মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার দেড়শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শমশেরনগর গলফ মাঠে চা ও রাবার চাষের জন্য মাটি খোঁড়া শুরু হলে স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল করেন। পরে জেলা প্রশাসক (ডিসি) খোঁড়ার কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত ২৮ জানুয়ারি সকাল থেকে গলফ মাঠে খনন কাজ শুরু করে শমশেরনগর চা-বাগান কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে মাঠের একটি অংশ খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। কোনো ধরনের ঘোষণা বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমতি ছাড়াই এই খনন কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির তালুকদার বলেন, ‘কোনো ঘোষণা নেই, কোনো আলোচনা নেই, নীরবে একটি ঐতিহাসিক মাঠ ধ্বংস করা হচ্ছে। এই মাঠ শুধু জমি নয়, এটি সময়ের এক নীরব সাক্ষী।’
মাঠটি হারিয়ে গেলে, এর সঙ্গে ইতিহাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি অধ্যায়ও হারিয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
কৃষি উদ্যোক্তা মোহন রবিদাস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ১৮৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে শমশেরনগর চা-বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তারা গলফ খেলতেন এবং এই সবুজ মাঠটি তারই অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় ১৭৭ বছরের ইতিহাস বহন করছে এই মাঠ।
নান্দনিক এই মাঠটির মালিক দেশের অন্যতম চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডানকান ব্রাদার্স। মাঠটি ইজারা নিয়েছিল তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চা বাগানের এক কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এখানে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী আসায় ঝামেলা সৃষ্টি হয়। এ কারণে মাঠটি খুঁড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।’
তবে স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই গলফ মাঠ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা এখানে অবসর সময় কাটাতে পছন্দ করেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানও বেড়েছে।
ঘুরতে আসা সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘এই খোলা সবুজ পরিবেশই আমাদের এখানে টেনে আনে। মাঠ খুঁড়ে চা ও রাবার গাছ লাগালে আগের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর থাকবে না।’
এ বিষয়ে পরিবেশকর্মী সালাউদ্দীন শুভ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই খোলা সবুজ মাঠই ছিল শমশেরনগরের পরিচয়। এটি ধ্বংস হলে পর্যটক কমবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক সমিতির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল মোহাইমীন মিল্টন বলেন, ‘ট্রাক্টর দিয়ে টিলা কেটে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধ্বংস করা হয়েছে। বৃষ্টি হলে মাটি সরে গিয়ে ঝুঁকি তৈরি করবে।’
তিনি আরও বলেন, কর্তৃপক্ষ চাইলে পরিবেশ রক্ষা করে বিকল্প পথে এগোতে পারতো।
এ বিষয়ে জানতে শমশেরনগর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক জাকির হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।
এদিকে, এলাকাবাসীর বিক্ষোভের মুখে আপাতত মাঠ খোঁড়ার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌহিদুজ্জামান পাভেল।
তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নির্বাচনের পর সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
