2.8 C
New York

স্লোপাগান্ডা যুগ: হোয়াইট হাউসের ১০ এআই ছবি আমাদের যা শেখায়

দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা নেওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে হোয়াইট হাউস তাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে নানা মিম, উইশকাস্টিং, নস্টালজিয়া ও ডিপফেক কনটেন্ট পোস্ট করা হয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, শুরুটা হয়েছিল ট্রাম্পকে রাজা হিসেবে দেখানো একটি নকল টাইম ম্যাগাজিনের কভার ফটোর মাধ্যমে। এরপর বিষয়টি এক পূর্ণাঙ্গ ফেনোমেনন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘স্লোপাগান্ডা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, যেখানে রয়েছে সহজলভ্য এআই টুল এবং রাজনৈতিক বার্তার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।

‘শিটপোস্টিং’ হলো ইন্টারনেটে ইচ্ছাকৃতভাবে বাজে বা আপত্তিকর কনটেন্ট প্রকাশ করা যাতে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিষয়টি এখন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করেন নো ইওর মিম নামে তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইটের সম্পাদক ডন ক্যালডওয়েল।

এটি হলো সরকারি বার্তার আড়ালে ট্রলিং। আর এতে ট্রাম্প প্রশাসনের চেয়ে পারদর্শী আর কেউ নেই। তারা কেবল এআই শিল্পকে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এগোতে দেয়নি, বরং নিজের দাপ্তরিক কাজে এই প্রযুক্তি ব্যবহারও করছে।

এখানে হোয়াইট হাউসের এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি নকল ছবি তুলে ধরা হলো।

হোয়াইট হাউসের এক্স একাউন্টে প্রথমবার এআই দিয়ে তৈরি যে ছবিটি পোস্ট করা হয়, তা যেন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্সি কেমন হবে, সেই পথ নির্ধারণ করে দেয়। আর এর মধ্য দিয়েই ট্রাম্পকে জনপ্রিয় করা কিছু অনলাইন ট্রলিং বা বিতর্কিত পোস্ট সরকারিভাবে সামনে আসা শুরু করে। আগে এসব পোস্ট ফোরচ্যান, রেডিটের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হতো। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা মূলধারার সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে আসে।

নিউইয়র্ক সিটির কনজেশন চার্জ (যানজট নিয়ন্ত্রণ ফি) বাতিলের ঘোষণার সঙ্গে ছবিটি পোস্ট করা হয়েছিল। এটি মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করেছিল যে, ট্রাম্প রাজা হিসেবে শাসন করবেন। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হকুল একটি প্রেস কনফারেন্সে ছবিটি দেখিয়ে বলেছিলেন, তিনি চার্জ বন্ধ করার চেষ্টা প্রতিহত করবেন।

‘নিউইয়র্ক ২৫০ বছরের বেশি সময় ধরে কোনো রাজার অধীনে শাসিত হয়নি। নিশ্চয়ই আমরা এখন থেকে এমন কোনো কাজ শুরু করব না।’

কনজেশন চার্জ এখনো কার্যকর রয়েছে।

হাউস স্পিকার মাইক জনসন পোস্টটি সমর্থন করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বার্তা দিচ্ছেন। যুক্তি দেওয়া যায়, তিনি সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তি, যিনি এভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেছেন। এখানে তিনি স্যাটায়ার ব্যবহার করে একটি বিষয় দেখাচ্ছেন।’

ওপেন এআই-এর স্টুডিও গিবলি-ইনস্পায়ার্ড মিম জেনারেটর গত বছরের মার্চে হঠাৎ করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে যেকোনো ছবিকে প্রিয় অ্যানিমে স্টুডিওর আর্ট ফর্মে বদলানো যায়। এখানে স্টুডিও গিবলির অনুমতির কোনো দরকার হয় না।

হোয়াইট হাউস এটি ব্যবহার করেছিল এক নারীর ছবি নিয়ে, যিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন যখন ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও ইনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্টরা তাকে গ্রেপ্তার করে বিতাড়নের জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন। পোস্টে মূল ছবি, নারীর নাম এবং অপরাধের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছিল।

ক্যালডওয়েলের মতে, এটি প্রমাণ করে যে হোয়াইট হাউস অনলাইন ট্রেন্ডের সঙ্গে কতটা আপ টু ডেট। ‘হোয়াইট হাউস নতুন ফ্রেশ মিমগুলো দ্রুত গ্রহণ করছে’, বলেন তিনি। তার ধারণা হোয়াইট হাউসের কর্মীরা নিয়মিত নো ইওর মিম দেখেন। ‘স্টুডিও গিবলির মিম ট্রেন্ড এক্স হ্যান্ডলে শুরু হয় ২৫ মার্চ। আমরা পরদিনই তা কভার করি। আর এর পরদিনই হোয়াইট হাউস।’

এই ছবি প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প যেকোনো আলোচনায় নিজেকে যুক্ত রাখতে চান এবং তিনি তা করতে সক্ষম। এমনকি যেগুলো তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিতও নয়। আর এই ছবি দেখায় ট্রাম্পের আলোচনায় থাকার কৌশল কতটা কার্যকর হতে পারে।

প্রত্যাশিতভাবেই ছবিটি সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী বিষয়টি খবরের শিরোনামে আসে এবং ক্যাথলিক গোষ্ঠী ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

এই ছবির প্রতিক্রিয়ায় নিউইয়র্ক স্টেট ক্যাথলিক কনফারেন্স তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখে, ‘এই ছবিতে হাস্যরসের কিছু নেই, মাননীয় প্রেসিডেন্ট। আমরা সদ্য আমাদের প্রিয় পোপ ফ্রান্সিসকে সমাহিত করেছি এবং কার্ডিনালরা সেন্ট পিটারের নতুন উত্তরাধিকারী নির্বাচনের জন্য একটি সম্মেলনে যাচ্ছেন। আমাদের নিয়ে উপহাস করবেন না।’

এই ধরনের শিটপোস্টিংয়ে যারা অসন্তুষ্ট হন, তাদের প্রায়শই হাস্যরসের অভাব বলে খোঁচা দেওয়া হয়। পরে এক প্রেস কনফারেন্সে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা কি ঠাট্টা বুঝতে পারছে না? এখানে ক্যাথলিকদের নয়, ফেক নিউজ মিডিয়ার কথা বলা হচ্ছে… ক্যাথলিকরা এটি পছন্দ করেছে।’

নিজের রাজনৈতিক জীবনে ট্রাম্প বহুবার ভক্তদের তৈরি প্রশংসামূলক ফ্যান আর্টের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছেন (ডিজিটাল ট্রাম্প ট্রেডিং কার্ডের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই?)। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এই কাজকে আরও সহজ করে দিয়েছে। ৪ মে স্টার ওয়ার্স ভক্তদের বিশেষ দিনে হোয়াইট হাউস একটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে প্রেসিডেন্টকে শক্তিশালী এক জেডি হিসেবে দেখানো হয়। ওই ছবিতে তার হাতে ছিল লাইটসেবার দণ্ড, চারপাশে পতাকা ও ঈগলের প্রতীক।

ট্রাম্পের হাতে দেখানো লাইটসেবারের রং ভুল হলেও (কারণ স্টার ওয়ার্সে ভালো চরিত্রদের লাইটসেবার সাধারণত নীল), কিংবা হোয়াইট হাউস নিজেকে ‘এম্পায়ার’ নয়, ‘রেবেলিয়ন’ বলে দাবি করলেও—এসব নিয়ে কারো মাথাব্যথা ছিল না। কারণ এটি ছিল সম্পূর্ণ ফ্যান্টাসি আর্ট।

২০২২ সালে ট্রাম্পের একটি ডিজিটাল ট্রেডিং কার্ডে তার মুখ আনাড়িভাবে একটি সুপারহিরোর শরীরের ওপর বসানো হয়েছিল, যা দেখতে বেশ কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক লেগেছিল। পরের বছর জুলাইয়ে তাকে তুলনামূলকভাবে আরও নিখুঁতভাবে সুপারম্যানের শরীরের ওপর বসানো হয়, যেন তিনি নতুন একটি সিনেমার প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। একই সময়ে হোয়াইট হাউস একটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে ট্রাম্পকে স্যুট পরা এক সাহসী বীরের মতো রোমের ঐতিহাসিক কলোসিয়ামের ভেতর দিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। শুধু সরকারি পক্ষ নয়, ট্রাম্পের ভক্ত ও সমর্থকরাও এমন অসংখ্য কাল্পনিক, অতিনাটকীয় ও নায়কোচিত ছবি ও কনটেন্ট তৈরি করেন।

হোয়াইট হাউস কেন ডেমোক্র্যাটিক হাউস নেতা হাকিম জেফ্রিস ও সিনেট নেতা চাক শুমারকে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী সোমব্রেরো টুপি পরিয়ে হাতে টাকোর প্লেট ধরিয়ে ছবি বানিয়েছে—তার কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা নেই। সেটি গুরুত্বপূর্ণও নয়। ছবিতে তাদের কিছুটা হাস্যকর মনে হয়, এটি সচেতনভাবে বিতর্ক ও অপমান উসকে দেয় এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আবার সেখানে আটকে যায়।

এই ছবি প্রমাণ করে, এমন পোস্টের প্রতিক্রিয়া জানানো কতটা কঠিন। এটি একটি ধারাবাহিক ঠাট্টা বা ট্রলিংয়ের অংশ, যার শুরু হয়েছিল এক মাস আগে ট্রাম্পের শেয়ার করা একটি ডিপফেক ভিডিও দিয়ে, যেখানে জেফ্রিসকে বিকৃতভাবে সোমব্রেরো ও গোঁফ পরানো হয়েছিল।

ভিডিওটি ব্যাপকভাবে আপত্তিকর ও বর্ণবাদী হিসেবে নিন্দিত হয়। বিশেষ করে জেফ্রিস নিজেই এর কড়া সমালোচনা করেন (জবাবে তিনি ট্রাম্প ও যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের একটি বাস্তব ছবি পোস্ট করেন)। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। তারা হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমের পর্দায় কয়েক ঘণ্টা ধরে ভিডিওটি বারবার চালাতে থাকে এবং একই ধাঁচের আরও ছবি তৈরি করে—যার ফলে এই ট্রলিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বাইরে খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি ‘স্বর্ণযুগে’ আছে। তবুও ট্রাম্প বার বার এই দাবি করে যাচ্ছেন। জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউস একটি এআই-তৈরি ভিডিও পোস্ট করে, যেখানে সোনালি রঙের হোয়াইট হাউসের সামনে স্বর্ণমুদ্রার বৃষ্টি দেখানো হয়। ভিডিওতে লেখা ছিল—’হোয়াইট হাউস? এখন তার স্বর্ণযুগে’ এবং পেছনে বাজছিল ব্রুনো মার্সের গান ‘টুয়েন্টিফোর কে ম্যাজিক’।

ট্রাম্পের তথাকথিত ‘মিডাস টাচ বা সোনার স্পর্শ’ যদি কেবল কল্পনার ফলও হয়, তবুও এ ধরনের আশাবাদী প্রচারণা (উইশকাস্টিং) বাস্তবে যতটা মনে হয়, তার চেয়েও বেশি কার্যকর। ‘স্লোপাগান্ডা’ শব্দের প্রবর্তক গবেষক মিখাউ ক্লিনচেভিচ, মার্ক আলফানো ও আমির এব্রাহিমি ফারদের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘ভুল প্রমাণিত তথ্য সংশোধনের পরও মানুষের বিশ্বাস ও চিন্তায় তার প্রভাব থেকে যেতে পারে।’ অর্থাৎ, আপনি জানেন যে কোনো তথ্য মিথ্যা, তবুও আপনার মস্তিষ্ক সেটিকে আংশিকভাবে সত্য বলে ধরে নেয়।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি কোনো সাধারণ পোস্ট—অর্থাৎ ‘ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড চান’। কিন্তু এর ভেতরে রয়েছে আরও অনেক বেশি অন্ধকার ও উদ্বেগজনক বার্তা।

ক্যালডওয়েল ব্যাখ্যা করেন, এই পোস্ট একটি জনপ্রিয় মিমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ছবিটি মূলত ইউ-গি-ও! মাঙ্গা সিরিজ থেকে এসেছে এবং ২০২১ সালের দিকে অনলাইনে এটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে।

‘গ্রিনল্যান্ডের জনগণ, কোন পথ বেছে নেবে?’—এই স্লোগানটি সম্ভবত ১৯৭৮ সালের এক নব্য-নাৎসি বই ‘হুইচ ওয়ে, ওয়েস্টার্ন ম্যান?’ থেকে অনুপ্রাণিত, যেখানে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী লেখক উইলিয়াম গেইলি সিম্পসন ইহুদি ও কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং দেশ ত্যাগের আহ্বান জানান এবং হিটলারকে সমর্থন করেন।
 
যুক্তরাষ্ট্রের নব্য-নাৎসি গোষ্ঠীগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা সংস্থা গ্লোবাল প্রজেক্ট অ্যাগেইনস্ট হেট অ্যান্ড এক্সট্রিমিজমের সহপ্রতিষ্ঠাতা হেইডি বেইরিচ বলেন, ‘এই প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ছবি ব্যবহার করা সত্যিই ভয়ংকর ও উদ্বেগজনক।’ তিনি বলেন, ‘এই ধারণা বর্ণবাদী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানুষের কাছে আবেদন তৈরি করে, যারা মনে করেন যে ক্ষমতায় কেবল শ্বেতাঙ্গদেরই থাকা উচিত।’

আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ আইসিইর (আইসিই) জন্য একটি ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পোস্ট করে, যেখানে ‘আঙ্কেল স্যাম’-কে একটি দ্বিমুখী পথের সামনে দেখানো হয় এবং লেখা ছিল—’আমেরিকার জনগণ, কোন পথ বেঁচে নেবে?’

চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ একটি ছবি পোস্ট করে, যাতে লেখা ছিল—’এক দেশ, এক মানুষ, এক ঐতিহ্য।’ সমালোচকেরা বলেন, এতে হিটলারের বিখ্যাত নাৎসি স্লোগানের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়।

আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল মিডিয়া কালচারের সহকারী অধ্যাপক ড্যানিয়েল দে জেউ বলেন, ‘এআই অতীতের ছবি ও ভিজ্যুয়াল উপাদান পুনরায় ব্যবহার করতে খুব দক্ষ, তাই এটি এমন নস্টালজিক ছবি তৈরি করতে পারে যা মানুষকে পুরনো সময়, ঐতিহ্য ও পরিচিত রীতিনীতি মনে করিয়ে দেয়।’

ফলে আইসিইর সামরিকায়িত পুলিশিংয়ের মতো এই সময়ের চরমপন্থী বার্তাকে এমন গ্রাফিক বা চিত্রশৈলীতে দেখানো যেতে পারে, যা মানুষের কাছে বেশ পরিচিত ও স্বস্তিদায়ক মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, দেশপ্রেমিক নিয়োগের পোস্টার, ৮০-এর দশকের অ্যাকশন সিনেমার পোস্টার, বা ১৯৫০-এর দশকের সরকারি প্রচারণার (যেমন সম্প্রতি ট্রাম্পকে বন্ধুভাবাপন্ন মিল্কম্যান হিসেবে দেখানো ছবি) কথা বলা যেতে পারে।

দে জেউ আরও বলেন, ‘এআই স্বভাবতই অতীতমুখী, কারণ এটি ইতিহাসভিত্তিক ছবির ওপর প্রশিক্ষিত।’ এই নান্দনিকতার ধরন ‘মেক অ্যামেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ আন্দোলনের সঙ্গে মানানসই, কারণ তা সবসময় পুরনো, ‘ভালো’ সময়কে মনে করিয়ে দেয়।

আরেকটি চমকপ্রদ উদাহরণ হলো হোমল্যান্ড সিকিউরিটির গত বছরের ডিসেম্বরের একটি ভয়ঙ্কর পোস্ট। এতে নির্জন সমুদ্র সৈকতে পামগাছের পাশে একটি একটি ভিনটেজ গাড়ি দেখানো হয়। সেখানে লেখা ছিল—’১০ কোটি (অভিবাসী) বিতাড়নের পর আমেরিকা’। ছবিটির মূল ক্যানভাস জাপানি শিল্পী হিরোশি নাগাইয়ের আঁকা। তার অভিযোগ ছিল, এটি অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে।

মিনিয়াপোলিসের প্রখ্যাত সিভিল রাইটস আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট নেকিমা লেভি আর্মস্ট্রং গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হন। যখন ভিডিও ধারণ করা হচ্ছিল, তখন এক এজেন্ট বলেছিলেন, ‘এটি টুইটারে পোস্ট করা হবে না।’ কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভিডিও থেকে নেওয়া একটি ছবি টুইটারে পোস্ট করা হয়। ছবিতে আর্মস্ট্রংকে শান্ত ও স্থির এবং খুব কম আবেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়।

আধাঘণ্টা পর হোয়াইট হাউসের এক্স অ্যাকাউন্ট একই ছবির একটি পরিবর্তিত সংস্করণ পোস্ট করে। তাতে আর্মস্ট্রংকে অতিরঞ্জিতভাবে বেশ দুঃখিত দেখানো হয়। ছবিতে দেখা যায়, গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তার ত্বকের রঙও কালচে করা হয়।

ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘গ্রেপ্তার: মিনেসোটার চার্চে দাঙ্গার পরিকল্পনার জন্য উগ্র-বামপন্থী উসকানিদাতা নেকিমা লেভি আর্মস্ট্রং।’ বাস্তবে আর্মস্ট্রং একটি চার্চে ধর্মীয় প্রার্থনা অনুষ্ঠানে প্রতিবাদ করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি এমন এক ধর্মগুরুর নেতৃত্বে হয়েছিল, যাকে আইসিই-সংশ্লিষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। পরে অবশ্য আর্মস্ট্রংকে অভিযুক্ত করা ছাড়াই মুক্তি দেওয়া হয়।

আগে হোয়াইট হাউসের এআই-সৃষ্ট ছবি দেখতে বেশ অদ্ভুত ও অযৌক্তিক ছিল। মানুষ সহজেই বুঝত এগুলো বাস্তব নয়। কিন্তু এই নতুন ছবিটি সত্যিকারের ছবির মতো দেখানোর চেষ্টা হয়েছে, যা কেবল ট্রোলিং নয়। বরং এটি এআইয়ের সাহায্য নিয়ে তৈরি ডিপফেক, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য তৈরি।

মাস্কের সম্প্রতি শেয়ার করা গ্রক টুলের মতো এই ছবিরও একটি নির্যাতনমূলক দিক আছে। এআই ব্যবহার করে একজন নারীর ছবি পরিবর্তন করে তাকে দুর্বল ও বেশি দুঃখী দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। মাস্কের ওই টুল নারী ও শিশুদের পোশাক তাদের অনুমতি ছাড়াই সরিয়ে ফেলতে পারে।

ডে জেউর মতে, ডিপফেক পুরোপুরি বাস্তব না হলেও সেটাই উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘এখানে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা হলো মিথ্যা সৃষ্টির ক্ষমতা। আপনি দেখাচ্ছেন, ছবি ও প্রমাণ কীভাবে ভুয়া হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।’

ডিপফেকের বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর হোয়াইট হাউসের ডেপুটি কমিউনিকেশনস ডিরেক্টর কেইলান ডর প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, ‘আইনের প্রয়োগ চলবে। মিমগুলো চলতেই থাকবে।’

ট্রাম্প এবং একটি পেঙ্গুইনকে গ্রিনল্যান্ডের পতাকার দিকে হাঁটতে দেখানো ছবির প্রতিক্রিয়ায় কিছু পর্যবেক্ষকের ভাষ্য, বাস্তবে পেঙ্গুইন তো দক্ষিণ মেরুতে থাকে। তবে, লন্ডনের বার্কবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল মিডিয়া ও রেটোরিক বিভাগের রিডার রবার্ট টোপিনকা বলছেন, ‘এ ধরনের পোস্টের মূল বিষয় সেটি নয়।’

‘এগুলোকে মানুষ এখনো বৈধ যুক্তি বা প্রমাণ মনে করেন, কিন্তু এগুলো মূলত আবেগের ফাঁদ।’ উদ্দেশ্য হলো সমর্থকদের উসকে দেওয়া। ‘হোয়াইট হাউসের কর্মীরা বলেছেন, এআই ব্যবহার করা হয় দ্রুত কনটেন্ট প্রকাশ করার জন্য; সত্যি বলার জন্য নয়, প্রোপাগান্ডা দ্রুত ছড়ানোর জন্য।’

যারা বিষয়টি জানেন, তাদের কাছে এটি ‘নিহিলিস্টিক পেঙ্গুইন’ মিমের একটি রেফারেন্স, যা টিকটকে সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। হারজোগের ২০০৭ সালের ‘এনকাউন্টারস অ্যাট দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ ডকুমেন্টারিতে দেখা যায়, একটি পেঙ্গুইন অজানা কারণে কলোনি থেকে আলাদা হয়ে অ্যান্টার্কটিকার দিকে চলে যাচ্ছে, যেখানে মৃত্যু নিশ্চিত। হারজোগ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন রাখেন, ‘কেন’ পেঙ্গুইনটি চলে যাচ্ছে? ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের অযৌক্তিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রেও অনেকে একই প্রশ্ন তুলেছেন।

ডে জেউ বলেন, এই ছবি সেই ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যা নাওমি ক্লেইন ও অ্যাস্ট্রা টেইলর ‘শেষ সময়ের ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রযুক্তি খাতের নেতা এবং তাদের সহযোগীরা পৃথিবীর সমাপ্তি কামনা করছেন। একইভাবে ট্রাম্প ও তার পেঙ্গুইন সঙ্গী অনিশ্চিত বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে।

‘মনে হচ্ছে তারা জানে যে শেষের দিকে এগোচ্ছে, কিন্তু তা আনন্দের সঙ্গে করছে।’

Related Articles

Latest Articles