-3 C
New York

রিশাদ ভবিষ্যতের একজন সুপারস্টার: বিলিংস

অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন ক্রিকেটার হওয়া সত্ত্বেও, ইংল্যান্ডের উইকেটরক্ষক-ব্যাটার স্যাম বিলিংসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। এর প্রধান কারণ ছিল একই ভূমিকার জন্য জনি বেয়ারস্টো এবং জস বাটলারের মতো দুই মহাতারকার উপস্থিতি। ইংল্যান্ডের একাদশে অনিশ্চিত জায়গার পেছনে না ছুটে বিলিংস ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন—বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের মাধ্যমে ক্রিকেট উপভোগ করা। ৩৪ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার বর্তমানে চলমান বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) সিলেট টাইটান্সের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বুধবার মিরপুরে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের বিপক্ষে তাদের দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার ম্যাচের আগে বিলিংস ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন।

অনূর্ধ্ব-১৯ সময় থেকে আপনি কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছেন, এমনকি চট্টগ্রামে আপনি আপনার প্রথম ওয়ানডে ফিফটিও করেছেন। এবার এই সফরটি আপনি কতটা উপভোগ করছেন?

স্যাম বিলিংস: আমি এটা ভালোবাসি। যখনই আপনি উপমহাদেশে খেলবেন, ক্রিকেটের প্রতি মানুষের আবেগ লক্ষ্য করার মতো। বাংলাদেশে আমরা যে সমর্থন ও ভালোবাসা পাই তা অসাধারণ—বিমান থেকে নামার পর থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত সেটা অনুভব করা যায়। গত রাতে আমি মঈন এবং ওকসিকে (ক্রিস ওকস) বলছিলাম যে, এখানে আসলে বোঝা যায় কন্ডিশন কতটা কঠিন। গতকালের (মঙ্গলবার) উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য খুব কঠিন ছিল এবং এটি বিশ্বের অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় ক্রিকেটের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধরন। এই চ্যালেঞ্জগুলোই প্রতিবার আপনাকে আরও ভালো খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলে। আমি ঠিক আগেই অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছি, যেখানে কন্ডিশন ছিল একদম আলাদা—গতি, বাউন্স এবং প্রতিপক্ষের ভিন্ন ধরনের দক্ষতা। ৩৪ বছর বয়সেও আমি এখনও শিখছি এবং নিজেকে উন্নত করছি, এই অভিজ্ঞতার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।

মিরপুরের মতো কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়, তবুও আপনি তা বেশ ভালোভাবে করেছেন। ব্যাটিং করতে যাওয়ার সময় আপনার মাথায় কী কাজ করছিল?

বিলিংস: এক পর্যায়ে আমাদের স্কোর ছিল ৪ উইকেটে ৪৪। এটা যদি ৫০ রানে ৫ বা ৬ উইকেট হয়ে যেত, তবে ম্যাচ প্রায় শেষ হয়ে যেত, বিশেষ করে মোস্তাফিজুর রহমান এর মতো কেউ যখন খেলা শেষ করার সুযোগ পায়। তাই উইকেটে টিকে থাকাটা জরুরি ছিল। আজকাল খেলোয়াড় এবং কোচরা স্ট্রাইক রেট নিয়ে একটু বেশিই পড়ে থাকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়টাই আসল। ম্যাচ জেতার জন্য যা প্রয়োজন ছিল, আমাকে নিজের অহং সরিয়ে রেখে সেটাই করতে হয়েছে—সময় নিয়ে ব্যাটিং করা এবং একটি পার্টনারশিপ গড়া। আমরা (বিলিংস ও মিরাজ) পঞ্চাশ রানের জুটি গড়েছিলাম। অবশ্যই আমি ম্যাচটি শেষ করে আসতে এবং দ্রুত রান করতে পছন্দ করতাম, কিন্তু পিচ খুব কঠিন ছিল। আমি কেবল পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী খেলার চেষ্টা করেছি।

শেষ পর্যন্ত ক্রিস ওকস নায়ক হয়ে উঠলেন।

বিলিংস: একদম তাই—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। আমি জানতাম ওকে যদি ওয়াইড বল করা হয় তবে সেটা ছয় হবে, কারণ ওই এলাকায় ও খুব দক্ষ। যদি ওকে মাঠের বড় বাউন্ডারির দিকে মারতে বাধ্য করা হতো, তবে হয়তো সমস্যা হতে পারতো। কিন্তু ও একজন মানসম্পন্ন ক্রিকেটার যে সারা বিশ্বে এমনটা করে দেখিয়েছে। সেটি ছিল অবিশ্বাস্য একটি শট।

বিগ ব্যাশ থেকে এসে বিপিএলে কী ধরনের পরিবর্তন আপনার চোখে পড়েছে?

বিলিংস: এটাই ক্রিকেটের সৌন্দর্য—সব জায়গায় কন্ডিশন বদলে যায়। মিরপুর এবং চট্টগ্রাম সম্পূর্ণ ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়া গতি এবং বাউন্স অফার করে, সেখানে খুব বেশি স্পিন নেই এবং ব্যাটিং সহায়ক উইকেট থাকে। এরপর আপনি মিরপুরে এসে ১১১ রান তাড়া করতে গিয়ে বুঝবেন যে আপনাকে খেলার ধরন বদলে নিতে হবে। ৩০-এর ঘরে এসেও আমি শিখছি। ক্রিকেটের এই দিকটিই আমার ভালো লাগে—ভিন্ন ভিন্ন কন্ডিশনে নিজেকে পরীক্ষা করা এবং বিশ্বজুড়ে ম্যাচ ও টুর্নামেন্ট জেতার পথ খুঁজে বের করা।

বাংলাদেশের লেগ-স্পিনার রিশাদ হোসেন এখন হোবার্ট হারিকেনসের হয়ে খেলছেন এবং আপনি তার বিপক্ষে খেলেছেন। তার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

বিলিংস: রিশাদের সঙ্গে আমার অনেক কথা হয়েছে। পিএসএলে লাহোর কালান্দার্সে থাকাকালীন আমরা ভালো বন্ধু হয়ে উঠি। আমি মনে করি ও ভবিষ্যতের একজন সুপারস্টার। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে লেগ-স্পিন খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং ও অনন্য—ওর রিলিজ পয়েন্ট অনেক উঁচুতে, বেশ জোরে বল করে এবং প্রকৃতপক্ষে ওর লেগ-ব্রেক অনেক টার্ন করে। আজকাল অনেক লেগ-স্পিনার গুগলির ওপর বেশি নির্ভর করে, কিন্তু বল টার্ন করানোর ক্ষমতা ওকে বিশেষ করে তুলেছে। ও সব সময় হাসিখুশি থাকে, কঠোর পরিশ্রম করে এবং আমি ওকে খুব উঁচু মানের খেলোয়াড় মনে করি। আমি চেষ্টা করছি ওকে নিয়ে ইংল্যান্ডে আমার সঙ্গে খেলাতে।

অনেক দিন হলো আপনি ইংল্যান্ডের হয়ে খেলছেন না। জাতীয় দলের হয়ে খেলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কি এখনও আছে?

বিলিংস: না, সেই অধ্যায় শেষ। সেই সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। আমি অনেক ভাগ্যবান যে বিশ্বের সব জায়গায় খেলতে পেরেছি, দলকে নেতৃত্ব দিয়েছি এবং শিরোপা জিতেছি। এখন আমি এগুলোতেই মনোনিবেশ করছি—আরও ট্রফি জেতা। এটা থেকেই আমি অনেক তৃপ্তি ও আনন্দ পাই।

ইংল্যান্ড ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার কোনো আফসোস আছে?

বিলিংস: কঠিন দিকটা ছিল দলের ভেতরে-বাইরে থাকা। জনি বেয়ারস্টো এবং জস বাটলার আমার আগে ছিল—দুই সুপারস্টার—তাই সময়টা আমার পক্ষে ছিল না। আমার একমাত্র আফসোস হলো যখন আমি খেলেছি তখন কেন আরও বেশি উপভোগ করিনি। আমি সব সময় নিজের জায়গা ধরে রাখার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকতাম। তবে আমার কিছু ভালো মুহূর্ত ছিল। মাঝেমধ্যে ভালো পারফর্ম করার পরও সুযোগ আসে না—এটাই ক্রিকেট।

আপনি ইংল্যান্ডের ২০২৩ সালের বাংলাদেশ সফরের চেয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকে বেছে নিয়েছিলেন এবং এরপর আর ডাক পাননি। সেটি কি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল?

বিলিংস: শতভাগ। তারা আমাকে খেলার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি, আর আমি শুধু ক্রিকেট খেলতে এবং তা উপভোগ করতে চেয়েছিলাম। খেলা বদলে গেছে—তৃপ্ত হওয়ার জন্য এখন আর শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রয়োজন নেই। আমি ভিন্ন ভিন্ন দলের অংশ হতে, ভিন্ন পরিবেশে থাকতে এবং টুর্নামেন্ট জিততে ভালোবাসি।

অনবরত ভ্রমণ এবং ল্যান্ড করার পরপরই খেলা—এর সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেন?

বিলিংস: আপনাকে পেশাদার হতে হবে—মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করা, পরিষ্কার গেম প্ল্যান থাকা এবং নিজের খেলা সম্পর্কে ভালোভাবে জানা প্রয়োজন। অন্য কারো মতো খেলার চেষ্টা করবেন না। রিকভারিও খুব জরুরি—জিম করা, মাসাজ, হট ও আইস বাথ এবং ক্রিকেটের বাইরে সময় কাটানো। এই সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, আপনার ফেভারিট কারা?

বিলিংস: নিজেদের মাটিতে ভারত খুব শক্তিশালী হবে। অস্ট্রেলিয়া সব সময়ই দাবিদার। আশা করি ইংল্যান্ডও ভালো করবে—আমাদের সেই প্রতিভা আছে। আদিল রশিদ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিউজিল্যান্ডও সব সময় তাদের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি ভালো খেলে। তবে ভারত ও অস্ট্রেলিয়াকে হারানো খুব কঠিন হবে।

সাম্প্রতিক অ্যাশেজ নিয়ে আপনি কি হতাশ?

বিলিংস: খুব বেশি। পার্থের সেই মাঝের সেশনটি সব বদলে দিয়েছে। ইংল্যান্ড যদি শক্তভাবে ব্যাটিং করতো, তবে আমরা ১-০ তে এগিয়ে যেতে পারতাম এবং সিরিজের চিত্রটা ভিন্ন হতে পারতো। ছোট মুহূর্তগুলো বড় লড়াইয়ের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় এবং সেটি ছিল একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হওয়া।

আপনি কি এখনও ‘বাজবল’ সমর্থন করেন?

বিলিংস: অবশ্যই। এই পরিবর্তনের আগে ইংল্যান্ড কতটা খারাপ অবস্থায় ছিল তা মানুষ ভুলে যায়। বাজ (ব্রেন্ডন ম্যাককালাম) একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান কোচ, আমার কাজ করা অন্যতম সেরা কোচদের একজন। অবশ্যই সময় অনুযায়ী আপনি মানিয়ে নেবেন এবং শিখবেন। এটি একটি ছোটখাটো পরিবর্তনের ভালো সুযোগ, তবে আমার কোনো সন্দেহ নেই যে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে।

 

Related Articles

Latest Articles