-4.6 C
New York

‘শুরুতেই কখনো কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিত নয়’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রাথমিক উত্থান এবং ক্রিকেট কূটনীতির অন্যতম রূপকার হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আশরাফুল হক আসন্ন আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের ছিটকে পড়ার সম্ভাবনায় গভীরভাবে মর্মাহত। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে আইসিসির সঙ্গে আলোচনার অচলাবস্থার কারণে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘ প্রশাসনিক ক্যারিয়ারে যেখানে কাজ করেছেন, সেখানেই রেখেছেন স্থায়ী ছাপ। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে ফোনে দ্য ডেইলি স্টার-এর সাংবাদিক সামসুল আরেফিন খানের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো—

দ্য ডেইলি স্টার: গত কয়েক সপ্তাহে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, আপনি সেগুলোকে কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ আশরাফুল হক: পুরো বিষয়টাই খুব খারাপভাবে সামলানো হয়েছে। খেলাধুলা আর রাজনীতিকে কখনোই একসঙ্গে মেশানো উচিত নয়। আমার মনে হয়, আমরা একটি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আর একটি বিশ্বকাপের পার্থক্যটাই ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি।

ডেইলি স্টার: যেভাবে বিষয়গুলো পরিচালিত হয়েছে, সে বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

আশরাফুল: কৌশলটাই ছিল ভুল। শুরু থেকেই কখনোই কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিত নয়। সব কিছুর মধ্যেই সমঝোতার সুযোগ থাকতে হবে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংলাপের পথ খোলা রাখতে হবে। আশির দশকে যে কোনো সময় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারত। তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক পরিস্থিতি শান্ত করতে জয়পুরে একটি টেস্ট ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে কারগিল সংঘাতের পর পুরো ভারতীয় দল পাকিস্তানে সফর করে। সে সময় দিল্লি থেকে লাহোর যাওয়ার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী দলকে বলেছিলেন, জয়–পরাজয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাকিস্তানের মানুষের হৃদয় জয় করা।

২০০৮ সালে সন্ত্রাসী হামলার সময় আমি এসিসির সিইও হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলাম। পরে আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং বিসিসিআই সভাপতি শশাঙ্ক মনোহরের সঙ্গে কথা বলি। আমরা বলেছিলাম, দুই দেশের মধ্যে এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কখনোই উন্নতি হবে না। তারা দুজনই একমত হন এবং ২০১০ সালে এশিয়া কাপ খেলতে আসেন। এসব বিষয়ে আলোচনা দরকার। এখান থেকে বসে শুধু বলা ‘আমি যাব না’ এভাবে কিছু হয় না।

ডেইলি স্টার: খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে মাত্র গতকাল, এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আশরাফুল: প্রথমত, কঠোর অবস্থানে যাওয়াটাই ছিল আমাদের ভুল। খেলাধুলায় কেন এত কঠোরতা? আমাদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত ছিল। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে আমাদের আইসিসির সঙ্গে যোগাযোগে থাকা দরকার ছিল, কারণ তারাই এই টুর্নামেন্টের মালিক। আইসিসি নিরাপত্তা মূল্যায়ন করেছে, আর তারা যদি বলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঠিক আছে, যেহেতু এটি তাদের টুর্নামেন্ট, তাহলে আমাদের সেটা মেনে নিতে হবে। যদি আমাদের সরকার তা না মানে, তাহলে কূটনৈতিক চ্যানেল তো সবসময় খোলা থাকে। আমাদের বোর্ড সভাপতি খুব সহজেই ভারতীয় বোর্ডকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন, আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত কি না। তিনি কি সেটা করেছেন? অথবা আমাদের সরকার কি ভারত সরকারকে জিজ্ঞেস করেছে, তারা কি হুমকি থেকে আমাদের সুরক্ষা দিতে পারবে? আমরা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি আরএসএস বা শিবসেনার মতো চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে।

ডেইলি স্টার: বিসিবি ও আইসিসির মধ্যে এই অচলাবস্থাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আশরাফুল: আমরা ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপের জন্য একটি অংশগ্রহণ চুক্তিতে সই করেছি। আমরা তাদের (আইসিসির) সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য। যদি আমরা তাদের কথা না মানি, তাহলে সরকারের উচিত ছিল কূটনৈতিক পথে ভারত সরকারকে বিষয়টি জানানো। প্রকাশ্যে চিঠি দিয়ে বিষয়টি তোলা উচিত হয়নি। আমাদের বোর্ডও ভারতীয় বোর্ডকে জিজ্ঞেস করতে পারত, বাংলাদেশ দলের ভারতে যাওয়া ঠিক হবে কি না।

ডেইলি স্টার: বিসিবির ওপর কি জরিমানা বা অন্য কোনো শাস্তি আসতে পারে?

আশরাফুল: সেটা সম্ভব। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, একটি বিশ্বকাপ মিস করা বিশাল ক্ষতি। আমাদের আসল সম্পদ আমাদের ক্রিকেটাররা। লিটন বা মোস্তাফিজের মতো খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপে খেলার গৌরবের জন্য কত পরিশ্রমই না করে।

ডেইলি স্টার: আপনি হলে পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতেন?

আশরাফুল: প্রথমেই আইসিসির সঙ্গে সই করা চুক্তির দায়বদ্ধতা স্বীকার করতাম। যদি তাদের নিরাপত্তা মূল্যায়ন মেনে না নিতাম, তাহলে কূটনৈতিক চ্যানেলে ভারত সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চাইতাম। দু’পক্ষের লাভের জন্য আমি যুক্তি দিতাম, ‘ভারতে বিশ্বকাপে খেলতে মোস্তাফিজ যদি নিরাপদ হয়, তাহলে আইপিএলে খেলতে সে নিরাপদ নয় কেন?’ তখন তারা নিশ্চয়ই হ্যাঁ বলত, আর সেটাই হতো সবার জন্য লাভজনক সমাধান।

ডেইলি স্টার: বিসিবির কি অন্য বোর্ডগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত ছিল?

আশরাফুল: বোর্ডের উচিত ছিল আগেই কথা বলে বিষয়গুলো মিটিয়ে ফেলা, যাতে সরকারকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে না হয়। তাদের ভারতীয় বোর্ড ও আইসিসির সঙ্গে কথা বলা দরকার ছিল। সরাসরি কথা বলতে না পারলে (আমিনুল ইসলাম) বুলবুলের মতো কাউকে ব্যবহার করা যেত। বুলবুল এবং বিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রজার বিনি এসিসিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন। মোস্তাফিজ ইস্যুতে তিনি আলোচনা করতে পারতেন। বুলবুল সরাসরি কথা বলতে না পারলে, রজার তার হয়ে এই বিষয়ে কথা বলতে পারতেন।

ডেইলি স্টার: একজন প্রশাসক হিসেবে বুলবুলকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আশরাফুল: বুলবুলের প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা আছে, কারণ আমরা ১২–১৫ বছর এসিসিতে একসঙ্গে কাজ করেছি। তিনি বিশ্বমানের কোচ এডুকেটর এবং বিশ্বমানের প্রোগ্রাম কন্ডাক্টর, কিন্তু একজন প্রশাসক হিসেবে তার অভিজ্ঞতা খুব বেশি নয়।

ডেইলি স্টার: বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, বাংলাদেশ না খেললে পাকিস্তানও নাকি খেলবে না। তাদের এই সংহতি কি আমাদের কাজে আসবে?

আশরাফুল: পাকিস্তান শতভাগ খেলবে। পাকিস্তান আমাদের সঙ্গে আছে, এটা ভেবে আমাদের কোনো স্বস্তি বা তৃপ্তি পাওয়ার কারণ নেই।

 

Related Articles

Latest Articles