-6.2 C
New York

‘নেপালে ক্রিকেট এখন একটি ধর্ম’

নেপালে ক্রিকেট দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে, আর এই উত্থানের অগ্রভাগে রয়েছেন লেগ স্পিনার সন্দীপ লামিচানে। জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে পরিচিত মুখ লামিচানে প্রথমবার বাংলাদেশের দর্শকদের নজরে আসেন ২০১৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। পরে ২০১৯ সালে সিলেট সিক্সার্সের হয়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগেও (বিপিএল) খেলেন তিনি। বিপিএলের দ্বাদশ আসরে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের হয়ে খেলতে আবারও বাংলাদেশে ফিরেছেন ২৫ বছর বয়সী এই স্পিনার। এ উপলক্ষে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে নেপালের ক্রিকেট, লেগ স্পিনের খুঁটিনাটি ও প্রত্যাশা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার-এর সামসুল আরেফিন খানের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো—

দ্য ডেইলি স্টার: বাংলাদেশে আবার ফিরতে আপনার এত সময় লাগল কেন?

সন্দীপ লামিচানে: আমার মনে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিপিএল কর্তৃপক্ষ অনেক দিন পর আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমিও বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আর নেপালের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, ফলে অনেক সময় সূচি মেলেনি। শেষ পর্যন্ত বিপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে প্রস্তাব আসায় আমি খুশি, আর এখন এখানে থাকতে পেরে ভালো লাগছে।

ডেইলি স্টার: ২০১৯ সালে আপনি বিপিএল খেলেছিলেন। টুর্নামেন্টে কী পরিবর্তন দেখছেন?

লামিচানে: বড় কোনো পার্থক্য আমি দেখছি না, কারণ এখানকার ক্রিকেটের প্রতি আবেগ আর সম্মান আগের মতোই আছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে সতীর্থ বদলানো স্বাভাবিক, কিন্তু শিরোপা জয়ের ক্ষুধা সব সময়ই একই থাকে। আগে সিলেটে খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাইনি, কিন্তু এ বছর এখানে অনেক ম্যাচ খেলছি। এখানকার পরিবেশ আর আবহ দারুণ।

ডেইলি স্টার: এ বছর আপনি বেশ ভালো করছেন এবং নেপালি সমর্থকরাও খুব সক্রিয়। এমনকি দুটি ম্যাচে বাদ পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোড়নও দেখা গেছে। বিপিএলকে নেপালি ভক্তরা কীভাবে দেখেন, আর আপনার দেশে ক্রিকেটের পরিবেশ কেমন?

লামিচানে: এমন সমর্থক পাওয়া আমাদের জন্য আশীর্বাদ, যারা আমাদের মাধ্যমেই তাদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে। নেপালে ক্রিকেট এখন আর শুধু খেলা নয়, এটা যেন এক ধরনের ধর্ম হয়ে গেছে। মানুষ ভীষণ আবেগপ্রবণ। খেলোয়াড়েরা একাদশে না থাকলে তারা হতাশ হয়, এটা স্বাভাবিক। তবে এসব সিদ্ধান্ত দল ও সঠিক সমন্বয়ের স্বার্থেই নেওয়া হয়।

ডেইলি স্টার: বিপিএল বা অন্যান্য বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নেপালের পরবর্তী কোন খেলোয়াড়কে দেখতে পাচ্ছেন?

লামিচানে: আমাদের অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে, পাওয়ার হিটার, অলরাউন্ডার সবাই। দীপেন্দ্র সিং আইরি ও সোমপাল কামির কথা আমরা প্রায়ই বলি, তারা আগেও বিভিন্ন লিগে খেলেছে। করণ কেসিও খেলেছে, আর কুশল মাল্লার মধ্যে আমি অনেক সম্ভাবনা দেখি। আরও অনেক তরুণ উঠে আসছে। তবে এই মুহূর্তে যদি বলতে হয়, তাহলে কুশল মাল্লা আর দীপেন্দ্র সিং আইরি।

ডেইলি স্টার: নেপাল প্রিমিয়ার লিগ (এনপিএল) শুরু হয়েছে। এই লিগ নেপালের ক্রিকেটকে কীভাবে এগিয়ে নেবে বলে মনে করেন?

লামিচানে: আমাদের নিজস্ব একটি লিগ থাকা বিশাল ব্যাপার। খুব দ্রুতই এর উন্নয়ন হয়েছে, গত বছর এটি ছিল দিনের ইভেন্ট, আর এক বছরের মধ্যেই ফ্লাডলাইট ও গ্যালারি বসানো হয়েছে। নেপাল ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন দারুণ আন্তরিকতা দেখাচ্ছে এবং খেলোয়াড়দের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নেপালে গ্যালারিভর্তি স্টেডিয়ামে ফ্লাডলাইটের নিচে খেলা একসময় স্বপ্ন ছিল, যা এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

ডেইলি স্টার: এই লিগ বিনিয়োগ ও রাজস্বও আনছে। সারা নেপালে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেওয়া ও অবকাঠামো উন্নয়নে এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

লামিচানে: আমরা এখনো টেস্ট-খেলুড়ে দেশ নই। বাইরে থেকে এনপিএলের রাজস্ব বড় মনে হলেও, সেই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করার বড় দায়িত্ব ক্যানের ওপর। আমাদের বর্তমানে মাত্র একটি আন্তর্জাতিক ভেন্যু আছে, তাই আরও মাঠ গড়ে তুলতে হবে। ফাফ দু প্লেসি ও মার্টিন গাপটিলের মতো আন্তর্জাতিক তারকাদের আনা ক্রিকেট অঙ্গন বদলে দিচ্ছে এবং খেলাটিতে এক ধরনের বিপ্লব আনছে। আইসিসি যদি নেপালকে আরও আন্তর্জাতিক সিরিজ বা নিরপেক্ষ ভেন্যুর ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ দেয়, তাহলে পর্যটন বাড়বে এবং মানুষের মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি হবে। আগামী সপ্তাহে নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের মতো ইভেন্ট আয়োজনও অর্থনীতিকে চাঙা করে এবং আমাদের আবেগ ও ভালোবাসার ব্যাপ্তি তুলে ধরে।

ডেইলি স্টার: লেগ স্পিনে এখন প্রযুক্তির কারণে প্রতিপক্ষ আপনার প্রতিটি নড়াচড়া বিশ্লেষণ করতে পারে। নতুন ভ্যারিয়েশন যোগ করা কতটা জরুরি?

লামিচানে: বছরের পর বছর ক্রিকেট বদলেছে এবং এখন ছোট বাউন্ডারি ও ভালো উইকেটের কারণে ব্যাটসম্যানদের পক্ষেই বেশি যায়। বিশ্লেষকেরা যেমন প্রতিপক্ষকে আমাদের ভিডিও দেখায়, আমরাও বিশ্লেষকদের মাধ্যমে ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতা খুঁজি। এটা জীবনেরই অংশ। লেগ স্পিন অবশ্যই কঠিন এক শিল্প, তবে নিয়মিত অনুশীলন আর কখন কোন ভ্যারিয়েশন ব্যবহার করতে হবে, সেটা বুঝে নেওয়াই পার্থক্য গড়ে দেয়।

ডেইলি স্টার: কোনো ওভারে বেশি রান খেলে ফেললে মানসিকতা কীভাবে বদলান?

লামিচানে: আমি খুব বেশি কিছু বদলাই না। লেগ স্পিনারদের সাহসী হতে হয়। নিজের দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ করা বা নেতিবাচক দিক ভাবা উচিত নয়; বরং উইকেট নেওয়ার দিকেই মনোযোগ দিতে হবে, যাতে ম্যাচ নিজের পক্ষে ঘুরে যায়। ব্যাটসম্যান কী করতে চাইছে, সেটা বুঝে নিজেকে বিশ্বাস করে খেলতে হয়।

ডেইলি স্টার: মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা আর আগে থেকে ঠিক করা পরিকল্পনা মেনে চলার ক্ষেত্রে আপনি কতটা সাহসী?

লামিচানে: আমি সব সময় এভাবেই জীবন কাটিয়েছি। মাঠে আমি নিজেকে বস মনে করি; আমি বের হই আর রাজাদের মতো খেলি।

ডেইলি স্টার: সামনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। আগের আসরে দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশের বিপক্ষে অল্প ব্যবধানে হারের হতাশা কতটা ছিল?

লামিচানে: ভীষণ হতাশাজনক ছিল। আমরা খুব কাছাকাছি গিয়েছিলাম। কিন্তু এক রানে হারুন বা একশ রানে, হার তো হারই। আমরা সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি, আর সেদিনগুলো আমাদের ছিল না। তবে আমরা প্রমাণ করেছি, নেপাল ক্রিকেট এসেছে এবং সম্ভাবনা রাখে। আরও অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেব, আর এ বছর কিছু অঘটন ঘটাতে পারব বলে বিশ্বাস করি।

ডেইলি স্টার: শোনা যাচ্ছে কিছু ভেন্যু বদলাতে পারে, যেমন বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় হতে পারে। আপনারা তো একই গ্রুপে এতে কি আপনার আপত্তি আছে?

লামিচানে: এটা বড় চ্যালেঞ্জ হলেও আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ভেন্যু যেখানেই হোক মুম্বাই, দিল্লি, দুবাই বা শ্রীলঙ্কা, আমরা খেলব। তবে নেপালে যদি বাংলাদেশ-নেপাল ম্যাচ আয়োজন করা যেত, তাহলে আমি খুব খুশি হতাম। আইসিসি যে সূচি বানিয়েছে, সেটাকে সম্মান করতে হবে, আর এতে নেপাল ক্রিকেটের কোনো সমস্যা নেই।

ডেইলি স্টার: বাংলাদেশি লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন বর্তমানে হোবার্ট হারিকেন্সের হয়ে বিগ ব্যাশ লিগে ভালো করছেন। তাকে খেলতে দেখেছেন? কী পরামর্শ দেবেন?

লামিচানে: ম্যাচগুলো দেখিনি, তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজে (আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ) তার সঙ্গে খেলেছি। সে ভালো প্রতিভা এবং বাংলাদেশের জন্য দারুণ অবদান রাখবে। আমার পরামর্শ হবে, খেলাটা উপভোগ করতে থাকুক এবং অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া উপভোগ করুক। সে হোবার্টের হয়ে খেলছে, যে দলে আমি দুই মৌসুম খেলেছি, এটা এক ধরনের যোগসূত্র। বিশ্বকাপে আবার তার সঙ্গে দেখা হবে বলে অপেক্ষায় আছি, ভালো একটা আড্ডাও হবে আশা করি।

ডেইলি স্টার: উপমহাদেশের অন্য দলের তুলনায় বাংলাদেশে খেলার চ্যালেঞ্জ কীভাবে আলাদা?

লামিচানে: খুব বড় পার্থক্য নেই, তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের স্থানীয় ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং দক্ষতা অনেক বেড়েছে। বল কোথায় ফেলছেন আর ম্যাচ পরিস্থিতি, এসব খুব সতর্কভাবে ভাবতে হয়। কন্ডিশন স্পিন-সহায়ক হলেও সিলেট ঢাকা থেকে একটু আলাদা; আমার মনে হয় ঢাকায় স্পিনাররা বেশি সহায়তা পায়, যদিও আমি সেখানে সাত বছর খেলিনি।

ডেইলি স্টার: মাঠের বাইরের কিছু ইস্যুর পর অনেক খেলোয়াড়ই ভেঙে পড়েন, কিন্তু আপনি শক্তভাবে ফিরেছেন। সেসব বিষয় মাঠের পারফরম্যান্সে কতটা প্রভাব ফেলেছিল?

লামিচানে: বিষয়টা অনেক কিছু মনে হলেও, আমি এটা নিয়ে কথা বলতে চাই না।

Related Articles

Latest Articles