-3 C
New York

সুতা আমদানি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ, অসন্তুষ্ট পোশাক ব্যবসায়ীরা

বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় নির্দিষ্ট কিছু ধরনের সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো। তবে তৈরি পোশাক প্রস্ততকারকদের শঙ্কা, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ও দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পাঠানো চিঠিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। এই কাউন্টের সুতা (মাঝারি থেকে মোটা) নিট পোশাক তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। কাউন্ট যত বেশি, সুতা তত চিকন হয়।

মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশের বাইরে থেকে বিশেষ করে ভারত থেকে কম দামে ‍সুতা আমদানির কারণে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো চাপে পড়ছে।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতকে অস্থির করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) নেতারা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং আজ এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছেন।

বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধ হলে গার্মেন্ট কারখানাগুলোকে স্থানীয় সুতার ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে, যেখানে ইতোমধ্যে দাম বাড়তে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, ‘দেশের বাজার থেকে বাধ্য হয়ে বেশি দামে সুতা কিনতে হলে পোশাক খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তিনি জানান, জরুরি বৈঠকে বিজিএমইএ সদস্যরা বিষয়টি তুলে ধরবেন। তবে সংবাদ সম্মেলনের আগে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি তিনি।

তবে তিনি বলেন, ‘ব্যাপক আকারে ব্যবহৃত’ সুতার আমদানিতে বিধিনিষেধের সিদ্ধান্তে রপ্তানিকারকরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দেশের মোট সুতার চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ বা প্রায় ১৫০ কোটি ডলার আমদানির মাধ্যমে আসে, যার বেশিরভাগই ভারত থেকে। বাকি চাহিদা পূরণ করে স্থানীয় স্পিনাররা।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বিধিনিষেধের পরই স্থানীয় মিলগুলো কেজিতে ২৫ সেন্ট থেকে ৩০ সেন্ট (৩০ থেকে ৩৬ টাকা) বেশি দামের কথা বলতে শুরু করেছে।

‘স্পিনিং খাত বাঁচাতে গিয়ে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ঠিক নয়,’ বলেন তিনি।

তার মতে, প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতকে ৪ থেকে ৫ শতাংশ লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা দেওয়া যেত।

সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধের এই উদ্যোগ এসেছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) দীর্ঘদিনের দাবির পর।

বিটিএমএ বলেছে, প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ থাকা প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের কিছু মিল ভারতীয় সস্তা সুতা আমদানির কারণে বন্ধের ঝুঁকিতে আছে।

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিটিএমএ সরকারকে কাউন্টের সুতা আমদানিতে হয় বন্ডেড সুবিধা স্থগিত, নয়তো ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের আহ্বান জানায়।

বিটিএমএ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৪০০ কোটি কেজি সুতা ব্যবহার করে, যার প্রায় ৪৬ শতাংশ আসে ভারত থেকে।

বিটিএমএ আরও জানায়, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে ৩০ কাউন্টের সুতা প্রতি কেজি ২ দশমিক ৫০ ডলার থেকে ২ দশমিক ৬০ ডলারে বিক্রি করছেন, অথচ একই সুতা ভারতে বিক্রি হয় ২ দশমিক ৯০ ডলার থেকে ২ দশমিক ৯৩ ডলারে।

সংস্থাটির মতে, এত কম দাম সম্ভব হচ্ছে ভারতীয় প্রণোদনার কারণে, ফলে বাংলাদেশের স্থানীয় সুতা মিলগুলো মারাত্মক সংকটে পড়েছে। ডিসেম্বরের শেষে অবিক্রিত সুতার মজুত প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে তারা দাবি করেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও এনবিআরকে পাঠানো চিঠিতে একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুতা আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে।

২০২৩–২৪ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় সুতা আমদানির পরিমাণ ৬৮ শতাংশের বেশি ও আমদানির মূল্য ৪৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ আরও ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং দাম ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এরই মধ্যে অন্তত ৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এভাবে আমদানি ধারা চলতে থাকলে আরও মিল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা আছে।

মন্ত্রণালয় আরও সতর্ক করেছে, বিদেশ থেকে বেশি সুতা আনলে পোশাক বানাতে সময় বেশি লাগবে, দেশের ভেতরে কাজের অংশ কমে যাবে এবং রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। এর ফলে পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, রপ্তানিকারকরা বলছেন, কম দামে সুতা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হলে বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হবে, কারণ বিদেশি ক্রেতারা এখনো দামের বিষয়ে খুবই সংবেদনশীল।

বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হলে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো বাজারে শুল্ক-সুবিধা পেতে ‘টু-স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ শর্ত মানতে হবে। অর্থাৎ আমদানি করা তুলার বদলে স্থানীয়ভাবে স্পুন করা সুতা ব্যবহার করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে হলে অন্তত ৪০ শতাংশ দেশীয় ভ্যালু অ্যাডিশন থাকতে হবে। অথচ বর্তমানে স্পিনিংয়ে ভ্যালু অ্যাডিশন প্রায় ৩৫ শতাংশ, নিটিংয়ে ২০ শতাংশ এবং উইভিংয়ে ২৫ শতাংশ ভ্যালু অ্যাডিশন হয়।

তিনি জানান, স্থানীয় সুতা মিলগুলো মূলত ৩০ কাউন্টের সুতা তৈরি করে, যা গার্মেন্ট রপ্তানিকারকরা বেশি ব্যবহার করেন।

তিনি আরও বলেন, দেশের মিলগুলো নিট পোশাকের সুতার চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে প্রায় ৪৫ শতাংশ জোগান দিতে পারে। বাকি অংশ এখনো ভারত, চীন ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

স্পিনাররা জানান, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে ২০০ কোটি ডলারের সুতা আমদানি হয়েছে এবং স্থানীয় মিলগুলো প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬০০ টন সুতা ব্যবহার করে।

ভারতীয় সুতার সবচেয়ে বড় গন্তব্য বাংলাদেশ, তাদের মোট রপ্তানির ৪৪ শতাংশ আসে এখানে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কম্বোডিয়া, ২১ শতাংশ।

এর আগে, গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল, যদিও সমুদ্রপথে আমদানি চালু ছিল। মিল মালিকরা বলছেন, তারা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা চান না, বরং যাকে তারা ‘ডাম্পিং’ বলছেন, তা ঠেকাতে ব্যবস্থা চান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের কাস্টমস (রপ্তানি ও বন্ড) শাখার প্রথম সচিব মোহাম্মদ নাজিউর রহমান মিয়া বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি তারা পেয়েছেন।

‘বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি,’ বলেন তিনি।

Related Articles

Latest Articles