0.6 C
New York

বস্তিতে ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহের হিড়িক

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১০ দিন বাকি। এ সময়ে ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে রাজনৈতিক দলের প্রচারণাকর্মীরা ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য ও মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করছেন।

বস্তিবাসীর অভিযোগ, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতাকর্মীর পরিচয়ে আসা ব্যক্তিরা এসব তথ্য নিচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সতর্ক করলেও তাদের এই তৎপরতা থামেনি।

গত এক সপ্তাহে ভাসানটেক, কাফরুল, মিরপুর, কড়াইল, মহাখালী সাততলা ও তেজগাঁও বস্তি ঘুরে এবং অন্তত ৫০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

তারা জানান, রাজনৈতিক কর্মীরা এনআইডি তথ্য এবং কিছু ক্ষেত্রে মুঠোফোন ও মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর সংগ্রহ করছেন। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে কয়েকটি ঘটনা কর্তৃপক্ষের নজরে আসার আগপর্যন্ত ব্যাপকভাবে এটা চলেছে।

অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, জামায়াতের প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’য় ভোট চাওয়া কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি দেখতে চাইছেন এবং কখনো কখনো মুঠোফোন নম্বর নিচ্ছেন।

ভাসানটেক বেনারসি পল্লি এলাকার বাসিন্দা রুবিনা (৫৯) বলেন, ‘২১ জানুয়ারি দুজন লোক এসে দাঁড়িপাল্লায় ভোট চায় এবং আমার আইডি কার্ড দেখতে চায়। কার্ড দেখালে তারা মোবাইলে ছবি তুলে নিয়ে যায়।’

১ নম্বর ভাসানটেক বস্তির কুমিল্লাপট্টির রাহেলা বেগম (৫৩) বলেন, ‘মাসখানেক আগে জামায়াত ও বিএনপির পরিচয়ে আসা দুটি দল আমার আইডি কার্ড দেখতে চায়। দুই দলই আমার কার্ডের ছবি তুলে নিয়ে গেছে।’

একই এলাকার মোসাম্মৎ রোকেয়া (৬৬) জানান, দুই সপ্তাহ আগে একদল লোক বস্তিতে নারী-পুরুষদের জড়ো করে ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর চায়। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে কার্ড না থাকায় আমি দিতে পারিনি।’

২১ জানুয়ারি ১ নম্বর ভাসানটেক বস্তিতে ১০-১২ জনের একটি দল এনআইডি ও নম্বর চাইতে গেলে স্থানীয় বাসিন্দা মুন্নি বেগমের সঙ্গে তর্ক বাধে। মুন্নি বলেন, ‘আমি তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলি। তখন বিএনপির কিছু ছেলে এসে তাদের প্রশ্ন করলে তারা সদুত্তর দিতে পারেনি। পরে স্থানীয়রা পুলিশ ও প্রশাসনকে খবর দিলে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা এসে তাদের নিয়ে যায়।’

ভাসানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম হোসেন নিশ্চিত করেন, ২১ জানুয়ারি স্থানীয় লোকজন আটজন পুরুষ ও চারজন নারীকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করে যে তারা ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করছিল।

গুলশান সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিলয় রহমান বলেন, আটকরা দাবি করেছে তারা নির্বাচনী জরিপ করছিল এবং কারও পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছিল না।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আটকরা ইসির কোনো অনুমতিপত্র দেখাতে পারেনি। জোর করে তথ্য নেওয়ার প্রমাণ না পাওয়ায় মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

কাফরুল ও মিরপুরেও একই চিত্র। ঢাকা-১৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, এনআইডি চাওয়া নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত কর্মীরা অন্তত চারবার প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। পরে কাফরুল থানা জামায়াতের আমির প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন এবং এমন কাজ আর করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে।

কাফরুল ও মিরপুরেও এনআইডি কার্ড চাওয়া নিয়ে কয়েক দফা উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ঢাকা-১৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মিল্টন অভিযোগ করেন, জামায়াত কর্মীরা এ ধরনের কাজ করতে গিয়ে অন্তত চারবার জনরোষের মুখে পড়েছে।

তিনি জানান, পরে কাফরুল থানা জামায়াতের আমির প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্থানীয় জামায়াত আমিরের ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও ক্লিপটি সে সময় অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।

২০ জানুয়ারি দক্ষিণ পীরেরবাগেও একই ধরনের ঘটনায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, জামায়াত কর্মীরা সেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডির তথ্য চাইছিলেন।

হ্যাভেন টাওয়ার ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইদ্রিস আলী বলেন, নিষেধ উপেক্ষা করে প্রচারণাকর্মীরা ফ্ল্যাটে ঢুকে এনআইডি চাইলে বাসিন্দারা প্রতিবাদ করেন।

মহাখালী সাততলা বস্তির সেলিনা বেগম বলেন, ‘কখনো এনজিও কর্মী, কখনো দলের কর্মী পরিচয়ে লোকজন এসে নম্বর ও এনআইডি নিচ্ছে। জামায়াত ও বিএনপি দুই দলের লোকই এসেছে।’

কড়াইল বস্তির এরশাদনগরের বাসিন্দা মো. হাসান (৬৫) জানান, বিএনপির কর্মীরা সম্প্রতি কম্বল বিতরণের সময় এনআইডির ফটোকপি নিয়েছে।

বনানী থানা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক রানা আহমেদ বলেন, ‘কিছু দল প্রচারের প্রমাণ হিসেবে এসব তথ্য সংগ্রহ করছে। যারা তথ্য নিচ্ছে তারা বলছে, ওপরের নেতাদের কাছে প্রচারের প্রমাণ দিতে হবে।’

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘কর্মীদের এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। বিএনপি এমন কাজ করছে বলে আমার জানা নেই।’

এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মাওলানা এ টি এম মাসুম ও মাওলানা আবদুল হালিম ফোন ধরেননি বা এসএমএস বার্তার জবাব দেননি।

ইসি গত ২২ জানুয়ারি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ভোটারদের এনআইডি তথ্য সংগ্রহ বা হস্তান্তর এবং অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

Related Articles

Latest Articles