-0.3 C
New York

ঢাকা-১৮: রাজধানীর প্রবেশদ্বারে নাগরিক বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি প্রার্থীদের

রাজধানী ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ উত্তরা এলাকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা রয়েছে প্রথম থেকেই। উত্তরা, তুরাগ, উত্তরখান, দক্ষিণখানের বিস্তৃত অলিগলিতে এখন উৎসবের সাথে মিশে আছে টানটান উত্তেজনা।

রাজপথের দীর্ঘ লড়াই ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে প্রার্থীরা যাচ্ছেন ঢাকা-১৮ আসনের বিভিন্ন এলাকায়। উত্তরার সুউচ্চ দালানের চাকচিক্য বনাম উত্তরখান-দক্ষিণখানের অবহেলিত গলির নাগরিক বঞ্চনা—এই দুইয়ের বৈষম্য ঘোচানোর প্রতিশ্রুতিই এখানকার মূল আলোচ্য বিষয়।

মূলত ঢাকা উত্তর সিটির ১, ১৭, ৪৩, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪ ওয়ার্ড ও বিমানবন্দর এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৮ আসনে একদিকে যেমন উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তদের বাস, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের বসবাস।

এখানে যেমন আছে উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরার মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা; তেমনি আছে খিলক্ষেত, উত্তরখান, দক্ষিণখানের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। বৈচিত্র্যপূর্ণ এই আসনের সমস্যাও ভিন্ন। 

পুরো এলাকায় ঘুরলে প্রথমেই চোখে পড়ে ধুলোবালির রাজ্য আর ময়লা-আবর্জনা। এছাড়াও, বর্ষাকালে উত্তরখান ও দক্ষিণখানের অনেক রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে যায়। অপরিকল্পিত রাস্তায় সারাদিন যানজট লেগেই থাকে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

উত্তরা ও খিলক্ষেত এলাকায় ‘কিশোর গ্যাং’-এর তৎপরতা ও মাদক একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসিক এলাকাগুলোতে প্রায়ই গ্যাস ও পানির স্বল্পতা দেখা দেয়।

নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসায় পুরো এলাকা এখন প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় জমজমাট। তারা প্রার্থীদের কাছে যাচ্ছেন। তাদের প্রত্যাশা-চাহিদার কথা শুনছেন, আশ্বাস দিচ্ছেন সমস্যা সমাধানের।

বিস্তৃত তুরাগ থানা এলাকার বাসিন্দারা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তাদের এলাকার প্রধান সমস্যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পুরো এলাকা নোংরা ও অপরিষ্কার। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো উদ্যোগ নেই। অন্যান্য সমস্যার মধ্যে আছে মাদক, চুরি-ছিনতাইসহ সার্বিক নিরাপত্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শিক্ষিকা বলেন, ‘ভোট চলে আসায় অনেকে অনেক ধরনের আশ্বাস দিচ্ছেন। কিন্তু ভোট শেষ হয়ে গেলে জানি না তাদের দেখা পাব কি না। আমরা চাই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমাদের কথা শুনবেন, তারা আমাদের সমস্যা সমাধান করবেন।’

উত্তরা-১৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম হিমেল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন দেশের ও জনগণের স্বার্থ দেখেন। আমাদের এলাকায় চাঁদাবাজি একটা নিয়মিত ঘটনা। কিশোর গ্যাং আছে, চুরি-ছিনতাই হচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যক্রম বাড়াতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারকে মারামারি-হানাহানি বন্ধ করতে হবে, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক সৌহার্দ্যপূর্ণ হতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নাগরিক সেবা সহজপ্রাপ্য করতে হবে।’

রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘তরুণদের চিন্তা-ভাবনাগুলোকে সামনে আসতে দেওয়া উচিত। নতুনদের সুযোগ করে দিলে, তারা ভুল-ত্রুটি কাটিয়ে ভবিষ্যতে একটি সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ উপহার দিতে পারবে বলে আমি মনে করি।’

উত্তরখান মাজার এলাকার বাসিন্দা ও জুলাই-যোদ্ধা হারুন অর রশিদ (৪৫) দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ঢাকা-১৮ আসনটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। সড়কে জ্যাম, ফুটপাতে দোকান, দোকানে চাঁদাবাজি, নিয়ন্ত্রহীন অটোরিকশা, অপ্রতুল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছাড়াও লাইনের গ্যাসে চাপ কম, ওয়াসার পানিতে ময়লা, রাস্তায় নির্মাণ সামগ্রী—সব মিলিয়ে এখানে মানুষের জীবন এক প্রকার অতিষ্ঠ।

ভোটারদের ধারণা, এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা আরিফুল ইসলাম আদীবের মধ্যে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হলেন—নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আনোয়ার হোসেন। আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিন হাওলাদার, জাতীয় পার্টির মো. জাকির হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সৈয়দ হারুন-অর–রশীদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) সাবিনা জাবেদ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. জসিম উদ্দিন‌, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইসমাইল হোসেন।

এনসিপি প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীব ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে ভোটারদের কাছে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বড় বড় শো-ডাউন না করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রতিদিন ৮-১০টি ছোট ছোট সভা করছি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ও বিভিন্ন বয়সের মানুষের কাছে যাচ্ছি। সবাই বেশ ভালো সাড়া দিচ্ছে।’

উত্তরাকে একটি ‘পরিকল্পিত, নিরাপদ ও ইনসাফের নগরী’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করছেন আদীব। তিনি বলেন, ‘উত্তরা মডেল টাউনের সঙ্গে অন্যান্য এলাকার নাগরিক সুবিধার বৈষম্য দূর করতে সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভাবনা আছে। নারীদের যাতায়াতে স্পেশাল বাস ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা আছে।’

তবে প্রচারণায় গিয়ে সম্প্রতি হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন আদীব। তার দাবি, প্রশাসন ও বড় ব্যবসায়ীরা একটি দলের দিকে ঝুঁকে পড়ায় প্রতিযোগিতার পরিবেশ অসম হয়ে গেছে।

জাতীয় রাজনীতি ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়তে তিনি ভোটারদের ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘গত ১৭ বছরে তুরাগ, উত্তরখান ও দক্ষিণখানে কোনো কাজ হয়নি। আমি নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা, যানজট এবং গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে কাজ করব।’

এছাড়া, তরুণদের আধুনিক শিক্ষা ও নারীদের কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি অপেক্ষাকৃত দরিদ্রদের দলের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার আশ্বাস দেন।

ঢাকা-১৮ আসনকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত করার অঙ্গীকার করছেন তিনি। এনসিপি প্রার্থী আদীবের ওপর হামলাকে তিনি ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘বিএনপির যে নেতাকর্মীদের সঙ্গে এ ঘটনা ঘটেছিল, তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরপর আমি এনসিপি প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি বুঝিয়েছি।’

‘আমি জয়ী হলে মাহমুদুর রহমান মান্না এবং আরিফুল ইসলাম আদীবসহ অন্যান্যদের সঙ্গে নিয়েই “মানবিক ও নতুন বাংলাদেশ” গড়তে কাজ করব,’ বলেন জাহাঙ্গীর।

নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘ভোটারদের ইতিবাচক সাড়া পেয়ে আমি অভিভূত। আমি মনে করি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত এই আসনে মানুষ এখন সত্যিকার গুণগত পরিবর্তন চায়।’

তিনি এ আসনকে ‘না শহর, না গ্রাম’ উল্লেখ করে পুরো এলাকার আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেন। চাঁদাবাজি বন্ধ করাকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন মান্না।

তিনি বলেন, ‘এই অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব বলে আমি মনে করি যদি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যায়। তরুণ ও নারীদের রাজনীতিতে আসতে বলব আমি এবং আমি তাদের কাছে এই বার্তা দিতে চাই যে, আসুন সবাই মিলে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ি।’

ঢাকা জেলার অন্যতম বৃহৎ এ আসনের মোট ভোটার ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৩। এর মধ্যে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯০৬ জন পুরুষ, ৩ লাখ ৬৭ হাজার ১৫১ জন নারী ও ৬ জন হিজড়া। বিগত নির্বাচনে এখানে ভোটার ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৯।

Related Articles

Latest Articles