ইন্টারনেট বন্ধ থাকার মধ্যেই শনিবার রাতে ইরানের রাজধানী তেহরানের রাস্তাঘাট সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। এএফপি বলছে, প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন সত্ত্বেও গত তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা।
এই বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে ইরানের সরকার। দুই সপ্তাহ আগে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে তেহরানে এই বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধর্মীয় শাসকদের অপসারণের দাবিতে রূপ নেয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর খবর দিয়েছে। শনিবার তারা জানায়, কর্তৃপক্ষ দমন অভিযান আরও জোরদার করছে এবং এ নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় খুব কম তথ্যই বাইরে আসছে। নেটব্লকস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে কার্যত কোনো সংযোগই নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার দেশ এই বিক্ষোভে সহায়তা দিতে ‘প্রস্তুত’। এর আগে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিক্ষোভ দমনের চেষ্টার কারণে ইরান ‘বড় বিপদে’ রয়েছে।
শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেন, ‘ইরান এখন স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে—হয়তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত।’
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে সম্প্রতি ট্রাম্পকে অবহিত করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা টাইমসকে বলেন, জুনে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে ওয়াশিংটন যুক্ত হওয়ার পর নতুন করে হস্তক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
এএফপির যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, শনিবার আবারও রাজধানীর উত্তরের এলাকায় লোকজন জড়ো হয়েছেন। তারা আতশবাজি ফোটান, হাঁড়ি–পাতিল বাজান এবং অপসারিত রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান দেন।
এএফপির তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে না পারা অন্যান্য ভিডিওতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারবিরোধী স্লোগানসহ বিক্ষোভ চলতে দেখা গেছে।
ইরানের অপসারিত শাহের যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছেলে রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় সপ্তাহান্তে আরও লক্ষ্যভিত্তিক বিক্ষোভের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য আর শুধু রাস্তায় নামা নয়। লক্ষ্য হলো শহরের কেন্দ্রগুলো দখল ও নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি নেওয়া।’
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যারা ইরান শাসন করছে, এই বিক্ষোভ তাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুরুতে সংযমের আহ্বান জানিয়ে এবং অর্থনৈতিক অভিযোগ স্বীকার করলেও পরে কর্তৃপক্ষ আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
শুক্রবার এক চ্যালেঞ্জিং ভাষণে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ট্রাম্পের ইশারায় কাজ করা ‘নাশকতাকারীদের’ বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের পর থেকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের খবর তারা বিশ্লেষণ করছে এবং যাকে তারা ‘উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করেছে।
নরওয়ে-ভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানিয়েছে, দমন অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫১ জন নিহত হয়েছেন, তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছে।
সংগঠনটি দাবি করেছে, পূর্ব তেহরানের আলঘাদির হাসপাতালের মেঝেতে গুলিতে নিহতদের মরদেহের ছবি তারা পেয়েছে।
আইএইচআর বলেছে, ‘এই ছবিগুলো বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের প্রমাণ দেয়।’
শুক্রবার তেহরানের সাদাতাবাদ এলাকায় বিক্ষোভকারীরা ‘খামেনির মৃত্যু হোক’-সহ বিভিন্ন সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। গাড়ির হর্ন বাজিয়ে অনেকে তাদের সমর্থন জানান—এমন ভিডিও যাচাই করেছে এএফপি।
ইরানের বাইরে থাকা ফারসি ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অন্যান্য ছবিতে রাজধানীর অন্য এলাকাগুলোতেও বড় বিক্ষোভ দেখা গেছে। একইসঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদ, উত্তরের তাবরিজ ও পবিত্র শহর কোমেও বিক্ষোভ হয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হামেদানে এক ব্যক্তিকে সিংহ ও সূর্যের প্রতীক-সম্বলিত শাহ আমলের ইরানি পতাকা নাড়াতে দেখা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা এএফপিকে জানিয়েছেন, একই পতাকা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য লন্ডনে ইরানের দূতাবাস ভবনের বারান্দায়ও উড়েছিল, যখন বিক্ষোভকারীরা সেখানে পৌঁছান।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তেহরানে এএফপির এক সাংবাদিক রাস্তাঘাট ফাঁকা এবং গোটা এলাকা অন্ধকারে ডুবে থাকতে দেখেছেন।
বিকেল ৪টার দিকে দোকান বন্ধের প্রস্তুতি নিতে নিতে এক ক্যাফে ব্যবস্থাপক বলেন, ‘এলাকাটি নিরাপদ নয়।’
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন। শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজা ও দাফনের দৃশ্য প্রচার করা হয়, যার মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শিরাজে বড় সমাবেশও ছিল।
এ ছাড়া, একটি মসজিদসহ কয়েকটি ভবনে আগুন লাগার ছবিও দেখানো হয়।
ইরানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘শৃঙ্খলা ও শান্তি বিনষ্ট করতে চাওয়া শত্রুর’ বিরুদ্ধে তারা ‘জাতীয় স্বার্থ জোরালোভাবে রক্ষা করবে’।
বিশ্বের বিভিন্ন নেতা ইরানি কর্তৃপক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেছেন, ইউরোপ ইরানিদের গণবিক্ষোভের পক্ষে রয়েছে এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘সহিংস দমনের’ নিন্দা জানায়।
ইরানে কর্ম-সপ্তাহের প্রথম দিন শনিবার তেহরানের এক ব্যক্তি বলেন, তিনি তার অফিসের ইমেইল পর্যন্ত দেখতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ‘বিজয়ের আগে মানুষকে এভাবে মূল্য দিতে হচ্ছে।’
