বাংলাদেশের ব্যাটারদের ব্যাটে সুসময় দীর্ঘস্থায়ী হওয়া যেন এক বিরল ঘটনা। এমনকি যারা ছন্দে থাকেন, তারাও বড় টুর্নামেন্টের ঠিক আগমুহূর্তে পথ হারিয়ে ফেলেন। ভক্ত ও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের পুরনো এই দুশ্চিন্তা নতুন করে উসকে দিয়েছেন জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। গত অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে টি-টোয়েন্টি সিরিজ চলাকালেই তিনি দলের টপ-অর্ডার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
আশরাফুলের সেই আশঙ্কাই এখন বাস্তব হয়ে ধরা দিচ্ছে চলমান বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল)। টুর্নামেন্টের নির্ধারিত ৩৪টি ম্যাচের মধ্যে ২০টি শেষ হলেও অধিকাংশ বাংলাদেশি ব্যাটারের ব্যাটে নেই রানের দেখা। বিপরীতে বল হাতে দাপট দেখাচ্ছেন বোলাররা। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শুরু হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে যা টিম ম্যানেজমেন্টের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ দীর্ঘ করছে।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা এই অস্থিরতায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। গুঞ্জন রয়েছে, বিসিবি ও আইসিসির চলমান শীতল লড়াই এবং নিজেদের অফ-ফর্ম নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচতে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ক্রিকেটারই সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে চলছেন। এমনকি মোস্তাফিজুর রহমান সংক্রান্ত ইস্যুগুলো নিয়েও তারা মুখ খুলতে নারাজ।
স্কোরকার্ডে ম্লান বিশ্বকাপ স্কোয়াড
বিপিএলের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ব্যাটারদের এই নাজুক অবস্থার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সিলেট টাইটান্সের ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন ৮ ইনিংসে ২৩৬ রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইমন ছাড়া বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের আর কোনো ব্যাটার সেরা দশে জায়গা পাননি।
স্কোয়াডের অন্য সদস্যদের মধ্যে রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক লিটন দাস ৬ ম্যাচে করেছেন মাত্র ১২৯ রান। মিডল অর্ডারের ভরসা হিসেবে বিবেচিত ঢাকা ক্যাপিটালসের শামীম হোসেন ৫ ইনিংসে ১১৪ রান করলেও এর সিংহভাগই এসেছে এক ম্যাচে (৮১ রান), যা দলকে জেতাতে যথেষ্ট ছিল না।
অন্যান্যদের মধ্যে তাওহীদ হৃদয় ৬ ম্যাচে ১০৬ এবং তানজিদ তামিম ৬ ম্যাচে ৮৭ রান করেছেন। সাইফ হাসান ৫ ম্যাচে মাত্র ৪৮ রান করে দল থেকে ছিটকে গেছেন। সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহান ও অলরাউন্ডার সাইফউদ্দিনের ব্যাটে; ৪ ইনিংসে সোহানের সংগ্রহ মাত্র ২০ রান এবং ৩ ম্যাচে সাইফউদ্দিনের রান ৪১।
কোচের বয়ান ও বিপরীত চিত্র
ব্যাটারদের এই ছন্দহীনতার পেছনে কৌশলগত কারণ দেখছেন রাজশাহীর প্রধান কোচ হান্নান সরকার। শনিবার সিলেটে তিনি বলেন, ‘টি-টোয়েন্টিতে ফর্ম অনেক সময় ব্যাটিং পজিশন ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের দলের পরিকল্পনার সঙ্গে আপস করতে হয়, যা সব সময় বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য আদর্শ হয় না।’
ব্যাটাররা যখন রান করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন বোলাররা রয়েছেন দারুণ ছন্দে। চট্টগ্রাম রয়্যালসের শরিফুল ইসলাম ৭ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে তালিকার শীর্ষে। সমানতালে লড়ছেন রংপুর রাইডার্সের মোস্তাফিজুর রহমান, যার ঝুলিতে আছে ১২ উইকেট (ইকোনমি ৬.৫২)। স্পিন ইউনিটে নজর কেড়েছেন নাসুম আহমেদ; ৭ রানে ৫ উইকেট নিয়ে গড়েছেন বিপিএল ইতিহাসের সেরা স্পিন স্পেলের রেকর্ড।
বিগ ব্যাশ লিগে খেলা রিশাদ হোসেনও ১১ উইকেট নিয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। তবে পেসার তাসকিন আহমেদ ও অলরাউন্ডার সাইফউদ্দিনের খরুচে বোলিং কিছুটা ভাবাচ্ছে নির্বাচকদের।
টুর্নামেন্টের শেষলগ্নে এক-দুটি ইনিংস ব্যাটারদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করেন কোচ হান্নান। তবে মাঠের বাইরের অনিশ্চয়তা আর মাঠের ভেতরের অফ-ফর্ম মিলিয়ে বিশ্বকাপের আগে টাইগার শিবিরে স্বস্তির সুবাতাস এখনও অধরা।
