-3 C
New York

নির্বাচনী প্রচারে এআই ভিডিওর অপব্যবহার, বিভ্রান্ত হচ্ছেন ভোটাররা

গত ১১ জানুয়ারি ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, এক পুলিশ কর্মকর্তা এক সংবাদ সম্মেলনে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলছেন আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ২০০টি আসন পাবে। একই ভিডিওতে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়।

এর কয়েক দিন আগে আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক ইসলামি বক্তা জামায়াত মদিনা সনদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে কড়া সমালোচনা করছেন। আরেকটি ক্লিপে এক সংবাদ উপস্থাপককে বলতে শোনা যায়, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফেরাতে সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে।

কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, এসব ভিডিওর চরিত্রগুলোর চোখের পলক ও ঠোঁটের নড়াচড়া অস্বাভাবিক। আলো-ছায়া ও ব্যাকগ্রাউন্ডের মধ্যেও অসংগতি স্পষ্ট। অডিওর সঙ্গে বক্তার ঠোঁটের মিল নেই। আসলে এগুলোর সবই ভুয়া বা ‘ফেক ভিডিও’, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে এ ধরনের এআই কন্টেন্টের ছড়াছড়ি। এসব কন্টেন্ট ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হচ্ছে বা নিজেদের দলের পক্ষে প্রচার চালানো হচ্ছে।

গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে দ্য ডেইলি স্টার ১৯টি ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল থেকে ছড়ানো ৯৭টি এআই কন্টেন্ট বিশ্লেষণ করেছে। দেখা গেছে, এই কন্টেন্টগুলো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এসব কন্টেন্টে ১৬ লাখের বেশি রিঅ্যাকশন বা এনগেজমেন্ট হয়েছে। পোস্টের নিচের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেকেই এসব কন্টেন্টকে সত্য বলে মনে করছেন।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের কন্টেন্টের প্রচারও বাড়ছে। তথ্য সংগ্রহের প্রথম সপ্তাহে ৯টি এআই কন্টেন্ট পাওয়া গেলেও শেষ সপ্তাহে তা ২৬৭ শতাংশ বেড়ে ৩৩টিতে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনমত প্রভাবিত করতে এআই কন্টেন্টকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর এসব শনাক্ত করার কারিগরি সক্ষমতা থাকলেও তারা তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কে কাকে আক্রমণ করছে

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব কন্টেন্টের অর্ধেকের বেশিই ‘ম্যানিপুলেটিভ’ বা বিভ্রান্তিকর। এ ছাড়া ৩৯ শতাংশ কন্টেন্ট অপতথ্য এবং বাকি ৯ শতাংশ ঘৃণা ছড়ানো, ধর্মীয় উসকানি ও চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে তৈরি।

৯৭টি এআই কন্টেন্টের মধ্যে ৫০টি এসেছে জামায়াতপন্থি পেজ বা প্রোফাইল থেকে। বিএনপিপন্থি পেজ থেকে ৩০টি এবং আওয়ামী লীগপন্থি পেজ থেকে ১৭টি কন্টেন্ট ছড়ানো হয়েছে। তবে এসব পেজ বা প্রোফাইল কোনো দলেরই অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট নয়।

বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার অনলাইন লড়াই এখন তুঙ্গে। জামায়াতপন্থি পেজগুলো থেকে বিএনপিকে লক্ষ্য করে ২৭টি এবং বিএনপিপন্থি পেজ থেকে জামায়াতকে লক্ষ্য করে ২৪টি কন্টেন্ট প্রচার করা হয়েছে।

জামায়াতপন্থি পেজগুলো বিএনপির বিরুদ্ধে মূলত চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ আনছে। যেমন—১৩ জানুয়ারি ‘হক টেলিভিশন’ নামের একটি পেজ থেকে এক ফল বিক্রেতার ভিডিও প্রচার করা হয়, যেখানে তিনি বিএনপিকে ‘সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ’ বলে অভিহিত করেন। এ ছাড়া জামায়াত নিজেদের পক্ষে জনমত গড়তে হিন্দু ও সাধারণ মানুষের ভুয়া এআই চরিত্র ব্যবহার করছে।

অন্যদিকে বিএনপিপন্থি পেজগুলো জামায়াতের ইসলামি ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ৭১-এ দলটির ভূমিকা এবং ভারতের সঙ্গে গোপন সম্পর্কের অভিযোগ তুলছে। একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের চার নেতাকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপিই প্রকৃত ইসলামী দল।

আওয়ামী লীগপন্থি পেজগুলো মূলত অন্তর্বর্তী সরকার, ছাত্রনেতা এবং এনসিপি নেতাদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তারা তাসনিম জারা, ফাতিমা জুমাসহ নারী নেত্রীদের চরিত্র হননে নোংরা প্রচার চালাচ্ছে।

জামায়াতের পক্ষে চালানো এআই ভিডিওগুলোর বেশির ভাগই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে দলটির সমর্থন দেখানোর জন্য তৈরি। এর মধ্যে তথাকথিত হিন্দু ব্যক্তি, রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষকে জামায়াতের পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়। একটি ভিডিওতে এক প্রবাসী দাবি করেন, তিনি ‘সব দেখেছেন’ তাই জামায়াতকেই ভোট দেবেন। অন্য দুটি ভিডিওতে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে সমর্থন করাকে ইসলামকে সমর্থনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

ভোটাররা কি ফাঁদে পা দিচ্ছেন?

মন্তব্যের ঘরে দেখা গেছে, অনেকেই এসব ভিডিও বিশ্বাস করছেন। জামায়াতপন্থি একটি ভিডিওতে এক হিন্দু ব্যক্তি জামায়াতকে ভোট দেওয়ার কথা বললে একজন মন্তব্য করেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো।’

তবে কেউ কেউ এসব ভিডিও ভুয়া বলে সতর্কও করছেন। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এআই ভিডিও।’

জামায়াতপন্থি ‘উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন’ একাই ১৪টি ভিডিওর মাধ্যমে ১০ লাখের বেশি এনগেজমেন্ট তৈরি করেছে। বিএনপিপন্থি পেজগুলোর মধ্যে ‘নেক্সট ইনসাইট নেটওয়ার্ক’ ৯৭ শতাংশ এনগেজমেন্ট পেয়েছে। আওয়ামী লীগপন্থি পেজগুলোর এনগেজমেন্ট বা প্রভাব তুলনামূলক কম। ১৭টি কন্টেন্ট থেকে তারা মাত্র ১১ হাজার ৮০০ এনগেজমেন্ট পেয়েছে, যা মোট এনগেজমেন্টের ১ শতাংশেরও কম। তাদের মধ্যে শিপন ইসলাম নামে একজন একাই ছয়টি কন্টেন্ট ছড়িয়েছেন। ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব তাকে ২০২৫ সালের তৃতীয় সর্বোচ্চ অপতথ্য ছড়ানকারী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

শিপন ইসলাম (আওয়ামী লীগপন্থি), ইঞ্জিনিয়ার জহিরুল ইসলাম টম (বিএনপিপন্থি) এবং নেক্সট ইনসাইট নেটওয়ার্কের (বিএনপিপন্থি) সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি। তবে উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন ও হক টেলিভিশন (জামায়াতপন্থি) রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে দাবি করেছে, তারা সমাজের ‘সত্য’ তুলে ধরতে চায়।

বিশেষজ্ঞ মতামত

ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এআই কন্টেন্টের প্রভাব নির্ভর করে ভোটারের ডিজিটাল সাক্ষরতার ওপর। পুলিশ দিয়ে এটি ঠেকানো সম্ভব নয়, প্রয়োজন জনসচেতনতা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর এ ধরনের আচরণ শনাক্ত করার প্রযুক্তি আছে। কিন্তু তারা তা প্রয়োগে কতটা আন্তরিক, সেটাই বড় প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মগুলোর আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন এবং কেন বা কার নির্দেশে কন্টেন্ট মডারেট করা হচ্ছে, তা জানানো উচিত।’

(প্রতিবেদনের লেখকরা দ্য ডেইলি স্টারের ইন্টার্ন। অতিরিক্ত গবেষণা ও তথ্যে সহায়তা করেছেন নওরিন সুলতানা তমা, মীর রওনক ও তারেক হোসেন)

Related Articles

Latest Articles