-3 C
New York

মূলধারার যে ১০ সিনেমাতে দারুণ অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম উচ্চারিত হলে প্রথমেই সামনে আসে তার সত্যজিৎ রায়ের অভিনেতা পরিচয়টি। 

‘অপুর সংসার’ থেকে শুরু করে ‘ঘরে বাইরে’, ‘অশনি সংকেত’—এই ছবিগুলো তাকে বাঙালির চোখে একজন ‘আর্ট ফিল্মের অভিনেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। 

কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে থেকে গেছে তার আরেকটি বড় পরিচয়—মূলধারার বা জনপ্রিয় ধারার সিনেমায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়। 

যেখানে তিনি শুধু নায়কের বাইরেও ছিলেন একজন সচেতন অভিনেতা। স্টারডমের পাশাপাশি তিনি অভিনয় দক্ষতার সহাবস্থান করিয়েছিলেন।

‘ঝিন্দের বন্দী’ থেকে ‘আতঙ্ক’—এই দীর্ঘ পথচলায় সৌমিত্র প্রমাণ করেছেন, জনপ্রিয় ধারার সিনেমা মানেই অভিনয়ে আপস করা নয়। বরং, এখানেও দেখানো যায় শক্তিশালী অভিনয়।

চলুন জেনে নেয়া যাক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত এমন ১০ সিনেমার কথা। 

১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ঝিন্দের বন্দী’ নিঃসন্দেহে সৌমিত্রর মূলধারার ক্যারিয়ারের এক মাইলফলক। এই ছবিতেই রাজা এবং বন্দী—দুই বিপরীত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার। তিনি দেখিয়েছিলেন, অতিনাটকীয়তা ছাড়াও দ্বৈত চরিত্র বিশ্বাসযোগ্য করা যায়।

এর বিপরীতে খলচরিত্র দারুণ অভিনয় করেন সৌমিত্র। তার দুর্দান্ত খল অভিনয়ে উত্তমের সঙ্গে জমে ওঠে দারুণ রসায়ন৷ সত্যজিতের ‘অপু’ এখানে নিজের ইমেজ ভেঙে একদম অন্যরকম চরিত্রে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দেন। 

আজও এই খল অভিনয় সৌমিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। 

‘বাঘিনী’ ড্রামা ঘরানার একটি জনপ্রিয় ছবি। এখানে সৌমিত্রর চরিত্রে আছে সাহস, প্রতিবাদ আর নায়কোচিত রোমান্টিকতা। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তিনি এখানে হিরোইজমকে বাড়িয়ে তোলেননি। 

বরং ‘চিরঞ্জীব’ চরিত্রে তিনি এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন যেন মানুষ তাকে আশপাশের একজনই মনে করতে পারে। 

অন্য অনেক অভিনেতার হাতে এই চরিত্র হয়ে উঠতে পারত অতিনাটকীয়। সৌমিত্র সেখানে আবেগকে রাখেন নিয়ন্ত্রণে। তার রাগ চিৎকারে নয়, চোখের দৃঢ়তায় প্রকাশ পায়। এই সংযত অভিনয়ই সিনেমাটিকে আলাদা করে তুলেছে।

‘তিন ভুবনের পারে’ সিনেমার সৌমিত্র যেন বাংলা মধ্যবিত্ত পুরুষের প্রতিচ্ছবি। এই ছবিতে তিনি কোনো মহানায়ক নন। আদতে একজন দায়িত্বে ক্লান্ত, দ্বিধাগ্রস্ত মানুষ।

‘মন্টু’ নামের এই চরিত্রটিতে সৌমিত্রের অভিনয়ের মূল শক্তি—নীরবতা। প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক, জীবনের টানাপড়েন—সবকিছুতেই তিনি আবেগ দেখান কম, এক্সপেশনে বোঝান বেশি। 

এই সিনেমাতে সৌমিত্র দেখিয়েছেন, জনপ্রিয় সামাজিক সিনেমাতেও ‘সূক্ষ্ম অভিনয়’ কতটা শক্তিশালী হতে পারে।

মূলধারার রোমান্টিক সিনেমা বললেই সাধারণত চোখে ভাসে গানের দৃশ্য, সংলাপের বন্যা। ‘প্রথম কদম ফুল’ নিবিড় অনুভূতি ও ভালোবাসার ছবি। কিন্তু সৌমিত্র এখানে রোমান্সকে তুলে ধরেছেন সংযতভাবে।

তিনি এখানে কোনো উচ্ছ্বসিত প্রেমিক নন। ভালোবাসা প্রকাশ পায় কণ্ঠের উষ্ণতায়, চোখের ভাষায়। এই সংযমই তার অভিনয়কে আলাদা করে তোলে। 

প্রচলিত রোমান্টিক উচ্ছ্বাসের বিপরীতে ‘সুকান্ত’ চরিত্রে সৌমিত্র তুলে ধরেন এক অন্তর্মুখী প্রেমিককে। আবার অভিমানের দৃশ্যেও তিনি অসামান্য। 

‘স্ত্রী’ সিনেমায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় অত্যন্ত মানবিক। এখানে তিনি নিখুঁত প্রেমিক নন। তার চরিত্রে আছে দ্বিধা, কিছুটা অপরাধবোধ, আত্মসমালোচনা।

এই ছবিতে সৌমিত্রর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—তিনি চরিত্রটিকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন না। দর্শককে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে দেন। 

জনপ্রিয় সামাজিক সিনেমায় যেখানে চরিত্রগুলো সাধারণত স্পষ্টভাবে ভালো বা খারাপ হয়, সেখানে ‘সীতাপতি’ চরিত্রে সৌমিত্র তৈরি করেন নৈতিক এক জটিলতা। 

অনেকেই ধারণা করেন, কমেডি সৌমিত্রের জন্য সহজ জায়গা ছিলো না। কিন্তু ‘বসন্ত বিলাপ’ সেই ধারণা ভেঙে দেয়।

এখানে ‘শ্যাম’ নামের চরিত্রটিতে তিনি কমেডি করেন অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গি ছাড়াই। এখানে চাপা হাসিতে তার রসিকতা বুদ্ধিদীপ্ত। এই ছবিতে তিনি প্রমাণ করেন, কমেডিতেও সংযমই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। 

আর সেই সংযত ভাঁড়ামিবিহীন অভিনয় রবি ঘোষ, অনুপ কুমার, চিন্ময় রায়ের মতো কমেডি অভিনেতাদের পাশে তাকে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। 

‘নিশি মৃগয়া’ সৌমিত্রর মূলধারার ছবিগুলোর মধ্যে একেবারেই আলাদা। এখানে তার চরিত্রে আছে গাম্ভীর্য, ভয় আর একরকম নৈতিক পতন।

এই ছবিতে সৌমিত্র অভিনয় করে ভেতরের অন্ধকারকে ধীরে ধীরে প্রকাশ করেন। জনপ্রিয় থ্রিলার কাঠামোর ভেতরেও তিনি চরিত্রটিকে বহুমাত্রিক করে তোলেন। 

এই সিনেমায় পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে সৌমিত্র যেমন সাবলীল ছিলেন, তেমনি রহস্য তৈরি করতে পেরেছিলেন ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গাতেও। 

দেবদাস চরিত্র বহুবার পর্দায় এসেছে। কিন্তু কম কান্না, আর বেশি আত্মঘৃণার মিশেলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ আলাদা।

নিজের ব্যর্থতার দায় নিজেই বহন করে এমন দেবদাসকে তিনি দেখান একজন বুদ্ধিমান কিন্তু দুর্বল মানুষ হিসেবে। 

এই দেবদাস নাটকীয়তার বাইরে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক মানুষ। এই চরিত্রে সৌমিত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিলো, তিনি চরিত্রটিকে কোনোভাবেই আবেগের আতিশয্যে মেলোড্রামাটিক করে তোলেননি। অন্যদিকে তার সংযত অভিনয়ে ব্যর্থ প্রেমের এক অনবদ্য স্মারক হয়ে ওঠে ‘দেবদাস’। 

‘প্রতিশোধ’ সিনেমায় এক কুটিল প্রতারক ‘সনাতন’ চরিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র। বড় ভাইয়ের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে যে মিথ্যে ষড়যন্ত্র করে ভাতিজাকে জেলে পাঠিয়ে সব সম্পত্তি দখল করে নেয়।

এই সিনেমায় খলচরিত্রে অসামান্য অভিনয় করেন তিনি। কোনোরকম লাউড অ্যাক্টিং নয়, বরং চোখের চাহনি আর সংলাপের শক্তিমত্ত্বায় জীবন্ত করে তোলেন চরিত্রটিকে। ‘কী বিষের ছোবল দিবি’ গানে তার অভিনয় ভোলার মতো না৷ 

‘মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি’–সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ‘আতঙ্ক’ সিনেমায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন এই মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রে। 

প্রচণ্ড বৃষ্টির রাতে একটি খুনের দৃশ্য দেখে ফেলা ও পরবর্তীতে এ নিয়ে নানান সংকট মোকাবিলা করতে হওয়া এক শিক্ষকের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেন সৌমিত্র। 

তার চাহনি, কণ্ঠস্বর ও সংযত সংলাপ চরিত্রটিকে একদম জীবন্ত করে তোলে দর্শকের সামনে। 

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মূলধারার সিনেমাগুলো প্রমাণ করে তিনি কখনোই প্রথাগত ‘তারকা’ হতে চাননি। জনপ্রিয় ধারার সিনেমার কাঠামোর ভেতরেও তিনি খুঁজেছেন অভিনয়ের সত্য। 

তিনি চরিত্রগুলোতে কিছু ‘আরোপ’ করেননি, বরং চরিত্রগুলোকে ‘ধারণ’ করেছেন।  আর এখানেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের আসল শক্তি। 

মূলধারার জনপ্রিয় সিনেমাতেও কোনোরকম ‘গিমিক’ প্রয়োগ না করে তিনি থেকে গেছেন সত্যিকারের একজন অভিনেতা হয়ে।

Related Articles

Latest Articles