-3 C
New York

‘রোকেয়া সরণি’ জুড়ে ভোটের হাওয়া: ঢাকা-১৫-তে কে জিতবেন

রাজধানীর মিরপুর-১৩ এলাকার বাসিন্দা রেজওয়ানা ইসলাম বড় হয়েছেন এ এলাকাতেই। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছেন এলাকার নারীরা যথেষ্ট সচেতন এবং তারা নিজেদের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে, এলাকার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রেজওয়ানা এবং তার বান্ধবী ও প্রতিবেশী নারীদের মধ্যে উৎসাহের কমতি নেই।

এই নারী ভোটাররা মনে করেন, বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট নাগরিক সমস্যা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে নতুন জনপ্রতিনিধির প্রধান চ্যালেঞ্জ।

মণিপুর এলাকার বাসিন্দা আঞ্জুমনোয়ারা অনু (৩৫) জানান, একজন নারী হিসেবে এলাকার রাস্তাঘাটে চলাফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব ও একটা অস্বস্তি কাজ করে তার মধ্যে।

গত ২০২৪ সালে দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে আশা করেছিলেন এই গৃহিণী। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বেশ ভেবেচিন্তেই ভোট দেবেন তিনি।

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ‘রোকেয়া সরণি’র দুই পাশের মণিপুর, ৬০ ফুট রোড, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর-১৩ ও কাফরুল নিয়ে ঢাকা-১৫ আসনের দিকে নজর শুধু এ এলাকার ভোটারদের নয়, পুরো দেশবাসীর।

কারণ এ আসন থেকেই নির্বাচন করছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। মূলত তাদের প্রতিশ্রুতির দিকেই তাকিয়ে আছেন এলাকাবাসী।

রেজওয়ানা বলেন, ‘এলাকার প্রধান সমস্যা নিরাপত্তাহীনতা। রাস্তায় বের হলে ছিনতাইয়ের ভয় আছে। ইদানিং ইভটিজিংও বেড়েছে।’

পুরো এলাকায় শিশুদের জন্য কোনো খেলার মাঠ বা পার্ক নেই বলেও জানান তিনি।

আঞ্জুমনোয়ারার অভিযোগ, এলাকায় মাদকের প্রকোপ বেড়েছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা আছে। বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ময়লা পানিতে তলিয়ে যায়। সেসময় মণিপুর স্কুলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এলাকায় পানি সমস্যাও আছে।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘রাস্তায় নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরায় বিভিন্ন ধরনের বাধা আছে। এটা দূর করতে মানুষের রুচি ও মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।’

এই নারী ভোটাররা এমন সরকার ও জনপ্রতিনিধি চান, যারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তবে নারীর নিরাপত্তা এবং শিশুদের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

মূলত বেশকিছু আবাসিক এলাকা নিয়ে গঠিত এ আসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে মনিপুর স্কুল, হারমেন মেইনার স্কুল, হার্ট ফাউন্ডেশন, বিআরটিএ।

ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকার মোট ভোটার ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮, যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৬, নারী ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৮ ও হিজড়া ৪, যা গত নির্বাচনের তুলনায় ৭ হাজার ২১১ জন বেশি।

বৃহস্পতিবার মিরপুর আদর্শ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত জনসভা থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের জনগণ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে।

ঢাকা-১৫ নির্বাচনী এলাকার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখানে তিনটি খাল আছে, যা ময়লার ভাগাড়। নেই কোনো কলেজ বা হাসপাতাল। সন্ত্রাস ও মাদক এ এলাকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গ্যাস ও পানির সংকট আছে।’

জনগণের ভোটে বিজয়ী হলে তিনি জনগণকে সঙ্গে নিয়েই এসব সমস্যা সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দেন।

শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাহমুদ শোয়েব জানান, জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা বাসা-বাড়িতে গিয়ে ভোট চাইছে। আর বিএনপিকর্মীরা রাস্তায় মিছিল করে এবং বিভিন্ন মোড়ে একসঙ্গে অবস্থান করে।

যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জামায়াত অতীতে কখনো এ আসনে ভালো করতে পারেনি। দলটির আমির এ আসনে প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির পক্ষ থেকে বিশেষ নির্বাচনী কৌশল ও প্রচারণার পরিকল্পনা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তবে মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা জানে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ধানের শীষের কোনো বিকল্প নেই।’

এদিকে ভোটারদের কাছে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’ সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়েছেন এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব শাহ আলম তুহিন।

তিনি বলেন, ‘দল-মত নির্বিশেষে মানুষ এখন পরিবর্তন চাচ্ছে। এজন্য তারা জামায়াতকে চাচ্ছে। মনিপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, ইব্রাহিমপুর ও তালতলা এলাকায় আমাদের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি ও জনসমর্থন রয়েছে।’

তবে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বিগত “ফ্যাসিস্ট” সরকারের লোকজনের কাছে এখনো বিপুল অবৈধ অর্থ ও অস্ত্র রয়ে গেছে, যা উদ্ধার করা হয়নি।’

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংঘাত বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসনকে কঠোর নজরদারি চালানোর আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের সঙ্গেও তাদের ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক’ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তুহিন।

মিল্টন অবশ্য ঢাকা-১৫ আসনকে বিএনপির ‘দুর্গ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নিজের স্থানীয় পরিচয়, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলীয় সাংগঠনিক শক্তিই তার জয়ের প্রধান ভিত্তি বলে তিনি মনে করেন।

ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে জামায়াত আমির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত কর্মীরা বাসাবাড়িতে গিয়ে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তোপের মুখে পড়ে ক্ষমাও চেয়েছে।’

এবারের নির্বাচন দীর্ঘ ১৬ বছর পর অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ভয়ভীতি দূরে ঠেলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নিজ কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এ আসনের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন—সিপিবির আহাম্মদ সাজেদুল হক, জাতীয় পার্টির মো. সামসুল হক, বাংলাদেশ জাসদের মো. আশফাকুর রহমান, জনতার দলের খান শোয়েব আমান উল্লাহ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মোবারক হোসেন ও আমজনতার দলের মো. নিলাভ পারভেজ।
 

Related Articles

Latest Articles