নব্বই দশকের যেকোনো ক্রিকেট ভক্তের কাছে ইংল্যান্ডের সাবেক পেসার ড্যারেন গফ মানেই একরাশ নস্টালজিয়া। মসৃণ ও সাবলীল বোলিং অ্যাকশন, যা কি না কিশোররা অনুকরণ করতে ভালোবাসত; সেই ডানহাতি এই ফাস্ট বোলার তার সমসাময়িকদের মধ্যে নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছিলেন—বিশেষ করে উপমহাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় তার সাফল্যের কারণে। অবসর নেওয়ার পর থেকে গফ বিভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন—ধারাভাষ্যকার, কোচ, প্রশাসক এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে এখনো খেলার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ বছর ৫৫ বছর বয়সী এই তারকা বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ধারাভাষ্যকার প্যানেলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এসেছেন। রবিবার সিলেটে গফ দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে বাংলাদেশের পেস বোলিং, ব্যাজবল, ইংল্যান্ডের চ্যালেঞ্জ এবং তার নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলেছেন।
বর্তমান বাংলাদেশের পেসারদের সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ড্যারেন গফ: নাহিদ রানা তার গতি দিয়ে আমাকে সত্যিই অবাক করে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি সে অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান একজন বোলার যে কি না ১৫০ কিমি/ঘণ্টার বেশি গতিতে বল করতে পারে। এমন গতির একজন বোলারকে যদি ভালোভাবে পরিচালনা করা যায়, তবে সে তিন ফরম্যাটেই বড় সম্পদ হতে পারে। তানজিম হাসান সাকিবের পারফরম্যান্সেও আমি মুগ্ধ। মোস্তাফিজুর রহমান তার বৈচিত্র্যের কারণে বিশ্বজুড়ে অন্যতম সেরা টি-টোয়েন্টি বোলারদের একজন হয়ে আছেন। সাইফউদ্দিনও আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং সে ব্যাটিংও করতে পারে। বাংলাদেশ দলে জায়গার জন্য এই লড়াই এখন খুবই ইতিবাচক।
এই টুর্নামেন্টে রিভার্স সুইং কি খুব বেশি দেখেছেন?
গফ: খুব বেশি নয়, তবে রিপন মন্ডল চাপের মুখে বেশ চতুর ছিল এবং সুপার ওভারে রিভার্স সুইং করতে পেরেছে, বিশেষ করে বাঁহাতিদের বিপক্ষে। হাসান মাহমুদও দারুণ। বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই পর্যায়ে আছে যেখানে একসময় ভারত ছিল—ফাস্ট বোলারদের একটি বড় ভাণ্ডার তৈরি করা। এর ফলে নিউজিল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকা, যেকোনো জায়গাতেই আপনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।
ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক অ্যাশেজ পারফরম্যান্স সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
গফ: এটি খুবই হতাশাজনক ছিল। বিশ্বাস ছিল এই ইংল্যান্ড দলের জয়ের সত্যিকারের সুযোগ আছে। যদি অস্ট্রেলিয়ার সব বোলার ফিট থাকত, তবে সিরিজটি সহজেই ৫-০ হতে পারত। যেসব পিচে বল মুভ করে, সেখানে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং টেকনিক যথেষ্ট ভালো ছিল না। কেবল জো রুট এবং কিছুটা জ্যাকব বেথেল দেখিয়েছেন যে অস্ট্রেলিয়ায় রান করার জন্য সঠিক টেকনিক কতটা প্রয়োজন।
বাজবল ক্রিকেট সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন?
গফ: আমি ইতিবাচক ক্রিকেটের পক্ষে, তবে আমি আসলে বাজবলের চেয়ে ‘ট্র্যাভ-বল’ (ট্রেভিস হেডের স্টাইল) বেশি পছন্দ করি। ইতিবাচকতা ভালো, তবে এটি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আসা উচিত। পাঁচ টেস্টের সিরিজে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ড কেমন পারফর্ম করে, তার ওপর ভিত্তি করেই তাদের সবসময় বিচার করা হবে।
আপনি উপমহাদেশে খুব সফল ছিলেন। এর রহস্য কী ছিল?
গফ: এর জন্য বড় হৃদয় এবং বৈচিত্র্যের প্রয়োজন। আমি নতুন বল দুদিকেই সুইং করাতাম, আর বল পুরনো হয়ে গেলে রিভার্স সুইং করতাম। আমার বিশেষ বোলিং অ্যাকশনের কারণে কবজি নিচু করে এবং সাইডওয়ে অ্যাঙ্গেল থেকে বলটিকে “উড়ন্ত থালা”র মতো পাঠাতে পারতাম। এই দক্ষতার কারণেই পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় আমি অনেক উইকেট পেয়েছি।
আপনি অস্ট্রেলিয়াতেও সফল ছিলেন। সেখানকার চাপ কীভাবে সামলাতেন?
গফ: আমি অস্ট্রেলিয়ায় আটটি টেস্ট খেলেছি এবং একটি হ্যাটট্রিক ও কয়েকবার ইনিংসে পাঁচ উইকেটসহ প্রায় ৪১টি উইকেট নিয়েছি। আমার ডাকনাম ছিল ‘বক্স অফিস গফ’, কারণ গ্যালারিতে দর্শক যত বেশি হতো, আমি তত ভালো খেলতাম। আপনি যদি মন থেকে খেলেন, তবে অস্ট্রেলিয়ার জনগণ আপনাকে সম্মান করবে, কিন্তু তা না পারলে তারা আপনাকে ছেড়ে কথা বলবে না।
আপনার চোখে সবচেয়ে কঠিন ব্যাটার কারা ছিলেন?
গফ: আমার সবচেয়ে বড় আফসোস হলো ইনজুরির কারণে ভারতের বিপক্ষে কখনো টেস্ট খেলা হয়নি। আমি আমার ফর্মের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় শচীন টেন্ডুলকারকে বল করতে চেয়েছিলাম। তিনিসহ ব্রায়ান লারা, জ্যাক ক্যালিস, রিকি পন্টিং, ইনজামাম-উল-হক এবং মোহাম্মদ ইউসুফ অসাধারণ ছিলেন। তবে বল করার জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল অ্যাডাম গিলক্রিস্ট—সে সাত নম্বরে নেমে মুহূর্তের মধ্যে খেলা বদলে দিতে পারত। ল্যান্স ক্লুজনারও খুব কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল।
আপনি কি জো রুটকে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় মনে করেন?
গফ: অবশ্যই। বিভিন্ন যুগের তুলনা করা কঠিন, তবে জো রুট যে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গ্রাহাম গুচ অসাধারণ ছিলেন এবং কেভিন পিটারসন যদি ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো না হারাতেন তবে তিনিও এই তালিকায় থাকতে পারতেন, তবে রুটই সেরা।
ক্রিকেট থেকে রিয়েলিটি টিভিতে আসার পেছনে কী কাজ করেছিল?
গফ: মানুষ ভেবেছিল এর জন্য আমার ব্যক্তিত্ব একদম সঠিক। আমি সব কিছুতে নিজেকে পরখ করতে চেয়েছিলাম। আমি ট্যুর ডি ফ্রান্স, মেক্সিকোতে প্রফেশনাল রেসলিং, স্কি জাম্পিং এবং কুকিং করেছি। জীবনে কখনো নাচিনি, তবুও ১২ সপ্তাহের প্রতিযোগিতার পর আমি ‘স্ট্রিক্টলি কাম ড্যান্সিং’-এ বিজয়ী হয়েছি।
