকছৈ পাড়ার উনুমে মারমা ও বলিপাড়ার মা মুই চিং মারমা গুরুত্বপূর্ণ ধাত্রী।

মাতৃসূত্রীয় লেঙাম সমাজে ধাত্রীদের বলে ‘মাউ-মুন্নু’। যিনি মাকে চিহ্নিত করেন এবং প্রসবের মাধ্যমে মাধ্যমে কাউকে ‘মা’ করে তোলেন, তিনিই ‘মাউ-মুন্নু’। নেত্রকোণার কলমাকান্দার সন্যাসীপাড়ার চিনচিলি নংব্রেই ছিলেন এক অসাধারণ মাউ-মুন্নু।

মাতৃসূত্রীয় খাসিদের ভেতর ধাত্রীরা ‘কা নংপাইনখ্যা খুন’ নামে পরিচিত। মানে, যারা বাচ্চা প্রসব করান। কিন্তু আঞ্চলিক ওয়ার-সিনতেং ভাষায় ধাত্রীদের ‘সাতার’ ডাকা হয়। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ঝিমাই খাসি পুঞ্জির রানি মারলিয়া একজন খাসি ধাত্রী।

আরেক মাতৃসূত্রীয় মান্দি সমাজে ধাত্রীরা ‘খামাল’ বা সাংসারেক পুরোহিতের মর্যাদা পান। তাদের বলে ‘মিচিকসা খামাল’। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের ইদিলপুরের মিজি মৃ ছিলেন একজন বিখ্যাত মিচিকসা খামাল, যিনি মধুপুরে আনারস আবাদের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। ত্রিপুরারা ধাত্রীদের ডাকেন ‘গুমাচৌক বা গুমাচোক’। খাগড়াছড়ির গুইমারার ঠাকুরছড়ার রচনা রোয়াজা ও বাইল্যাছড়ির সুচিরোং ত্রিপুরা নামকরা গুমাচৌক।

উপকূলের রাখাইনদের ভেতর ধাত্রীদের বলে ‘ওয়াডেছ্রামা’। তারা সমাজে ‘এমিইগ্রীও’ বা বড়মা হিসেবে মর্যাদা পান। কারণ, ‘এ্যাসেই (নাড়ী)’ ছিন্ন করার অধিকার সমাজ কেবল তাদেরকেই দিয়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার তুলাতুলীপাড়ার শতবর্ষী সেমাচিং রাখাইন একজন অভিজ্ঞ ধাত্রী।

চাকমাদের ভেতর ধাত্রীদের বলে ‘অজা’। তঞ্চংগ্যারা বলেন ‘অসাপুরী’। রাঙ্গামাটির রাজস্থলীর গাইন্দা ইউনিয়নের তুলাছড়িপাড়ার দয়ামুগী তঞ্চংগ্যা ও ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের আততলীপাড়ার দিবি তঞ্চংগ্যা অসাপুরীর কাজ করেন।

সাঁওতালরা ধাত্রীকে বলেন ‘দৌরগিন বুডহি’। দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বারকোণা গ্রামের মালতী হেমব্রম ও ঠাকুরগাঁও সদরের মাতৃগাঁওয়ের দুলহান টুডু অভিজ্ঞ ধাত্রী। মুন্ডারা ধাত্রীকে বলেন ‘ধাইয়ানী বা দাইয়ানি’। মুসহর সমাজে ধাত্রীরা ‘ধাইনি’ নামে পরিচিত। ঠাকুরগাঁও সদরে ফকদনপুরের ধাইনি লিলমনি ঋষি একইসঙ্গে একজন খোদনী (উল্কি আঁকিয়ে)।

বেদিয়া মাহাতোদের ভেতর ধাত্রীকে বলে ‘কুশরাইন’। পাবনার চাটমোহরের হান্ডিয়াল ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের মালতী মাহাতো এবং জয়পুরহাটের পাঁচবিবির বালিঘাটা ইউনিয়নের কাশপুর গ্রামের সোনানুনি মাহাতো বলেন বিখ্যাত কুশরাইন।

লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার বিজ্ঞান ও দর্শন

বাংলাদেশের প্রবীণ আদিবাসী ধাত্রীরা জানান, কেবল সন্তান প্রসব ও নিরাপদ মাতৃত্বের কাজ নয়, বরং ভূমি ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরির এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করেন। একইসঙ্গে সমাজে মহাবয়ানের ডাক ও জীবনবীক্ষার প্রবাহ বংশপরম্পরায় জীবিত রাখেন। এ ক্ষেত্রে তাদের বহু রীতি ও কৃত্য পালন করতে হয়। সংরক্ষণ করতে হয় বহু উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ। মাতৃগর্ভ থেকে নাড়ি কাটার দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে সমাজ তাদের দিয়েছে। এটি পেশা নয়, বরং এক গভীর জীবনদর্শন ও জটিল অনুশীলন।

দেখা গেছে, অধিকাংশ আদিবাসী সমাজে নাড়ি কাটার জন্য বিশেষ বাঁশ প্রজাতির তৈরি ছুরি বা ব্লেড ব্যবহৃত হয়। এর ভেতর দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রথম সাংস্কৃতিক সংযোগ ঘটে। হয়তো মানবসমাজ বুনোপ্রকৃতির ভেতর বাঁশকেই প্রথম গৃহপালিত করেছিল বলে সাংস্কৃতিক সভ্যতা বিকাশের সেই আদি স্মৃতির চিহ্ন বাঁশের ছুরির ভেতর দিয়ে আবারো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া; মানুষ যাতে প্রকৃতির ঐতিহাসিক পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ না করে এবং দায় ও দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ থাকে।

মারমা জনগোষ্ঠী এই বাঁশের ছুরিকে ‘ওয়াহ: কালাইসং’ বলেন। লেঙামরা বলেন ‘সাংসালি’, ত্রিপুরাদের ককবরক ভাষায় বলে ‘য়ান্থাল’, চাকমারা বলে ‘দুলুক’, তঞ্চংগ্যারা বলে ‘বাই-শ দুলুক’, মান্দিরা বলেন ‘ওয়ানি গানদেলেং’, মুন্ডারা বলে ‘পাতিক্ষুর’, বেদিয়া মাহাতোরা বলেন ‘চাঁচড়’ এবং সাঁওতালি ভাষায় বলে ‘ছৌইলৌঃ বা ছুনছুনি’। সাঁওতালদের ক্ষেত্রে বাঁশের তৈরি তীরের ফলা (অৗপড়ি) দিয়ে নাড়িকাটার এক আদি নিয়ম ছিল, যা পূর্বজনদের স্মৃতির সঙ্গে নতুন জন্মের এক পরিচয়পর্ব। এসব বাঁশের ছুরির ধরণ, প্রস্তুতপ্রণালি ও ব্যবহারে জাতিগত ভিন্নতা আছে। সব বাঁশ দিয়ে এটি বানানো হয় না। মাকলা, ডলু, পারবো বাঁশ দিয়ে সাধারণত তৈরি হয়। গ্রামে সংরক্ষিত পবিত্র বন বা থান থেকে এই বাঁশ সংগ্রহ করা হয়।

নবজাতকের মুখে বিশুদ্ধ পবিত্র পানি, মধু বা কখনো সাংস্কৃতিক পানীয়ের ফোঁটা দেওয়া হয়। নাভি ও কাটাস্থানে কাঁচা হলুদ, নিম, ছাই ও বিভিন্ন ভেষজের প্রলেপ দেওয়া হয়। অধিকাংশ সমাজে সন্তান জন্মের জন্য এক অস্থায়ী ‘আঁতুড়ঘর’ বানানো হয়। মূলত ধাত্রীরা কয়েকদিনের জন্য এই ঘরেই প্রসূতির সঙ্গে কাটান। এ সময় বিশেষ খাদ্য, স্বাস্থ্যগত পরিচর্যা, নিয়ম ও আচার অনুষ্ঠান পালিত হয়। বাচ্চা জন্মের পর সামাজিকভাবে কৃত্য-অনুষ্ঠান আয়োজনের ভেতর দিয়ে ধাত্রীদের বিদায় দেওয়া হয়। ঋতুভিত্তিক নানা স্বাস্থ্যগত বিধি যেমন আছে, তেমনি লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যায় মহামারি সামাল দেওয়ার বিধিও আছে।

কার্যকর নীতি ও অঙ্গীকার

‘উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণ আইন (২০১৯)’ লোকায়ত জ্ঞানকে ‘চিরায়ত জ্ঞান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ‘বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইনে (২০১৭)’ স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রাণবৈচিত্র্য বিষয়ক জ্ঞানের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, স্বীকৃতি প্রদান ও জ্ঞান সংরক্ষণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ‘জাতীয় সংস্কৃতি নীতিতে (২০০৬)’ আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতি সুসংহত করা এবং ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে (২০১০)’ তাদের সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। লোকায়ত জ্ঞান ও সংস্কৃতি হিসেবে আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা এসব আইন ও নীতি দ্বারা সুরক্ষিত থাকার কথা।

জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে (২০১১) বলা হয়েছে, দরিদ্র, সামাজিকভাবে বঞ্চিত, অশিক্ষিত, প্রান্তিক, দূরবর্তীস্থানে বসবাসরত মানুষ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী, চা-শ্রমিক, কৃষিখাতে ও পশুপালনে নিয়োজিত মানুষ, কারখানা শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও কিছু কর্মসূচি তাদের জন্য বাস্তবায়ন হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কার্যকরভাবে প্রবেশ করতে পারছে না।

সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় মাঠপর্যায় পর্যন্ত ধাত্রীবিদ্যায় দক্ষ জনশক্তি প্রদান এবং প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা আছে স্বাস্থ্যনীতিতে। কিন্তু আদিবাসীসহ গ্রামীণ লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার সুরক্ষা এবং প্রথাগত ধাত্রীদের জীবন-বিকাশে কোনো সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার নেই। এ ক্ষেত্রে কার্যকর নীতিকাঠামোর পাশাপাশি ধাত্রীদের স্বীকৃতি ও লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা সুরক্ষা ও বিকাশে সমন্বিত তৎপরতা জরুরি।

 

পাভেল পার্থ: গবেষক ও লেখক
[email protected]

‘এটা পৃথিবীর শেষ নয়, নতুন শুরুর সময়’—ব্রাজিলকে ধৈর্য ধরার আহ্বান কাফুর

বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের হতাশাজনক বিদায়ের পর শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনা। কোচ, কৌশল, খেলোয়াড় সবকিছু নিয়েই চলছে নানা আলোচনা। তবে ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের অধিনায়ক কাফু মনে করেন, সমাধান শুধু কৌশল বদলানো বা নতুন কাউকে দোষারোপ করার মধ্যে নেই। ব্রাজিলকে আবার শীর্ষে ফিরতে হলে ধৈর্য, নতুন প্রজন্মের ওপর আস্থা এবং কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে সময় দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

শেষ ষোলোতে নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচে জোড়া গোল করেন আর্লিং হালান্ড। এই হারে ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষা অন্তত ২০৩০ সাল পর্যন্ত গড়াল। অর্থাৎ বিশ্বকাপ শিরোপার খরা দাঁড়াবে ২৮ বছরে, যা দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতম।

১৯৯৪ সালে ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটানো ব্রাজিল দলের সদস্য ছিলেন কাফু। তাই দীর্ঘ প্রতীক্ষার চাপ কতটা, তা খুব ভালো করেই জানেন তিনি। পরবর্তী প্রজন্মের ওপর চাপ আরও বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে কাফু বলেন, ‘অবশ্যই আরও বেশি। ১৯৯৪ সালে ২৪ বছর পর শিরোপা জেতার চাপ যদি এতটা হয়ে থাকে, তাহলে কল্পনা করুন, ২০৩০ সালে ২৮ বছর পর সেই চাপ কতটা হবে।’

সোমবার নিউইয়র্কের রকফেলার প্লাজায় ১৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি লেগো ব্লক দিয়ে তৈরি ৮ দশমিক ৪৭ মিটার দীর্ঘ বিশ্বকাপ ট্রফির একটি ভাস্কর্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কাফু।

সেখানে তিনি বলেন, একটি ব্যর্থতার কারণে ব্রাজিলের ফুটবলকে খাটো করে দেখার কোনো কারণ নেই। ‘ব্রাজিল তো ব্রাজিলই। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সম্ভাবনা ও মান কখনোই প্রশ্নের মুখে পড়ে না।’

তবে সেই কারণেই ধৈর্য ধরা আরও কঠিন হবে বলেও মনে করেন তিনি, ‘এটা পৃথিবীর শেষ নয়। বরং এটি একটি নতুন চক্র এবং নতুন প্রজন্মের শুরু। তাই আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, কার্লো আনচেলত্তিই সেই মানুষ, যিনি আবার ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারবেন।’
 

জনবসতি থেকে ৩০০ মিটার দূরত্বে পোলট্রি ফার্ম, থাকতে হবে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট

দেশের হাঁস-মুরগি পালন খাতকে আরও নিরাপদ ও রপ্তানিমুখী করতে প্রায় দুই দশক পর একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। পরিবেশবান্ধব উপায়ে ফার্মের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনব্যবস্থাকে আধুনিক করতে এই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুন ‘জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬’ অনুমোদন দিয়েছে। এটি ২০০৮ সাল থেকে চালু থাকা পুরোনো নীতিমালার স্থলাভিষিক্ত হলো।

বর্তমানে দেশের পোলট্রি খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত পোলট্রি খামারের সংখ্যা ৯০ হাজার। এর পাশাপাশি আরও প্রায় দুই লাখ অনিবন্ধিত খামার রয়েছে।

ডিম ও মাংসের উৎপাদন বাড়ানো, মুরগির খাবারে (ফিড) স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, খাবারে ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার বন্ধ করা, মুরগির জাত উন্নয়ন, দেশীয় জাত সংরক্ষণ, প্রাণিস্বাস্থ্য উন্নয়ন করা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোই এই নতুন নীতিমালার লক্ষ্য।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন এই নীতিমালা সময়োপযোগী। এতে পোলট্রি খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার কথা বলা হয়েছে।

কোথায় হবে খামার

নতুন নীতিমালায় খামার স্থাপন ও বায়ো সিকিউরিটি নিয়ে বেশ কিছু নিয়মের কথা বলা হয়েছে। খামার করতে হবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাইরে অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্ন বা ফাঁকা জায়গায়। এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি বা জনবসতি থাকলে অন্তত ৩০০ মিটার দূরে খামার করতে হবে। আর একটি খামার থেকে আরেকটি খামারের দূরত্ব হতে হবে কমপক্ষে ২০০ মিটার। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, এমন দূরত্ব বা ‘বাফার জোন’ খামারের ধুলাবালি ও দুর্গন্ধ কমানোর পাশাপাশি রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক পোলট্রি খামার পরিচালনা করা যাবে না।

দেশীয় জাতের মুরগি পালন উৎসাহিত করতে এবং ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে ‘অর্গানিক’ খামারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মুরগির জন্য মানসম্মত ওষুধ ও টিকার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে নীতিমালায়। নতুন বা সংক্রামক রোগ থেকে পোলট্রি খাতকে বাঁচাতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশে টিকা আবিষ্কার ও উৎপাদনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ফার্মের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

নীতিমালা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক খামারগুলোয় বায়ো গ্যাস প্ল্যান্ট এবং তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে।

বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারের জন্য বায়ো গ্যাস প্ল্যান্ট বিদ্যুতের দারুণ এক বিকল্প উৎস হতে পারে। মুরগির বিষ্ঠা প্রক্রিয়াজাত করে বায়ো গ্যাস ও তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। বায়োগ্যাস প্লান্টের তরল বর্জ্য জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের আহ্বায়ক এবং ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, ২০০৮ সালের পর এই খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং এর আকার আগের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘দেশের জমির পরিমাণ একই থাকলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ডিম ও মুরগির মাংসের চাহিদা অনেক বেড়েছে। খামারের সংখ্যা ও ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোরদার জৈব নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।’

এই নীতিমালাকে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন মশিউর রহমান। তবে তার মতে, এর সফলতা নির্ভর করছে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. শফির রহমান বলেন, নতুন এই নীতিমালায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা এর ক্ষতিকর প্রভাব ঠেকাতে কঠোর নিয়ম আনা হয়েছে, যা ২০০৮ সালের নীতিমালায় ছিল না। প্রথমবারের মতো এখানে অর্গানিক পোলট্রি উৎপাদনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মুরগির ওজন বাড়াতে রাসায়নিক গ্রোথ প্রমোটার, জিনগত পরিবর্তন করা উপাদান বা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘এই নীতিমালায় নিরাপদ মুরগির খাবারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, শুধু দেশে মুরগির বাচ্চার সংকট থাকলেই ‘গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক’ এবং এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি করা যাবে। ‘প্যারেন্ট স্টক’ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও এটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে আমদানির সুযোগ নেই।

ধানমন্ডিতে জামায়াতের মিছিল শেষে ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে সাংবাদিককে মারধর

রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে এক সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের বিরুদ্ধে।

হামলায় আহত ওই সাংবাদিকের নাম মাহফুজুর রহমান শিশির। তিনি দৈনিক সকালের রিপোর্টার।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর ধানমন্ডি জোন ওই এলাকায় মিছিলের আয়োজন করে।

মিছিলের পর ব্রিফিং চলাকালে কয়েকজন জামায়াত কর্মী এক সাংবাদিককে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ বলে আখ্যা দেন। সাংবাদিকরা এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করলে কথা কাটাকাটি শুরু হয়, যা পরে সংঘাতে রূপ নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, জামায়াত কর্মীরা শিশিরের কলার ধরে তাকে ঘুষি মারেন এবং তিনি রাস্তায় পড়ে গেলে কয়েকজন তাকে লাথিও মারেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিশির বলেন, জামায়াত কর্মীরা মারধর করে আমাকে আহত করেছেন, এটা লজ্জার।

তিনি আরও বলেন, আপনারা (জামায়াতে ইসলামী) তো সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলেন। একজন সাংবাদিকের কলার ধরা আর তাকে মারধর করা কি আপনাদের সেই স্বাধীনতার নমুনা?

পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন ঘটনাটিকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, আমরা সাংবাদিকদের প্রতি কোনো ধরনের অসদাচরণ সমর্থন করি না।

ফুটেজ দেখে আমরা এই ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করব এবং তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব। কোনো বহিরাগত এর সঙ্গে জড়িত ছিল কি না- তাও আমরা তদন্ত করে দেখব।

সবাই আমাকে মেহেরীন নামে ডাকে, ভাবিনি এতটা জনপ্রিয়তা পাব: কেয়া পায়েল

নতুন প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী কেয়া পায়েল। কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে অসংখ্য নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি মডেলিংয়েও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ধারাবাহিক নাটক ‘এটা আমাদেরই গল্প’-এ ‘মেহেরীন’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। এই চরিত্র তাকে এনে দিয়েছে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা ও ভালোবাসা।

সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপে নিজের অভিজ্ঞতা, জনপ্রিয়তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত এই ধারাবাহিকটি প্রচারিত হচ্ছে চ্যানেল আই-এ এবং ইউটিউবেও। নাটকটিতে একঝাঁক জনপ্রিয় শিল্পীর পাশাপাশি কেয়া পায়েলের অভিনয় বিশেষভাবে দর্শকদের নজর কেড়েছে।

নাটকটির সাফল্য নিয়ে কেয়া পায়েল বলেন, ‘অনেক নাটকে অভিনয় করেছি, কিন্তু এইভাবে কোনো নাটকের জন্য সাড়া পাইনি। বিশেষ করে ধারাবাহিক নাটক। ভাবিনি নাটকটি এতটা জনপ্রিয়তা পাবে, এতটা ভালোবাসা পাব।’

‘মেহেরীন’ চরিত্রের জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন যেখানে যাই, মানুষ আমাকে নাটকের চরিত্রের নাম ধরে ডাকে। সবাই আমাকে “মেহেরীন” নামে ডাকে। এটা আমার জন্য বড় পাওয়া। একটি নাটক সফল হলে এবং চরিত্রের নামে মানুষ চিনলে বুঝি—কাজটি দর্শকের কাছে পৌঁছেছে।’

দর্শকদের প্রতিক্রিয়া নিয়েও উচ্ছ্বসিত এই অভিনেত্রী। তিনি বলেন, ‘দর্শকরা সবসময় জানতে চান পরের পর্বে কী হবে। তারা অসাধারণ প্রশংসা করেন। মজার বিষয় হলো, তারা আমাকে কেয়া পায়েল না বলে “মেহেরীন” বলেই ডাকেন।’

ক্যারিয়ারে এমন সাড়া আগে পেয়েছেন কি না—এ প্রশ্নে তার সরল জবাব, ‘না, এভাবে প্রশংসা পাওয়া যায়, আগে ধারণা ছিল না।’

নাটকের সহশিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেন তিনি। বলেন, ‘অনেকদিন ধরে শুটিং করেছি। ইরফান সাজ্জাদ, সুনেরাহ, খায়রুল বাসার—সবাই মিলে দারুণ সময় কেটেছে। কাজ করতে করতে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। পুরো প্রক্রিয়াটা খুব উপভোগ করেছি।’

পরিচালক রাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রাজ ভাইয়ার সঙ্গে আগেও কাজ করেছি। তবে এবার ধারাবাহিক করলাম। তিনি খুব পরিশ্রমী ও মেধাবী একজন পরিচালক। দর্শকরা কী চান, সেটা তিনি ভালো বোঝেন। এই নাটকে তিনি সত্যিই পরিচালনার ম্যাজিক দেখিয়েছেন।’

সম্প্রতি মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে এই নাটকের জন্য দর্শক জরিপে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন কেয়া পায়েল। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে এমন একটি স্বীকৃতি পেয়ে খুব ভালো লাগছে। এজন্য পরিচালক রাজ ভাইয়াকে ধন্যবাদ।’

কোন ধরনের চরিত্রে কাজ করতে আগ্রহী—এ প্রশ্নে তিনি জানান, ‘যেসব চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ থাকে, যেখানে চ্যালেঞ্জ নেওয়া যায়—সেসব চরিত্র আমাকে বেশি টানে।’

একটি চরিত্রের জন্য প্রস্তুতি প্রসঙ্গে কেয়া বলেন, ‘আমি অনেক ভাবি, পুরোপুরি প্রস্তুতি নিই। তারপর শুটিংয়ে যাই।’

বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন ঈদের নাটকের শুটিং নিয়েই ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। আশা করছি, আগামী ঈদে দর্শকরা আমাকে ভালো কিছু নাটকে দেখতে পাবেন।’

ক্ষেপণাস্ত্র বনাম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কত দিন চলবে প্রতিযোগিতা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এখন মূলত দুটি দৃশ্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে ইরানের ছোঁড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হচ্ছে। অন্যদিকে সেগুলোকে প্রতিহত করতে আকাশে ছুটে যাচ্ছে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র।

বার্তা-সংস্থা এএফপির বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপট।  

ওপেন-সোর্স গোয়েন্দা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মিন্টেল ওয়ার্ল্ডের তথ্যের বরাতে এএফপি জানায়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম দুই দিনেই সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানের দিকে চারশ ক্ষেপণাস্ত্র ও এক হাজার ড্রোন নিক্ষেপ করে ইরান।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মেরিন কর্মকর্তা স্কট বেনেডিক্ট এএফপিকে বলেন, ‘এটা আসলে কার অস্ত্রভাণ্ডার বেশি তার প্রতিযোগিতা। যেন দুই তীরন্দাজ একে অপরকে তীর ছুঁড়ছে, শেষ পর্যন্ত যার তীর আগে ফুরাবে, সে হারবে।’

কতদিন টিকবে আকাশ প্রতিরক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন জানান, সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে এবং শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুদ প্রায় সীমাহীন এবং এ দিয়ে দীর্ঘসময় যুদ্ধ চালানো সম্ভব বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে বাস্তবে এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতদিন কার্যকর রাখা যাবে—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘তীর নয়, তীরন্দাজকে লক্ষ্য’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন লঞ্চার বা উৎক্ষেপণ ব্যবস্থাগুলো ধ্বংসে মনোযোগ দিচ্ছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এই যুদ্ধ মূলত ‘তীর নয়, তীরন্দাজকে গুলি করার’ কৌশল।

গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধ শেষে ধারণা করা হয়েছিল, ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম কয়েকশ থেকে প্রায় দুই হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের হাতে ছিল।

এ ছাড়া, উপসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছাতে সক্ষম স্বল্পপাল্লার বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র এবং তুলনামূলক কম খরচের ড্রোনও রয়েছে তাদের ভাণ্ডারে।

ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্র বলছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন দ্রুত বাড়ছিল।

তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক লঞ্চার গত বছর যুদ্ধের সময় ধ্বংস করা হয় এবং বাকিগুলো এখন লক্ষ্যবস্তু।

ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা, দীর্ঘ যুদ্ধের চাপ

ফ্রান্সভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চের গবেষক এতিয়েন মারকুজ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘনত্ব কম দেখা যাচ্ছে।

তার প্রশ্ন—ইরান কি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংরক্ষণ করছে, নাকি বড় আকারের সমন্বিত হামলা চালানোর সক্ষমতা কমে গেছে?

তবে হামলা কম হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যে আঘাত হানছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা পুরোপুরি অপ্রবেশযোগ্য নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে কমপক্ষে দুটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করতে হয়। এসব ইন্টারসেপ্টর অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সীমিত সংখ্যায় উৎপাদিত হয়।

এএফপি জানায়, বছরে মাত্র ৯৬টি থাড মিসাইল এবং প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রায় ৬০০টি ইন্টারসেপ্টর তৈরি হয়।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে প্রায় ১৫০টি থাড মিসাইল ব্যবহার করে ইসরায়েল।

এই মজুত দীর্ঘ সময় টিকবে না বলে সতর্ক করেছেন মারকুজ।

তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য দ্রুত ইরানের উৎক্ষেপণ সক্ষমতা ধ্বংস করা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।

তার মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা অসম্ভব।

রাজনৈতিক সমাধান না আসলে ইয়েমেনের হুতিদের মতোই ইরানও দীর্ঘ সময় ধরে কম মাত্রার কিন্তু স্থায়ী চাপ বজায় রাখতে পারে বলে মনে করেন গবেষক এতিয়েন মারকুজ।

পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি

পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলছে, পোশাকের রঙ বা নকশা নয় বরং পুলিশ সদস্যদের মন মানসিকতার পরিবর্তন, মনোবল এবং পেশাদারত্বের উন্নয়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামানের সই করা এক বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ পুলিশের জন্য যে নতুন পোশাক নির্বাচন করেছে, সেখানে পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং, আবহাওয়া এবং সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো প্রকার জনমত যাচাই ছাড়াই নির্বাচিত এই পোশাকের সঙ্গে ইউনিফর্মধারী অন্যান্য সংস্থার পোশাকের হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে।

এর ফলে পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মাঠপর্যায় থেকে মতামত উঠে এসেছে। বিষয়টি অ্যাসোসিয়েশনের নজরে এসেছে এবং বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই পরিবর্তনের পক্ষে নন। তারা বর্তমানে পরিহিত পোশাকটিকে বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের প্রতীক হিসেবে মনে করেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, পোশাক পরিবর্তন একটি বিশাল ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া, যা বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন মনে করে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নতুন পোশাক তৈরির পরিবর্তে বাহিনীর আধুনিকায়ন, থানা পর্যায়ে যানবাহন সরবরাহ ও লজিস্টিকস্ সাপোর্ট বাড়ানোই অধিক যুক্তিযুক্ত হবে।

এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পোশাকের রঙ বা নকশা নয় বরং পুলিশ সদস্যদের মন মানসিকতার পরিবর্তন, মনোবল এবং পেশাদারিত্বের উন্নয়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্য এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেছে, পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি যেন পুনর্বিবেচনা করে তা আরও অধিক গবেষণা ও জনমত যাচাইকল্পে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের প্রতিটি সদস্যের আবেগ ও বাস্তবসম্মত দিকগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।  

শুধু রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নয়, অর্থনৈতিক জ্ঞানও প্রয়োজন

আমরা বাংলাদেশিরা গণতন্ত্রকে ভালোবাসি, লালন করি এবং এর জন্য সংগ্রাম করি। কিন্তু, বারবার গণতন্ত্রকে টেকসই করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। সদ্য আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করলাম। এই অভ্যুত্থান নানা দিক থেকেই ছিল অনন্য। এটি ছিল সর্বব্যাপী, তৃণমূলভিত্তিক ও তারুণ্যনির্ভর।

নিপীড়নমূলক শাসনের বিরুদ্ধে আমাদের শিক্ষার্থী ও তরুণদের রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস দীর্ঘ ও গৌরবময়। পঞ্চাশের দশকে বাংলাকে পাকিস্তানের দুই রাষ্ট্রভাষার একটির মর্যাদা এনে দিয়েছিল তরুণরাই। তারাই আইয়ুব শাসনের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দেয়া মুক্তিবাহিনীর অন্যতম শক্তি ছিল এই তরুণেরা। স্বাধীনতার পর তারাই জেনারেল এরশাদের শাসনের অবসান ঘটায় এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায়। এসব আন্দোলনে তরুণদের উদ্যম, দূরদৃষ্টি ও দেশপ্রেম প্রমাণ করে যে, নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিতে নতুন প্রজন্মের অদম্য স্পৃহা কখনো নিঃশেষ হয় না।

কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হতে না হতেই আমাদের রাজনৈতিক নেতারা আবারও পারস্পরিক দ্বন্দ্বে ফিরে গেছেন। পরস্পরকে নিরন্তর দুষছেন। ফলে, দিনকে দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, এত তাড়াতাড়ি যদি দেশের রাজনীতি সেই পুরোনো ধারাতেই ফিরে যায়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী?

প্রশ্ন হলো, আমাদের রাজনৈতিক নেতারা কেন মানুষের মধ্যে এই হতাশা তৈরি করছেন? যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন উদযাপন করার কথা, সেখানে সরকার ও বিরোধীদলগুলোর বাকযুদ্ধ চলছে। আর এ সবকিছুই অস্বস্তি সৃষ্টি করছে দেশের মানুষের মধ্যে। এই মুহূর্তে আমাদের উচিত ছিল একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেদের অভিনন্দন জানানো। কিন্তু তার পরিবর্তে আমরা এমন কথা বলছি বা এমন ইঙ্গিত দিচ্ছি, যা অপ্রয়োজনীয় এবং আত্মঘাতী সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।

গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এসব পরিস্থিতি তৈরি করে তারা নিজেদের অজান্তেই পতিত, পরাজিত, পলাতক স্বৈরাচারের পুনর্বাসনের পথ সুগম করছে কি না, সেটি মনে হয় ভেবে দেখা প্রয়োজন আমাদের।’

আমরা কি সত্যিই অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছি? পরাজিত স্বৈরাচারী শক্তির ফিরে আসার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা কি আছে? আমাদের বিশ্বাস, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা যথেষ্ট প্রস্তুত এবং নিকট ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করে অযথাই নিজের অবস্থানকে দুর্বল করছেন।

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির জুলাই জাতীয় সনদ এবং এতে প্রতিশ্রুত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বিলম্বের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘দেশের বারোটা বাজবে, আর আমরা কি বসে বসে আঙুল চুষব।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, আরেকটি বিপ্লব আসন্ন। এই বিপ্লবের জন্য আমি আপনাদের সবাইকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

নির্বাচিত বিরোধীদলীয় নেতা যখন বলেন ‘দেশের বারোটা বাজছে’, তখন আমাদের ভাবনায় কী আসবে? এটি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। যে ‘দেশের বারোটা বাজছে’, সেখানে কেউ কেন বিনিয়োগ করতে আসবে? দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আমরা কীভাবে অর্জন করব? এ ধরনের বক্তব্য কি আমাদের প্রতিপক্ষের মুখে হাসি ফোটায় না? আমরা ভুল পথে এগোচ্ছি—প্রতিপক্ষের এমন দাবিকে আরও শক্তিশালী করে না?

বিরোধীদলীয় নেতার পূর্বাভাস যদি সত্যের কাছাকাছিও হতো, তাহলে কি দক্ষিণ কোরিয়া আমাদের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সই করত? কিংবা জাপানও কি এই কিছুদিন আগেই একই রকম আরেকটি চুক্তি করত?

সামান্য জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য আমরা কীভাবে নিজেদের অগ্রগতির সম্ভাবনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করি, তারই দুঃখজনক কিন্তু বাস্তব উদাহরণ এগুলো।

আমার আগের কলামে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলাম। দুঃখজনকভাবে, সেই প্রবণতা শুধু অব্যাহতই নেই, বরং আরও সহিংস রূপ নিয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের ছাত্রসংগঠনগুলো সরাসরি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। গত মঙ্গলবার বিভিন্ন জেলার চারটি ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে অন্তত ৯০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব বিরোধ এড়ানো সম্ভব ছিল এবং সংলাপের মাধ্যমে অবশ্যই সমাধান করা যেত। কিন্তু তা না করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার এই প্রবণতা সহিংসতার প্রতি এক ধরনের মানসিক ঝোঁকই প্রকাশ করে। এর ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা আরও কমবে এবং অতীতে যেভাবে বড় রাজনৈতিক দলগুলো পেশিশক্তিকে প্রশ্রয় দিয়েছে, সেই সংস্কৃতিই আরও শক্তিশালী হবে। এর পরিণতিতে ছাত্ররাজনীতি সেই গঠনমূলক ও জাতি গঠনের ভূমিকায় ফিরে যেতে পারবে না, যা আমরা একসময় দেখেছি।

সক্রিয় রাজনীতিতে নেই এমন সাধারণ শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যেই ক্লাসে যেতে বা ক্যাম্পাসে থাকতে ভয় পাচ্ছেন, অনিরাপদ বোধ করছেন। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র এমন হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটাই হচ্ছে এবং বাড়ছে। অতীতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলের ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে যে দ্বন্দ্বের সংস্কৃতি ছিল, আমরা আবারও সেই ধারাবাহিকতাই দেখছি।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ সময়ে ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনায় ৫৬ জন নিহত ও ৫ হাজার ২৪৬ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর মধ্যে ২৭৩টি সংঘর্ষ হয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে, ২৯০টি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এবং ৩৩টি বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে।

এটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত।

আমরা যে বিষয়টি তুলে ধরতে চাই তা হলো, সহিংসতার পরিবর্তে শাসক ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আরও পরিণত ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা হতে হবে। এই সময়ে আমাদের রাজনীতিবিদদের অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করা উচিত। হ্যাঁ, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীদের অনেকে অনেক সময় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা বলেন। কিন্তু সংসদীয় কমিটি কিংবা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধীদলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে দেশের গভীর অর্থনৈতিক সংকট বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করার কোনো আন্তরিক উদ্যোগ আমরা দেখতে পাই না।

একইসঙ্গে বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদদেরও দায়িত্ব অনেক। সেখানে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান কীভাবে এমন মন্তব্য করেন যে, ‘দাম বাড়ানোর অজুহাত তৈরি করতে সরকার কৃত্রিম গ্যাস সংকট সৃষ্টি করেছে’? গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে ১১-দলীয় জোট দেশব্যাপী বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। এটা ‘জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

আজকের এই দুনিয়ায় অর্থনীতি কীভাবে বিকশিত হয়, শিল্প কীভাবে পরিচালিত হয় এবং আমাদের রপ্তানিকারকরা কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন—এসব বিষয়ে আমাদের রাজনীতিবিদদের মৌলিক ধারণা থাকা আবশ্যক। কৃষি এখনো আমাদের পরিকল্পনায় অবহেলিত, অথচ এটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কৃষির উন্নয়নে বায়ো টেকনোলজি ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অপরিহার্য উপাদান। আধুনিক অর্থনীতিতে ব্যাংকখাত সবচেয়ে উন্নত ও জটিল ক্ষেত্রগুলোর একটি। একইসঙ্গে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে প্রকল্প অর্থায়ন কীভাবে হয় এবং কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয় সে বিষয়গুলো রাজনীতিকদের বিবেচনায় রাখা।

আমরা সাধারণত দক্ষতা দেখে মন্ত্রী নিয়োগ দিই না। রাজনৈতিক কারণে যদি এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতেই হয়, তাহলে যাকে যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেই বিষয়ে অবিলম্বে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, আজকের দিনে রাষ্ট্র পরিচালনাও একটি বিজ্ঞান। এটি জ্ঞাননির্ভর ও বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক হতে হয়, বক্তৃতা বা বাগাড়ম্বরনির্ভর নয়। ভালো নীতি বাস্তবায়নে আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকেই এই শিক্ষা নেওয়া উচিত।

বর্তমানে বাংলাদেশ ইতিহাসের অন্যতম কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একটি সুস্থ অর্থনীতির কিছু মৌলিক ভিত্তি হাসিনা সরকারের আমলে ধ্বংস হয়ে গেছে, বিশেষ করে ব্যাংকখাত। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে তৃণমূল পর্যায়ে শৃঙ্খলাহীনতা ও মবতন্ত্রের বিস্তার আমাদের শিল্প উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণ জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ছোট অর্থনীতিগুলো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইরান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে জুনের মধ্যে জ্বালানি ও সার আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

আজ আমরা কাঁচামাল সরবরাহ, শিল্প উৎপাদনের উপকরণের দাম এবং রপ্তানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। তবে সর্বোপরি, জ্বালানির সংকটই আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাসও প্রায় একই।

গ্যাস সংকট, বেসরকারিখাতে দুর্বল বিনিয়োগ ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। করোনা মহামারির পর এই প্রথম শিল্প উৎপাদন কমছে। শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ৭০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার ফলে কর্মহীন হয়েছে লাখো মানুষ।

ব্যাংকখাতের সংকট আরও গভীর হয়েছে। গত মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা টাকার অঙ্কে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি।

মূল্যস্ফীতি এখনো অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এর কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে টানা চার বছর ধরে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের আশপাশে রয়েছে।

কাজেই, আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের উচিত বাংলাদেশের সামনে থাকা গুরুতর চ্যালেঞ্জগুলো উপলব্ধি করা, তাদের বক্তব্যে সংযম আনা এবং আরও বাস্তবসম্মত অবস্থান গ্রহণ করা। একইসঙ্গে পরামর্শ দেবো, বিরোধীদলকে আরও বেশি ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে তারা আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। একইসঙ্গে, যত বেশি স্বাধীনতা বিরোধীদল পাবে, তত বেশি দায়িত্বশীলও তাদের হতে হবে। তাদের অবস্থান হতে হবে আরও বাস্তবভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর।

বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলো তো বটেই, প্রতিটি দেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে অনেক বেশি পরিণত, দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক রাজনৈতিক সংলাপ প্রয়োজন। আর তার জন্য জনপ্রিয়তানির্ভর বাগাড়ম্বরে অবশ্যই সংযত হতে হবে।

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার