যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার জন্য নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার।
সিএনএন জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চে কুশনার বলেন, ‘আমাদের একটি মাস্টারপ্ল্যান আছে। এর কোনো বিকল্প পরিকল্পনাও নেই।’
তিনি বলেন, যদি এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, তবে দায় কার—তা নির্ধারণ করাও সহজ হবে।
তিনি বলেন, ‘হামাস যদি নিরস্ত্র না হলে তা গাজার জনগণকে তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে পিছিয়ে দেবে।’
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনা তড়িঘড়ি করে উপস্থাপন করা হয় ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘বোর্ড অব পিস’ সনদ স্বাক্ষরের পরপরই। গত অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ২০ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ হলো এটি।
ওই চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কুশনার বলেন, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীই ছিল গাজা উপত্যকার জন্য ট্রাম্পের মূল যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান অংশ।
এরপর তিনি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরেন।
সিএনএন জানায়, গাজার আসন্ন উন্নয়ন দেখাতে পর্দায় উপত্যকাটির একটি মানচিত্র তুলে ধরা হয়।
কুশনার বলেন, সমুদ্রতট বরাবর একটি ‘উপকূলীয় পর্যটন’ অঞ্চল গড়ে তোলা হবে যেখানে প্রায় ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করা হবে। এর বেশিরভারগই হোটেল হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
গাজার দক্ষিণ-পশ্চিমে মিসরের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় একটি সমুদ্রবন্দরও দেখানো হয়। বন্দরের ঠিক ভেতরের দিকে মানচিত্রে একটি বিমানবন্দরের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০ বছরেরও বেশি আগে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া গাজার একটি পুরোনো বিমানবন্দর রয়েছে ওই এলাকার কাছাকাছি।
‘নিউ রাফাহ’ ও ‘নিউ গাজা’—নামে দুটি নগর উন্নয়ন প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন কুশনার।
‘নিউ রাফাহতে’ এক লাখের বেশি স্থায়ী আবাসন নির্মাণ করা হবে। সেখানে ২০০টির বেশি স্কুল এবং অন্তত ৭৫টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব।
ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আর শতভাগ কর্মসংস্থান নিশ্চিতের লক্ষ্যে ‘নিউ গাজা’ হবে একোটি শিল্পেকেন্দ্র।
সিএনএন জানায়, কম্পিউটারে বানানো ছবিতে শহরটিকে দোহা ও দুবাইয়ের মতো পারস্য উপসাগরীয় শহরের মতো মনে হয়। সেখানে ঝকঝকে জলধারার পাশে আবাসন ও আধুনিক অফিস স্থাপনার দৃশ্যও দেখা যায়।
সিএনএন জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার জবাবে শুরু হওয়া টানা দুই বছরের ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে গাজায় ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে।
কুশনার বলেন, প্রথম পর্যায়ে সরকারগুলোই অর্থায়নে এগিয়ে আসবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিতব্য এক সম্মেলনে প্রাথমিক ঘোষণা আসবে বলেও জানান তিনি।
‘অসাধারণ বিনিয়োগের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি এমন জায়গায় বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আমাদের-আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে, বিশ্বাস রাখতে হবে এবং বিনিয়োগ করতে হবে।’
সিএনএন জানায়, কুশনারের এই উপস্থাপনার বিষয়ে সমালোচকরা বলছেন—ফিলিস্তিনিদের অসহায়ত্বকেই এখানে কাজে লাগানো হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি ইউরো-মেডিটেরেনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের প্রতিষ্ঠাতা রামি আবদু এক্সে লেখেন, ‘ফিলিস্তিনিদের সামনে এমন একটি পরিকল্পনা দাঁড় করানো হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য নিয়ন্ত্রণ, বশ মানানো ও দমনের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্বই মুছে ফেলা।’
বর্তমানে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী গাজার অর্ধেকসহ রাফাহতেও অবস্থান করছে।
গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি নিশ্চিতে করা ২০ দফা পরিকল্পনায় একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কথা ছিলো এই বাহিনীই ইসরায়েলের পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করবে এমন।
কিন্তু এখন পর্যন্ত তৃতীয় পক্ষগুলো এই বাহিনীতে যোগ দিতে অনাগ্রহী বলে জানিয়েছে সিএনএন। আবার ইসরায়েল হিসেবে তুরস্কের মতো দেশেরর অংশ্রহণের বিরোধিতা করেছে।
কুশনার তার উপস্থাপনায় কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনীর কথাই উল্লেখ করেননি।
ইসরায়েলি প্রত্যাহারের বিষয়টি একটি স্লাইডে বলা হয়, ‘গাজাব্যাপী নিরস্ত্রীকরণ ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ তৈরি করবে।’
কুশনার স্পষ্ট করে বলেন, নিরস্ত্রীকরণ তদারকির দায়িত্ব টেকনোক্র্যাটিক কমিটির ওপর—যারা ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস কাঠামোর মাঠপর্যায়ের অংশ। এটি ফিলিস্তিনি নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়ে গঠিত।
তিনি বলেন, এটি না হলে ‘আমরা পুনর্গঠন করতে পারব না।’
উপস্থাপনায় বলা হয়, ভারী অস্ত্র, সুড়ঙ্গ, সামরিক অবকাঠামো, গোলাবারুদ ও উৎপাদন স্থাপনা ধ্বংস করা হবে। তবে প্রক্রিয়াটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
হামাস সাধারণত বলে এসেছে, তারা কেবল একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রে তাদের সেনাবাহিনীর কাছেই অস্ত্র হস্তান্তর করবে। সম্প্রতি হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা বাসেম নাইম বর্তমান যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে অস্ত্র ‘স্থগিত রাখা বা সংরক্ষণের’ কথাও বলেছেন।
নীরবে হলেও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, নতুন টেকনোক্র্যাটিক কমিটি ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে তাদের কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সিএনএন জানায়, কুশনার কমিটিকে ‘গাজার নতুন সরকার’ হিসেবে উল্লেখ করায় সেই উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জনসেবা দেওয়া জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ এই পরিকল্পনায় কার্যত বাদ পড়েছে।
গাজার জন্য উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা উপস্থাপনের এটি প্রথম ঘটনা নয়।
সিএনএন জানায়, ২০১৯ সালে কুশনার ‘ফ্রম পিস টু প্রসপারিটি’ শীর্ষক একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন বাহরাইনে। সেখানেও গাজা ও পশ্চিম তীরকে ‘ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও পর্যটন কেন্দ্রে’ রূপান্তরের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল।
তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রায় সম্পূর্ণ অভাবে সেই পরিকল্পনাগুলো কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি।
