মিরপুর-১১ নম্বরের বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা বাবলু প্রায় প্রতিদিনই উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটান। জনাকীর্ণ ক্যাম্পে ছোট থেকে তিনি দেখছেন পানি আর গ্যাসের সংকট। প্রায় বস্তির মতো এই ক্যাম্পে সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে বেড়ে ওঠা বাবলু এখন ভোটার। তার চাওয়া সব ধরনের নাগরিক সুবিধা এবং স্থায়ী আবাসন।
শুধু বিহারি ক্যাম্প নয়, ঢাকা-১৬ আসনের রূপনগর, কালশী ও পল্লবী এলাকাজুড়ে সমস্যার শেষ নেই। মাদক ও ছিনতাই এখানকার প্রধান সমস্যা। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। খালগুলো পরিণত হয়েছে নর্দমায়। পোশাক কারখানাগুলোকে কেন্দ্র করে নিয়মিতই ঘটে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ঘটনা। বছরে কয়েক দফা আগুন লাগে এলাকার বিভিন্ন বস্তিতে।
পল্লবী হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা ব্যবসায়ী এ এম সলিমুল্লাহ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঢাকার এক প্রান্তে হওয়ায় আমাদের সমস্যাগুলো সেভাবে সামনে আসে না। এখানে সার্বিকভাবে নিরাপত্তার সমস্যা আছে। প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চলে, চুরি-ছিনতাই বাড়ছে। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব সমস্যা দেখা হচ্ছে না।’
নির্বাচনের পর এসব সমস্যা কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন তিনি। সলিমুল্লাহ বলেন, ‘আমরা বসবাসের জন্য সুন্দর পরিবেশ ও নিরাপত্তা চাই। নির্বাচিত সরকার এলে অস্থিতিশীলতা হয়তো কিছুটা কাটবে। আমি চাই সুস্থ রাজনীতির মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন জীবন শান্তিপূর্ণ হোক।’
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় বিএনপির প্রচারণা জোরেশোরে শুরু হচ্ছে এবং অন্যান্য দলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রচারণাও দৃশ্যমান হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পল্লবী ও রূপনগর থানাধীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন দলটির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আহ্বায়ক ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন।
দুই প্রার্থীই এলাকায় জোরেশোরে প্রচারণা শুরু করেছেন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঢাকা মহানগর উত্তরের দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মনসুর ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জামায়াত ও বিএনপি দুই দলই বেশ আগে থেকে গণসংযোগ চালিয়ে আসছে। জামায়াতের কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে বস্তি এলাকাগুলোতে গিয়ে প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলছেন। বিএনপিও মিছিল-মিটিং করছে।’
এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১ হাজার ১৬৮, নারী ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩২৩ এবং হিজড়া ভোটার ৮ জন।
এ আসনে ৫০ হাজারের বেশি ভোটারের বাস বিহারি ক্যাম্পে। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সংগঠন উর্দু স্পিকিং পিপলস ইয়ুথ রিহ্যাবিলিটেশন মুভমেন্টের সভাপতি সাদাকাত খান বলেন, ‘মৌলিক অধিকারের কিছুই আমরা পাই না। শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে কেউ খবর রাখে না। প্রতিদিন ক্যাম্পের জায়গা দখল হচ্ছে। আমাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা নিয়মিত ঘটনা। এই ক্যাম্পে বাস করে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।’
স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বসবাসের জন্য স্থায়ী কোনো বন্দোবস্ত না করা পর্যন্ত ক্যাম্পে শান্তি ফিরবে না। অতীতে অনেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমাদের সবাই ব্যবহার করে, কিন্তু নির্বাচনের পর আর খোঁজ নেয় না।’
‘যে প্রার্থী তার ইশতেহারে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি রাখবেন তিনি আমাদের ভোট পাবেন,’ বলেন সাদাকাত।
জানতে চাইলে বিএনপি প্রার্থী আমিনুল হক বলেন, ‘গত ৪ মাসের বেশি সময় ধরে এলাকার মানুষের কাছে যাচ্ছি। জনগণের কথা শুনছি, সে অনুযায়ী সমস্যা নথিভুক্ত করছি। আমি নির্বাচিত হলে ক্রমান্বয়ে সব সমস্যা সমাধানে কাজ করব। কর্মপরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছি, এলাকার বাসিন্দাদের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’
বিহারি ক্যাম্পের সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে অনেকেই ক্যাম্পে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমি ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা সরকার গঠন করলে পর্যায়ক্রমে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের কাজ শুরু করব। এটা করতে পারলে সেখানে অপরাধসহ অন্যান্য সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে।’
নিজের সংসদীয় আসন সম্পর্কে আমিনুল বলেন, ‘আমি এখানেই বড় হয়েছি, এখানকার মানুষ বহু বছর ধরে আমাকে চেনেন, ভালোবাসেন। খেলাধুলার কারণে আলাদাভাবে তারা আমাকে পছন্দ করেন, রাজনীতিতে আসার পরও তাদের সমর্থন পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ভ্রাতৃত্ববোধ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার রাজনীতি করতে চাই। সব মতের সবাই মিলেমিশে থাকবে। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমি মনে করি, এলাকার মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেবেন।’
জামায়াত প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন বলেন, ‘গত জুলাই থেকে আমি এলাকার মানুষের কাছে যাচ্ছি। সবার কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। এই আসনে আমার বেশ জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। মানুষ এখন চাঁদাবাজি, সম্পদ হরণ ও অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে। এ জায়গা থেকে ভোটাররা জামায়াতে ইসলামীকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। কারণ জামায়াতে ইসলামী ছাড়া বাকি দলগুলোকে অতীতে তারা দেখেছে।’
ক্যাম্পের বাসিন্দাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ‘আকুতি’র প্রতি সাড়া দিয়ে আব্দুল বাতেন বলেন, ‘তারা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য সুন্দর পরিবেশ চায়। অতীতে শাসক দল এই ক্যাম্পগুলোকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করেছে। এই খপ্পর থেকে তারা মুক্তি চান। আমরা তাদের আকুতি পূরণে কাজ করব, যেন তারা স্বাভাবিক জীবনের দিকে যেতে পারে।’
তবে দুই প্রার্থীই নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বাতেন বলেন, ‘প্রতিপক্ষ মরিয়া হয়ে ফলাফল নিজেদের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করবে। অতীতে আমরা ভোটের দিন প্রার্থীদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, এজেন্টদের বের করে দিয়ে সিল মারার চেষ্টাসহ নানা অনৈতিক কার্যক্রম দেখেছি। তবে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আমার আস্থা আছে। আশা করব, ভোটকেন্দ্রে আসার পথে যাতে প্রার্থীদের বাধা না দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সজাগ দৃষ্টি রাখবে।’
অন্যদিকে আমিনুল বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট দলের লোকজন বিভিন্ন বাসায় গিয়ে এনআইডি কার্ড সংগ্রহের চেষ্টা করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিকাশ নম্বরও নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। তারা কী উদ্দেশ্যে, কোন ষড়যন্ত্রের আশায় এসব করছে, তা জানি না। তবে আমরা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাচ্ছি। আমরা বিষয়গুলো নিয়ে সতর্ক আছি।’
এ আসনের অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মোহাম্মাদ তৌহিদুজ্জামান, মুক্তিজোটের আব্দুল কাদের জিলানী, গণঅধিকার পরিষদের মো. মামুন হোসেন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির এ কে এম মোয়াজ্জেম হোসেন, এনপিপির মো. তারিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির মো. নাজমুল হক, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের রাশিদুল ইসলাম ও জাতীয় পার্টির সুলতান আহম্মেদ সেলিম।
