‘আর কটা টাকা আমি জমাতে পারলে যাব, যাব ফিরে’–বাড়ি ফেরার কী অসীম আকুলতা। বাড়ি নিয়ে এমন রোমাঞ্চ–যেখানে মিশে আছে ছেলেবেলার প্রেম, জীবিকার তাগিদ আর তাকে তার মতো থাকতে দেওয়ার তাগিদ।
এইতো অঞ্জন–যে আছে আমাদের পুরোটা জীবন জুড়ে, কখনো বেলা বোসের লাল নীল সংসারে তো কখনো ‘জেরেমির বেহালায়’ সুর তুলে তিনি কল্পনার সব রং আমাদের জীবনের কঠিন ও সত্য বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দেন।
‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ গানটা আমার মনে হয় পুরোদস্তুর এক উপন্যাস–কি নেই এতে? পাহাড়ে বেড়ে ওঠা এক মানব মন জীবিকার তাগিদে ঠাঁই নেয় মেট্রোপলিটনে।
ব্যস্ত পরিশ্রান্ত জীবনে বার বার ফিরে আসে তার ছেলেবেলার সোনার পাহাড়ের স্মৃতিতে। এই নস্টালজিয়াই অঞ্জনের সবচেয়ে বড় শক্তি বোধহয়।
তিনি যেভাবে আমাদের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত করতে পারেন সেভাবে কি আর কেউ পারেন?
কার কত টাকা বাকি, কাকে কী দিতে হবে এসব বুঝিয়ে দিতে দিতেই তার মনে হলো–আর যদি দেখো তার কপালে সিঁদুর বলো না কিছুই তাকে আর। এইতো অঞ্জন–যিনি ভালবাসতে জানেন, ফিরে আসতে জানেন।
আবার ভালোবাসার জন্য তিনি একের পর এক ডায়াল করতে জানেন একই নম্বর। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, বেলা বোসের কথাই বলছি। এই গান শুনে নিজেকে সেখানে একবার কল্পনা করেননি এমন মধ্যবিত্ত বাঙালি খুঁজে পাওয়া হবে দুষ্কর।
‘এটা কি টু ফোর ফোর? ওয়ান ওয়ান থ্রি নাইন’–আমরা এই গানে নিজেদের বারবার খুঁজে পেয়েছি সাদা কালো এই জঞ্জালে ভরা শহরে, হোক সেটা ঢাকা কিংবা কোলকাতা।
এই গানে একটা মুক্তির খোঁজ আছে–আর্থিক দুরবস্থা থেকে মুক্তি, একটু সচ্ছলতার মুক্তি, এই মুক্তি পেয়ে চোখ ছলছল করে ওঠেনি এমন মধ্যবিত্ত তরুণ পাওয়া যাবে?
দশ বারোবার রং নম্বারের পরে সুর মিলে গেছে, তাল মিলে গেছে, জীবনের পরম চাওয়াকে পাওয়ায় রূপান্তর করা গেছে। এরপর বলা যাক, ‘সম্বন্ধটা এইবার তুমি ভেস্তে দিতে পারো!’
আমাদের জীবনে যেমন অঞ্জন দত্তের প্রভাব তেমন অঞ্জনের গানেও আছে পশ্চিমা প্রভাব। বব ডিলানের কথা অঞ্জন বারবারই বলেছেন, কখনো বা তার পাহাড়ি জীবনের স্মৃতিচারণায় তুলনা এসেছে জন ডেনভারের। পাহাড়কে ভালোবেসে দুজনই নিজেদের সংগীত সত্তা সপে দিয়েছেন বলে।
আবার যদি আমার ট্রেন ধরতে না জানো তবে জেনে রেখো, আমি চলে গেছি–’ইফ ইউ মিস দ্য ট্রেন আ’ম অন।’
হুইসেল শুনতে পাবে বন্ধু, হাজারো মাইল দূর থেকে। জনপ্রিয় এই আমেরিকান ফোক গান ইউরোপ আমেরিকার মানুষের মুখে মুখে ছিল বহু বছর, অঞ্জন ‘মিস্টার হলের’ গল্প বলতে গিয়ে আমাদেরও শুনিয়েছেন কিছুটা।
বহু হৃদয় নিংড়ানো বিচ্ছেদের গল্প গানে গানে বলা অঞ্জনের বাস্তব জীবনে ভালোবাসার মানুষ তার সাথেই থাকেন, চন্দা দত্ত। তাকে নিয়ে ২০২৪ সালে এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, ‘৪৬ বছর ধরে আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। ভালবেসে, লড়ে, চাহিদায় এবং আঘাত সারিয়ে প্রতি মুহূর্তে শিখে কখনও সহজ পথে হাঁটিনি।’
কিন্তু অঞ্জন জানিয়ে গেছেন, সবাই সব পায় না। কখনো ‘মেরি আনের’ গল্প বলেছেন, কখনো জানিয়ে রেখেছেন দিন শেষে কিন্তু এক মুঠো ছাই, তাই আমরা যাতে সবাই না হয়ে যাই।
সবাই তো প্রেমের গানই গায়, অঞ্জন অন্য কিছু গাইতে চাইতেন, কিন্তু ‘তোমার’ কাছে এসে অঞ্জনও প্রেমের গানই লিখলেন, অপ্রাপ্তি, অগোছালো, অসমাপ্ত।
ঘরের মাঝের সীমারেখা ফুটিয়ে তুলেছেন আরেক গানে, ‘চারটে দেয়াল মানেই যে ঘর নয়।’
আমরা অনেক সময় ধরে নেই, এই ঘর এই সংসার–এইতো থিতু হয়ে এলাম, আদতে কি মানুষ কখনো থিতু হয়। তার যাত্রা কোথায়? নিজের ঘরেই তো অনেক মানুষ পর।
পাসপোর্ট পাওয়ার পর থেকে ভারতে যাওয়া হয়েছে অনেকবার, সঙ্গত কারণেই বেশিরভাগ যাত্রা শুরু হয়েছে কলকাতা থেকে, আমার কাছে কলকাতার ম্যাপ মানে কিন্তু অঞ্জনের গান তোমাদের ধর্মতলা, এন্টালি সিনেমার পেছনের বস্তি, ওবেরয় হোটেলের কফি।
আমরা যেন কলকাতার মনের ভেতরটা দেখে ফেলেছি অঞ্জনের গানে, আমি গিয়ে বলেছি, আমি জানি, আমি চিনি তোমাকে।
আমরা যারা মধ্যবিত্ত আমরা হেরে যাওয়াটাকে বড্ড ভয় পাই, প্রেম, চাকরি, ব্যবসা–সবখানেই যেন হারটা স্বীকার করতে আমাদের খুব বাঁধে। অঞ্জনও তাই, ভেঙ্গেচূড়ে আবার শুরু করতে বলেছেন। আমরাও তাই পাবার আশায়, অঞ্জনের লেন্স দিয়ে ‘ঝাপসা চোখে দেখি এই শহর’।
আজ ১৯ জানুয়ারি অঞ্জন দত্তের জন্মদিন।
