-6.2 C
New York

মুন্সীগঞ্জের সবুজ শেখ নাম পাল্টে হয়ে যান ‘সম্রাট’ 

ঢাকার সাভারে ভবঘুরে ছদ্মবেশে সাত মাসে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার মশিউর রহমান সম্রাটের আসল নাম সবুজ শেখ। তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলায়। সেখানে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবেশীর নামের সঙ্গে মিল থাকায় সবুজ তার নাম পাল্টে ফেলেন।

সাভার থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, মশিউর রহমান সম্রাটের আসল নাম সবুজ শেখ। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা এলাকার পান্না শেখের ছেলে। 

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তার জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাই করে তার পরিচয় পাওয়া যায়নি। তার নামে আগে কোনো মামলা রয়েছে কি না, তাও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারণ তিনি কখনো টাইগার সম্রাট, মশিউর রহমান সম্রাট ছাড়াও বিভিন্ন ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।’

পুলিশকে ফোন

সাভার থানা এলাকায় সম্রাটকে সবাই পাগল হিসেবেই চিনতেন। সম্রাট বিভিন্ন সময় থানা পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সদস্যদের মুঠোফোনে ‘অকারণে’ ফোন করতেন বলে জানিয়েছেন মো. হেলাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পরি। আমরা একপর্যায়ে সম্রাটকে টার্গেট করি। কিন্তু সম্রাট এসব অপরাধ করতে পারে, এমনটা প্রমাণ করা কঠিন। কারণ তাকে মানুষ পাগল হিসেবে জানে। পাগলকে অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করা কঠিন।’

হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সম্রাট বিভিন্ন সময় আমাকেসহ থানার বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সদস্যকে অকারণে ফোন করতেন। সর্বশেষ পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারে দুইজনকে পুড়িয়ে হত্যার একদিন আগে (১৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় সম্রাট আমাকে কল করে দুটি লাশ উদ্ধার করতে বলেন। আমি তাকে বকাবকি করে কল কেটে দিই।’

সন্দেহ হলে এই কর্মকর্তা ফোর্স নিয়ে সেদিন ওই কমিউনিটি সেন্টারে যান। তিনি বলেন, ‘দেখি দ্বিতীয় একজন নারী (অটিজম আক্রান্ত তানিয়া আক্তার যাকে হত্যা করা হয়েছে) শুয়ে আছেন। একটু দূরে সম্রাট ঘোরাঘুরি করছেন। পরে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। পরে সম্রাটের ব্যাগ সার্চ করি।’ 

‘সেখানে শেরেবাংলা নগর থানা ও সাভার মডেল থানার অফিসারদের নামের মোবাইল নম্বরসহ দুই পৃথক তালিকা পাই। পরে উপস্থিত একজন পুলিশ সদস্য সেগুলো রাগ করে ছিঁড়ে ফেলেন। প্রায় রাত ৩টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে চলে আসি।’ 

মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এক দিন পর যখন দুইজনের পোড়া মরদেহের খবর পাই, তখন আমি সেখানে যাই। এরপর ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে সাভার কলেজে যাই। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সম্রাটের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার পর তাকে আটক করা হয়।’

জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার, হত্যার মোটিভ অজানা

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, সম্রাটকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি একে একে ছয়জনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি (সম্রাট) হত্যা বলেন না। প্রতিটি হত্যাকে বলেন—থার্টি ফোর। স্বীকার করে বলেছেন, ছয়জনকে ‘থার্টি ফোর’ করেছি।

২০২৫ সালের ৪ জুলাই থেকে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা পৃথক পাঁচটি মামলার কপি হাতে পেয়েছে দ্য ডেইলি স্টার। মামলার কপিগুলো বিশ্লেষণ করে ভুক্তভোগীদের পরিচয় জানা না গেলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে ভুক্তভোগীদের মধ্যে দুই জন পুরুষ, তিন জন নারী। বাকি এক জনের লিঙ্গ পরিচয় এখনো জানা যায়নি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বা প্রকৃত কারণ জানতে পারিনি। কিন্তু এটা নিশ্চিত হয়েছি, যাদের হত্যা করা হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই ভবঘুরে কিংবা পাগল শ্রেণীর। যারা মূলত রাস্তায় রাত্রিযাপন করেন।’

‘সম্রাট প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমাদের জানিয়েছেন, ওর এলাকায় পাগল শ্রেণীর কাওকেই রাখবেন না। এ লক্ষ্যেই হত্যাকাণ্ডগুলো করেছে। আমরা বিষয়টি আমলে নিইনি। তবে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। ছয়টি হত্যাকাণ্ডই তিনি ঘটিয়েছেন। আদালতের সেই কপি হাতে পেলে বোঝা যাবে আসলে কী কারণে হত্যা করেছেন।’

দুই পোড়া লাশের পরিচয় শনাক্ত, মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর 

সর্বশেষ দুইজনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ভুক্তভোগীদের একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তার নাম তানিয়া আক্তার (২৫)। তিনি রাজধানীর উত্তরার মৃত জসিম মিয়ার মেয়ে। তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘অনলাইনে ছবি-ভিডিও দেখে তানিয়ার মা জুলেখা বেগম থানায় এসেছিলেন। পরে তার সঙ্গে থাকা নথি ও তথ্য যাচাই করে আমার নিশ্চিত হই, তানিয়া তার মেয়ে। তাই ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

তানিয়া সম্পর্কে আমরা জেনেছি, মূলত তানিয়া অটিজম আক্রান্ত ও মানুষিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। গত ১ জানুয়ারি উত্তরার বাসা থেকে নিখোঁজ হন।

প্রতিবেশীর নামের সঙ্গে মিল থাকায় নিজের নাম পাল্টান সম্রাট, জানান মা

সবুজ শেখ বা সম্রাটের জন্মস্থান ও পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা গ্রামে। তিন ভাই ও চার বোনের এই পরিবারে সবুজ দ্বিতীয়।

মা মমতাজ বেগম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সবুজ বাড়িতে খুব একটা আসে না। অনেক বছর পরে গত এক মাস আগে একবার বাড়িতে এসেছিল। আমার সাথে কথাবার্তা বলে না। নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলে। সে সবাইকে গালাগালি করে। সে আগে মাদরাসায় পড়তো। পড়া ছেড়ে দেয়।’  

তিনি বলেন, ‘সবুজ তার বাবার নামেই পদ্মা থানায় অকারণে মামলা করেছিল। সে বিয়ে করার পর থেকে আরও বেশি পাগল হয়ে যায়। অনেক বছর আগেই ওর স্ত্রী ওকে ছেড়ে চলে যায়। ওর এক সন্তান আছে। সবুজ কয়েকজনকে হত্যা করেছে এমন খবর আজ জানতে পেরেছি। সে আমাদের পরিচয় দিতো না। সে বলতো আমরা নাকি তার সৎ মা-বাবা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাকে সবুজ শেখ নাম দিয়েছিলাম। কিন্তু, প্রতিবেশী এক ছেলের নামও সবুজ ছিল বলে সে তার নাম পাল্টে সম্রাট রাখে।’

সবুজ বা সম্রাটের ছোট ভাই জীবন শেখ বলেন, ‘ভাই মাদরাসার পড়া বাদ দিয়ে বন্ধুদের সাথে ঘোরাফেরা শুরু করে। পরে সে নানারকম পাগলামি শুরু করে। একে তাকে গালাগালি করে। বাড়ি ছেড়ে এখানে সেখানে চলে যায়। প্রায় দুই বছর পর গত একমাস আগে বাড়িতে এসেছিল। তবে একদিনও বাড়িতে থাকে নাই। এর আগে তাকে রিহ্যাবে দেওয়া হয়েছিল। কেরানীগঞ্জে দিনের আলো রিহ্যাবে দেওয়া হয়েছিল। এর আগে কিছুদিন জেলখানায় ছিল।’

স্থানীয় হলদিয়া ইউনিয়নের মেম্বার সোহেল খান বলেন, ‘তাকে আগে মাঝেমধ্যে স্থানীয় বাজারে হাঁটতে দেখতাম। কয়েক বছর আগে এক অটোরিকশা চালককে মারধরের বিষয়ে তাকে নিয়ে বিচার-সালিশ হয়। এলাকায় তিনি থাকেন না। নিজ এলাকায় তার কোনো অপরাধের কথা আমরা জানি না। তবে, মুন্সীগঞ্জের বাইরে নানা অপরাধে তিনি কয়েকবার জেল খেটেছেন বলে শুনেছি।’

স্থানীয় অনেকেই জানান, সম্রাট মাদকাসক্ত ছিলেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার ও কাশিমপুর কারাগারে থাকার কথা অনেকে শুনেছেন বলে জানান।

লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, লৌহজং থানায় তার নামে কোনো মামলা নেই। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না।

Related Articles

Latest Articles