ভারত সফরে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে বিরাট কোহলির আকাশে ওঠা ড্রাইভ যখন লং অন বাউন্ডারির ভেতরে দাঁড়িয়ে তালুবন্দি করলেন ড্যারিল মিচেল, ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসও ধরা পড়ল তার হাতে। কোহলি ছিলেন স্বাগতিকদের শেষ ভরসা, অসম্ভব এক রানতাড়া বাঁচানোর একমাত্র বাস্তব পথ। কিন্তু মিচেল ছিলেন অবিচল, ক্যাচও নিলেন, সিরিজও জিতল কিউইরা।
এর আগে ব্যাট হাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের করে নিয়েছিলেন ৩৪ বছর বয়সী এই ডানহাতি। তার নবম ওয়ানডে সেঞ্চুরিতে ভর করেই জয়ের ভিত গড়ে দেয় ব্ল্যাক ক্যাপস। মাত্র ৫৪টি ইনিংসে নয়টি ওয়ানডে শতক পূর্ণ করে ইতিহাসে চতুর্থ দ্রুততম ব্যাটার হিসেবে নাম লেখান মিচেল, তার চেয়ে দ্রুত কেবল ইমাম-উল-হক (৪৮), হাশিম আমলা (৫২) ও কুইন্টন ডি কক (৫৩)।
ভারতে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের সঙ্গে এসেছে আরও এক বিরল কীর্তি। কোহলি খেলেন ১০৮ বলে ১২৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস, তবে দিনটি ছাপিয়ে যান মিচেলই, ১৩১ বলে ১৩৭ রান করে। পুরো তিন ম্যাচে মিচেলের সংগ্রহ ৩৫২ রান; দ্বিতীয় ম্যাচে ১১৭ বলে অপরাজিত ১৩১ রান করে ম্যাচসেরার পুরস্কারও জেতেন তিনি। এমনকি প্রথম ম্যাচে হারের মধ্যেও কিউইদের সর্বোচ্চ স্কোরার ছিলেন মিচেল (৭১ বলে ৮৪)।
তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ৩৫২ রান, নিউজিল্যান্ডের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ। সর্বকালের তালিকায় এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ, বাবর আজম (৩৬০, ২০১৬) ও শুভমান গিলের (৩৬০, ২০২৩) পরেই। টানা দুটি ১৩০-প্লাস ইনিংসে মিচেল নিউজিল্যান্ডের ওয়ানডে ইতিহাসে মার্টিন গাপটিলের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ (চারটি) এমন কীর্তির মালিক হলেন।
এই দুর্দান্ত ফর্মের পুরস্কার মিলেছে আইসিসি র্যাঙ্কিংয়েও। সর্বশেষ হালনাগাদে ৮৪৫ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে ওয়ানডে ব্যাটিংয়ের এক নম্বরে উঠে এসেছেন ড্যারিল মিচেল। ৭৯৫ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে নেমেছেন বিরাট কোহলি। পেছনে থাকা ইব্রাহিম জাদরান, রোহিত শর্মা, শুভমান গিল ও বাবর আজমদের থেকে স্পষ্ট ব্যবধান গড়ে নিয়েছেন এই দুজন। মিচেলের ক্যারিয়ারে এটি দ্বিতীয়বার ওয়ানডে ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওঠা; আগেরবার অবশ্য তিন দিনের মধ্যেই তাকে টপকে যান রোহিত।
ভারতে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সেঞ্চুরির দিক থেকেও মিচেলের নাম উঠে এসেছে বিশেষ তালিকায়, এমন কীর্তিতে তার চেয়ে এগিয়ে কেবল এবি ডি ভিলিয়ার্স (৫টি), মিচেলের ঝুলিতে এখন ৪টি। আরও বিস্ময়কর হলো, ৫৪টি ওয়ানডে ইনিংস খেলে এখনো কোনোবার শূন্য রানে আউট হননি তিনি, এটি সর্বকালের দ্বিতীয় দীর্ঘতম ধারা; কেবল কেপলার ওয়েসেলস (১০৫ ইনিংস) এগিয়ে।
মিচেলের উত্থান তাই আরও অনন্য। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার আবির্ভাবই দেরিতে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ২৮ বছর বয়সে ভারতের বিপক্ষে ওয়েলিংটনে। টেস্ট অভিষেক সেই বছরই, বয়স ২৯। আর ওয়ানডে খেলতে শুরু করেন ৩০ বছর বয়সে। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুই শতাধিক ম্যাচ খেলে, অস্ট্রেলিয়ায় পার্থে সময় কাটিয়ে অ্যান্ড্রু টাই, মার্কাস হ্যারিস, মার্কাস স্টয়নিসদের সঙ্গে খেলেই গড়ে উঠেছে তার ভিত। অধ্যবসায় আর ধারাবাহিকতার এই যাত্রাই তাকে আজ বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটারদের একজন বানিয়েছে।
ব্যাটিংয়ে মিচেল ও কোহলির পেছনে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন আফগানিস্তানের ইব্রাহিম জাদরান (৭৬৪), চতুর্থ রোহিত শর্মা (৭৫৭)। ইন্দোরে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে গ্লেন ফিলিপসের সঙ্গে ২১৯ রানের জুটিতে নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পার্টনারশিপ গড়েন মিচেল। ৮৮ বলে ১০৬ রান করা ফিলিপস ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়ে ১৬ ধাপ এগিয়ে ২০ নম্বরে, আর অলরাউন্ডার তালিকায় ১৪ ধাপ এগিয়ে যৌথ ৩১ নম্বরে উঠেছেন, যেখানে শীর্ষে আছেন আজমতুল্লাহ ওমরজাই।
বোলিং র্যাঙ্কিংয়ে মাইকেল ব্রেসওয়েল ছয় ধাপ এগিয়ে ৩৩ নম্বরে উঠেছেন। শীর্ষে অপরিবর্তিত রশিদ খান (৭১০), তার পেছনে জোফরা আর্চার (৬৭০)। টি-টোয়েন্টিতে রশিদ দুই ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয়, মুজিব উর রহমান যৌথ ১৪ নম্বরে এবং ইব্রাহিম জাদরান পাঁচ ধাপ এগিয়ে ১৫ নম্বরে উঠেছেন।
