কেরাণীগঞ্জের রোহিতপুরের বিসিক এলাকার বাসিন্দা মো. আবুল কালাম অপেক্ষায় আছেন নির্বাচনের জন্য। এলাকার সার্বিক পরিবেশ নিয়ে কোনো অভিযোগ না থাকলেও অর্থনৈতিক অবস্থা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
ঢাকা-২ আসনের এই ভোটার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এলাকায় সবকিছু শান্তিপূর্ণভাবে চললেও অর্থনৈতিকভাবে অনেকেই একটু নাজুক অবস্থায় আছে। আশা করি ভোটের পর নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে।’
একই আশা প্রকাশ করেন আটিবাজার এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার ভূঁইয়া। নিজেকে একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ হিসেবে দাবি করে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি হয়তো নির্বাচনের পর কিছুটা ভালো হবে। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনীতিটা খুবই প্রতিহিংসামূলক। রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ হলে অনেক কিছুই ঠিক হবে বলে আমি মনে করি।’
কেরাণীগঞ্জ উপজেলার হযরতপুর, কলাতিয়া, তারানগর, শাক্তা, রোহিতপুর, বাস্তা, কালিন্দী ইউনিয়ন ও সাভার উপজেলার আমিনবাজার, তেঁতুলঝোড়া ও ভাকুর্তা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঢাকা-২ আসন।
স্থানীয়দের মতে, পুরো এলাকার প্রধান সমস্যা পরিবেশ দূষণ। এর একটি অংশে রয়েছে বুড়িগঙ্গা নদী। নদী দূষণের পাশাপাশি বায়ুদূষণের কারণে বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
পাশাপাশি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার ও হেমায়েতপুর এলাকায় রয়েছে তীব্র যানজট। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে কমে গেছে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান।
নির্বাচন সামনে রেখে এলাকায় প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে। প্রার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পথসভা করছেন, ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছেন, এলাকায় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
ভাকুর্তা ইউনিয়নের বাসিন্দা আমির হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এলাকার রাস্তায় মিছিল হয়, মাইকে ভোট চাইছেন প্রার্থীরা। আগে অবশ্য বাসায় বাসায় এসে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে ভোট চেয়ে যেত কর্মীরা। এবার এখন পর্যন্ত বাসায় কেউ আসেনি।’
‘এলাকার মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে বেশ উৎসাহ দেখতে পাচ্ছি। এখানে বিএনপি আছে, জামায়াত আছে, ইসলামী আন্দোলন আছে। সবাই তাদের মতো প্রচারণা করছেন। আমি মনে করি, সবার যেমন ভোট চাওয়ার অধিকার আছে, ভোটারদের অধিকার আছে যাকে খুশি তাকে ভোট দেওয়ার। এলাকায় নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সংঘাত-সংঘর্ষের খবর পাইনি,’ বলেন তিনি।
ঢাকা-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনজন প্রার্থী। তারা হলেন—বিএনপির আমানউল্লাহ আমান, জামায়াতে ইসলামীর মো. আব্দুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জহিরুল ইসলাম।
ভোটের প্রচারণায় গিয়ে জনগণের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলে জানান ‘হাতপাখা’ প্রতীকের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দেশের মানুষ দীর্ঘ কলুষিত রাজনীতির পরিবর্তে সুস্থ ধারার রাজনীতি দেখতে চায়। এই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই আমাদের বিষয়ে তৃণমূলের সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি বলে মনে করি।’
তার মতে, অতীতে তরুণদের শুধু রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে এবং নারীদের ভুল বুঝিয়ে রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘ইসলামী আন্দোলন নারীদের কাছে ইসলামের সাম্য ও মর্যাদার সঠিক বাণী পৌঁছে দিয়েছে, যার ফলে নারী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি,’ বলেন তিনি।
তরুণদের কর্মমুখী হিসেবে গড়ে তুলতে এবং নারীদের প্রকৃত অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তার দল শরীয়াহ-সম্মত আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানান জহিরুল ইসলাম।
তিনি জানান, নির্বাচিত হলে তার প্রধান লক্ষ্য ঢাকা-২ আসনের ১০টি ইউনিয়নের সামগ্রিক উন্নয়ন।
বিএনপি প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা এলাকায় ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি। ভোটারদের ভয়ভীতি ও হুমকি উপেক্ষা করে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে ভোটের দিন কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মো. জহিরুল।
বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকির অভিযোগ তুলেছেন জামায়াত প্রার্থী আব্দুল হকও। ভোটারদের সজাগ থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আব্দুল হক ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে মানুষ এখন চরম বিরক্ত। একটি দলের প্রার্থীর সাম্প্রতিক অপকর্ম দেখে সাধারণ মানুষ এখন বিকল্প খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন তৈরি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত হলে প্রথম দিন থেকেই আমি পাঁচটি কাজ করার অঙ্গীকার করেছি। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, মাদক ব্যবসার শেকড় উপড়ে ফেলা, কোনো ধরনের মিথ্যা মামলা বা রাজনৈতিক হয়রানি হবে না, দল-মত-বর্ণ নির্বিশেষে একটি শত্রুমুক্ত সমাজ, তৃণমূল থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত উন্নত ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা।’
ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শুধু ভোট দিয়েই দায়িত্ব শেষ করবেন না। প্রতিপক্ষ অবৈধ অর্থ খরচ করে ভোটারদের বিভ্রান্ত ও ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা করতে পারে। তাই কেন্দ্রে কোনো অনিয়ম দেখলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাবেন এবং ভোট গণনা পর্যন্ত সজাগ থাকবেন।’
বিএনপি প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা আমানউল্লাহ আমান এ আসন থেকে আগে ৪ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে এলাকায় তার মাধ্যমে হওয়া উন্নয়নমূলক কাজের জন্য এলাকায় বিএনপি ও ধানের শীষের জোয়ার তৈরি হয়েছে।
নির্বাচিত হলে তিনি ঢাকা-২ আসনকে একটি আধুনিক পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন।
‘আমার প্রধান প্রতিশ্রুতি পাঁচটি। এলাকাকে সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলমুক্ত করা; ঢাকার সঙ্গে সংযোগ আরও সহজ করা; আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করে জলাবদ্ধতা-আবর্জনামুক্ত পরিচ্ছন্ন শহর গড়া; যেসব এলাকায় এখনো গ্যাস পৌঁছায়নি, সেখানে দ্রুত সংযোগ নিশ্চিত করা এবং ওয়াসার মাধ্যমে আধুনিক পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা চালু করা,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন আমানউল্লাহ আমান।
প্রতিপক্ষ দুই প্রার্থীর হুমকি-ধমকির অভিযোগ ‘সঠিক নয়’ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সাল থেকে এলাকায় নির্বাচন করছি। আমি কখনো কোনো প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমালোচনা করিনি। সেখানে কাউকে হুমকি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আচরণবিধি মেনেই আমার প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’
ভোটারদের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি আধুনিক, শান্তিপূর্ণ ও পরিকল্পিত কেরাণীগঞ্জ গড়ার লক্ষ্যে আবারও ‘ধানের শীষ’ তথা বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয়ী করার আহ্বান জানিয়েছেন আমানউল্লাহ আমান।
সীমানা পুনর্নির্ধারণ করায় এ আসনে এবার ভোটার সংখ্যা কমে হয়েছে ৪ লাখ ১৯ হাজার ২১৫। যার মধ্যে ২ লাখ ১৭ হাজার ৯০৮ জন পুরুষ, ২ লাখ ১ হাজার ২৯৮ জন নারী ও ৯ জন হিজড়া। বিগত নির্বাচনে এ আসনের ভোটার ছিল ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯৫৪।
