-3 C
New York

এয়ারফোর্স ওয়ান কী, একে ‘উড়ন্ত হোয়াইট হাউস’ বলা হয় কেন?

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাকে বহনকারী উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটি ম্যারিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ফিরে গেছে।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এই ত্রুটিকে ‘সামান্য বৈদ্যুতিক গোলযোগ’ দাবি করলেও এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হোয়াইট হাউসের এক সংবাদদাতা জানান, উড্ডয়নের পর এয়ারফোর্স ওয়ানের প্রেস কেবিনের আলো কিছু সময়ের জন্য জ্বলে আবার নিভে যায়। সেসময় এ ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

এখন বিষয়টি নিয়ে চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা। কেননা এয়ারফোর্স ওয়ানকে ‘উড়ন্ত হোয়াইট হাউস’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, যা অত্যাধুনিক যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রেসিডেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সমাহার নিয়ে গঠিত এবং আকাশ থেকে সরকারি কাজ পরিচালনা করতে সক্ষম। 

হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে যেকোনো মুহূর্তে বিশ্বের যেকোনো স্থানে ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। সৌভাগ্যক্রমে আধুনিক প্রেসিডেন্টদের হাতে রয়েছে নানা ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা—এরমধ্যে অন্যতম হলো এয়ারফোর্স ওয়ানে ভ্রমণ।

প্রযুক্তিগতভাবে ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ বলতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমান বাহিনীর যেকোনো উড়োজাহাজকে বোঝায়। তবে বর্তমানে এই নামটি সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু উড়োজাহাজের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়, যেগুলো বিশেষভাবে সর্বাধিনায়ককে পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

বর্তমানে এয়ারফোর্স ওয়ান বলতে বোঝায় অত্যন্ত বিশেষায়িত বোয়িং ৭৪৭-২০০বি সিরিজের দুটি উড়োজাহাজকে। এগুলোর লেজের কোড নম্বর যথাক্রমে ২৮০০০ ও ২৯০০০। বিমান বাহিনীর শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এসব উড়োজাহাজের নাম ভিসি-২৫এ।

এয়ারফোর্স ওয়ান প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি। শুধু মার্কিন সংস্কৃতিতেই নয়, বিশ্বজুড়েই এটি অসংখ্য উদাহরণ ও প্রতীকের জন্ম দিয়েছে। উড়োজাহাজের গায়ে বড় করে লেখা থাকে ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’, সঙ্গে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ও প্রেসিডেন্টের সিল—যার ফলে এটি যেখানেই উড়ে যায়, সেখানেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

আকাশেই জ্বালানি ভরার সক্ষমতার কারণে এয়ারফোর্স ওয়ানের পাল্লা কার্যত সীমাহীন। প্রেসিডেন্টের যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই তাকে নিয়ে যেতে পারে এই উড়োজাহাজ। এতে থাকা ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালসের মতো আক্রমণ থেকেও সুরক্ষিত। উন্নত ও সুরক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে হামলার মতো পরিস্থিতিতে এয়ারফোর্স ওয়ান একটি ভ্রাম্যমাণ কমান্ড সেন্টার হিসেবেও কাজ করতে পারে।

উড়োজাহাজের ভেতরে তিনটি স্তরে প্রায় ৪ হাজার বর্গফুট জায়গা রয়েছে। এরমধ্যে প্রেসিডেন্টের জন্য রয়েছে আলাদা একটি বড় স্যুট—যেখানে অফিস, টয়লেট ও সম্মেলন কক্ষ আছে। এয়ারফোর্স ওয়ানে একটি মেডিকেল স্যুটও রয়েছে, যা প্রয়োজনে অপারেশন থিয়েটার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একজন চিকিৎসক সবসময় বিমানে উপস্থিত থাকেন। উড়োজাহাজের দুটি রান্নাঘর একসঙ্গে ১০০ জনের খাবার প্রস্তুত করতে সক্ষম।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকা ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা, সিক্রেট সার্ভিস সদস্য, সফরসঙ্গী সাংবাদিক ও অন্যান্য অতিথিদের জন্যও বিমানে আলাদা থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণত এয়ারফোর্স ওয়ানের আগেই একাধিক কার্গো উড়োজাহাজ উড়ে যায়, যাতে দূরবর্তী এলাকায় প্রেসিডেন্টের প্রয়োজনীয় যানবাহন ও সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া যায়।

এয়ারফোর্স ওয়ানের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে প্রেসিডেনশিয়াল এয়ারলিফট গ্রুপ, যা হোয়াইট হাউস মিলিটারি অফিসের একটি অংশ। এই গ্রুপের সূচনা হয় ১৯৪৪ সালে, তখন এর নাম ছিল প্রেসিডেনশিয়াল পাইলট অফিস—যা গঠন করা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের নির্দেশে। পরবর্তী ১৫ বছর বিভিন্ন প্রপেলারচালিত বিমান প্রেসিডেন্টদের পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। এরপর ১৯৫৯ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট ডেভিড আইজেনহাওয়ার ইউরোপ সফরে যান ভিসি-১৩৭এ নামের একটি বোয়িং ৭০৭ স্ট্রাটোলাইনারে।

১৯৬২ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিশেষভাবে প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য নির্মিত জেট বিমানে ভ্রমণ করেন—যা ছিল পরিবর্তিত একটি বোয়িং ৭০৭ মডেলের উড়োজাহাজ। পরবর্তী বছরগুলোতে আরও কয়েকটি জেট বিমান ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত উড়োজাহাজের প্রথমটি সরবরাহ করা হয় ১৯৯০ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের শাসনামলে।

ঠিকাদার: বোয়িং
প্রথম উড্ডয়ন: ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ (ভিসি-২৫এ)
হস্তান্তর: আগস্ট–ডিসেম্বর ১৯৯০
আইওসি (ইনিশিয়াল অপারেশনাল ক্যাপাসিটি): ৮ ডিসেম্বর ১৯৯০; পরিকল্পিত ২০২৪ (ভিসি-২৫বি)
উৎপাদন: দুটি ভিসি-২৫এ; দুটি ভিসি-২৫বি (পরিবর্তন প্রক্রিয়াধীন)
মজুৎ: দুটি (ভিসি-২৫এ)
পরিচালক: এয়ার মোবিলিটি কমান্ড (এএমসি)
উড়োজাহাজের অবস্থান: জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ, ম্যারিল্যান্ড।
সক্রিয় ভ্যারিয়েন্ট: ভিসি-২৫এ হলো বোয়িং ৭৪৭-২০০বি–এর বিশেষভাবে পরিবর্তন করা প্রেসিডেন্সিয়াল সাপোর্ট সংস্করণ। ভিসি-২৫বি হলো বোয়িং ৭৪৭-৮ ইন্টারকন্টিনেন্টাল–ভিত্তিক পরবর্তী প্রজন্মের প্রেসিডেন্সিয়াল উড়োজাহাজ।
মাত্রা: ভিসি-২৫এ-এর ডানার বিস্তার ১৯৫.৮ ফুট, দৈর্ঘ্য ২৩১.৮ ফুট ও  উচ্চতা ৬৩.৪ ফুট এবং ভিসি-২৫বি-এর ডানার বিস্তার ২২৪.৫ ফুট, দৈর্ঘ্য ২৫০.২ ফুট ও উচ্চতা ৬৩.৪ ফুট।
ওজন: ভিসি-২৫এ-এর সর্বোচ্চ টেক-অফ ওজন ৮৩৩,০০০ পাউন্ড এবং ভিসি-২৫বি-এর সর্বোচ্চ টেক-অফ ওজন ৯৮৭,০০০ পাউন্ড।
ইঞ্জিন: ভিসি-২৫এ-এ রয়েছে চারটি জিই এভিয়েশন সিএফ৬-৮০সি২বি১ টার্বোফ্যান ইঞ্জিন, প্রতিটি ৫৬,৭০০ পাউন্ড থ্রাস্ট এবং ভিসি-২৫বি-এ রয়েছে চারটি জিই এভিয়েশন জিইএনএক্স-২বি টার্বোফ্যান ইঞ্জিন, প্রতিটি ৬৬,৫০০ পাউন্ড থ্রাস্ট।
কর্মক্ষমতা: ভিসি-২৫এ-এর গতি ৬৩০ মাইল/ঘণ্টা, পাল্লা ৭,৮০০ মাইল (আকাশে জ্বালানি নিলে আরও বেশি) এবং ভিসি-২৫বি-এর গতি ৬৬০ মাইল/ঘণ্টা, পাল্লা ৮,৯০০ মাইল।
সর্বোচ্চ উচ্চতা: ৪৫,১০০ ফুট।
ক্রু: দুজন পাইলট, নেভিগেটর, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার এবং সর্বোচ্চ ২২ জন কেবিন ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী।
যাত্রী ধারণক্ষমতা: ভিসি-২৫এ-তে সর্বোচ্চ ১০২ জন। তবে ভিসি-২৫বি-এর যাত্রী ধারণক্ষমতা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

 

Related Articles

Latest Articles