রামপুরা টিভি সেন্টার, রামপুরা ব্রিজ পার হয়ে একটু সামনে এগোলেই চোখে পড়ে লাল রঙের ‘স্বাধীনতা তোরণ’। রাজধানী ঢাকার পূর্ব অংশের এই লাইফলাইন ‘প্রগতি সরণি’ ঘেঁষে স্থাপিত আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ বুদ্ধানন্দ মহাথেরোর সঙ্গে সম্প্রতি সাক্ষাৎ হলে, তিনি দেশের সার্বিক শান্তি কামনা করেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন দুই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর যখন পুলিশ আক্রমণ করছিল, তখনও এমন প্রার্থনাই করেছিলেন তিনি। সেদিন বিহারের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিলেন অনেক শিক্ষার্থী।
এই বৌদ্ধ ভিক্ষু চান, রাষ্ট্র ও জনগণের দায়িত্ব যারা নেবেন তারা যেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য একটি কল্যাণকর সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।
বৌদ্ধ বিহারটির অবস্থান ঢাকা-১১ আসনে। রামপুরা, বাড্ডা ও ভাটারা থানা এবং হাতিরঝিল থানার একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসন থেকেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান মুখ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার জন্মস্থান বাড্ডা থানার ফকিরখালী গ্রামে।
তরুণদের এই দলের প্রতি দেশের মানুষের অনেক আশা। এমনটাই মনে করেন ভাটারা থানার নূরেরচালা পশ্চিমপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাহমুদা বেগম (৪০)। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘এবার আমি তরুণদের পক্ষে। শুধু তরুণদের দল নয়, অন্যান্য দলের তরুণরাও জিতে আসুক এটাই আশা করব।’
এলাকায় গ্যাস, পানি ও জলাবদ্ধতার সমস্যার কথা জানালেন তিনি। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে নাগরিক সুবিধা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিতে চান মাহমুদা।
এলাকায় একটি মুদি দোকান চালান এই নারী। রাজনীতিবিদদের কাছ তার প্রত্যাশা, ‘নতুন বাংলাদেশে’র রাজনীতিবিদরা যেন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে পারেন।
নাহিদ ইসলামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী এম এ কাইয়ুম। দীর্ঘসময় বাড্ডা এলাকায় কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
সারাদেশ এখন অপেক্ষা করছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য। দীর্ঘকাল পর তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এলাকার জনগণ রাজনৈতিকভাবে বেশ সচেতন এবং বর্তমানে পুরো এলাকায় ভোটের আমেজ।
নাহিদ ইসলাম মসজিদ, বাজারের মতো জনসমাগমস্থলে গিয়ে গণসংযোগ করছেন, উঠান বৈঠক করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে তার জোর প্রচারণা। এম এ কাইয়ুম তার লোকজন নিয়ে পথসভা করছেন, মতবিনিময় করছেন। ভোটারদের কাছে তারা নিজ নিজ ইশতেহার তুলে ধরছেন। এখন পর্যন্ত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সরাসরি সাক্ষাৎ না হলেও স্থানীয় পরিবার হিসেবে জানাশোনা আছে।
ঢাকা-১১ আসনটি মূলত একটি মিশ্র জনবসতিপূর্ণ এলাকা। বাড্ডা, আফতাবনগর, শাহজাদপুর, রামপুরা এলাকায় মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী জনগোষ্ঠীর বাস। উত্তর বাড্ডা, সাতারকুল, বেরাইদ এলাকার বড় অংশে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাস। বাড্ডা এলাকায় আছেন বড় সংখ্যক শ্রমিক জনগোষ্ঠী।
ভাটারা, কুড়িল ও শাহজাদপুর এলাকায় বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় এখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অস্থায়ীভাবে বসবাস করলেও, তাদের বেশিরভাগ এখানকার ভোটার নন।
সাতারকুল ব্রিজ থেকে বাড্ডা পর্যন্ত সম্প্রতি শুরু হয়েছে সড়ক উন্নয়নকাজ। মূল ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান এই সড়কটি বর্তমানে ব্যবহারের উপযোগী না থাকায় বাসিন্দাদের ভোগান্তির শেষ নেই।
শহুরে ও গ্রামীণ মিশ্র পরিবেশের এই আসনে নানা সমস্যা। যানজট, মাদক, আইনশৃঙ্খলা, জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়কসহ আরও অনেক অভিযোগের কথা জানালেন ভোটাররা।
ভাটারা হিন্দুপাড়ার বাসিন্দাদের প্রধান সমস্যা গ্যাস ও পানি। এ এলাকায় প্রায় ৪০০ হিন্দু পরিবারের বসবাস। তারা এ সমস্যার প্রতিকার চান। এখানকার বাসিন্দা অমৃত চন্দ্র দাস (৪০) চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করছেন গত প্রায় ৮ বছর ধরে। তার মতে, এলাকার হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা না থাকলেও, তারা সবাই একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ চান।
তার মতো এ এলাকার ভোটাররা প্রতিদিন প্রার্থীদের প্রচারণা দেখছেন, প্রতিশ্রুতি শুনছেন আর ভাবছেন কাকে ভোট দেবেন এবারের নির্বাচনে, যিনি তাদের নিয়ে যেতে পারেন সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের পথে যার জন্য জুলাইয়ে জীবন দিয়েছেন হাজারো কিশোর-তরুণ-শ্রমিক।
নাহিদ ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রচারণায় গিয়ে বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। তরুণ সমাজ ও নারীদের কাছ থেকে যথেষ্ট ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। গত ১৬ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি। কিন্তু এবার দেশের রাজনীতির সমীকরণ পাল্টে গেছে। স্থানীয় পর্যায়ে এর প্রভাব পড়েছে। মানুষ কাছে আসছে, কথা বলছে, সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা জানাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে একটা আশা তৈরি হয়েছে।’
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে এ আসনের এনসিপি প্রার্থী নাহিদ বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর মতো সুশৃঙ্খল দলের দীর্ঘদিনের মাঠে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাদের বেশ কাজে লাগছে। আমরা সমন্বিতভাবে আমাদের আসনগুলোতে প্রার্থী ও মার্কার পক্ষে প্রচারণা করছি।’
জয়ী হলে কী করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তরুণদের সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে চাই। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে। সুশাসন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করব। এলাকার যানজট নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত পরিকল্পনার কাজ হাতে নেব। এলাকার জনগণের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করব। সব সমস্যা পাঁচ বছরে সমাধান করে ফেলব তা বলছি না। কিন্তু এই এলাকা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করব।’
ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন বিএনপি প্রার্থী কাইয়ুমও। তিনি বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক প্রচারণা সম্প্রতি শুরু হলেও আমরা গত এক মাস ধরেই স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করছি। প্রায় দুই দশক ধরে এ এলাকার কমিশনার ছিলাম। আমার সময়ে এ এলাকায় গ্যাস, পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি, স্কুল-কলেজ নির্মাণ হয়েছে। এ কারণে আমার প্রতি এলাকার মানুষের আস্থা আছে।’
‘এলাকার প্রধান সমস্যা সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তরুণদের বলেছি তারা অভ্যুত্থান করে দেখিয়েছে। এখন যেন সমাজের সমস্যাগুলো সমাধানে তারা সহযোগী হয়। যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে অভ্যুত্থান করেছি, মাদক-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিও সেভাবে সবাই মিলে নির্মূল করব। এলাকার নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করব। এছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গেও আলাদা করে বসেছি। তাদের নিরাপত্তা ও জীবনমানের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।’
নাহিদ ইসলাম এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো বাধার সম্মুখীন না হলেও কিছু আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘ভোটের সময় রাজনৈতিক পেশিশক্তির বাধা পাওয়ার আশঙ্কা আছে। আমরা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে জানিয়ে রাখছি। তবে নির্বাচনের দিনের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি থাকবে আমাদের। বাধা এলে মোকাবিলা করব।’
তবে এম এ কাইয়ুমের ভাষ্য, ‘নির্বাচন ঘিরে একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। কর্মীদের বলেছি যেন অতীতের মতো রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি না করা হয়। মানুষ যাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে তিনিই আমাদের প্রতিনিধি হবেন।’
জয়ের ব্যাপারে দুই প্রার্থীই যথেষ্ট আশাবাদী। নাহিদ ইসলামের মতে, তারুণ্যের জোয়ার এবার এনসিপি-জোটের পক্ষে থাকবে এবং তার আসনে জনগণ তারুণ্যের প্রতীক ‘শাপলা কলি’ বেছে নেবে। একইসঙ্গে তিনি গণভোটে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভোটারদের উদ্দেশে কাইয়ুম বলেন, ‘এলাকার মানুষ যেহেতু আমাকে দীর্ঘসময় ধরে চেনেন এবং আমি তাদের কল্যাণে কাজ করেছি, তাই তারা যেন আমার মতো পরীক্ষিত জনপ্রতিনিধিকে সেবার জন্য বেছে নেয়।’
ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা-১১ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৮, যার মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২২ হাজার ৮৭৭, নারী ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ ও হিজড়া ৩ জন।
এ আসনের অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ, গণঅধিকার পরিষদের মো. আরিফুর রহমান, গণফোরামের মো. আবদুল কাদের, জাতীয় পার্টির শামীম আহমেদ, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. জাকির হোসেন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মিজানুর রহমান, মুক্তিজোটের কাজী মো. শহীদুল্লাহ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী কহিনূর আক্তার বীথি।
