1.2 C
New York

ঢাকা-৯ আসনে ত্রিমুখী লড়াই, তৃণমূলের শক্তিকে তারুণ্যের চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘদিন ধরে খিলগাঁও এলাকায় ফুটপাতে দোকান চালান আবুল হোসেন। ছোটবেলা থেকে এই এলাকায় বেড়ে ওঠার সুবাদে প্রায় গ্রামীণ চেহারার খিলগাঁওকে তিনি আধুনিক আবাসিক এলাকায় পরিণত হতে দেখেছেন। এলাকায় জমি দখল থেকে শুরু করে টেন্ডার বাণিজ্য—সবই তার চোখের সামনে ঘটেছে।

ঢাকা-৯ আসনের এই ভোটার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত কয়েক দশকে খিলগাঁও এলাকার অনেকেই রাজনীতির খুঁটির জোরে নিজেদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অবস্থা দিন দিন খারাপই হয়েছে।’

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছেন আবুল হোসেন। তার ধারণা, ভোটাররা পুরোনো রাজনীতিকে এবার বিদায় জানাবেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকা-৯ (খিলগাঁও-সবুজবাগ-মুগদা) আসনের নির্বাচনী মাঠ বেশ সরগরম। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সম্প্রতি পদত্যাগ করা স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা এবং এনসিপি নেতা জাভেদ মিয়া (রাসিন)। তবে তরুণদের এই লড়াই সহজ হবে না। তাদের বিরুদ্ধে লড়ছেন দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্ররাজনীতি করে আসা বিএনপি নেতা হাবিবুর রশীদ হাবিব।

ফুটবল প্রতীকে তাসনিম জারা এ আসনের একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী। পরিবর্তনের রাজনীতির আহ্বান জানিয়ে এই তরুণ নেতার প্রচারণা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশীদ হাবিব দলের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত এবং ধানের শীষের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এলাকায় জনসভা ও পথসভা করে জলাবদ্ধতা নিরসন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে এনসিপির জাভেদ রাসিন ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের স্পিরিট’ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ‘আমূল সংস্কারের’ কথা বলছেন। তিনি চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও গডফাদার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার।

খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা থানাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনটি একটি জনবহুল ও মিশ্র আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকা। খিলগাঁওয়ে মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের বাস। বাসাবো ও দক্ষিণ বনশ্রী বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। মুগদা দ্রুত বর্ধনশীল এলাকা হিসেবে বাণিজ্যিক ও যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া মান্ডা, মাদারটেক, গোড়ান ও নন্দীপাড়া বেশ ঘনবসতিপূর্ণ। মুগদা মেডিকেল কলেজ, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, বাসাবো বৌদ্ধমন্দির এ আসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এ আসনেই বালু নদী, রামপুরা খাল, মান্ডা খাল।

এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে বিএনপির দীর্ঘদিনের ভোট ব্যাংক ও সাংগঠনিক শক্তি বনাম তারুণ্যের রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটাররা কাকে বেছে নেবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ।

নির্বাচন ঘিরে প্রচার-প্রচারণার সময় উঠে আসছে এলাকার নানা সমস্যা। ভোটাররা বলছেন, জলাবদ্ধতা, যানজট, গ্যাস সংকট, মাঠ ও পার্কের অভাব এখানকার প্রধান সমস্যা। সবুজবাগ, খিলগাঁও এবং মুগদার রাস্তাগুলো সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায়। এ ছাড়া মাদক, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ও ছিনতাইয়ের অভিযোগও আছে। মুগদা হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য, শয্যা সংকট ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নিয়মিত পাওয়া যায়। দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা শোডাউন বা মাইক না বাজিয়ে বিকল্প উপায়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এলাকায় গিয়ে সরাসরি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা-দাদারা এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। আমিও এখানে বড় হয়েছি। এলাকার অলিগলি ও মানুষের সমস্যার সঙ্গে ছোটবেলা থেকে পরিচিত। তাই এ আসনকেই বেছে নিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘মানুষের কাছাকাছি গিয়ে কথা বলছি, তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা শুনছি। মানুষ মন খুলে কথা বলছে। এক কথায় অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি।’ প্রচারণায় এ পর্যন্ত কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি বলেও জানান তিনি।

এলাকাবাসীর মতামতের ভিত্তিতে তিনি গ্যাস সংকট নিরসন, রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা দূর করার মতো নাগরিক সুবিধা নিয়ে কাজ করতে চান। এ ছাড়া মুগদা হাসপাতালকে একটি ‘আদর্শ সেবা কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান।

জারা বলেন, ‘আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে এলাকায় স্থায়ী অফিস করব। সেখানে যে কেউ এসে তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারবেন এবং সমাধানের অগ্রগতি ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। কোনো ফাইল চাপা পড়ে থাকবে না।’

অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হাবিবুর রশীদ নিজেকে এই এলাকার ‘ঘরের ছেলে’ উল্লেখ করে বলেন, এলাকার প্রতিটি অলিগলি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক। তিনি বলেন, ‘এ এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আমি কাছ থেকে দেখেছি। আমি মনে করি, এগুলো আমারও দুঃখ। এলাকার মানুষদের নিয়েই আমি সমস্যা সমাধান করতে চাই।’

কারিগরি শিক্ষা, ফ্যামিলি কার্ড ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এলাকার নারী উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছেন তিনি। এ ছাড়া নিরাপত্তা সমস্যা, খেলার মাঠের সংকট ও রাস্তাঘাট উন্নয়নের কথাও বলছেন ভোটারদের। হাবিব বলেন, ‘ক্ষমতাকে আমি দায়িত্ব ও সেবা হিসেবে দেখি। ভোটারদের বলব, আমার কার্যক্রম, সততা ও মানুষের পাশে থাকার রেকর্ড বিবেচনা করে যেন আমাকে মূল্যায়ন করেন।’

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ‘সহযোগী’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি সংঘাতমুক্ত, সম্প্রীতির রাজনীতির দৃষ্টান্ত গড়তে চাই। এলাকার উন্নয়নে পরাজয়ের পরও প্রার্থীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরি।’ একই সঙ্গে তিনি নির্বাচন ঘিরে ‘ষড়যন্ত্র’ রুখতে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দিতে যাওয়ার আহ্বান জানান।

এনসিপি প্রার্থী জাভেদ রাসিন গণসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। জোটবদ্ধ হওয়ার কারণে ‘শাপলা কলি’র প্রতি জনসমর্থন বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা তার পক্ষে ভোট চাইছেন। জামায়াতের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে রাসিন বলেন, ‘এটি একটি কৌশলগত জোট। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা টেকসই করতে এবং সংস্কার বাস্তবায়নের স্বার্থেই এই জোট করা হয়েছে।’

তবে প্রচারণায় কিছু বাধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বড় বাধা না পেলেও প্রচ্ছন্ন হুমকি পাচ্ছি। বিভিন্ন জায়গায় ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে এবং ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। প্রশাসনকে জানানোর পরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’

বেকার তরুণদের জন্য আইটি পার্ক, ইকোনমিক জোন এবং কুটিরশিল্প তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক ও হতাশা থেকে দূরে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেন রাসিন।

এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৩ জন পুরুষ, ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৮২ জন নারী ও ৫ জন হিজড়া। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শাহ ইফতেখার আহসান, জাতীয় পার্টির কাজী আবুল খায়ের, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মো. মনিরুজ্জামান, গণফোরামের নাজমা আক্তার, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মাসুদ হোসেন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের নাহিদ হাসান চৌধুরী জুনায়েদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) খন্দকার মিজানুর রহমান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শাহীন খান ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের মোহাম্মদ শফি উল্লাহ চৌধুরী।

Related Articles

Latest Articles