দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে চার ডজনের বেশি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে না সরায় জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে দলটি।
দলীয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ও বহিষ্কারের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে যারা এখনও নির্বাচনে রয়েছেন, তাদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপির শীর্ষ মহল। আজ মঙ্গলবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন।
দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে ৪৫টির বেশি আসনে ৯১ জন বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থী সক্রিয় আছেন।
দলীয় টিকিট না পাওয়ায় অনেক সাবেক ও বর্তমান স্থানীয় নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে স্থানীয় ইউনিটগুলোতে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে নির্বাচনী সমন্বয়ও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী ও দলীয় পদে থাকা যারা নির্বাচনে ছিলেন, তারা যেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান, আমরা সেই চেষ্টা করেছি। অনেকে সরে গেছেন, আবার অনেকে দলীয় নির্দেশ অমান্য করায় বহিষ্কৃত হয়েছেন। আমরা আমাদের জোটসঙ্গীদের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি অবশ্যই রক্ষা করব।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ ও ৬, সুনামগঞ্জ-৫, বরিশাল-৩, ভোলা-১ এবং রাজশাহী-৬ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা এসেছে।
এদিকে, জোটের আসন ভাগাভাগির চুক্তির আওতায় যেসব আসন মিত্র দলগুলোকে দেওয়া হয়েছে, সেসব আসনের অন্তত ছয়টিতে এখনও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে আছেন।
জোটসঙ্গীদের জন্য বরাদ্দ আসনে বিএনপি নেতাদের প্রার্থী হওয়ায় জোটের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এতে ভোট বিভাজন এবং সম্ভাব্য পরাজয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।
গণঅধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তিনি বলেন, একই আসনে একজন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচন করছেন। তাকে গুলশান কার্যালয়ে আসতে বলা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বিষয়টি অত্যন্ত অনভিপ্রেত।
বিএনপি কঠোরভাবে বিষয়টি সমাধান করবে বলে আশাবাদ জানান তিনি।
জোটের নেতারাও ব্যক্তিগতভাবে বিএনপিকে অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সেটি বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কয়েকজন জোট নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, বিএনপি আদৌ তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারছে কি না। এ বিষয়ে শীর্ষ নেতারাও উদ্বেগের কথা স্বীকার করলেও বলছেন, সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান করা কঠিন।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের (বিজেডি) চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে প্রার্থী হয়ে তিনি বলেন, আমি অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছি। অনেক কমিটি আমার সঙ্গে কাজ করছে না। এসব সমস্যা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আগেই সমাধান করা উচিত ছিল।
ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদও নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন। নড়াইল-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। তার আসনেও একজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন।
বিষয়টিকে তিনি ‘দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করে বলেন, শুধু ধানের শীষ প্রতীক ব্যবহার করলেই হবে না। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচিত ছিল আমার সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থীর একটি সমঝোতা করানো। দলকে আরও কঠোর হতে হতো।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেও জোটসঙ্গীদের জন্য বরাদ্দ কিছু আসনে এখনও তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বহিষ্কৃত নেতা সাইফুল আলম নীরব এখনও ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচন করছেন। ওই আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি। সেখানে জোটসঙ্গী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রার্থী।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা কামরুজ্জামান রতন দলীয় প্রার্থী হলেও জেলা বিএনপির সদস্য-সচিব মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন শেখ মো. আব্দুল্লাহ। তবে জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোমিন আলী এবং কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মীর শরাফত আলী—এই দুই বিদ্রোহী প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন।
পটুয়াখালী-৩ আসনে জোট চুক্তি অনুযায়ী বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি। সেখানে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক প্রার্থী হলেও একজন বিএনপি বিদ্রোহী এখনও নির্বাচনে আছেন।
এ ছাড়া, চট্টগ্রাম-১৪ ও ১৬, সিলেট-৫, নাটোর-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ ও ২, ময়মনসিংহ-১, ৩, ৬, ৭, ৯, ১০ ও ১১, জয়পুরহাট-২, মাদারীপুর-১, হবিগঞ্জ-১, নারায়ণগঞ্জ-২, ৩ ও ৪, গোপালগঞ্জ-২, বাগেরহাট-২, ঝালকাঠি-১, চাঁদপুর-২, টাঙ্গাইল-১ ও ২ সহ আরও কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দলীয় প্রার্থী বা সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় অন্তত ১০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তবে তাদের অধিকাংশই এখনও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশ দিয়েছে, দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করতে এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রচারণা থেকে দূরে থাকতে।
পটুয়াখালী-৩ আসনে তৃণমূল নেতাদের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে দেখা যাওয়ায় গত শনিবার সেখানে দুটি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।
এদিকে, বিএনপির তিনজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় ওই আসনগুলোতে দলটির আর কোনো বিকল্প প্রার্থী থাকছে না, যা নির্বাচনী প্রস্তুতিতে আরেকটি বড় ধাক্কা।
মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আপিল ও রিট আবেদন করে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। আইনি দলগুলো মামলার অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
নেতারা আশঙ্কা করছেন, রায় পক্ষে না এলে কিছু অঞ্চলে বিএনপির নির্বাচনী অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
