ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) দুই শিক্ষককে বরখাস্তের ঘটনাকে ‘মব’-এর কাছে আত্মসমর্পণ এবং একাডেমিক স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘন বলে মনে করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তাদেরকে অবিলম্বে পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আজ দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে শিক্ষকদের এই সংগঠনটি।
ইউএপির বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক লায়কা বশির এবং সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এ এস এম মহসিনকে বরখাস্তের প্রতিবাদে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়। মহসিন বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—অবিলম্বে দুই শিক্ষককে পুনর্বহাল করা, বরখাস্তের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ করা, ভীতি প্রদর্শন ও মিথ্যা অভিযোগ তোলায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির নিরাপত্তা ও একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিতে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরেই একাডেমিক স্বাধীনতার সংকট চলছে। ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী মহল ভিন্নমত দমন এবং জবরদস্তির মাধ্যমে আনুগত্য আদায়ের চেষ্টা করে আসছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে এই সংকট কাটানোর আশা জাগিয়েছিল।
তবে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে একটি গোষ্ঠী ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনে তৎপর হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। স্বাধীন বা ভিন্নমত পোষণের কারণে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হয়রানি করা হচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউএপির দুই শিক্ষকের বরখাস্ত এই প্রবণতারই সর্বশেষ উদাহরণ।
বিবৃতিতে বলা হয়, লায়কা বশির ফেসবুকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থেকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন, যা কোনো ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ছিল না। কিন্তু বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একাংশ পোস্টটিকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করে অনলাইনে হয়রানি শুরু করে। তিনি ব্যাখ্যা দিলেও চাপ অব্যাহত থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযোগ যাচাই না করেই তাকে ফোনে পদত্যাগ করতে বলে।
পরে নিরাপত্তার শঙ্কায় লায়কা বশির তেজগাঁও থানায় জিডি করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে বক্তারা অভিযোগ করেন, তদন্ত কমিটি গুগল ফরমের মাধ্যমে অভিযোগ সংগ্রহ করে এবং ৩৪টি বেনামি অভিযোগ পায়, যা যাচাই করা অসম্ভব। তাকে জবাব দেওয়ার জন্য ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও এর আগেই তাকে বরখাস্ত করা হয়, যা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন।
এ এস এম মহসিনের বিষয়ে বলা হয়, কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ বা তদন্ত ছাড়াই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকলেও তাকে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ রয়েছে।
বক্তারা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীরবতার সমালোচনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজলী শেহরীন ইসলাম, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শামীমা শিল এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক তানভীর সোবহান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
