-3 C
New York

ঢাকায় মুক্ত বাতাসে শরীরচর্চা: সুস্বাস্থ্য নাকি স্বাস্থ্যঝুঁকি?

সুস্বাস্থ্যের কথা ভাবলেই সবার আগে মনে আসে সকালের নির্মল বাতাসে হাঁটাহাঁটি, দৌড়ানো বা খোলা মাঠে শরীরচর্চার কথা। শিশু–কিশোরদের ক্ষেত্রে খোলা জায়গায় খেলাধুলা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক বিকাশের জন্যও অপরিহার্য। কিন্তু স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের চিরায়ত এই ধারণাই এখন প্রশ্নের মুখে, বিশেষ করে ঢাকাবাসীর জন্য।

গত কয়েক বছর ধরে রাজধানী ঢাকার বাতাস এতটাই দূষিত হয়ে উঠেছে যে, নিয়মিত শরীরচর্চা করা মানুষদের জন্যও বাইরে বেরোনো হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় আছে শিশুরা—যাদের ফুসফুস ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি।

আজ রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) বা বায়ুর মান সূচকে গড় স্কোর ছিল ৩১৬, যা বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।

প্রায় প্রতিদিনই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআইয়ের দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষ দশে থাকছে বাংলাদেশের রাজধানীর নাম।

এই বাস্তবতায় ‘স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বাইরে বের হওয়া’—এই চেনা পরামর্শ ঢাকার মানুষের জন্য আদৌ কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসে গেছে।

ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ এখন একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যসংকটে পরিণত হয়েছে। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত কারণে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষ প্রাণ হারান।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের (ইপিআইসি) এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু দূষণের কারণে প্রায় সাত বছর কমে যাচ্ছে।

বিশেষত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকে এবং ধূলিকণা মাটির কাছে ঘন হয়ে জমে থাকে। এই সময়টাতে ঢাকার বাতাস কার্যত ‘বিষে’ পরিণত হয়।

আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (আইকিউআই) অনুযায়ী, একিউআই মান শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বায়ু ‘ভালো’ হিসেবে বিবেচিত হয়।

৫০ থেকে ১০০ হলে ‘মাঝারি’, ১০১ থেকে ১৫০ হলে ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’, ১৫১ থেকে ২০০ হলে ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ হলে ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০০-এর বেশি হলে তা ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে ধরা হয়, যা মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

আইকিউআই তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা দূষিত বাতাসের শহরগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই শীর্ষে ছিল।

এসময় একিউআই স্কোর প্রায় ৩৪১ থেকে ৪২২ পর্যন্ত ওঠায় শহরটির বাতাসের মান ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে ধরা হয়। নভেম্বর মাসে ঢাকার একিউআই স্কোর ১৯৩ থেকে ২৫৫ পর্যন্ত দেখা গেছে।

ঢাকার বাতাসে বর্তমানে পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম ২.৫-এর ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত বাৎসরিক গড় সীমার চেয়ে অনেক সময় ১০ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি থাকে।

বিশ্বব্যাংকের হিসেব মতে, বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতি হয়।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ মিনিটে ৭ থেকে ৮ লিটার বাতাস গ্রহণ করলেও শরীরচর্চার সময় তা ১০০ লিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে ফুসফুসের বায়ুথলিতে সাধারণের তুলনায় বেশি বিষাক্ত পিএম ২.৫ কণা জমা হয়।

তিনি আরও বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে এটা জীবনঘাতী হতে পারে। কারণ তাদের শ্বাসনালী সরু এবং শরীরের ওজনের অনুপাতে বিপাকীয় হার বেশি হওয়ায় তারা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করে।

আইকিউএয়ার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরামর্শ অনুযায়ী, একিউআই স্কোর যখন ১৫১ বা তার বেশি হয়, তখন বাইরে ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

শিশুদের ফুসফুস পরিপূর্ণভাবে গঠিত নয় এবং তাদের বিপাকীয় হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি অক্সিজেন (ও দূষিত বাতাস) গ্রহণ করে। এতে তাদের ফুসফুসের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের ২০২৪ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকায় বায়ুমান সবচেয়ে খারাপ থাকে রাত ৯টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত।

এই সময় অফিসগামী মানুষ ও স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীরা দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে আসে সবচেয়ে বেশি। তাই প্রথাগত ‘মর্নিং ওয়াক’-ও এখন আর নিরাপদ নয়।

বায়ুমান তুলনামূলক ভালো থাকে বিকেল ৩ থেকে ৫টার মধ্যে। এছাড়া, সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বায়ুমান তুলনামূলক ভালো থাকে।

ঘরের ভিতরের বাতাসও সবসময় নিরাপদ নয়। আমেরিকার এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) অনুযায়ী, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন না থাকলে ঘরের বাতাস বাইরের চেয়ে ২-৫ গুণ বেশি দূষিত হতে পারে।

রান্নার ধোঁয়া, কার্পেটের ধুলো ও আসবাবপত্রের রাসায়নিক এর প্রধান কারণ। তাই ঘরে ইনডোর প্ল্যান্ট রাখা বা ভালো মানের এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা জরুরি।

সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক আইকিউএয়ারের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের তথ্যে ঢাকার বিশেষ কিছু এলাকায় দূষণের মাত্রা বেশি দেখা গেছে।

আজ রবিবার সকালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মধ্যে সবচেয়ে দূষিত বাতাস পাওয়া গেছে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্ট এলাকায়, একিউআই স্কোর ৫৭২। বায়ুর মানের ক্ষেত্রে যা বিপজ্জনক। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইকিউএয়ার এবং স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার কয়েকটি এলাকা নিয়মিতভাবে দূষণের শীর্ষে থাকে। এর মধ্যে আছে খিলক্ষেত ও নিকুঞ্জ এলাকা, ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান ও বারিধারা, পুরান ঢাকা, দক্ষিণ পল্লবী ও গোড়ান।

এসব এলাকায় বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় কারণ নির্মাণকাজ বা রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, শিল্পকারখানা, ইটভাটা ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া, গৃহস্থালি ও রান্নার কাজ এবং বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া।

তবে যেসব এলাকায় গাছপালা বেশি, আশপাশে জলাশয় আছে, সেসব স্থানের বাতাসে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক কম। যেমন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ক্যান্টনমেন্টর ভেতরের এলাকা।

নিয়মিত শরীরচর্চা ও সূর্যের আলো আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এটি রক্তসঞ্চালন ও মেটাবলিজম বাড়ায়, শরীরে ভিটামিন ডি উৎপাদন হয় এবং মানসিক চাপ কমায়।

শিশু-কিশোরদের জন্য হাড় ও পেশীর বিকাশে খেলাধুলা করা জরুরি, যা সহমর্মিতা ও দলগত কাজ শেখাতেও সাহায্য করে।

শীতকালে খুব সকালে দূষণ সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই একদম সকালে না বেরিয়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে অল্প সময়ের জন্য রোদে যেতে পারেন। সময় থাকলে বিকেলের দিকেও শরীরচর্চা করতে পারেন।

একিউআই স্কোর ২০০ পার করলে বাইরে না যাওয়াই ভালো। এই সময় ঘরেই যোগ ব্যায়াম, ফ্রি-হ্যান্ড বা ট্রেডমিলে ব্যায়াম করুন।

ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে।

সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক দূষণ আটকাতে পারে না। তাই যদি বাইরে ব্যায়াম করতে বা হাঁটতে যেতেই হয়, এন‑৯৫ বা এফএফপিটু পলিউশন মাস্ক ব্যবহার করুন।

রাস্তার ধারে বা যেখানে গাড়ি বেশি চলে সেখানে ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকুন। রমনা পার্ক বা বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো এলাকাগুলোতে দূষণ শহরের মূল রাস্তার তুলনায় কিছুটা কম।

বৃষ্টি পরের কয়েক ঘণ্টায় ধুলো ও পিএম২.৫ কণা কমে যায়। ব্যায়ামের জন্য এই সময়টা বেছে নেওয়া যেতে পারে।

তবে হাঁপানিতে আক্রান্ত, হৃদরোগী বা শিশু ও প্রবীণরা অধিক দূষণের সময় বাইরে না বের হওয়াই ভালো।

আরেকটা ভালো উপায় হতে পারে নিয়মিত একিউআই স্কোর দেখে বের হওয়া। 

Related Articles

Latest Articles