-4.6 C
New York

শহর থেকে গ্রাম, ভোটারের দুয়ারে প্রার্থীদের প্রচার

নির্বাচনী প্রচারের প্রথম সপ্তাহ শেষে গতকাল শুক্রবার বড় রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জোরালো প্রচারণা চালিয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে শহর থেকে গ্রাম, ভোটারের দুয়ারে যাচ্ছেন তারা।

ব্যস্ত সড়ক হোক বা শান্ত অলিগলি—সব জায়গাতেই প্রার্থীরা ও তাদের কর্মী-সমর্থকেরা লিফলেট বিলি করছেন, স্লোগান দিচ্ছেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন। উন্নয়ন ও পরিবর্তনের নানা আশ্বাস দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা চলছে।

এবার প্রথমবারের মতো পোস্টার নিষিদ্ধ থাকায় অনেকের চোখে নির্বাচনী আমেজ কিছুটা ম্লান মনে হচ্ছে। তবে পাড়া-মহল্লার ভেতর দিয়ে ছোট ছোট মিছিল ও প্রচারণা অতীতের নির্বাচনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে।

মিরপুর ১০-এর বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, দীর্ঘদিন পর আমাদের এলাকায় বিভিন্ন দলের মিছিল দেখতে ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে সত্যিই একটা বাস্তব প্রচারণা আর প্রকৃত প্রতিযোগিতা দেখতে পাচ্ছি।

শুক্রবারের জুমার নামাজও প্রচারণায় বাড়তি গতি এনেছে। অনেক এলাকায় নামাজ শেষে মসজিদের বাইরে প্রার্থীরা ও তাদের কর্মীরা দাঁড়িয়ে মুসল্লিদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ এবং কুশল বিনিময় করতে দেখা গেছে।

আর মাত্র ১৯ দিন বাকি থাকায় সামনে প্রচারণা আরও জোরদার হবে বলে মনে করছেন অনেকেই। তাদের মতে, ২০০৮ সালের পর এটিই দেশের প্রথম সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। এ কারণে প্রার্থীদের সর্বত্র দৃশ্যমান রাখতে প্রচার টিমগুলো নিরলসভাবে কাজ করছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গতকাল ভোরে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার পাঁচরুখী এলাকায় বেগম আনোয়ারা ডিগ্রি কলেজ মাঠে এক সমাবেশে বক্তব্য দেন। পরে সন্ধ্যায় তিনি ঢাকা-১৭ আসনের ভাসানটেকের বিআরবি ময়দানে যান, যেখান থেকে তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এই আসনের ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় তিনি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কাটিয়েছেন।

সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায় এবং নিজেদের সমস্যার সমাধান দেখতে চায়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে জনগণের কথা শোনা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ঢাকা থেকে আকাশপথে সৈয়দপুরে যান। পরে হেলিকপ্টারে পঞ্চগড়ের সুগার মিল মাঠে পৌঁছে এক সমাবেশে বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, ১০ দলীয় ঐক্য ক্ষমতায় এলে পাঁচ বছরের মধ্যেই ‘উত্তরাঞ্চলের চেহারা বদলে দেওয়া সম্ভব’। এরপর তিনি দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে আরও কয়েকটি সমাবেশে অংশ নেন।

এদিকে, জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনের শাহজাদপুর এলাকায় প্রচারণা চালান। এই আসন থেকেই তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম নারায়ণগঞ্জে তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় এলাকায় এক সমাবেশে তিনি বলেন, একটি গোষ্ঠী মানুষকে রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার পরিকল্পনা করছে।

তিনি বলেন, যারা নিজেদের সহযোদ্ধাদের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে, তারা ইসলাম কিংবা দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার যোগ্য নয়।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শোল্টিহরি বাজারে প্রচারণা চালান।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে যেমন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান একসঙ্গে দেশ গড়েছে, ভবিষ্যতেও সবাইকে নিয়েই দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে। সবার জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বিএনপির লক্ষ্য বলে তিনি জানান।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় পথসভায় বলেন, দুঃশাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অবসান ঘটানো ছাড়া দেশের সামনে এগোনোর আর কোনো পথ নেই।

চট্টগ্রামেও ছিল প্রাণবন্ত প্রচারণা। বিভিন্ন আসনে প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন।

চট্টগ্রাম-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী লালদিয়ার চরে প্রচারণা চালিয়ে বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর মানুষ অবশেষে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত।

চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াত প্রার্থী একেএম ফজলুল হক জুমার নামাজের পর কাপাসগোলা জামতলা জামে মসজিদে গণসংযোগ করেন। তিনি সুশৃঙ্খল নগর উন্নয়ন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।

কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ চকরিয়ায় এক পথসভায় বলেন, জনগণ আবার দেশের মালিকানা ফিরে পেয়েছে এবং গণতন্ত্রকে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেছে।

তিনি বলেন, এখন গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সবাই নিজেকে এই রাষ্ট্রের মালিক মনে করে। সে জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি সবাইকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে ভোট দিতে হবে।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে রংপুর-৪ আসনে প্রচারণা চালিয়ে বলেন, দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও জনগণ শেষ পর্যন্ত জোটকেই ক্ষমতায় আনবে।

লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে ইছাপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতা আজিজুর রহমান দলের পক্ষে ভোট চাইছেন। একই আসনে তার ছেলে মাহবুব আলম এনসিপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাহবুব জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির কর্মী এবং সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ভাই।

এবারের নির্বাচনে ২৪৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত প্রচারণা চলবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটাররা রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে একটি গণভোটেও অংশ নেবেন।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন মূলত বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

(নিজ নিজ জেলা থেকে আমাদের সংবাদদাতারা এই প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন)

Related Articles

Latest Articles