২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেও মঈন আলী বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে এখনও এক অতি পরিচিত মুখ। অনূর্ধ্ব-পর্যায় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট এবং সিলেটের সঙ্গে পারিবারিক টান—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক ৩৮ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) চলতি আসরে তিনি সিলেট টাইটানসের হয়ে খেলছেন। দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় সাবেক এই ইংলিশ অলরাউন্ডার কথা বলেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতির ঘাটতি, বিপিএলের ভাবমূর্তি সংকট, আধুনিক ক্রিকেটের রাজনীতি এবং আরও অনেক কিছু নিয়ে।
আপনার আগমনে সিলেট টাইটানসের ভাগ্য বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তারা বেশ ধুঁকছিল, কিন্তু আপনি আসার পর গত তিন ম্যাচের দুটিতেই তারা জিতেছে। আপনার দলের সার্বিক অবস্থা এবং প্লে-অফে কোয়ালিফাই করার সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?
মঈন আলী: আমাদের ভালো সম্ভাবনা আছে, যদিও রাজশাহী (ওয়ারিয়র্স) এবং রংপুরের (রাইডার্স) মতো দলগুলোর বিপক্ষে সামনে দুটি কঠিন ম্যাচ রয়েছে। তারা বেশ শক্তিশালী দল, তাই কোয়ালিফাই করতে হলে আমাদের ভালো খেলতে হবে, কারণ যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। তবে আমাদের দলটি বেশ ভারসাম্যপূর্ণ এবং দলে ভালো কিছু তরুণ ও স্থানীয় খেলোয়াড় আছে, যা সব সময় সাহায্য করে।
বাংলাদেশের সঙ্গে আপনার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায় থেকে আপনি এখানে খেলছেন। এরপর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, বিপিএল এবং জাতীয় দলের বিপক্ষেও খেলেছেন। গত দুই দশকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মঈন: শুরুতে আমি তামিম ও সাকিবের মতো খেলোয়াড়দের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সুন্দরভাবে এগোতে দেখেছিলাম, কিন্তু আমার মনে হয় সম্প্রতি সেই উন্নতির ধারাটা থমকে গেছে। এখন অনেক ভালো খেলোয়াড় থাকলেও সেখানে কোনো ‘টপ প্লেয়ার’ নেই। আর এখানেই বাংলাদেশ ক্রিকেট ধুঁকছে। সাকিব, তামিমদের মতো খেলোয়াড়দের ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। বর্তমান খেলোয়াড়রা বেশ সংগ্রাম করছে—হতে পারে সেটা কোচিং, সুযোগ-সুবিধা কিংবা সিস্টেমের কারণে। বিপিএলে কিছু খেলোয়াড়ের শট সিলেকশন খুবই অপেশাদার; সমস্যা হলো মানুষ প্রতিনিয়ত একই ভুল দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমি কয়েক মৌসুম ধরে এখানে আসছি এবং এখনও তাদের একই ভুল করতে দেখছি। মনে হচ্ছে এখানকার খেলোয়াড়রা শিখতে অনেক সময় নেয়।
বাংলাদেশের একসময় ‘ফ্যাব ফাইভ’ (সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাশরাফি বিন মর্তুজা, মুশফিকুর রহিম এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ) ছিল। তারা চলে যাওয়ার পর এখন যেন একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এখন কেন তাদের মতো খেলোয়াড় আসছে না?
মঈন: আলাদা কিছু করার তাড়না খেলোয়াড়দের ভেতর থেকেই আসতে হবে। বাংলাদেশ ভাগ্যবান ছিল যে দীর্ঘদিন তারা একসঙ্গে ওই মানের খেলোয়াড়দের পেয়েছিল। আপনারা ‘টপ ফাইভ’ বলেন, কিন্তু আমি আসলে মনে করি দুজন—তামিম এবং সাকিব—যারা অসামান্য ছিল। সাফল্য আসে শেখার মাধ্যমে; যেমন রিশাদ হোসেন বিগ ব্যাশে খেলছে, এটা তার এবং বাংলাদেশের উন্নতির জন্য সঠিক পদক্ষেপ। পার্থক্য হলো, ওই টপ প্লেয়াররা বহু বছর ধরে একক প্রচেষ্টায় ম্যাচ জিতিয়েছে।
আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশ তামিম ইকবালের মতো খেলোয়াড়কে আরও দীর্ঘ সময় না পেয়ে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে? কারণ ২০১৯ সালের পর বিভিন্ন সমস্যার কারণে তিনি বিশ্বকাপ খেলেননি, আবার সাকিবের ক্ষেত্রেও জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করা নিয়ে ভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
মঈন: আমার মনে হয় তামিম যা সঠিক মনে করেন তাতেই অটল থাকেন এবং নিজের জন্য যেটা সেরা মনে হয় সেটাই করেন। রাজনীতি নির্বিশেষে কোনো কিছু ভুল মনে হলে তিনি সেটা সরাসরি বলতে পারেন, যা আমি পছন্দ করি। সাধারণত বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাংবাদিকতা, পাণ্ডিত্য, কোচিং এবং সুযোগ-সুবিধার মানসিকতায় আরও উন্নতি প্রয়োজন।
রিশাদ এবং মোস্তাফিজুর রহমান বাদে বর্তমান বাংলাদেশ দলে বিশ্বমানের সম্ভাবনা আছে এমন কাউকে দেখছেন?
মঈন: লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্ত এবং তাওহিদ হৃদয় ভালো খেলোয়াড়। হৃদয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিভাবান খেলোয়াড়, কিন্তু কয়েক বছর আগে তার সঙ্গে খেলার সময় যেমন উন্নতি দেখেছিলাম, এরপর আর তেমনটা দেখিনি। খেলোয়াড়দের উচিত প্র্যাকটিসে নিজেদের দুর্বলতা নিয়ে কাজ করে নিজেদের চ্যালেঞ্জ করা, কেবল শক্তির জায়গা নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। এছাড়া কোচিং ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা দরকার; বড় নামের কোচ থাকলেও তারা সব সময় কার্যকর হন না।
নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর তুলনায় বিপিএল কেন পরবর্তী ধাপে পৌঁছাতে পারছে না?
মঈন: এর অন্যতম কারণ হলো পারিশ্রমিক পরিশোধ নিয়ে নেতিবাচক ভাবমূর্তি। গত ১০ বছর ধরে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যেখানে খেলোয়াড়রা পাওনা টাকা পাননি। খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে কথা বলে; কেউ যদি টাকা না পায়, তবে সে আর ফিরে আসবে না এবং অন্যদেরও আসতে মানা করবে। একারণেই এখন খেলোয়াড়রা আগেভাগেই টাকা চায়, কারণ তারা জানে আইএলটি২০ (ILT20) বা আমেরিকার লিগগুলোতে সময়মতো টাকা পাওয়া যাবে। নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে আগের করা ভুলের নেতিবাচক প্রভাব সামলাতে হচ্ছে।
আপনি কেন খেলোয়াড়দের বিপিএলে আসতে উৎসাহিত করবেন?
মঈন: কারণ এটি ক্রিকেটের জন্য ভালো। আমি তরুণ খেলোয়াড়দের বলব এটি তাদের উন্নতির জন্য খুব ভালো জায়গা, কারণ এখানকার কন্ডিশন বেশ কঠিন।
মোস্তাফিজুর রহমান আইপিএল খেলার অনুমতি না পাওয়া নিয়ে বিসিবি এবং আইসিসির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
মঈন: আমি মোস্তাফিজুর রহমান-এর জন্য দুঃখিত। খেলাধুলার সঙ্গে রাজনীতি মিশে যাওয়াটা লজ্জাজনক, এবং প্রায়ই দেখা যায় রাজনীতিবিদরাই ক্রিকেট চালাচ্ছেন। এমনকি গৌতম গম্ভীরের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি অবসরের পর রাজনীতিবিদ হলেন এবং পরে ভারতের কোচ হলেন।
আপনার কি মনে হয় ভারতের আধিপত্যের কারণে ‘বিগ থ্রি’ এখন ‘বিগ ওয়ানে’ পরিণত হচ্ছে?
মঈন: আমি ভারতকে দোষ দিই না—এটি আমার অন্যতম প্রিয় জায়গা। তারা কেবল সেটাই করছে যা তাদের আগে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড করেছিল: নিজেদের স্বার্থ নিশ্চিত করা… অন্যান্য বোর্ডগুলো প্রায়ই চুপ থাকে কারণ তাদের নিজেদের দল এবং অর্থায়ন ঠিকঠাক চলছে, তাই যা আসলে সঠিক তার পক্ষে কেউ দাঁড়ায় না।
অ্যাশেজে ইংল্যান্ড সম্প্রতি খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের পারফরম্যান্স অনেক দিন ধরেই ভালো নয়। এ নিয়ে আপনার মতামত কী?
মঈন: আমার মনে হয় টেস্ট দলে কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন দরকার। আমাদের খুব ভালো খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট জায়গায় বা সময়ে খেলার ধরনটা একটু পরিবর্তন করে আরও বুদ্ধিদীপ্ত হওয়া প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়া সফর সব সময়ই কঠিন, এবং হয়তো আমাদের প্রস্তুতি যতটা ভালো হওয়া উচিত ছিল ততটা হয়নি, যার মাশুল দিতে হয়েছে।
অ্যাশেজের পর নাসের হুসাইন ব্রেন্ডন ম্যাককালামের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এবং তাকে কিছু কড়া প্রশ্ন করেছিলেন যা ম্যাককালামকে ক্ষুব্ধ করেছিল। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
মঈন: ইংল্যান্ডের মানুষ নিজেদের মতামত দিতে বা পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পছন্দ করে। আমি বিশ্বাস করি ম্যাককালাম জানেন তিনি কী করছেন এবং কী চান। মানুষ যেসব নাম প্রস্তাব করছে, আমার মনে হয় না তার দলে অত পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। আমি মনে করি না ঢালাও পরিবর্তন করা সঠিক পথ।
জো রুটের বর্তমান রানের গতি দেখে আপনি কতটা নিশ্চিত যে তিনি চলমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে শচীন টেন্ডুলকারের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবেন?
মঈন: আমি নিশ্চিত তিনি শচীনকে ছাড়িয়ে যাবেন। ফিট থাকলে তিনি অবশ্যই এটি করবেন। বর্তমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ নাগাদ এটি না-ও হতে পারে, কারণ তার এখনও প্রায় ২ হাজার রান বাকি, যার জন্য প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।
এই প্রজন্মের অন্যতম কিংবদন্তি রুটের সঙ্গে আপনি অনেক খেলেছেন। এ ধরনের খেলোয়াড়রা কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করেন?
মঈন: সে প্রচুর পরিশ্রম করে, সাধারণ বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করে এবং মানসিকভাবে অত্যন্ত শক্ত। সে একজন অসাধারণ খেলোয়াড় যে সব সময় অন্যদের সাহায্য করে। আমার মনে হয় সে সবার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করে। আমার পডকাস্ট শুনলে দেখবেন, আমি বলেছিলাম রুট একের অধিক সেঞ্চুরি করবে এবং সে তা করেছে। আমার বিশ্বাস, সে যদি শচীনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, তবে সে-ই হবে সর্বকালের সেরা টেস্ট খেলোয়াড়।
আসন্ন বিশ্বকাপে আপনার চোখে ফেভারিট কারা?
মঈন: ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। ইংল্যান্ড হয় খুব ভালো করবে নয়তো খুব খারাপ। পাকিস্তান সাধারণত মোটামুটি খেলে এবং নিউজিল্যান্ড শক্তিশালী দল। আমার মনে হয় না দক্ষিণ আফ্রিকা গত কয়েক বছরের মতো ভালো করবে, কারণ তাদের কোনো রিস্ট স্পিনার নেই, যা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার শীর্ষ চার প্রতিযোগী হলো অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ড।
বর্তমান বৈশ্বিক ক্রিকেটে রিস্ট স্পিনাররা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
মঈন: তারা বল দুই দিকেই ঘোরাতে পারে—গুগলি এবং লেগ-স্পিন। এছাড়া পিচ থেকে বল ভিন্নভাবে ঘোরে। তারা ম্যাচ উইনার এবং তাদের কয়েক ম্যাচে পারফরম্যান্স খারাপ হলেও তাদের ওপর আস্থা রাখতে হয়। আমার মনে হয় ঠিক একারণেই রিশাদ বাংলাদেশের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ।
