একটি পেঙ্গুইন তার কলোনি ছেড়ে উল্টো-পথে পাহাড়ের দিকে একা হেঁটে চলেছে—এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘নিহিলিস্ট পেঙ্গুইন’ নামে পরিচিত এই ভিডিও ঘিরে কেন এত আলোচনা—তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যেই।
পেঙ্গুইনের একা হাঁটার এই ভিডিও আসলে নতুন কিছু নয়। এটি ২০০৭ সালে নির্মিত বিখ্যাত জার্মান পরিচালক ভার্নার হার্জগের ডকুমেন্টারি ‘এনকাউন্টারস অ্যাট দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর একটি দৃশ্য। প্রামাণ্যচিত্রটিতে অ্যান্টার্কটিকার মেরু অঞ্চলের প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের নানা দিক তুলে ধরা হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, অ্যাডেলি প্রজাতির একটি পেঙ্গুইন দলছুট হয়ে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের বরফে ঢাকা পাহাড়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। অথচ পেঙ্গুইন সাধারণত সমুদ্রের কাছাকাছি থাকে। সেখানেই তারা সহজে খাবার খুঁজে পায়। সেখানেই গড়ে তোলে নিজেদের সম্প্রদায়।
আপনারা অনেকেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গানটি শুনেছেন। ‘যদি তোর ডাক শুনে না আসে, তবে একলা চলো রে।’ অ্যাডেলি প্রজাতির এই পেঙ্গুইনটি যেন সেই গানের মতোই ‘একলা চলো রে’ নীতি অনুসরণ করছে।
এই দৃশ্যের বর্ণনায় ভার্নার হার্জগ একে ‘ডেথ মার্চ’ বা ‘মরণযাত্রার’ সঙ্গে তুলনা দেন। তার ভাষায়, এই পেঙ্গুইন এমন এক পথে আগাচ্ছে, যেখান থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
চলতি বছরে প্রায় দুই দশক পর এই ‘মরণযাত্রা’ মানুষের কাছে নতুন অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে এই ভিডিওর সঙ্গে নাটকীয় সুর, গান ও নানা রকম ক্যাপশন যুক্ত করা হচ্ছে। কোনোটি গভীর, কোনোটি ব্যঙ্গাত্মক।
অনেকে এই একাকী হাঁটাকে মানুষের অস্তিত্বের সংকট, মানসিক বিষণ্ণতা, জীবনের অর্থহীনতা বা উদ্দেশ্যহীনতার প্রতীক হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ আবার সামাজিক চাপ, ছকে বাঁধা জীবন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তুলনা করছেন এই দৃশ্যকে।
হাস্যরসাত্মক পোস্টে পেঙ্গুইনটিকে ‘বিদ্রোহী’ বা ‘নিহিলিস্ট’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, ওই পেঙ্গুইন তার জীবনের গভীর কোনো অর্থ খুঁজে না পেয়ে একা পথে হাঁটছে।
অনেক ইউজার পেঙ্গুইনের এই যাত্রার আড়ালে নিজ নিজ জীবনের চাপ, হতাশা, অনিশ্চয়তা বা ক্লান্তির প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাচ্ছেন।
তবে বিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে পেঙ্গুইনটি কোনো মানবীয় দর্শন বা আবেগতাড়িত হয়ে একাকী পথ বেছে নেয়নি। প্রাণীবিদদের ধারণা, বোবা প্রাণীটি অসুস্থতা বা সঠিক দিক খুঁজে না পাওয়ার বিভ্রান্তির কারণে ভুল পথে এগিয়ে যেতে পারে। এধরনের আচরণ পেঙ্গুইনের টিকে থাকার জন্যও মারাত্মক হুমকি।
পেঙ্গুইনের জীবন সমুদ্রনির্ভর। খাবার ও দলের অন্যান্য সদস্যদের থেকে দূরে সরে যাওয়া শুধু ব্যতিক্রমী আচরণই নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ডে রাজনৈতিক ব্যঙ্গও যোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে প্রকাশিত পোস্টে দেখা যায়, পেঙ্গুইনটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হাঁটছে। পেঙ্গুইনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। সামনে বরফে ঢাকা পাহাড়ে উড়ছে গ্রিনল্যান্ডের পতাকা। ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে, ‘পেঙ্গুইনকে আঁকড়ে ধরো’।
Embrace the penguin. pic.twitter.com/kKlzwd3Rx7
— The White House (@WhiteHouse) January 23, 2026
আদতে গ্রিনল্যান্ডে পেঙ্গুইনের অস্তিত্বই নেই। এ কারণে এআই দিয়ে তৈরি করা ওই পোস্ট ঘিরে ব্যাপক ট্রলিং শুরু হয়। পেঙ্গুইন মূলত পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে, বিশেষ করে অ্যান্টার্কটিকায় বসবাস করে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘নিহিলিস্ট পেঙ্গুইন’ ট্রেন্ড নানা বার্তা বহন করছে। কেউ এতে খুঁজে পাচ্ছেন একাকীত্ব ও জীবনের ক্লান্তির প্রতিফলন, কেউ আবার দেখছেন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
আবার অনেকেই একে নিছক মজার ট্রল-মিম হিসেবেই উপভোগ করছেন।
