-3 C
New York

সুন্দরবন উপকূলের ‘নতুন সোনা’ নরম খোলের কাঁকড়া

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রধান পেশা চিংড়ি চাষ, মাছ ধরা, কাঠ কাটা, মধু সংগ্রহ ও এসব পণ্য বেচাকেনা। তবে এ কাজগুলো সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। বাঘ ও জলদস্যুর ভয়, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর বন বিভাগের কড়াকড়ি—এসব নিত্যসঙ্গী। তার ওপর মৌসুমি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরের কয়েক মাস আয়রোজগার থাকে না বললেই চলে।

তবে গত এক দশকে এই জনপদে নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে নরম খোলসের কাঁকড়া চাষ বা ‘সফট শেল ক্র্যাব ফার্মিং’। রপ্তানিমুখী এই নিবিড় চাষাবাদ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলে দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। এটি স্থানীয়দের কাছে মাছ বা চিংড়ি চাষের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলায়, বিশেষ করে শ্যামনগর উপজেলায় এই শিল্প এখন কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত। তবে এর সঙ্গে পরিবেশগত ও আইনি কিছু চ্যালেঞ্জও আছে।

এক দশক আগেও এ অঞ্চলে বাগদা চিংড়ি ছিল প্রধান অর্থকরী ফসল, যাকে বলা হতো ‘সাদা সোনা’। কিন্তু রোগবালাই, বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ও দাম কমে যাওয়ায় চিংড়ির জৌলুশ কমেছে। অনেক চাষি তাই কাঁকড়ার দিকে ঝুঁকেছেন। অনেকে চিংড়ির ঘেরেই লোনা পানিতে কাঁকড়া চাষ করছেন। কাঁকড়া চাষে জমি কম লাগে, ঝুঁকি কম এবং দ্রুত মুনাফা আসে।

শ্যামনগরের ‘রোহান অ্যাগ্রো ক্র্যাব ফিশারিজ’-এর মালিক রাজীব জয়দ্দার বলেন, কাঁকড়া রপ্তানি এখানকার মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে। এটি অনেক ছোট উদ্যোক্তা তৈরি করছে এবং অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।

তার খামারে প্রতি মাসে প্রায় ৯-১০ হাজার কেজি কাঁকড়া উৎপাদিত হয়। জলোচ্ছ্বাস ও লোনা পানি ঢোকার ঝুঁকি থাকলেও আয় নিয়ে তাকে আর আগের মতো দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় না।

নরম খোলসের কাঁকড়া চাষ একটি বিশেষায়িত পদ্ধতি। কাঁকড়া যখন খোলস বদলায় (মোল্টিং), তখন এর শক্ত বহিরাবরণ তৈরি হওয়ার আগেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটি সংগ্রহ করতে হয়। এই সময়টুকু মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়।

সুন্দরবনের নদী-খাল ও খাল থেকে চাষিরা ছোট বা মাঝারি আকারের কাঁকড়া (ক্র্যাব সিড) সংগ্রহ করেন। হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন নগণ্য হওয়ায় এই শিল্পকে পুরোপুরি বুনো উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। মাঝারি আকারের কাঁকড়া বেশি পছন্দ করা হয় কারণ এরা দ্রুত খোলস বদলায় এবং বদ্ধ অবস্থায় ভালোভাবে টিকে থাকে।

প্রতিটি কাঁকড়াকে অগভীর লোনা পানিতে ভাসমান ছোট প্লাস্টিকের বাক্সে বা খাঁচায় আলাদাভাবে রাখা হয়। চাষিরা পানির লবণাক্ততা, গভীরতা ও পরিচ্ছন্নতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রতি এক-দুদিন পর পর ছোট মাছ বা শামুক খেতে দেওয়া হয়। খোলস বদলানো শুরু হলে ঘড়ির কাঁটা ধরে কাজ করতে হয়। নতুন খোলস শক্ত হওয়ার আগেই কাঁকড়া সংগ্রহ করে পরিষ্কার বা ঠান্ডা পানিতে রাখতে হয়। এরপর গ্রেডিং ও হিমায়িত করে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়।

এ ছাড়া শক্ত খোলসের কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ বা ‘ক্র্যাব ফ্যাটেনিং’ পদ্ধতিও জনপ্রিয় হচ্ছে। স্থানীয় বাজার থেকে কেনা কাঁকড়া তিন সপ্তাহ খাঁচায় রেখে ওজন দ্বিগুণ করে বিক্রি করা হয়। এই পদ্ধতি সস্তা, দ্রুত এবং এতে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কম।

বাংলাদেশে প্রায় ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া থাকলেও বাণিজ্যিক চাষের পুরোটাই নির্ভর করে শিলা কাঁকড়ার (রক ক্র্যাব) ওপর। এই প্রজাতিটি জীবনে ১৬ বার পর্যন্ত খোলস বদলায় এবং অন্য প্রজাতির চেয়ে দীর্ঘ সময় নরম থাকে, যা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় নরম খোলসের কাঁকড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে পোনা বা ক্র্যাব সিডের সংকট এই শিল্পের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুন্দরবনে ঢোকায় মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পোনা সংগ্রহ বন্ধ থাকে। তার ওপর লার্ভা বা রেণুর মৃত্যুহার বেশি হওয়ায় পোনার প্রাপ্যতা কমে গেছে। এতে কাকড়ার পোনার দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

চাষিরা জানান, কয়েক বছর আগের তুলনায় এখন তিন-চার গুণ বেশি দামে পোনা কিনতে হচ্ছে। বিশ্বমন্দার কারণে রপ্তানি মূল্যেও ওঠানামা আছে, এতে তাদের লাভ কমে যাচ্ছে। তারা বলছেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ও কম খরচে পোনা সরবরাহের ব্যবস্থা করা জরুরি।

২০১৪ সালে বাংলাদেশের উপকূলে বাণিজ্যিকভাবে নরম খোলসের কাঁকড়া চাষ শুরু হয়। শুরুতে কারিগরি জ্ঞান ও বিনিয়োগের অভাবে এর প্রসারের গতি ছিল ধীর। পরে বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে কাকড়া চাষে গতি আসে।

বর্তমানে সাতক্ষীরায় অন্তত ৩০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে কাঁকড়া চাষের ওপর নির্ভরশীল। শ্যামনগর এখন এই শিল্পের জাতীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে মাত্র ১০টি বাণিজ্যিক ঘের ছিল, সেখানে এখন প্রায় ২২০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৮৭০টি ঘের হয়েছে।

দাতিনাখালী, অর্পণগাছিয়া, বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সিগঞ্জের মতো গ্রামগুলো এখন ভাসমান প্লাস্টিকের খাঁচায় ছেয়ে গেছে। এই খাতে শ্রমিকের চাহিদাও প্রচুর। কাঁকড়া সংগ্রহ, পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীরা বড় ভূমিকা রাখছেন। অনেক বেকার তরুণ অল্প পুঁজি নিয়েও এই ব্যবসায় নামছেন।

সুন্দরবনের কাছে ‘ভাই ভাই অ্যাগ্রো ক্র্যাব ফিশারিজ’ চালান বিশ্বনাথ মন্ডল। ২০১৭ সালে ২০ বিঘা জমিতে তিনি চাষ শুরু করেন। এখন তার ৫৫ হাজার খাঁচা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সবকিছুই সামলানো যায়, কেবল পোনার সংকট ছাড়া।’ তিনি জানান, ১০০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়াকে ১৮-২০ দিন তেলাপিয়া মাছ খাইয়ে মোটাতাজা করা হয়। খোলস বদলানোর পর ১৫০ গ্রাম হলে তা রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করা হয়। তার খামারে ২৫ জন স্থায়ী কর্মী দিনে ছয়বার খাঁচা পরীক্ষা করেন।

একই এলাকার চাষি আবদুল্লাহ আল কাইয়ুম আবু বলেন, ‘আগে প্রতি কেজি পোনা ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ৩০০-৪০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।’ তিনি জানান, শক্ত খোলসের কাঁকড়া ২৫০-৩৫০ টাকায় বিক্রি হলেও নরম খোলসের কাঁকড়া ৮০০-১০০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

ঘের থেকে কাঁকড়া সংগ্রহের পর তা পাঠানো হয় শ্যামনগরের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে। শুধু বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নেই এখন ছয়টি কারখানা আছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কাঁকড়া পরিষ্কার ও হিমায়িত করা হয়।

সাতক্ষীরা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, শ্যামনগর, কালিগঞ্জ ও আশাশুনিতে ৪২০ হেক্টর জমিতে কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার ৮০০ টন। শুধু শ্যামনগরেই ১ হাজার ১৯৫টি ঘের রয়েছে, যার মধ্যে ৮৭০টি নরম খোলসের কাঁকড়ার। গত বছর এখানে ১ হাজার ৬৮০ টন কাঁকড়া উৎপাদিত হয়েছে।

সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌহিদ হাসান বলেন, নরম খোলসের কাঁকড়া চাষের বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে এবং দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে শ্যামনগর থেকে।

ফরিদ নাইন স্টার অ্যাগ্রো বিডি লিমিটেড ২০১৫ সাল থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে কাঁকড়া রপ্তানি করছে। বছরে তারা রপ্তানি করে ৩০০-৩৫০ টন। কোম্পানির ব্যবস্থাপক আমির হোসেন বলেন, সরকারি সহায়তা ও পোনার নির্ভরযোগ্য সরবরাহ পেলে এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।

সরকারি তথ্যও এই প্রবৃদ্ধির সাক্ষ্য দেয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাতক্ষীরা থেকে ৬৭ লাখ ডলারের ৫৬৭ টন কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ৮০০ টন ছাড়িয়ে যায়। তবে পরের বছর বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় তা কিছুটা কমে ৬২২ টনে নামে, যার মূল্য ছিল ৮৭ লাখ ডলার।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, ‘চিংড়ির পর কাঁকড়া আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য। নরম খোলসের কাঁকড়ার আন্তর্জাতিক চাহিদা আছে। সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে এই খাত আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।’

তবে এই সমৃদ্ধির উল্টো পিঠে রয়েছে পরিবেশগত ঝুঁকি। কাঁকড়ার পোনার প্রায় পুরোটাই সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা হয়, যা ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চের চেয়ারপারসন গৌরাঙ্গ নন্দী সতর্ক করে বলেন, অপরিকল্পিতভাবে কাঁকড়া আহরণ বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। তিনি বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রে কাঁকড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরা ঝরা পাতা পচতে সাহায্য করে এবং গর্ত করে মাটিতে বাতাস চলাচলের সুযোগ করে দেয়, যা জরুরি পুষ্টিচক্র সচল রাখে।’

তিনি বলেন, ‘ব্যাপক হারে কাঁকড়া পোনা সরিয়ে নিলে মাটির গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ম্যানগ্রোভের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। কাঁকড়া হলো “ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার”। এদের কমে যাওয়া সরাসরি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও টিকে থাকার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলবে।’

এর প্রভাব পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে পড়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কাঁকড়া কমলে মাছ, পাখি ও সরীসৃপের খাবার কমে যায়। প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা কাঁকড়া ধরায় বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া ক্ষতিকর উপায়ে পোনা সংগ্রহের কারণে নদীর পাড় ভাঙছে এবং ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে।’

Related Articles

Latest Articles