বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, অতীতে আপনাদের সমর্থনে বিএনপি একাধিকবার দেশ পরিচালনা করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার সময় কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। সেজন্য আমি আন্তরিকভাবে এ দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাই।
তিনি আরও বলেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনগুলোকে অবলম্বন করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে আবারও আমি আপনাদের সমর্থন চাই।
আজ সোমবার সন্ধ্যায় বিটিভিতে নির্বাচনী ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘জাতীয় পে স্কেল’ সময়মতো ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি কঠোর দুর্নীতিবিরোধী নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি কার্যকর করা হবে।
তিনি বলেন, কিছু গোষ্ঠী রাজনৈতিক স্বার্থে ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মকে অপব্যবহার করছে ও নির্বাচনী সময়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, অনেক খ্যাতনামা আলেম স্পষ্টভাবে বলেছেন—কিছু মানুষ দলীয় স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে বিশ্বাসী মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তাই আমি সব বিশ্বাসীর প্রতি আহ্বান জানাই—আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন কেউ বিশ্বাসী মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে না পারে।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি এমন একটি দেশ গড়তে চায়, যেখানে বিশ্বাস বা পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ বোধ করবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের হারানো রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটি বড় সুযোগ। এই উপলব্ধি ও বাস্তবতাকে সামনে রেখে দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে।
‘প্রতিটি সেক্টর এবং প্রতিটি শ্রেণি–পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমরা আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্রের মালিকানা কেড়ে নিয়েছিল এবং সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছিল। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আন্দোলন ও হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের কাছে ফিরে এসেছে।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি কর্মসংস্থান, যুবসমাজ, নারী, কৃষক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও শাসনব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার আনবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং আইটি, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। শিক্ষিত বেকার যুবকদের চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ এক বছর অস্থায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, পরিবারের নারী প্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে, যার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোকে মাসিক সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ডকে আমরা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে দেখি। পাশাপাশি কর্মস্থলে ডে-কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন এবং নারীদের জন্য বিশেষায়িত ‘ইলেকট্রিক পরিবহন’ চালু করা হবে। সাইবার বুলিং ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হবে। যার মাধ্যমে হালনাগাদ কৃষি তথ্য ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কৃষকদের সুরক্ষা মানে জাতির সুরক্ষা।
তিনি আরও বলেন, মাধ্যমিক স্তর থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামূল্যে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু হবে এবং বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা যুক্ত করা হবে, যাতে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে।
জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিএনপি ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিওর’ নীতি গ্রহণ করবে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এ লক্ষ্যে সারা দেশে এক লাখ ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। প্রতিটি ইউনিয়নে এই কর্মীরা মানুষের বাড়িতে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরামর্শ দেবেন।
তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা প্রক্রিয়াকরণ ও সেমিকন্ডাক্টর খাত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। যেন প্রতিবছর শত শত হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ধর্ম ব্যক্তিগত, আর রাষ্ট্র সবার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কেউ ধর্ম জিজ্ঞেস করেনি। ২০২৪ সালেও কেউ করেনি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর নিরাপত্তা প্রত্যেকের অধিকার।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশিরা বরাবরই স্বৈরতন্ত্র, চরমপন্থা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রত্যাখ্যান করেছে।
‘এই দেশ আমাদের সবার। দল, ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠি নির্বিশেষে—আমরা সবাই বাংলাদেশি,’ যোগ করেন তিনি।
ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ধানের শীষে ভোট মানে বাংলাদেশের বিজয়। এর মানে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ।
তরুণ ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন। আমাদের তরুণদের প্রথম ভোট হোক গণতন্ত্রের পক্ষে। আপনাদের সমর্থনে আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ব।
