সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশবাসীর নজর এখন অনেকটাই ঢাকা-৮ আসনকে ঘিরে। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও নতুন প্রজন্মের প্রার্থীকে কেন্দ্র করে সেখানে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ঢাকা-৮ আসনটি মূলত রাজধানীর রমনা, শাহবাগ, মতিঝিল, কাকরাইল, মগবাজারের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় এ এলাকায় হওয়ায় আসনটিকে দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল বলা যায়।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এ আসনে লড়াইয়ের রাজনৈতিক ভাষা ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ওসমান হাদি। প্রচারণার সময় গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে তার মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা।
এ আসনে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, কমলাপুর রেলস্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
সচিবালয়, মতিঝিল, পল্টন ও শাহবাগ এলাকার ভোটারদের একটি বড় অংশ সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী।
অন্যদিকে রমনা, শান্তিনগর, শাহজাহানপুর, সিদ্ধেশ্বরী ও মালিবাগে মূলত উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের বাস। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল কলেজ এ আসনে হওয়ায় এখানে বিপুল
সংখ্যক তরুণ ভোটার আছেন।
নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, প্রচারণায় মুখরিত হচ্ছে এসব এলাকা। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, তীব্র যানজট, ফুটপাত দখল, নিরাপত্তা, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়েছেন ভোটাররা।
এ আসনের ভোটার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঢাবির অনেক শিক্ষার্থী এ আসনের ভোটার। তারা যেহেতু সমাজের শিক্ষিত শ্রেণির অংশ, তাই তাদের ভোট পেতে হলে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তাদের সক্ষমতার সামঞ্জস্য থাকতে হবে। প্রার্থীদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে তাদের কথা শোনা উচিত।’
মতিঝিল-সংলগ্ন আর কে মিশন রোড এলাকার বাসিন্দা সাকির হাসান বলেন, ‘এলাকার মূল সমস্যা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখল বাণিজ্য। নির্বাচনের পরও এসব সমস্যার সঠিক সমাধান হবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।’
কমলাপুর এলাকার ভোটার মো. নিজামউদ্দীন ভরসা রাখতে চান তরুণ নেতৃত্বের ওপর।
‘স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও দেশের মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসেনি। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। নতুনদের নেতৃত্বে আসা উচিত বলে আমি মনে করি,’ বলেন অটোরিকশাচালক নিজাম।
এ আসনে লড়ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাস। এলাকায় তার রাজনৈতিক প্রভাব বেশ পুরোনো। এ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে আছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের প্রতিনিধি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের এই প্রার্থী ‘পুরোনো’ রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।
আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদের মেঘনা আলম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেফায়েত উল্লা, জনতার দলের মো. গোলাম সারোয়ার, বাংলাদেশ জাসদের এ এফ এম ইসমাইল চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এস এম সরওয়ার, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা, জাতীয় পার্টির জুবের আলম খান, মুক্তিজোটের মো. রাসেল কবির, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের এ এইচ এম রাফিকুজ্জামান আকন্দ।
সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারণার সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠার পর ঢাকা-৮ আসন আলোচনার কেন্দ্রে আসে। হামলার পেছনে মির্জা আব্বাসের সমর্থকদের দায়ী করেছেন নাসীরুদ্দীন।
তবে মির্জা আব্বাস অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, এটি সস্তা জনপ্রিয়তা ও ‘সহানুভূতি’ আদায়ের কৌশল।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভোটারদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। মানুষ প্রার্থীর অতীত দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের কথা মনে রেখেছে। এ এলাকায় কিছু “সুইং” ভোটার আছে। সেগুলোকে “জুলাই স্পিরিটের” আলোকে তরুণদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছি।’
তরুণদের প্রধান সমস্যা অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বেকারত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি প্রথাগত রাজনীতির মতো চাকরি দেওয়ার ফাঁকা বুলিতে বিশ্বাসী নই। আমার মূল লক্ষ্য—সমস্যার গোড়ায় হাত দিয়ে তা নির্মূল করা, অর্থাৎ চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এই সিস্টেম ভাঙলে তরুণরা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান করতে পারবে।’
মাদক ও সন্ত্রাসী চক্রও ভেঙে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
প্রচারণার সময় তিনি ও তার কর্মীরা দফায় দফায় হামলার শিকার হয়েছেন জানিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমাকে লক্ষ্য করে ডিম ও ময়লা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এমনকি শারীরিক লাঞ্ছনা ও ইটপাটকেল মারা হয়েছে। প্রতিপক্ষের ছাত্র ও যুব সংগঠনের কর্মীরা এসব কাজ করেছে। উসকানি সত্ত্বেও আমি ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।’
নির্বাচন কমিশনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কমিশন ঋণখেলাপি, সন্ত্রাসী ও দ্বৈত নাগরিকদের মনোনয়ন বৈধ করে দিয়ে তাদের সংসদে পাঠানোর পথ পরিষ্কার করেছে। আমি মনে করি, কমিশনের কর্মকর্তারাও এ ক্ষেত্রে অসহায় ও আতঙ্কের মধ্যে আছেন।’
বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের অভিযোগ, নির্বাচনে কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।
তিনি বলেন, ‘প্রতিপক্ষ প্রার্থী আমার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও নোংরা প্রচারণা চালাচ্ছে। এটা সম্পূর্ণ আচরণবিধি লঙ্ঘন। ভোটারদের সহানুভূতি পেতে আমার বিরুদ্ধে অহেতুক অভিযোগ তুলছেন। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমি নীরব আছি, কোনো উসকানিতে পা দিচ্ছি না।’
‘আমি এই এলাকার সন্তান। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে ছিলাম, সামনেও থাকব। এই এলাকার উন্নয়নের অনেক কিছুই আমার হাত দিয়ে হয়েছে। এলাকার জন্য আমার চেয়ে যদি বেশি কেউ কাজ করতে পারে, তাহলে কিছু বলার নেই। আর যদি ভোটাররা মনে করে এ এলাকার জন্য আমি ভালো কিছু করতে পারব, তাহলে তাদের রায় যেন আমি পাই,’ বলেন মির্জা আবাস।
নির্বাচিত হলে তিনি বিগত ১৭ বছরে দখল হওয়া খেলার মাঠ ও পার্ক উদ্ধার, মুগদা হাসপাতালের আধুনিকায়ন এবং এলাকায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কবরস্থান নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আশঙ্কা প্রকাশ করে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমি মনে করি সরকারের একটি অংশ একটি গোষ্ঠীকে ভোটে জিতিয়ে আনতে পর্দার আড়াল থেকে কাজ করছে। কিন্তু দেশের জনগণ ১২ ফেব্রুয়ারি তাদের সঠিক রায় দেবেন বলে আমার বিশ্বাস।’
এদিকে প্রার্থীদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ বন্ধ করে ‘পলিসিভিত্তিক’ বিতর্কের আহ্বান করেছেন এ আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী মেঘনা আলম।
তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘হামলার কথা যেরকম শুনছি আমার সঙ্গে এমন কিছু হয়নি। তবে কিছু এলাকায় যেতে আমরা বাধা পেয়েছি। আমি মনে করি, নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ থাকা উচিত এবং এক প্রার্থীর উচিত অন্য প্রার্থীর কথা শোনা।’
উন্নত বিশ্বের মতো সব প্রার্থীর ইশতেহার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গণমাধ্যমে বিতর্ক আয়োজনের প্রস্তাব তার। ভোটারদের ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালটের মাধ্যমে ‘নোংরা’ রাজনৈতিক ধারা বদলানোর আহ্বান জানিয়েছেন মেঘনা আলম।
এ আসনের শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন ভোটারদের জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি পরীক্ষা। এখানকার ভোটার ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭১, যাদের মধ্যে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৫ পুরুষ, ১ লাখ ২২ হাজার ৬৭৫ নারী ও একজন হিজড়া।
