-4.6 C
New York

বিদ্যুৎ চুক্তিতে বাড়তি ক্যাপাসিটি চার্জে বছরে গচ্চা ১৫০ কোটি ডলার

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা বিদ্যুৎ খাতের একতরফা বা অনাকাঙ্ক্ষিত চুক্তিগুলোর কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর প্রায় ১৫০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

কমিটি জানিয়েছে, তারা যে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনা করেছেন, সেগুলোর সঙ্গে আবার দরকষাকষির মাধ্যমে চুক্তি সংশোধন করা জরুরি। তা না হলে চুক্তিগুলোর অবশিষ্ট মেয়াদে তাদের প্রায় ৭২০ কোটি ডলার বাড়তি দিতে হবে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল চুক্তি নিয়ে করা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে এমনভাবে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল, যার ফলে যোগসাজশ, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধির বিশেষ বিধান আইন বিদ্যুৎ খাতের ক্রয়প্রক্রিয়াকে অস্বচ্ছ করে তোলে এবং চুক্তি প্রণয়নে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ায়।

তীব্র বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার যুক্তিতে করা এই আইন সরকারকে প্রকল্প অনুমোদন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিশেষ ক্ষমতা দেয়।

এর আওতায় সরকারি ক্রয় আইন থেকে অব্যাহতি, বিচারিক পর্যালোচনার সীমাবদ্ধতা এবং বিশেষ আইনের আওতায় নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য বিস্তৃত আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়।

যদিও আইনটি ছিল সাময়িক জরুরি ব্যবস্থা, বাস্তবে একের পর এক মেয়াদ বাড়িয়ে এটি ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যকর রাখা হয়। ধীরে ধীরে এটি বিদ্যুৎ খাতের চুক্তির প্রধান আইনি কাঠামোতে পরিণত হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আইনের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা, নিয়ন্ত্রক তদারকি ও বিচারিক নজরদারির বাইরে একটি সমান্তরাল ক্রয়ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

আরও বলা হয়, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। প্রতিযোগিতা না থাকায় অবকাঠামো খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রধান প্রক্রিয়াটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে করা চুক্তিতে একাধিক সুবিধা একসঙ্গে যুক্ত করা হয়। যেমন— উৎপাদন হোক বা না হোক, নিশ্চিত ক্যাপাসিটি চার্জ, বিদ্যুৎ না নিলেও অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, জ্বালানির দাম সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপানোর সুযোগ, বৈদেশিক মুদ্রার দরের সঙ্গে মূল্য সমন্বয় এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি।

এর ফলে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত সব ধরনের বাণিজ্যিক ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ ব্যয়ের ফাঁদ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব শর্ত আলাদাভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে প্রতিযোগিতা ছাড়াই সবগুলো শর্ত একসঙ্গে প্রয়োগ করায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় স্থায়ীভাবে অস্বাভাবিক উচ্চ পর্যায়ে আটকে যায়।

কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তিগুলোতে বৈশ্বিকভাবে সৌর প্যানেলের দাম দ্রুত কমলেও তার সঙ্গে সমন্বয় হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দাম ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় মানদণ্ডের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি। একতরফাভাবে অনুমোদিত গ্যাসভিত্তিক প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও নিয়মিতভাবে বেশি দামে চুক্তি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের ভাষায়, এই অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, এটি ছিল কাঠামোগত।

বিদ্যুতের একমাত্র ক্রেতা হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) উৎপাদন পর্যায়ের সব অতিরিক্ত ব্যয় বহন করছে। এই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে জাতীয় বাজেটে।

২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল ১১ গুণেরও বেশি বেড়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণের মতো।

এই পার্থক্যের প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছে ক্যাপাসিটি চার্জকে।

অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বা আংশিকভাবে অব্যবহৃত থাকলেও নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন কমলেও ব্যয় কমছে না। এমনকি কোনো কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে, উল্টো ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে।

এর ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বার্ষিক লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বকেয়ার পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা।

গত এক দশকে সব শ্রেণির গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের খুচরা দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো ব্যয় আদায়ের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হলে বাংলাদেশের শিল্পখাতের বিদ্যুৎমূল্য ভিয়েতনাম, চীন ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি এবং ভারতের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি হয়ে যেতে পারে।

কমিটি ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গুরুতর অস্বাভাবিকতা ও সম্ভাব্য দুর্নীতির ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছে—আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র, এস এস বিদ্যুৎকেন্দ্র, সামিট মেঘনাঘাট, রিলায়েন্স-জেরা, পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র।

কমিটি আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল এবং কয়েকটি প্রকল্পের বিদ্যুৎমূল্য আবার আলোচনার সুপারিশ করেছে। আদানি চুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অস্বাভাবিকতাগুলো কাকতালীয় নয়। এগুলো ছিল বিপুল অতিমুনাফা তৈরির জন্য পরিকল্পিত যোগসাজশের ফল। অধিকাংশ চুক্তিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার হোক বা না হোক, ক্যাপাসিটি চার্জ নিশ্চিত। ফলে অব্যবহৃত সক্ষমতাও রাষ্ট্রের জন্য স্থায়ী আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।

Related Articles

Latest Articles