31 C
Dhaka

আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী লিডসের ব্যাংকআল্টিমাস নিয়ে টানাপোড়েন

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার মিজানুর রহমানকে লিডস করপোরেশনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ফোন করে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাবেক প্রধান হিসেবে মিজানুর রহমান লিডসের কার্যক্রম ও পণ্য সম্পর্কে আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও আইনি পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার পরও তিনি মার্চের শুরুতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন।

বাংলাদেশে গত দুই দশকে ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত। লিডস করপোরেশন এ খাতে কাজ করে আসছে। ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গ্রাহকের হিসাব ও আর্থিক তথ্য সংরক্ষণ, বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ ধরনের ব্যবস্থা তৈরি ও পরিচালনার জন্য কারিগরি দক্ষতা, ব্যবস্থা বিন্যাসের জ্ঞান এবং অর্থের প্রয়োজন হয়।

১৯৯২ সালে বাংলাদেশে এনসিআর করপোরেশনের কার্যক্রম থেকে যন্ত্রপাতি কেনার পর লিডস করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৯ সালে কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরির কার্যক্রমে প্রবেশ করে। লিডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আবদুল ওয়াহিদের বক্তব্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন ব্যাংকে এনসিআরের এটিএম কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকার মাধ্যমে ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে লিডসের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। পরে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেয়।

লিডসের আর্থিক সংকট প্রকাশ্যে আসার আগে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩০০ কর্মী কাজ করতেন, যাদের অর্ধেক ছিলেন কারিগরি বিভাগের। কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের শেষ দিক থেকে নিয়মিত বেতন প্রদানে সমস্যা শুরু হয়। সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা এস এম সাইফুর রহমান জানান, ওই সময় কর্মীদের বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়লেও পরিচালনা পর্ষদ ও মালিকপক্ষ এটিকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল।

এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতের আদেশে লিডসের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাংকআল্টিমাস নিলামে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর পেছনে ছিল খান আখতার আলমের পাওনা পরিশোধসংক্রান্ত মামলা। ওই সময় পাওনার পরিমাণ প্রায় ৮৩ কোটি টাকা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ব্যাংকআল্টিমাস লিডসের প্রধান পণ্য হওয়ায় নিলামের উদ্যোগে কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সাইফুর রহমান জানান, দুই দশকের বেশি সময় লিডসে কাজ করার পর প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যাওয়ার সময় তার পাওনা এক কোটি টাকার বেশি ছিল।

খান আখতার আলমের সঙ্গে লিডসের বিরোধের সূত্র ১৯৮১ সালের একটি মামলা। আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, খান আখতার আলম তখন এনসিআর করপোরেশনের কর্মী ছিলেন এবং বিক্রয় কমিশন পাওয়ার দাবি নিয়ে ওই মামলা করেন। তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত পাওনা কমিশন বাবদ ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। ১৯৮৬ সালে মামলাটি খারিজ হলে তিনি ১৯৮৭ সালে আপিল করেন। এ সময় এনসিআর ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় এবং তাদের যন্ত্রপাতি থেকে লিডস করপোরেশনের যাত্রা শুরু হয়।

লিডসের আইনজীবীদের বক্তব্য ছিল, প্রতিষ্ঠানটি এনসিআর করপোরেশনকে অধিগ্রহণ বা একীভূত করেনি। বরং এনসিআরের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির দায় লিডস গ্রহণ করেনি। তবে ১৯৯৯ সালে খান আখতার আলম মামলার নথিতে লিডস করপোরেশন ও এনসিআরের তৎকালীন আঞ্চলিক ব্যবস্থাপককে পক্ষভুক্ত করেন। বিষয়টি ২০১০ সালে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে বিবেচিত হয়।

২০১০ সালে আদালত খান আখতার আলমের পাওনা নির্ধারণের জন্য নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দেন। এনএল রায় অ্যান্ড কোম্পানিকে এ কাজের জন্য নিয়োগ করা হয়। একই বছর সম্পন্ন নিরীক্ষায় সুদসহ খান আখতার আলমের পাওনা ৭ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়। ২০১৮ সালে সেই পাওনা প্রায় ৫৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায় এবং ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালত লিডসকে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়।

লিডসের কর্মীদের অভিযোগ, ২০১৮ সালে আদালতের ওই নির্দেশের বিষয়টি তাদের জানানো হয়নি। একই সময় থেকেই বেতন প্রদানে অনিয়ম শুরু হয়। সাবেক কর্মী আরিফুর আমরান চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে অনেক সময় তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকত। ২০২৩ সালের শুরুতে তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ার সময় তার পাওনা ১৭ লাখ টাকার বেশি ছিল বলে জানান।

সাইফুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, লিডসের কর্মীদের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ২ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করত। কর্মীদের পাওনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগ থেকে মালিকদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যবহারের কথা জানানো হতো বলে তিনি দাবি করেন।

প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার দায়িত্ব নেওয়ার পর মিজানুর রহমানও অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব জব্দের আগে লিডস মাসে প্রায় ৪ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পেত। বিপরীতে কর্মীদের বেতন বাবদ ব্যয় ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। তার দাবি, নথিতে অর্থের উপস্থিতি থাকলেও সেই অর্থ পাওয়া যাচ্ছিল না এবং অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

এই অভিযোগের বিষয়ে লিডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আবদুল ওয়াহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কর্মীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা হবে বলে জানান। পরে তিনি মিজানুর রহমানকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা কর্মীদের ই-মেইলে জানান এবং কর্মীদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান।

মিজানুর রহমান অবশ্য দাবি করেন, লিডসের আর্থিক ও আইনি সমস্যার পেছনে মালিকপক্ষের সিদ্ধান্ত ছিল এবং পরিস্থিতি সমাধানের বাইরে চলে গিয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্য নথিতে অর্থ সরিয়ে নেওয়া বা অর্থের অপব্যবহারের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ব্যাংকআল্টিমাস ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলোর জন্যও পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কারিগরি কর্মী কমে গেলে রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন সেবা যুক্ত করা এবং সফটওয়্যার হালনাগাদে সমস্যা তৈরি হতে পারে। লিডসের অধিকাংশ কারিগরি কর্মী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলো নিয়ে উদ্বেগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ব্যাংকআল্টিমাস ব্যবহারকারী উত্তরা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, সফটওয়্যার সেবায় হঠাৎ কোনো সমস্যা হলে এর প্রভাব ব্যাংকের কার্যক্রমে পড়তে পারে। তার মতে, একটি কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিবর্তন করা দ্রুত সম্পন্ন করার মতো বিষয় নয় এবং এর প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাহ উল হক জানান, সফটওয়্যার-সংক্রান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি নির্দেশনা রয়েছে। কোনো সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর সংখ্যা কমে গেলেই ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে না বলে তিনি জানান। তবে নতুন পণ্য চালু বা সফটওয়্যার হালনাগাদে বিলম্ব হতে পারে বলে উল্লেখ করেন।

লিডস করপোরেশনের ঘটনাপ্রবাহে তাই একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট কীভাবে তার কর্মী, মালিকানা, আদালতের মামলা এবং ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তার একটি চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৮ সাল থেকে বেতন অনিয়ম, কর্মীদের পাওনা, পুরোনো দেওয়ানি মামলা, অর্থ পরিশোধের আদেশ এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকআল্টিমাস নিলামে ওঠার ঘটনা একই ধারাবাহিকতায় সামনে এসেছে।

তবে এসব ঘটনার পাশাপাশি আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং লিডসের বর্তমান মালিকানা ও পরিচালন কাঠামোর বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাংকআল্টিমাস ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলোর জন্য সফটওয়্যারটির মালিকানা, রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি কর্মী এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য থাকা প্রয়োজন।

Related Articles

Latest Articles