সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পে কমিশন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যখন কৃচ্ছ্রতার পথে হাঁটছে, ঠিক তখনই বেতন বাড়ানোর এই প্রস্তাব রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল বোঝা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
একদিকে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থ সরবরাহ কমাচ্ছে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট কাটছাঁট করছে। অন্যদিকে সরকারেরই একটি কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এমন এক প্রস্তাব দিয়েছে, যা বেতন বাবদ সরকারের ব্যয় দ্বিগুণ করে দেবে।
ঋণের ভারে জর্জরিত অবস্থায় এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না করেই ব্যয় বৃদ্ধির এই প্রস্তাবকে বিশেষজ্ঞরা ‘ফিসক্যাল ল্যান্ডমাইন’বা আর্থিক মাইন হিসেবে অভিহিত করছেন।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনটি গত সপ্তাহে জমা দিয়েছেন কমিশনের প্রধান ও সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। এক দশক ধরে বেতন না বাড়ায় এবং মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বেতন বাড়ানোর যুক্তি একেবারে অমূলক নয়।
কিন্তু সমস্যা হলো গাণিতিক বাস্তবতা। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে রাষ্ট্র ব্যয় করে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
পে কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করলে সরকারের যে খরচ বাড়বে তা চলতি অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় আড়াই গুণ। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাত যেখানে মাত্র ৫০১ কোটি টাকার সামান্য বরাদ্দ বাড়াতে হিমশিম খেয়েছে, সেখানে আমলাতন্ত্রের জন্য এই বিপুল ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই বাড়তি অর্থ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের এক-পঞ্চমাংশ।
একটি সংকোচনমূলক বাজেটের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এই বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব সাংঘর্ষিক। ঘাটতি কমাতে ইতিমধ্যে এডিপি ১৩ দশমিক ২ শতাংশ কাটছাঁট করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের মতে, এই বেতন বৃদ্ধির ফলে সরকারকে ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নিতে হবে। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এটা কি মূল্যস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে? না।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
বাড়তি বেতনের জন্য অর্থ সংস্থানের পথগুলোও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমার্ধে ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখালেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে আছে। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার তলানিতে। ফলে রাজস্ব আয় থেকে এই বাড়তি ব্যয় মেটানো একরকম অসম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ঋণের টাকায় নিয়মিত ব্যয় মেটানো অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভুল। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এই টাকা আসবে কোথা থেকে?’
সরকার টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। বিদেশি সংস্থাগুলো সরকারি কর্মচারীদের বেতনের জন্য ঋণ দেয় না। আর ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে, যা ইতিমধ্যে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরি মনে করেন, দেশের অর্থনীতি এখনো এই চাপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ বেতন কমিশনের বদলে মহার্ঘ ভাতা দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হতো। এখন কমিশন যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তা পূরণ করা সম্ভব নয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই প্রস্তাবকে ‘বাস্তবায়নযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, অর্থের সংকটে থাকা দেশে আমলাদের সুবিধা বাড়ানোর বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে। বেশি বেতন দিলে দুর্নীতি কমে—এই ধারণা ভুল। ইতিহাস বলে, বেতনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘুষের হারও বাড়ে। সাধারণ জনগণ এই বেতন বৃদ্ধি মানতে পারে একমাত্র যদি তাদেরকে প্রভাবিত করে এই বাড়তি বেতন দেওয়া হয় এবং এই শর্তে যে সরকারি কর্মচারীরা তাদের সম্পদ এবং আয়ের সব তথ্য প্রকাশ করে।
এদিকে এই বেতন বৃদ্ধির প্রভাব বেসরকারি খাত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়বে। সেখানেও বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে, যা সামাল দেওয়া অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সম্ভব হবে না।
এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি নিয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত বা বাধ্যতামূলক নয়। এটি গ্রহণ, সংশোধন বা বাতিলের এখতিয়ার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের। বর্তমান সরকার কেবল দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের প্রক্রিয়াটি এগিয়ে দিয়েছে।
এটি রাজনৈতিকভাবে চতুর সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু পরবর্তী সরকারের জন্য এটি একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আমলাতন্ত্রের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর কোষাগারের করুণ বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
জাহিদ হোসেনের মতে, নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য সহনীয় মাত্রায় বেতন বাড়ানো যেতে পারে। তবে কমিশনের পুরো প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৫ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতিতে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ১৮-২০ শতাংশ কমেছে। এর সঙ্গে সমন্বয় করে ২৫ শতাংশ বেতন বাড়ালেও সরকারের ব্যয় বাড়বে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও এই টাকাও কোথা থেকে আনা যায় তা স্পষ্ট নয়। কারণ অর্থনীতির সব খাতগুলোই চাপের মুখে রয়েছে।
