30.3 C
Dhaka
Home Blog

এআই দৌড়ে টিকতে যে কৌশল হাতে নিয়েছে গুগল

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে একসময় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিলেও আবারও পিছিয়ে পড়েছে গুগলের জেমিনাই। কোডিংসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে জেমিনাইয়ের সক্ষমতা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় কম এবং নতুন ফ্ল্যাগশিপ মডেল প্রকাশের সময়ও অন্তত দুই মাস পিছিয়ে গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছে।

মূলত এআই নিয়ে হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে ‘গুগল ডিপমাইন্ডের’ শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এনেছে গুগল। গুগল ডিপমাইন্ড হলো গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান।

গত নভেম্বরে গুগলের জেমিনাই মডেল অল্প সময়ের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে গেলেও অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের নতুন ভার্সন আসার পর আবারও পিছিয়ে পড়ে। আগস্টে জেমিনাইয়ের নতুন ফ্ল্যাগশিপ সংস্করণ প্রকাশের কথা থাকলেও এই উদ্যোগটি অন্তত দুই মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় গুগল।

পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখা যায়, কোডিংয়ের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জেমিনাইয়ের সক্ষমতা তখনো প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে।

গত নভেম্বরে জেমিনাই ৩ প্রকাশের মাধ্যমে গুগল এআই প্রযুক্তির শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে ব্যবধান কমালেও দ্রুত আবার পিছিয়ে পড়ে।

চারটি সূত্রের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত সমস্যার কারণেই গুগল আবার পিছিয়ে পড়েছে।

কম্পিউটিং সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং জেমিনাইয়ের বিভিন্ন প্রকল্পপ্রধানদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে কোডিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় কম নজর দেওয়া হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন মতে, গুগলের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। ছোটখাটো সিদ্ধান্তগুলোও অনেকের হাত ঘুরে আসে। যার ফলে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় নতুন ভার্সন প্রকাশে বরাবরই ধীরগতি দেখিয়েছে গুগলের জেমিনাই।

৫ আগস্ট গুগলের এআই গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘গুগল ডিপমাইন্ডের’ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা আসে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ডেমিস হাসাবিসের জায়গায় তার সহকারী কোরে কাভুকচুওগলুকে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

হাসাবিসকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হলেও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

একই সময়ে জেমিনাইয়ের দুই মূল প্রযুক্তিগত সহনেতা পদত্যাগ করে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা করেন।

গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ৬ আগস্ট টাউন হল কর্মীসভায় জানানো হয়, ডিপমাইন্ডের কিছু দলকে সরিয়ে গুগলের মূল করপোরেট কাঠামোর অধীনে নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে ডিপমাইন্ডের স্বায়ত্তশাসন আরও কমে গেছে।

২০১৪ সালে লন্ডনভিত্তিক এই এআই গবেষণাগারটি কিনে নেওয়ার পর থেকেই গুগল ধীরে ধীরে এর স্বাধীনতা কমিয়ে আসছে। গুগল চায় এআই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তাদের অন্যান্য পণ্যকে আরও উন্নত করতে এবং মুনাফা বাড়াতে।

হাসাবিসের নেতৃত্বে গুগল ডিপমাইন্ড প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বিস্তৃত পরিসরে এআই গবেষণা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জেমিনাই মডেল তৈরি করেছে, যা গুগলের ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ২০২৩ সালে জেমিনাই আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর কিছুদিন পরই হাসাবিস ওই এআই প্ল্যাটফর্মের ব্যবস্থাপনা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসেন এবং তার সহযোগীদের হাতে এই দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

হাসাবিস এআই কীভাবে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটাতে এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে, সে বিষয়ে কাজ করেছেন ও বক্তব্য দিয়েছেন।

চেয়ারম্যান হিসেবে তার নতুন দায়িত্বের মূল বিষয় হবে এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন।

২০২৫ সালে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই ডিপমাইন্ডের তৎকালীন প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা কোরে কাভুকচুওগলুকে বাড়তি দায়িত্ব দেন। তিনি তাকে গুগলের চিফ এআই আর্কিটেক্ট হিসেবে নিয়োগ দেন।

গুগলের বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে জেমিনাইকে যুক্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে।

চারটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এরপরের কয়েক মাসে ডিপমাইন্ডের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তার প্রভাব কমতে থাকে এবং কাভুকচুওগলু জেমিনাইয়ের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

এবার কাভুকচুওগলুর কর্তৃত্বের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পেল।

গত সপ্তাহে গুগলের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানান, এখন থেকে ডিপমাইন্ডের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কাভুকচুওগলুর হাতেই থাকবে।

বছরের পর বছর মানুষকে বিনামূল্যে সার্চ ইঞ্জিন সেবা দিয়ে গেছে গুগল।

এখনো তাদের বেশিরভাগ পণ্যই সাধারণ ইউজাররা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারেন। এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করে তোলা ও এর মুনাফা বাড়াতে কাভুকচুওগলুর মতো কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

ডিপমাইন্ডের দায়িত্ব পাওয়ার আগে থেকেই তিনি গুগলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরে মনোযোগী একজন কর্মকর্তা হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

গুগলের এআই খাতে রাজস্বের সবচেয়ে বড় উৎস গুগল ক্লাউড। ডিপমাইন্ডের পক্ষ থেকে তিনিই গুগল ক্লাউড বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

প্রযুক্তি জগতে কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিনকে তেমন সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়নি। তবে এবার সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।

সের্গেই ব্রিন এআই বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের জেমিনাই মডেলের উন্নয়নে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অ্যানথ্রপিক তাদের শক্তিশালী ক্লড মিথোস মডেলের প্রিভিউ প্রকাশ করে প্রতিযোগীদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে যায়। ওই পরিস্থিতিতে গত এপ্রিল মাসে শত শত কর্মীর উপস্থিতিতে টাউন হল বৈঠকে বক্তব্য দেন ব্রিন।

এ সময় গুগল ডিপমাইন্ডকে আরও দ্রুত কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

গুগলে ৫২ বছর বয়সী ব্রিনের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাহী পদ নেই। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে তিনি এআই মডেল প্রশিক্ষণের বিভিন্ন উদ্যোগে প্রভাব রাখছেন।

গত কয়েক মাস ধরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের বলে আসছেন, এআই প্রযুক্তির অগ্রভাগে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে তাদের ব্যবধান কমাতে হবে।

গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ব্রিনের যে প্রভাব রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে তিনি রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্টের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

শীর্ষ কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্যের পরও সর্বস্তরের কর্মীদের ওই বৈঠকে ডিপমাইন্ডের স্বাধীন সত্তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সামনে আসে। কর্মীদের ধারণা, আগামীতে দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের জন্যও গুগলের করপোরেট অফিসের ওপর নির্ভর করতে হবে তাদের।

এ প্রসঙ্গে হাসাবিস ও কাভুকচুওগলু কর্মীদের জানান, প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে না এমন বিভাগগুলোকে ডিপমাইন্ড থেকে সরিয়ে গুগলের করপোরেট কাঠামোর অধীনে নেওয়া হচ্ছে।

কাভুকচুওগলু ছাড়া জেমিনাইয়ের মূল প্রযুক্তিগত সহনেতা জেফ ডিন ও ওরিওল ভিনিয়ালসসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা গত সপ্তাহের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে গুগল ছেড়ে গেছেন।

এসব কর্মকর্তার অধীনে কাজ করা কর্মীদের জেমিনাই প্রশিক্ষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়—এমন গবেষণা পরিচালনার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা ছিল।

তাদের চলে যাওয়ার পর ওই দল ও প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুগল তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পরিকল্পনা জানায়নি। এতে কেউ কেউ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন যে বাণিজ্যিক স্বার্থের বিরুদ্ধে ডিপমাইন্ডের যে সুরক্ষা ছিল, তা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ আগামীতে স্বাধীন এআই গবেষণার বদলে ডিপমাইন্ডকে শুধু লাভজনক প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে হতে পারে।

কাভুকচুওগলুর অন্যতম দায়িত্ব ছিল গুগলের বিভিন্ন পণ্যে জেমিনাইকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা।

পিচাইসহ গুগলের শীর্ষ কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বলেছেন, ভিডিও তৈরির মতো কিছু ক্ষেত্রে তারা এআই প্রযুক্তির অগ্রভাগে রয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লেও অন্য ক্ষেত্রগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধরে ফেলতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গুগলের ক্লাউড বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশা করছেন, কাভুকচুওগলুর নিয়োগের ফলে টেনসর প্রসেসিং ইউনিট বা টিপিইউ নামে পরিচিত সীমিত সরবরাহের এআই চিপ বণ্টন নিয়ে ডিপমাইন্ডের সঙ্গে বিদ্যমান টানাপোড়েন কমে আসবে।

এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে গুগল।

তবে গত মাসে ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপকালে পিচাই বলেন, মডেল প্রশিক্ষণ এবং ভোক্তা ও ব্যবসায়িক পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় টিপিইউ-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা কমাতে গুগল তার অবকাঠামো আরও সম্প্রসারণ করে যাবে।

প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন, গুগল কি এআই মডেলের প্রতিযোগিতা থেকে সরে যাচ্ছে? তবে জেমিনাইয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন এমন সাতজনের সঙ্গে কথা বলে রয়টার্স জানতে পেরেছে, অ্যালফাবেটের বাণিজ্যিকীকরণ কৌশল এবং গত সপ্তাহের নেতৃত্ব পুনর্গঠনের সঙ্গে এআই মডেলের প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অর্জনের প্রচেষ্টার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

গুগলের এই পুনর্গঠন এমন এক সময়ে হলো, যখন ব্রিন কর্মীদের আরও সক্রিয় ও উদ্যমী করে তুলতে কাজ করছেন।

২০২২ সালে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর গুগল যখন বড় ধাক্কা খেয়েছিল, তখনও একইভাবে কর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

গুগলের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর কারণেও তুলনামূলকভাবে দ্রুতগতির প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে ধীরগতিতে নতুন মডেল প্রকাশ করতে হয়েছে।

গুগলের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিপমাইন্ডের দৈনন্দিন কাজ আগের মতোই থাকবে। জেমিনাইয়ের দায়িত্বও কাভুকচুওগলুর কাছেই থাকবে।

তবে সামগ্রিক বার্তাটি স্পষ্ট—প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে ব্যবধান কমাতে গুগল আরও দ্রুত এগোতে চায়, জেমিনাইয়ের পেছনে আরও বেশি সম্পদ দিতে চায় এবং এআই গবেষণাকে কোম্পানির বাণিজ্যিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে চায়।
 

গাছ লাগানোর সাফল্য নয়, বাঁচানোর হিসাব চাই

বর্ষাকাল এলেই আব্বা আমাকে নিয়ে নওগাঁর গ্রামের বাড়িতে আম, কাঁঠালসহ নানা ফলদ গাছের চারা লাগাতে বের হতেন। কাদামাটির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি জায়গা বেছে নিতেন, চারা রোপণ করতেন, তারপর বছরের পর বছর সেগুলোর পরিচর্যা করতেন। নিয়মিত পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, বাঁশের খুঁটি দিয়ে গাছকে সুরক্ষা দেওয়া ছিল তার অভ্যাস। তখন বুঝিনি কিন্তু আজ উপলব্ধি করি, আব্বা আমাকে শুধু গাছ লাগানো নয়, দায়িত্ব, ধৈর্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার শিক্ষা দিচ্ছিলেন। আজও যখন গাছ লাগাই, মনে হয় আব্বার সেই শিক্ষা ও দায়িত্বেরই একটি ছোট অংশ পালন করছি।

কৈশোরে আমি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গ্রামবাংলায় বৃক্ষরোপণ ও খাল খননের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে দেখেছি। পরে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও পল্লী উন্নয়ন ও সবুজায়নকে জাতীয় কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছিলেন। তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয়ে উভয়েই সঠিক ছিলেন। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। গাছ, নদী, উর্বর জমি ও সবুজ প্রকৃতিও একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির ভিত্তি।

আজ সরকারের ২৫ কোটি গাছ রোপণের উদ্যোগ আমাকে আব্বার সেই শৈশবের শিক্ষার কথাই মনে করিয়ে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, সবুজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার এক ঐতিহাসিক সুযোগ।

তবে একটি প্রশ্ন অবশ্যই করতে হবে—পাঁচ বছর পর এই ২৫ কোটি চারার কতটি জীবিত থাকবে? আর এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে কর্মসূচিটির প্রকৃত সাফল্য।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আর গাছ লাগানো নয়, বরং রোপণ করা গাছগুলোকে বাঁচিয়ে পরিপক্ব গাছে পরিণত করা। একটি চারা রোপণ করতে কয়েক মিনিট লাগে, কিন্তু একটি গাছ বড় হতে লাগে বছরের পর বছর। সেই সময়জুড়ে প্রয়োজন পরিচর্যা, সুরক্ষা, পরিকল্পনা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জবাবদিহিতা।

এখন সময় এসেছে আমাদের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের—গাছ লাগানো নয়, গাছ বাঁচানো হোক বাংলাদেশের জাতীয় আন্দোলন।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সময়ে দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে পরিপক্ব গাছ কমে যাচ্ছে। জাতীয় বন জরিপ অনুযায়ী, দেশের বনভূমি মোট ভূমির মাত্র ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।

এই বাস্তবতায় গাছ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের প্রাকৃতিক অবকাঠামো। গাছ তাপমাত্রা কমায়, বায়ু বিশুদ্ধ করে, কার্বন শোষণ করে, জলাবদ্ধতা ও মাটিক্ষয় কমায় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। তাই রাস্তা ও সেতুর মতো গাছেও বিনিয়োগ করতে হবে। পার্থক্য হলো, একটি সুস্থ গাছের মূল্য সময়ের সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পায়।

সেইসঙ্গে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সাফল্য কেবল রোপিত চারার সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্যের সূচক হওয়া উচিত কতটি গাছ বেঁচে আছে, কতটি পরিপক্ব হয়েছে, কোথায় বৃক্ষ আচ্ছাদন বেড়েছে এবং মানুষ ও পরিবেশ কতটা উপকৃত হয়েছে। অর্থাৎ, সংখ্যা নয়, ফলাফলই হবে সাফল্যের মানদণ্ড। আর সেই ফলাফল নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জবাবদিহিতা।

কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় নীতি, অর্থায়ন ও লক্ষ্য নির্ধারণ করবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জাতীয় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু প্রকৃত সফলতা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় সরকারকে।

এর জন্য সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার বৃক্ষরোপণ, গাছের টিকে থাকার হার ও বৃক্ষ আচ্ছাদনের অগ্রগতি নিয়ে প্রতি বছর একটি সংক্ষিপ্ত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন। একইভাবে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও সিটি করপোরেশনের মেয়ররা নিজ নিজ এলাকার বৃক্ষরোপণ, পরিচর্যা, গাছের টিকে থাকার হার ও বৃক্ষ আচ্ছাদনের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন।

প্রতিবেদনে শুধু রোপণ করা গাছের হিসাব থাকবে না, বরং কতটি গাছ এক বছর, তিন বছর ও পাঁচ বছর পরও বেঁচে আছে, কতটি পরিপক্ব হয়েছে, কোথায় বৃক্ষ আচ্ছাদন বেড়েছে, কোথায় গাছ নষ্ট হয়েছে এবং তা পুনরুদ্ধারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও থাকবে। জাতীয় পর্যায়েও বৃক্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, জিআইএস ও ডিজিটাল মানচিত্র ব্যবহার করে সার্বিক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা আজ আর মোটেই কঠিন নয়।

অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, যা পরিমাপ করা হয়, তা ব্যবস্থাপনা করা যায়; আর যা ব্যবস্থাপনা করা যায়, তা উন্নত করা সম্ভব। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য। যে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন সবচেয়ে ভালো করবে, তাদের জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। আবার যেখানে গাছের টিকে থাকার হার কম হবে, সেখানে কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

গাছ শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনৈতিক সম্পদ

গাছ শুধু পরিবেশ রক্ষার উপাদান নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পদ। বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশের জন্য আম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, সুপারি, পেয়ারাসহ ফলদ গাছ বহু বছর ধরে খাদ্য, পুষ্টি ও আয় নিশ্চিত করতে পারে। একটি ভালোভাবে পরিচর্যা করা পরিপক্ব ফলদ গাছ প্রতি বছর হাজার হাজার টাকা আয় দিতে পারে। কয়েকটি সুস্থ গাছই একটি পরিবারের জন্য সময়ের সঙ্গে কয়েক লাখ টাকার সম্পদে পরিণত হতে পারে।

গাছ শুধু ফল দেয় না; সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা অন্য যেকোনো জরুরি সময়ে একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার ভিত্তি হতে পারে। একইসঙ্গে ফলদ ও বনজ গাছ স্থানীয় অর্থনীতি, ক্ষুদ্র শিল্প, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যতের সবুজ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।

তাই ২৫ কোটি গাছের কর্মসূচি শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়, লাখো পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও দেশের দীর্ঘমেয়াদি সবুজ সম্পদ গড়ে তোলার জন্য জাতীয় বিনিয়োগ।

প্রতিটি গাছের জন্য প্রয়োজন অভিভাবক

প্রতিটি রোপিত গাছের একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক থাকা উচিত। এই অভিভাবক হতে পারেন একজন শিক্ষার্থী, একটি পরিবার, একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অথবা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। স্কুল ও কলেজে ‘আমার গাছ, আমার দায়িত্ব’ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু গাছ লাগানো নয়, গাছ বাঁচানোর দায়িত্বও নেয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশে আনুমানিক ৬ কোটির বেশি তরুণ গোষ্ঠী রয়েছে। প্রত্যেকে যদি মাত্র পাঁচটি গাছের দায়িত্ব নেয় এবং সেগুলো বাঁচিয়ে বড় করে, তাহলে প্রায় ৩০ কোটি গাছ নিরাপদ ভবিষ্যৎ পেতে পারে। প্রযুক্তিতে দক্ষ এই প্রজন্ম মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গাছের অবস্থান, ছবি ও পরিচর্যার তথ্য সংরক্ষণ করে একটি জাতীয় ডিজিটাল বৃক্ষ মানচিত্র তৈরিতেও নেতৃত্ব দিতে পারে।

কাজেই সরকার, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে ২৫ কোটি গাছের কর্মসূচি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ নাগরিকভিত্তিক সবুজ আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু কংক্রিট দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি সত্যিকার উন্নত দেশ সেটাই, যেখানে মানুষ বিশুদ্ধ বায়ু পায়, শহরগুলো বাসযোগ্য থাকে এবং প্রকৃতি উন্নয়নের অংশীদার হয়।

একটি গাছ মানে ভবিষ্যতের জন্য একটি উপহার। আজ বাংলাদেশের সামনেও সেই সুযোগ এসেছে। ২৫ কোটি গাছের উদ্যোগকে সফল করতে হলে এটিকে জাতীয় বৃক্ষ পরিচর্যা আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সরকার এখানে নীতি ও নেতৃত্ব দেবে, স্থানীয় সরকার জবাবদিহি নিশ্চিত করবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠন অংশীদার হবে, আর প্রতিটি পরিবার অন্তত একটি গাছের দায়িত্ব নেবে। তাহলেই শুরু হবে বাংলাদেশের প্রকৃত সবুজ বিপ্লব।

আর সেজন্যই আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হোক—একটি গাছ লাগাব, একটি গাছ বাঁচাব, একটি গাছ বড় করব।

ময়নুল হক: অস্ট্রেলীয় অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশেষজ্ঞ; মাল্টিকালচারাল অস্ট্রেলিয়ায় অবদানের জন্য মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া (ওএএম) প্রাপ্ত।

নাহিদ রানার ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে লন্ডভন্ড জিম্বাবুয়ে

নাহিদ রানার বিধ্বংসী বোলিং স্পেলে স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং লাইন-আপ ধসিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। ১০ ওভার বল করে মাত্র ২১ রান খরচায় ৬ উইকেট তুলে নিয়েছেন নাহিদ রানা। তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন তাসকিন আহমেদ। এই দুজনের বোলিং তোপে ৩৭ ওভারে মাত্র ১৪১ রানে গুটিয়ে গেছে জিম্বাবুয়ে।

উইকেটে পেসারদের জন্য সহায়ক হবে এমন আশা থেকে টস জিতে বোলিং নিয়েছিলেন টাইগার অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। অধিনায়কের সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করেছেন দুই পেসার নাহিদ ও তাসকিন। এই দুজন মিলেই নিয়েছেন জিম্বাবুয়ের ৮ উইকেট। 

অথচ ইনিংসের শুরুটা বেশ ইতিবাচকই করেছিল জিম্বাবুয়ে। ওভারপ্রতি প্রায় ৬ রান তুলে বিনা উইকেটে ৩৬ তুলে ফেলেছিল স্বাগতিকরা। তখনই রানআউটের ফাঁদে কাটা পড়েন ওপেনার বেন কারান। এরপর পরপর দুই ওভারে জোড়া ধাক্কা দেন তাসকিন, আরেক ওপেনার ব্রায়ান বেনেট ও জিম্বাবুয়ে ব্যাটিংয়ের বড় ভরসা ক্রেইগ আরভাইনকে ফিরিয়ে। 

ইনিংসের বাকি অংশটুকু শুধুই নাহিদ রানার। তার পেস যেন সামলাতেই পারেনি স্বাগতিকরা। ৪৫ থেকে ৭০- এই ২৫ রান তুলতেই আরও ৫টি উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। সবগুলোই নিজের পকেটে পুরেছেন নাহিদ রানা। জিম্বাবুয়ের মিডল অর্ডারের পাঁচ ব্যাটারের কেউই দুই অঙ্কের ঘরে রান তুলতে পারেননি। 

এরপর ছোটখাটো একটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন অধিনায়ক রিচার্ড এনগারাভা ও নিউম্যান নিয়ামহুরি। তাদের ৬৩ রানের জুটিও ভাঙে নাহিদের হাতেই। এনগারাভাকে ২৭ রানে ফিরিয়ে নিজের ষষ্ঠ শিকার তুলে নেন এই গতিতারকা। ইনিংসের শেষ উইকেটটি তুলেছেন অধিনায়ক মিরাজ। 

আজকের বোলিং পারফরম্যান্স ওয়ানডেতে নাহিদ রানার সেরা। ওয়ানডেতে এটি নাহিদ রানার তৃতীয়বার ইনিংসে পাঁচ উইকেট প্রাপ্তি। মাত্র ১৪ ম্যাচেই তিনবার পাঁচ উইকেট পাওয়ার পাশাপাশি একবার চার উইকেটও পেয়েছেন তিনি।

আর্থিক চাপ সামলাতে সম্পদ বিক্রির পথে সিটি গ্রুপ

ঋণের চাপ সামলাতে ও মূল ব্যবসা নজর দিতে কিছু সম্পদ বিক্রির কথা ভাবছে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ।

একই সঙ্গে মূলধনের ভিত্তি শক্তিশালী করতে এবং ঋণ নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা ভাবছে গ্রুপটি। এর মধ্যে আছে কৌশলগত দেশি ও বিদেশি অংশীদার এবং প্রাইভেট ইক্যুইটি বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ আনা। এ ছাড়া কিছু ব্যবসাকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করছে তারা।

কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো সিটি গ্রুপের এক চিঠিতে এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই চিঠির একটি অনুলিপি দেখার সুযোগ পেয়েছে দ্য ডেইলি স্টার।

সিটি গ্রুপের কর্মকর্তা এবং ঋণ দেওয়া ব্যাংকাররা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গ্রুপটি তাদের চা-বাগান, এলপিজি ব্যবসা, হোসেন্দী ইকোনমিক জোন (অর্থনৈতিক অঞ্চল) এবং একটি টেলিভিশন চ্যানেল বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছে।

এ বিষয়ে জানতে সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হাসানের সঙ্গে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে দ্য ডেইলি স্টার। তবে তার দিক থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লেখা চিঠিতে মো. হাসান নগদ অর্থের প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, অর্থের জোগান বাড়ানো এবং ঋণের পরিমাণ কমাতে তিন বছর মেয়াদি একটি সুনির্দিষ্ট পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এ জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সহায়তা চেয়েছেন।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এই পুনরুদ্ধার পদক্ষেপ এবং ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সহযোগিতায় আগামী তিন বছরের মধ্যে গ্রুপের আর্থিক অবস্থা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়বে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যাংকাররা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণ নিয়ে আগ্রাসীভাবে ব্যবসার সম্প্রসারণ করেছে সিটি গ্রুপ।

তাদের মতে, এই সম্প্রসারণের বড় অংশই ছিল সিমেন্ট, এলপিজি, চা, গণমাধ্যম এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে। একটি লাভজনক ব্যবসার মুনাফা অন্য দুর্বল ব্যবসায় খাটানো হয়েছে। এই চর্চার কারণেই আজ পুরো গ্রুপটি আর্থিক চাপে পড়েছে।

এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী ইকোনমিক জোন গ্রুপটির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।

ব্যাংকাররা জানান, ১০৮ একর জায়গার ওপর এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে গ্রুপটি প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। সরকারের গ্যাস পাওয়ার অনুমোদনের ভিত্তিতে সেখানে ছয়টি শিল্পকারখানাও স্থাপন করা হয়। কিন্তু এখনো গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় বিশাল বিনিয়োগের পরও কারখানাগুলো অলস পড়ে আছে। তাই সিটি গ্রুপ এখন এই প্রকল্প বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছে।

এ ছাড়া ২০১৫ সালে ব্র্যাকের কাছ থেকে প্রায় ১২০ কোটি টাকায় কেনা চট্টগ্রামের ব্র্যাক বাঁশখালী চা-বাগানটিও বিক্রির কথা ভাবছে শিল্পগোষ্ঠীটি।

সিটি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্পাইস টেলিভিশন লিমিটেডের অধীনে ২০২২ সালে চালু হওয়া ‘এখন টিভি’ নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। টেলিভিশন চ্যানেলটিতে নতুন বিনিয়োগ আনা বা এটি বিক্রি করে দেওয়ার সুযোগ খুঁজছে তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বিপুল ঋণের বোঝা এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বের অদক্ষতার কারণেই সিটি গ্রুপ আজ এমন আর্থিক সংকটে পড়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের ঋণ শোধ করার জন্য আমরা এখন ওই সব অ-প্রধান ব্যবসা বা সম্পদ বিক্রি করার জন্য চাপ দিচ্ছি।

১৯৭২ সালে ঢাকার গেন্ডারিয়ায় ‘সিটি অয়েল মিলস’ স্থাপনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর শিল্পগোষ্ঠীটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন সন্তানেরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর তথ্যমতে, ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিটি গ্রুপের বর্তমানে বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।

ঋণদাতাদের মধ্যে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, শীর্ষ দেশীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা থেকেও অর্থায়ন পেয়েছে গ্রুপটি।

দেশীয় বড় ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), ডাচ-বাংলা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়া।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সরকার ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো চালুর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এ জন্য একটি সহায়তা প্যাকেজও ঘোষণা করেছে।

তিনি বলেন, এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে যে, ব্যবস্থাপনা বা অন্য কোনো কারণে সাময়িক সংকটে পড়া একটি আর্থিকভাবে মজবুত শিল্পগোষ্ঠীকে বিদ্যমান নীতির আওতায় কীভাবে সহায়তা করা যেতে পারে।

আরিফ হোসেন খান বলেন, নানা কারণে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থনীতির স্বার্থেই ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে দুর্বল হয়ে পড়া একটি সম্ভাবনাময় কোম্পানিকে রক্ষা করা জরুরি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যা জানিয়েছে সিটি গ্রুপ

বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া চিঠিতে সিটি গ্রুপ তাদের আর্থিক ও পরিচালনগত সংকটের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন, ঋণ নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট এবং ঋণ পাওয়ার শর্ত কঠিন হওয়া।

গ্রুপটি জানিয়েছে, গত চার বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ৪২ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। এতে আমদানি খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং তাদের অনুমোদিত ঋণসুবিধার প্রকৃত মান কমে গেছে। এর ফলে তাদের আমদানি অর্থায়নের সক্ষমতা প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার কমেছে বলে তারা হিসাব করেছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হার ৪ থেকে ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। অন্যদিকে ২০২২ সাল থেকে মার্কিন ডলারে নেওয়া ঋণের খরচ প্রায় তিন গুণ হয়েছে। এতে নগদ অর্থের প্রবাহ ও পরিচালন মুনাফার ওপর বড় ধরনের চাপ পড়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস–সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে শিল্পগোষ্ঠীটি জানায়, বড় বিনিয়োগের পরও গ্যাস না থাকায় হোসেন্দী ইকোনমিক জোনের বেশ কয়েকটি কারখানা অলস পড়ে আছে বা উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম কাজ করছে।

চাপ সামলাতে সিটি গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুরোধ করেছে, যাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয় ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করার। পাশাপাশি চলতি মূলধনের জোগান অব্যাহত রাখারও অনুরোধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঋণ পুনর্গঠনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমর্থন চেয়েছে গ্রুপটি। একই সঙ্গে ২০২২ সালে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার সময় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান একটি স্কিমের আওতায় ব্যাংকগুলোকে মেয়াদি ঋণ দেওয়ারও অনুরোধ করেছে তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর গত ১৮ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে সিটি গ্রুপের সঙ্গে আলোচনায় বসেন এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা। সেখানে গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠনসহ কীভাবে তাদের কার্যক্রম চালু রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে ঋণদাতা ব্যাংকগুলো শীর্ষ ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। এই কমিটির কাজ হলো, সিটি গ্রুপের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করা এবং সম্ভাব্য সহায়তার বিষয়ে সুপারিশ করা।

কমিটিতে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইউসিবি, প্রাইম ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংকসহ আরও বেশ কয়েকটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা রয়েছেন।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, গ্রুপটিকে কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতেই তাদের অনুরোধে ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেন।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে গ্রুপটিকে সাহায্য করতে চাই। বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে তাদের কীভাবে সহায়তা করা যায়, তার সন্ধান করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ৫৩ বছরের ইতিহাসে সিটি গ্রুপ কখনো ঋণখেলাপি হয়নি, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সব সময়ই ভালো ছিল এবং তারা ঋণের অর্থ অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়নি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, শুধু অব্যবস্থাপনার কারণেই গ্রুপটি আজ এমন সংকটে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে গ্রুপটি বড় ধরনের সংকটে পড়লে পুরো ব্যাংকিং খাত এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আমরা মূল্যায়ন করব যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম মেনে তাদের কীভাবে সহায়তা করা যায়।’

মামলার ব্যবসা করছেন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা: রুমিন ফারহানা

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা মামলার ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার।

আজ শুক্রবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার ঘাগড়াজুড়ি গ্রামে একটি সড়ক নির্মাণকাজের অগ্রগতি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ অভিযোগ করেন।  

রুমিন ফারহানা বলেন, বিএনপি শ্যোন অ্যারেস্টের কালচার শুরু করেছে। একটা মামলা হয়েছে, জামিন নিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি মামলা দেওয়া হচ্ছে। এলাকায় এলাকায় বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা মামলার ব্যবসা করেছেন। এটা আমি সংসদেও বলেছি, সরকারকেও বলবো।

তিনি বলেন, আমাদের অত্যন্ত জ্ঞানী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও বলবো—বিষয়টি আপনি দেখবেন। মনে রাখবেন—নাথিং গোজ আননোটিসড অ্যান্ড আনপানিশড (কোনো কিছুই নজর এড়ায় না ও কোনো অপরাধই শাস্তি ছাড়া থাকে না)। আজ আপনি যা করছেন, তার জন্য একদিন আপনাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ফারহানা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা নিকট অতীতে ছিল না। অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা—এই দুই খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সরকারের পরিণতি সত্যিকার অর্থেই দুঃখজনক হবে।

রুমিন ফারহানা বলেন, নতুন অর্থবছরের বাজেট দেওয়া হয়েছে। এ বাজেটের বিশ্লেষণ করে আমি সংসদেও কথা বলেছি। এটা কতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় মনে হয়, সরকারের দুই মন্ত্রীর কাঁধে প্রায় ৫০ শতাংশ দায়িত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর বিষয়ে যতটা আগ্রহ, উৎসাহ ও তৎপরতা দেখান, নিজের মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে যদি সেই একই তৎপরতা দেখাতেন, তাহলে দেশবাসী উপকৃত হতো’, বলেন তিনি।

ইরফান খান: বলিউডের পর্দা থেকে হলিউড জয়

২০২০ সালের ২৯ এপ্রিল, বিশ্ব তখন করোনা মহামারিতে ভুগছে। সেই ভয়ংকর সময়ে নিভে যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি হলেন ইরফান খান। তার মৃত্যুতে কেবল বলিউডের নয়, বিশ্ব সিনেমায় এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।

ইরফান খানের যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। ছোট পর্দা পেরিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন হলিউডের বিশাল মঞ্চেও। প্রতিভা, অধ্যবসায় ও চরিত্র বেছে নেওয়ার তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিলেন। সেই গল্প উঠে এসেছে অসীম ছাবরার লেখায়।

২০০৭ সালের কথা। মাইকেল উইন্টারবটম পরিচালিত ‘আ মাইটি হার্ট’ সিনেমার প্রচারণায় ইরফান তখন নিউইয়র্কে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি ড্যানিয়েল পার্লের অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে নির্মিত হয়েছিল এই সিনেমা।

সিনেমার অভিনয়শিল্পীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছিল। অ্যাঞ্জেলিনা জোলিসহ অন্য সহশিল্পীদের সঙ্গে ইরফানও সেখানে ছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারের ভিড়ের মধ্যেই অসীম ছাবরাকে একপাশে ডেকে নেন ইরফান।

হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করলেন অভিনেতা। তিনি জানতে চাইলেন, সেখানে বিশেষ কিছু হচ্ছে কি না, মানুষ তাকে চিনতে পারছে কি না কিংবা পশ্চিমে তার আরও কাজ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না।

‘আ মাইটি হার্ট’ ছিল ইরফানের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কাজ। তার প্রথম আন্তর্জাতিক সিনেমা মীরা নায়ারের ‘দ্য নেমসেক’ (২০০৬)। হলিউড স্টুডিওর অর্থায়নে নির্মিত ভারতীয়-আমেরিকান অভিবাসীদের জীবনধর্মী এই সিনেমাটি তখনো নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরের সিনেমা হলে চলছিল।

অসীম ইরফানকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই বড় কিছু হচ্ছে।’ কারণ বলিউডের আর কোনো অভিনেতার কথা তার জানা ছিল না, যার দুটি ছবি একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হচ্ছিল।

সে বছরের শেষের দিকে ইরফান আবারও আন্তর্জাতিক পর্দায় ফেরেন। ওয়েস অ্যান্ডারসনের ‘দ্য দার্জিলিং লিমিটেড’ সিনেমায় ছোট একটি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন।

মঞ্চ অভিনয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল ভারতের স্বনামধন্য ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনএসডি), অথচ অভিনেতা হিসেবে ইরফানের শুরুর পথচলাটা ছিল টেলিভিশনে টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প।

তার জীবনের প্রথম বড় সাফল্য আসে ২০০১ সালে, ব্রিটিশ-ভারতীয় নির্মাতা আসিফ কাপাডিয়ার ‘দ্য ওয়ারিয়র’ সিনেমার মাধ্যমে। বাফটাজয়ী এই সিনেমা যখন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল, তখন এর সঙ্গে ছিল প্রয়াত নির্মাতা অ্যান্থনি মিনহেলার বিশেষ প্রশংসাপত্র।

২০০৭ সালের মধ্যেই ইরফান বলিউডের একজন প্রতিষ্ঠিত তারকা হয়ে ওঠেন। ভারতের বাইরে কাজ করার খুব একটা বৈষয়িক প্রয়োজন ছিল না তার। তবে একজন প্রকৃত অভিনেতা হিসেবে সব সময় নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে চাইতেন।

পরের বছরই তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সাফল্যটি আসে ড্যানি বয়েলের ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ সিনেমার মাধ্যমে। সিনেমাটি ফ্রিদা পিন্টো ও দেব প্যাটেলকে রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেলেও এটি পর্দার আড়ালে ইরফানের জন্যও বৈশ্বিক মঞ্চের পথ প্রশস্ত করেছিল।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রে পেশাদার এজেন্ট ও ম্যানেজার নিয়োগের মাধ্যমে শুরু হয় তার নতুন যাত্রা। পরে আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নাম লেখান হলিউডের বড় বাজেটের সব সিনেমায়।

২০১২ সালের ‘দ্য অ্যামেজিং স্পাইডার-ম্যান’ সিনেমায় ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করলেও ২০১৬ সালের ‘ইনফার্নো’ এবং ২০১৫ সালের ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’ সিনেমার মতো বড় প্রজেক্টের সব সিনেমায় তিনি কাজ করেন।

‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’ সিনেমার প্রচারণায় ইরফান সংবাদমাধ্যমকে একটি গল্প শুনিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে যখন প্রথম ‘জুরাসিক পার্ক’ মুক্তি পায়, তখন তিনি মুম্বাইয়ে (তৎকালীন বম্বে) টেলিভিশন অভিনেতা হিসেবে টিকে থাকার লড়াই করছেন। সে সময় সিনেমাটি দেখতে একটি টিকিট কেনার সামর্থ্যও তার ছিল না।

ঠিক ২২ বছর পর তিনি সেই ফ্র্যাঞ্চাইজিরই একটি সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন, যা বিশ্বজুড়ে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। রাতারাতি তিনি হয়ে ওঠেন হলিউডের পর্দায় ভারতের সফলতম অভিনেতা।

২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘লাইফ অব পাই’ সিনেমার মতো বড় সব আন্তর্জাতিক প্রজেক্টের সুযোগ এলেও ইরফানকে প্রায়ই কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হতো। পশ্চিমের বড় প্রজেক্টে কাজ করবেন, নাকি দেশের মাটিতে ছোট কিন্তু শৈল্পিক কাজগুলোতে মনোনিবেশ করবেন, এমন দোটানায় প্রায়ই পড়তে হতো তাকে।

এমন পরিস্থিতিতে তাকে বেশ কয়েকবার পড়তে হয়েছে।

২০১৫ সালে তিনি রিডলি স্কটের ‘দ্য মার্শিয়ান’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তার বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন দিল্লি ও কলকাতা প্রেক্ষাপটে নির্মিত এক চমৎকার প্রেমের গল্প ‘পিকু’।

ইরফানের জীবনী নিয়ে কাজ করার সময় ‘পিকু’র পরিচালক সুজিত সরকার অসীম ছাবরাকে বলেছিলেন, তিনি কী করবেন তা নিয়ে বেশ দোটানায় ছিলেন, বারবার তাকেই জিজ্ঞেস করছিলেন।

এর আগে ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া রিডলি স্কটের ‘বডি অব লাইজ’ সিনেমাতেও অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ইরফান। তবে তার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ছিল ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’ (২০১৪) হাতছাড়া হওয়া নিয়ে। কারণ একই সময়ে ভারতে তার অভিনীত ‘দ্য লাঞ্চবক্স’ সিনেমার শুটিং চলছিল।

বিশেষ করে ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ এর পর ইরফান যে উচ্চতার তারকা হয়ে উঠেছিলেন, এটি তারই প্রমাণ। তিনি অনায়াসেই হলিউডের ‘এ-লিস্ট’ বা শীর্ষ সারির সিনেমাগুলোর পথে হাঁটতে পারতেন।

কিন্তু ২০১৮ সালে অভিনয় করেন তার প্রথম আমেরিকান স্বতন্ত্র ঘরানার ‘পাজল’ সিনেমায়। মিষ্টি গল্পের এই সিনেমায় কেলি ম্যাকডোনাল্ডের বিপরীতে তিনি খামখেয়ালি ধনী ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করেন।

৫৩ বছর বয়সী ইরফানের সামনে বিশ্ব চলচ্চিত্রের দুয়ার যখন সবে পুরোপুরি খুলতে শুরু করেছে, তখনই এলো সেই দুঃসংবাদ। ২০১৮ সালে তিনি জানান, তিনি ‘নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমার’ এ আক্রান্ত। পরে চিকিৎসার জন্য দ্রুতই লন্ডনে পাড়ি জমান।

ক্যানসারের সঙ্গে দুই বছরের লড়াই ও চিকিৎসার মাঝেই নিজের শেষ হিন্দি সিনেমা ‘আংরেজি মিডিয়াম’ এর কাজ শেষ করতে পেরেছিলেন। এই সিনেমা ২০২০ সালের ১৩ মার্চ মুক্তি পেয়েছিল।

ইরফান কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিল্পসত্ত্বা। ছোট পর্দা থেকে শুরু করে বলিউড, তারপর হলিউড, প্রতিটি ধাপে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করে গেছেন। বড় বাজেটের ঝলকানির চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল গল্প, চরিত্র ও অভিনয়। তাই তার সাফল্য কেবল বক্সঅফিসে সীমাবদ্ধ ছিল না, ছুঁয়ে গেছে দর্শকের হৃদয়ও।

খামেনিকে হত্যার গোয়েন্দা তৎপরতা চলছিল যেভাবে

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার আগে তেহরানের ট্রাফিক ক্যামেরা থেকে শুরু করে গাড়ি পার্কিং, মোবাইল টাওয়ার, দেহরক্ষীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণসহ নিরাপত্তা বলয় ঘিরে বছরের পর বছর গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়েছে ইসরায়েল।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার যেখানে ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন, তেহরানের ওই পাস্তুর স্ট্রিট এলাকায় শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের দেহরক্ষী ও চালকদের গতিবিধি দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাতে ফিনান্সিয়াল টাইমস জানায়, তেহরানের প্রায় সব ট্রাফিক ক্যামেরা বহু বছর আগে থেকে হ্যাক করা। এসব ক্যামেরার ভিডিও এনক্রিপ্ট করে ইসরায়েলের সার্ভারে পাঠানো হতো।

এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ক্যামেরা থেকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি কোথায় পার্ক করা হয় এবং নিরাপত্তা বলয়ের প্রতিদিনের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেন গোয়েন্দারা।

‘প্যাটার্ন অব লাইফ’ তৈরি

উন্নত ও জটিল অ্যালগরিদম ব্যবহার করে দেহরক্ষীদের ঠিকানা, দায়িত্ব পালনের সময়সূচি, যাতায়াতের পথ এবং তারা কাকে নিরাপত্তা দেন—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্যাটার্ন অব লাইফ’ বা ‘জীবনযাত্রার মানচিত্র’ তৈরি করে।

রিয়েল-টাইম নজরদারির এই তথ্যই খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের পথ তৈরি করে।
পাশাপাশি তেহরান পাস্তুর স্ট্রিট এলাকায় প্রায় এক ডজন মোবাইল ফোন টাওয়ারের নিয়ন্ত্রণও নেয় ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। যার ফলে কল করতে গিয়ে বারবার ফোনগুলো ব্যস্ত পাচ্ছিলেন নিরাপত্তা সদস্যরা। আর এ কারণেই হামলার আগে খামেনির নিরাপত্তা বলয়কে সতর্কবার্তা পাঠাতে পারেননি ইরানের গোয়েন্দারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা এফটিকে বলেন, ‘আমরা তেহরানকে এমনভাবে চিনতাম, যেমন নিজের শহরকে চিনি। এ কারণে সেখানে সামান্য অসামঞ্জস্যও চোখে পড়ত।’
তবে শুধু রিয়েল-টাইম তথ্যের মাধ্যমে নয় ইসরায়েল ও সিআইএ সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পেরেছিল যে, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি ঠিক কখন তার অফিসে থাকবেন এবং কারা তার সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেবেন।

বিপুল গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়

ইসরায়েলের এই অত্যাধুনিক গোয়েন্দা চিত্রটি ছিল শ্রমসাধ্য তথ্য সংগ্রহের ফল। এর পেছনে ছিল সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-৮২০০, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নিয়োগ করা দল ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিদিনের বিশ্লেষণ। 

ইসরায়েল ‘সোশ্যাল নেটওয়ার্ক অ্যানালাইসিস’ নামে একটি গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে শত শত কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। 

এর মাধ্যমে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নজরদারির জন্য নতুন লক্ষ্যবস্তু ঠিক করত। 

এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি কারখানার মতো কাজ করত, যারা ‘টার্গেট’ বা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করত।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও ২৫ বছর গোয়েন্দা বাহিনীতে কাজে অভিজ্ঞ ইতাই শাপিরা বলেন, ‘ইসরায়েলি গোয়েন্দার কাররযক্রমে লক্ষ্য নির্ধারণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়।’
যদি নীতিনির্ধারকরা কাউকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন, তবে গোয়েন্দা বিভাগের কাজ হলো তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করা।

হামলা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে খামেনি তার কার্যালয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন—এ তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 
যুদ্ধ শুরু হলে ইরানি নেতৃত্ব দ্রুত বাঙ্কারে আশ্রয় নিলে তাদের হত্যা করা কঠিন হয়ে যেত।

সূত্রের বরাতে এফটি জানায়, ওই সময় খামেনি তার দুটি নিরাপদ বাঙ্কারের একটিতেও ছিলেন না। বাঙ্কারে থাকলে বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করা সম্ভব হতো না।

এরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অনুমোদন দেন। 

তবে চূড়ান্ত হামলা শুরুর আগ মুহুর্তে সাইবার হামলার মাধ্যমে ইরানের যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া হয়। এ কারণে সহজে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘স্প্যারো’ নামে বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েল, যা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে এক হাজার কিলোমিটার দূরের একটি ডাইনিং টেবিলের মতো লক্ষ্যবস্তুতেও নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।

খামেনির কমপ্লেক্সে ইসরায়েল নির্ভুলভাবে প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দুই দশকের প্রস্তুতি

সাবেক মোসাদ কর্মকর্তা সিমা শাইনের মতে, এই অভিযান দুই দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা কৌশলের ফল। ২০০১ সালে তৎকালীন ইসারায়েলি প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন প্রথম ইরানকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য মোসাদকে নির্দেশ দেন। সেই থেকে ইরানই ছিল প্রধান লক্ষ্যবস্তু।

এর পর থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নস্যাৎ করা, বিজ্ঞানী হত্যা ও আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল করার ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো হয়।

গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানী ও ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করাও তারই ধারাবাহিক সাফল্যের অংশ। 

৬ জনের বেশি বর্তমান ও সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এফটি জানায়, খামেনিকে হত্যার বিষয়টি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়। 

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন ছিল—যুদ্ধ পূর্ণমাত্রায় শুরু হলে খামেনিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। কিংবা আত্মগোপনে না থেকে জনসমক্ষে শহীদ হওয়ার চিন্তা ছিল খামেনির।

সাবেক মোসাদ কর্মকর্তা সিমা শাইন এফটিকে একটি হিব্রু প্রবাদ বলেন, ‘খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুধাও বাড়তে থাকে।’

এর অর্থ হলো ইসরায়েল এখন একের পর এক লক্ষ্য পূরণ করতে আরও মরিয়া।

সভাপতির পদ স্থগিতের পর এবার গ্রেপ্তার জাহিদুল

বেড়িবাঁধের ২২টি মেহগনি গাছ কেটে ফেলার অভিযোগে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপি নেতা জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার  করেছে পুলিশ।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার তার মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ স্থগিত করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি

আজ বুধবার সন্ধ্যায় জেলা শহরে ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। 

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

পুলিশ সুপার বলেন, ‘মিঠামইন উপজেলা সদরের কামালপুর বেড়িবাঁধের গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। এই মামলায় জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার জাহিদুলের দলীয় পদ স্থগিত করে বিএনপি। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবিরের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। 

গতকাল মিঠামইন উপজেলা প্রকৌশলী ফয়জুর রাজ্জাক বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় বেড়িবাঁধের গাছ চুরির অভিযোগ এনে মামলা করেন। 

মামলায় আঙ্গুর মিয়া নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২-৩ জনকে আসামি করা হয়। 

ফোন চুরি হলে বা হারালে প্রথম ৩০ মিনিটে যা করা জরুরি

মোবাইল ফোন এখন আর শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ব্যক্তিগত ছবি, অফিসের নথিসহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই এখন একটি ফোনের ভেতরে থাকে।

তাই ফোন চুরি বা হারিয়ে গেলে প্রথম চিন্তা শুধু নতুন ফোন কেনার খরচ হওয়া উচিত নয়। বরং সবচেয়ে জরুরি হলো, ফোনের ভেতরে থাকা তথ্য ও আর্থিক অ্যাকাউন্টগুলো কত দ্রুত সুরক্ষিত করা যায়।

এ ক্ষেত্রে প্রথম ৩০ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

প্রথমেই অন্য কারও ফোন থেকে নিজের নম্বরে কল দিন।

ফোনটি হয়তো চুরি হয়নি, কাছাকাছি কোথাও পড়ে গেছে। কোনো সৎ ব্যক্তি পেয়ে থাকলে ফোন ধরতে পারেন।

কিন্তু ফোনটি কোথায় আছে নিশ্চিত না হয়ে একা সেখানে ছুটে যাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে অবস্থান যদি অপরিচিত বা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা দেখায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।

এরপর যত দ্রুত সম্ভব ফোনের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করুন।

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে গুগলের ‘ফাইন্ড হাব’ ব্যবহার করে হারানো ফোন খোঁজা, লক করা এবং প্রয়োজনে দূর থেকে ডেটা মুছে ফেলা যায়।

অন্য ফোন বা কম্পিউটার থেকে নিজের গুগল অ্যাকাউন্টে সাইন ইন করে ফাইন্ড হাবে গেলে ফোনটির বর্তমান অথবা সাম্প্রতিক অবস্থান দেখা যেতে পারে।

সেখান থেকে ফোনে শব্দ বাজানো এবং ‘মার্ক অ্যাজ লস্ট’ (হারিয়ে গেছে বলে চিহ্নিত করা) ব্যবহার করে ডিভাইসটি লক করার সুযোগ আছে। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, ফাইন্ড হাব চালু থাকলে ফোনের সাম্প্রতিক এনক্রিপ্টেড অবস্থানও কাজে লাগতে পারে, এবং সমর্থিত ডিভাইস অফলাইনে থাকলেও ফাইন্ড হাব নেটওয়ার্ক সেটি খুঁজতে সহায়তা করতে পারে।

ফোনে আগে থেকেই পিন, প্যাটার্ন বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা থাকলে নিরাপত্তা আরও বাড়ে।

আইফোন হারিয়ে গেলে অন্য ডিভাইস থেকে আইক্লাউডের ‘ফাইন্ড ডিভাইসেস’ ব্যবহার করে সেটিকে ‘মার্ক অ্যাজ লস্ট’ করা যায়।

লস্ট মোড চালু করলে ফোনটি পাসকোড দিয়ে লক হয়ে যায়। ফলে অন্য কেউ ফোন হাতে পেলেও সহজে সেটিতে প্রবেশ করতে পারে না।

অ্যাপলের তথ্যমতে, আইক্লাউডের ফাইন্ড ডিভাইসেসে প্রবেশ করতে হারানো ফোনে পাঠানো যাচাইকরণ কোড-ও প্রয়োজন হয় না। ফলে বিশ্বস্ত আইফোনটিই চুরি হলেও দ্রুত লস্ট মোড চালু করার সুযোগ থাকে।

আইফোনে ‘স্টোলেন ডিভাইস প্রোটেকশন’ আগে থেকে চালু থাকলে নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়। এই সুবিধা চালু থাকলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ফেস আইডি বা টাচ আইডি প্রয়োজন হতে পারে।

ফোন চুরির পর সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হলো সিম কার্ড সাময়িকভাবে ব্লক করা।

কারণ আপনার নম্বরে আসতে পারে ওটিপি, ব্যাংকের যাচাইকরণ কোড, পাসওয়ার্ড রিসেট কোড, বিভিন্ন অ্যাপের লগইন কোড এবং গুরুত্বপূর্ণ খুদে বার্তা।

চোর ফোন আনলক করতে না পারলেও যদি কোনোভাবে সিম অন্য ফোনে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে আপনার নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট দখলের চেষ্টা করতে পারে।

তাই অন্য নম্বর থেকে নিজের মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করে সিম ব্লক করার ব্যবস্থা নিন। পরে পরিচয় যাচাই করে একই নম্বরের নতুন সিম নেওয়া যাবে।

ফোনে বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা কোনো ব্যাংকের অ্যাপ থাকলে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

বিশেষ করে ফোনটি যদি আনলক অবস্থায় চুরি হয়, অথবা চোর আপনার পিন বা স্ক্রিন লক জানে—তাহলে সময় নষ্ট করা বিপজ্জনক।

নিজ নিজ ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নিজস্ব হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে প্রয়োজন হলে অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ব্লক বা সুরক্ষিত করুন।

একই সঙ্গে সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোও পরীক্ষা করুন। সন্দেহজনক কোনো লেনদেন দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে জানান।

স্মার্টফোনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলোর একটি হলো গুগল অ্যাকাউন্ট বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট।

কারণ এই একটি অ্যাকাউন্ট থেকেই অনেক সময় ইমেইল, ছবি, ফোন নম্বরের তালিকা, ক্লাউড ব্যাকআপ এবং অন্য অনেক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড রিসেট করা সম্ভব।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে।

ফোনটি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চললে সঙ্গে সঙ্গে মূল গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট থেকে ডিভাইসটি সরিয়ে ফেলবেন না।

বিশেষ করে আইফোনের ক্ষেত্রে অ্যাপল সরাসরি সতর্ক করেছে, ‘ফাইন্ড মাই’ থেকে চুরি হওয়া ডিভাইস সরিয়ে দিলে ‘অ্যাক্টিভেশন লক’ উঠে যেতে পারে, এতে চোরের জন্য ফোনটি পুনরায় ব্যবহার বা বিক্রি করা সহজ হয়ে যেতে পারে।

বরং প্রথমে লস্ট মোড বা মার্ক অ্যাজ লস্ট চালু করুন।

এরপর অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা সেটিংস পরীক্ষা করুন। অচেনা লগইন বা পরিবর্তন দেখতে পেলে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন এবং অন্য অচেনা ডিভাইসের সেশন বন্ধ করুন।

ফোনের মধ্যে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, জিমেইল কিংবা অফিসের স্ল্যাক বা টিমস অ্যাকাউন্ট লগইন করা থাকতে পারে।

অন্য ডিভাইস থেকে এসব অ্যাকাউন্টে ঢুকে সক্রিয় সেশন পরীক্ষা করুন।

সন্দেহ থাকলে চুরি হওয়া ডিভাইস থেকে সেশন লগআউট করুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।

ইমেইল অ্যাকাউন্টকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। কারণ অধিকাংশ অনলাইন অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড রিসেট লিংক ইমেইলেই আসে।

অর্থাৎ চোর ইমেইলে প্রবেশ করতে পারলে একে একে অন্যান্য অ্যাকাউন্টেও প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে।

প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি স্বতন্ত্র আইএমইআই নম্বর থাকে। দুই সিমের ফোনে সাধারণত দুটি আইএমইআই থাকতে পারে।

আইএমইআই পাওয়া যেতে পারে ফোনের বাক্সে, ক্রয়ের রসিদে, গুগল ফাইন্ড হাবে অথবা আগে সংরক্ষণ করে রাখা তথ্য থেকে।

গুগলের ফাইন্ড হাব থেকেও হারানো অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের আইএমইআই দেখা যায়।

নিকটস্থ থানায় অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করার সময় আইএমইআই, ফোনের মডেল, রং, মোবাইল নম্বর এবং ঘটনার সময়-স্থান সঙ্গে রাখা ভালো।

অ্যান্ড্রয়েড এবং আইফোন—দুটিতেই দূর থেকে ফোনের ডেটা মুছে ফেলার ব্যবস্থা আছে।

কিন্তু এটি প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত নয়।

প্রথমে ফোন খুঁজে বের করা ও লক করার চেষ্টা করুন। ফোন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম এবং ভেতরের তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হলে দূর থেকে মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা যেতে পারে।

অ্যান্ড্রয়েডের ক্ষেত্রে গুগল সতর্ক করেছে, দূর থেকে মুছে ফেলার পর ডিভাইসটির অবস্থান আর ফাইন্ড হাবে পাওয়া যাবে না।

আইফোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। অ্যাপল জানিয়েছে, আইওএস ১৫ বা পরবর্তী সংস্করণের সমর্থিত ডিভাইস মুছে ফেলার পরও ফাইন্ড মাই দিয়ে অবস্থান শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে ডিভাইসটি ফাইন্ড মাই থেকে সরিয়ে ফেলা উচিত নয়, কারণ তাতে অ্যাক্টিভেশন লক বন্ধ হয়ে যায়।

তাই ‘মুছে ফেলা’ এবং ‘অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে ফেলা’—দুটি এক জিনিস নয়।

ফোন আনলক অবস্থায় চুরি হলে ঝুঁকি অনেক বেশি

চুরির সময় ফোনটি যদি লক করা থাকে এবং শক্তিশালী পিন বা বায়োমেট্রিক সুরক্ষা থাকে, তাহলে কিছুটা সময় পাওয়া যায়।

কিন্তু ফোনটি যদি ব্যবহার করার সময় হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আলাদা।

চোর তখন সরাসরি খুদে বার্তা পড়তে, ইমেইল খুলতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে এবং কিছু আর্থিক অ্যাপে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় সিম, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করার কাজগুলো আরও দ্রুত করতে হবে।

চোরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে নতুন প্রতারণার শিকার হবেন না

ফোন চুরির কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর আরেক ধরনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

কেউ ফোন করে বলতে পারে, ‘আপনার ফোনটি পেয়েছি।’ তারপর ওটিপি, অ্যাপল আইডির পাসওয়ার্ড, গুগলের পাসওয়ার্ড কিংবা কোনো যাচাইকরণ কোড চাইতে পারে।

কখনো আবার খুদে বার্তা বা ইমেইলে ভুয়া ফাইন্ড মাই বা গুগল লগইন পাতার লিংক পাঠানো হয়। সেখানে লগইন করলে আপনার আসল পাসওয়ার্ড প্রতারকের কাছে চলে যেতে পারে।

তাই ফোন ফিরে পাওয়ার নাম করে কেউ ওটিপি, পিন বা পাসওয়ার্ড চাইলে কখনোই দেবেন না।

ফোন চুরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি রাখা বেশি কার্যকর।

প্রথমত, ফোনে শক্তিশালী পিন বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। শুধু সহজ প্যাটার্ন বা ১২৩৪ ধরনের পিন এড়িয়ে চলুন।

দ্বিতীয়ত, অ্যান্ড্রয়েডে ফাইন্ড হাব এবং আইফোনে ফাইন্ড মাই চালু রাখুন। গুগল নিজেও হারানোর আগেই অবস্থান ও ফাইন্ড হাব সক্রিয় আছে কি না পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়।

তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (দুই স্তরের যাচাইকরণ) চালু করুন এবং ব্যাকআপ কোড নিরাপদ জায়গায় রাখুন।

চতুর্থত, ফোনের আইএমইআই নম্বর আলাদা জায়গায় লিখে রাখুন।

পঞ্চমত, গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও নথির নিয়মিত ক্লাউড ব্যাকআপ রাখুন। তাহলে নিরাপত্তার স্বার্থে ফোন দূর থেকে মুছে ফেলতে হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারানোর ভয় কম থাকবে।

একটি স্মার্টফোন হারানোর ক্ষতি হয়তো কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু ফোনে থাকা ইমেইল, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত ছবি, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ও অফিসের নথি অন্য কারও হাতে গেলে ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়েও অনেক বড় হতে পারে।

তাই ফোন চুরির পর প্রথম কাজ নতুন ফোনের দাম নিয়ে চিন্তা করা নয়।

প্রথম কাজ হলো, চুরি হওয়া ফোনটিকে দ্রুত ডিজিটাল জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

কারণ আজকের দিনে চোর শুধু আপনার ফোনটি হাতে পায় না, সুযোগ পেলে আপনার পুরো ডিজিটাল পরিচয়ের দরজাটিও তার হাতে চলে যেতে পারে।

নিরাপত্তা নাকি নিয়ন্ত্রণ: নারী আবাসিক হলের রাজনীতি

‘আমার বাড়ি খাগড়াছড়িতে। যখনই আমি ঢাকায় ফিরি, বাস আমাকে ভোর ৪টার দিকে নামিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের হলের গেট খোলে সকাল ৬টায়। এই দুই ঘণ্টা আমি কোথায় থাকব? আমি কী করব? যদি নিরাপত্তার নামে হলের গেট রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়, তাহলে কি এই মধ্যবর্তী সময়ে ছাত্রীদের কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি থাকে না? এ কারণেই আমরা দাবি করছি, হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাহী সদস্য হেমা চাকমার এই কথাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়টির নারী নিরাপত্তা নীতির স্ববিরোধিতা প্রকাশ করে। যদি রাত ১০টার পর ক্যাম্পাস সত্যিই ছাত্রীদের জন্য অনিরাপদ হয়, তাহলে ভোর ৪টায় বাস থেকে নেমে হলগেট খোলার অপেক্ষায় থাকা একজন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? যদি সেই সময়ে কোনো বাস্তব নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে হল তালাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্য আসলে কী? এই নীতি কি সত্যিই নারীদের নিরাপত্তার জন্য, নাকি এর ভিত্তি এই ধারণায় যে, নারীদের নিজেদের ভালোর জন্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে?

এই ধরনের অভিজ্ঞতা কেবল হেমার একার না। বেগম রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী অদিতি রায়ও নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেছেন, ‘গত শীতে আমরা একটি শিক্ষাসফর থেকে ফিরছিলাম। আমাদের বাস ক্যাম্পাসে পৌঁছায় রাত সাড়ে ৩টার দিকে। হলের গেট মাত্র কিছুক্ষণের জন্য খোলা হয়েছিল, তারপর আবার বন্ধ হয়ে যায়। আমি অসুস্থ থাকায় সময়মতো বাস থেকে নামতে পারিনি। আমি ও আরেকজন মেয়ে সকাল ৬টা পর্যন্ত হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বাইরে অপেক্ষা করতে বাধ্য হই।’

আরেকজন শিক্ষার্থী বর্ণনা করেন, কীভাবে তার এক বান্ধবী শিক্ষাসফর থেকে ফিরে অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারানোর পরও তার স্থানীয় অভিভাবক উপস্থিত না থাকায় প্রাথমিকভাবে তাকে হলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি তাকে সিট বাতিলের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনা প্রশাসনের বৈপরীত্য সামনে আনে। নিরাপত্তার নামে তৈরি নীতিগুলো প্রায়ই ছাত্রীদের আরও বেশি অনিরাপত্তার মুখে ঠেলে দেয়। তাদের রক্ষা করার বদলে এসব নীতি কার্যত তাদের একটি কারাগারে আটকে ফেলে।

২০২৬ সালেও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা মূলত সহিংসতার উৎপত্তিস্থলের মুখোমুখি হওয়ার বদলে নারীর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ এবং জনপরিসরে মোরাল পুলিশিং করার চারপাশেই ঘুরপাক খায়।

এই স্ববিরোধিতা সম্প্রতি ডাকসুর একটি উদ্যোগে আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত টিএসসিতে ‘ফিমেল জোন’ নামে পর্দাঘেরা একটি বসার জায়গা চালু করা হয়েছে। প্রথম দেখায় এটি পর্দাশীল নারীদের জন্য একটি ব্যবস্থা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতীকের দিক থেকে চিন্তা করলে, এটি জনপরিসরে নারীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের এক পুরোনো ঐতিহ্যকেই আরও এগিয়ে নেয়। যে ঐতিহ্য ইতোমধ্যে হলের কারফিউ ও নারীর চলাফেরার ওপর নানা বিধিনিষেধে প্রতিফলিত।

এই উদ্যোগের সমালোচনা মানে এই নয় যে, যেসব ছাত্রী পর্দার আড়ালে বসতে চান তাদের সেই অধিকার অস্বীকার করা। ধর্মীয়, ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক কারণে যারা এই ব্যবস্থা বেছে নিতে চান, তাদের সেই স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে থাকা উচিত। সমস্যা তখনই দেখা দেয়, যখন একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক চর্চা সমগ্র নারীত্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, আর অন্যদিকে হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবি ‘স্লাটশেমিং’য়ের মুখোমুখি হয়।

এ কারণেই ‘ফিমেল জোন’ নামকরণটি বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। ডাকসু একে ‘পর্দা জোন’ বলে ডাকেনি। তারা একে আখ্যা দিচ্ছে ‘ফিমেল জোন’। এই জায়গার প্রতীক হিসেবে যে কার্টুন বেছে নেওয়া হয়েছে, সেটিও হিজাব পরা এক নারীর প্রতীক। এভাবে একটি নির্দিষ্ট নারীত্বের রূপকে অন্তর্নিহিতভাবে ‘নারী’র প্রতিনিধিত্বকারী চিত্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলো।

কিন্তু নারীত্ব সংজ্ঞায়িত করছে কে? ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছিলেন, মানুষ নারী হয়ে জন্মায় না, নারী হয়ে ওঠে। নারীত্ব কোনো স্থির জৈবিক সত্ত্বা না। এটি সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত নির্মিত হওয়া একটি সামাজিক পরিচয়। যখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একটি দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক চিহ্নকে সব নারীর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে, তখন তা অজান্তেই নারীত্বের একটি নির্দিষ্ট রূপকে সবার সামনে সর্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নারীদের কল্পনা করার পদ্ধতিকেই আকার দেয়। ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস, পোশাক-রীতি, রাজনৈতিক অবস্থান ও জনজীবনে বিচরণের ভিন্ন ভিন্ন উপায় নিয়ে বৈচিত্র্যময় ব্যক্তি হিসেবে নারীদের উপস্থিতি ক্রমে সংকুচিত হয়ে যায়। তারা একটি একক, পূর্বনির্ধারিত সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। নারীত্বের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ নারী কেমন হবে তার একটিমাত্র চিত্রের আড়ালে হারিয়ে যায়।

সামাজিক মনোবিজ্ঞান এই প্রক্রিয়া বোঝার জন্য একটি কার্যকর ধারণা দেয় ‘ডিপারসোনালাইজেশন’। সেখানে বর্ণনা করা হয়, কীভাবে ব্যক্তিরা ধীরে ধীরে সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত ‘স্বাভাবিক’ বা ‘উপযুক্ত’ বৈশিষ্ট্যগুলো নিজেদের গোষ্ঠীর জন্য আত্মস্থ করে নেয়। এই প্রত্যাশাগুলো যত স্বাভাবিক বলে গৃহীত হয়, সমষ্টির স্বাধীনতা সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা ততই সংকুচিত হতে থাকে। প্রচলিত রীতির বাইরের জীবনযাপনের ধরণগুলো আর সমান বৈধ বলে মনে হয় না। সেগুলো অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক, এমনকি বাড়াবাড়ি বলে প্রতীয়মান হতে থাকে। এই যুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়েও বিস্তৃত। অনেক নারী পোশাক শ্রমিকের জন্য বোরকা কিংবা গায়ে জড়ানো বিশাল ওড়না এক ধরনের ‘সেফটি কিট’ হিসেবে কাজ করে, যা তাদের পিতৃতান্ত্রিক নিয়মকানুনকে খুব একটা চ্যালেঞ্জ না করেই উপার্জনের পথে চলতে দেয়। সমস্যা তখন হয়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো এটিকে নারীত্বের আদর্শ চিত্র হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সমাজের প্রতিফলন হিসেবে এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না। এটি সামাজিক নিয়মকানুন গঠনকারী একটি প্রতিষ্ঠানও বটে। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন কার্যকর যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল বজায় রাখতেই ব্যর্থ হয়, তখন আলোচনার ব্যর্থতা আড়াল করতে নারীত্বের মানদণ্ডও নির্ধারণ করতে শুরু করে। কাকে নিরাপত্তা দিবে আর কাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, কার কণ্ঠস্বর দমন করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত তখন প্রতিষ্ঠানই নিতে থাকে। যার মাধ্যমে ‘আদারিং’ করার রাজনীতি শুরু হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ধরনের নীতিগুলো ‘প্রকৃত নারী’ হিসেবে কোনটা বিবেচিত হবে, তা ঠিক করে দিচ্ছে। এখানেই ‘পারফরম্যাটিভ অন্তর্ভুক্তি’র ধারণা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই ইনক্লুসিভিটির ভাষায় কথা বলে। এই ইনক্লুসিভিটির মধ্যে মাত্র সেই নারীরাই আমন্ত্রিত, যারা পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর নরম বিরোধিতা করে জোড়া-তালি দিয়ে তাকে টিকিয়ে রাখছে।

১৯৯০-এর দশক জুড়ে বাংলাদেশের জেলা শহরের অনেক রেস্তোরাঁ নারীদের জন্য ‘প্রাইভেট কেবিন’ বা পর্দাঘেরা আলাদা বসার জায়গার বিজ্ঞাপন দিত। এই ব্যবস্থাগুলো নিরাপত্তা, শালীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের ভাষায় যুক্তিসঙ্গত করা হতো। কিন্তু এই যুক্তির আড়ালে ভিন্ন একটি ধারণা লুকিয়ে ছিল—জনপরিসরে নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি নিজেই একটি সমস্যা। জনপরিসরকে অনিরাপদ করে তোলা পরিস্থিতিগুলোর মুখোমুখি হওয়ার বদলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীদের জনদৃষ্টি থেকে আড়াল করে নারীর জনপরিসর সংকোচন করে।

পাবলিক ও প্রাইভেট পরিসরে নারীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক নিয়মকানুন এভাবেই নিজেদের পুনরুৎপাদন করে। ধীরে ধীরে নিপীড়নমূলক কাঠামো স্বাভাবিক হিসেবে ধরা দেওয়া শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এসব চর্চাকে আর নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে চিনতে পারে না। তারা এগুলোকে স্বাভাবিক, এমনকি প্রয়োজনীয় বলে মনে করতে শুরু করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার রাজনীতিও একইভাবে কাজ করে। ২০২৬ সালেও ছাত্রীদের রাত ১০টার মধ্যে হলে ফিরতে হয়। নারীদের জন্য গেস্ট পলিসি পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। অথচ যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা—তা শিক্ষক, সহপাঠী বা অনলাইন নিপীড়নের মাধ্যমেই হোক না কেন—এখনো অকার্যকর। প্রতিষ্ঠানগুলো নারীর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে যতটা শক্তি ব্যয় করে, নিপীড়নকারীদের মোকাবিলা বা জবাবদিহিতার প্রক্রিয়ায় ততটা করে না। নিরাপত্তার দায়ভার এখনো নারীর ওপরই বর্তায়, হয়রানি ও নিপীড়ন সহায়ক কাঠামোর ওপর থাকছে না।

এই স্ববিরোধিতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি, একি বিশ্ববিদ্যালয় পড়া ছেলে শিক্ষার্থীরা মলচত্বরে ১০টার পর সময় কাটায়, বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, রাজনৈতিক আলোচনা ও নেটওয়ার্ক তৈরি করে; অথচ নারীদের রাত ১০টার মধ্যে হলে ফিরে যেতে হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় সমান নাগরিকত্বের চর্চা করার দাবি করতে পারে না, যদি সে ক্যাম্পাস জীবনের প্রাণকেন্দ্র সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীদের সমান প্রবেশাধিকার থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বঞ্চিত রাখে।

এই ব্যবস্থাকেই এখন অনেক ছাত্রী চ্যালেঞ্জ করছেন। কেউ কেউ হলে ফেরার সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ আরও মৌলিক দাবি তুলছেন—হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতে হবে। একদল প্রায়ই এসব দাবিকে বাড়াবাড়ি বলে খারিজ করে দেন। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়া নিজেই পিতৃতান্ত্রিক সামাজিকীকরণের ফল, যেখানে বিধিনিষেধকে স্বাভাবিক ধরা হয়, অথচ স্বাধীনতার দাবিকে অযৌক্তিক মনে করা হয়।

সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা হয়তো অন্য জায়গায় লুকিয়ে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রীদের হলের তালাবদ্ধ গেট ভেঙে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার দৃশ্য সেই আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী টার্নিং পয়েন্টে পরিণত হয়েছিল। সারা দেশে সেই দৃশ্যকে সাহস, প্রতিরোধ ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের দৃশ্য হিসেবে উদযাপন করা হয়েছিল। তালাবদ্ধ গেট হয়ে উঠেছিল কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। সেই গেট ভাঙা হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক মুক্তির এক কঠোর প্রদর্শন।

তার কিছুদিন পরই রাতে সেই একই নারীদের হলে তালাবদ্ধ করে রাখা আবার ‘নিরাপত্তা’র ভাষায় যুক্তিসঙ্গত করা হচ্ছে। যদি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে নারীর রাজনৈতিক এজেন্সি এতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণ গণতান্ত্রিক জীবনে সেই এজেন্সি কেন সংকুচিত হয়ে ওঠে? রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্ত পার হয়ে গেলে চলাফেরার স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা কিংবা ক্যাম্পাস জীবনে পূর্ণ অংশগ্রহণের অধিকার কেন শর্তসাপেক্ষ হয়ে যাবে? এই সমস্যা হলের নীতিমালা বা টিএসসির পর্দাঘেরা বসার জায়গার সীমা ছাড়িয়ে অনেক বিস্তৃত। এখানে আলোচনা আসলে পূর্ণ নাগরিকত্ব সম্পর্কেই।

গণতান্ত্রিক সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাদের কাছে প্রত্যাশা কেবল ডিগ্রি দিয়ে বের করা না। এমন স্বাধীনচেতা নাগরিক গড়ে তোলা, যারা নিজে বিচার-বিবেচনা করতে, দায়িত্ব নিতে এবং জনজীবনে অংশ নিতে সক্ষম। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নতুন জ্ঞান উৎপাদন করার মধ্য দিয়ে পশ্চাৎপদতা ত্যাগ করে সমাজের অগ্রগামী অংশ প্রস্তুত করা। যে নীতিগুলো ধরে নেয় যে, নারীদের ক্রমাগত প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান দরকার, সেগুলো এই মূল লক্ষ্যকেই দুর্বল করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এগুলো অনিরাপদ পরিবেশ বদলানোর বদলে সেই পরিবেশে সবচেয়ে অরক্ষিত মানুষদের নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়।

ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের সময় পিতৃতান্ত্রিক খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসা নারীদের অনেকেই পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতির কাছে ঘরের আলমারিতে রাখা সাজসজ্জার শোপিসের মতো। অতিথি এলে বের করা হয়, চলে গেলে আবার শোকেসে তুলে রাখা হয়। অনেকের কাছে এভাবে বস্তুরূপে টিকে থাকাটাই সম্মানের প্রতীক। যারা একে সম্মান মনে করেন না, তাদের জন্য সেই শৃঙ্খল ভাঙার সংগ্রাম এখনো চলছে।

 

নূজিয়া হাসিন রাশা: ছাত্র সংগঠক ও ফ্রিল্যান্স লেখক।