উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যাদের আলাদা করে কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না। নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে একটি সময়, আবহ ও অনুভূতি ভেসে ওঠে।
কে এল সায়গল তেমনই একটি নাম।
অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি বা সুরকারই নন, নিজেই একটি সাংস্কৃতিক মহাদেশ। এই দুই মহীরুহের মিলনস্থলেই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত কিন্তু গভীর সম্পর্ক—সায়গলের রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের সায়গল।
১৯০৪ সালের ১১ এপ্রিল জম্মুতে জন্ম নেওয়া কুন্দনলাল সায়গল পরবর্তীতে ভারতীয় সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতের প্রথম ‘সুপারস্টার’ হয়ে ওঠেন। আজকের দিনে ‘প্লেব্যাক সিংগার’ শব্দটা যত পরিচিত, সায়গলের সময় তা ছিলো না।
তিনি নিজেই গান গাইতেন, নিজেই অভিনয় করতেন। তার কণ্ঠের ভাঙাচোরা আবেগ, গভীর বিষণ্নতা আর স্বাভাবিক মানবিক আর্তি—শ্রোতাকে সহজেই টেনে নিত।
হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যালের ছাপ থাকা গজল, ভজন কিংবা চলচ্চিত্রের গান—সব ক্ষেত্রেই সায়গলের উপস্থিতি ছিলো অনন্য। তবুও রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে তার যোগাযোগের অধ্যায়টি প্রায়শই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
রবীন্দ্রনাথের গান—জীবনদর্শন, প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি ও আত্মজিজ্ঞাসার এক বিস্তৃত ভাণ্ডার। প্রায় দুই হাজার গানের এই ভুবন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
রবীন্দ্রসংগীতের নিজস্ব রীতি, উচ্চারণ, তাল ও আবেগ রয়েছে। এই কারণেই একসময় ধারণা ছিলো—রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া মানেই বাঙালি হওয়া চাই, অথবা অন্তত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর চর্চা থাকা চাই।
এই প্রেক্ষাপটে একজন হিন্দিভাষী শিল্পীর রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া ছিলো সাহসী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
সায়গল রবীন্দ্রনাথকে কবিতা ছাপিয়ে একজন সুরকার ও মানবিক অনুভূতির শিল্পী হিসেবে আবিষ্কার করেছিলেন। তার কাছে রবীন্দ্রনাথের মানে ছিলো গভীর আবেগের ভাষা। কলকাতায় থাকার সময় তিনি নিয়মিত রবীন্দ্রসংগীত শুনতেন, গানের কথা বোঝার চেষ্টা করতেন এবং নিজে নিজে তা গাওয়ার অনুশীলন করতেন।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর ভেতর আছে—’আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান’, ‘যখন রবো না আমি’, ‘আমার রাত পোহালো’।
এই গানগুলো রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শক্তিশালী সৃষ্টি—একাকিত্ব, প্রেম আর অনুরাগের নিবিড় ডাক। সায়গলের কণ্ঠে এই গানগুলো নতুন এক মাত্রা পায়। সেখানে ছিলো না রবীন্দ্রসংগীতের প্রচলিত মৃদু সৌম্যতা। ছিলো বিষণ্ন অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
এই গানগুলোতে সায়গল রবীন্দ্রনাথকে নিজের মতো করে গেয়েছেন—একজন মানুষের অন্তরের আর্তি হিসেবে।
সংগীত ইতিহাসে বহুল আলোচিত একটি তথ্য হলো—সায়গল রবীন্দ্রনাথের অনুমতি নিয়েই রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করেছিলেন। সে সময় রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে অনুমতির প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলো বলে ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ নিজে গান ও সুরের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। গানের বিকৃতি নিয়েও থাকতেন উদ্বিগ্ন।
সায়গলের কণ্ঠ শুনে রবীন্দ্রনাথ সন্তুষ্ট ছিলেন—এমন কথা সংগীতজগতের নানা আলোচনায় উঠে এসেছে।
রবীন্দ্রনাথের গান একজন অবাঙালি শিল্পীর কণ্ঠে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠায় ছিলো যুগান্তকারী।
সায়গলের রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি স্বরলিপি নিখুঁতভাবে অনুসরণ করতে চাননি। বরং তিনি গানের আবেগকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করতে চেয়েছেন।
কোথাও কোথাও উচ্চারণে ঘাটতি ছিলো, কোথাও তাল ভেঙেছে—কিন্তু তার বদলে পাওয়া গেছে এক অদ্ভুত আন্তরিকতা।
এই জায়গাতেই রবীন্দ্রনাথের সায়গল আলাদা। রবীন্দ্রসংগীতের শুদ্ধতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে সায়গল নিখুঁত নন। কিন্তু মানবিক আবেগের বিচারে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী।
সায়গলের রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া শুধুই ব্যক্তিগত অনুরাগের প্রকাশ ছিলো না। এটি ছিলো বাংলা ও হিন্দি সাংস্কৃতিক জগতের মধ্যে এক ধরনের সেতুবন্ধন। তার মাধ্যমে অবাঙালি শ্রোতারাও রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।
যে রবীন্দ্রনাথ অনেকের কাছে ‘কঠিন’ বা ‘অতিবুদ্ধিদীপ্ত’ মনে হতো, সায়গলের কণ্ঠে তিনি হয়ে উঠলেন অনুভবযোগ্য, ব্যক্তিগত ও মানবিক। তার কণ্ঠের ভার, টান আর একধরনের বিষণ্নতা রবীন্দ্রনাথের গানকে নতুন শ্রোতার কাছে সহজ করে তোলে।
ত্রিশের দশকের কলকাতা ছিলো এক সাংস্কৃতিক চৌরাস্তা—থিয়েটার, সাহিত্যসভা, গ্রামোফোন আর চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা যেখানে একসঙ্গে বিকশিত হচ্ছিল।
এই শহরেই সায়গল প্রথম গভীরভাবে বাংলা সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসেন। বাংলা তার মাতৃভাষা না হলেও, তিনি শব্দের অর্থ ও অনুভূতিটুকু ধরার চেষ্টা করেছেন—এটাই ছিলো তার শক্তি।
স্বাভাবিকভাবেই সায়গলের রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া নিয়ে হালকা বিতর্ক ছিলো। কেউ কেউ মনে করেছেন, রবীন্দ্রসংগীতের নির্দিষ্ট রীতিনীতি তিনি পুরোপুরি মানেননি। আবার অন্য একটি পক্ষ বলেছে—রবীন্দ্রনাথ নিজেই তো গানের ভেতর স্বাধীনতার কথা বলেছেন, অনুভূতির প্রাধান্য দিয়েছেন। সেই জায়গা থেকে দেখলে সায়গলের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতকে কোনোভাবেই দুর্বল বলা যায় না।
এই দ্বন্দ্বই আসলে সায়গলের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। তিনি দেখিয়ে দেন, রবীন্দ্রসংগীত কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘরানার সম্পত্তি নয়, বরং এটি এক জীবন্ত সংগীতভাষা।
তার গানে যেমন নিয়ম আছে, তেমনি আছে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার জায়গাও। সায়গল সেই জায়গাটিতেই দাঁড়িয়েছিলেন।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন—রবীন্দ্রসংগীতকে ভালোবাসতে হলে আগে তার অনুভূতিটুকু ধরতে হয়। উচ্চারণ বা তাল সেখানে দ্বিতীয় ধাপ। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে রবীন্দ্রসংগীতের গ্রহণযোগ্যতার পরিসর আরও প্রসারিত করেছে।
সায়গলের কণ্ঠে একটি স্থায়ী বিষণ্নতার ছায়া ছিলো, ছিলো ন্যাচারাল প্যাথোস। ব্যক্তিজীবনের নানা টানাপোড়েন, একাকিত্ব ও আত্মসংঘাত তার গানে অজান্তেই ঢুকে পড়ত।
রবীন্দ্রনাথের অনেক গানের মধ্যেও তো আছে নিঃসঙ্গতা, আত্মসংলাপ, নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। এই জায়গাতেই দুই শিল্পীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রসংগীত সায়গলের কণ্ঠে তাই কেবল গান নয়, হয়ে ওঠে অনুরাগ ও ভালোবাসার দর্শন।
সায়গলের রবীন্দ্রসংগীতের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তিনি নিয়মিতভাবে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার কোনো প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন না। আবার নিজেকে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠাও করতে চাননি।
তার গাওয়া কয়েকটি গান—বিশেষ করে ‘একলা চলো রে’ মূলত আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। এই সীমিত সংখ্যাই আসলে বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। কারণ, এখানে পরিমাণ নয়, গুরুত্বই মুখ্য।
সেই সময়ের রেকর্ডিং প্রযুক্তিও ছিলো কঠোর ও নির্দয়। একটানা গেয়ে শেষ করতে হতো গান। ভুল সংশোধনেরও সুযোগ ছিলো না। ফলে সায়গলের কণ্ঠে যে মানবিক অসম্পূর্ণতা শোনা যায়, সেটিই হয়ে ওঠে তার গানের স্বাক্ষর।
রবীন্দ্রসংগীতে এই অপরিশীলিত সততাই অনেকের কাছে নতুন এক অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
সায়গলের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত পৌঁছেছিলো এমন এক শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে, যারা আগে রবীন্দ্রনাথকে খুব একটা জানত না।
হিন্দিভাষী দর্শক-শ্রোতার কাছে রবীন্দ্রনাথ তখন মূলত সাহিত্যিক নাম, সংগীতের মানুষ নন। সায়গলের মাধ্যমে তারা প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রনাথের গানের আবেগের সঙ্গে পরিচিত হয়।
এই পরিচয় ছিলো সরল, আবেগঘন এবং কোনো রীতির বেড়াজালে বন্দি নয়। ফলে ‘শ্রেণিকক্ষের কবি’ নন, বরং রবীন্দ্রনাথ সেখানে হয়ে ওঠেন জীবনের সঙ্গে যুক্ত এক মানবিক কণ্ঠস্বর।
১৯৪৭ সালের ১৮ জানুয়ারি পাঞ্জাবের জলন্ধরে মারা যান সায়গল৷ সায়গলের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত প্রতীকী দিক থেকে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।
তার পরবর্তী সময়ে দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সাগর সেন, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীতকে আরও জনপ্রিয় ও শৈল্পিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু সায়গল থেকে গেছেন এক ভিন্ন পথের চিহ্ন হয়ে—যেখানে আবেগই শেষ কথা।
রবীন্দ্রনাথ ও সায়গল—দুজনেই তাদের নিজ নিজ জায়গায় সম্পূর্ণ। একজন শব্দ ও সুরে জীবনকে ব্যাখ্যা করেছেন, আরেকজন কণ্ঠে ধারণ করেছেন মানুষের ভাঙা মন।
সায়গলের রবীন্দ্রনাথ মানে একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত পাঠ—যেখানে আবেগ আসে শুদ্ধতার আগে । আর রবীন্দ্রনাথের সায়গল মানে—মহৎ সৃষ্টিভাষা, অঞ্চল ও রীতির সীমা ছাড়িয়ে যা শেষ পর্যন্ত হৃদয়েই পৌঁছাতে চায়।
