’খেলাটার জন্য এক দু:খের মুহুর্ত’—বাংলাদেশের বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার প্রতিক্রিয়ায় ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন এই বাক্যটি ব্যবহার করেছে। তবে কেবল খেলার জন্যই দুঃখজনক নয়; ক্রিকেটারদের জন্য এই পরিস্থিতি অতি বেদনার, যারা কিনা বিশ্ব আসরে নিজেদের মেলে ধরতে অধীর অপেক্ষায় ছিলেন। সেইসব খাঁটি ভক্তদের জন্যও ভীষণ কষ্টের, যারা ক্রিকেটকে স্রেফ ক্রিকেটের জন্যই হিসেবেই ভালোবাসেন।
ক্রিকেটারদের স্বার্থরক্ষা করা সংগঠনটি লিটন দাসদের জন্য স্বাভাবিক কারণেই সমব্যথী। বাংলাদেশের বিশ্বকাপে না থাকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সবচেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আক্রান্ত ক্রিকেটাররা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব পুরো ক্রিকেট কাঠামোতেই পড়তে পারে।
খেলা রাজনীতির বাইরের কোনো বিষয় নয়। তবে যখন রাজনীতিই খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন অস্বাভাবিক সব পরিস্থিতির জন্ম হয়। যেখান থেকে রাজনীতিবিদরা ফায়দা লুটে নিলেও দিনশেষে আক্রান্ত হন মূল স্টেকহোল্ডাররা।
মোস্তাফিজুর রহমানকে বিসিসিআই আইপিএল থেকে “রাজনৈতিক কারণে” বাদ দেওয়া থেকেই ইস্যুটির শুরু। পরে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুরুতেই ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ না খেলার ‘হার্ড লাইনে’ চলে যাওয়া এবং সবকিছুর অতি-রাজনীতিকরণ পুরো পরিস্থিতিকে এলোমেলো করে দিয়েছে। ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ চলে গিয়ে বিশ্বকাপ জলাঞ্জলি দেওয়ার আগে দায়িত্বশীলরা খেলা, খেলোয়াড় এবং প্রকৃত ভক্তদের কথা একবারও ভাবেননি।
ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকার ১৮ দিন পর ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন তারা। তবে সেই আলাপ কোনো মতামত জানার জন্য ছিল না, ছিল স্রেফ নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্তের যুক্তি তুলে ধরার জন্য।
গোটা ব্যাপারটা ঘটেছে অনেকটা ‘মব’ সংস্কৃতির আবহে। দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে উসকে দেওয়া হয়েছে আবেগ; স্থির চিন্তা ও যুক্তিকে কোনো পর্যায়েই গ্রাহ্য করা হয়নি। কেউ বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইলে তাকে দেওয়া হয়েছে ‘আপত্তিকর ট্যাগ’। এই ভয়েই সুবিবেচনাবান মানুষ এবং উদ্বিগ্ন ক্রিকেটাররা নীরবে বুকের যন্ত্রণা পুষেছেন।
বিশ্বকাপ না খেলায় বিসিবির সামনে এখন বিশাল আর্থিক ক্ষতি। কিন্তু এই ক্ষতির শঙ্কা উপেক্ষা করেই তারা বেপরোয়া ছুটেছিলেন। সব ধাপে হেরে যাওয়ার পর আচমকা সব হম্বিতম্বিও যেন মিলিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের কথা জোর দিয়ে বললেও, বাংলাদেশের বদলে স্কটল্যান্ডের নাম ঘোষণার পর বিসিবি সব মেনে নিচ্ছে। অর্থাৎ, আইসিসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে আর কিছু করার নেই তাদের।
ভেন্যু বদলের আবেদন জানানোর পর বিসিবির অবস্থান ছিল অনড়—যে অবস্থানে আসলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয় না। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি প্রক্রিয়া শেষে আইসিসির বোর্ড সভায় ভোটেও হয়েছে শোচনীয় হার। এরপর আর কোনো লড়াই বাকি থাকে না।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কথায় মনে হয়েছিল, তাদের এমন কোনো খুঁটির জোর আছে যা দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও কাবু করতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত তেমন কিছুই হয়নি। বাতাসে এখন বিষণ্ণতা; বিশ্বকাপ শুরু হলে তার রেশ আরও বাড়বে।
এমনিতেই ঘরে-বাইরে বোর্ডের লেজেগোবরে অবস্থা। বিশ্বকাপ খেলতে না পারার বিপর্যয়ের পাশাপাশি বিশাল আর্থিক ধাক্কা ও ক্রিকেটীয় দিক থেকে পিছিয়ে পড়ার আভাস স্পষ্ট। এর মধ্যে ঘরোয়া ক্রিকেটও স্থবির হয়ে আছে। কোনোভাবে বিপিএল শেষ করা গেলেও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। আগের সব অনিয়মকে সঙ্গী করে শুরু হওয়া বিপিএলের শেষ দিকে ফিক্সিং কেলেঙ্কারি বড় হয়ে সামনে এসেছে। খোদ এক পরিচালকের বিরুদ্ধে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ উঠেছে। মোখলেসুর রহমান শামীম নামের সেই পরিচালককে স্থায়ী কমিটির পদ থেকে সরাতে বাধ্য হয়েছেন সভাপতি। ফিক্সিংয়ের অভিযোগ ফেসবুক লাইভে তুলেছেন আরেক ফ্র্যাঞ্চাইজির উপদেষ্টা।
শনিবারের বোর্ড সভার মধ্যেই খবর আসে, পদত্যাগ করেছেন বিসিবির প্রভাবশালী পরিচালক ইশতিয়াক সাদেক। আরও একাধিক পরিচালক সরে যাওয়ার গুঞ্জন আছে। বোর্ড সভাপতির সঙ্গে দূরত্ব এবং নিজেদের নানা ইস্যুতে বনিবনা না হওয়া নিয়ে পরিচালকদের দ্বন্দ্ব এখন ওপেন সিক্রেট।
অন্যদিকে, বিতর্কিত পরিচালকদের ব্যাপারে কোনো সুরাহা নেই। ক্রিকেটারদের কটূক্তি করে আন্দোলনের মুখে স্থায়ী কমিটির পদ থেকে এম নাজমুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল; বিপিএলের পর তাকে আবার পুনর্বহাল করা হয়েছে। ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ডের দূরত্ব এখন আরও স্পষ্ট।
বিপিএলের মধ্যেই একাধিক দাবি সামনে এনে ক্রিকেটাররা ম্যাচ বয়কট করে বিসিবির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের অচলাবস্থা ও দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন চরমে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই, ঘরোয়া ক্রিকেটের পরবর্তী সূচি নিয়ে কারো কাছে কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই। বিপিএল চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের অধিনায়ক ও দেশের টেস্ট দলপতি নাজমুল হোসেন শান্ত প্রকাশ্যে নিজের হতাশা প্রকাশ করেছেন।
ঘরে-বাইরে খেলা বন্ধ, সংগঠকদের বিরোধ এবং বোর্ড কর্তাদের নিয়ে ক্রিকেটারদের চরম অসন্তোষ এখন তুঙ্গে। ব্যর্থতার পাহাড় ঢাকতে নির্বাসিত দেশের সফলতম ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে ফেরানোর ‘চমকপ্রদ’ কথা শুনিয়েছে বিসিবি। চলমান আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য এটি কোনো চাল কিনা, তা নিয়ে শুরুতেই প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে কেবল বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার ক্ষতিই নয়, অচলাবস্থায় আক্রান্ত দেশের ক্রিকেট দেখছে ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক সময়। পরিহাস হলো, এই চূড়ান্ত পতনকালে সভাপতি এবং সহ-সভাপতি—উভয়ই সাবেক অধিনায়ক। দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে তারা কাজ করছেন কিনা, দুঃখজনকভাবে এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রকৃত অর্থেই এক দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে।
