মরক্কোর স্বপ্নসারথি হয়েই আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে নেমেছিলেন ব্রাহিম দিয়াজ। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা ফরোয়ার্ড ছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তার পায়ের জাদুতে ভর করেই দীর্ঘ ২২ বছর পর ফাইনালের টিকিট পেয়েছিল মরক্কো। কিন্তু শিরোপা নির্ধারণী সেই রাত দিয়াজের জন্য হয়ে রইল এক দুঃস্বপ্নের নাম।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের অন্তিম মুহূর্তে পেনাল্টি পায় মরক্কো। সেনেগালের ডিফেন্ডার এল হাদজি মালিক দিউফের চ্যালেঞ্জে দিয়াজ ডি-বক্সে পড়ে গেলে দীর্ঘ ‘ভিএআর’ পর্যালোচনার পর পেনাল্টির বাঁশি বাজান কঙ্গোর রেফারি জঁ-জ্যাক এনডালা।
রেফারির এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সেনেগাল শিবির। কোচ পাপে বুনা থিয়াও মাঠ থেকে খেলোয়াড়দের তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এমনকি বেশ কয়েকজন ফুটবলার টানেলের দিকে হাঁটা শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় পর সাদিও মানের হস্তক্ষেপে মাঠে ফিরতে রাজি হয় সেনেগালের খেলোয়াড়রা।
সেই বিশৃঙ্খলা আর নাটকের মধ্যে পেনাল্টি শট নেওয়ার জন্য দিয়াজকে প্রায় ১৭ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। স্নায়ুর চাপের সেই মুহূর্তে দিয়াজ বেছে নেন ‘পানেনকা’ স্টাইল। কিন্তু তার নেওয়া দুর্বল চিপটি অনায়াসেই লুফে নেন সেনেগাল গোলরক্ষক এডুয়ার্ড মেন্ডি।
ম্যাচ শেষে মেন্ডি বলেন, ‘সে পানেনকা করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমি বিভ্রান্ত হইনি। আমি আমার জায়গায় স্থির ছিলাম এবং দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলাম।’
দীর্ঘ বিরতিই কি দিয়াজের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল? মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই অন্তত তেমনটাই মনে করছেন। তিনি বলেন, ‘পেনাল্টি নেওয়ার আগে সে অনেকটা সময় পেয়েছিল যা তাকে বিচলিত করেছে। তবে পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে এটা কোনো অজুহাত হতে পারে না। আমরা শিরোপার খুব কাছে ছিলাম, কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে এমনই নিষ্ঠুর হয়।’
নির্ধারিত সময়ের খেলা গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে পাপে গে’র গোলে জয় নিশ্চিত করে সেনেগাল। এর মাধ্যমে গত তিন টুর্নামেন্টের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করল তারা।
তবে আলোচনা ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে দিয়াজের সেই পেনাল্টি মিস এবং সেনেগালের ফুটবলারদের আচরণ। মেন্ডি যখন নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দিলেন, তখন সেনেগালের কোনো খেলোয়াড়কে উল্লাস করতে দেখা যায়নি। বরং তারা দ্রুত নিজেদের অবস্থানে ফিরে যাচ্ছিলেন।
আর এই রহস্যজনক আচরণই উসকে দিচ্ছে নতুন বিতর্ক। ইএসপিএন-এর বিশেষজ্ঞ ডেল জনসন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সেনেগাল উদযাপন করেনি কেন? মাঠ ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার পর দিয়াজ কি তবে ইচ্ছাকৃতভাবে মিস করে তাদের মাঠে ফেরার পথ করে দিয়েছিলেন?’
ইতালীয় সাংবাদিক তানক্রেদি পালভেরিও একই সুরে সন্দেহ প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, মেন্ডি পেনাল্টি বাঁচানোর পরও সেনেগালের খেলোয়াড়রা কেন পাথরের মতো শান্ত ছিলেন? তার মতে, এই মিস ছিল সুপরিকল্পিত। প্রেস বক্সে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যেও এই একই আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছিল।
এদিকে মাঠের সেই বিশৃঙ্খলা নিয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন মরক্কোর কোচ। তিনি বলেন, ‘আফ্রিকার ফুটবলের যে চিত্র আজ ফুটে উঠেছে তা লজ্জাজনক। একজন কোচ কীভাবে তার খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে বলেন! পাপে যা করেছেন তা ফুটবলের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে।’
গোটা টুর্নামেন্টে দ্যুতি ছড়ানো ব্রাহিম দিয়াজ ট্রফি জিততে না পারলেও, তার সেই রহস্যময় ‘পানেনকা’ মিস ফুটবল বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে অনেক দিন।
