গ্রামাঞ্চলে প্রায়ই একটি প্রাণীকে ঘিরে হঠাৎ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ দেখামাত্র চিৎকার শুরু করে, মুহূর্তেই লোক জড়ো হয়। এরপর যা ঘটে, তা অত্যন্ত দুর্বিষহ। ভয় আর ভুল ধারণার বশে সবাই মিলে নিরীহ বন্য প্রাণীটিকে পিটিয়ে হত্যা করে। যে প্রাণীটিকে মানুষ সাধারণত ‘মেছো বাঘ’ বলে ডাকে ও হিংস্র ভেবে হত্যা করে, সেটি আসলে ‘মেছো বিড়াল’। নামের কারণে বিভ্রান্তি থাকলেও এটি বাঘ নয়, বরং অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের একটি প্রাণী। পরিবেশগতভাবে প্রাণীটি প্রকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিপন্নপ্রায় প্রাণী মেছো বিড়াল। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট (আইইউসিএন) মেছো বিড়ালকে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাদেশেও মেছো বিড়ালের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ প্রাকৃতিক জলাভূমি ধ্বংস।
পরিবেশবাদীরা জানান, হাওর বেষ্টিত সিলেট বিভাগ এই প্রজাতির বন্যপ্রাণীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
একটি পরিবেশবাদী সংস্থার সদস্য খোরশেদ আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, মেছো বিড়াল রক্ষার্থে মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। তাদের কোনোরূপ ক্ষতি বা হত্যা করা যাবে না। যদিও এ ধরনের কার্যক্রম বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০০১২ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি প্রাণীই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সম্প্রতি মৌলভীবাজারের বড়লেখায় উপজেলায় এক অনুষ্ঠানে জাপানের রিতসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আই সুজুকিও বলেন, মেছো বিড়াল কোনো বাঘ না। এটি মানুষের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি করে না। সুতরাং এটিকে ভয় পাওয়ারও কোনো কারণ নেই।
তিনি জানান, তার নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে মেছো বিড়ালের পরিবেশগত গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। মেছো বিড়াল যে মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়, প্রামাণ্যচিত্রে এ বিষয়ে স্পষ্টবার্তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মূলত মেছো বিড়াল হত্যার পেছনে মানুষের অসচেতনতাই প্রধান কারণ। ভুলভাবে চেনার কারণেই প্রাণীটি মানুষের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনতাসীর আকাশ মেছো বিড়ালকে ‘জলাভূমির নীরব প্রহরী’ হিসেবে সম্বোধন করেন।
ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানের জন্য মেছো বিড়াল ভীষণ প্রয়োজনীয়। এটি মাছ, ব্যাঙ ও ইঁদুর খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। একটি মেছো বিড়াল তার জীবদ্দশায় ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে অন্তত ৫০ লাখ টাকার ফসল রক্ষা করে। এটি প্রকৃত অর্থেই কৃষকের বন্ধু।
স্থানীয় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পানকৌড়ি কনজারভেশন ক্লাবের উদ্যোগে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চল এখন মেছো বিড়ালের নিরাপদ আশ্রয় ও স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তবে দেশের অন্যান্য এলাকায় এখনো ভয়, কুসংস্কার ও ভুল ধারণার কারণে এই নিরীহ বন্য প্রাণীটিকে হত্যা করা হচ্ছে।
২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মৌলভীবাজার অঞ্চলে কখনো পিটিয়ে, সড়ক দুর্ঘটনায় ও কখনো অবৈধভাবে আটকে রাখার কারণে ৫০টিরও বেশি মেছো বিড়াল মারা গেছে। আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো—প্রচারণা, সচেতনতা, বিলবোর্ড বার্তা ও উদ্ধার অভিযানের কারণে মেছো বিড়াল সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাচ্ছে।
কেউ ব্যক্তিগতভাবে মেছো বিড়াল আটকে রাখলেও পরবর্তী সময়ে বন্দিদশা থেকে তাদের উদ্ধার করে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু সচেতনতা যথেষ্ট নয়, বিশেষ করে তরুণদের যুক্ত করে ধারাবাহিক সামাজিক কার্যক্রম, গবেষণা ও প্রচারণা প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এ আজিজ ডেইলি স্টারকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সিলেট অঞ্চল মানুষ ও মেছো বিড়ালের মধ্যে সংঘাতের জন্য হটস্পট হিসেবে পরিচিত।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের চার-পাঁচটি দেশে মেছো বিড়াল পাওয়া যায়। জনসংখ্যার চাপ সত্ত্বেও মানুষের সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশে এটি এখনো মেছো বিড়াল টিকে আছে।
তিনি আরও বলেন, তবে দেশের আরও কয়েকটি দেশীয় বনবিড়াল প্রজাতি এখন হুমকির মুখে রয়েছে। একটি মেছো বিড়াল তার জীবদ্দশায় ৫০ লাখ টাকার ফসল রক্ষা করে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম ডেইলি স্টারকে বলেন, এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি হাকালুকি হাওর মেছো বিড়ালের প্রধান আবাসস্থল।
তিনি বলেন, অনেক সময় মানুষ মেছো বিড়াল আটক করে বন বিভাগকে খবর দেয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মেছো বিড়ালদের তাদের নিজস্ব আবাসস্থল থেকেই ধরা হচ্ছে। যদি যথাযথ সচেতনতা থাকে তাহলে সেগুলো নিরাপদে সেখানেই অবমুক্ত করা সম্ভব।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন সংরক্ষক মো. সানাউল্লাহ পাটোয়ারী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মেছো বিড়াল হাওরের বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা অসুস্থ মাছ খেয়ে বাকি মাছ রক্ষা করে। পরোক্ষভাবে তারা কৃষি ও মৎস্য খাতকে সহায়তা করে। মেছো বিড়াল ও বন্যপ্রাণী না থাকলে হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
