নির্বাচনী পরিবেশ কেমন হতে পারে, তার একটা টেস্ট ম্যাচ গতকাল ঢাকায় দেখা গেছে মন্তব্য করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী কায়দায় পুলিশ তার নগ্ন রূপে ফিরে গেছে।
আজ শনিবার দুপুরে যশোর শহরের দড়াটানা ভৈরব চত্বরে ১১-দলীয় ঐক্য আয়োজিত নির্বাচনী পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
পুলিশের উদ্দেশে হাসনাত বলেন, ‘আপনি যে পোশাকটা পরিধান করে আছেন, সেই পোশাকটা আপনার যোগ্যতার মধ্য দিয়ে অর্জন করা। আপনার মেধার মধ্য দিয়ে অর্জন করা। আপনাকে অনুরোধ করব, আপনার বাসায় সন্তান রয়েছে, মা-বাবা রয়েছে। আপনি বিগত তিনটা নির্বাচনের মতো আবার যদি ঘুষের টাকা স্পর্শ করেন, আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠবে।’
‘আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন আগামীর বাংলাদেশটা চাঁদাবাজদের হাতে তুলে দেবেন, আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎটা কি চাঁদাবাজদের হাতে তুলে দেবেন নাকি ন্যায়-ইনসাফের হাতে তুলে দেবেন,’ প্রশ্ন রাখেন হাসনাত।
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ ভাইয়েরা, আপনারা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকুন। কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে না। রাজনৈতিক দলের কাছে দায়বদ্ধ থাকলে কী পরিণতি হয় সেটা আপনারা গত জুলাইয়ে দেখেছেন। আল্লাহর কসম করে বলছি, আপনারা ন্যায়ের পক্ষে, ইনসাফের পক্ষে থাকেন। আপনারা বাংলাদেশের জনতার চাকরি করতে আসছেন, জনতার ট্যাক্সের টাকায় আপনার বেতন হয়, কোনো রাজনৈতিক দলের টাকায় আপনার বেতন হয় না। আজকে যদি আপনি কোনো রাজনৈতিক দলকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে যান, আগামীকাল আপনার সন্তানের চাকরির জন্য তাদেরকে ঘুষটা দিতে হবে।’
বাংলাদেশকে সুখি-সমৃদ্ধ করে তুলতে হলে পুলিশকে অবদান রাখতে হবে উল্লেখ করে এই এনসিপি নেতা বলেন, ‘আমরা চাই একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভাই-ভাইয়ের মতো করে এই বাংলাদেশটাকে একটা সুখি-সমৃদ্ধ করে তুলতে চাই। আপনারা নিজেদেরকে প্রশ্ন করেন, আর কতদিন আপনারা রাজনৈতিক গোলামি করবেন? অনেক পুলিশ ভাইয়েরা আমাদেরকে এসে বলেন, তাদের অফিসাররা তাদেরকে চাপ প্রয়োগ করেন।’
‘জুনিয়র অফিসার আপনারা যারা আছেন, আপনারা জুলাইয়ের কথা ভুলে যাবেন না। বাংলাদেশের জনতা যার বিপক্ষে দাঁড়ায়, কামান দিয়ে, গোলাবারুদ দিয়ে, মিলিটারি দিয়ে, ভারত দিয়ে তাদেরকে আটকে রাখা যায় না,’ যোগ করেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশাসনের আস্থা অর্জনের নির্বাচন উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, ‘আমরা আস্থা রাখতে চাই, বিশ্বাস রাখতে চাই, বিগত তিনটা নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনে কোনো ওসির জন্য খাম পাঠাতে হবে না। কোনো এসপির জন্য খাম পাঠাতে হবে না। কোনো এসআইয়ের জন্য খাম পাঠাতে হবে না। কোনো কনস্টেবলের জন্য খাম পাঠাতে হবে না।’
‘আপনারা যদি একটা অবৈধ টাকা স্পর্শ করে দেখেন, আল্লাহ সাক্ষী, আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ আপনারা বিনষ্ট করবেন। আপনারা মা-বাবার ভবিষ্যৎ আপনারা বিনষ্ট করবেন। এই বাংলাদেশের মালিকানা আপনারা বুঝে নেন। নিজেকে একবার প্রশ্ন করে দেখেন, একদিন যদি কোনো রাজনৈতিক দলের গোলামি করেন, আগামী পাঁচ বছর রাজনৈতিক দলের নেতার বাসায় পোস্টিং-ট্রান্সফার-প্রমোশনের জন্য যেতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
হাসনাত আরও বলেন, ‘আপনাদের বিএনপির পুলিশ হওয়ার দরকার নাই, জামায়াতের পুলিশ হওয়ার দরকার নাই, এনসিপির পুলিশ হওয়ার দরকার নাই। আপনারা বাংলাদেশের পুলিশ হয়ে উঠুন, জনতার পুলিশ হয়ে উঠুন। আমরা আপনাদেরকে নিরাপত্তা দেবো। আমরা আপনাদেরকে মাথায় তুলে রাখবো।’
ভোটারদের কাছে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি যদি জেনেও থাকেন কেউ আপনার বিরুদ্ধে কাজ করছে, তাও তার কাছে আমাদের দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলির দাওয়াতটা পৌঁছায় দিতে হবে। সে আপনার দাওয়াতের অপেক্ষায় রয়েছে, দাঁড়িপাল্লা মার্কায় সিল মারার জন্য অপেক্ষা করছে।’
হাসনাত বলেন, ‘যিনি চাঁদাবাজি করে জীবিকা নির্বাহ করেন, যিনি মাদক ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন, উনিও উনার সন্তানের জন্য একটা সুস্থ, সুন্দর ভবিষ্যৎ রেখে যেতে চান। তিনি এটা বিশ্বাস করেন, এটা শুধুমাত্র ১১-দলীয় ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই সম্ভব।’
১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায় কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা দল কেন্দ্র দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের নামে, নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে, বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মধ্য দিয়ে ভোট রিগিং করার চেষ্টা করছে। আমি বিশ্বাস রাখতে চাই, আমার যেসব ছাত্র ভাইয়েরা কামানের মুখে, গোলা-বারুদের মুখে হাসিনার চোখে চোখ রেখে, হাসিনার পেটোয়া বাহিনীর বিরুদ্ধে গিয়ে যারা জুলাইতে রাস্তায় নেমে এসেছিল, আমার এই ভাইয়েরা আবার এই ১২ তারিখ ভোট কেন্দ্রগুলো পাহারা দিতে নেমে আসবে।’
বিএনপির অনেক নেতাকর্মী কষ্টে আছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘ধানের শীষের অনেক ভাইয়েরা মনঃকষ্ট নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। তাদের নেতারা তাদেরকে টার্গেট দিয়ে দেয়, এই সপ্তাহে পাঁচ লাখ—ওই সপ্তাহে ১০ লাখ। তারাও এসব থেকে মুক্তি চায়। তৃণমূলের যেসব নির্যাতিত-নিপীড়িত বিএনপি নেতাকর্মী আছে, তাদের কাঁধে হাত রাখুন, তারা কষ্টে আছে। তারা নিজেদের নির্যাতিত মনে করছে, নিপীড়িত মনে করছে। কারণ নেতা চাঁদাবাজি করতে অর্ডার দেয়, সেটা কিন্তু কর্মীদেরকে বাস্তবায়ন করতে হয়।’
‘গত ১৭ বছর বিএনপির আমার যে ভাইয়েরা নির্যাতিত হয়েছে, নিপীড়িত হয়েছে, গুম-খুনের শিকার হয়েছে, আজকে তারা বিএনপিতে মার্জিনালাইজড। এক হাইব্রিড বিএনপি এসে এই মূল বিএনপির ভাইদেরকে কর্নার করে ফেলেছে।’
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাসনাত আরও বলেন, ‘আপনারা বিএনপির ভাইদের কাছে যাবেন, যারা জিয়াউর রহমানের আদর্শে বিশ্বাস করে, বেগম খালেদা জিয়াকে ধারণ করে। তারা চাঁদাবাজির সাথে সম্পৃক্ত না। তারা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশকে ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।’
‘আপনারা বিশ্বাস রাখেন, তারা ধানের শীষের মিছিল নিয়ে কেন্দ্রে যাবে কিন্তু ভোটটা দেবে দাঁড়িপাল্লাতে। ভোটটা দেবে শাপলা কলিতে, ভোটটা দিবে রিকশা মার্কায়। সুতরাং, তাদের কাছে আমার দাওয়াতটা পৌঁছে দিতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
