4 C
New York

তদন্ত প্রতিবেদন জমা, হাইকোর্টের নজরদারি আর নিরপেক্ষতা প্রশ্নে চাপে বিসিবি

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির অভিযোগ ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল একটি ক্রীড়া-সংক্রান্ত বিষয় নয়, এটি পরিণত হয়েছে একটি জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নে। সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন, হাইকোর্টের রুল, জনস্বার্থমূলক রিট এবং বিসিবির ভূমিকা সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন গভীর বিচারিক নজরদারির মধ্যে রয়েছে।

২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ রুল জারি করেন। এই রুলে প্রশ্ন তোলা হয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কেন নারী ক্রিকেটারদের জন্য একটি নিরাপদ, যৌন হয়রানিমুক্ত ও লিঙ্গ-সংবেদনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এই নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে আদালত বিসিবিকে পূর্ববর্তী বিচারিক নির্দেশনার আলোকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নির্দেশিকা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন এবং রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় একটি কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট আদালতে দাখিল করতে বলেন।

এই রুল জারি হয় সাবেক জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক জাহানারা আলমকে ঘিরে ওঠা যৌন হয়রানির অভিযোগ থেকে উদ্ভূত একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে। অভিযোগের সূত্রপাত হয়েছিল জাহানারার এক সাক্ষাৎকার থেকে, যেখানে তিনি নারী ক্রিকেট দলের সাবেক নির্বাচক ও টিম ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে গুরুতর যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। পিরিয়ড সংক্রান্ত আপত্তিকর প্রশ্ন, অশালীন প্রস্তাব এবং শারীরিক আচরণের মতো অভিযোগ সামনে আসে। জাহানারা দাবি করেন, তিনি এসব বিষয়ে একাধিকবার বিসিবিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানালেও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। তার অভিযোগের পর রুমানা আহমেদ, সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার ও কোচ রেশমা আক্তার আদুরিও নিজেদের অভিজ্ঞতা গণমাধ্যমে প্রকাশ করেন।

এই প্রেক্ষাপটে বিসিবি গত ৮ নভেম্বর একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রথম দফায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়ায় একাধিকবার সময় বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ৩১ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও ২ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি তারিক উল হাকিমের নেতৃত্বাধীন কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিবি সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করে। তবে এই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

একই দিনে জনস্বার্থমূলক রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিসিবির ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলে। আদালত নির্দেশ দেন, তদন্তের ভিত্তিতে কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী কাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কী বাস্তবায়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, এসব বিষয়ে বিস্তারিতভাবে আদালতকে জানাতে হবে।

এই আইনি প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে রিট আবেদনকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন আহমেদ অসীম বলেন, “এই বিষয়টা শুধু একটি অভিযোগ বা একটি তদন্ত প্রতিবেদন নয়, এটা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি একটি আইনি ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।”

তিনি ২০০৮ সালের বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেনস লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের রিটের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “হাইকোর্ট তখনই স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি থাকতে হবে, কমপক্ষে পাঁচ সদস্যের। নারী সদস্য থাকলে নারীকেই কমিটির প্রধান করতে হবে। এটা অস্থায়ী তদন্ত কাঠামো নয়, এটা স্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা।”

তদন্ত কমিটির গঠন নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “যেই বিভাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বিভাগের কর্তা ব্যক্তিকে তদন্ত কমিটিতে রাখা মানেই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। একজন মানুষ নিজের মামলার বিচারক হতে পারে না। এতে নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়।”

দীর্ঘসূত্রিতা নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন, “দীর্ঘ সময় ধরে যে নির্লিপ্ততা ছিল, সেটাই আসল প্রশ্ন। আদালতের আদেশের পর তড়িঘড়ি করে প্রতিবেদন জমা পড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার চেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেয়।”

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রিপোর্ট গোপন রেখে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে স্বচ্ছতা থাকবে না। এতে ন্যায়বিচার প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। একজন মানুষ দোষী বা নির্দোষ যাই হোক, সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি জানার অধিকার জনগণের আছে।”

তিনি আরও বলেন, “নারী ক্রিকেটারদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল কাগুজে নীতিমালায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। বাস্তব কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”

এখন তদন্ত প্রতিবেদন বিসিবির হাতে, হাইকোর্টের রুল বিচারাধীন। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সামনে প্রশ্ন একটাই, এই প্রতিবেদন কি সত্যিকার অর্থে ন্যায়বিচার ও সংস্কারের পথে নিয়ে যাবে, নাকি এটি আরেকটি প্রশাসনিক নথি হয়েই থেকে যাবে? কারণ এই সংকট কেবল একজন ক্রিকেটারের অভিযোগ নয়, এটি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, মর্যাদা, আস্থা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

Related Articles

Latest Articles