আজকের গল্পটা একদম ভিন্ন। গল্পটা আমার, আপনার কিংবা আমাদের। ২৪ বছরের একটি মেয়ে প্রথমবার জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে পেয়ে ভেবেছিল—অবশেষে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার দিন এসেছে। কিন্তু, বাস্তবতা তাকে বারবার হতাশ করেছে। জন্ম থেকে এখন পর্যন্ত সে একটি গ্রহণযোগ্য, শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অভিজ্ঞতা পায়নি। স্বাধীন দেশে থেকেও একবার ব্যালটে হাত রাখতে না পারা—এ এক অদ্ভুত বাস্তবতা হলেও নির্মম সত্য।
গণঅভ্যুত্থানের পর মেয়েটির মনে নতুন প্রশ্ন জাগলো—’এবার কি আমার ভোট সত্যিই কোনো মূল্য পাবে?’ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে যেমন আশাবাদী করছে, তেমনি আবারও অনিশ্চয়তার গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
কারণ, এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখনও পরস্পরের মতামতকে মূল্য দিতে শেখেনি। শ্রদ্ধা তো নেই বললেই চলে। মতভিন্নতাকে সমঝোতার সুযোগ হিসেবে নয়, বরং অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের আলো ঠিকই দেখা যায়, কিন্তু কাছে যেতেই আবার যেন অন্ধকার।
বাংলাদেশে নির্বাচন বলতে উত্তেজনা, অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, সহিংসতার আশঙ্কা—সবকিছুই যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমাগত একে অপরের প্রতি সন্দেহে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আলোচনা যেন অচেনা শব্দ, আস্থা যেন বিলুপ্ত সম্পদ।
এমন পরিবেশে সাধারণ ভোটাররা, বিশেষ করে তরুণরা রাজনীতিতে সাহস করে আসলেও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেছে। ২৪ বছরের সেই মেয়েটি শুধু এক ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি একটি পুরো প্রজন্মের প্রতীক, যারা গণতন্ত্রকে বইয়ের পাতায় পড়ে, মাঠে দেখে না। গণতন্ত্র শব্দকে বাস্তবায়িত করতে প্রয়োজন দেশের সব রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা।
সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো রহস্য নয়—এটি প্রক্রিয়া, প্রস্তুতি, স্বচ্ছতা, ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়। কিন্তু গত দেড় দশক ধরে এই চারটি বিষয়ে কোথাও স্থায়ী অগ্রগতি হয়নি।
অথচ, চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্ট—দলগুলো একে অপরের ওপর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস রাখে না; বহু নির্বাচনে দেখা গেছে অসম রাজনৈতিক মাঠ; আইন প্রয়োগে নির্বাচন কমিশনের দোদুল্যমানতা, সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা নেই; নির্বাচনের সময়ে সহিংসতার সংস্কৃতি; অধিকার থাকা সত্ত্বেও যুব সমাজ ভোট দিতে না পারায় তাদের বিচ্ছিন্নতা, যা তাদের আস্থা নষ্ট করেছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ভোটের আয়োজন করা নয়, পুরো পরিবেশকে বিশ্বস্ত করতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সুরাহা করা। যা হয়নি।
গণঅভ্যুত্থানের পরে দেশ নতুন একটা মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ চায়, রাষ্ট্র বদলাবে। নির্বাচন হবে স্বচ্ছ, উন্মুক্ত, বিতর্কমুক্ত। তরুণরা চায়, তাদের ভোট মূল্যবান হবে। কিন্তু, রাজনৈতিক দলগুলোর সাম্প্রতিক আচরণ দেখলে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
এখনো রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ তাদের বক্তব্যে প্রতিপক্ষকে হেয় করছে, সমঝোতায় অনীহা দেখাচ্ছে, ক্ষমতায় যাওয়াকে দেশের স্বার্থের ওপরে রাখছে। এই মানসিকতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে নির্বাচন যত কাছে আসবে রাজনৈতিক উত্তাপই কেবল বাড়বে—আস্থা নয়।
অথচ, সমাধানের পথ মোটেই জটিল নয়। নির্বাচন নিয়ে দোদুল্যমানতা ভাঙতে হলে কিছু মৌলিক পরিবর্তন করতে হবে।
প্রথমত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সুসস্পষ্টভাবে উল্লেখিত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা হলো যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপর নির্ভর করে সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কতটা সুস্থ ও সুষম প্রতিযোগিতার জন্য রাজনীতি করছে। আইন, প্রযুক্তি, পর্যবেক্ষক—সবকিছু ব্যর্থ হবে, যদি দলগুলো নিজেরাই নিয়ম মানতে না চায়। সদিচ্ছাই হলো বিশ্বাসের ভিত্তি।
দ্বীতিয়ত, আলোচনার টেবিল সক্রিয় করতে হবে। সংলাপবিহীন রাজনীতি বরফের মতো—ওপর থেকে শক্ত দেখায়, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা। আলোচনাই আস্থার প্রথম ধাপ।
তৃতীয়ত, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সব দলের নিরাপত্তা, স্বাধীন প্রচার ও বাধাহীন রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঐচ্ছিক নয়, বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চতুর্থত, নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছ ও দৃঢ় ভূমিকা প্রয়োজন। কেননা, এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, নির্বাচনের মেরুদণ্ড। তাদের দোদুল্যমানতা পুরো নির্বাচনী কাঠামো ভেঙে দেয়।
পঞ্চমত, তরুণ ভোটারদের কাছে যেতে হবে রাজনীতিবিদদের। ভোটের আগে তাদের গুরুত্ব দিতে হবে এবং এখন থেকে নিয়মিতভাবে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সেই ২৪ বছরের মেয়েটির মতো প্রতিটি তরুণের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া শুধু স্বপ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রের মৌলিক গণতান্ত্রিক দায়িত্বও।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পরও আমরা ভোটের মতো মৌলিক অধিকার নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে থাকি। এটাই আমাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, উন্নয়ন দেখিয়েছে, পরিকাঠামো দাঁড় করিয়েছে, কিন্তু একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রক্রিয়া দাঁড় করাতে পারেনি।
এটি শুধু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা বলে পরিগণিত হতে পারে না, এটি এ দেশের জনগণের জন্য রাজনীতি করার দাবি জানানো প্রতিটি রাজনৈতিক দলের দায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে। প্রজন্মের চোখে, বিশেষ করে সেই ২৪ বছরের মেয়েটির চোখে, একটাই প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি আমার ভোটকে এবার মূল্য দেবে?
তার এই প্রশ্নের উত্তর রাজনীতিবিদদের হাতে। এবারও যদি তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু একটি নির্বাচন নয়, একটি প্রজন্মের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসই হারিয়ে যাবে। আর যদি সফল হয়, তাহলে জন্ম নেবে নতুন আস্থা। যে আস্থা রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক করবে।
জুবাইয়া ঝুমা, পিআর প্রফেশনাল
