রেকর্ড আর বিরাট কোহলি যেন এখন সমার্থক শব্দ। গতকাল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে রান তাড়া করতে নেমে আরও একবার নিজের জাত চেনালেন এই ব্যাটিং কিংবদন্তি। ৯৩ রানের এক অনবদ্য ইনিংস খেলার পথে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্রুততম ব্যাটার হিসেবে স্পর্শ করেছেন ২৮ হাজার রানের মাইলফলক। তবে রেকর্ডের ভিড়ে কোহলি নিজে পড়ে থাকতে চান না পরিসংখ্যানে; বরং তার কাছে দলের জয় আর ক্রিকেটীয় দর্শনই মুখ্য।
ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় কোহলি কথা বলেছেন তার ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত অর্জন এবং মাঠের ভেতরের নানা অনুভূতি নিয়ে।
দর্শকদের আচরণে বিব্রতরোধ
বিরাট কোহলি দর্শকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হতে পারেন, কিন্তু সতীর্থের উইকেট পতনের পর দর্শকদের উল্লাস করার অভ্যাসটি তিনি মোটেও পছন্দ করেন না। সাধারণত ওয়ানডে ক্রিকেটে কোনো একজন ওপেনার আউট হলেই কোহলি মাঠে নামেন, আর তখনই গ্যালারি মেতে ওঠে উল্লাসে। বছরের পর বছর শচীন টেন্ডুলকার ও এমএস ধোনির ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা যেত।
গতকাল রোহিত শর্মা আউট হওয়ার পর স্টেডিয়ামে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কোহলি মাঠে প্রবেশের পর সেই নীরবতা ভেঙে চিৎকার শুরু হয়। তবে দর্শকদের এই আচরণ নিয়ে কোহলি তার মনোভাব স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে সচেতন এবং সত্যি বলতে এটি আমার কাছে ভালো লাগে না। আমি এমএস-এর (ধোনি) ক্ষেত্রেও একই জিনিস হতে দেখেছি। যে খেলোয়াড়টি আউট হয়ে ফিরে যাচ্ছেন, তার জন্য এটি মোটেই ভালো অনুভূতি নয়।’
কোহলি এদিন ৫৪তম সেঞ্চুরির কাছেই ছিলেন। দর্শকরাও অপেক্ষায় ছিলেন কিংবদন্তির আরও এক অর্জনের। এক ক্ষুদে দর্শকের প্ল্যাকার্ড ক্যামেরায় দেখাচ্ছিল, ‘কোহলির সেঞ্চুরি না হলে এক সপ্তাহ খাব না।’ এমন পাগলাটে পরিস্থিতিতে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ব্যাটিং জিনিয়াস। স্টেডিয়ামে তখন পিন পতন নীরবতা। যদিও ম্যাচ ভারতই জিতেছে অনায়াসে।
কোহলি ২.০: আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের নতুন ধারা
সাত রানের জন্য ৫৪তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি মিস করলেও কোহলি এখন রয়েছেন ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ফর্মে। শেষ সাতটি ‘লিস্ট-এ’ ম্যাচে টানা সাতটি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস তার প্রমাণ। এই ‘কোহলি ২.০’ সংস্করণ আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। ৩০১ রান তাড়া করতে নেমে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাকে ‘রান তাড়া করার রাজা’ বলা হয়। ৩০০-এর বেশি লক্ষ্য তাড়া করার ক্ষেত্রে ১২ ইনিংসে কোহলির গড় এখন ১২২২.২।
নিজের নতুন ব্যাটিং ধরন নিয়ে তিনি বলেন, ‘মূল ধারণাটা হলো আমি তিন নম্বরে ব্যাটিং করি; যদি পরিস্থিতি জটিল হয়, তবে আমি কেবল অপেক্ষা না করে পাল্টা আক্রমণ করার ওপর বিশ্বাস রাখি। যে কোনো বলেই উইকেট যেতে পারে, তাই নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকার কোনো মানে নেই। তবে নিজের শক্তির জায়গাতেই অটল থাকতে হবে।’
স্বপ্নযাত্রা ও কৃতজ্ঞতা
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়া এবং দ্রুততম ২৮ হাজারি ক্লাবে প্রবেশ করাকে অলীক মনে হয় কোহলির কাছে। নিজের যাত্রা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যদি আমার পুরো যাত্রার দিকে ফিরে তাকাই, তবে এটি আমার কাছে একটি স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতোই। আমি সব সময় আমার সামর্থ্য সম্পর্কে জানতাম, তবে এও জানতাম যে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে আমাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে।’ বিনয়ের সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘ঈশ্বর আমাকে যা চেয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি দান করেছেন। আমি অনেক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আমার যাত্রার দিকে ফিরে তাকাই।’
মায়ের কাছেই সব ট্রফি
ক্যারিয়ারে কতগুলো ‘প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার পেয়েছেন, সেই হিসাব রাখার প্রয়োজন মনে করেন না কোহলি। ওয়ানডেতে ৪৫তম ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়ে তিনি জানান, ট্রফিগুলো তিনি গোরগাঁওয়ে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন, কারণ তার মা সেগুলো গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করেন।
২০২৫ সাল যেভাবে শেষ করেছিলেন, ২০২৬ সালের শুরুটাও কোহলি একইভাবে বিধ্বংসী মেজাজে করেছেন। সেঞ্চুরির সংখ্যা বাড়াতে না পারলেও নিজের ব্যাটিংয়ের ধরন নিয়ে তিনি গর্বিত। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেই তিনি খুশি বলে জানান এই মহাতারকা।
